হোম গদ্য গল্প বউ যেভাবে ঘরে আসে

বউ যেভাবে ঘরে আসে

বউ যেভাবে ঘরে আসে
1.30K
0

বছর দশ আগের একদিন। ২০০৮ সাল। বলা ভালো, সেটা দিন নয়, ডিসেম্বরের একটা রাত। নির্বাচন-শেষের ভাগ্যরজনী। যখন অন্ধকারে ক্রমে ফুটে উঠছে ক্ষমতার নতুন বিন্যাস। নাবালক চিত্তে সাবালক অনুভূতির একটা উত্তেজনা চারদিকে।

এইসব উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জন্য কনকনে শীতও তেমন আর টের পাওয়া যায় না। কিংবা হয়তো ঠিকঠাক মতো বাড়ি ফেরার টেনশনে প্রিসাইডিং অফিসার সাজ্জাদুল ইসলাম কিছুটা ঘেমে উঠেছিল। আশলে তার মন তেতে ছিল নির্বাচনের আগের রাত থেকেই। এই বালের মাস্টারি জীবন বেছে না নিলে এটা নিশ্চিত যে, ভোটের ঠিকাদারি করতে এমন ভাঙা স্কুলের বেঞ্চিতে শুয়ে রাত কাটাতে হতো না।

সকালবেলা আনসার-পুলিশের সাথে ডাল-খিচুড়ি খেয়ে নির্বাচন ভালোই চালানো গেল। আর্মি টহল দিচ্ছে এমন একটা খবর ছিল বাতাসে। ফলে কোনো উৎপাত ছিল না। ব্যালট গুনতে গুনতে সন্ধ্যা সাড়ে ছটা।

মুরব্বি গোছের একজন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার বারবার ফিসফিস করে বলছিল, ‘স্যা‌র এট্টু তাড়াতাড়ি করেন। গেছেবার কিন্তু মেলা রাইত অইছিল। ব্যালট বাক্স ছিনতাই অইছিল নদীর মদ্দে।’ পুলিশের এএসআই হুংকার দিয়ে বলল, ‘এইবার ওইসব কিছু অইবে না। আম্মহে নিশ্চিত থাহেন স্যার।’

গদ্দার হাটের এই স্কুল থেকে সন্ধ্যানদীর পাড় দুমিনিট হাঁটার দূরত্ব। নদী পেরোলে রিক্সা। রিক্সায় বিশ মিনিটে রিটার্নিং অফিস। ব্যালট-বস্তা-সিল জমা দিয়ে বেরিয়ে আসার পথে অফিসের একজন এসে কানে কানে বলল, ‘স্যার আপ্যায়নের ব্যবস্থা আছে।’ বলার ধরনে বোঝা গেল এ ব্যবস্থা সবার জন্য নয়। সম্ভবত, কেবল প্রিসাইডিং অফিসারদের জন্য।

আপ্যায়ন মন্দ নয়। ভুনা খিচুড়ি আর মুরগির মাংস। এই প্রথম সাজ্জাদের মনটা শান্ত হলো। যাক বাসায় ফিরে আর রান্না-বান্নার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু আশল সমস্যাটা টের পাওয়া গেল খাওয়া শেষ করে। বাড়ি ফিরবে কিভাবে? রাত তখন দশটা। বানারীপাড়া থেকে বরিশাল ফেরার কোনো গাড়ি নাই। ইনফ্যাক্ট, রাস্তা প্রায় ফাঁকা।

ভাগ্যই বলতে হবে। কলেজের পিয়ন জামিলের সাথে দেখা হয়ে গেল। ‘স্যার, রাইতে থাকবেন কোনহানে?’ ওর প্রশ্ন শুনে প্রথমে হতাশ হয়ে পড়েছিল সাজ্জাদ, ‘বলো কী! ফেরার কোনো ব্যবস্থা নাই?’ একটু ভেবে পিয়নটা যা বলল তাতে ওকে প্রায় জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিল সে। মোদ্দা কথা হলো এই, পরিচিত এক ড্রাইভার আছে এখানে, যার গাড়িটা পুলিশ রিকুইজিশনে নিতে পারে নাই, কারণ গত দুদিন সে বাড়ি ছিল না। আজ বাড়ি এসেছে। এখন তাকে বললে হয়তো একটা ট্রিপ দিতে পারে।

