হোম গদ্য গল্প বেসরকারি ট্রেনের নিজস্ব জগৎ

বেসরকারি ট্রেনের নিজস্ব জগৎ

বেসরকারি ট্রেনের নিজস্ব জগৎ
2.12K
0

ঢাকা চট্টগ্রাম রুটের বেসরকারি ট্রেন কর্ণফুলী এক্সপ্রেসের একজন টিকেট চেকার সাইদুল। সপ্তাহে চারদিন তাকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম কিংবা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত টিকেট বিক্রি ও চেক করতে করতে ডিউটি দিতে হয়। বেসরকারি ট্রেন জন্য এমনকি ছাদে ওঠা যাত্রীদের কাছ থেকেও বাধ্যতামূলক ভাড়া আদায় করতে হয় সাইদুলকে। ট্রেনে দশটা বগি, প্রত্যেক বগিতে সাইদুলের মতো দুজন করে বরাদ্দ। টিকেট না কেটে ভ্রমণের সুযোগ নাই বললেই চলে। সাইদুল বাকিদের মতোই শীত কিংবা গ্রীষ্মে অনেকগুলো পকেটের একটা জ্যাকেট পরে থাকে। একেক পকেটে কাছের ও দূরের নানা গন্তব্যের টিকেট আর টিকেট বিক্রির টাকা। লোকাল যাত্রীদের কাছ থেকে অল্প দূরত্বের ভাড়া হিশেবে আদায়কৃত এসব টাকা মূলত অনেক অনেক ভাঙতি নোটের জঞ্জাল। সাইদুলের বসতভিটা বিক্রমপুরে, যদিও বিক্রমপুরে রেললাইন নাই। সাইদুল বলে, ওদের ট্রেনে রেললাইন নাই এমন এলাকায় জন্ম নেওয়া লোকজনের সংখ্যাই নাকি বেশি। উদাহরণ হিশেবে একদিন টিকেট চেকারদের বস সবুজ ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সবুজ ভাইয়ের বাড়ি বরিশাল, কে না জানে, বিক্রমপুরের মতো বরিশালও রেললাইনহীন। তবে রেললাইনহীন এলাকার মানুষদেরও রেলওয়েতে চাকরি হয়। একই রকম ঘটনা মনে করে সাইদুল বলে, বরিশালে ট্রাম লাইন নাই, তাই বলে ট্রামের তলায় পড়ে কবি জীবনানন্দের মৃত্যুও ঠেকানো যায় নাই।


আমার মাথা খারাপ, যার তার জন্য পাগল হয়ে যাই, আগে এক তরুণ অধ্যাপকের জন্য বিষ পর্যন্ত খেয়েছি।


টিকেট চেকারি পেশাটাকে সাইদুল মন থেকে ঘৃণা করে। সকাল আটটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত বগিতে হেঁটে হেঁটে এমনকি ছাদে উঠে পর্যন্ত টিকেট বিক্রি করতে হয়, যেটা সাইদুলের মতে ‘অমানুষিক পরিশ্রমের কাজ’। একটা ব্যাপার ভালো, সপ্তাহে তিনদিন ছুটি। সাইদুলের ডিউটি রোস্টার : শনিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম, রবিবার চট্টগ্রাম-ঢাকা, সোমবার ছুটি, মঙ্গলবার ঢাকা-চট্টগ্রাম, বুধবার ছুটি, বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম-ঢাকা, শুক্রবারও ছুটি। দুইটা ছুটির দিন ঢাকায় এবং একটা ছুটির দিন ওকে চট্টগ্রামে কাটাতে হয়। অনেক তদবির করে দুইটা ছুটির দিন ঢাকায় পড়ার ব্যবস্থা করে সাইদুল। এজন্য টিকেট চেকারদের বস সবুজ ভাইকে এককালীন পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয় যদিও, কিন্তু সাইদুলের বিশ্বাস, ‘বিশেষ কনসিডারের’ জায়গা থেকেই এত অল্প টাকায় দুইটা ছুটির দিন ঢাকায় পড়ার ব্যবস্থা করেছেন সবুজ ভাই।

সাইদুলের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা নরসিংদী রেলস্টেশনে। স্টেশনে ছোট চাচার কনফেকশনারি ও বইয়ের দোকানে সারা দিনের ভাঙতি টাকা যতটা সম্ভব বড় নোটে বদলে নিতে আসে সাইদুল। ভাঙতি টাকা পেলে চাচার লাভ আর বড় নোট পেলে সাইদুলের, এই ভিত্তিতে দুজনের মধ্যে ভাঙতি ও বড়নোট বিনিময়ের একটা সম্পর্ক। নিয়মিত চাচার দোকান থেকে ম্যাগাজিন আর নভেল এনে পড়া আমার অভ্যাস। সেদিন আমাকে দোকানে রেখে চাচা পাশের দোকানের ঝামেলা মেটাতে চলে গেলে কিছুক্ষণের মধ্যে স্টেশনে এসে দাঁড়ায় ঢাকাগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেন। আগে থেকেই খেয়াল করতাম, স্টেশনে থামা মাত্র এই ট্রেনের বিভিন্ন বগি থেকে বিচিত্র জ্যাকেট পরিহিত একদল যুবক প্লাটফর্মে নেমে বিড়ি ধরায়। সেরকমই জ্যাকেট পরা এক যুবক স্বয়ং আমার সামনে এসে হাজির হয়, এদিক সেদিক উঁকি দিয়ে চাচাকে দেখতে না পেয়ে জিগ্যেস করে, ‘বেলায়েত ভাই কোথায়?’

আমি বলি, ‘চাচা তো পরের মোষ তাড়াতে গেছেন।’ সাইদুল হেসে বলে, ‘নিজের খেয়ে? নাকি ওরাই খাওয়াচ্ছে?’ প্রত্যুত্তর শুনে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। জানতে চাই, কিভাবে সাহায্য করতে পারি। সাইদুল ভাঙতি ও বড় নোট বিনিময়ের বিষয়টা বললে ড্রয়ার খুলে দেখি বড় নোটে আড়াই হাজার টাকা আলাদা করা আছে। বলি ‘আড়াই হাজার টাকা, সম্ভবত আপনার জন্যই আলাদা করে রাখা।’ কিন্তু সম্মত হয়েও সাইদুলের মুুখে হাসি না ফোটার কারণ, সে সন্দিহান ট্রেন ছাড়ার আগে ভাঙতি নোটগুলো আমি গুনে শেষ করতে পারব কিনা। বলা বাহুল্য সন্দেহটা অমূলক নয়। সারাদিন লোকাল যাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া ছেঁড়া ও মলিন সব খুচরো নোট আমাকে ধরতে ও গুনতে দিতে ইতস্তত করে সাইদুল। বলে, ‘কিছু মনে না করলে আমি গুনে দিই? আপনি দেখেন ঠিক আছে কিনা।’ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, আমার প্রতি দেখানো এইটুকু যত্নশীল আচরণের কারণে মুহূর্তকাল বিলম্ব না করে সাইদুলকে আমি ভালোবেসে ফেলি। ব্যাখ্যা করে সাইদুল বলে, ‘নোটগুলো আনহাইজেনিক। তাই আপনাকে ধরতে দিতে চাই না।’

