হোম গদ্য গল্প ভবিষ্যতের দিকে যেতে যেতে

ভবিষ্যতের দিকে যেতে যেতে

ভবিষ্যতের দিকে যেতে যেতে
70
0

১.
আমি কবি হতে চেয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন—মনের ভেতর আমি এখনও একজন কবি, একজন স্বপ্নবাজ। এই যে জোছনা রাত আপনারা দেখছেন : আকাশে টুকরো মেঘ, মস্ত চাঁদ, মিটিমিটি তারা, মিহি বাতাস—এইসব দেখতে দেখতে আপনি যখন সারাদিনের ক্লান্তি মুছে বেহেশতি কোনো অনুভূতির ভেতর একবার ডুব মেরে ভুস করে আবার ভেসে উঠছেন, তারপর গভীর নিশ্বাসে পাল তুলে চলে যাচ্ছেন ঘুমঘুম স্বপ্নে, তখন আমার গভীরে তৈরি হচ্ছে বাক্য কিংবা আমি যা দেখি তাই—স্বপ্ন।


আপত্তি হচ্ছে এক ধরনের অজুহাত, আর অজুহাত হলো অপরাধীর হাতিয়ার।


আমি যদি সত্যি সত্যিই কবি হতে পারতাম তবে হয়তো কোথাও না কোথাও প্রকাশিত এইসব বাক্য—আমার স্বপ্নে বানানো প্রাসাদ—আপনার চোখে পড়ত আর আপনি বলে উঠতেন, বাহ! আফসোসের বিষয় হলো, অনেক ইচ্ছা থাকার পরও আমি শেষ পর্যন্ত কবি হয়ে আত্মপ্রকাশ করতে পারি নি। আর তাই, আমার কাছে আমি কবি কিন্তু আপনাদের কাছে আমি একজন সামান্য কেরানি।

শাদা শার্ট, কালো কোট, কালো প্যান্ট, কালো জুতো, লম্বা টাই, পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল, ক্লিনশেভড মুখ—আমাকে যখন খুব কাছ থেকে দেখবেন, আমার কেরানি পরিচয় আপনার কাছে আরো স্পষ্ট হবে; মনে মনে তখন হয়তো গালি দিয়ে বলতে পারেন—শালা, বীমা কোম্পানির চুতিয়া দালাল! আমি অবাক হব না।

যেহেতু আমি যা হতে চয়েছি তা হতে পারি নি সেহেতু নিজের কাছেই আমি নিজের না। অন্যেরা যেমন চেয়েছে আমি সবসময় তেমনটাই হয়ে ওঠার চেষ্টা করে গেছি : আমার বাবা-মা, আমার স্ত্রী, আমার পুত্র-কন্যা এমনকি আমার অফিসের বস পর্যন্ত আমাকে যেমন খুশি তেমন সাজাতে পেরে সন্তুষ্ট। তাই আপনার ইচ্ছার ভেতর আপনারই রংতুলিতে আঁকা কেউ একজন হতে আমার কোনো আপত্তি নেই।

এই যে আমাকে যারা এই মুহূর্তে ব্রিজের ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে, তারা যখন প্রথম আমাকে নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুই অমুক? ভালোয় ভালোয় স্বীকার করে নে।’ আমি কোনো আপত্তি করি নি। কারণ যে পরিবেশে আমি আজকের আমি হয়ে উঠেছি—আমার পরিবার, সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র—সবাই আমাকে শিখিয়েছে যে আপত্তি হচ্ছে এক ধরনের অজুহাত, আর অজুহাত হলো অপরাধীর হাতিয়ার।

আমি কখনোই চাই নি যে একজন অপরাধীর সাথে আমাকে—যে কিনা বরাবরই একজন কবি হতে চেয়েছিল—তাকে গুলিয়ে ফেলা হোক। তাই তারা যখন বলেছিল যে ‘আমি অমুক’ তখন আমি ভেবেছিলাম হয়তো ‘আমি অমুকই’। কারণ যারা রাষ্ট্রের মতো জটিল একটা প্রতিষ্ঠানকে সহজভাবে চালানোর মতো দক্ষতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তারা নিশ্চয়ই কোনো ভুল করতে পারে না! (আমি তো এই শিক্ষাই পেয়েছি!)