ঘণ্টাখানেক লাগল সেই ড্রাইভারকে ম্যানেজ করতে। ৪০০ টাকায় তাকে রাজি করানো গেল। বানারীপাড়া ব্যাসস্ট্যান্ড থেকে বরিশাল ফরেস্টার বাড়ি। আলফা নামে পরিচিত এই তিনচাকা-গাড়ির ড্রাইভার মাঝবয়সী, নাম রুস্তম। যাত্রী সাজ্জাদ, একাই।


কাছে আসতে বোঝা গেল অল্পবয়সী একটা মেয়ে। তরুণী বলাই ভালো। গাড়ি থামল তরুণীর একেবারে পায়ের কাছে।


বাজারে প্রচুর লোক-সমাগম। টেলিভিশন চলছে। চারদিক সরগরম। কিন্তু রাস্তায় গাড়ি নেই। বাজার পেরোতেই একরাশ অন্ধকার। পথের দুধারের গাছগাছালি নিঃশব্দে ঢালছে আরও অন্ধকার কুয়াশা। বাতাসে কনকনে ঠান্ডা এবার যেন টের পাওয়া যাচ্ছে। গাড়ি গুয়াচিত্রা পৌঁছবার খানিক আগে রুস্তম বলল, ‘স্যার, একটা মাইয়া রাস্তায় হাত তুইলা থামতে কইতাছে। থামমু?’

‘এত রাতে একটা মেয়ে! আচ্ছা কাছে যাও দেখি।’ সাজ্জাদ মাথা নিচু করে বাইরে দেখতে চেষ্টা করল।

কাছে আসতে বোঝা গেল অল্পবয়সী একটা মেয়ে। তরুণী বলাই ভালো। গাড়ি থামল তরুণীর একেবারে পায়ের কাছে। গাড়িটা থামল সে তরুণী বলেই। তরুণ কেউ হলে নিশ্চয়ই থামত না।

‘যাইবেন কোনহানে?’ রুস্তম ইঞ্জিনের আওয়াজ ছাপিয়ে হাঁক দিল।

মেয়েটি কিছুই না বলে গাড়ির মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখল। মনে হলো, সে খুব আশ্বস্ত হলো সাজ্জাদকে দেখে।

‘বরিশাল যাইবেন তো ওঠেন গাড়িতে।’ রুস্তম বুঝে গেছে স্যার আপত্তি করবে না।

মেয়েটি গাড়িতে উঠে পড়ল চুপচাপ। বসল এসে ঠিক পাশে। মুখে চোরা হাসির একটা ঢেউ খেলে গেল যেন। সাজ্জাদের নজর এড়াল না।

গাড়ি আবার ছুটল বিকট আওয়াজ তুলে। রাস্তার দুপাশের শীতার্ত গ্রামকে ধমক দিয়ে।

মেয়েটি বিপজ্জনক নয় ঠিকই, কিন্তু সরলও তো মনে হচ্ছে না। সাজ্জাদ ভাবছে। কিভাবে কথা শুরু করা যায়? তাকে কি আপনি বলবে, না তুমি?

‘আপনি থাকেন কোথায়?’

হিহি করে হেসে উঠল মেয়েটি। সাজ্জাদ বোকা হয়ে গেল।

‘হাসছেন যে!’

‘আমারে আপনি বলতেছেন ক্যান?’

স্যালোয়ার-কামিজ পরা, চাদরে মোড়ানো মেয়েটিকে সাজ্জাদের এবার একটু বাচ্চাই মনে হলো। একে আপনি বলা ঠিক হয় নি।

‘আচ্ছা। তোমার বাড়ি কোথায়?’

