হোম গদ্য গল্প বিভ্রান্ত এক যুবক ও তার অতিজাগতিক ট্রেন

বিভ্রান্ত এক যুবক ও তার অতিজাগতিক ট্রেন

বিভ্রান্ত এক যুবক ও তার অতিজাগতিক ট্রেন
258
0

গুরুগম্ভীর শব্দটা ঠিক যেন বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়। বুকের ভেতর সারাক্ষণ এই গমগমে আওয়াজটা সে শুনতে পায় আজকাল। সবকিছু ভেঙেচুরে, সব মোহবন্ধন কাটিয়ে একটা ট্রেন কোথায় যেন ছুটে যেতে চায় সীমা ছাড়িয়ে, গণ্ডি ডিঙিয়ে। বুকের মধ্যে একটা লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে তোলে যেন। বড্ড বুক ধড়ফড় করে। এতদিনের সব মোহ, মায়া, বন্ধন, সংস্কার সবকিছু ভেঙেচুরে ফেলার, গুঁড়িয়ে দেয়ার দুর্মর একটা বাসনা তাকে তাড়া করে ফেরে ভীষণ। কে যেন অবিরাম গমগমে শব্দটার সাথে তাল মিলিয়ে বলতে থাকে—বেরিয়ে পড়! অংকন! বেরিয়ে পড়!

স্টেশন জায়গাটা এত অদ্ভুত সেটা আগে কোনোদিন বুঝতে পারে নি অংকন। জায়গাটা তার কাছে এতকাল স্রেফ একটা স্টেশনই ছিল। গন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যে যেখানে মানুষ ক্ষণকাল অপেক্ষায় থাকে। ট্রেন এসে দাঁড়ায়। অপেক্ষমাণ যাত্রীরা পড়িমরি করে উঠে পড়ে, কিছু মানুষ নামে। নামে যারা তারা ব্যস্ত হয়ে ছুটে যায় যে যার গন্তব্যে। মুহূর্তকাল পরেই ফাঁকা হয়ে যায় জায়গাটা। নীরব, নিথর পড়ে থাকে শূন্য প্ল্যাটফর্ম, প্রহর গোনে পরবর্তী কোনো ট্রেনের। চেনা এ দৃশ্যের অন্তরালেও যে থাকে আরও হাজারও দৃশ্য, থাকে আরও হাজারও প্রতিদৃশ্যের টিকা পাদটিকা সেসব অংকনের অজানাই ছিল এতকাল। বিস্ময় বিমুগ্ধ হয়ে সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে প্রতিটা দৃশ্য। অবাক হয়ে ভাবে জীবন সত্যিই কী বিচিত্র! অথচ এতদিন কী অন্ধ, অর্বাচীনের মতো একটা জীবন কাটছিল তার! কী অর্থহীন একটা জীবন!


বাবা উজ্জ্বল এক আলোকপিণ্ড হয়ে জ্বলছেন এই মুহূর্তে অনতিদূরে, ছড়িয়ে পড়ছেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে, এই কি তবে মুক্তি!