অথচ তারা যখন সত্যিসত্যিই ‘অমুকের’ খোঁজ পেল এবং বুঝতে পারল যে তাদের ভুল হয়েছে তখন আমি সবিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম যে শিশুকাল থেকে আমাকে যা শেখানো হয়েছে তা আসলে ডাহা মিথ্যা! তখন আমার মনে হতে লাগল, আমার পরিবার মিথ্যা, সমাজ মিথ্যা, রাষ্ট্র মিথ্যা—সর্বোপরি আমার অস্তিত্বই এক বিশাল মিথ্যা! এবং আমাকে যারা ধরে এনেছিল তারাও আমাকে মিথ্যা বলার দায়ে অভিয্ক্তু করল। তারা ভাবল, আমি হয়তো  ‘অমুক’ সেজে ‘অমুক’-কে বাঁচাতে চেয়েছিলাম (আসলে তারা এমনটাই ভাবতে চেয়েছিল, নয়তো তাদেরও যে ভুল হয় এটা স্বীকার করে নিতে হতো)। ফলে ‘অমুকের’ সাথে আমারও শাস্তির বন্দোবস্ত করা হলো।

আর এখন আমি শূন্যে ভাসছি। নিচে নদী বয়ে যাচ্ছে, যেন আপনাদের জীবন। সেই জীবনে আর কিছুক্ষণ পরেই আমি ‘অজ্ঞাতনামা’ একজন হয়ে যাব। আমি পতনের গতি অনুভব করছি। আমার কপালে ছোট্ট একটা গর্ত। সেখানে জড়ো হয়েছে আমার বাবা, আমার মা, আমার স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, আমার সমাজ, রাষ্ট্র। তারা উঁকি মেরে আমার ভেতরটা দেখার চেষ্টা করছে। সেই ভিড় ঠেলে আপনি আমার কাছাকাছি এসে কান পাতলে শুনবেন, আমার গভীর থেকে একজন কবি রক্তাক্ত মুখ বাড়িয়ে ফিসফিস করছে—সব মিথ্যা, বুঝলেন? কবিরা কখনো মরে না। মরে কি?

২.
‘কতক্ষণ ধইরা বইয়া আছি, কাকা! আর কতক্ষণ?’ জমির বিরক্তির সাথে বলে।

সিগারেটে ছোট্ট টান দিয়ে শুক্কুর মিয়া ওপরের দিকে তাকায়। ডানা ছড়িয়ে দেয়া বাদুড়ের মতো লম্বা হয়ে মাথার ওপর ব্রিজটা ঝুলে আছে। সে ঘাড় বাঁকা করে ব্রিজের ছায়া থেকে বেরিয়ে চোখ কুঁচকে ওপরে দেখার চেষ্টা করে। তার নড়াচড়ায় নৌকাটা বেশ দুলে ওঠে। ভয় পেয়ে জমির চেঁচায়, ‘ডুইবা যাইব তো!’

‘চুপ!’ শুক্কুর মিয়া সাবধানে এদিক-ওদিক তাকায়। ‘তোরে না চুপ থাকতে কইছি!’

‘চুপই তো আছি! আর কতক্ষণ এমনি এমনি বইয়া থাকমু? তুমি শিওর চার লম্বর পিলারের কাছেই ফেলাবো?’

‘বারবার একই প্রশ্ন করস! তোর কি মনে হয় আমি না জাই না শুই না এইহানে আইছি? সবুর কর সময় প্রায় হইয়া আইছে। এরপর কইলাম ম্যালা কাম। আগেরবার ঠিকঠাক মতো করতে পারস নাই!’

‘আমার কী দুষ? গেল বার যেইডারে পিস করছিলাম সেইডা এমন চিমসা আছিল, ছুরিতেই ধরে না!’

‘ছুরি চালাবার না পারলি পারে এইসবই কওয়া লাগে!’ শুক্কুর মিয়ার কণ্ঠে রাগ। হাতটা উল্টিয়ে সে ঘড়ি দেখে। তাকে বেশ অসহিষ্ণু মনে হয়। নিজের মনে সে গালি দেয়, ‘শালারা ছ্যাপ দিয়া টাকা গইনা নেয় মাগার টাইম একদিনও ঠিক রাখপার পারে না!’