ঝিলিক-দেয়া চোখে মেয়েটি তীব্র চাহনিতে দেখে নিল সাজ্জাদকে। কী দেখল কে জানে।

‘খলিশাকোটা গ্রাম।’

মনে মনে হিশাব কষল সাজ্জাদ। এটা তো চাখার কলেজেরও পেছনে। অতদূর থেকে একা একা গুয়াচিত্রা এল কিভাবে এই মেয়ে? প্রশ্নটা জেরামূলক হয়ে যায়। তাই ও-পথে গেল না। সিম্পলি জানতে চাইল, কোথায় যাচ্ছে সে।

‘যাচ্ছি বরিশাল। শ্বশুরবাড়ি।’

বলে কী এই মেয়ে! ইয়ার্কি করছে নাকি! এ তো বেশ বেয়াদব!

‘মানে তোমার বিয়ে হয়েছে?’

রাস্তার পাশ থেকে হৈচৈ শোনা গেল। গাড়ি পার হচ্ছে গুঠিয়া বন্দর। বাজারে মিছিল-মিছিল ভাব। হয়তো এতক্ষণে ফল ঘোষণা শুরু হয়ে গেছে।

‘বিয়ে হয় নি, হবে।’

খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। বিয়ে হবার আগেই মেয়ে যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি ঘুরতে। তাও মধ্যরাতে। একা একা।

‘তুমি তো দারুণ সাহসী মেয়ে। কী নাম তোমার?’

‘রাজিয়া সুলতানা।’ গাড়ির শব্দে নামটা ঠিক শোনা গেল না।

এমন সময় মোবাইল বেজে উঠল। ইংরেজির শিক্ষক আকমল স্যার ফোন করেছেন। উনি থাকেন ঢাকায়। প্রিন্সিপালকে বলে, ইউএনও অফিসে তদবির করে তার নামটা বাদ দিতে পেরেছেন নির্বাচনি কাজ থেকে।

‘কী স্যার, নির্বাচন কেমন করলেন?’ বেশ টেনে টেনে সুরেলা একটা প্রশ্ন করলেন আকমল স্যার। এমনিতেই উনি কথা বলেন অ্যাবনর্মাল টোনে। ভরাট গলায়। কিছুক্ষণ কথা বললেই আবৃত্তির ক্লাস হয়ে যায়।

‘জি স্যার, ভালো?’

‘আপনার দল তো জিতে গেল।’

‘আমার দল কোনটা! রেজাল্ট হয়ে গেছে নাকি?’

‘ম্যাক্সিমাম।’

‌‘তো আপনি কি ব্যথিত না আনন্দিত?’

‘পরিবর্তনকে স্বাগত জানাই।’ ক্লিশে, ডিপ্লমেটিক, হাল্কা রসিকতা।

‘ভোট কিন্তু ফেয়ার। আমার কেন্দ্রে কোনো ঝামেলা হয় নাই।’

‌‘যাক আপনার এবার একটা হিল্লে হবে।’

‌‘আমার আর কী!’

‘না, এখন চাইলে ভালো জায়গায় পোস্টিং নিতে পারবেন।’

‘ভাই রে, আমার কোনো লাইন নাই। আপনার থাকলে বইলেন।’

জানা গেল, আগামী পরশুদিন উনি কলেজে আসছেন। ঢাকা থেকে যারা এসে ক্লাস করেন, তারা কলেজেই একটা বড় ক্লাসরুমে থাকেন, সেটাকে মেস বানিয়ে। তিনতলায় সেই রুমের জানালা খুললেই দেখা যায় বড় বড় কাঁঠাল গাছ। সেই গাছ বেয়ে তড়তড় করে নেমে আসে কাঠবিড়ালি। ধূসর রঙের কাঠবিড়ালিটা তখন নেমেই আসছিল। কিন্তু তার আগেই ঘুমে টলে পড়ল সাজ্জাদ। যখন ঘুম ভাঙল, গাড়ি ততক্ষণে গড়িয়ার পাড় চলে এসেছে।


মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। ‘স্যার, আপনি তো খুব ভালো অভিনয় জানেন!’


