হোম গদ্য গল্প মার্জ্জার-কথা

মার্জ্জার-কথা

মার্জ্জার-কথা
181
0

মানবকূল নিয়া আমি বড়ই হতাশ হইয়া পৃথিবীর পথে পথে ফিরি, পৃথিবীতে এহেন হাস্যাস্পদ প্রজাতি আর নাই। ইহারা ‘কূলশুণ্ড’ পাটহস্তীকে কদলীবৃক্ষ খাওয়ায়—রাজপথে কাতার দেয়, পক্ষীরাজ লইয়া ইহাদের আহ্লাদের অন্ত নাই—রাজপুত্রের বাহন পক্ষীরাজ… কেহ মার্জ্জারের কথা কহে না। পেঁচক-লক্ষ্মী দেবীর পদতলে ঠাঁই পাইয়া প্রতি বৃহস্পতিবার সধবা স্ত্রীলোকের পূজা পাইতেছে, যে মহিষ কাদাজলে গড়াগড়ি দেয়া আর হালচাষ ছাড়া আর কোনো কাজে লাগে না—সেও কিনা সিংহবাহিনী দেবী দ্বারা আক্রান্ত হইয়া এই জনমে কত শারদ অর্ঘ্য পাইল। গণেশের সহিত মিলিয়া ইঁদুরের ইঁদুর সেও কিনা পূজা পায়। কোলে-পো কাঁখে পো ষষ্ঠী ঠাকরুনের বাহন হইয়া আমিও কিছু পূজা পাই বটে, সন্তানপিয়াসী নারীর ভক্তির কেন্দ্রে থাকেন পীবরস্তনী মা ষষ্ঠী—আমার দিকে কাহারও নজর পড়ে না। গেরস্থ ঘরের কন্যারা আমাকে দেখিলেই রে রে করিয়া খন্তা নিয়া ছুটিয়া আসে। পূজার মেঠাই টপাটপ মুখে পুরিয়া এক গেরস্থ-বউ আমার দোষ দিয়াছিল, রাগ করিয়া আমি তাহার সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তান মুখে করিয়া লহিয়া পলাই, একবার নহে, দুইবার নহে, সাতবার। অবশেষে অরণ্যষষ্ঠীর পূজা করিয়া তাহার নিষ্কৃতি হয়।


আমার শ্রবণকে দিব্যকর্ণ বলিলে অত্যুক্তি হয় না, আঁধারেই কত ফোঁসফোঁস শুনিতে পাই। বাহাদুর বলিয়া আমাকে সম্মান করিবে না কেন!


অথচ অমন যে শুকসারি কিংবা দাঁড়ের হীরামণ… তাহাদেরকে আমি এক গালে পুরিয়া খাইতে পারি। মন্ত্রপুত তরোয়াল ছাড়াই অন্ধকারে দিব্য দেখিতে পাই সুতাশঙ্খ সাপের বত্রিশফণা। আমার শ্রবণকে দিব্যকর্ণ বলিলে অত্যুক্তি হয় না, আঁধারেই কত ফোঁসফোঁস শুনিতে পাই। বাহাদুর বলিয়া আমাকে সম্মান করিবে না কেন!

ভুলিও না, ডালিমকুমার পাশাবতীদের সাত বোনের সাথে পাশা খেলিতে গিয়াছিল। সেই যে পাশাবতী, যাহার পুরীর ফটকের নিশানে রচিত আছে তাহার পরিচয়, যে পাশাবতী মানবজীবনের ন্যায় ‘যে জিনে’ শুধু তাহাকেই মালা দেয় আর যে হারে তাহাকে পেটে পুরিয়া লয়। রাজপুত্র সেই পাশাবতীর সহিত পাশা খেলিতে গিয়া হারিলেন, ইঁদুর আসিয়া পাশার দান উল্টাইয়া দিল বলিয়া হারিলেন, পণ হিশাবে রাজপুত্রের পক্ষীরাজকে দিতে হইল। চোখের জলে ভাসিয়া পক্ষীরাজ ঘোড়া গরাসে গরাসে পাশাবতীর পেটে গেল, রাজপুত্রের মনেও পড়িল না কতকাল এই অবলা জীব তাহাকে হাড়ের পাহাড়, কড়ির পাহাড় পার করিয়া লইয়া ছুটিয়াছে, পায়ের তলায় কত নরমুণ্ড তুষ করিয়াছে। অন্ধকারে আমি স্পষ্ট দেখিতে পাই সত্য, অন্তর্লঘু এই সকল মনুষ্যের ভালোবাসা রাক্ষসের পিরিতি হইতে পৃথক কী রূপে আমি তাহা প্রকাশ্য দিবালোকেও ভেদ করিতে পারি না। আমার নিকট সকলি সমান ঠেকে। আফিম খাইয়া কমলাকান্তের নিকট যেইরূপ গাছের কাঁদি কাঁদি নারিকেল আর গবাক্ষের কাঁদি কাঁদি যুবতী একরূপ ঠেকিত, কতকটা তেমন।