‘ছুরি চালাবার পারি না সে কথা কইয়ো না। গরু, ছাগল হইলে একখান কথা ছিল—ধর, মার, কাট। এইডা হইল মানুষ! চোখ আলাদা করো, মগজ আলাদা করো, কিডনি-কইলজা-পিত্তি আলাদা কইরা সেইগুলান আবার বোয়ামে ভরো। তারপরও শেষ নাই, মাংস আবার এমনভাবে কাটতি হবি যাতে সুন্দর করে গরু ছাগলের লগে মিস্ক করা যায়! যে সে কাম! লোকজন দু’একটা বাড়ানো যায় না কাকা?’

‘বাড়ানো যাবি ন্যাকা? অবশ্যি যায়। আজকে কলি পার কালকেই তোর মতো পাঁচজন আইসে হাজির হবি নে। তয়, লোক যত বেশি ট্যাকার ভাগ তত কম আর জানাজানির ভয় তত বেশি, তোরে কয়বার এইডা বুঝামু? আর এই খবর যদি একবার বাইরে যায়, উপরের হ্যারা আমগোরে কী করব জানোস? সেরেফ হওয়া কইরা দিব,’ শুক্কুর মিয়া সিগারেটের শেষটুকু নদীতে ছুঁড়ে ফেলে।


এগিয়ে আসছে ছুরি। এখনি ওকে কেটে টুকরো টুকরো করে নাই করে দেয়া হবে। অদৃশ্য সেই ছুরির শিরশিরে স্পর্শে জমিরের কলিজা কেঁপে ওঠে।


তার বলার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যাতে বাধ্য হয়ে জমির কল্পনায় দেখে, ‘কসাইখানার ঠান্ডা মেঝেয় হাত পা ছড়িয়ে ও শুয়ে আছে। ওর শরীর চুইয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। কপালে টিপের মতো ছোট্ট একটা গর্ত, চোখ খোলা—মাটির পথ ধরে ওর দৃষ্টি শাপলার বিলে গিয়ে মিশেছে; মুখ হা—যেন ও কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেছে। এগিয়ে আসছে ছুরি। এখনি ওকে কেটে টুকরো টুকরো করে নাই করে দেয়া হবে। অদৃশ্য সেই ছুরির শিরশিরে স্পর্শে জমিরের কলিজা কেঁপে ওঠে।

ঠিক তখনি শুক্কুর মিয়া উপর দিকে তাকিয়ে আনন্দের গলায় বলে, ‘জমির তৈরি হ, আইতাছে!’

৩.
শুক্কুর মিয়ার নৌকার ছায়ায় ঘাপটি মেরে থাকা বোয়াল মাছ মৃদু পাখনা নেড়ে রুই মাছকে বলে, ‘আজ কিন্তু খালি হাতে ফেরা যাবে না!

শরীরের ভার সামলাতে সামলাতে রুই মাছ গম্ভীরভাবে মাথা ঝাঁকায়।

কাতলা কিছুটা ছটফট করে ওঠে, ‘সবাই মিলে নৌকাটা উল্টে দিলেই তো হয়!’

‘শয়তান দুটো পানিতে পড়বে। আমি তখন এক কামড়ে ওদের কান ছিঁড়ে ফেলব,’ গজার ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে।

‘উল্টোপাল্টা কিছু করে নিজেদের জীবন বিপন্ন করা যাবে না,’ মাগুর সাবধান করে দেয়।

‘হুম! আমরা যা করতে এসেছি তাই করব,’ বোয়ালের কণ্ঠ গমগম করে। ‘উপর থেকে মানুষটা পড়া মাত্রই টান দিয়ে তাকে নিচে নিয়ে যাব। রুই তুমি থাকবে ডানে, কাতল বামে, আমি পা ধরব, গজার আর মাগুর তোমরা যত জোরে পারো নিচের দিকে টানবা। গতবারের মতো কোনো ভুল করা যাবে না! মানুষটাকে একটানে দাদুবুড়োর কাছে নিয়ে তারপর দম নেবে। মনে থাকবে?’

