হোম গদ্য গল্প ফার্স্টবয়

ফার্স্টবয়

ফার্স্টবয়
334
0

মহুয়ার মুখের দিকে আমি অবাক তাকিয়ে থাকি। বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক ভালো লাগা ঢেউ তুলে যায়। শেষ বিকেলের সোনালি আলো মহুয়ার কালো মুখে চুমু খায়, কি যে অপূর্ব দেখায় সে আলোয় মহুয়াকে! বাঁশবনের আড়াল থেকে বিদায়ী সূর্য ঈর্ষায় জ্বলে ওঠে। তারপর দপ করে নিভে যায়। কয়েকটা ঘুঘু ডেকে ওঠে, অনেকগুলো বক ডানা ঝাপটে বাঁশবনের উপর আছড়ে পড়ে, নীড়ে ফেরার তীব্র বাসনায় অনেকগুলো পাখি উড়ে চলে ডানা মেলে। মহুয়া কী যেন বলে যায় বেণি দুলিয়ে দুলিয়ে। আমার কানে কিছু ঢোকে না আর। আমি মহুয়ার দিকে অপলক তাকিয়ে ভাবি রবীন্দ্রনাথের ক্যামেলিয়া। মহুয়াকে আমার ক্যামেলিয়া কবিতার সেই কালো মেয়েটি বলে মনে হয় হঠাৎ। মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়ানো মহুয়াকে ভারি অচেনা আর অপার্থিব লাগে। আমার ইচ্ছে হয় আমি মহুয়ার প্রেমে পড়ি! ভেবেই খিলখিল হেসে উঠি আমি।

মহুয়া চমকে বলে, কিরে? কী হলো তোর? হাসছিস কেন?

আমি হাসতে হাসতে বলি, তোকে খুব ভালো দেখাচ্ছে রে! ইচ্ছে করছে তোর প্রেমে পড়ে যাই!

মহুয়ার মুখটা বেগুনি হয়ে ওঠে। মুখ গোমড়া করে সে বলে, তোরা সবাই আমার সাথে ইয়ার্কি করিস কেন? তোরা না হয় সুন্দর আছিস, আমি কালো, তাই বলে অমন ইয়ার্কি করবি সব সময়?

মহুয়ার মুখটা দুখী দেখায় খুব। হঠাৎ আমারও ভারি দুঃখ হয় মহুয়ার জন্য। মহুয়াকে কুৎসিত বলে, দেখতে খারাপ বলে অনেকেই খোঁচায়। কী করে বোঝাই ওকে যে সত্যিই এই মুহূর্তে ওকে কী অপূর্ব লাগে, কী অদ্ভুত আলো চলকে পড়ে ওর কালো কোমল মুখে।

আমি নরম গলায় ওকে বলি, না রে, ইয়ার্কি না, সত্যি তোকে খুব ভালো দেখাচ্ছে। সত্যি বলছি, বিদ্যা!

মহুয়া লজ্জা পায় এবার, হাসে। বলে, কী যে বলিস! তোরা কত সুন্দর! আমি তো কালো পেঁচি!

এরপর আরও অনেক কথা হয় মহুয়ার সাথে। সন্ধ্যা হয়ে আসে। বাড়ি থেকে মার কণ্ঠ ভেসে আসে—জুঁই! সন্ধ্যা হয়ে এল! ঘরে আয়! মহুয়া নিজের বাড়ির দিকে চলে যায়।


ফার্স্টবয়ের সাথে কোন দুঃখে কথা বলব আমি! আর সেই-বা কোন সাহসে চুমু খাবে আমার ঠোঁটে!


