হোম গদ্য গল্প মলাটের ভেতর থেকে : ইসরাফিলের প্রস্থান

মলাটের ভেতর থেকে : ইসরাফিলের প্রস্থান

মলাটের ভেতর থেকে : ইসরাফিলের প্রস্থান
290
0

খালিদ মারুফের প্রথম গল্পগ্রন্থ ইসরাফিলের প্রস্থান বেরিয়েছে এবারের বইমেলায়। বইটি প্রকাশ করেছে দাঁড়কাক প্রকাশনা। এতে আছে ৫টি গল্প। একটি গল্প মুদ্রিত হলো পরস্পরে…


জননী ও পুত্রেরা


ধরে নেই এই গল্পপ্রকল্পের প্রধান দুটি চরিত্রের নাম রফিক ও শফিক। তারা একই মায়ের গর্ভজাত, এমনকি তারা যমজ। তিন মিনিটের ব্যবধানে মায়ের জরায়ু ফুঁড়ে তারা ভূমিষ্ঠ হয়েছিল ধরণীর দিকে মুখ রেখে, অন্যেরা যেভাবে জন্মায়। প্রথমে রফিক, তারপর শফিক। তবে কে যে আগে আর কে পরে সেটা নিয়ে আঁতুড় ঘরের ধাত্রীদের মধ্যে কিঞ্চিৎ সন্দেহ থাকলেও বাড়ন্ত সময়টাতে যখন রফিক শফিকের চেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠল তখন সবাই নিশ্চিত হলো যে, রফিকই বড়। তারা তাদের মায়ের গর্ভে এসেছিল সেই মহা খুনের বছরটিতে। তাই হয়তো তাদের জন্মের পর দেশে আর খুন-খারাবি থামে নাই। তবে ছোটবেলা থেকে তারা এতটাই শান্তশিষ্ট যে, তাদের নিয়ে সেই নাবালক অবস্থার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সময়গুলি পাড়ি দেবার পর তাদের মায়ের আর বিশেষ দুশ্চিন্তা হয় নাই। এবং এরই ধারাবাহিকতায় বিয়ের বয়েস কিছুটা পেরিয়ে গেলেও তাদের বিবাহ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্যও হয় নাই। এই নিয়ে মহল্লার লোকেরা যখন তাদের মায়ের কাছে প্রশ্ন রেখেছে, ‘কি! রফিক-শফিকের মা, ছেলেদের কি বিয়ে শাদি করাবা না?’ তখন তাদের মা মুখটাকে কিছুটা ডানে কিংবা বাঁয়ে ঘুরিয়ে নরম স্বরে জবাব দিয়েছে, ‘পাত্রী মেলা ভার।’ তাছাড়া যেহেতু তারা যমজ তাই সবার মত হলো তাদের বিবাহটাও হওয়া চাই একই সাথে।


মাঘের শেষে এসে তারা জানতে পারে বুড়িগঙ্গার ওই পাড়ে মুখ ঢেকে রাখা সেই তান্ত্রিক, জাদুকর ও চিকিৎসকের কথা। ক্যান্সারকেও যে সারিয়ে তোলে নিজের আবিষ্কৃত চিকিৎসায়।


গত বছর তাদের মাকে এই দুরারোগ্য ব্যাধিটাতে পেয়ে বসবার আগে চুনকুটিয়ার কাজী বাড়ির আকরাম কাজীর জ্যেষ্ঠ কন্যাটিকে তার মা অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুধুমাত্র মেয়েটার রূপ-গুণের কথা মাথায় রেখে রফিকের জন্য চূড়ান্ত করে রেখেছে। রণজিৎ কর্মকারের দোকান থেকে তার মায়ের একটা স্মৃতিবহ পুরনো আংটিকে ঘষে ধুয়ে তার উপর আরবি আলিফ-লাম-মিম অক্ষর তিনটি খোদাই করে বিরাট একঝুড়ি পান আর বারো প্যাকেট মিষ্টি সহযোগে তাদের বংশের লোকেরা গিয়ে সেই আংটি পরিয়ে এসেছিল মেয়েটার মধ্যমায়। কেননা হাসি মুখের শ্যামসুন্দরী সেই কনের অনামিকায় আংটিটা খুবই ঢলঢলে হয়ে যাচ্ছিল। পক্ষান্তরে মধ্যমায় সেটা মানিয়ে গিয়েছিল দারুণভাবে। কথা ছিল দ্রুতই শফিকের জন্য কন্যা নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করে একসাথে মহাসমারোহে তাদের দুই সহোদরের বিবাহ হবে। আর এই অবসরে ছয় মাস বাকি থাকা স্নাতক চূড়ান্ত পর্বের পরীক্ষা সম্পন্ন করে নেবে মেয়েটা। যেহেতু শফিকের জন্য কন্যা এখনো নির্বাচন করা যায় নাই, তাই রফিকের প্রচণ্ড ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সে সেদিন চুনকুটিয়ার সেই বাড়িতে যায় নাই।

বারো মাসই কাঠের বাটওয়ালা ছাতা বহনকারী তাদের এক দূরাত্মীয়, মেয়েটার একটা ছবি সরবরাহ করেছিল রফিককে। এই যুগে এমন আকারের ছবি পাওয়া দুষ্কর। ছবি দেখে রফিকের শৈশবে লুকিয়ে পড়া একশ বছর আগেকার উপন্যাসের নায়িকাদের কথা মনে পড়েছিল। এটা নিজে তোলা নিজের ছবি নয়। স্টুডিওতে গিয়ে তোলা ছবি। পাসপোর্ট মাপের নয়, আবার সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ভিউকার্ড সাইজেরও নয়। নিমতলির মোড়ে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার সময় যখন মাঝ বয়েসি ছাতাওয়ালা দূরাত্মীয় লোকটা ছবিটা হস্তান্তর করছিল—রফিক তখন মধ্য কার্তিকের আধা শীত আধা গরমেও ঘেমে গায়ে থাকা মোটা কাপড়ের শার্টটাকে ভিজিয়ে ফেলেছিল। এদিক ওদিক তাকিয়ে রফিক যখন বুঝতে পারল ছবিটা তার বুক পকেটে রাখা সঙ্গত হবে না, তখন সে সেটাকে দ্রুতই হাতের চাপে ফেলে মাঝামাঝিতে একটা ভাঁজ দিয়ে মানিব্যাগের প্রধান পকেটটাতে রেখে সোজা ফিরে গিয়েছিল নিজের ঘরে। যাবার সময় তার মনে হয়েছিল ছবিটাকে ওইভাবে ভাঁজ করে মানিব্যাগে রাখা ঠিক হয় নাই। প্রাণহীন কাগুজে ফটোগ্রাফটাকে একটা সচেতন সত্তা বলে মনে হচ্ছিল তার। সে একবার ভাবল মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে হাঁটতে থাকবে, পরক্ষণেই তার মনে হলো কেউ যদি হাতে মানিব্যাগ দেখে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘কিরে রফিক! মানিব্যাগে কী?’ তাহলে একটা বিব্রতকর কাণ্ড ঘটে যেতে পারে, সেই ভাবনা থেকে মানিব্যাগে যাতে খুব বেশি চাপ না লাগে সেজন্য রফিক তার পাছার মাংসপিণ্ডকে যতটা সম্ভব নরম করে দ্রুতই ঘরে ফিরে গেল।