ঘুমন্ত অজগরের মতো পড়ে থাকে স্টেশনটা। স্পন্দনহীন, অসাড়। হঠাৎই আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে। ঢং ঢং ঘণ্টা বাজতেই গা ঝাড়া দেয়, নড়েচড়ে ওঠে। চোখ কচলে ক্ষুধার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে পথের দিকে। গম্ভীর শব্দ তুলে ট্রেনটা অবশেষে ঢুকে পড়ে স্টেশনের শূন্য উদরে। হুটোপুটি, চিৎকার, চেঁচামেচিতে ভরে ওঠে জায়গাটা। ট্রেনটাকে মুহূর্তে বুভুক্ষুর মতো গিলে ফেলে স্টেশনটা। আর তারপর যেন সহসাই ক্লান্ত, বিষণ্ণ, অবসন্ন হয়ে পড়ে। আচমকা বেশুমার উদরপূর্তির এই ধকলটা যেন সহ্য হয় না তার দীর্ঘক্ষণের অনাহারী, কৃশ পেটে। সশব্দে সে উগড়ে দেয় সদ্যাহারকৃত ট্রেনটিকে, সমুদয় যাত্রীসহ। কানফাটানো শব্দে ঢেকুর তুলতে তুলতে কিলবিলে ট্রেনটি অবশেষে স্টেশনের উদর থেকে সদ্যভূমিষ্ট গো শাবকের মতো টালমাটাল পায়ে এঁকেবেঁকে চলতে থাকে পুনরায়। প্রথমে সে যেন দ্বিধাগ্রস্ত থাকে কিছুটা। ক্ষণপরেই দ্বিধা কাটিয়ে, ঝিমিয়ে আসা শরীরটাতে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে সে ছুটে যায় দ্বিগ্বিদিক ভুলে ভীষণ গর্জন তুলে। তার উদরটিও তখন উপচে পড়ে পার্থিব নানাবিধ শব্দসম্ভার ও গোলযোগে, অসংখ্য যাত্রীর অস্থির প্রাণচাঞ্চল্যে। দুলতে দুলতে, ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এঁকেবেঁকে ট্রেনটা চলে যায় সমান্তরাল দুটো রেখায় ভর করে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য হয়ে ওঠে অংকনের। কী এক হাহাকার যেন গোঙিয়ে ওঠে বুকের খাঁচায়। তখন প্রবল ইচ্ছে জাগে সেও ছুটে যায় দিগ্বিদিক ভুলে। বাঁধন ছেঁড়ার, মায়া কাটার তীব্র ইচ্ছে তাকে ভেতরে ভেতরে যত বেশি পাগল করে তোলে বাইরে সে ক্রমশই তত বেশি অবশ, নির্জীব হয়ে ওঠে। সে ঝিম ধরে বসে থাকে, স্টেশনটার মতোই। বুকের মধ্যে তীব্র, দুরন্ত গতি তুলে একটা অস্থিরতার ট্রেন তখন চলতে থাকে তার এই ঝিম ধরা অবস্থানের সাথে সমান্তরালে। এই বৈপরীত্যের মোকাবেলায় অংকন বড় অসহায় বোধ করে তখন। বড় বেসামাল লাগে তার। কিন্তু স্টেশন আর ট্রেন দুইই তাকে চুম্বকের মতো টানে। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ছুটে আসে এখানে। ঠায় বসে থাকে। খিদে পেলে উল্টোপাশের ঝাঁপতোলা, খুপরি দোকানগুলোর কোনো একটাতে গিয়ে ডালপুরি খায়। খুব খিদে পেলে সবজি আর ডাল দিয়ে ভাত। খিদে তার অবশ্য খুব একটা পায় না আজকাল। পকেটের অবস্থা করুণ।

বাবার শেষকৃত্যের দৃশ্যটা মনে পড়ে। তার বাবা! তার আলাভোলা ভালোমানুষ বাবাটা মুহূর্তেই কেমন দাউদাউ জ্বলে উঠছিল। অংকন অল্পদূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল সে দৃশ্য। কেমন পটপট শব্দ উঠছিল বাবার চিতা থেকে! লাফিয়ে উঠছিল লকলকে অগ্নিশিখা! অবাক ব্যাপার হলো অংকনের মধ্যে তেমন কোনো দুঃখবোধ-টোধ জাগে নি তখন। সে খুব বাধ্য ছেলের মতোই মুখাগ্নি করেছিল তার বাবার। যেন সে অমন কাজ প্রায়দিনই করে। তারপর বেশ একটু দূরে দাঁড়িয়ে কেমন অবাক অদ্ভুত চোখে দেখছিল একজন মানুষ মুহূর্তেই কেমন করে একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড হয়ে ওঠে। পুরুত ঠাকুরের মন্ত্রোচ্চারণ, আত্মীয়-স্বজনের বিলাপ ইত্যাকার শব্দ ছাপিয়ে অংকনের কানে কে জানে কেন হঠাৎই একটা গান বেজে উঠেছিল তখন! এমন নয় যে গানটা কেউ আশেপাশে গাইছিল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে অংকনের কানে (নাকি মনে?) অনবরত বাজছিল তখন! আর সে ভাবছিল, আচ্ছা, রবিবাবু কি তবে এই মুক্তির কথাই বলেছিলেন? এই যে তার বাবা উজ্জ্বল এক আলোকপিণ্ড হয়ে জ্বলছেন এই মুহূর্তে অনতিদূরে, ছড়িয়ে পড়ছেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে, এই কি তবে মুক্তি! এই কি তবে আলোয় আলোয় ছড়িয়ে যাওয়া! আচ্ছন্নের মতো সে তাকিয়েছিল জ্বলন্ত চিতার দিকে। কেমন একটু গা ছমছম করছিল তার। জ্বালা করছিল চোখ। সে নিজের অজান্তেই গুনগুন করে গাইছিল—

‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে
আমার মুক্তি তারায় তারায় ঘাসে ঘাসে’

বন্ধু বরুণ তখন বিস্মিত, অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন করেছিল, এই অংকন! কী বলছিস রে তুই ফিসফিস করে?

লজ্জা পেয়ে অংকন থেমে গেছিল তখনই। আর তারচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো সে হঠাৎ খেয়াল করেছিল যে সে আসলে কাঁদছিল এতক্ষণ। তার গণ্ডদেশ ভিজে উঠেছিল উষ্ণ, নোনা স্রোতে।

সেদিনের পর থেকে অংকনের মনে কেমন একটা নির্মোহ, উদাস ভাব এসে জায়গা জুড়ছিল। সবকিছুতে থেকেও কেমন বিচ্ছিন্ন, আলাদা ছিল সে। কিন্তু সে বিচ্ছিন্নতা ঠিক বৈরাগ্য ছিল না। ছিল সংসারে থেকেই সংসারের যাবতীয় পাক থেকে দূরে থাকা, ঝামেলা থেকে গা বাঁচিয়ে চলা। কেবলই মনে হতো সেও অমনি অগ্নিকুণ্ড হয়ে জ্বলে উঠবে অচিরেই।

আরও একটা ট্রেন আসে, চলেও যায় একটু পরেই। ফেলে যায় শূন্য স্টেশন, উগড়ে দিয়ে যায় কতিপয় যাত্রীকে মালসামানা সমেত। তুলে নেয় নতুন আরও অনেককে। অংকন বসে থাকে তেমনই অনড়, ভাবলেশহীন।

স্টেশনে সে সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি বসে থাকে আজকাল। কখনও-বা মাঝরাত অবধি। ইদানীং মনে হয়, মূলত জীবনকে উপলব্ধি করার, জীবনের নিগূঢ় অর্থটুকু বোঝার এরচেয়ে ভালো কোনো তীর্থস্থান, মোক্ষম কোনো পবিত্র জায়গা আর হয় না। স্টেশন একইভাবে জীবনকে ভালোবাসতে শেখায়, ঘৃণা করতে শেখায়, ভোগ করতে শেখায় সেই সাথে শেখায় ত্যাগের মহিমাও। এ যেন পৃথিবীর মধ্যেই লুকিয়ে থাকা আরেক পৃথিবী, জীবনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা অন্য জীবন।


কিন্তু মুক্তি কি আর সত্যি মেলে! আরও ট্রেন আছে যে! পরবর্তী সে ট্রেনের জন্য আবার চলে প্রস্তুতি।


ট্রেন আসার আগে আগে কী ভীষণ তোড়জোড় শুরু হয়! কী দারুণ উৎকণ্ঠা থাকে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের! গন্তব্যে পৌঁছানোর দুর্মর বাসনা তাড়া করে তাদেরকে। নিজেদের প্রয়োজনীয় বাক্স-পেটরা বেঁধে তারা চাতকের মতো পথ চেয়ে থাকে কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের। তারপর, ঘণ্টা বাজে ঢং ঢং! ভেঁপু বাজাতে বাজাতে, তারস্বরে চিৎকার করতে করতে হাজির হয় ট্রেন। কে কার আগে উঠবে শুরু হয়ে যায় সে প্রতিযোগিতা। চিৎকার, চেঁচামেচি, কোলাহল, ধাক্কাধাক্কি চলে কিছুক্ষণ। জীবন যেন ভীষণরকম সরব হয়ে ওঠে তখন, ভীষণরকম ঈর্ষাকাতর। জীবনের সকল রকম অস্থিরতা, উষ্ণতা, প্রতিযোগিতা, ক্ষুদ্রতা, নীচতা, শঠতা সব যেন মুহূর্তে স্থান করে নেয় স্টেশনের ঐ সামান্য প্লাটফর্মের ফ্রেমে। তারপর আবার সব নীরব, নিথর। ট্রেন চলে যায়। সাথে নিয়ে যায় জীবনের সব উষ্ণতা ও সরবতা, নিয়ে যায় সকল পঙ্কিলতার জরা। ঠিক তখনই বুকটা কেমন দুমড়ে মুচড়ে ওঠে। হু হু করে ওঠে মন। মনে হয় কোথাও একটা যাওয়ার আছে তার, আছে কোনো এক ভীষণ আপন আর চেনা গন্তব্য। কিন্তু কোথায় সে গন্তব্য, কী-ই বা ঠিকানা তার, সেটা আর মনে পড়ে না কিছুতেই। শুধু একটা ভয়ংকর অস্থিরতার ঢেউ আছড়ে পড়ে বুকের ভেতর, গুরুগম্ভীর আওয়াজ তুলে ছুটতে থাকে এক ভীষণ দ্রুতগামী পাগলা ট্রেন। কানের কাছে আছড়ে পড়ে কয়েকটা শব্দ, অংকন! বেরিয়ে পড়! বেরিয়ে পড়! মুক্তি!