আমি বাড়িতে গিয়ে সাঁঝবাতি জ্বালি। মুরগিগুলো ঘরে তুলে, ঘরের দরজা বন্ধ করে দেই। তারপর পড়তে বসি। এ আমার প্রতিদিনের রুটিন। ইদানীং আমি পড়তে বসি বটে পড়া হয় না তেমন। আকাশ-পাতাল চিন্তা আসে মাথায়। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে গল্পের বই পড়ি। রবীন্দ্র, শরৎ, নীহাররঞ্জন, বিভূতি, মানিক আরও আরও। আমার খুব প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করে আজকাল। ইচ্ছে করে কেউ একজন আমাকে খুব ভালো বাসুক, খুব আদর করে জড়িয়ে ধরে চুমু খাক। গল্পের চরিত্রগুলোর মতো করে কেউ একজন আমার জন্য উদাস দীর্ঘশ্বাস ফেলুক আর আমি তার জন্য বকুলের মালা নিয়ে অপেক্ষায় থাকি। কিন্তু কার প্রেমে পড়ব! হাতের কাছে তেমন কাউকে দেখি না আমি। অচেনা, অজানা কোনো এক রাজকুমারের জন্য আমি গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলি, বিরহে পুড়ি। বুকের মধ্যে তীব্র একটা কষ্ট কেমন যেন জট পাকাতে থাকে আর আমি ছটফট করতে থাকি। ক্লাস নাইনে পড়ি! কেন এমন কষ্ট জমে আমার বুকে! সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই কী কারণে যেন বাবা বকে খুব। মা-ও বাবার সুরে সুর মেলায়। ভারি কষ্ট হয় আমার। না, কেউ ভালোবাসে না আমাকে।

না খেয়েই স্কুলে চলে যাই। তীব্র ইচ্ছে হয় সকাল থেকেই, ভয়ংকর কিছু একটা করার। কিন্তু কী করব! বাবার উপর, মার উপর রাগটা কী করে উসুল করব ভেবে পাই না আর। শেষে চিঠি লিখি। প্রেমপত্র। হাতের কাছে যাকে পাব, দেবো! যা থাকে কপালে। কদিন আগে আমি স্বপ্নও দেখি। দেখি আমাদের ক্লাসের টুকটুকে ঠোঁটের ফার্স্টবয় ছেলেটা হঠাৎ তার বেঞ্চ থেকে উঠে এসে আমার ঠোঁটে চুমু খায়! ঘুম ভেঙেও অনেকক্ষণ গা শিরশির করে আমার। মনে হয় ওর ঠোঁটের স্পর্শ তখনও আমি টের পাই আমার ঠোঁটে! কিন্তু অমন স্বপ্ন কেন দেখি আমি! ওর সাথে তো কোনোদিন তেমন কথাই হয় নি আমার! স্কুলে কোনো ছেলের সাথে কোনো মেয়ের কথা বলা মানে স্যারদের কাছে নালিশ চলে যাওয়া। আর ভালো মেয়ে, লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে বলে সবাই আমাকে চেনে। সেখানে ঐ ফার্স্টবয়ের সাথে কোন দুঃখে কথা বলব আমি! আর সেই-বা কোন সাহসে চুমু খাবে আমার ঠোঁটে! কিন্তু স্বপ্ন তো দিব্যি দেখে ফেলি আমি! আর কী আশ্চর্য, তারপর থেকে ঐ ন্যাকা ছেলেটাকে কেন যেন বারবার মনে পড়তে থাকে আমার। ক্লাসে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে, ওর ঠোঁটের দিকে তাকালেই কেমন অদ্ভুত শিহরন জাগে শরীরে! চিঠিটা ওকেই দেবো আজ! মনস্থ করে ফেলি! ওর নাম রতন। প্রতিবছর ফার্স্ট হয় বলে তার রতন নাম হাওয়া হয়ে গেছে। সবাই তাকে ডাকি ফার্স্টবয়। বেকুব গোছের আছে একটু। চোখ বন্ধ করে পড়া বলে ক্লাসে। আমরা মেয়েরা আড়ালে হাসাহাসিও করি তাকে নিয়ে। স্কুলে গিয়ে একফাঁকে ওর আসার পথে দাঁড়িয়ে থাকি।

ওকে আসতে দেখে বলি—এই দাঁড়া! ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে যায় বেচারা! ওর হাতের মধ্যে লেখাটা চালান করে দেই।

গোবেচারা মুখে বলে, কী রে এটা?

—বাড়িতে গিয়ে দেখবি! খবরদার, স্কুলের কারো সামনে খুলবি না!