ঘরে ফিরে সে দেখল তার সহোদর শফিক এই অসময়ে খাটের কোণে শুয়ে আছে। কী এক সংকট থেকে রফিক ছবিটা হাতে নিয়ে দেখা থেকে বিরত হলো। মনে হলো ছবিটাকে কোনোক্রমে বের করে টেবিলের নিচে কোনো একটা বইয়ের মধ্যে রেখে দেবে সে। সেটাও করল না। শফিকের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, সে জেগেও থাকতে পারে। তাই ছবিটাকে সে মানিব্যাগে রেখেই হাত-মুখ ধুয়ে নিল। তারপর ধাতস্থ হয়ে সে যখন বুঝল শফিকের কাছে বিষয়টা গোপন না করলেও চলে, তখন তার মায়ের ঘর থেকে ডাক পড়ল। তার মায়ের পীড়া ক্রমশ বেড়ে চলছে। তাদের মা এতখানি প্রৌঢ়া নন, তবে কলজে পচা রোগে পড়ার পর থেকে সে বুড়িয়ে গেছে। প্রতিদিনই তার কান্তিমান মুখ থেকে লাবণ্য খসে গিয়ে বলিরেখা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। মায়ের ঘরে ঢুকে রফিক তার মাকে পেল ঘুমন্ত অবস্থায়। ঘুমন্ত মায়ের দিকে তাকিয়ে নির্বাক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বায়েজিদ বোস্তামির শিক্ষাকে মাথায় রেখে পায়ে পায়ে মায়ের শিয়রে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল দীর্ঘক্ষণ। তবে সারা রাত নয়। ফিরে এসে শফিকের পাশে ঘুমিয়ে সে স্বপ্নে দেখল, সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। শফিকের জন্য কন্যাও ঠিক হবে এবং তাদের মা-ও সুস্থ হয়ে উঠবে । এবং তারপর… এইসব সুখস্বপ্ন দেখতে দেখতে সে ঘুমিয়ে পড়ল। তৎপরবর্তী দিনগুলো অর্থাৎ মধ্য কার্তিক থেকে মাঘের শেষ পর্যন্ত তারা তাদের মাকে নিয়ে অনবরত রাজধানীর সব বড় বড় ডাক্তার বৈদ্য আর দূর-দূরান্তের ওঝার বাড়িতে ছুটে যেতে লাগল। এই সংকটকালে চাপা পড়ে গেল রফিক-শফিকের বিবাহের আয়োজনও। সবাই জেনে গেছে এই কলজে পচা রোগে মানুষ কিছুতেই আর বেঁচে থাকে না, তিনমাস-চারমাস অধিক ছয়মাস। এই দিনগুলোতে তারা যেখানেই যায় সবাই জানিয়ে দেয়, ‘তোমাদের মা আর কিছুতেই বাঁচবেন না।’ তারপর রফিক-শফিক বিয়ে শিকেয় তুলে মাকে সারিয়ে তোলবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো। ইত্যবসরে পিজি হাসপাতালের সবচেয়ে প্রবীণ ডাক্তারদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডও জানিয়ে দেয়: মানুষের পচা কলজে সারিয়ে তোলা কিংবা উপড়ে সেখানে নতুন কলজে প্রতিস্থাপন বিদ্যা এখনো তাদের অজ্ঞেয়। মাঘের শেষে এসে তারা জানতে পারে বুড়িগঙ্গার ওই পাড়ে মুখ ঢেকে রাখা সেই তান্ত্রিক, জাদুকর ও চিকিৎসকের কথা। ক্যান্সারকেও যে সারিয়ে তোলে নিজের আবিষ্কৃত চিকিৎসায়। তার খবর রফিক-শফিকের কানে এসে পৌঁছায় সেই কনকনে ঠান্ডার রাতটিতে। রাতটা কোনোভাবে কেটে যেতেই কুয়াশা মাথায় করে তারা বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে এপারে এসে তান্ত্রিককে খুঁজতে থাকে। সারাদিন খোঁজাখুজির পর, পুনরায় কুয়াশা এসে চারপাশের আলোকে ম্লান করে দেবার কিছুক্ষণ পূর্বে, শাঁখারী বাজারের রাস্তাটার সামনে, জগন্নাথ কলেজের দেয়াল ঘেঁষে নানা রকম বন্যপ্রাণীর শরীর নানা কসরতে পুড়িয়ে ছাই কিংবা তেলে পরিণত করা নানা মরণব্যাধির দাওয়াই বেচতে থাকা অবস্থায় তারা সেই তান্ত্রিককে দেখতে পায়। তান্ত্রিক ও চিকিৎসক সেই স্বল্পালোকে পেতলের হাতলওয়ালা ছোট ধারাল ছোরাটা দিয়ে সকলের সামনে চানখারপুল থেকে যাওয়া এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর পিঠ থেকে ফুলে সুপারির মতো হয়ে ওঠা টিউমারটাকে কেটে হাতে নিয়ে সমবেতদের প্রদর্শন করে। তারপর সেটা তার ধাতব বাটিটার মধ্যে জমে থাকা লাল জারকে টুপ করে ছেড়ে দেয়। সবাই বিস্ফারিত নেত্রে সেই দৃশ্য দেখতে থাকে।


‘সকালে ঘুম থেকে উঠে শিশ্ন ফোলা থাকা অবস্থায় একবার শুধু মালিশ করে নিতে পারলেই হলো, বাকিটা বোঝা যাবে সেইদিন রাতেই।’


রফিক-শফিক দুই ভাই সামনে এসে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়। তারা দেখে, যে লোকটার পিঠ থেকে এইমাত্র সকলের সামনে টিউমারটা কেটে নেওয়া হলো সে নির্বিকার ভঙ্গিতেই বসে আছে। এমনকি তান্ত্রিক তাকে প্রশ্ন করে, ‘কী! ব্যথা পাইছ?’ নির্বিকার ধুলোমাখা মুখটা উত্তর দেয়, ‘না।’ রক্ত বেরুতে থাকা জায়গাটাতে সে তখন একদলা পিচ্ছিল ভেষজ ঘষে দিতে দিতে আবার প্রশ্ন করে, ‘কী! ব্যথা করছে?’ দাঁতে দাঁত চেপে ভাঙারি ব্যবসায়ী বলে, ‘না। একদমই না।’ হাতে রক্তমাখা ছুরিটা নিয়ে এবার সে দর্শক সারির সামনে চলে আসে। ‘কী! আর কী দেখতে চান?’ বলে হুঙ্কার দিয়ে অতৃপ্তদের লজ্জা ভেঙে দেয়। অতৃপ্তরা মানিব্যাগে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে থাকে। প্রথমে লজ্জাভাঙা একজন মুঠোয় চেপে রাখা দুমড়ানো অথচ চকচকে লাল পঞ্চাশ টাকার একটি নোট তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘আমায় দিন এক শিশি।’ অতৃপ্ত লোকটা যতটা সম্ভব অনুচ্চস্বরে বলে কথাটা। জাদুকর চিকিৎসক বিকট চিৎকারে একটি শিশি তার হাতে পৌঁছে দিতে দিতে সেই তেলের ব্যবহারবিধি ঘোষণা করে, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে শিশ্ন ফোলা থাকা অবস্থায় একবার শুধু মালিশ করে নিতে পারলেই হলো, বাকিটা বোঝা যাবে সেইদিন রাতেই।’ রফিক-শফিক দুই ভাই কিয়ৎক্ষণের জন্য নিজের পীড়িত মাকে ভুলে তাদের সমাগত বিবাহের রাতটি নিয়ে ঈষৎ চিন্তিত হয়ে পড়ে। পরক্ষণেই দুই ভাই পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিয়ে জাদুকরের চিকিৎসার আসর শেষ হবার অপেক্ষা করে। যত্নে পাতা মাদুরের ওপর সার করে রাখা শিশিগুলো একটা একটা করে শেষ হয়ে গেলে জাদুকর চিকিৎসক হাত তুলে সবাইকে বিদায় জানায়। যাদের ভাগ্যে আজ আর শিশি জুটলো না তাদের পরবর্তী কোনো একদিনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওপরের দিকে হাত জোড় করে মাথাটাকে সম্পূর্ণই গায়ের চাদরে ঢেকে নেয়।

