হোম গদ্য গল্প মানুষকুকুর!

মানুষকুকুর!

মানুষকুকুর!
566
0

১.
কামাল কুকুর হয়ে গেছে! অলৌকিক! অথচ বাস্তব—বিস্ময়কর! আজ পুরো এলাকাজুড়ে শুধু একটাই আলোচনা—কামাল মানুষকুকুর! সাধারণের মধ্যে বিস্তর কৌতূহল। বাড়ির উঠানজুড়ে পরিচিত-অপরিচিত মানুষের ঢল। কারো চোখে বিস্ময়, কারো মুখে হাসি, কারো বুকে ভয় ও ব্যথা একাকার হয়ে আছে। অর্থাৎ কেউ ব্যথিত, কেউ-বা উচ্ছ্বসিত। বন্ধুদের ব্যথা যেন সবচেয়ে বেশি। আবার অনেকে বন্ধুত্ব অস্বীকারের প্রস্তুতিও নিচ্ছে। মানুষকুকুরকে তো আর বন্ধু বলে পরিচয় দেওয়া যায় না। কামালের নিন্দুকরা আজ সঠিক বিচার পেয়েছে ভেবে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাচ্ছে। কেউ-বা ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে বলছে, লঘু পাপে গুরু শাস্তি? মানুষ ওকে মানুষকুকুর বলছে আদল দেখে—কামালের কিছুটা ছাপ যেন এখনও খেলে যাচ্ছে মানুষের চোখে—স্মৃতি থেকে তো আর হারিয়ে যায় নি সেই সৌম্য-দর্শন। এলাকার মানুষ বিষয়টা সম্পর্কে আজ জানলেও কামালের কুকুর হওয়ার ঘটনা দুদিন পূর্বের। পরিবার কতদিন চেপে রাখবে! কুকুরকে পোষ মানিয়ে পায়ের তলাতে রাখা যায়—কুকুরের সাথে পায়ে পায়ে তাল রেখে তো আর হাঁটা যায় না।


কবি থেকে কুকুর, এখানে আত্মনিয়ন্ত্রণের কোনো পূর্ণতা নেই।


কামাল কবিতা লিখত। স্বপ্নাবিষ্ট। বাউণ্ডুলে। ভবঘুরে। উদ্ভিন্নমান এক তরুণীর সাথে প্রণয় ছিল—পরিণতি পায় নি। এ সম্পর্ক এলাকার মানুষের কাছে গোপন ছিল না। যদিও সেই যৌবনা নারীকে হাতে গোনা দুএকজন ছাড়া কেউই দেখে নি। পরিবারও প্রেম ও প্রণয়িনীর কথা শুনতে চায় নি। বেকারের আলোচনা কখনো কখনো কুকুরের আবদারের মতো হয়ে যায়। কামালের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। এ বিষয়, সে বিষয় মিলিয়ে, নানা কারণে পরিবারের সাথেও সুসম্পর্ক ছিল না। বাহির থেকে দেখতে নিপুণ মনে হলেও দেয়ালের গাঁথুনি দুর্বল ছিল। সমাজের কাছেও কামাল বাঞ্ছিত ছিল না। কামাল বাহিরে মানুষের জীবন বহন করলেও ভেতরে ভেতরে কুকুরজীবনই যাপন করত। আজ যেখানে বিপরীত চিত্র মানুষের চোখে খেলা করছে। মানুষ নিশ্চিত ভাবছে, কামালের বাহিরে কুকুরের পোশাক থাকলেও ভেতরে ঠিক মানুষ-জীবন লুকিয়ে আছে। কবি মনও হয়তো বর্তমান।