আদেশ দিয়ে গটগট নিজের পথে হাঁটা দেই আমি। একবার পেছন ফিরে দেখি ফার্স্টবয় তখনও পাংশু, ফ্যাকাসে মুখে সেখানেই দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে! সেদিন বাড়িতে গিয়ে অদ্ভুত আনন্দ হয় আমার! মনে হয় মা বাবার উপর বেশ একহাত নেয়া হলো। সেই সাথে ফার্স্টবয়ের মুখখানা ভাবি বারবার। বাঁচা গেল! একজন প্রেমিক জুটল এবার! পরদিন শুক্রবার। স্কুল বন্ধ। মনটা খারাপ হয় খুব। ফার্স্টবয়ের চিঠির জন্য মনটা ভারি উচাটন করে। শনিবার তাড়াতাড়ি স্কুলে যাই। ফুরফুরে মেজাজ। হঠাৎ মহুয়া এসে বলে—ফার্স্টবয় তোকে ডাকে, যা শুনে আয়! আমি তো জানি ফার্স্টবয় আমাকে কেন ডাকে! আমি যাই। স্কুলের পেছনের খালি জায়গায় সে দাঁড়িয়ে। আমি যেতেই অপলক কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে আমার চোখে। আমিও তাকিয়ে থাকি। ভালো লাগার একটা চোরাস্রোত টের পাই বুকের ভেতর। তারপর হঠাৎ কী হয়, ফার্স্টবয় ঝট করে তার পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে আমার হাতে দিয়েই ভোঁ দৌড়! থতমত খেয়ে আমি তাড়াতাড়ি চিঠিটা লুকিয়ে চলে আসি কমনরুমে, যেখানে অফ পিরিয়ডে আমরা মেয়েরা গাদাগাদি করে থাকি ভেড়ার পালের মতো, তারপর ক্লাস শুরু হলে, স্যারের পেছন পেছন ঢুকি ক্লাসে, যেন একপাল মাদি ভেড়া চলেছি রাখালের পিছু পিছু।

কমনরুমে এসে আমি বাথরুমে ঢুকে পড়ি। আমার হাতের ভাঁজে উঁকি দেয়া চিঠি মহুয়ার নজর এড়ায় না। সে দৌড়ে আমার হাতের ভাঁজ থেকে চিঠিটা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতেই, আমি ঠাস করে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে দেই!

হতভম্ব মহুয়ার কণ্ঠ ওপাশ থেকে ভেসে আসে—তোর কাছে আবার কে চিঠি লিখল রে!

—পিত্তি জ্বলে যায়! কেন, আমার কাছে কি কেউ চিঠি লিখতে পারে না!

না হয় বয়কাট চুলে একটু গম্ভীর ভাব নিই, ছেলেদেরকে তেমন পাত্তা দিই না, তা বলে কি ছেলেরা আমার প্রেমেও পড়বে না একটু! মহুয়া দেখতে খারাপ হলেও প্রেমের বাজারে তার বেশ চাহিদা!

রুমি বলে—ও তো সবাইকেই পেতে দেয়, তাই ওর অত প্রেমিক জোটে, বুঝেছিস?

কথা মিথ্যে না। মহুয়াকে সবাই এড়িয়ে চলে। এমনকি সবাই বলে ওর নাকি অ্যাবরশনও হয়েছে একবার। মহুয়া বয়সে আমার চেয়ে বেশ বড় ছিল। অশিক্ষিত পরিবার ওদের। দেরি করে স্কুলে যাওয়ায় আমাদের ক্লাসে পড়ে ও। নইলে ওর এদ্দিনে কলেজে-টলেজে পড়ার কথা। আমাদের বাড়িতে এলে মা তেমন কথা বলে না ওর সাথে। গম্ভীর মুখ করে থাকে। আমাকে বলে ওর সাথে না মিশতে। কিন্তু মহুয়াকে আমার খুব ভালো লাগে। খুব উচ্ছল মেয়ে মহুয়া। ওর ঐ উচ্ছলতা আমাকে টানে। ওকে ভালোও বাসি একটু। ওর এমন কথায় তাই মেজাজ খারাপ হয়। তাড়াতাড়ি চিঠিটা বের করে খুলি। বুকের মধ্যে ধুকপুকানি নিয়ে চিঠি খুলেই ভীষণ চমকে উঠি। হাত পা কাঁপতে থাকে আমার। হারামজাদা ফার্স্টবয়! সে তো আমার চিঠিই আমাকে ফেরত দিয়েছে! কোথাও একটু নতুন কালির আঁচড় পর্যন্ত নেই! এমন অপমান কী করে মেনে নিই! রাগে, দুঃখে, অপমানে ভীষণ ইচ্ছে হয় আত্মহত্যা করব এবার! সব রাগ গিয়ে জমা হয় বাবা-মার উপর! সব তাদের দোষ! কেন সেদিন অমন করে বকল! নইলে কি ছাই ঐ হারামজাদা, বেকুবটাকে চিঠি দিতে যাই! কোন সাহসে আমার চিঠি ফিরিয়ে দেয়! চোখে জল জমে আমার।