কিন্তু মুক্তি কি আর সত্যি মেলে! আরও ট্রেন আছে যে! পরবর্তী সে ট্রেনের জন্য আবার চলে প্রস্তুতি। অন্ধ, পঙ্গু, অসুস্থ ভিখারিদের কলাই উঠা প্লেটে জমা হওয়া আধুলি আর ছেঁড়া, ময়লা, কাগুজে নোটগুলো ত্রস্তে এসে সরিয়ে নেয় তাদের তত্ত্বাবধায়ক শকুন চেহারার লোকটা। ধূর্ত চোখে আশেপাশে তাকিয়ে ভিখারিদের উদ্দেশে নিচুগলায় কিছু বলে আবার সে অদৃশ্য হয়ে যায়। কিছু দূরে সারি সারি বিছানা পেতে সংসার সাজিয়ে নেয়া মানুষগুলো এই ফাঁকে নিত্যকর্মে মন দেয়। কেউ স্টেশনের উল্টোপাশের রেল লাইনের ধার ঘেঁষে বসে পড়ে। মাটির তোলা উনুনে লাকড়ি গুঁজে ফুঁ দিয়ে আগুন জ্বেলে ভাত-তরকারি চড়ায়। দমকা দমকা উনুনের ধোঁয়ায় চোখ জ্বলায় ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠা কোলের শিশুটাকে অন্যহাতে আগলে রাখে বুকে, কেউ বা ধুলো-ময়লায় মাখামাখি সন্তানটাকে নিয়ে সোহাগে মাতে, কেউ বা মনের আহ্লাদে উকুন বাছতে বসে। এখানে আহ্লাদ খুব সহজে জুটে যায়। কান্নার মতোই। সন্ধ্যার দিকে এদের জীবন এক আশ্চর্য গতি পায়। ময়লায়, ধুলোয় মাখামাখি নারী শরীরগুলো যেন এক অদ্ভুত মায়াবলে বদলে যায়। উটকো কতগুলো লোক জুটে যায় আশেপাশে, দুর্গন্ধময় মাছির মতো। চোরের মতো এরা তখন আড়াল খোঁজে, আবডাল চায়। অনেক রাত পর্যন্ত এখানে থেকে দেখেছে অংকন। মফস্বলের এই ছোট্ট স্টেশনে রাতে অনেক মানুষ এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমোয়। এরই মধ্যে অনেকে যৌনকর্মেও মাতে। যেন ব্যাপারটা খুবই সহজ, স্বাভাবিক। জীবনের আর নানা স্বাভাবিক কর্মের মতোই। ক্ষুৎপিপাসা মেটাবার মতোই এও এক জরুরি প্রাত্যহিক কর্ম। পাশেই হয়তো ঘুমিয়ে আছে নিজেরই সন্তান, অথবা অন্যকেউ, কিংবা ঘুমোয় নি কেউই, জেগে আছে তখনও। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই কারও। জীবন। এও জীবনেরই অংশ! জীবনেরই অন্যপিঠ! অথচ এইসব জীবন, এইসব তুচ্ছ, সামান্য, শুঁয়াপোকার মতো গুটিয়ে থাকা জীবন অদেখাই ছিল এতদিন তার।