কামাল ভাষা নিয়ে কাজ করত। ভাবের ভাষা। কবিতা অন্তপ্রাণ এ জীবনে ব্যক্তিক-পূর্ণতা ছিল। কবি থেকে কুকুর, এখানে আত্মনিয়ন্ত্রণের কোনো পূর্ণতা নেই।  মনের নিগূঢ় অভীপ্সা ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত ভেতরে কাজ করবে না নিশ্চিত—বিকল, চৈতন্যহীন। একটা অপরিকল্পিত কুকুরজীবনে কামাল নিজেকে অপ্রস্তুত আর নিরাশ্রয় ভেবেছিল প্রথম দিন। ঘুম থেকে উঠে দেখে আয়নার ভেতরে এক কুকুর দেখা যায়। আতঙ্কিত চোখ মুহূর্তেই নিজের দিকে তাকায়। আবার আয়নাতে। এভাবে ক’বার যে চাওয়া-চাওয়ি হয়েছিল তা ও নিজেও জানে না। অস্থিরতায় দুহাত দিয়ে চুল ধরতে চাইছিল। দেখে কুকুরের চার পায়ের দুপা সামনে চলে আসে। কামাল অনুভব করে, শরীরের সবকিছুতেই এখন কুকুরের আদল। পেছনে লেজও হয়তো আছে একটা। বাঁকা। নড়ছে বোধহয়। এসব ভেবে আরো কুঁকড়ে গেল। দমে গেল। চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল টপটপ। চোখ দুটোও কি কুকুরের হয়ে গেছে? কাফকার রূপান্তর গল্পের কথা মনে করল। শেষ পর্যন্ত কাফকার গল্প ওর মাধ্যমেই বাস্তবরূপ পেল!

অদ্ভুত আর অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের ঘ্রাণ পেয়ে প্রথমেই মার কথা মনে পড়ল। মাকে চিৎকার করে ডাকতেই ঘেউ ঘেউ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ মুখ দিয়ে বের হলো না। অপরিচিত এ শব্দ শুনে কামাল নিজেও অপ্রস্তুত। বাড়ির সবাই যখন কুকুরের ডাক শুনে কামালের রুমের সামনে চলে এল তখন কামালের স্বর নিচু হয়ে কুঁইকুঁই শব্দ হতে লাগল। বড় ভাই না-বুঝে লাঠি নিয়ে তাড়া করল। বাড়ি চালালে কামালের গায়েও পড়ল। আবারও কুঁইকুঁই শব্দ। যন্ত্রণা, লজ্জা, অপমান। কামাল কঠিন বিপদ বুঝে খাটের কোণায় যেয়ে চুপটি করে বসে রইল। ভয়াশ্রিত দেহ! দুটো চোখ শুধু সবার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে চাচ্ছে। নিজেকে চেনাতে চাচ্ছে কি! পালাবার কোনো তাড়না কুকুর-বনে যাওয়া কামালের চোখে দেখা গেল না। অষ্টাদশী ছোট বোন ভয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। কিছুতেই যখন কিছু হচ্ছিল না তখন সবার কামালের কথা মনে পড়ল। কামালকে বাড়ির কোথাও খুঁজে না পেয়ে মা ও বড় ভাই কুকুরের আদল লক্ষ করল। কুঁইকুঁই শব্দ আর চোখের আকুতি দেখে ধীরে ধীরে বুঝতে পারল এ কুকুর নয়, কামাল। কুকুর নয় তাও তো বলা যায় না—কামালকুকুর নয়তো মানুষকুকুর।

দুদিন অভুক্তই থাকে কামাল। খাবারে অরুচি কিংবা ক্ষুধার তীব্রতা কম ছিল বিষয়টা এমন নয়। এ রূপান্তরের পর খাবার কি মুখ দিয়ে ঢোকে? মা পাঠিয়েছিল ভাতের মাড়, রুটি, বিস্কিট। এসব খাবার তো সচরাচর খেতো সকালের খাবারের আগে নয়তো বিকেলে। আজ বাড়ির উঠানে কামালের জন্য খাবার বরাদ্ধ হাড্ডি, এঁটো ভাত-তরকারি—উচ্ছিষ্ট খাবার। খাবারের কথা মনে পড়লে কামালের হাসিই পায়। ছোট বোন আবদারে নয়তো স্নেহের অধিকারে উৎকৃষ্ট খাবার কেড়ে নিত—আজ ওরই উচ্ছিষ্ট খাবার খেতে হচ্ছে ক্ষুধার তাড়নায়। কৌতূহলী মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখছে করুণ এ দৃ্শ্যপট।


অতীতের কবির চেয়ে বর্তমানের কুকুরের মূল্য ওর কাছে বেশি?