সবাই বিদায় হয়। সে চোখ খুলে তখনও তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যমজদের দেখতে পায়। সে ভেবেছিল সবাই চলে গেছে, তাই মুখ তুলবার সময় মুখের কাপড় আর ঠিক করে নাই। রফিক-শফিক তার অনাবৃত মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে লোকটার নাক নাই। নাকের বদলে সেখানে রয়েছে গাঢ় অন্ধকারময় একটি গর্ত। হয়তো গর্তটার শেষ দিকে নিশ্বাস ছাড়বার মতো রন্ধ্র রয়েছে এক বা একাধিক—তবে সে রন্ধ্র রফিক কিংবা শফিক কারো চোখেই পড়ে না। তারা চোখ নামিয়ে নিলে সে তার বাক্স-পেটরাগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে রফিক-শফিকের কাছে তাদের মতলব জানতে চায়। প্রায় হাত জোড় করা ভঙ্গিমায় তারা তাকে জানায়, কোনো বিশেষ মতলব নয় বরং এক কঠিনতম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তারা এসেছে তার কাছে। তাদের মায়ের কলজে পচা রোগ এবং ইতঃপূর্বে নেওয়া সকল ব্যর্থ চিকিৎসার বর্ণনা দেয়। নাকহীন তান্ত্রিক এবার তার বাক্স-পেটরার ওপর চড়ে পা ছড়িয়ে আরাম করে বসে বলে, ‘এই রোগেরও চিকিৎসা আছে।’ এমনকি তা আরোগ্য হতে পারে তার তৈরি তেলেই। রফিক-শফিক আনন্দ আর আশায় নিজেদের পায়ের শক্তি হারিয়ে ধপ করে বসে পড়ে চিকিৎসকের পায়ের কাছে। এক সাথে চারটি হাত উপরে তুলে সমস্বরে বলতে থাকে, ‘দিন! সেই তেলের শিশিটা আমাদের দিন!’ জাদুকর চিকিৎসক মুখের কাপড় সরিয়ে তাদের দিকে ঝুঁকে এসে বলে, সে তেল প্রস্তুত করা কিছুটা কষ্টসাধ্য, যমজেরা আবারও সমস্বরে ‘কেন? কিভাবে? কী দিয়ে? কী পুড়িয়ে বানায় সে তেল আমাদের বলুন। আমরাই যোগাড় করে দেব সেইসব। যত দূরবর্তী আর কষ্টসাধ্যই হোক না কেন মায়ের কলজে পচা রোগ সারাবার জন্য আমাদের সেখানে যেতেই হবে। বলুন আপনার কী চাই?’ জাদুকর আবার নিজের নাকহীন বীভৎস মুখ উন্মুক্ত করে তাদের দিকে ঝুঁকে এসে বলে ‘শান্ত হও!’ সেই তেল বানাবার অধিকাংশ উপাদানই আমার কাছে রয়েছে, কেবল একটি উপাদান হলেই তেল তৈরিতে আর কোনো বাধা থাকছে না। যমজেরা এবার কাতর স্বরে বলে ‘কী? কী সেটা? বলুন আমাদের।’

‘যা প্রয়োজন সেটা হলো: জীবিত মানুষের দেহের এক টুকরো ঝলসানো প্রত্যঙ্গ, হাত কিংবা পা হলেই বেশি সুবিধা হয়।’ বলে সে অদৃশ্য নাসারন্ধ্র থেকে তপ্ত নিশ্বাস ছুড়ে দেয় যমজদের মুখে। যমজেরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে একমুহূর্তে ভেবে নেয়, এটা বাঘিনীর দুধ কিংবা দুধরাজের মাথার মণি নয়, তাই এটা নিশ্চয় এমন কঠিন কিছুও নয়। জাদুকর তার অস্থাবরের ঝোলাটা কাঁধে তুলে নিতে নিতে বলে, ‘সেটা যোগাড় হলেই চলে এসো, আমি তোমাদের মায়ের কলজে পচা রোগের দাওয়াই তৈরি করে দেব।’

রফিক-শফিক দুই ভাই অনুজ্জ্বল ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রিকশার ফাঁক গলে জাদুকরের হারিয়ে যাওয়া দেখে উৎফুল্ল বদনে। অতঃপর হাওয়ার গতিতে দুর্গন্ধযুক্ত বুড়িগঙ্গার পাড়ে এসে দাঁড়ায়। বুড়িগঙ্গার ওপর দিয়ে আসা গাঢ় শীতল বাতাসে নৌকার জন্য অপেক্ষা করে। স্বল্প বিরতিতেই তারা একটি নৌকার ছেড়ে যাবার তোড়জোড় লক্ষ করে সেটাতে চড়ে দাঁড়ায়। নৌকায় দাঁড়িয়ে তারা সোজা উত্তর দিকে তাকিয়ে প্রথমে পানি শোধনাগারের সুউচ্চ বুরুজটা দেখতে পায়। তারা বুরুজের ঠিক পেছনে পাঁচ দিন বয়েসি লাজুক চাঁদটাকে লুকিয়ে থাকতে দেখে। চোখ নামিয়ে যমজেরা বুড়িগঙ্গার পীতবর্ণের বুকে চাঁদের ছায়া দেখতে চায়। তারা চাঁদের কোনো ছায়া বুড়িগঙ্গার ওপরে খুঁজে পায় না, বরং বুড়িগঙ্গার ওপর তারা ধোঁয়ার উড়াউড়ি দেখে। যমজেরা হাই তোলে একসাথে, তাদের মুখগহ্বর থেকেও গাঢ় ধোঁয়া বেরিয়ে যায়। তাদের মনে পড়ে প্রতিদিনই শীত তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। তীরে এসে পাটনি নৌকাটাকে ঘুরিয়ে নোঙর করে বৈঠা পায়ে চেপে দুই হাতে আরোহীদের দেওয়া পয়সা মিলিয়ে নিতে থাকে। রফিক-শফিক নামে সবার শেষে। নামার সময় হঠাৎই পাটনির পায়ের তলায় আটকে রাখা বৈঠাটা নড়েচড়ে ওঠে। পাটনি সতর্ক হয়ে সেটাকে সামলে নিতে বাম হাতটা নিচে নামায়। তাদের সামনে থাকে কেবল তার মেলে রাখা শীর্ণ ডান হাতখানা। যমজেরা লোভের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই হাতখানার দিকে। বৈঠা সামলে পাটনি দু’হাত মুক্ত করে তর্জনী নাড়িয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে, ‘কী দ্যাখতাছেন? ট্যাকাডা দিয়া নামেন! উফ্! ঠান্ডায় জইমা যাইতাছি।’ বলে তাদের দিক থেকে দৃষ্টি ফেরায়। রফিক-শফিকেরা তার হাতের তলায় দুটি ধাতব মুদ্রা রেখে নেমে আসে। বাড়িতে ফেরার হাঁটা রাস্তায় তারা গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকে। কেউ কোনো কথা বলে না কারো সাথে। ফিরে এসে ঘুমন্ত অথবা অচেতন মায়ের শিয়রে অবনত বদনে দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। তারপর নিজেদের ঘরে ফিরে তলিয়ে যায় গভীর ঘুমে।