ফার্স্টবয়ের অপমানিত, ভীত, ফ্যাকাসে মুখ দেখে অদ্ভুত আনন্দ হয় আমার!


দরজা খুলে বের হতেই আবার মহুয়া। আমার চোখ মুখের অবস্থা দেখে ও ভয় পেয়ে বলল, কী হয়েছে রে জুঁই?

—ফার্স্টবয়কে চিঠি লিখছিলাম, উত্তর দেয় নাই, আমার চিঠি ফেরত দিছে আমাকেই!

কাঁদো কাঁদো হয়ে বলি আমি। মহুয়া অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি যে কাউকে চিঠি লিখতে পারি এ খবর ওর কাছে অবিশ্বাস্য। ও জানে ছেলেদের আমি একদম সহ্য করতে পারি না। ছেলেরাও আমাকে দেখে ভয় পায় রীতিমতো। সমীহ করে চলে। আমি বই খাতা নিয়ে ফিরে আসি বাড়ি। স্কুল জাহান্নামে যাক। আর লেখাপড়া করব না, পারলে আত্মহত্যা করব, আজই। বাড়িতে ফিরতেই হাজারো প্রশ্ন করে মা, কেন ফিরে এলাম ক্লাস না করে, কী হয়েছে ইত্যাদি। আমি কোনো উত্তর দিই না। মা বিরক্ত হয়ে নিজের কাজে মন দেয়। আমি তন্ন তন্ন করে বিষ জাতীয় কিছু খুঁজি। নাহ্ পাই না। গলায় দড়িটা খুব সেকেলে লাগে। মরে গেলে আধহাত জিব বের হয়ে থাকবে ভাবতেই ও চিন্তা ঝেড়ে ফেলি মাথা থেকে। কিন্তু অপমানটা খুব তীব্র হয়ে পোড়ায়। বমি বমি লাগে, খেতে পারি না কিছু। ঘুমোতেও পারি না।

মা অস্থির হয়ে জানতে চায়—কিরে কী হলো তোর? শরীর খারাপ? ডাক্তার ডাকব?

—কিছু হয় নি! ডাক্তার লাগবে না। তুমি যাও তো! আমার খিদে নাই। খিদে পেলে খাব।

মা চলে যায়। বাবার সাথে উদ্বিগ্ন মুখে আলাপ করে। দুদিন পর মহুয়া আসে। হাসি হাসি মুখ, উজ্জ্বল চোখ। ও আমাকে দেখে চমকে যায়।

বলে, কিরে তুই স্কুলে যাস না দু দিন! তোর এ অবস্থা ক্যান?

বলেই হাসে। আড়ালে টেনে নিয়ে বলে—তোর জন্য খবর আছে, বুঝেছিস? ফার্স্টবয় চিঠি দিছে! নে পড়!

আমার হাতের মধ্যে চিঠিটা গুঁজে দিয়ে ও হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, ওর মুখে খুশি ছলকে ওঠে। আমি ওর হাত থেকে চিঠিটা নিই।

নির্জীব গলায় ওকে বলি—তুই এখন যা। আমার চিঠি পড়তে মন চাচ্ছে না এখন। পরে পড়ব!