পক্ষীরাজ হারাইয়া রাজপুত্র পরদিন আর ভুল করিলেন না, নিকটস্থ গ্রামের একটি বাটী হইতে আমাকে সংগ্রহ করিয়া আনিলেন, শতরঞ্চে পাশার পাশে আমি ঘাপটি মারিয়া বসিলাম। ইঁদুর আমার গায়ের গন্ধে দুই পা আগাইলে দশ পা পিছায়। ইঁদুর আসিয়া পাশার দান উল্টাইতে পারিল না বলিয়া পাশাবতী পলক ফেলিতে না ফেলিতে হারিল। রাজপুত্র পক্ষীরাজ ফিরিয়া পাইলেন, একে একে সাত ভাইকে তাহাদের ঘোড়াসমেত ফিরিয়া পাইলেন। পাশাবতীর সকল জিতিয়া রাজপুত্র এইবার পাশা আর ইঁদুর চাহিলেন, পাশাবতী সম্মত না হওয়ায় আমাকে ছাড়িয়া দিলেন। আমিও স্বমূর্তি ধরিয়া ইঁদুরের পো’কে ছিঁড়িয়া খাইলাম। ঘরের পরানবাতি নিভিল। সাত পাশাবতী সাত বোন সাতখানা কেঁচোর মরণ মরিল।


জগতের লাভক্ষতির বিচিত্র নিয়মে আমার অর্জন ক্ষীণমাত্র, ক্ষতি আপাতদৃষ্টে কিছুই নহে, অথচ আমার হিশাবে আমার অর্জনের সমুচিত গৌরব না হওয়াই আমার ক্ষতি।


রাজার পুত্র ডালিমকুমার কই আমাকে কোলে করিলেন না, বলিলেন না ‘এতদিন ছিলে সখা—কা’র দুধে-ভাতে?’, তিনি ভাইদের সঙ্গে করিয়া পক্ষীরাজ ছুটাইয়া স্বভূমে ফিরিলেন। রাজপুরীতে সোনার হাট বসিল। এত শোরগোলে কেহ ক্ষুদ্র মার্জ্জারের কীর্তি মনে রাখিল না। সত্যকার বীর হিশাবে, এমন অকল্পনীয় জয়ের অনুঘটক হিশাবে আমাকে কেহ অভিনন্দন জানাইলো না, আমি অখ্যাত গাঁয়ের অজ্ঞাতনামা কেলে বেড়াল হিশাবে কোথা কোথা ঘাস-জল খাইতে লাগিলাম, অন্ত্র পরিষ্কার করিতে বেড়ালে ঘাসপাতা খায় বৈকি। জগতের লাভক্ষতির বিচিত্র নিয়মে আমার অর্জন ক্ষীণমাত্র, ক্ষতি আপাতদৃষ্টে কিছুই নহে, অথচ আমার হিশাবে আমার অর্জনের সমুচিত গৌরব না হওয়াই আমার ক্ষতি। যাচাই করিয়া ফিরাইয়া দেওয়া রত্নের যদি হৃদয় থাকিত, তাহা হইলে সে আপনাদেরকে বুঝাইয়া দিতে পারিত এ ক্ষতির বোধ কিসের, পুরুষকার কেবল মানুষের থাকে না, হুলোরও থাকে। যাহা হউক, যুধিষ্ঠিরকে যেমন করিয়া কুরুসভায় পাশাখেলায় হারিতে হইয়াছিল, লজ্জায় এবং ধিক্কারে মিশিয়া গিয়া সর্বস্ব খোয়াইতে হইয়াছিল, সেইরূপ হইলেই হয়তো ডালিমকুমারের উচিত শিক্ষা হইত। উচিত কিছু আজকাল জগতে হয় না। জগৎ অনুচিতের অধীন, বীরের সম্বর্ধনা নাই, কীর্তির সহিত যশের যোগ নাই। মনুষ্য যদি আমার ন্যায় প্রায়দিব্য-দৃষ্টি পাইত, তাহা হইলে দেখিত সমগ্র জগৎকে তাহারা পাশাবতীর ইঁদুরের উল্টাইয়া ফেলা দানের মতন করিয়া ফেলিয়াছে। এই খেলায় হৃদয়হীন ছাড়া কেহ জিতিবে না। অতিকায় মেকুর-অবতার ছাড়া এই অনাচারেরও কেহ প্রতিকার করিতে পারিবে না।

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

জন্ম ৮ ডিসেম্বর, ১৯৭৬; ঢাকা। স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক। স্নাতোকোত্তর, যুক্তরাজ্য। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত গ্রন্থ—

'কনফেশন বক্সের ভিতর। অটাম-দিনের গান [নভেলা, ভাষাচিত্র, ২০১০]
ভরযুবতী, বেড়াল ও বাকিরা [গল্প, শুদ্ধস্বর, ২০১১]
অলস দিন-খয়েরিপাতা-বাওকুড়ানি' [গল্প, শুদ্ধস্বর, ২০১২]
আনবাড়ি [গল্প, শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
ইভ গ্রীন [অনুবাদ, আদর্শ, ২০১৫]

Latest posts by সাগুফতা শারমীন তানিয়া (see all)