শফিক আরো বিরক্ত হয়ে রফিকের বাহু ধরে টেনে বের করে আনে। গজগজ করে বলতে থাকে, ‘কেন আমরা এখানে সময় নষ্ট করছি? আমাদের প্রয়োজন জীবিত মানুষের প্রত্যঙ্গ।


ঝলসানো মানব প্রত্যঙ্গের সন্ধানে এদিক-সেদিক এমনকি দিগ্বিদিক ঘুরে ঘুরে তাদের দিন কেটে যেতে থাকে। যদিও তান্ত্রিকের চাওয়া হলো জীবিত মানুষের ঝলসানো প্রত্যঙ্গ তবু তারা একদিন সকালে চিতাখোলা মহাশ্মশানে এসে দাঁড়ায়, সকাল থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা শ্মশানের ফাঁকা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দূর আকাশে চিল আর শকুনের উড়ে যাওয়া দেখে। উলুধ্বনি দিয়ে বাঁশের খাটিয়ায় চড়ে কোনো লাশ তখনও এসে পৌঁছোয় না। শফিক অধৈর্য হয়ে ওঠে। বলে, ‘চলো আমরা চলে যাই, তুমি কি বুঝতে পারছ না প্রতিদিন মরার মতো এত হিন্দু আর নেই আমাদের কেরানিগঞ্জে।’ রফিক বুঝতে পারে। তবুও সে আরো কিছুটা সময়, অন্তত সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায়। এবং সন্ধ্যায় যখন তারা ফিরে আসার উপক্রম করে, তখন লাশবাহী একটি ফ্রিজার ভ্যান হুইসেল বাজিয়ে শ্মশানের উঁচু-নিচু প্রান্তরে ঢুকে পড়ে বালিতে আটকে যায়। মাত্র চার পাঁচ জন লোক এসেছে লাশটা নিয়ে। তাদের পোশাক দেখে বোঝা যায় না তারা কোন ধর্মের আর উলুধ্বনির তো প্রশ্নই আসে না। যারা এসেছে তারা নিশ্চয়ই মৃতের আত্মীয়-স্বজন এমনকি ছেলে-পুলেও হতে পারে। যদিও রফিক-শফিক কেউই তাদের মুখে স্বজন হারাবার বেদনা দেখতে পায় না। দ্রুতই ফ্রিজার ভ্যানের দরজা খুলে তারা লাশটাকে টেনে নামায়। সচকিত হয়ে যমজেরা তাদের দিকে এগিয়ে আসে। ডানে বাঁয়ে তারা কোনো স্তূপাকার কাঠ-খড়ি কিংবা এমন কোনো দাহ্য দেখতে পায় না। কাপড়ে জড়ানো লাশটাকে নিয়ে আসা স্বজনেরা শ্মশানের শেষ প্রান্তে নতুন ওঠা পলেস্তারাহীন ইটের ছোট দালানটার দিকে ধরাধরি করে নিয়ে যেতে থাকে। রফিক-শফিকও দূরত্ব বজায় রেখে তাদের পেছন পেছন এগিয়ে যায়। নতুন দালানটার একপাল্লার স্টিলের দরজাটা খুলে গামছা কাঁধে একজন প্রৌঢ় বেরিয়ে আসেন। সমাগতদের অভ্যর্থনাসূচক নমস্কারে তোলা তার হাত দুটির কাঁপুনি চোখে পড়ে রফিক-শফিকের। তারা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে, প্রৌঢ় লোকটা ইটের গায়ে লাগানো সুইচ টিপে দেয়। জ্বলে ওঠে হলুদ আলো। আর সামনে বেকারির চুল্লির মতো একটা চুল্লির দরজা খুলে সেখান থেকে লাশের চেয়ে কিঞ্চিৎ বড় আকারের একটি ট্রে বেরিয়ে আসে। সবাই মিলে ট্রের ওপর তুলে দেয় শবদেহটাকে। প্রৌঢ় আবার সুইচ টিপে দেয়। ট্রেটা ঢুকে যায় চুল্লির পেটে। লাশের সাথে আসা এক মাঝবয়সীর চোখে এবার অশ্রু টলটল করে। একজন তার পিঠে হাত রাখে। এরই মধ্যে প্রৌঢ় চুল্লির পেছনে গিয়ে আবার ফিরে আসে। হাতে করে নিয়ে আসে একটি অ্যালুমিনিয়ামের ছোট পাত্র। চোখ টলটল করতে থাকা লোকটা পাত্রটা হাতে নিয়ে ভালো করে পাত্রের ভেতরে তাকিয়ে বলে, ‘এ কী! এ যে কেবল ছাই, আমার পিতার নাড়িভুঁড়ির অংশ কোথায়? কী দিয়ে আমরা তার আত্মাকে মুক্ত করব?’ প্রৌঢ় জবাব দেয়, ‘বাবাজি, এ ব্যবস্থায় ছাই ছাড়া অন্য কিছু পাবে না, এটাই নাও, এগুলোই বরং ঢেলে দিও দূষিত বুড়িগঙ্গায়। আমি তোমার পিতার মুক্তির জন্য প্রার্থনা করব।’ বলে দক্ষিণার জন্য তার কম্পিত হাত দুটো প্রসারিত করে। শফিক আরো বিরক্ত হয়ে রফিকের বাহু ধরে টেনে বের করে আনে। গজগজ করে বলতে থাকে, ‘কেন আমরা এখানে সময় নষ্ট করছি? আমাদের প্রয়োজন জীবিত মানুষের প্রত্যঙ্গ, চাইলে আমরা সেটা নিজেরাও ঝলসে নিতে পারি। চলো এখানে আর সময়ক্ষেপণ নয়।’ হতাশ রফিক সহোদরের পায়ের গতির সাথে পা মিলিয়ে রাস্তায় উঠে আসে। সন্ধ্যা নেমে গেছে। আলোও জ্বলে গেছে চারদিকে। হাঁটতে হাঁটতে তারা তাদের বাড়ির রাস্তা ছাড়িয়ে চুনকুটিয়ার মোড়ে এসে থামে। কোথাও বসবে বলে একটি যুৎসই জায়গার জন্য এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে।