ট্রেন ছাড়ার আগেই সাইদুল টাকা গুনে শেষ করে। বিপরীত দিক থেকে আসা না থামা আন্তঃনগর ট্রেন অন্য লাইন দিয়ে দ্রুতগতিতে চলে গেলে কর্ণফুলী ট্রেনটাও হুইসেল দেয়। সাইদুল ‘বাই’ বলে ট্রেনে ওর নির্ধারিত বগিতে উঠে পড়লে ধীর গতিতে নরসিংদী স্টেশন ছেড়ে যায় কর্ণফুলী এক্সপ্রেস। আমার মনে হয় এরচেয়ে করুণ দৃশ্য আমি আর কখনোই দেখি নাই। কখনোই এত মন খারাপ করে কোথাও দাঁড়িয়ে থাকি নাই। চাচা এসে ভাঙতি নোট দেখে ‘ওহো সাইদুল এসেছিল’ বললে লোকটার নাম যে সাইদুল তা বোঝা যায়। সাইদুলের সম্পর্কে চাচার কাছ থেকে যতটা সম্ভব জেনে নিতে চেষ্টা করি। ‘বেসরকারি ট্রেনের টিকেট চেকার, সামাজিক অবস্থান জিরো। কিন্তু কথা বলে খুব গুছিয়ে।’ চাচাকে মনে হয় সাইদুুলের ব্যাপারে মুগ্ধ, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই মুগ্ধতা তিনি ঢাকতে চান। ‘আমি সিনেমায় নামতে বলেছি। চেহারা ছবি ভালো, হাইটও লক্ষণীয়, নিশ্চিত চান্স পাবে।’ সাইদুলকে নিয়ে চাচা বলতে থাকেন, ‘হাজার সাতেক বেতনের টিকেট চেকারি করে জীবন চালানো কঠিন।’ যোগ্য লোককে অযথার্থ জায়গায় দেখতে পাওয়ার ক্ষোভ ঝরে চাচার কথায়।

‘কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এমনও না যে সে শিক্ষিত।’ যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া চাচা শেষ পর্যন্ত কাউকেই আমলে নেন না। ‘পড়ালেখা করে নাই, টিকেট চেকারি ছাড়া আর উপায় কী?’ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন চাচা। বিরক্ত স্বরে বলি, ‘এত পড়াশোনা করে আপনার কী হলো, করেন তো দোকানদারি!’ ক্ষেপিয়ে দিই এই বলে যে, ‘শিক্ষার সাইনবোর্ড হিশেবে কয়টা নভেল, ম্যাগাজিন আর নিউজপেপার রাখেন, বিক্রি তো হয় না! শেষ পর্যন্ত বিস্কিট আর পানির বোতলই বেচেন।’ এসব শুনে তিনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকান। পরিবেশটাকে একই রকম থমথমে রেখে সাইদুল আবার কবে আসবে, জিগ্যেস করি। জবাবে সাইদুলের ডিউটি রোস্টারটা আমি চাচার কাছ থেকেই পেয়ে যাই। সেদিন বৃহস্পতিবার, পরের দিন শুক্রবার সাইদুলের তদবির করে পাওয়া ঢাকায় পড়া ছুটি। সারা রাত আর পরের ৩০ ঘণ্টা ঘোরের মধ্যে কেটে যায়। শনিবার সকাল দশটায় চট্টগ্রামগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনের অপেক্ষায় স্তব্ধ হয়ে থাকি।

শনিবার সকালে দোকানে গিয়ে বসলে, নিতান্তই প্লাটফর্মে ট্রেন ঢুকে পড়ার পর চাচা জানান, সাইদুল শুধুমাত্র ঢাকাগামী ডিউটির দিন দোকানে আসে। চট্টগ্রামগামী ডিউটির দিন, চট্টগ্রামের কাছাকাছি সীতাকুণ্ড বা ফেনী স্টেশনের কিছু দোকান থেকে সে তার ভাঙতি নোট বড় নোটে বদলায়। ব্যবস্থা দেখে আমি অবাক না হয়ে পারি না। ঢাকাগামী ডিউটির দিন ঢাকার নিকটবর্তী নরসিংদীতে চাচার দোকানের পাশাপাশি টঙ্গী স্টেশনের কয়েকটা দোকান থেকেও সে তার নোট বদল করে। ফলে আদুরে ভঙ্গিতে আমাকে বলতে হয়, ‘এই লোক দেখি নোট বদলানোয় খুব ওস্তাদ!’ আমার কণ্ঠে বিপদজনক কিছুর আন্দাজ পেয়ে মুহূর্তে উদ্বিগ্ন চাচা বলেন, ‘পাগলামি করিস না কিন্তু!’ আমি ‘আচ্ছা’ বলে ধীরে ধীরে থামতে থাকা ভিড়ভর্তি ট্রেনটার গা ঘেঁষে প্ল্যাটফর্ম ধরে হাঁটতে শুরু করি। আর কয়েকটা বগির দরজায় উঁকি দিয়ে দেখি জ্যাকেটধারী টিকেট চেকাররা যাত্রীদের ঠাসাঠাসি ভিড়ের মধ্যে যে যার নিজের অবস্থানে টান টান হয়ে আছে।

দ্রুত পায়ে একেকটা বগি পার হতে থাকি, আর ভিড়ের মধ্যেও উঁকি দিয়ে যতটা দেখা সম্ভব, দেখি। কিছুটা শিথিল অবস্থায় পাওয়া এক জ্যাকেটধারীকে সাইদুল কোন বগিতে আছে জিগ্যেস করলে সে জানায় ‘ইঞ্জিনের পরের বগিতে।’ একটা মেয়ে প্লাটফর্মে হেঁটে হেঁটে ট্রেনের ভেতর উঁকি দিতে দিতে সাইদুলকে খুঁজছে, যদিও খুব স্বাভাবিক দৃশ্য না, কিন্তু শিথিল টিকেট চেকার সহজভাবেই প্রশ্নটার জবাব দেয়। ঘুরে, ইঞ্জিনের দিকে হাঁটা দিতেই তাকে বলতে শোনা যায়, ‘পাওয়া গেছে আরেকজন সাইদুল-পাগল।’