মহুয়া আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত, তারপর কী ভেবে চলে যায়। ওর চলে যাওয়া দেখে বুকটা হু হু করে আমার। বেচারা কালো বলে, কুচ্ছিত বলে কেউ ভালোবাসে না ওকে, আমি টের পাই। যারা ওকে ভালোবাসার কথা বলে, সব ঠক, জোচ্চর! মহুয়াটাও এত বোকা! ভালোবাসার কথা শুনলেই গলে যায়। রুমির ভাষায় পেতে দেয়! আমার ভারি ঘেন্না হয় শব্দটা শুনে। কিন্তু মহুয়াকে আমি ভালোবাসি, ওর জন্য মায়া হয়। বেচারা! ও তো ভালোবাসতেই চায়! ভালোবাসার কথা বলে কেউ যদি ওকে ঠকায় সেও কি ওর দোষ!

একদিনের কথা মনে পড়ে। মহুয়া আমাদের অঙ্ক স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ছিল। আমি পড়তাম অন্য স্যারের কাছে ইংরেজি। আমি পড়া শেষ করে মহুয়াকে খুঁজতে গেলাম। দেখি সবার পড়া শেষ, শুধু স্যার আর মহুয়া।

আমাকে দেখে বিরক্ত মহুয়া বলে, তুই চলে যা, আমার আরও অনেক দেরি হবে!

স্যারও একই কথা বলে। আমি বোকার মতো বলি—আচ্ছা দেরি হোক, আমি দাঁড়াই, তুই পড়া শেষ কর, একসাথে যাব। অনেকটা পথ। একা যেতে ভালো লাগে না।

আমি মহুয়ার জন্য বাইরে অপেক্ষা করি, মহুয়ার পড়া আর শেষ হয় না। অনেকক্ষণ পর বিরক্ত আমি ভেতরে উঁকি দিয়েই থমকে যাই। একটু পর স্যার চলে যায়। মহুয়া আর আমি। হাঁটি। কারও মুখে কথা নাই।

শেষে আমি বলি—এই তোর পড়া?

মহুয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর লাজুক লাজুক গলায় যা বলে তার সারমর্ম হলো, স্যার ওকে ভালোবাসে, ও স্যারকে! অবাক হয়ে মহুয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। কী বলব ভেবে পাই না! দুই বাচ্চার বাপ, বউ আছে, চল্লিশ হতে চলল বয়স, সে নাকি ভালোবাসে ক্লাস টেনে পড়া মহুয়াকে, আর মহুয়াও ঐ হারামজাদা বদমাশটাকে! মনে মনে শুধু বলি—তুই এত বোকা কেন মেয়ে! চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে থাকি। পড়তে ইচ্ছে করে না আমার। হারামজাদা ফার্স্টবয়! তোর চৌদ্দপুরুষের ভাগ্য যে তোকে চিঠি লিখেছিলাম! ফেরত দিলি! এখন কেন আবার চিঠি দিচ্ছিস তবে! এবার দেখাব মজা, দাঁড়া! মনে মনে বলি আমি। রাতে লুকিয়ে চিঠি পড়ি। ক্ষমা চেয়ে লেখা, ফার্স্টবয়ও ভারি ভালোবাসে আমাকে! ফুঃ! তোর ভালোবাসার গুষ্টি কিলাই!

পরদিন স্কুলে যাই আমি, ফার্স্টবয়কে চিঠি ফেরত দিয়ে বলি, তুই কী করে ভাবলি তোকে চিঠি লিখেছি? ওটা অন্য একজনকে লেখা, তোর কাছে রাখার জন্য দিলাম, কদিন পর চেয়ে নিতাম! তুই কী বোকা রে! ভাবলি তোকে লিখেছি! তোকে আমি কোন দুঃখে চিঠি লিখব? দেশে কি ছাগলের আকাল?

ফার্স্টবয়ের অপমানিত, ভীত, ফ্যাকাসে মুখ দেখে অদ্ভুত আনন্দ হয় আমার! একটু একটু কষ্টও হয় কোথায় যেন। আমি ওর চিঠি ওকে ফেরত দিয়ে বীরদর্পে কমনরুমে ফিরে আসি।