‘আচ্ছা, জিজ্ঞেস করা হয় নাই, তুমি নামবে কোথায়?’ এবার যেন আশল কথাটা মনে পড়ল সাজ্জাদের।

‘হাতেম আলী কলেজের উল্টা পাশে।’

বলে কী! এ তো দেখি আমার বাসার কাছেই। সাজ্জাদ বিস্মিত হলেও সেটা প্রকাশ করল না। ড্রাইভারকে বলল হাতেম আলী কলেজের সামনে মেইনরোডে গিয়ে থামতে। সে নিজেও মেইনরোডেই নামল। সম্ভবত মেয়েটার শ্বশুরবাড়ি কোনটা সেটা দেখার একটা কৌতূহল।

রুস্তম ভাড়া বুঝে নিয়ে সালাম-টালাম জানিয়ে চলে গেল। তারপর সাজ্জাদও যখন মেয়েটিকে বিদায় দিতে গেল তখনই ঘটল কাণ্ডটা।

সৌজন্যবশত সে মেয়েটিকে বলেছিল, ‘ঠিক আছে, তাহলে যাও… বাসা চিনবে তো!’

মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। ‘স্যার, আপনি তো খুব ভালো অভিনয় জানেন!’

‘মানে?’

‘থাক থাক। অনেক হয়েছে, এখন আর কেউ নাই যে অ্যাকটিং করবেন।’

‘মানে কী?’

‘আমিও তো তাই বলি, মানে কী?’

‘তুমি কি আমার স্টুডেন্ট?’

‘জি স্যার। এবার আমি ইন্টার পরীক্ষা দিয়েছি। চাখার কলেজ থেকে।’

‘এনি ওয়ে, আমি তোমাকে চিনতে পারছি না। কিছু মনে করো না, আমি আশলে মানুষের চেহারা মনে রাখতে পারি না।’

‘তাই!’

‘হ্যাঁ, তাই। যা হোক, রাত অনেক হয়েছে। এখন বাড়ি যাও।’

‘সে জন্যই তো এতদূর আসা।’

‘ওকে।’

কিন্তু দুজনেই ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ নড়ছে না। সাজ্জাদ ঠিক বুঝতে পারছে না, মেয়েটার উদ্দেশ্য কী।

‘চলেন, বাসায় যাই।’ মেয়েটিই ইশারা করল তাকে যেতে।

‘কোন বাসায়?’

‘স্যার, আমাকে এতদূর নিয়ে এসে এখন কি নাটক করবেন?’

‘নাটক?’

‘নয়তো কী? আমি আপনার জন্য সেই সকালে বেরিয়েছি। সারাটা দিন, সন্ধ্যাটাও কাটালাম সলিয়াবাকপুর আমার এক বান্ধবীর বাড়ি।’

‘কিন্তু কেন?’

‘কেন মানে? আপনিই তো বললেন, নির্বাচনের দিন রাতে গুয়াচিত্রা অপেক্ষা করতে। আমিও বাড়িতে বলে এসেছি, বরিশালে খালার বাসায় থাকব আজকে।’

‘দ্যাখো, ইয়ে… কী নাম যেন… যা হোক, তুমি নিশ্চয়ই কোথাও ভুল করছ। আমি সত্যিই তোমাকে চিনি না।’