আজ সকালে ডাক্তারকে খবর দেওয়া হয়েছিল। এসে ফিরে গেছে কামালের অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধ আর পশুসুলভ আচরণ পরখ করে। পুলিশকেও খবর দেওয়া হয়েছে। পুলিশ এসেই ফায়সালা করবে কামালের ভবিষ্যৎ। কামাল জনশূন্য উঠানে হঠাৎ জড়ো হওয়া মানুষগুলোকে লক্ষ করে। অধিকাংশ মানুষই কামালের পরিচিত। কামাল সবার মুখভঙ্গি দেখে বুঝতে পারছে কার ভেতর কী মনোভাব লুকিয়ে আছে। মানুষ থাকাকালীন ওর ভেতরে সূক্ষ্ম আর তীক্ষ্ণ বিষয়গুলো কাজ করত সত্যি—তাই বলে এতটা প্রখর ছিল কি? এ যেন কুকুরীয় শক্তি! কার চোখে আতঙ্ক, কার চোখে আনন্দ, কার চোখ প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপে মিটিমিটি হাসছে তাও চোখের আড়াল হচ্ছে না। দূরদৃষ্টির মাঝে দুঃখবাদ ভাবনা যখন মনকে একেবারেই ঘায়েল করে ফেলছে, তখন লক্ষ করল, তন্ময় নামের ছেলেটা কেন জানি হঠাৎ সামনে চলে এল। একটা রুটি কামালের নিকট ছুড়ে ফেলে পুনরায় পেছনে ফিরে গেল ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি বজায় রেখে। রুটিটা বাসি। পচা। দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। এ তন্ময়ই তো সেই ছেলেটা যার কাছে এখনও হাজার টাকার উপরে পাবে কামাল। যে তন্ময় এক কাপ চা আর একটা সিগারেটের জন্য কুকুরের মতো কামালের পিছু পিছু পুরো একটা প্রহর কাটিয়ে দিতে সদা প্রস্তুত থাকত, আজ কামালকেই কুকুর দেখছে ও। কামালকে কুকুর দেখে ও কি নিজের ভেতরে গড়ে ওঠা কুকুরের আচরণকে ভুলার চেষ্টা করছে? নাকি পাওনা টাকা দিতে হবে না জেনে ভেতরের পুলক উপচে পড়ছে। তন্ময়কে কঠিন কিছু কথা বলার চেষ্টা করল কামাল। ধমকাতে ইচ্ছে হলো। ওর প্রকৃত পরিচয় সবার সামনে প্রকাশের জোর তাড়নাও প্রকাশ করল। কিন্তু কথা তো আর বের হলো না। ঘেউ ঘেউ শব্দে পুরো উঠান কেঁপে উঠল। আতংকিত হয়ে কিছু মানুষ পেছনে সরে গেল। সুন্দরী রমণীরা একে অন্যের পায়ে পা তুলে দিলো। বিশ্রী অবস্থা! শেকলে বাঁধা না থাকলে আজ কামাল বুঝি কামড়েই দিত। কামড়টা তো হাঁটুর নিচেই দিত। এ কথা ভেবে কেমন মুষড়ে গেল কুকুরের পোশাক পরা কামালমন।

বৃষ্টি এসেছে। কামাল উঠে দাঁড়াল গোল চোখ বড় বড় করে। বৃষ্টির চোখও অপলক। চাহনি স্তিমিত ও ঘোলাটে। কান্না করেছে কি? নাকি চোখও অভিনয় করে দৃষ্টির ভেতরে। প্রায়শ্চিত্ত? ভালোবাসা! করুণাও হতে পারে। মায়ের সাথে কথা বলছে। বৃষ্টি কামালকে সাথে নিয়ে যেতে চায়। ভাইয়া রাজি। মা কী উত্তর দিবে বুঝতে পারছে না। বড় ভাই কী সম্পত্তির পুরোটা অধিকারের লোভে কামালকে বাড়ি থেকে তাড়াতে চাইছে? কামালের কুকুর-বনে যাওয়াতে তার লাভ তবে নিতান্ত মন্দ না! কিন্তু বৃষ্টি কেন কুকুরকামালকে নিতে চাচ্ছে? প্রেম তো অস্বীকার করেছে প্রবাসী পাত্র’র টাকার ঘ্রাণ পেয়ে। এখন সুখও নাকি উপচে পড়ছে শরীর বেয়ে বেয়ে। শরীরও অনেকটা ভরন্ত। শরীর শরীরের স্বাদ পেলে যা হয়। বৃষ্টির এ শরীর দেখে কি কামনা জাগছে? মুখ দিয়ে লালা পড়তে দেখে কামাল নিজেই অবাক হয়ে গেল। বৃষ্টি কাছে আসাতে কামালের ভাবনা বিদায় নিল। স্বামী প্রবাসে—বৃষ্টির কি একাকী জীবনে নিছক কুকুর পোষার শখ? ও তো নিশ্চয়ই পাশ্চাত্য রমণীদের মতো কোলে কোলে বয়ে বেড়াবে না কুকুররূপ কামালকে। এক বিছানায় শুয়ে শরীরের উষ্ণতাও নিবে না। তবে কেন অতীতের কবির চেয়ে বর্তমানের কুকুরের মূল্য ওর কাছে বেশি? প্রতিশোধ! ওর স্বপ্নের শিল্পপতি হতে পারে নি বলে? এখন কি পায়ের কাছে বসিয়ে বিস্কিট খাওয়াবে? বিষাদ ভর করল ওর চোখে। ছলছল চোখ আরো নরম হয়ে এল।