রাতে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে বিড়ি খাই আজকাল। আমার রুমে একবস্তা বিড়ি। আমাদের এক আত্মীয় বিড়ি ব্যবসায়ী। সে গ্রামের দিকে বিড়ি সাপ্লাই দেয়ার জন্য আমাদের বাড়িতে একবস্তা বিড়ি রেখে গেছে। সেটা এখন আমার রুমে। আমি রাতে বিড়ি ধরিয়ে টানি, খকখক কাশি। বাবা মা অন্যরুমে। টের পায় না। কিংবা আমি বিড়ি খেতে পারি অমন দুর্ভাবনা মাথায় আসে না তাদের। ক দিন পরই এসএসসি পরীক্ষা। আমি রাত জেগে পড়ি। পড়ি বলতে বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে রেখে গল্পের বই পড়ি। উপন্যাস পড়ি। একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য বুকটা হু হু করে আমার। ফার্স্টবয়কে মনে করে রাতে কাঁদি মাঝে মাঝে। মনে মনে বলি, হারামজাদা! ফার্স্টবয় এখন আমাকে দেখলে পালায়। যেন জোঁকের মুখে নুন পড়ে হঠাৎ।

মহুয়া বলে—তুই তো আচ্ছা মেয়ে জুঁই! ছেলেটাকে কষ্ট দিচ্ছিস শুধু শুধু! দেখত তোকে কত ভালোবাসে ছেলেটা!

আমি ঠোঁট উল্টে বলি—তুই-ই দেখ, যা! আমি যেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই সেদিকে ফিরে তাকাই না আর। খাবার ওগরে দিলে তা বমি, ওদিকে তাকাতে নেই, ঘেন্না।

এসএসসি পাস করে ভর্তি হই শহরে। মহুয়া আর ফার্স্টবয় একই কলেজে, মফস্বলে। টুকরো কথা কানে আসে, মাঝে মাঝে দেখা হয়। মহুয়া আর ফার্স্টবয় নাকি প্রেম করছে! শুনে বেশ একটু দুঃখ হয়। বেশ একটু ঈর্ষা হয়। আর মহুয়াটার জন্য কষ্ট হয় খুব। মহুয়ার সাথে কেউ প্রেম করছে মানেই মহুয়া ব্যবহৃত হচ্ছে, পুরনো আসবাব যেমন ব্যবহৃত হয় অনাদরে, নেহাত প্রয়োজনে!

মহুয়ার সাথে দেখা হতেই মহুয়াকে বলি—তুই এত বোকা ক্যান রে? যে যা বলে তাই তোকে বিশ্বাস করতে হবে ক্যান? ও হারামজাদা বললে তোকে ভালোবাসে আর তুই অমনি বিশ্বাস করে ফেললি?

মহুয়া রেগে যায়, ফুঁসে ওঠে। ও আমাকে অপমান করে। বলে ফার্স্টবয় আমাকে প্রথমে অপমান করেছিল বলেই আমি আর সহ্য করতে পারি না তাকে, এখন মহুয়াকেও হিংসে করি আমি!


পুরুষতন্ত্রের পাছায় কষে কয়েকটা লাথি মারব আমরা, থুতু ছিটাব তার নোংরা মুখে তবেই শান্তি আমাদের!


খুব কষ্ট হয় আমার। মহুয়া কী করে একথা বলতে পারে! ওকে আমি সত্যিই ভালোবাসি। ও খারাপ মেয়ে বলে সবাই ওকে এড়িয়ে চললেও আমি সব সময় সহজ, স্বাভাবিক থাকি ওর কাছে, ওর যেকোনো বিপদে ছায়া দিতে চেষ্টা করি সবসময়, অথচ কী করে ও এমন কথা বলতে পারে আমাকে!

আমি ওকে বলি—তুই আর কোনোদিন আমাদের বাড়ি আসিস না মহুয়া! তোর সাথে আর কোনোদিন কথা বলব না আমি। তোর আর শিক্ষা হবে না! তুই যা!