ইঞ্জিনের পরের বগি পর্যন্ত পৌঁছাতে লাইন ক্লিয়ার দিয়ে দেয়। ভিড় হট্টোগোলের বগিটা ধীরে ধীরে প্লাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ দেখা যায় চাচার দোকান থেকে বেরিয়ে এসে দরজায় ঝুলে থাকা আরো অনেক মানুষের সঙ্গে নিজেকেও ঝুলিয়ে দিচ্ছে সাইদুল। তারপর ভিড় ঠেলে ক্রমশই ট্রেনের ভেতর নিজেকে গুঁজে ফেলবার চেষ্টারত অবস্থায় আমাকে দেখতে পায়। আমি পাগলের মতো চাচার দোকানে ফেরত এসে জানতে চাই, ‘আমাকে মিথ্যা বলা হয়েছিল কেন?’ কিন্তু চাচা জানান, এটা খুবই অস্বাভাবিক ব্যাপার, সাইদুলও নাকি দোকানে এসে আমার ব্যাপারেই জানতে চাচ্ছিল! লজ্জা পেয়ে এবং খুশি হয়ে অল্প রাগী ভঙ্গিতে আমি জিগ্যেস করি, ‘বলছেন আমি উনাকে খুঁজতেছি?’ জবাবে কড়া ধমক দিয়ে আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন চাচা।

বাড়ি গিয়ে মনে হয় সাইদুলের জন্য আমার এমন ব্যাকুলতার বিশেষ কোনো মানে নাই। খানিকটা আগ বাড়ানো আচরণ হয়ে গেছে আমার দিক থেকে। কিন্তু সাইদুলও তো চট্টগ্রামগামী ডিউটির দিন ‘অস্বাভাবিকভাবে’ চাচার দোকানে ছুটে এসেছে। চাচা কি সাইদুলকে বলেছেন, আমি তাকে খুঁজছি? সাইদুলকে চাচা কী বলেছিলেন, আরো পরে সাইদুলের কাছ থেকে তা জানতে পারি। তিনি বলেছিলেন, আমার মাথা খারাপ, যার তার জন্য পাগল হয়ে যাই, আগে এক তরুণ অধ্যাপকের জন্য বিষ পর্যন্ত খেয়েছি। ঘটনা যদিও মিথ্যা না, তবে সেই তরুণ অধ্যাপক আদতে একজন লুইচ্চা প্রকৃতির লোক। বুঝতে পেরে, বিষ খেয়ে ফেলার মতো বোকামির জন্য নিজের প্রতি যথেষ্ট বিরক্ত আমি। আমার শিক্ষিত চাচা কিভাবে অপরিচিত একজন মানুষকে এই পর্যায়ের একটা পারিবারিক সিক্রেট বলে দিতে পেরেছিলেন তা অশিক্ষিত সাইদুল আর শিক্ষানবীশ আমার, বলতে গেলে, মাথার উপর দিয়ে যায়।


আমাকে এখনই তার সঙ্গে একটু থানায় যেতে হবে। ‘মানে কী?’ সিঁড়িতে থেমে গিয়ে আমি চিৎকার করি, কিন্তু রেলবিটের সাংবাদিকের একই কথা।


পরের দিন ঢাকাগামী ডিউটির সময় দোকানে আসলে সাইদুলের সঙ্গে তৃতীয়বারের মতো দেখা হয় আমার। চাচা চান আমাদের মধ্যে কথাবার্তা না হোক, ফলে বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলাপ তুলে নিজের সঙ্গেই তিনি এনগেইজড রাখেন সাইদুলকে। কিন্তু সাইদুল বারবার ভুলবশত আমার দিকে তাকিয়ে ফেলে আর সংশোধনের ভিত্তিতে পুনরায় মনোযোগ দেয় চাচার ফালতু কথাবার্তায়। শেষে ট্রেন ছেড়ে দেওয়ায় তাড়াহুড়া করে জিগ্যেস করে বসি, ‘পরশুদিন কোন বগিতে থাকবেন?’ দ্রুতই ট্রেনের দিকে পা বাড়ানো সাইদুল পেছন ঘুরে চাচার দিকে বোকা চাহনি দিয়ে, শেষে আমাকে বলে, ‘এটা আসলে আগে থেকে জানা থাকে না।’ বলেই লাফ দিয়ে চলতি ট্রেনে উঠে পড়লে সাইদুলের জন্য আবারও আমার অপেক্ষার প্রহর গোনা শুরু হয়। ফলে রহস্যময়ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা চাচাকে সোজা বলে দিই, ‘করলে সাইদুলকেই বিয়ে করব, নইলে কাউকেই না।’

সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব শুনে থতমত চাচা তাৎক্ষণিকভাবে মতামত দেন, সেবা রোমান্টিক সিরিজের বই পড়েই আমার এমন অধঃপতন। ক’দিন আগেই পড়ে শেষ করি সেবা রোমান্টিকের এমন এক উপন্যাস, নায়ক যেখানে গাইড হয়ে নায়িকাকে সুন্দরবন দেখাতে নিয়ে যায়। চাচা বলেন, এসব গল্প মৌলিক না, বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে দলবেঁধে রচিত। জন্ডিস বাঁধিয়ে নরসিংদী ফিরে আসার আগে চাচা কিছুদিন ঢাকায় স্থায়ী হবার চেষ্টা চালান। তখন কিছুদিন সেবা প্রকাশনীর অনুবাদক হিশেবে কাজ করেছেন। চাচার দাবি, বাজারে পাওয়া যায় এমন কিছু সেবা ওয়েস্টার্নের অনুবাদ তার করা। ‘যদিও নাম গেছে শুধু কাজী আনোয়ার হোসেনের,’ ভিতরের দুর্নীতি ফাঁস করে দেওয়ার ভঙ্গিতে পরিচিত মহলের প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গেই চাচা এই গল্প করেন। সাইদুলের কাছ থেকে পরে আরো জানা যায়, তার সঙ্গেও একাধিকবার এই গল্প করা হয়েছে চাচার।