‘হ্যাঁ,’ কাতলা বলে।

‘এই সবাই তৈরি হও,’ মাগুর ভুস করে মাথা তুলে আবার নামিয়ে নেয়, ‘মানুষটা পড়ছে…’

৪.
‘রাত অনেক হইছে, এইবার ঘুমা,’ করিমুন্নেছা রতনকে বলে।

‘না আমি ঘুমামু না।’ রতন মাথা ঝাঁকায়। ‘আরেকটা গপ কও।’

করিমুন্নেছা জানলা দিয়ে বাইরে তাকায়। চাঁদের আলোয় নদী হেসে যাচ্ছে। ঘরের জমিনে সেই হাসির দুলুনির ছন্দ সে টের পায়। তার ইচ্ছা করে, নদীর ধারে গিয়ে খানিকক্ষণ বসে আসে। তারপর প্রতিদিন দেখা ব্রিজটার দিকে তার চোখ যায়। চান্নিপশর রাতকে দুই ফালা করে দৈত্যের মতো ব্রিজটা দাঁড়িয়ে আছে। দেখলেই ভয় লাগে। ব্রিজের কোল ঘেঁষা বস্তি মহল্লায় সবার কানাঘুঁষা, প্রায় রাতেই নাকি ব্রিজে ভুত আসে। ‘একটা, দুইটা না অনেক ভুত,’ জয়তুনের মায়ের কণ্ঠ করিমুন্নেছা’র কানে বেজে ওঠে।

‘তুমি নিজের চোখে দেখছ?’

‘তা আর কলাম কী রে! সেই ভুতের ইয়া বড় ঠ্যাং, ইয়া বড় হাত। মানুষ ধইরা আইনে ব্রিজের ওপর রক্ত খায়।’

‘কই আমি তো দেখি না!’

‘তুই দেখপি কেমন করে? তুই হচ্ছিস ভিতুর ডিম। আমি কাছে যায়্যে দেখছি।’

‘ভুতেরা তোমারে কিছু কলো না?’ করিমুন্নেছা জিজ্ঞেসা করে।

‘ভুতেরা তো আমারে দেখপারই পারে নাই। আমার গলায় আজিরা বাবার তাবিজ আছে না! আমি যাইয়া দেহি, এক মানুষরে ধইরে আনছে। সে কত কান্নাকাটি করল। কয়, আমার ছোটছোট পোলাপান আছে, আমারে ছাইড়া দাও।  ভুতেরা কী আর ছাড়ে! সবাই মিইলা কচকচ কইররা মানুষটার ঘাড় মটকাইয়া রক্ত চুইষা খাইল।’

‘তারপর?’

‘তারপর ব্রিজের ওপর থেইকা নদীর ভিতরে ছুঁইড়া মারল।’

‘ও মাগো!’

সেদিনের সেই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে করিমুন্নেছা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার বুকটা ঢিপ ঢিপ করে। সে হাত দিয়ে তাড়াতাড়ি জানালার পাল্লাদুটো ভেজিয়ে দেয়।

‘জানলা বন করো ক্যান?’ রতন চেঁচায়। ‘আমি চাঁদমামুরে দেখমু।’

‘চুপ!’ করিমুন্নেছা ফিসফিস করে, ‘“ধপাসধপ” আসপেনে।’

ধপাসধপের কথা শুনেই রতন চুপ হয়ে যায়। করিমুন্নেছা তাকে ধপাসধপের বহু কিচ্ছা শুনিয়েছে। তারা ভুতের চেয়েও ভুত, রাক্ষসের চেয়েও রাক্ষস—বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ কোনো কিছুকেই তারা পরোয়া করে না। তবে তাদের সবচেয়ে পছন্দ হলো মানুষ। মানুষ পেলেই তার রক্ত খেয়ে তারা নদীতে ছুঁড়ে ফেলে। কল্পনায় সেই ধপাসধপদের আসতে দেখে রতন গুটিয়ে গুটিসুটি মেরে করিমুন্নেছার বুকের ভেতর ঢুকে যায়। করিমুন্নেছা তাকে জড়িয়ে ধরে  অভয় দেয়। মাথায় আলতো করে কয়েকবার হাত বোলাতেই রতনের নিশ্বাস গাঢ় হয়ে আসে। কিন্তু করিমুন্নেছার ঘুম আসে না। তার মনে হয় ধপাসধপ তার জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ভয়ে সে শ্বাস নিতেও ভুলে যায়। একটু পরেই, দূর থেকে অস্পষ্টভাবে তার কানে এসে বাজে—‘ধপাস’।