‘আরে মিয়া, আপনাদের যে কোনো খবরই নাই!’ রফিকের অদেখা বাগদত্তার ছবি সরবরাহকারী দূরাত্মীয় তার ডান হাতের ছাতাটা বা’হাতে নিয়ে ‘কী সৌভাগ্য আমার! আপনাদের দুই ভাইকে পেয়ে গেলাম একই সাথে, সবই তার ইচ্ছে। চলেন! চলেন! রাস্তার ওপাশে চলেন!’ বলে একটি চায়ের দোকান নির্দেশ করে শফিকের হাত ধরে রাস্তা পার হতে থাকে। দোকানের বেঞ্চে এক সারিতে পাশাপাশি বসে নিজেই চায়ের ফরমাশ দিয়ে বলে চলে, ‘ছোট ভাইয়ের জন্য কন্যা চূড়ান্ত হয় নাই বুঝি, চিন্তা করবেন না দ্রুতই হয়ে যাবে। আর আপনাদের ঘরের হবু লক্ষ্মীর তো পরীক্ষা শেষ হইছে। তাড়াতাড়িই সে ফিরবে চট্টগ্রাম থেকে। ফিরলে আর দেরি কইরেন না, জানেনই তো, শুভ কাজে দেরি করতে নেই।’ এই কথা বলে সে তার দুই পাশে বসা দুই ভাইয়ের দিকে তাকায়, তাদের চোখে মুখে কোনো চাঞ্চল্য নেই দেখে একটু যেন দমে যায় লোকটা, ‘ভাই কোনো সমস্যা?’ ‘হাঁ! সমস্যা’ বলে রফিক তাকে তাদের সমস্যার একটি নাতিদীর্ঘ বিবরণ দেয়। সব শুনে ছাতার বাটে দু’হাত রেখে বিজ্ঞোচিত নীরবতা শেষ করে দূরাত্মীয় বলে ওঠে, ‘ভাববেন না! একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে, কাল আবার আইসেন এইখানে, এই সময়ে, দেখি কী রাস্তা বের করতে পারি!’

পরদিন সকালবেলা রফিক-শফিক ঘুমন্ত থাকতেই ছাতাওয়ালা দূরাত্মীয় হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে তাদের ঘরে। টেনে দুই ভাইকেই বিছানা থেকে তোলে। ‘আরে মিয়া আপনারা দেখি নিশ্চিন্তে ঘুমাইতেছেন, ওই দিকে আপনাদের চিন্তায় আমি সারারাত ঘুমাইতে পারি নাই। শফিককে সরিয়ে খাটের ওপর বসে পড়ে সেও। টিভিটার দিকে চেয়ে বলে, ‘আরে আপনাদের ঘরে তো টিভিও আছে দেখতেছি, তয় টিভিটুভি আপনারা খুব একটা দেখেন বলে মনে হয় না। যাই হোক উপায় আমি খুঁজে বাইর করছি। জীবন্ত মানুষের ঝলসানো প্রত্যঙ্গ পেতে আপনাদের আর যেখানে সেখানে ঘুরতে হবে না। আমি একটা ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি, ঠিক-ঠাক তার কাছে গিয়ে ঘটনাটা বুঝিয়ে বললেই কিছু টাকার বিনিময়ে সেই ব্যবস্থা করে দিবে।’ এইসব বলে সে মানুষের মাংসখেকো খোরশেদ ডোমের ঠিকানা বাতলে দেয় তাদের। ঘুম থেকে ধড়ফড় করে উঠে যমজদের ধাতস্থ হতে সময় লাগে। চোখ রগড়ে তারা পুনরায় খোরশেদ ডোমের ঠিকানা ভালো করে বাতলে নেয়। দূরাত্মীয় তাড়া দেয়, ‘দেরি করবেন না, এক্ষণ রওনা হোন। আশা করি আজকের সন্ধ্যার আগেই আপনারা পেয়ে যাবেন আপনাদের মায়ের কাঙ্ক্ষিত দাওয়াইয়ের প্রধান উপাদান। রওনা হোন! রওনা হোন!’ বলে সে আবার তার ছাতাটাকে হাত বদল করে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায়। রফিক-শফিক তড়িঘড়ি করে হাত মুখ ধুয়ে নিয়ে অভুক্ত পেটেই বেরিয়ে পড়ে। তবে সকালে বেরুলেও রাস্তার দীর্ঘ জ্যাম পাড়ি দিয়ে ঢাকার প্রধান লাশকাটা ঘর খুঁজে পেতে তাদের দুপুর হয়ে যায়।

সেখানে পৌঁছে তারা দেখে, লাশ কাটা ঘরের বিশাল দরজার দুইপাশে বিষণ্ন শোককাতর মানুষেরা বসে আছে লম্বা সারি করে। হয়তো তারা অপেক্ষায় আছে কাটাছেঁড়া গলিত অর্ধগলিত প্রিয়জনের মরদেহ গ্রহণের অপেক্ষায়। লাশকাটা ঘরের সামনে, আশেপাশের লোকজনের কাছে তারা খুঁজতে থাকে মানুষখেকো খোরশেদ ডোমকে। কেউ বলে চিনি না, কেউ বলে ‘আছে হয়তো আশেপাশে, খুঁজলে পাবেন, খুঁজে দেখেন।’ বেলা বাড়তে বাড়তে এবার গড়িয়ে যাবার উপক্রম, খোরশেদ ডোমকে তবু তারা খুঁজে পায় না। সেই সময়ে ত্রাতা হয়ে আসে এক চপল কিশোর, নিজ থেকেই জানতে চায়, ‘কী? খোরশেদরে খুঁজেন ক্যান? তামাক লাগব? লাগলে আমারে কন, আইনা দিতাছি।’ রফিক-শফিক তাদের মোলায়েম কণ্ঠকে আরো কোমল করে জানায়, ‘না! তামাক নয় তাদের খোরশেদকেই দরকার।’ ‘আইচ্ছা বুচ্ছি বুচ্ছি, আইয়েন, আমার লগে আইয়েন!’ বলে কিশোর তাদের দুই ভাইকে নিয়ে যায় পানির মটরওয়ালা গুদাম ঘরে। অন্ধকার ঘরের দরজায় কিছুক্ষণ করাঘাত করতেই পিঠের সাথে লেগে থাকা পেট নিয়ে শীর্ণকায় খোরশেদ দরজা খুলে দেয়। ‘মামা, এই দুইজন সেই সক্কাল থেইকা তোমারে বিছরাইতাছে।’ বিরক্ত খোরশেদ ভ্রু কুঞ্চিত করে বলে, ‘না, মাল নাই, বিছরাইয়া লাভ নাই, আপনেরা যান গা!’ বলে দরজা লাগানোর উপক্রম করতেই রফিক-শফিক তাকে ঠেলে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে সেই গুদাম ঘরে। ঘরের বোঁটকা গন্ধের দিকে খেয়াল না দিয়ে তারা খোরশেদের হাত চেপে ধরে। বলে, ‘শুনুন, আপনি আমাদের একজন অতি প্রিয় ভাই। আমাদের একটা বিহিত করে দিন, আমরা যতটা সম্ভব আপনাকে খুশি করে দেব।’ খোরশেদ কিছুটা নরম হয়ে নিজের কাঁচাপাকা দাড়িগুলো ভালোরকম চুলকে নিয়ে তাদের বসতে বলে, যমজেরা বসলে এবার সে একে একে তামাক সাজবার সকল উপাদান বের করে তামাক সাজতে থাকে। হাতের তলায় তামাকের দলা নিয়ে একটা কৌটা থেকে তর্জনীর মাথায় লাল পুডিংয়ের মতো বস্তু লাগিয়ে সেটা তামাকে মেখে হাতের তলায় পিষতে থাকে, মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘কন তো এইডা কী দিলাম? যমজেরা উত্তর দেয় ‘জানি না ভাই।’ শব্দ করে হেসে খোরশেদ জানায়, ‘এইডা হইল পেরেম কইরা বিষ খাইয়া মরা এক ছেরির হাড়ের ভিতরের রক্ত। চিপড়াইয়া বাইর করছি। এইডাতে নেশাডা জমে ভালা।’ বলে সবগুলো ধাপ একে একে শেষ করে জ্বলন্ত কলকিটায় বিকট টান দেয় খোরশেদ ডোম। টানের প্রচণ্ডতায় কলকির মুখের আগুন লাফিয়ে জ্বলে উঠে ঘর আলো করে দেয়। খোরশেদ ডোমের গলার সবগুলো শিরা-উপশিরা জেগে ওঠে একসাথে। ইট খোলার চুল্লির মতো ধোঁয়া ছাড়ে খোরশেদ, একই প্রক্রিয়ায় বিরতিহীন আরো কয়েকটা টান দেয় সে। তারপর কালসিটে পড়া হাতের তালুতে কলকে উপুড় করে ভালো করে পরখ করে নেয় তামাকের কোনো কণা পুড়তে বাকি রয়ে গেল কিনা।