পুলিশ এসে বিহবলের মতো কামালের দিকে চেয়ে আছে। মানুষকুকুরের চোখে পুলিশ আজ মানুষ হয়ে উঠল। পুলিশ আল্লাহকে স্মরণ করতে বলল। পরিবারের সবাইকে সান্ত্বনা দিয়ে চলে গেল। যাবার আগে সাবধান করে গেল কামালকে যেন কেউ না নেয়। আল্লাহর প্রতি আস্থা রাখলে তিনি নিশ্চয়ই আগের মতো কামালের মানুষরূপ ফিরিয়ে দিবে।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের আনাগোনা চলল। একপক্ষ আসে তো আরেকপক্ষ যায়। কারো ব্যথিত মন দেখে কামালের চোখ ছলছল করে ওঠে। কারো স্বস্তিমুখ দেখে কামালের মানবপশু-মন আক্রোশে ফেটে পড়ে। উঠানজুড়ে অন্ধকার দখল নিলে মানুষ কমে আসে। কামাল একাকী চিন্তা করে আশ্চর্য এ জীবনাভিজ্ঞতার কথা। এও কি থাকে মানুষের অদৃষ্টে? এ ভাবনায় বিবেকের দ্বার উম্মোচিত হয়। রাস্তার কত কুকুরকে অযথা লাথি মেরেছে। কুকুরগুলো এক টুকরো রুটির জন্য চাতকের মতো হাঁ করে তাকিয়ে থাকত। তাতে মানবমন নরম হয় নি—মজা পেয়েছে, মজা করেছে। রুটি না ছিড়েই শূন্যহাতে ঢিল ছুড়েছে। কুকুর দৌড়ে দিয়ে ধোঁকা খেয়েছে। অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল কামাল নিজের পুরোটা উজার করে।


কামালকুকুর মুক্ত—ও জঙ্গলে খুঁজে নিবে বাসযোগ্য পৃথিবীর ঠিকানা।


সন্ধ্যা গাঢ় হলে এলাকার ছেলে আক্কাস কামালের সামনে এসে দাঁড়ায়। হাতে লাঠি। আক্কাসের সাথে কামালের সম্পর্ক কোনোকালেই ভালো ছিল না। তারা পরস্পর প্রতিযোগী কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী এমনটাও নয়, আবার শিক্ষা কিংবা মানসিকতায় তারা সমদর্শীও নয়। বয়সে বড় আক্কাসের কাজই ছিল কামালের কবিত্ব-শক্তি নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা। এ নিয়ে একবার হাতাহাতিও হয়ে গেল। সেই লড়াইয়ে কেউ হারে নি, কেউ জিতেও নি।  কামাল কুকুর হওয়াতে আক্কাস ব্যথিত না হয়ে স্বাভাবিকতায় খুশিই হলো। আজ আক্কাসের সুবর্ণ সুযোগ— কামালকুকুরকে ঘায়েল করার। লাঠি দিয়ে দুইটা বাড়ি দিতেই কামাল কুঁইকুঁই করে উঠল চোখে ভয় ও আতংক নিয়ে।