৫.
‘তারপর?’, ছানাপোনারা জিজ্ঞেস করে।

পাখনা দিয়ে পিঠের শক্ত খোলটা একটু চুলকে দাদুবুড়ো চারিদিকে চোখ বোলান। কই, পুটি, ট্যাংরা, চিংড়ি, রয়না, খয়রা, টাকি—কত কত মাছের বাচ্চাকাচ্চা। দেখে তার প্রাণ জুড়িয়ে যায়। হেসে তিনি বলতে থাকেন, ‘ফকির শাহ তখন সাহেবদের বিরুদ্ধে জানপ্রাণ বাজি রেখে লড়ে যাচ্ছে। তার দলের আক্রমণে সাহেবদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। তারা নতুন নতুন সৈন্য আনে। সেইসব সৈন্যও ফকির শাহ’র সামনে শুকনো পাতার মতো উড়ে যায়। লোকে বলতে লাগল, ফকির শাহ মারফতি জাদু জানে। তার জাদুর শক্তির কথা দিকে দিকে যত ছড়িয়ে পড়ল, ততই মানুষজন সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাহসী হয়ে উঠল।  ফকির শাহকে কোনো মতেই কাবু করতে না পেরে শেষে সাহেবরা অন্য পথ ধরল। তারা টাকা পয়সা নানা প্রলোভন ছিটিয়ে ফকির শাহ’র কাছের কাউকে হাত করার চেষ্টা করল এবং তাদের সেই চেষ্টায় কাজ হলো। যে ফকির শাহকে হাজার ফাঁদ পেতেও ধরা যায় নি সেই ফকির শাহ তার কাছের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতায় ধরা পড়ে গেল। সাহেবরা তার হাত কাটল, পা টুকরো করল, চামড়া তুলে তাকে কুকুর দিয়ে খাওয়ালো। আর তার চোখ দুটো—দাদুবুড়ো লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলেন, উপড়ে নদীতে ফেলে দিল।’


‘কী ভয়ঙ্কর!’ ফকির শাহ’র হত্যার কাহিনি শুনে ছানাপোনারা সব শিউরে উঠে একে অন্যের গা ঘেঁষে আসে।


‘কী ভয়ঙ্কর!’ ফকির শাহ’র হত্যার কাহিনি শুনে ছানাপোনারা সব শিউরে উঠে একে অন্যের গা ঘেঁষে আসে।

তাই দেখে দাদুবুড়ো অভয় দেয়ার ভঙ্গিতে পাখনা নাড়েন। পিঠের খোলে খানিকটা ভর দিয়ে সামনে ঝুঁকে বলেন, ‘আমি তখন কোথায় যেন যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি আমার সামনে দুটো চোখ। সেই চোখ আমাকে দেখে বলল, আমি ফকির শাহ’র চোখ!’

‘চোখ কথা বলল?’

‘বলল তো!’ দাদুবুড়ো হাসেন। ‘চোখ কথা বলছে, এই দেখে আমি তো ভয়ে শেষ।’

‘চোখ হেসে বলল, ভয় পাসনে। আমাকে টুপ করে গিলে ফেল। তাহলে ভবিষ্যৎ দেখতে পাবি।’

‘সে কিভাবে? আমি অবাক হয়ে বললাম।’

চোখ বলল, ‘ফকির শাহ মারফতি জাদু জানত শুনিস নি? আমি তার জাদুর চোখ। আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পারি।’

‘তারপর তুমি চোখ খেলে?’ ছানাপোনারা জিজ্ঞেসা করে।

‘হ্যাঁ, জাদুর কথা শুনে খুব লোভ হলো। তাই খেয়ে ফেললাম। খাওয়ার পর দেখি, সত্যি সত্যিই ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। দেখলাম সাহেবরা হেরে যাবে… নতুন দেশ হবে… সেই দেশ থেকে আরেকটা সোনার দেশের জন্ম হবে…’

‘আমরা কি সেই সোনার দেশে আছি?’

‘হ্যাঁরে, হ্যাঁ,’ দাদুবুড়ো খোলের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে আবার বের করেন।

‘আচ্ছা,  তুমি তাহলে এখন আর ভবিষ্যৎ বলো না কেন?’

‘এই তো হয়েছে সমস্যা,’ দাদুবুড়ো নিজের চোখ কচলান। ‘চোখদুটো ঠিক মতো আর কাজ করছে না!’