আমি ভিতর থেইকা ডাক দিলে আপনেরাও ভিতরে যাইবেন। আমি খোরশেদ হারাম খাই না। আপনাগোরে দেহাইয়া জ্যান্ত শইল থেইকাই কাইটা দিমু।


শান্ত হয়ে খোরশেদ এবার বলে, ‘চিন্তা কইরেন না, আইজকাই ব্যবস্থা কইরা দিমু। আগে হইলে একটু দেরি লাগতে পারতো তয় অক্ষণ আর দেরি হইব না। পোড়া লাশ আইতাছে সোতের লাহান। পেত্তেকদিন একশ দুইশ’ একটার থেইকা হাত কিংবা পাও একটা কাইটা বাইর কইরা দিমু নি। রফিক বলে ভাই আমাদের তো জীবন্ত মানুষের প্রত্যঙ্গ চাই। ‘অসুবিধা নাই, তয় টেকা কিন্তু যেইডা কইছেন ওইডাই দিতে হইব, কম হইলে চলব না। শ্যাষ রাইতে কুমিল্লায় বাস পুড়ছে বিরাট একখান। অল্প কয়ডা বাদ দিলে প্রায় সবগুলানই মরছে শুনছি। আমার লগে যাইবেন, দরজার বাইরে খাড়াইয়া থাকবেন, আমি ভিতর থেইকা ডাক দিলে আপনেরাও ভিতরে যাইবেন। আমি খোরশেদ হারাম খাই না। আপনাগোরে দেহাইয়া জ্যান্ত শইল থেইকাই কাইটা দিমু। লইয়া যাইবেন।’ ‘আচ্ছা। তাই হবে! তাই হবে!’—বলে যমজেরা সায় দেয়। খোরশেদ আবার বলে, ‘দরজার এক্কেরে সামনে থাইকেন, আমি ভিতরের থেইকা ডাক দিলে আপনাগোর য্যান ঢুকতে দেরি না অয়। আর শুনেন, লগে একটা ব্যাগ রাইখেন। লুকাইয়া নিতে অইব। মরা হউক আর জ্যাতা। মাইনসের হাত পাও। তা কি দেহাইতে দেহাইতে লইয়া যাইবেন?’ খোরশেদের গলায় এবার কতকটা যেন হুকুম ছড়িয়ে পড়ে। যমজেরা আবারও ‘তাই হবে, তাই হবে’ বলে সায় দেয়। ‘এইবার বাইরাইয়া গিয়া লাশকাটা ঘরের সামনে খাড়ান।’

রফিক-শফিক বেরিয়ে এসে লাশকাটা ঘরের সামনের দোকানগুলোতে একটি ব্যাগ খুঁজতে থাকে। সকল দোকানিই তাদের পাউরুটি ঝুলিয়ে রাখা স্বচ্ছ পলিথিন দেখিয়ে বলে ‘চাইলে এর একটা নিতে পারেন।’ ওতে তাদের চলবে না। তাদের চাই এমন ব্যাগ যা দেখে বোঝার উপায় থাকবে না ব্যাগের ভেতর কী আছে। খুঁজতে খুঁজতে তারা একটি কাগজের হাতল ছিড়ে যাওয়া চাররঙা শপিং ব্যাগ পেয়ে যায় রাস্তার উপর। ধুলো ঝেড়ে সেটাকেই হাতে নিয়ে তারা এসে দাঁড়ায় অপেক্ষমাণদের সামনে প্রায় দরজা লাগোয়া জায়গাটাতে। এমন জায়গায় দাঁড়াতেই খেঁকিয়ে ওঠে একজন, ‘কী! লাশ নিতে আইছেন? সইরা খাড়ান, আগে আমগো লাশ, পরে আপনাগোর। লাশ বাইর করণ এত সোজা না। গত পরশু সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়িতে পুইড়া মরছে। টেকা দিয়া আইজ দুইদিন এইহানে বইসা আছি লাশের খোঁজ নাই। সইরা খাড়ান মিয়া। আগে আমগোর লাশ, পরে অন্য কতা।’ ‘না মানে লাশ নয় আমরা আসলে…’— আমতা আমতা করতে থাকা রফিকের ওপর লোকটা আবারও খেঁকিয়ে উঠতে চায়। শফিক মধ্যস্থতা করে জানিয়ে দেয় ভেতর থেকে কেউ একজন তাদের ডেকে নেবে। এক মুহূর্তের কাজ। তারা কোনো লাশ গ্রহণ করতে আসে নাই। এবার লোকটা বলে ‘তাইলে অন্য কতা, বহেন বহেন, আমগো লগে বহেন।’ সেইখানে তাদের সাথে বসে রফিক-শফিকের সময় কাটতে থাকে। আধঘণ্টা একঘণ্টা করে দুই ঘণ্টা কেটে যায়। দরজায় একটু শব্দ হতেই নড়েচড়ে বসে রফিক-শফিক। লোকটা তাদের বলে ‘লাভ নাই, এমন কথা সবাইরেই দেয় ওরা, তয় রাহে না।’ সূর্যের ক্ষীণ আলোয় তাদের সামনে এতক্ষণ ধরে থাকা নারকেল গাছটির পাতার ছায়ার নড়াচড়া হালকা হয়ে যেতে থাকে। তারা বুঝতে পারে দিনের আলো ফুরিয়ে এসেছে। তাদের পীড়িত মায়ের কথা মনে পড়ে। তারা আরো অধৈর্য হয়ে মাঘের শেষ দিককার এই বিকেলেও ঘেমে উঠতে থাকে।