নিজের নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি এতটা নিখাদ হয়তো হতো না তার, যদি না সে এই স্টেশনের মায়ায় পড়ত। স্টেশন তাকে বেঁধেছে হঠাৎই। সে আসলে জানে না যে, এই যে নির্মোহ ভাবছে সে নিজেকে, ভাবছে সংসারের মায়া কেটে বেরিয়ে পড়বে, সে আসলে পড়েছে এক নতুন মায়াজালে! জীবন এখানে স্টেশনে রূপ নিয়েছে, সংসার পাল্টে গেছে ট্রেনে। এক মোহ থেকে বিকর্ষিত হয়ে অন্য মোহে আকর্ষিত হয়েছে সে সমানুপাতিক হারে।

স্টেশনে উদ্দেশ্যহীন বসে থাকতে থাকতেই একদিন হঠাৎ কী মনে হয় তার, সে উঠে বসে সদ্য এসে দাঁড়ানো যাত্রীতে টইটুম্বুর এক ট্রেনে। ভীষণ ভিড় সেদিন। সম্ভবত ঈদ বা এমন কোনো উপলক্ষ তখন। প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে, প্রায় মারামারি করে সে ঢুকে পড়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীলাইনে। টিকিট ছাড়াই। একসময় আবিষ্কার করে, সে উঠে পড়েছে ট্রেনে এবং ট্রেনের দুলুনিতে টের পায় চলতে শুরু করেছে ট্রেন। পায়ের কাছে কোনো মতে ঠেলেঠুলে বসার একটু জায়গা করে নিয়ে ঢুলতে শুরু করে অংকন। জীবন কতটা অর্থহীন আর অকারণ সে ভাবনা তার মস্তিষ্ক জুড়ে রীতিমতো ডালপালা ছড়াতে শুরু করে। ঠিক তখনই হঠাৎ শোরগোলে বিরক্ত হয়ে ওঠে সে। লাল চোখ মেলে তাকিয়ে সে শোরগোলের উৎস খোঁজার চেষ্টা করে, বুঝার চেষ্টা করে এমন তরো বিশৃঙ্খলার কারণ। সে দেখতে পায় কান্নায় ভেঙে পড়া এক মাকে, তীব্র অনুতাপে, অনুশোচনায়, বেদনায় মুষড়ে পড়া অসহায় এক বাবাকে। দেখতে পায় তাদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টারত যাত্রীদের সহানুভূতি-মাখা কোমল মুখাবয়ব। প্রচণ্ড ভিড়ে দিশেহারা হয়ে এই বাবা তার সন্তানকে জানালা দিয়ে তুলে দিয়েছে কোনো এক অপরিচিতের হাতে, তারপর নিজেরা ঠেলেঠুলে কোনোমতে উঠেছে ট্রেনে। এখন আর কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না নিজের সন্তানকে। যার কাছে সন্তানকে তুলে দিয়েছে প্রচণ্ড ভিড়ে আর তাড়াহুড়োয়, তার মুখটা পর্যন্ত দেখা হয় নি ভালো করে। পুরো পথে ডুকরে কাঁদতে থাকে মা, সন্তানের শোকে দুমড়ে মুচড়ে যেতে থাকে তার মন। উন্মাদ, পাগলের মতো ট্রেনের এ কামরা থেকে ও কামরা করতে থাকে বাবা আর কামরার সব যাত্রীরা সহমর্মিতা জানানোর পাশাপাশি এরকম শোনা আরও নানা কাহিনিতে রং চড়িয়ে পরিবেশনে ব্যস্ত হয়। অংকনের মনে মেঘ জমে ওঠে। থম ধরে বসে থাকে সে। তার মন বলে মূলত যে গন্তব্যে পৌঁছবে বলে এই ট্রেনে উঠে বসেছে সে, এই ট্রেন কোনোদিন সেখানে পৌঁছবে না। সে আদতে উঠে পড়েছে এক ভুল ট্রেনে। এ ট্রেন তাকে জাগতিক মোহবন্ধন কাটিয়ে পৌঁছে দেবে না কোনো পরাবাস্তব স্টেশনের প্লাটফর্মে। পরবর্তী স্টেশনে টুপ করে নেমে পড়ে ফিরতি ট্রেনে আবার সে এসে বসে তার চেনা, পরিচিত স্টেশনে। মাথাটা ভার হয়ে থাকে। সন্তানহারা মার মুখটা মনে পড়ে বারবার। মনে পড়ে বাবার অর্থহীন ছুটোছুটি। বুকের ভেতর অস্থিরতার ট্রেনটা কিলবিল করে। কানের কাছে সেই চেনা শব্দগুলো আছড়ে পড়ে অনবরত। মায়ার সুতো কেটে ভোঁকাট্টা হয়ে উড়ে যেতে ইচ্ছে করে ভীষণ। এই জীবন, এই স্টেশন, একটু পর পর তীব্র গর্জন তুলে হাজির হওয়া এক একটা ট্রেন সব অনিত্য মনে হয় তার। বুকের মধ্যে অনর্গল ছুটে চলা অস্থিরতার ট্রেন আর তার গুরুগম্ভীর শব্দটাকেই একমাত্র ধ্রুব বলে মনে হয়। অজানা কোনো গন্তব্য তাকে তীব্র গতিতে টানে।