‘চাচার সব কথা বিশ্বাস করার কারণ নাই,’ আমি সাইদুলকে বুঝাই। ‘কিন্তু বিষ খাওয়ার ঘটনা তো সত্য?’ টিপ্পনি কেটে প্রত্যুত্তর করে সাইদুল। জানতে চায়, ‘তোমার জীবনে চাচার এত প্রভাব কেন?’ কেননা চাচাই আমাদের সংসার চালান। বাবা উঠে পর্যন্ত বসতে পারেন না। শুনে সমবেদনা জানায় সাইদুল, রেললাইনের ধার থেকে ছিঁড়ে আনে বুনোফুল। রস খেতে খেতে বলে, ‘তোমার চাচা তো সম্পর্কে আমার ভাই, তোমার সাথে তাহলে কিভাবে হবে?’ আমি বলি, ‘না হলে মরেই যাব।’ কিন্তু আমাকে দুঃখ দিয়ে সাইদুল বলে বসে, ‘যেহেতু প্রত্যেকের জন্য একবার করে “মরেই” যাওয়া তোমার স্বভাব।’ শুনে আমি কেঁদে ফেলি। সাইদুল আমাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেয়, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে।’ আমি ভাবি, সব তো ঠিকই আছে। কিন্তু কিসের এত! একটা সময় ঢাকায় পড়া ছুটির দিনগুলোতে ঢাকায় গিয়ে সাইদুলের সঙ্গে থাকতে শুরু করি। ঠিকঠাক মতো প্রেম হতে কয়েকমাস লেগে যায় আমাদের। সাইদুলের নিষ্ঠুরভাবে বলা এসব কথাবার্তা নিতে পারতাম না যদিও। কিন্তু সাইদুলের জন্য আমার প্রেমটা ছিল এতই স্থূল আর চেহারাজনিত জায়গা থেকে যে, ওইদিকে তাকালে পরে আমি ফিদা হয়ে যেতাম।

অসম এই সম্পর্কের জের ধরে চাচার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে সাইদুলের। যদিও এই ‘অসম’ শব্দটির ঘোষক একান্তই চাচা নিজে। নয়তো আমাদের বয়সের ব্যবধান খুব বেশি না, আট নয় বৎসরের মতো। কিন্তু সাইদুল অশিক্ষিত জন্য এটাই চাচার কাছে বিশাল ব্যবধান হিশেবে ধরা পড়ে। সাইদুলের বক্তব্য, ‘অসম বললে সেটাকেও ঠিক ফেলে দেওয়ার উপায় নাই।’ কেননা, ‘আট নয় বছরের ব্যবধান তো অনেক। ভেবে দেখো, আমি যখন ফোর ফাইভে পড়ছি, তখন তোমার জন্ম হচ্ছে মাত্র।’ আমি জানতে চাই সে আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে কিনা। জবাবে অপ্রাসঙ্গিকভাবে সাইদুল শর্শদি ইউনিয়ন পরিষদের এক মেম্বারের মেয়ের গল্প শোনায়। ওই মেয়ে কর্ণফুলী ট্রেনের টাইম সিডিউল অনুযায়ী গুণবতী রেলওয়ে স্টেশনে ঘুরঘুর করে। উদ্দেশ্য সাইদুলকে দেখা, সোজা বাংলায় বললে মেয়ে তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। কিছুদিন পর অল্প কথাবার্তা আর পরিচয়ের সূত্রপাত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেম্বারের মেয়ের সঙ্গে তেমন কিছুই আর হয় না সাইদুলের। ফলে একদিন স্টপেজ না থাকা শর্শদি স্টেশনে থামিয়ে ফেলা হয় ওদের বেসরকারি ট্রেন। হৈ হৈ রব তুলে পাণ্ডা গোছের কিছু লোকজন বগি থেকে বগি ছোটাছুটি করে সাইদুলকে খুঁজতে থাকে। সাইদুল তখন ছাদের যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া তুলতে গেছে। তাই বগিগুলোতে সাইদুলকে না পেয়ে টিকেট চেকারদের বস সবুজ ভাইকে শাসিয়ে পাণ্ডাদল ট্রেন থেকে নেমে যায়।

এককালে শুধুমাত্র চেহারাজনিত কারণে পড়ায় (তাছাড়া চেহারা একটা ফ্যাক্টর) সাইদুলের প্রতি নিজের প্রেমটাকে আজ যতই স্থূল বলে চালানোর চেষ্টা করি না কেন, অস্বীকার করার উপায় নাই চেহারা ছাড়াও একটা অপ্রতিরোধ্য ও নিজস্ব সম্মোহনী শক্তি ওর ছিল। দুয়েকটা কর্মশালা ভিত্তিক আত্মোন্নয়ন সাপেক্ষে আজকের জমানায় এসে সাইদুলকে যতই সাধারণ আর গতানুগতিক চিন্তার মানুষ বলি না কেন, যেমন এককালে তরুণ অধ্যাপককেও বলেছিলাম ‘লুইচ্চা’, ব্যাপার তবু ঠিক এক রকমের না। সাইদুলের জন্য অপেক্ষার একটা ইঞ্জিন আমার ভেতর প্রতিনিয়ত ঘর্ঘর করে গেছে। পনের বছর পর ফেসবুকের কল্যাণে আবারও সাইদুলকে খুঁজে পাওয়ার পর থেকে নিজের মধ্যে আমি লক্ষ করছি ভয়ানক অস্থিরতা। সাইদুল এখন দেশের বাইরে, বউ বাচ্চাসহ ইতালির মিলানো শহরে থাকে। ওর টাইমলাইন ঘেঁটে বুঝতে পেরেছি, আমার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবার পরপরই ইতালি চলে গিয়েছিল সাইদুল।

এতদিন পরেও নিজেকে প্রতারিত মনে হয়। সেই দিনগুলোতে বাসাবোতে সাইদুলের মেসে, ট্রেনে ট্রেনে জ্যাকেটধারী টিকেট চেকারদের কাছে বারবার, টঙ্গীতে তার ঢাকার দিকের টাকা ভাঙানোর দোকান আর চট্টগ্রামের দিকে ফেনী ও সীতাকুণ্ডে তার টাকা ভাঙানোর দোকানসহ একদিনের চট্টগ্রামে কাটানো ছুটির দিনে যেখানে সে থাকত, সম্ভাব্য সবখানেই সাইদুলকে আমি খুঁজেছি। কেউই বিক্রমপুরে সাইদুলের বসত বাড়ির ঠিকানা জানত না। টিকেট চেকারদের বস সবুজ ভাইকে অনেক অনুরোধ করে সাইদুলকে যিনি চাকরি দিয়েছিলেন, বেসরকারিভাবে পরিচালিত কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনের সেই ম্যানেজার গোছের লোকটার কাছেও আমি গিয়েছিলাম। গিয়ে জানতে পারি তিনিও সরাসরি সাইদুলের পরিচিত না। জানতে পারি, শুধু আমিই না, সাইদুলের খোঁজে আরো অনেক মেয়েই নাকি তাকে বিরক্ত করে যাচ্ছে। এর মধ্যে পরিবার পরিজন নিয়ে এসেছে দুইজন। তবে কাউকেই তিনি যা দেন নি, অজ্ঞাত যোগ্যতায় আমি তা পাই। ম্যানেজার গোছের লোকটা আমাকে দেন রেলবিটের সেই সাংবাদিকের ঠিকানা, যার অনুরোধে সাইদুলকে তিনি টিকেট চেকারির চাকরিটা দিয়েছিলেন।