মহুয়া চলে যায়। আমিও শহরে চলে যাই আবার। মাঝে মাঝে গ্রামে যাই। মহুয়ার সাথে দেখা হয় না। ও আসে না আর। আমি তো কোনোদিনই যাই না ওদের বাড়িতে। খবর পাই। বেশ চলছে। ইন্টারমিডিয়েট পাস করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির কোচিং করছি। ফার্স্টবয়ও একই কোচিং সেন্টার-এ ভর্তি হয়। মহুয়া ফেল করে। আমরা রুম ভাড়া নিয়ে থাকি। রুমমেট টুনি। ও আর আমি মনের সুখে সিগারেট খাই এখন। দেখার কেউ নেই। রুমের দরজা বন্ধ করে দিব্যি ধোঁয়া ছাড়ি দুজন। আলোচনা করি কমিউনিজম নিয়ে, গণতন্ত্র আর ধনতন্ত্র নিয়ে। আলোচনা করি মোপাসাঁ, মার্ক টোয়েন, আরও সব হাবিজাবি নিয়ে। আমরা দুজনই স্বপ্ন দেখি একদিন সব জঞ্জাল দূর হবে। গল্প, উপন্যাস আর রূপকথার মতো আলো ঝলমলিয়ে উঠবে চারপাশে। টুনি আর আমি একসাথে কোচিং-এ যাই, একসাথে ফিরি। টুনিকে ফার্স্টবয় এর গল্প বলি, ও হেসে গড়ায়, ফার্স্টবয় আমাকে আর টুনিকে দেখলে পালিয়ে বাঁচে। বেশ বন্ধুত্ব জমেছে তার কয়েকটি মেয়ের সাথে। বেচারা মহুয়া। ভারি করুণা করতে ইচ্ছে হয় ওকে। আমি আর টুনি অনেক পাগলামি করি । কারণ ছাড়াই অনেক অনেকদূর হেঁটে হেঁটে চলে যাই, আবার ফিরে আসি। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করি। আমরা চাকরি করব না, ব্যবসা করব, অনেক টাকা হবে, তারপর সেসব ব্যয় করব সমাজ উন্নয়নে, ভেবে উত্তেজিত হয়ে উঠি।

আমরা বলাবলি করি চলমান এই পুরুষতন্ত্রের পাছায় কষে কয়েকটা লাথি মারব আমরা, থুতু ছিটাব তার নোংরা মুখে তবেই শান্তি আমাদের! কী করে তা করব তা অবশ্য স্থির করতে পারি না ভেবে। তবে করব যে সে ব্যাপারে দৃঢ় মত পোষণ করি উভয়েই। তারপর নিজেদের পাগলামিতে নিজেরাই হেসে গড়াই। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আমরা উঠেপড়ে লাগি।

টুনি বলে, চল এক কাজ করি—এভাবে রুমের মধ্যে পড়তে ভালো লাগে না, আমরা বইখাতা নিয়ে খোলা আকাশের নিচে চলে যাই, ভালো নির্জন কোনো জায়গায় বসে সারাদিন পড়ব, তারপর বিকেলে ফিরে আসব!

কথাটা খুব মনে ধরে আমার। আমিও লাফিয়ে উঠি আনন্দে। টিফিন ক্যারিয়ারে দুপুরের খাবার নিয়ে আমরা নির্জন স্থানের খোঁজে বের হই। হাঁটতে হাঁটতে অনেক বড় বাঁধানো একটা পুকুরপাড়ে বসি আমরা। খুব পছন্দ হয় জায়গাটা আমাদের। আমরা দুজনেই যার যার মতো বসে পড়ি। পড়তে শুরু করি। মাঝে মাঝে গল্প করি। বেশ মনোযোগে পড়তে থাকি। একদিন তেমনি পড়ছি, হঠাৎ টুনির ডাকে চমক ভাঙ্গে।

টুনি প্রায় ফিসফিস করে বলে—এই জুঁই! ওদিকে দেখ!

চমকে বলি—কী হয়েছে? কী দেখব?

টুনি আঙুল উঁচিয়ে পুকুরের ওপার নির্দেশ করে। বলে—দেখ! দেখ! তোর ফার্স্টবয়! প্রেম করতে এসেছে বোধহয়!

