হোম গদ্য গল্প বাবার কৃচ্ছতা সাধন

বাবার কৃচ্ছতা সাধন

বাবার কৃচ্ছতা সাধন
454
0
11068037_920522861326169_793579576_o
অলংকরণ : সারাজাত সৌম

শীত জেঁকে বসেছে। গত কদিন থেকে হিমালয় থেকে আসা কনকনে উত্তরে হিমেল হাওয়া বইতে থাকায় তাপমাত্রা নিচে নেমে গিয়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। একান্ত প্রয়োজন না হলে ঘরদোর ছেড়ে কেউ সন্ধ্যারাতে প্রায় জনমানবহীন চরাচরে বেরুচ্ছে না।
বাবা আজ আয়েশ করে বসে মুখে মুড়ি দিতে দিতে চা খাচ্ছেন। বাবার চা খাওয়ার ভাব-ভঙ্গি দেখে আপা নিশ্চিত হয়ে গেছে, বাবা আজ বেরুচ্ছেন না।আমরাও চা খাচ্ছি, তবে আমি লুকিয়ে। মেজবু, মণিবু আর মা খাটে বসে মুড়ি দিয়ে চা খাচ্ছে। বাবা আমায় চা খেতে দেন না। বলেন, ‘ছোটদের চা খেতে নেই।’ তাই লুকিয়ে চা খাচ্ছি। আপা এসবে নেই। ও পাটালি গুড় দিয়ে মুড়ি খাচ্ছে।
পাশের ঘরে খলিল চাচা আসার আওয়াজ শোনা গেল।
খলিল চাচা পুলিশের সুবাদার। মনে হয়, ডিউটি থেকে ফিরছেন। আজ বড় জলদি এলেন। রাত-বিরাতে যখন ফেরেন, মদে তখন চুর হয়ে থাকেন। চাচিও কম যান না। তেঁতুল গুলে খাইয়ে দেন। নেশাগ্রস্ততা কেটে যায়।

বিহারি কিশোররা খলিল চাচাকে যমের মতো ভয় করে। তাঁকে দেখলেই ‘খলিল সুবাদার আরাহাহে, খলিল সুবাদার আরাহাহে’ বলে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। চাচাও খাস উর্দু জবানে যখন ‘আবে সালা সুয়ার…’ অশ্লীল গালি উচ্চারণ করে এগিয়ে যান, তখন তাদের পালিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকে না।

● আমাকে দেখে বলল, ‘আবে সালা বাঙালি ভুত।’ ●

বিহারিরা এখন চুপসে গেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের নৃশংসতা এই শহরের লোকেরা প্রত্যক্ষ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস পাক সেনা আর দেশিয় দালালদের সঙ্গী হয়ে এই শহরটা তারা নিয়ন্ত্রণ করেছে। হেন কোনো অপকর্ম নেই যা তারা সবাই মিলে করে নি। আমরা এখন যে বাড়িটায় অবস্থান করছি, এ বাড়িরই মালিকের বৃদ্ধ বাবা-মা এবং তাদের দুজন কিশোর নাতিকে কুয়োয় জ্যান্ত ফেলে উপর থেকে ইট ছুড়ে হত্যা করেছে। কী পাশবিকতা!
বাবার আওয়াজ শোনা গেল।
‘চা খেয়েছ, এখন সবাই পড়তে বস।’

বাবা বলার আগেই পড়তে বসেছি।
এমনিতে আজ সকালবেলা স্কুলে যাওয়ার সময় গণ্ডগোল করেছি। এক বিহারি ছেলেকে বেধড়ক পিটিয়েছি। দোষটা অবশ্য আমার না। যাচ্ছিলাম স্কুলে, চিটাগাং রেস্টুরেন্টের সামনে পৌঁছতেই ফয়সাল (যার সঙ্গে আমার পূর্ব শত্রুতা ছিল) আমাকে দেখে বলল, ‘আবে সালা বাঙালি ভুত।’ মেজাজ গেল খিঁচড়ে। দিলাম কয়েকটা ঘুষি। দেখি, দৌড়ে গিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে চেলাকাঠ নিয়ে এল। ততক্ষণে মকবুল এসে যোগ দিয়েছে। দুবন্ধু মিলে দিলাম বেধড়ক পিটুনি। তারপর বললাম,
‘বিহারিকা ভুত, খাটিয়ামে সুত।
খাটিয়ামে আগ লাগে, ধড়পড়াকে উঠ ।’
বাবার ডাক শোনা গেল । ‘টিংকু এদিকে আয় ।’
এই সেরেছে। বুক ধড়ফড় করে উঠল। ভয়ে বুকে থুথু দিলাম।
‘কী হয়েছিল? বলতো ।’
আকলমন্দকে লিয়ে ইশারা কাফি। আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলাম। সব শুনে বললেন, ‘বল, সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই ।’
বললাম, ‘সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই।’