পত্রিকা অফিসে গিয়ে রেলবিটের সেই সাংবাদিককে খুঁজে বের করার পর সুদূর নরসিংদী থেকে এসেছি শুনে এবং সাইদুলকে খুঁজছি জেনে তিনি আমাকে সারাদিন তার পাশের একটা খালি ডেস্কে বসিয়ে রাখেন। বিকালে আমাকেসহ অফিস থেকে নামতে নামতে ভালো করে চেপে ধরেন, উল্টো আমার কাছেই সাইদুলের কোনো খবর আছে কিনা জানতে চান। ‘সে কী!’ অবাক হই আমি, ‘আমার কাছে খবর থাকলে আমি কি আপনার কাছে আসতাম?’ এবং বিরক্ত হই, ‘অকারণে সারাদিন বসিয়ে রাখলেন, প্রথমেই বলে দিলেন না কেন!’ কিন্তু এ কথার জবাবে রেলবিটের সাংবাদিক অগ্নিমূর্তি ধারণ করে ‘তাকে চিনি কিনা, তার পাওয়ার সম্পর্কে আমার ধারণা আছে কিনা’ এ ধরনের প্রশ্ন ও হম্বিতম্বি শুরু করেন। শেষমেশ জানান, আমাকে এখনই তার সঙ্গে একটু থানায় যেতে হবে। ‘মানে কী?’ সিঁড়িতে থেমে গিয়ে আমি চিৎকার করি, কিন্তু রেলবিটের সাংবাদিকের একই কথা। নিশ্চয়ই আমি সাইদুলের ব্যাপারে জানি, আর একমাত্র আমিই পারি সাইদুলের ধার নেওয়া তিরিশ হাজার টাকা আবার তাকে ফেরত পাইয়ে দিতে।

কী ধরনের জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছি, বুঝতে বাকি থাকে না। রেলবিটের সাংবাদিক থানার বদলে আমাকে বনশ্রীর একটা ফ্ল্যাটবাসায় নিয়ে যান। পত্রিকা অফিসের সিঁড়ি থেকে কাঁদতে শুরু করায় এবং সহসা সেটা থেমে যাবে এমন কোনো সম্ভাবনা দেখতে না পেয়ে পথেই ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন সাংবাদিক, ‘ভয় নাই, টাকাটা সাইদুল আমার কাছ থেকে নেয় নাই, যার কাছ থেকে নিছে আপনাকে তার কাছেই নিয়ে যাচ্ছি।’ রেলবিটের সাংবাদিকের এক বান্ধবীর ফ্ল্যাট। বান্ধবী সাংবাদিকের ওপর খুবই বিরক্ত হয় আমাকে এভাবে ধরে আনার জন্য। ‘তোমরা তো জরিমানা দিতে শুরুই করেছ, এখন আবার এসব ঝামেলা কেন?’ আমি বিষয় কিছুই বুঝতে না পেরে সম্ভব হলে ঘটনাটা আমাকে খুলে বলার প্রস্তাব দিই।

কোনোরকম দ্বিধা সংকোচ ছাড়াই বান্ধবী জানায়, সে ভাড়া খাটে। নিজের ভাড়া করা ফ্ল্যাটেই। রেলবিটের সাংবাদিকই একদিন সাইদুলকে তার কাছে নিয়ে আসে। নিয়মিত শারীরিক সম্পর্কের বাইরে, বান্ধবীই প্রথম সাইদুলের প্রতি অন্যরকম টান অনুভব করে। আর সেটারই সুযোগ নিয়ে উধাও হওয়ার কয়েকদিন আগে বান্ধবীর কাছ থেকে তিরিশ হাজার টাকা ধার করে সাইদুল। এমন ঘটনার পর থেকে ভাড়া খাটা বান্ধবী রেলবিটের সাংবাদিকসহ সকল সাংবাদিকের জন্য দশ পার্সেন্ট রেট বাড়িয়ে দেয়। বান্ধবীর যুক্তি, টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর মার্কিনিরা যদি ক্ষতিপূরণ বাবদ বিমান ভাড়া বাড়াতে পারে, সেও পারে সাংবাদিকদের কাছে তার রেট বাড়াতে।


শুধু এটুকুই জানায় সাইদুল, ‘আমি একটা খুনের মামলায় ফেঁসে গেছি।’ বিহ্বল আমি মরিয়া হয়ে জানতে চাই, ‘তুমি খুন করো নি তো, তাই না?’


অকাট্য এই যুক্তি আর বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা নিয়ে, সর্বোপরি সাইদুলকে খুঁজতে থাকার এক অর্থহীন কর্মযজ্ঞ স্থগিত করে নরসিংদী ফিরি। বিমান বন্দর রেলস্টেশন থেকে তিতাস এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠি। সাইদুলসহ কয়েকবার এই ট্রেনে উঠেছিলাম, কর্ণফুলীর মতো এটাও বেসরকারি। সিটে গিয়ে বসতেই অনেক পকেটের জ্যাকেটওয়ালা তরুণ সামনে এসে দাঁড়ায়। টিকেটের মধ্যে কলম তাক করে জিগ্যেস করে, ‘কোথায় যাবেন?’ আমি ‘নরসিংদী’ বললে তরুণ টিকেট চেকার বলে ওঠে, ‘আরে আপা, আপনি! আপনার জন্য টিকেট লাগবে না।’ সাউন্ড করে বগিতে থাকা অপর টিকেট চেকারকে আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বলে, ‘সাইদুল ভাইয়ের ওয়াইফ।’ বেসরকারিভাবে পরিচালিত ট্রেনগুলোতে সাইদুলের ওয়াইফ হিশেবে আমার একটা পরিচিতি হয়ে গেছিল। দিনের পর দিন সাইদুলের সঙ্গে ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বেড়ানো এর কারণ। এসব নিয়ে নিয়মিতই মায়ের আজেবাজে কল্পনাশক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটত। তবে শুরুতে আপত্তি তুললেও দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি সাহিত্যের পাঠক হিশেবে এক পর্যায়ে চুপ মেরে যান চাচা।