হঠাৎ কচ করে আওয়াজ হয়ে তাদের পেছনের দরজাটা ঈষৎ ফাঁকা হয়ে যায়। খোরশেদ তার পোড়া চেহারাটা বের করে চোখের ইশারায় তাদের ডেকে নেয়। যমজেরা ভেতরে ঢুকে তীব্র ঠান্ডা অনুভব করে। বিরাট ঘরের দুইপাশে বড় বড় আলমারি। তাদের চোখে মুখে ভয় খেলে যায়। খোরশেদ কথা বলে, চারকোনা বদ্ধ ঘরে তার কথা প্রতিধ্বনিত হয়। ‘আর কইয়েন না, সামনে তো যান নাই, দ্যাখলে বুঝতেন, কী পরিমাণ বডি আইছে! সব পোড়া, মরা গুলানরে টাইন্যা টাইন্যা এতক্ষণ ধইরা আলমারিতে পুরাইছি। আর জ্যান্ত টাইন্যা লাশঘরে আনা কী এত সোজা! হ্যাগোর সব আত্মীয়-স্বজন আইসা পড়ছে, পুলিশ সাংবাদিক আরো কত কী!’ বলতে বলতে সে খাটিয়ার ওপর সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা একটা ঝলসানো শরীরের কাছে নিয়ে যায় তাদের।—‘তয় আপনাগোর কপাল ভালা। এই বেডির খোঁজ লইতে এহনও কেউ আহে নাই। ডাক্তারেও বুঝছে কিছুক্ষণের মদ্যেই মরব। তাই হ্যার দিকে আর চোউখ দেয় নাই। সুযোগ বুইঝা আমি টাইন্যা লইয়া আয়া পড়ছি।’

হিমঘরে রফিক তার সহোদর শফিকের হিম হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকায়। চাকাওয়ালা লোহার খাটে শোয়ানো মেয়েটার চুলগুলো ঝুলে পড়ে মেঝে ছুঁয়ে আছে। আগুন তার শরীর পোড়ালেও চুলগুলো কী এক রহস্যবলে অক্ষত রয়ে গেছে। তাদের দুই ভাইয়ের জন্য তাদের মা এমন লম্বা চুলের মেয়েই খুঁজে বেড়াচ্ছিল। চুনকুটিয়ার কাজী বাড়ির মেয়েটার চুলও নাকি এমনই লম্বা ছিল বলে জেনেছিল রফিক। এসব ভাবনার সময় নয় এখন। খোরশেদ তার চকচকে ধারাল ছুরিটা হাতে দাঁড়িয়েছে খাটের ওপর পাশে, ‘কন, হাত দিমু, না পাও?’ বলে মেয়েটার ঢেকে রাখা মুখের কাপড় টেনে সরিয়ে ফেলে। পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া মুখের দিকে এক নজর তাকিয়ে দুই ভাই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ‘কী? আপনেরা ভাবতাছেন মরা? মরা না, জ্যান্তই আছে,’ বলে খোরশেদ টান দিয়ে ঢেকে রাখা কাপড়টা মেয়েটার বুকের নিচ পর্যন্ত নামিয়ে আনে। ‘কী? দেখতাছেন না, বুক যে ওঠা-নামা করতাছে?’ দুই ভাই তবুও বাকরুদ্ধ। পুড়ে ঝলসে গেলেও কুমারীর বুকের ঔদার্য ম্লান হয় নাই এতটুকু। ফুটে থাকা পোড়া বাম স্তনটির নিচে ছুরি দিয়ে খোঁচা মেরে খোরশেদ বলে, ‘দেহেন মিয়া, কেমনে রক্ত বাইরায়, মরার শৈল দিয়া রক্ত এমনে বাইরায় না, বিশ্বাস না করলে রক্ত হাতে মাইখা দেহেন এক্কেবারে গরম।’ খোরশেদ সে রক্ত নিজের হাতে মেখে স্বল্পালোকিত ঘরে হাত উপরে তুলে দেখায়, ‘ব্যাগ লইছেন তো!’ নিঃশব্দে শফিক তার হাতে থাকা ব্যাগ উঁচিয়ে ধরে, ‘এই ব্যাগে হইব না। হাত পাও পুড়ছে বেশি, পোড়া জায়গা দিয়া এহনও রস পড়তাছে।’ ‘আইচ্ছা’ বলে খোরশেদ কাপড়ের নিচে হাত দিয়ে মেয়েটার পরনে থাকা পোড়া পাজামার কিয়দংশ ছিড়ে নেয়। ‘আপনাগোরে ডাইন হাতটাই দেই, আর আমি লই বায়ের ডা।’ মাইনষের মাংসের স্বাদই আলাদা। আর এই বয়সী মায়া মানুষ হইলে তো আর কতা নাই। ভাইবেন না আমি কাঁচা খাই। ভালো কইরা রাইন্দা মাসে এক দুইবার খাই। তয় কোত্থেইকা য্যান মাইনসে আইজ কাইল জাইনা যাইতাছে। খোরশেদ ডোমে নাকি মানুষ খায়! হি, হি, হুনেন নাই আপনেরা?’ এইসব বলার অবসরে খোরশেদ ডোম তার অর্জিত দক্ষতায় নির্বিকার মুখে পাজামার অর্ধপোড়া সাদা কাপড়ে চেপে কনুই থেকে মেয়েটার ডান হাতটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ‘দ্যান ব্যাগটা দ্যান’ বলে হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা নিয়ে কর্তিত হাতটা সেটার মধ্যে পুরে দিতে দিতে বলে, ‘সইরা খাড়ান, প্লেট বাইয়া রক্ত নামতাছে, গায়ে মাখব, এই মাইয়ার শইলে এত রক্ত কেন?’ বলে নিজেই ওপাশ থেকে সরে খাটের এপাশে তাদের সামনে এসে মুখে দারুণ হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘দ্যান, ট্যাকাটা দ্যান।’ রফিক-শফিক তাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মতো সবগুলো টাকা তার হাতে দিয়ে দ্রুতই বেরিয়ে পড়ে।


প্রত্যেকের চাই একটা করে শিশি, সকলেরই চাই। নুয়ে পড়া শিশ্ন তাদের জাগাতেই হবে। আজ রাতের মধ্যেই।