‘আপনি কিন্তু আমাকে অপমান করছেন।’ মেয়েটি এবার কান্না শুরু করল।

ভীষণ মুশকিলে পড়া গেল। রাগে গা কাঁপছে সাজ্জাদের। ভয়ে শরীর ওজনশূন্য হয়ে পড়ছে।

‘এত রাতে আমি কোথায় যাব?’ বলে মেয়েটি ফুটপাতের ওপর জাস্ট বসে পড়ল।

‘জানি না।’ বলে সাজ্জাদও হাঁটা দিল তার বাসার গলির দিকে। কিন্তু দুপা এগিয়েই থেমে গেল। ঘটনার ভয়াবহ দিকটা সে টের পেল এবার। সত্যিই যদি মেয়েটিকে এখন ফেলে যায়, এটা নিশ্চিত, কিছুক্ষণের মধ্যে এখানে লোকজন জড়ো হয়ে যাবে। তারপর ঘটনার সূত্রে ফাঁস হয়ে পড়বে তার নাম-পরিচয়। মহল্লার সবাই একটা মিথ্যা গল্প দাঁড় করাবে তাকে নিয়ে। একটা কেলেঙ্কারি ব্যাপার।

ফলে ফিরে আসতে হলো। যতটা সম্ভব বেশ রাশভারি কণ্ঠে সাজ্জাদ বলল, ‘শোনো মেয়ে, কান্না থামাও। আসো আমার সাথে।’

কান্নাভেজা মেয়েটির মুখে হাসি ফুটে উঠল। কোনো কথা না বলে অনুসরণ করল সাজ্জাদকে। সাজ্জাদের কাছে বাসার গেটের চাবি থাকে সবসময়ই। ভাগ্য ভালো যে দারোয়ান বেটা ঘুমিয়ে পড়েছে। চারতলার ফ্ল্যাটে ওঠা পর্যন্ত কারো মুখোমুখি হতে হলো না।

‘তোমাকে একটা কথা বলি। যেহেতু তুমি আমার স্টুডেন্ট, আমি তোমাকে একটা ফেবার করছি মাত্র। আজ রাতটা তুমি থাকো আমার বাসায়। কাল সকালে সোজা বাড়ি ফিরে যাও।’ ফ্ল্যাটে ঢুকেই সাফ সাফ জানিয়ে দিল সাজ্জাদ।

মেয়েটি এ কথা শুনল কি শুনল না ঠিক বোঝা গেল না। শুধু বলল, ‘আমার খুব খিদে পেয়েছে।’

‘ভেরি গুড।’ সাজ্জাদ ফ্রিজ থেকে মাছের তরকারি বের করে বলল, ‘রান্নাঘরে যাও। এটা গরম করে খাও।’

‘আচ্ছা।’

‘ওখানে চাল আছে। ভাত রান্না করে নাও।’

‘আপনি খাবেন না?’

‘না, আমি খেয়ে এসেছি।’

সাজ্জাদ গোসল-টোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে মেয়েটা ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছে।


তবে গুজব রটে যে, কলেজের এক শিক্ষকের সঙ্গে তার নাকি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই শিক্ষকও পরে চলে যায় কলেজ ছেড়ে।


এরপরে আশলে কী ঘটেছিল, কিছুই মনে করতে পারে না সাজ্জাদ। সে তার বাড়ি অরক্ষিত রেখে কিভাবে ঘুমাতে গেল ভেবে পায় না। অ্যাটলিস্ট তার উচিত ছিল দরজায় তালা দিয়ে ঘুমানো। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে মেয়েটি নেই। যাক, আপদ বিদায় হয়েছে।

কিন্তু বাড়ির কী কী জিনিশ খোয়া গেল সেটা কে খুঁজে দেখবে এখন! অবশ্য এটা ঠিক যে, তার বেডরুম ছাড়া অন্য কোথাও এমন মূল্যবান কিছু নেই যা চুরি গেলে বিশেষ কোনো ক্ষতি হবে।

ঘটনার পর তিন দিন পর্যন্ত একটা চাপা উদ্বেগ ছিল সাজ্জাদের মনে। আফটার-ইফেক্ট নিয়ে ভাবছিল। কিছুই ঘটল না দেখে শেষমেশ আকমল স্যারের সাথে শেয়ার করল ব্যাপারটা। তখন সে যা শুনল তা ভয়ঙ্কর।