আগুনে ঝলসে যাওয়া তিনটে শরীরের জন্য আবারও সাজাতে হলো চিতা। অংকন দূরে দাঁড়িয়ে আবারও দেখল আলোর মিছিল।


বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হালটা সে টানছিল ভালোই। দেশি একটা কোম্পানিতে মার্কেটিং এর কাজে বেশ ভালোই চলছিল মা আর অংকনের ছোট্ট সংসার। লতাকে বেশ পছন্দ ছিল মা, অংকন দুজনেরই। লতার পরিবারেরও অনিচ্ছে ছিল না খুব। হয়তো খুব শিগগিরই বিয়ে করে ফেলত তারা। কিন্তু বাদ সাধল ঐ আগুন। পঞ্চভুতের এক ভুত। গানটা আবার গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে অংকন।

অফিস শেষে ফিরতে বেশ রাত হতো তার। সেদিনও সে ফিরেছিল রাতে। সবে সে ঢুকেছে স্নানঘরে অমনি দমাদম কিল দরজায়, মার কান্নাজড়ানো কণ্ঠ, অংকন! বের হ! তাড়াতাড়ি বের হ!

ঘটনা সামান্যই। হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠেছিল লতাদের ঘরে। লতা, তার মা আর ছোটভাইটা তখন মাত্রই ঘুমিয়েছিল হয়তো। অংকন দৌড়ে গিয়ে দেখল লতাদের ঘরে দাউদাউ আগুন জ্বলছে, আর জ্বলন্ত সেই চিতা থেকে ছুটে বেরিয়ে আসছে তিন তিনটে মানুষের অবয়ব। সে অবয়ব ঢেকে গেছে আগুনের লেলিহান শিখায়। তারপরও চেনা যায়। চেনা গেল। লতা, তার মা আর তার ভাই পরেশ। লতার বাবা বাড়িতে ছিল না সেদিন। অংকন দেখল লতার ছোট্ট শরীরটা ভীষণ উজ্জ্বল আগুনে গলে পড়ছে, গলে পড়ছে তার মা আর ভাই পরেশের শরীর। তাদের গগন-বিদার চিৎকারও শুনল অংকন, শুনল আরও অনেকেই। সবাই চেষ্টা করে আগুন নেভাল, লতাদের শরীরের, বাড়ির। তবু আগুনে ঝলসে যাওয়া তিনটে শরীরের জন্য আবারও সাজাতে হলো চিতা। অংকন দূরে দাঁড়িয়ে আবারও দেখল আলোর মিছিল।