এবার তাদের খুঁজে বের করতে হবে সেই তান্ত্রিককে। বাইরে বেরিয়ে দেখে সন্ধ্যা নেমে গেছে। লাশঘরের সামনের জায়গাটা হেঁটে পাড়ি দিয়ে তারা নাজিমুদ্দীন রোডে এসে দাঁড়ায়। রিকশার পেছনে রিকশা, গাড়ির বাম্পারে গাড়ি লেগে স্তব্ধ হয়ে আছে সমগ্র রাস্তা, যতদূর চোখ যায়। রিকশার ফাঁক গলে রাস্তাটা পাড়ি দিয়ে তারা হাঁটতে থাকে দুরন্ত গতিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে যায় সেদিনের সেই জায়গায়। শাঁখারী বাজার রাস্তার মুখে জগন্নাথ কলেজের দেয়াল ঘেঁষে তান্ত্রিকের আজকের মজমাটা জমে উঠেছে আরো বৃহৎ পরিসরে। তাকে ঘিরে টাকার বৃষ্টি নামিয়েছে জড়ো হওয়া অতৃপ্তের দল। প্রত্যেকের চাই একটা করে শিশি, সকলেরই চাই। নুয়ে পড়া শিশ্ন তাদের জাগাতেই হবে। আজ রাতের মধ্যেই। ভিড় ঠেলে ব্যাগ হাতে রফিক-শফিক সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তান্ত্রিকের চোখে চোখ পড়ে তাদের। তান্ত্রিকের কথার গতি কমে যায়। আজ আর শিশি বিক্রি হবে না বলে সজোরে তালি বাজিয়ে সেদিনের মতো সকলকে বিদায় নিতে বলে সে। তার হুকুমে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যায় দ্রুতই। সবাই চলে গেলে তান্ত্রিক মুখের কাপড় সরিয়ে তাদের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নেয় নিজের হাতে। ঘুরে রাস্তার দিকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে ব্যাগের ভেতর হাত দিয়ে সে বুঝতে পারে, যমজেরা সঠিক জিনিসই নিয়ে এসেছে। ‘চলো, সামনেই আমার আস্তানা, বেশিক্ষণ লাগবে না, আমি সব কিছু প্রস্তুত করে রেখেছি। এটার জন্যই ছিল আমাদের অপেক্ষা। চলো! আর অপেক্ষা নেই।’—বলে তার ঝোলাটাকে কাঁধে নিয়ে সে হাঁটতে থাকে। পীড়াগ্রস্ত জননীর যমজ পুত্রেরাও হাঁটতে থাকে তাঁর পেছনে পেছনে। নদীর ধারে এক ঝুপড়িতে ঢুকে পড়ে তান্ত্রিক, সাথে সাথে তারাও ঢুকে পড়ে। তান্ত্রিক ঝুপড়ির মধ্যে এক বৃহদাকার কাঠের বাক্সের ওপর ঝোলা নামিয়ে তাদের দিকে পেছন ফিরে খুটখাট শব্দ করে কী যেন করতে থাকে। রফিক-শফিক বুঝতে পারে তাদের দাওয়াই তৈরি হচ্ছে। কাজের মাঝে পেছনে না ফিরেই তান্ত্রিক কাগজে মুড়ে ছোট্ট একটা কী যেন রফিকের হাতে দিয়ে বলে, ‘এটা রাখো!’ রফিক তাঁর প্যান্টের ঝুল পকেটে গুঁজে রাখে সেটা। স্বল্পক্ষণেই দাওয়াই তৈরি শেষ হয়। মুখের দিকে লম্বা, একটি মাঝারি আকৃতির শিশি তান্ত্রিক তাদের হাতে দিয়ে বলে, ‘আর কোনো অসুবিধা নাই, এই রক্তবর্ণ তেলের দু’টি ফোটা তোমাদের মায়ের কানের ফুটো দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাদের মা আগের মতোই হাঁটবে, চলবে, হাসবে, রান্না করবে, ঠিক আগের মতোই, যাও দেরি কোরো না!’

রফিক-শফিক তান্ত্রিকের পায়ের ধুলো হাতে নিয়ে মাথায় মেখে, হাওয়ার গতিতে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে মায়ের শিয়রে এসে দাঁড়ায়। মনে মনে বলতে থাকে, ‘আর কোনো অসুবিধা নাই।’ ‘মা’ ‘মা’ বলে দুটি ছোট্ট ডাক দিতেই তাদের মা সাড়া দেয়, শিয়র থেকে তারা খাটের পাশে এসে দাঁড়ায়। ধরাধরি করে তারা তাদের মাকে তুলে বসায়। রফিক খাটে উঠে মায়ের পেছনে বসে নিজের স্ফীত বক্ষকে দেয়াল করে সেখানে মায়ের পিঠ ঠেকিয়ে কাঁধ ধরে বসে। শফিক এবার দাওয়াইয়ের শিশির ছিপি খোলে। ঘরময় এক অপরিচিত গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মা চোখ খোলে। এদিক-ওদিক তাকায়, কথা বলে, ‘আমার প্রিয় পুত্রেরা, তোমাদেরকে আমি এই ঘরেই প্রসব করেছিলাম, আজ তোমাদের আঁতুড়কালীন গন্ধ এই ঘরে আবার ফিরে এসেছে।’ রফিক ছিপি খোলা শিশির মুখ উপুড় করে মায়ের মাথাটা কাত করে ধরে এক ফোটা তেল কানের ছিদ্র বরাবর ঢেলে দেয়, প্রথমে ডান কান তারপর বাম কান, মুহূর্তে তাদের মা যেন খানিকটা সজীব হয়ে ওঠে।

‘আমার পুত্রেরা, তোমরা কি তোমাদের মায়ের বুক বেয়ে নামা শাল দুধের ঘ্রাণ কিংবা স্বাদ স্মরণ করতে পারবে?’ রফিক-শফিক মাথা নেড়ে জানিয়ে দেয়, না! তাদের মা বলে, ‘আমি পারছি, শাল দুধের গন্ধ আমার সারা শরীরে। আমার আবার জন্মাবার সময় হয়েছে। আমি আমার মায়ের শরীরের গন্ধ পাচ্ছি।’—বলতে বলতেই মায়ের কান, নাক-মুখ দিয়ে রক্তের ধারা বেয়ে নামে। এ দৃশ্য দেখে রফিক-শফিক খেই হারিয়ে ফেলে। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। শফিক মনে করিয়ে দেয়, তান্ত্রিক আরো কী একটা ছোট জিনিস কাগজে মুড়ে রফিকের হাতে দিয়েছিল, রফিক পকেট হাতড়ে সেটা বের করে। মুড়ে রাখা কাগজ খুললে তার হাতের তালুতে একটা আংটি চকচক করে ওঠে, তার মা বলে, ‘কী ওটা? আমার হাতে দাও!’ হাতে নিয়ে মা সেটা তার ঘোলা চোখ দিয়ে দেখতে থাকে, বলে, ‘চিনতে পারছ? এই তো সেই আংটি যা বিবাহের সময়ে আমার মা আমার অনামিকায় পরিয়ে দিয়েছিল।’ তাদের মা আর কোনো কথা বলে না। হাতের মুঠি শক্ত করে এক হাতে শফিকের তর্জনী অন্য হাতে আংটিটা নিয়ে হেলান দিয়ে থাকা তার অপর পুত্রের বুকের ডানপাশে মাথা বাঁকিয়ে নিঃসাড় হয়ে পড়ে।

খালিদ মারুফ

খালিদ মারুফ

জন্ম ১০ আগস্ট, ১৯৮৫, বাগেরহাট। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, দর্শন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কর্মস্থল বাংলা একাডেমি।

প্রকাশিত বই :
ইসরাফিলের প্রস্থান [গল্প] (বইমেলা ২০১৬, দাঁড়কাক)
শীতার্ত পৌষ অভিমুখে [উপন্যাস] (বইমেলা ২০১৬, বেহুলাবাংলা)

ই-মেইল : archedia2013@gmail.com
খালিদ মারুফ