‘সেকি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ দেখবে কে!’

‘নতুন চোখ লাগবে। ‘ফকির শাহ’র চোখ আমাকে বলেছিল। এমন একদিন আসবে যখন আমি আর দেখতে পাব না। তখন, ‘মরেছে কিন্তু মরে নাই, ভেতরে জ্যান্ত ছটফটাচ্ছে’ এমন কারো চোখ লাগবে। স্বপ্নের চোখ…’ দাদুবুড়ো ঘোলা চোখে এদিক-ওদিক তাকান। কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করেন।

৬.
‘দাদুবুড়ো, এই যে নিয়ে এলাম,’ রুই, কাতল, বোয়াল, গজার, টানতে টানতে লোকটাকে দাদুবুড়োর কাছে নিয়ে আসে।

দাদুবুড়ো বুক হেঁটে সামনে এগিয়ে এসে লোকটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। তার কপালের গর্ত, নাক, মুখ, চোখ—এক এক করে সব। দেখতে দেখতে তিনি অস্ফুট স্বরে বলেন, ‘কবি! চোখ ভরা স্বপ্ন! মরে নাই, বেঁচে আছে!’

‘এর চোখেই তাহলে হবে?,’ বোয়াল  জিজ্ঞেসা করে।

‘হওয়ার কথা!’ দাদুবুড়ো মাথা ঝাঁকায়।

চারিদিকে খুশির হুল্লোড় ওঠে, ‘চোখ পাওয়া গেছে, চোখ!’

দাদুবুড়ো লোকটার চোখের কাছে মুখ এগিয়ে আনেন। বিড়বিড় করে কিছু বলতে বলতে তিনি এক এক করে দুটো চোখই গিলে ফেলেন।

সবাই চুপ হয়ে যায়। দাদুবুড়ো এবার ভবিষ্যৎ দেখবেন।

গলাটা খোলের ভেতর ঢুকিয়ে দাদুবুড়ো নড়েচড়ে বসেন। আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ করে তিনি ধ্যানের ভেতর ঢুকে যান।

একটু একটু করে সময় যায়। ভবিষ্যৎ জানার উত্তেজনায় সবাই উসখুস করে। কিন্তু দাদুবুড়ো কোনো কথা বলেন না। শেষে একসময় থাকতে না পেরে তারা দাদুবুড়োকে ধাক্কা দিয়ে বলে, ‘ও দাদুবুড়ো, সামনে কী দেখছ?’

দাদুবুড়োর ঘোর ভেঙে যায়। তিনি চোখ খুলে তাকান। অচেনার মতো এদিক-ওদিক দেখেন। তারপর ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে বিহ্বল কণ্ঠে বলেন, ‘ অন্ধকার!

মূর্তালা রামাত

জন্ম ১৯৮৩; সুলতানপুর, রাজবাড়ী। বর্তমানে থাকেন অস্ট্রেলিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। কবিতা লেখায় ২০০৪ সালে পেয়েছেন ক্লোজআপ ওয়ান পুরস্কার।

প্রকাশিত গ্রন্থ—

কষ্টালজিয়া [কবিতা, বৃক্ষ প্রকাশনী, ২০০৮]
অনুবাদ কবিতা [অনুবাদ, বাতিঘর প্রকাশনী, ২০০৯]
গুয়ানতানামো’র কবিতা [অনুবাদ, ঐতিহ্য, ২০১২]
ফেরাফিরি [কবিতা, বৃক্ষ প্রকাশনী, ২০১২]
আপুনি’র ডায়েরি [উপন্যাসিকা, বৃক্ষ পকাশনী, ২০১২]
মরা নদীর জোছনা [উপন্যাসিকা, বৃক্ষ প্রকাশনী, ২০১২]
ঘোরদৌড়ের ঘুড়ি [ছোটগ্রল্প, শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
ওয়ার হর্স- মাইকেল মোরপার্গো [অনুবাদ, ঐতিহ্য, ২০১৪]
ক্যাপিটালিজ এ ঘোস্ট স্টোরি- অরুন্ধতী রায় [অনুবাদ, সংহতি, ২০১৭]
ঘুম ঘুণ চোখে [কবিতা, দিব্য প্রকাশনী, ২০১৭]

ই-মেইল : murtala31@gmail.com