লোকাল ট্রেন হিশেবে ছোট বড় প্রায় সব স্টেশনেই থামে সাইদুলদের ট্রেন। ছোট ছোট, এমনকি কোনো কোনো লোডশেডিং চলতে থাকা অখ্যাত স্টেশনে অন্য ট্রেনের সঙ্গে ক্রসিং পড়ে যখন, বগি থেকে বেরিয়ে সাইদুলের সঙ্গে আশেপাশের টং দোকান খুঁজে চা খেতে বসে যাই। এমন সব অখ্যাত স্টেশনের আজেবাজে চা খাওয়ার মধ্যেই খুঁজে পাই স্বর্গীয় আনন্দ। যদিও অনেক চাই, সাইদুল কিছুতেই রাজি হয় না, একবার অন্তত ট্রেনের ছাদে উঠার শখ আমার। স্টেশনের প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছাদের ওপর সাইদুুলের চলাফেরা দেখতে ম্যাজিক্যাল লাগে। টিকেটের জন্য যাত্রীদের সঙ্গে ঝগড়া করতে হয় ওকে। সবারই ধারণা, লোকাল ট্রেনে চড়তে আবার টিকেট কিসের! শাশ্বত এই ধারণার বিপরীতে সাইদুলকে ব্যাখ্যা করতে হয় যে এটা একটা বেসরকারি ট্রেন, এখানে টাকা না দিয়ে ভ্রমণ করার কোনো ব্যবস্থা নাই। মালিক পক্ষ খুবই কড়া। শুনে যাত্রীরা খুব বিরক্ত, ট্রেন কেন বেসরকারি হয়ে যাচ্ছে? পুঁজিবাদ কি সব খেয়ে ফেলছে? ইত্যাদি প্রসঙ্গে ভাসা ভাসা উদ্বিগ্ন সব কথাবার্তা সারা বগিতে ছড়িয়ে পড়ে।

আর তখন সাইদুল তাদের ভর্ৎসনা করে এই বলে যে, সরকারি থাকা অবস্থায় যদি মাঝেমাঝে টিকেট করতেন তাহলে আর বেসরকারি হতো না। বেসরকারি এই কঠিন নিয়মের ট্রেনে একমাত্র টিকেটছাড়া যাত্রী আমি। টিকেট চেকারদের বস সবুজ ভাই অডিটে এসে সবাইকে যার যার টিকেট হাতে নিতে বললে। বেরিয়ে আসে দুয়েকজন দুর্নীতিপরায়ণ যাত্রী, যারা কম দূরত্বের টিকেট কিনে পাড়ি দিচ্ছে বেশি দূরত্বের পথ। সবুজ ভাই তাদের শাস্তি নির্ধারণ করেন পরের স্টেশনে নেমে যাওয়া। বাধ্য হয়ে দুর্নীতিপরায়ণ যাত্রীরা ন্যায্য ভাড়ার পাশাপাশি জরিমানা দিয়ে অপমানজনক শাস্তি এড়ায়। তবে কোনো বগিতে এরকম যাত্রী পাওয়াটা একই সঙ্গে দায়িত্বরত টিকেট চেকারদের জন্যেও শাস্তিযোগ্য। কেননা কোনো যাত্রী অল্প ভাড়ার টিকেট কিনে বেশি দূরত্ব পাড়ি দিচ্ছে কিনা এটা দেখে রাখাও তাদেরই কাজ।

সেদিন সাইদুলের বগিতে এরকম দুয়েকজন যাত্রী শনাক্ত হলে টিকেট চেকারদের বস সবুজ ভাই এমনকি আমাকে জড়িয়ে সাইদুলকে আজেবাজে কথা শোনান। জবাবে সাইদুল ক্ষেপে গেলে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের পাশাপাশি দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি পর্যন্ত হয়। স্বাভাবিকভাবে এ ঘটনায় যারপরনাই বিব্রত হই আমি আর সিদ্ধান্ত নিই পরের স্টেশনে নেমে যাব। সাইদুলও আমাকে সাপোর্ট দেয়, সেও ঘোষণা করে, সেও এই বালের চাকরি আর করবে না। বিক্রমপুরে তাদের প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার গরম দেখিয়ে সাইদুল বলে, ‘সময় মতো দেখা হলে তুই সবুজ আমার সঙ্গে দেখা করারই সিডিউল পাইতি না।’

এ থেকে বোঝা যায়, সময় খারাপ বলে বিক্রমপুরের প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা ছেড়ে সাইদুলকে দূরে এসে অন্য কিছু করতে হচ্ছে। কিন্তু সময় কেন খারাপ, ভালো সময়ের সাইদুলকে আমি চিনতে পারব তো? পরবর্তী স্টপেজ গঙ্গাসাগরে আমরা নেমে যাই। সাইদুল তার অনেক পকেটের জ্যাকেট খুলে সবুজ ভাইয়ের গায়ে ছুড়ে ফেলে। ট্রেন চলে গেলে সন্ধ্যার ফাঁকা গঙ্গাসাগর স্টেশনে আমরা একদম একা পড়ে যাই। স্টেশনটা অল্প উঁচু মতো জায়গায়, নাকি পেছনে বিশাল গঙ্গাসাগর দিঘি খানিকটা ঢালুভাবে নিচের দিকে নেমে যাওয়ার এমন লাগে, হঠাৎ সেটা বোঝা যায় না। অপর পাশে সমতল ভূমি, ধানক্ষেত। অদূরেই ভারতীয় সীমান্ত। ফলে আমরা যখন পরবর্তী ট্রেন কখন আসবে জানতে স্টেশন মাস্টারের রুমে যাই, সেখানে আয়েশি ভঙ্গিতে পান খেতে থাকা এক বিডিআর সদস্যকেও বসে থাকতে দেখি।