রাজিয়া সুলতানা নামে সত্যিই একটা মেয়ে পড়ত চাখার কলেজে। এবং তার বাড়িও খলিশাকোটা। যতদূর জানা যায়, বছর চারেক আগে কলেজের ছাদ থেকে পড়ে মারা যায় সে। সেটা দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা তা জানা যায় না। তবে গুজব রটে যে, কলেজের এক শিক্ষকের সঙ্গে তার নাকি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই শিক্ষকও পরে চলে যায় কলেজ ছেড়ে। একেবারে মেলোড্রামা।

কিন্তু এই ঘটনা শুনে সাজ্জাদের কোনো সুরাহা হলো না। ‘চলেন একবার সেই মেয়েটার বাড়ি ঘুরে আসি।’ আকমল স্যারকে এমন প্রস্তাব দিলে উনি একটু দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন, ‘যাবেন! চলেন ঘুরে আসি।’

একদিন বিকেলে সত্যি সত্যি তারা দুজন হাঁটতে হাঁটতে খলিশাকোটা গ্রামে ঢুকে পড়ল। পুরনো সেনবাড়ির মস্ত বড় পুকুর, ভাঙা শিবমন্দির পার হয়ে একটা বাড়ির সামনে গিয়ে তারা যখন দাঁড়াল তখন প্রায় সন্ধ্যা। বাড়ির কর্তা তাদের দেখে চিনতে পারলেন।

‘স্যার, আপনারা এদিকে!’

‘এই হাঁটতে হাঁটতে চলে আসলাম।’

‘ভেতরে আসেন স্যার, একটু বইসা যান।’

আমন্ত্রণটা যথেষ্ট জোরালো ছিল না। স্বাভাবিক সৌজন্য বলা যায়। কিন্তু সেটাকেই লুফে নিতে হলো আপাতত।

বসার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বাড়ির কর্তা, মানে বাদশা মিয়া, হাঁক দিলেন, ‘এই সাজু, দ্যাখ তোর কলেজের স্যাররা আইছে।’

সাজ্জাদ আর আকমল পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিল চকিতে। বাদশা মিয়া বললেন, তার এই মেয়ে এবার ইন্টার পাশ করেছে। বরিশালে খালার বাসায় থেকে এখন কোচিং করছে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির জন্য।

আকমল স্যার একটুও অবাক না হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার ছেলে-মেয়ে কয়জন?’

‘ছিল দুইজন। একটা মেয়ের কথা তো আপনারা সবাই জানেন। এইডা অইল তার ছোট।’

যে মেয়েটি সামনে এসে সালাম দিয়ে দাঁড়াল তাকে দেখে সাজ্জাদের চোখ কপালে উঠে গেল। এ তো সেই মেয়ে!

‘ওর নাম সাজু। সাজিয়া সুলতানা’, বাদশা মিয়া মেয়ের দিকে ফিরে বললেন, ‘স্যারদের জন্য একটু চায়ের আয়োজন করো।’

মেয়েটা এক সময় চা নিয়ে এল। সাজ্জাদ অপার বিস্ময় চায়ের চুমুকে গিলে কোনো মতে শুধু বলল, ‘তোমার নাম যে সাজিয়া, তা তো জানতাম না।’

‘কী বলেন স্যার! আপনার কাছে পরীক্ষার আগে এক মাস পড়লাম, এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন!’