চাকরিটা নেই আর। অফিসে না গিয়ে স্টেশনে বসে সারাদিন সে মানুষ দেখে আজকাল। জীবন দেখে। কুলিদের কর্মব্যস্ততা দেখে, হকারদের হুটোপুটি দেখে, বাদাময়ালা, ঝালমুড়িয়ালার আনাগোনা দেখে। দেখে দেখে তার মনে হয় সময়ের বিশাল উদরে আটকা পড়ে কেমন খাবি খাচ্ছে এইসব বোকা মানুষগুলো! স্টেশনটা যেমন অনিচ্ছে সত্ত্বেও গিলে নেয় একেকটা ট্রেন, পরক্ষণেই আবার উগড়ে দেয় তীব্র বিবমিষায়, তেমনিভাবে সময়ও গিলে নেয় মানুষকে, আর তারপর উগড়ে দেয় অবহেলায়। সময়ের উদরে আটকে পড়া সামান্য এই ক্ষণটুকুই জীবন! এরই জন্য কী বিপুল আয়োজন মানুষের! কী বিশাল কর্মযজ্ঞ! উগড়ে দেয়া ট্রেনটা কোথায় যায়, কোথায় গিয়ে থামে, ট্রেনের যাত্রীরা তা জানে, নিজ নিজ গন্তব্যে নেমে পড়ে তারা। কিন্তু সময়ের উগড়ে দেয়া মানুষগুলো শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়? কোন গন্তব্যে ইতি টানে তারা এ নিরুদ্দেশ যাত্রার? অংকনের বুকের ভেতর অস্থিরতার ট্রেন ভীষণ গতিতে ছোটে, তীব্র শব্দ তুলে দৌড়ায়। স্টেশনের ট্রেন ছেড়ে গেলে বুকের ভেতরের ট্রেনটা কিলবিল করে ওঠে। তোলপাড় করে দেয় তার বোধের পৃথিবী। কেমন এক শূন্যতা, সীমাহীন হাহাকার পাখা মেলে দেয়। মনে হয়  চূড়ান্ত কোনো এক গন্তব্য তাকে ভীষণভাবে টানে, সেও ছুটে যেতে চায়। কিন্তু পথ চেনে না, ঠিকানা জানে না। আর তাই সে প্রতিদিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো এসে বসে থাকে মফস্বলের নোংরা, কোলাহলময় এক স্টেশনে। দেখে প্রতিদিনের ট্রেনের আসা-যাওয়া। তার মনে হয় কোনো একদিন তার কাঙ্ক্ষিত ট্রেনটিও ঠিক এসে দাঁড়াবে এখানে। সে ট্রেনে শুধু সেই সওয়ার হবে। ঘণ্টা বাজবে, গম্ভীর, গমগমে আওয়াজ তুলে ছুটে যাবে সে ট্রেন, ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে সে হাসিমুখে হাত নেড়ে বিদায় জানাবে সময়কে, জীবনকে। আলোময় পথে সে তখন গলা ছেড়ে গাইবে ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে…’

যেমন ইতঃপূর্বে বিদায় জানিয়েছে সময়ের পেট থেকে উগরে যাওয়া পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ। মাঝে মাঝে নিজেকেই তার আস্ত একটা স্টেশন মনে হয়, আবার কখনও মনে হয় ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত সামান্য এক যাত্রী, হঠাৎ হঠাৎ আবার মনে হয় সে নিজেই প্রচণ্ড গতিময় এক ট্রেন! তুমুল গতিতে যে ছুটে চলেছে কোনো এক অতিজাগতিক স্টেশন বরাবর… যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে অনন্ত বিস্ময়, অপার মুগ্ধতা! মফস্বলের কোনো এক অখ্যাত, নোংরা, স্টেশনে বসে আকাশ পাতাল এসব ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে বসে থাকে অংকন। উৎকর্ণ, অধীর হয়ে অপেক্ষা করে আকাঙ্ক্ষিত একটি ট্রেনের, স্টেশন কাঁপিয়ে, গুরুগম্ভীর শব্দ তুলে যে ট্রেন হাজির হবে একদিন অকস্মাৎ। অংকনকে পৌঁছে দেবে গন্তব্যে।

শিল্পী নাজনীন

শিল্পী নাজনীন

জন্ম ১৪ জুলাই, ১৯৮১; কুষ্টিয়া। কবি, কথাচিত্রী।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই :
ছিন্নডানার ফড়িঙ [উপন্যাস, কাা বুকস, ২০১৬]
আদম গন্দম ও অন্যান্য [গল্পগ্রন্থ, ছিন্নপত্র প্রকাশনী, ২০১৭]
তোতন তোতন ডাক পাড়ি [শিশুতোষ গল্প, ছিন্নপত্র প্রকাশনী, ২০১৭]

ই-মেইল : 81naznin@gmail.com
শিল্পী নাজনীন