স্টেশনমাস্টার জানায় কিছুক্ষণ পরেই পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের সঙ্গে ক্রসিং, ঢাকাগামী উপকূল এক্সপ্রেস গঙ্গাসাগরে থামবে। যদিও অননুমোদিত স্টপেজ, তাও স্টেশন মাস্টার অভয় দেন, অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে তিনি এর একটা বিহিত করে দেবেন। বাধ সাধেন পান খাওয়া বিডিআর। তার মতে আমরা ভারতীয় বর্ডার ক্রস করে বাংলাদেশে ঢুকেছি। তার আন্তরিক ইচ্ছা, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে যাবেন। সাইদুল বলে, ‘আমরা ভারতীয় হলে আমাদের ভারতে ফেরত পাঠান, বাংলাদেশে আর ভালো লাগে না।’ আমি জিগ্যেস করলাম, ‘বাংলাদেশে সমস্যা কী?’ সাইদুল বলে, ‘এখানে ভিন্নমতের মানুষদের সহ্য করা হয় না। থাকতে দেওয়া হয় না।’ আমি ঘটনা কিছুই বুঝতে পারি না। কিন্তু এই কনভার্সেশনে বিডিআর ম্যানেজ হয়ে যান। এনি হাউ তিনি বুঝতে পারেন আমরা আসলে বাংলাদেশেরই। ফলে তিনি বেশি কিছু না, পান খাওয়ার জন্য তাকে এক শো টাকা দিতে বলেন। আমি ব্যাগ থেকে বের করে এক শো টাকা দিয়ে বিডিআর সদস্যের কাছ থেকে একটা পান চেয়ে নিই। সাইদুল বলে, ‘তুমি পান খাও নাকি?’ আমার মনে হয় পান খাওয়ার মধ্যদিয়ে আমি হয়তো একটা বউ বউ পরিবেশ ঘনিয়ে আনতে পারব নিজের মধ্যে।

সাইদুল অনেক সিগারেট খায়, এমনকি মাঝেমধ্যে গাঁজাও। বলে, ‘কাজের ফাঁকে আগার মধ্যে একটু নিয়ে মেরে দেওয়া।’ পদ্ধতিটা ভালো, কেউ কিছু বুঝতে পারার আগেই গন্ধের উৎসটুকু টানা হয়ে যেত সাইদুলের। আমাকে পান খেতে দেখে উশখুশ শুরু করলে সাইদুলের মনোবাসনা বুঝতে অসুবিধা হয় না আমার। ট্রেন আসতে এখনো কিছুক্ষণ সময় বাকি জেনে আমরা স্টেশনের পেছনে গঙ্গাসাগর দিঘির পাড়ে নেমে গিয়ে ঘাসের মধ্যে বসি। প্রস্তুতি দেখে বুঝি আগার মধ্যে না মেরে হাফটা স্টিক বানিয়েই খেতে চায় সাইদুল। বানানো হয়ে গেলে বলি, ‘আমি টেনে দিই?’ অবাক হয়ে সাইদুল ম্যাচ এগিয়ে ধরে জিগ্যেস করে, ‘পারো? সিগারেট টানার অভিজ্ঞতা আছে?’ বলি, ‘পারি তো, চাচার সঙ্গে খাই মাঝেমধ্যে।’ গোটা কয় টান দেওয়ার পর গঙ্গাসাগর দিঘিটা একটা মস্তবড় আয়না হয়ে আমাকে দেখায় নেমে যাওয়া সন্ধ্যার এক অল্প না-নামা প্রতিবিম্ব। ‘দ্যাখো সাইদুল সন্ধ্যাটা কিন্তু অল্প একটু এখনো নামে নাই।’ তারপর খুব ধরে। অনেকক্ষণ গঙ্গাসাগর দিঘির কিনারে পড়ে থাকি। ট্রেন আসলে সাইদুল আমাকে ডেকে ডেকে হয়রান হয়। আমি শুধু বলে চলি, ‘আর কখনো খাবো না। এইবারের মতো উদ্ধার করো খোদা।’ আমাকে স্টেশন পর্যন্ত টেনে তোলে সাইদুল।

জেগে উঠে দেখি ট্রেন আশুগঞ্জ স্টেশনে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সাইদুল আমাকে জাগতে দেখে জানালার কাছে এগিয়ে আসে। ‘কতক্ষণ ঘুমালাম?’ জিগ্যেস করলে সাইদুল জানায়, ‘বেশি না, দেড় ঘণ্টার মতো।’ জিগ্যেস করি, ‘চাকরিটা থাকবে তো?’ পাত্তাই দেয় না সাইদুল, বলে, ‘তুমি আসলে কিছুই জানো না, এরকম একটা চাকরির পরোয়া সাইদুল কখনোই করে না। শুধু সময় খারাপ জন্য…’ আমি সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করে বসি, ‘সময় খারাপ কেন? বিক্রমপুরে যাও না কেন তুমি?’ সেদিনই, বিস্তারিত না বলে শুধু এটুকুই জানায় সাইদুল, ‘আমি একটা খুনের মামলায় ফেঁসে গেছি।’ বিহ্বল আমি মরিয়া হয়ে জানতে চাই, ‘তুমি খুন করো নি তো, তাই না?’ তা করে নি। রাজনৈতিক মামলায় তাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে মাত্র। বলে, মামলা দ্রুতই নিষ্পত্তির পথে। অনেক টাকা পয়সা নাকি ঢালা হয়েছে। ট্রেন চলতে শুরু করলে আমি সাইদুলের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিতেই পুলিশের একটা তল্লাশি দল এসে আমাদের মধ্যে সম্পর্ক কী, কোথায় যাচ্ছি ইত্যাদি প্রশ্ন করতে থাকে।

আমাকে ওয়াইফ হিশেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে সাইদুল তাদের বলে, ‘আমরা ঢাকা যাচ্ছি।’ কিন্তু পুলিশের দলটি অবগত আছে আমরা গঙ্গাসাগর স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠেছি। সীমান্তবর্তী স্টেশন জন্য চোরাকারবারি সন্দেহে আমাদের তল্লাশী করতে চায়। আর তল্লাশি করতে গিয়ে সাইদুলের পকেট থেকে তারা উদ্ধার করে কিয়ৎপরিমাণ গাঁজা। সাইদুল বারবার বলে এটা তার নিজের ব্যবহারের জন্য, চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত থাকলে গাঁজার পরিমাণ অনেক বেশি হতো। কিন্তু তল্লাশি দল তা মানে না। তাদের মতে, এটুকু গাঁজা হলো স্যাম্পল। নিশ্চয়ই সে কোনো বড় গাঁজা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। ইত্যাকার অভিযোগে সাইদুলকে তারা তুলে নিয়ে যায় অন্য কামরায়। সাইদুল বারবারই পুলিশের ভ্রাম্যমাণ দলটিকে আমাকে নরসিংদী স্টেশনে নামিয়ে দিতে অনুরোধ করে। কিন্তু তারা কিছুতেই ভেবে পায় না স্টপেজ না থাকা স্টেশনে কী করে তারা ট্রেন থামিয়ে আমাকে নামিয়ে দেবে। এবং তারা প্রশ্ন তোলে যে, আমাদের তো ঢাকায় যাওয়ার কথা, তাহলে আমি এখন নরসিংদী নেমে যেতে চাচ্ছি কেন। সাইদুল তাদের বোঝায়, সে নিজে যখন পুলিশের হাতে আটক, ঢাকায় না গিয়ে নরসিংদীতে নামিয়ে দিলে আমি আমার বাড়ি চলে যেতে পারি।