ভীষণ পাজলড হয়ে পড়ল সাজ্জাদ।

‘বাদ দাও তোমার স্যারের কথা। উনি কারো নাম মনে রাখতে পারেন না।’ আকমল স্যার সাজ্জাদকে কায়দা করে বাঁচিয়ে দিলেন এ যাত্রায়।

ফিরে আসার পথে সাজ্জাদ বারবার আকমল স্যারকে বোঝাতে লাগল, মেয়েটা ডাহা মিথ্যা বলেছে। সে কখনো ক্লাসের বাইরে কাউকে পড়ায় নি। ব্যাচে পড়ানোর অভ্যাস তার নাই।

‘হয়তো ক্লাস শেষেই মেয়েটা আসছে হেল্প নিতে। সে জন্যেই হয়তো মনে নাই আপনার। কিন্তু মেয়েটা মিথ্যা বলবে কেন?’ আকমল স্যার সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন।

‘ওর তো পুরোটাই মিথ্যা। সেদিন রাতে ওই তো গিয়েছিল আমার বাসায়।’

‘বলেন কী? আপনি না বললেন, সে ছিল রাজিয়া সুলতানা!’

‘নাম তো তাই বলেছিল।’

‘বেশ মজার তো!’


আকমল স্যার একদিন সাজ্জাদকে ডেকে বললেন, ‘শোনেন, আমি মেয়ের বাবার সাথে কথা বলেছি। উনারা রাজি।’


এরপর দুজন অন্ধকারে হাঁটতে লাগল। খলিশাকোটা গ্রাম থেকে কলেজের পথে। বেশ কিছুক্ষণ পর আকমল স্যারই মুখ খুললেন, ‘তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াল এই যে, সাজিয়া নামের মেয়েটা আপনার বাসায় গিয়েছিল রাজিয়া নাম ভাঙিয়ে। যে কিনা তার বড় বোন। এত নাম থাকতে সে ওই নাম কেন বলবে আপনাকে? আর কেনইবা সে যাবে আপনার কাছে?’

‘সেইটাই তো কথা।’

‘এই মিয়া প্রেম করেন নাই তো! এখন উল্টাপাল্টা বলে আমারে বেকুব বানাচ্ছেন!’

‘আরে ধুর, কী বলেন স্যার! আমি কি এতই সেয়ানা?’

‌‘কললিস্ট চেক করব?’

‘করেন। তবে আপনার জেনে রাখা ভালো, ওর কোনো সেল ফোন নাই।’

‌‘বলেছে আপনাকে?’

‌‘হুম।’

সেদিন আর কথা হলো না। এর পরের ঘটনা আরও নাটকীয়। আকমল স্যার একদিন সাজ্জাদকে ডেকে বললেন, ‘শোনেন, আমি মেয়ের বাবার সাথে কথা বলেছি। উনারা রাজি।’

‘রাজি মানে, কিসের রাজি?’

‘সাজিয়ার সাথে আপনার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলেছি।’

‘স্যার, এটা কী বলেন!’

‘বেশি নাটক কইরেন না। আমি কিন্তু সব রাষ্ট্র করে দেব।’

‘কী রাষ্ট্র করবেন! আপনি কি রসিকতা করতেছেন…’

শেষমেশ সাজ্জাদকে বিয়ে করতেই হলো। এবং কন্যার নাম সাজিয়া সুলতানা। মা মারা যাবার পর তেমন কোনো আত্মীয়-পরিজন ছিল না সাজ্জাদের। আকমল স্যারই তার লিগাল বা ইলিগাল গার্জিয়ান। বিয়েটা হয়েছিল এক ঐতিহাসিক দিনে। সেদিন নির্বাচনে বিজয়ী দল শপথ নিয়েছিল সরকার গঠনের জন্য।

বাসর-রাতে সাজ্জাদ সাজিয়াকে একটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করে, ‘তুমি কি আগে কখনো আমার বাসায় এসেছ?’

‘কী বলেন, আপনার মাথা ঠিক আছে! আমি আপনার বাসায় আসব কেন?’

‘না, মানে কখনো পড়তে এসেছ কিনা।’

‘আপনি বাসায় ব্যাচ পড়ান?’

‘না তো।’

‘তাহলে?’

‘ও, তাই তো!’

সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি ফজলুল হক কলেজ, বরিশাল।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব

Latest posts by সোহেল হাসান গালিব (see all)