আক্কাস বলে, মানুষের বাচ্চা কুত্তা! তোর তো জন্মের ঠিক নাই রে। তুই না, কবি? একটা কবিতা বল না? ঘেউ ঘেউ ঘেউ…

আক্কাস বিকৃত মুখ করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। গলায় শিকল বাঁধা না থাকলে আজ আক্কাসকে দেখে নিত ও। হোক না হাঁটুর নিচে—কামড়ের পর কামড় বসিয়ে দিত। কামালের বিকৃত মুখ দেখে আক্কাস আরো বেশি ক্ষেপে চালাতে থাকে আঘাতের পর আঘাত। ভেতর থেকে মা ও বড় ভাই সেই চিৎকার শুনতে পায়। কামালের আক্রোশের কোনো ডাক কি? দরজা বন্ধ করে দেয়। কার এত ভালো লাগে বিরক্তিকর চিৎকার! ঘেউ ঘেউ ঘেউ… ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে কামাল মুষড়ে পড়ে। জীবন অর্থহীন হয়ে ওঠে। কোনো কুকুর আত্মহত্যা করেছে কিনা ওর জানা নেই। আজ ওর ইচ্ছে হচ্ছে আত্মারবিনাশ ঘটাতে। আত্মবধের দুর্মরস্পৃহা কাজ করছে ভেতরে ভেতরে—প্রবলভাবে। জামান এসে রক্ষা করে—কেড়ে নেয় আক্কাসের লাঠি। চলে ধস্তাধস্তি। আক্কাসকে মাটিতে ফেলে জামান চিৎকার দিয়ে বলে, তুই তো মানুষ না, কুকুরের চেয়েও অধম। বন্ধুসম জামানের আচরণে কৃতজ্ঞ কামাল। ওর চোখে মুখে হাসি ফুটে ওঠে। যদিও জামানের কথাটা বুকে বিঁধে থাকে কিছুক্ষণ। অনুরণিত হয় চিন্তার ভেতরে—তুই তো মানুষ না, কুকুরের চেয়েও অধম! পশু বলেই কি কুকুর অধম হয়ে যায়! কামাল বুঝতে পারে জামানও সামনে আসতে ভয় পাচ্ছে। কুকুররা কি আক্কাসরূপী মানুষের চেয়েও ভয়ংকর?

সকাল হয়। ছোট ভাই ‍দিপু আসে ফজরের নামাজের পর। সেই দিপু যাকে কামাল একদিন অযথাই কান ধরে ওঠবোস করিয়েছে। দিপুর কান্না দেখে হেসে উঠেছে। আকুতি ও বিনয়কে দুর্বলতা মনে করেছে। দিপুও কি আজ প্রতিশোধ নিবে? পেটাবে লাঠি দিয়ে নাকি থুতু ছিটাবে? মানুষ থাকাকালীন অনুতপ্ত হয় নি। আজ কুকুরশরীর নিয়ে অনুতপ্ত হয়ে কী লাভ! তবে দিপুর চোখে কোনো আক্রোশ নেই। প্রতিশোধস্পৃহাও হয়তো কাজ করছে না। সজ্জন মানুষের আচরণ কি এমনই হয়? আচমকাই দিপু পকেটে হাত দিল। কামাল পূর্বের ন্যায় ভয়ে কেঁপে উঠল। ‍দিপু হয়তো কোনো গোপনাস্ত্র বয়ে এনেছে। কামালের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিবে কি? তাই হয়তো ভালো হবে। এ মরণে ভালো লাগা বোধ না থাকলেও স্বস্তি থাকবে। মুক্তি মিলবে।

না ভয় নয়। স্বস্তিরই ব্যাপার। দিপু পকেট থেকে কাগজ বের করল। কাগজের মধ্যে কী যেন লিখেছে। কামাল কাগজটা পড়তে পারল। কুকুরের মুখের ভাষা হয়তো নেই, চোখের ভাষা তো আছে। দিপু কামালকে ছেড়ে দিবে যদি ওকে কামড় না দেয়। দুখের মাঝেও হাসি পেল কামালের। দিপু জানে না, কুকুর হয়ে কামালের কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি হয়েছে। কামাল ছাড়া পেয়ে ছুটতে লাগল। পেছন ফিরে তাকাবার সময় আর নেই। এ ভূমি অত্যাচারীদের দখলে। অকৃতজ্ঞদের দখলে। এ ভূমিতে স্বার্থ ছাড়া কোনো সম্পর্ক তৈরি হয় না। রক্তের আত্মীয়ও রক্ত চুষে খায়। জঙ্গলে যেতে হবে। যেখানে মানুষ নেই। কামালের বিশ্বাস বন্য পশুরা ওকে ঠিক গ্রহণ করবে। কামালকুকুর মুক্ত—ও জঙ্গলে খুঁজে নিবে বাসযোগ্য পৃথিবীর ঠিকানা।