আমারও প্রেম (আবারও মরবার চেষ্টা), বিয়ে, সন্তানাদি আর অল্পবিস্তর প্রতিষ্ঠাও হয়েছে।


মেঘনা ব্রিজ পেছনে ফেলে না থামা ভৈরব জংশন পার হতে থাকে উপকূল এক্সপ্রেস। আমিও পুলিশের দলটিকে অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে একের পর এক কামরা পার হতে থাকি। খাবার গাড়িতে এসে সাইদুলসহ পুলিশের দলটির দেখা মেলে। ততক্ষণে পুলিশের আরো বড় অফিসারের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে, দুয়েকটা লাথি গুঁতো খেয়ে বিমর্ষ হয়ে পড়েছে সাইদুল। আমাকে দেখে, আমি কেন এখানে এসেছি, জিগ্যেস করে। উপায় বাতলে দেয়, হাতে দুই শো টাকা রেখে যেন নরসিংদী স্টেশন পার হওয়ার সময় শিকল টান দিই। ‘গাড়ি থামাইতে শিকল টানুন, অযথা টানিলে ২০০ টাকা দণ্ড’ লেখাটা বিভিন্ন সময় আমার চোখে পড়েছে। কিন্তু টান দিলে এই শিকল সত্যিই কাজ করে কিনা, থামে কিনা ট্রেন, নিশ্চিত না। এক পুলিশ সদস্য ব্যাপারটা নিয়ে কৌতুক করে বলে, শিকল টেনে কোনো লাভ নাই। ট্রেন থামাতে হলে ছাদের ওপর থেকে হাওয়া ছেড়ে দিতে হবে। ছাদের ওপর থেকে ট্রেনের হাওয়া ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু সাইদুল বলে, অনুমতি পেলে সে হাওয়া ছাড়ার চেষ্টা করতে পারে। তখন আরেক পুলিশ সদস্য বলে ওঠে, ‘দেখলেন তো! চলতি ট্রেনের ছাদে উঠে হাওয়া ছাড়তে চায়। কত বড় চোরাকারবারি!’ যেহেতু চোরাকারবারিরা যেখানে সেখানে ট্রেন থামিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু বিশেষ এই দক্ষতার পেছনে সাইদুলের ব্যাকগ্রাউন্ড যে অন্য, চোখের ইশারায় আমাকে সেটা জানাতে নিষেধ করে সাইদুল। এর মধ্যে হঠাৎই পুলিশ অফিসার সিদ্ধান্ত নেয় আমাকে নামিয়ে দেওয়া হবে নরসিংদী স্টেশনে। তবে নামানোর আগে সে বারবার করে জানতে চায়, আসলেই আমি সাইদুলের বিবাহিত ওয়াইফ কিনা।

পুলিশ অফিসারের তৎপরতায় স্টপেজ না থাকা নরসিংদী স্টেশনে উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনটিকে দাঁড় করানো হয়। সাইদুল ছাড়া পেয়ে যোগাযোগ করবে বলে আমাকে বিদায় জানায়। আমি বুঝতে পারি, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসা ঠেকাতে সাধারণ চোরাকারবারি হিশেবেই আটক থাকতে চাইছে সাইদুল। ট্রেন থেকে নেমে এক নাম্বার লাইন পার হয়ে প্লাটফর্মে উঠার সময় জানি না কেন, তখনই মনে হয়, সাইদুলের সঙ্গে এটাই আমার শেষ দেখা। দু’দিন পর সাইদুল ছাড়া পেয়েছে জানিয়ে চাচার দোকানে একটা ফোন করে দেয়। তারপর ষোল বছর কেটে যায়।

এতদিন পর সাইদুলও বিনা দ্বিধায় নিজের সব অসত্য স্বীকার করে নিয়েছে। জানিয়েছে, আমার সঙ্গে পরিচয়ের আগে থেকেই বিক্রমপুরে তার স্ত্রী সন্তান ছিল। রাজনৈতিকভাবে ফাঁসানো মামলায় দেশ ছাড়ার আগে বাধ্য হয়ে কিছুদিন তাকে ট্রেনের চেকারি করতে হয়েছিল। বারবার দুঃখিত হয়ে সাইদুল জানায়, কর্ণফুলী ট্রেনে চাকরির সময়টাকে কখনোই সে সিরিয়াসলি নেয় নাই। আরো জানিয়েছে, মোটেই অশিক্ষিত না, জানলে হয়তো খুশিই হবেন চাচা, মিলানোর একটা কলেজে এখন ইতিহাস পড়ায় সাইদুল। আর আমি, এই ষোল বছর শুধু সাইদুলের স্মৃতি নিয়েই বেঁচে ছিলাম কিনা? মোটেই না। আমারও প্রেম (আবারও মরবার চেষ্টা), বিয়ে, সন্তানাদি আর অল্পবিস্তর প্রতিষ্ঠাও হয়েছে। শুধু একটা অবৈজ্ঞানিক সমস্যা এই যে, বেসরকারি ট্রেনে ট্রেনে ছড়িয়ে পড়া সেই খ্যাতির মোহ এখনো আমাকে পাগলের মতো টানে। এককালের সাইদুলের ওয়াইফ হিশেবে বিনা টিকেটে ট্রেন ভ্রমণের হারিয়ে ফেলা যে ক্ষমতা, রহস্যময় কারণে সেই ক্ষমতা আমার, আবারও খুব ফিরে পেতে ইচ্ছে করে।

Tanim Kabir

তানিম কবির

জন্ম ২৫ মার্চ, ফেনী।

প্রকাশিত বই :
ওই অর্থে [কবিতা, শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
সকলই সকল [কবিতা, শুদ্ধস্বর, ২০১৫]
মাই আমব্রেলা [কবিতা, আদর্শ, ২০১৬]
ইয়োলো ক্যাব [গল্প, ঐতিহ্য, ২০১৬]
ঘরপলায়নসমূহ [আত্মজীবনী, ঐতিহ্য, ২০১৭]

ই-মেইল : tanimkabir@gmail.com
Tanim Kabir