দূরে কোথাও থেকে মাঝে-মধ্যে মাইকে কাওয়ালির আওয়াজ ভেসে আসছে। মনে হয়, আরও কোথায় বিহারিদের বসবাস আছে।
আপার কথা ঠিক হলো না। বাবাকে আর আটকে রাখা যাবে না। বাবা গানপাগল মানুষ। নিজে গান করেন, আবার সুন্দর করে বাঁশিও বাজান।আমাদের পরিবারে বংশ পরম্পরায় গানের একটা প্রচলন আছে। শুনেছি, সেই ইংরেজ আমলে বাঙালি মুসলমানরা যখন গান-বাজনায় নেই, তখন আমার দাদা দোতারা বাজিয়ে গান করতেন।
গান ছাড়া সিনেমা-নাটক-যাত্রাও বাবাকে আকর্ষণ করে। এই তো গত ঈদে পাড়ার ছেলেদের ডেকে নিয়ে বললেন, ‘বাবারা, যদি সিনেমা দেখতে যাও, আমার ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে যেও।’ তারপর, দলবেঁধে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মেরিনায় গিয়ে ‘দুই রাজকুমার’ দেখে এলাম। টিকিট না পাওয়ায় মাধুতে ‘মালকাবানু’ দেখা হলো না। সিনেমা অবশ্য এর আগেও দেখেছি, মণিবুর সঙ্গে বনানিতে।
ঘণ্টা দুয়েকবাদে ড্রেস পড়া অবস্থায় খলিল চাচা এলেন। ততক্ষণে, আমার পড়া-লেখা শেষ হয়ে গেছে।
মা হেঁসেলে বসে রুটি বানাচ্ছেন। মাস দেড়েক হয়, আমরা দুবেলা রুটি খাচ্ছি।
দেশে দুর্ভিক্ষ চলছে। লঙ্গরখানা চারদিকে খোলা হয়েছে। খলিল চাচা সুন্দর করে বলেন, ‘পাক হানাদাররা দেশটাকে বিরান করে গেছে। আমেরিকাও পিছনে লেগেছে। দুর্ভিক্ষ হবে না তো, কী দুধের নহর বইবে!’
যেটাই হোক, খু-উ-ব কষ্ট হচ্ছে।
খলিল চাচা মিনিট বিশেক বসলেন। লাল চা খেতে খেতে বাবার সঙ্গে আলাপচারিতায় মগ্ন হলেন। বললেন, ‘বাইসাব, দেশের অবস্থা বেশি ভালো না।টেররিস্টদের উৎপাতে বাঁচা বড় দায়। কোন সময় কী হয়, বাঁচি কি মরি, সব আল্লা জানেন।’
বাবা বললেন, ‘বিপ্লবের পরে প্রতিবিপ্লব আসে। এটাই তো স্বাভাবিক।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা বিপ্লব-প্রতিবিপ্লব কী?’
চোখ তুলে তাকালেন। দ্রুত ভেতরের ঘরে চলে গেলাম।
তারপর মার বারণ সত্ত্বেও ‘এই আমি যাইরে ’ বলে বাবা খলিল চাচার সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন।
ফিরলেন গভীর রাতে।
খুব সকালে চাচি আর চাচির বোনের আর্তচিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল। খলিল চাচা গতকাল গভীর রাতে এক অভিযানের সময় টেররিস্টদের গুলিতে নিহত হয়েছেন।

● দিন কয়েকের মধ্যে মেজবু রাজিব ভাইয়ের সঙ্গে লাপাত্তা হয়ে গেলেন 

নিঃসন্তান খলিল চাচা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। আটগ্রাম-কানাইঘাটের যুদ্ধের কথা বলতেন। জকিগঞ্জ মুক্ত হওয়ার কথা বলতেন। জকিগঞ্জ মুক্ত করতে গিয়ে এক ভারতীয় মেজরের শহিদ হওয়ার কথা বলতেন।
খলিল চাচার জন্যে মনটা খারাপ হয়ে গেল।
ক্রমেই বাবার কৃচ্ছতা সাধনের মাত্রা বাড়ল। মাস দেড়েক আগে অবজারভার রাখা বন্ধ করেছিলেন, এবার বন্ধ করলেন প্রাইভেট টিউটর। আর মালতি বুয়াকে ‘মালতি মাসখানেক বাড়িতে থেকে এসো ’ বলে বিদায় করে দিলেন। মালতি বুয়া সব বুঝে চোখের জল-নাকের জল এক করে কাঁদতে কাঁদতে অজানার উদ্দেশে হারিয়ে গেলেন।
সপ্তাহখানেকের মধ্যে বাবার পড়ানোর মাজেজা টের পেলাম। চড়-থাপ্পড় আর স্কেলের বাড়ি অনবরত পড়তে লাগল। শেষমেশ মা এগিয়ে এলেন।বললেন, ‘তুমি, তোমার মেয়েদের পড়াও। আমি, আমার ছেলেকে পড়াব।’ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
দিন কয়েকের মধ্যে মেজবু রাজিব ভাইয়ের সঙ্গে লাপাত্তা হয়ে গেলেন। যাবার আগে বাবার উদ্দেশে একটা চিরকুট রেখে গেলেন—

‘বাবা,
আমি তোমার কৃচছতাসাধনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে রাজিবের সঙ্গে চলে যাচ্ছি। একদিকে দিয়ে তোমার ভালোই হলো। সংসারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সংখ্যা কমে গেল।’

চিরকুট পড়ে বাবা চুপ হয়ে গেলেন। দিন দুয়েক কারো সঙ্গে কোনো কথা বললেন না। আমরাও ভয়ে বোবা হয়ে গেলাম। ইশারা-আশারায় ভাব বিনিময় চলল।
অবশেষে, বাবা হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠলেন। এই প্রথম আমরা বাবার কান্না প্রত্যক্ষ করলাম।
বাবার কান্না দেখে মাও কেঁদে উঠলেন। একে একে সবাই কেঁদে উঠল।

iqbal@gmail.com'
iqbal@gmail.com'

Latest posts by ইকবাল তাজওলী (see all)