 কামালের ভেরতটা আবারও নড়ে ওঠে—দ্রুত আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।


২.
ঘুম ভেঙে গেল। কামাল আহমেদ ধড়মড় করে উঠল। টেবিলের উপরে রাখা গ্লাসে হাত দিয়ে ঢাকনা সরিয়ে ঢকঢক করে পানি পান করল। হাত তো ঠিকই আছে। কুকুরের চার পায়ের দু’পা তো সামনে আসে নি। আয়নার সামনে যেয়ে দাঁড়াল পঞ্চাশ বছরে পা দেওয়া কামাল আহমেদ। শরীরের গঠন একই আছে। কুকুরের মতো আদল তৈরি হয় নি। দাঁড়িগুলো শাদাকালো রঙ নিয়ে মিলেমিশে আছে। চোখের জ্যোতিও স্পষ্ট। পেছন ফিরে দেখে নিল লেজ-নামের কোনো ঝলন্ত অঙ্গ আছে কিনা। ঘাম বের হচ্ছে শরীর থেকে। মানুষের শরীর। এবার মাকে ডাকা যায়। ডাকতে পারবে কি? চিৎকার করতেই মা সামনে চলে আসলো। নামাজ পড়ে পায়চারি করছিলেন। স্নিগ্ধ আর সৌম্যরূপে পুরো চেহারা ঔজ্জ্বল্য হয়ে আছে। এ মা’ই তো পৃথিবী। মা ছাড়া কামালের পৃথিবীশূন্য।

কামাল আহমেদ ভাবতে থাকে স্বপ্নের কথা। স্বপ্নের বিষয়বস্তু সম্পর্কে। এরকম অদ্ভুত স্বপ্ন কি কারো জীবনে এসে অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দেয়! যদিও এ স্বপ্নের ভেতর অদ্ভুতরকম এক শিক্ষা লুকিয়ে আছে। সমাজ জীবনের অাজকের অবস্থান নিয়ে এক পরিপূর্ণ পাঠই যেন নিয়ে ফেলল কবি কামাল আহমেদ। তন্ময়, আক্কাস, জামান, দিপু, এমনকি বড় ভাইয়ের রূপে নিষ্ঠুর মানুষটিও আলাদা কোনো ব্যক্তি ছিল না। প্রত্যেকেই ছিল কামাল আহমেদের বিভিন্ন বয়সের রূপ। আসলে এ রূপের মধ্যে লুকিয়ে আছে কামাল আহমেদের ভেতর-বাহির, ভালো-মন্দ, কামনা-কর্মস্পৃহা অর্থাৎ নিন্দনীয় ও আদর্শিক দিক। বুঝতে পারছে ওর ভেতরেও আছে মানুষ আর কুকুরের বসবাস। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ইত্যাদি যেমন আছে তেমনি আছে মানবিকগুণের সত্যবাদিতা, আদর্শ, বিশ্বাস, কৃতজ্ঞতাবোধ। যে গুণ প্রভুত্ব, পরাক্রম, যশ, সম্পদ ইত্যাদি বিষয়গুলোকে তুচ্ছ করতে শেখায়। এসকল ভাবনার ভেতরে মায়ের চিৎকার শুনতে পায়। মা বলছে, কামাল, দেখ না বাবা, একটা কুকুর ঢুকে পড়েছে বাড়ির ভেতরে। কামালের ভেরতটা আবারও নড়ে ওঠে—দ্রুত আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৮৪, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।

কবি ও কথাসাহিত্যিক।

মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর।

পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই :
সমাপ্তির যতিচিহ্ন [উপন্যাস, ইমন প্রকাশনা, ২০১৩]

ই-মেইল : joychironton@gmail.com

Latest posts by মহ্‌সীন চৌধুরী জয় (see all)