মুখ তুলে তাকিয়ে ভারি অবাক হয়ে যাই! বটেই তো! কিন্তু সাথে ওটা তো মহুয়া! মহুয়া এখানে এসেছে কী করতে? প্রেম! বাহ্! বাহ্! ভালো তো! টুনি মহুয়াকে চেনে না। সে হই হই করে ওঠে।

—হেই ফার্স্টবয়!—বলে সে চেঁচায়।

আমরা অমন করি। রাস্তায় কোনো জুটি দেখলে আওয়াজ দিয়ে দৌড়ে পালাই। হেসে গড়াই। ফার্স্টবয় চমকে এদিকে তাকায়। মহুয়াও শব্দ শুনে মুখ তুলে তাকায়। দূর থেকে সে প্রথমে আমাকে দেখে চিনতে পারে না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর চেনে হয়তো। কারণ আমরা দেখতে পাই সে পায়ে পায়ে আমাদের দিকে এগোয়। পেছন পেছন রামছাগলের মতো এগোয় ফার্স্টবয়। আমি ততক্ষণে টুনির শাপ শাপান্ত করে চলি।

বলি, হারামজাদি! তোকে কে অমন চেঁচাতে বলল শুনি?

টুনি আমার হঠাৎ পরিবর্তনে চমকায়। ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলে—কী হলো তোর? রেগে গেলি কেন অমন?

আমি দ্বিগুণ রেগে গিয়ে বলি—থাপড়ায়ে দাঁত ফেলব হারামজাদি! চুপ কর!

ততক্ষণে মহুয়া আমার সামনে চলে আসে।

ও আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসে—তারপর বলে, কেমন আছিস জুঁই? ভালো!

অন্যদিকে তাকিয়ে বলি আমি। মহুয়ার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না আমার। অপমানটা ভুলি নি আজও। মহুয়া আমার পাশে বসে। ফার্স্টবয় তার পাশে। তারপর মহুয়া তার কথা বলে যায়। টুনি আর আমি শুনি। ফার্স্টবয়ও শোনে। সে অন্যদিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে থাকে। সাবধানে আমার সাথে চোখাচোখি এড়িয়ে যায়। মহুয়া বলে তার কথা। আমার কাছে অপমানিত হয়ে ফার্স্টবয় মহুয়ার সাথে তার দুঃখ ভাগ করত। মহুয়াও বলত তার কষ্টের কথা ফার্স্টবয়কে। এতে তাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব হয়। এখন সেটা প্রেম! মহুয়া এতদিন শুধু ঠকেছে। এবার সে একটু একটু করে বুঝতে শিখছে ভালাবাসা কী! আর সে ঠকবে না! আর সে ভালোবেসে প্রতারিত হবে না কোনোদিন! মহুয়ার কণ্ঠে এমন দৃঢ় প্রত্যয় বাজে, যাতে আমি আর টুনি অবাক হই, চমকে উঠি। টুনি এতক্ষণে বুঝে নিয়েছে কে মহুয়া, গল্প তো তার শোনা ছিল ঢের আগেই। আমি মনে মনে বলি, ঈশ্বর! মহুয়াকে এবার তুমি জিতিয়ে দাও! যে লম্বা পথ তার সামনে আছে সে পথটুকুতে যেন ফার্স্টবয় তার সঙ্গী হয়। টুনি এবার ফার্স্টবয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।

গলায় ফুর্তি ঢেলে বলে—তুমি সত্যিই ফার্স্টবয় ইয়ার!

ফার্স্টবয় লজ্জায় মুখ নিচু করে বসে থাকে। কোনো কথা বলে না সে। আমার হঠাৎ শিরশির করে ওঠে শরীর। কেমন শীত শীত লাগে। ভয় ভয় লাগে। মহুয়ার সামনে অনেকটা লম্বা পথ! কী আছে সে পথে? ফার্স্টবয় শেষ পর্যন্ত পারবে তো জীবনের দৌড়ে ফার্স্ট হতে? হেমন্তের হিমেল হাওয়া কেমন কাঁপিয়ে দিয়ে যায় উপস্থিত সবাইকে। শুধু মহুয়া বসে থাকে স্থির। বিশ্বাসের পাথরে খোদাই মূর্তি…

শিল্পী নাজনীন

শিল্পী নাজনীন

জন্ম ১৪ জুলাই, ১৯৮১; কুষ্টিয়া। কবি, কথাচিত্রী।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই :
ছিন্নডানার ফড়িঙ [উপন্যাস, কাা বুকস, ২০১৬]
আদম গন্দম ও অন্যান্য [গল্পগ্রন্থ, ছিন্নপত্র প্রকাশনী, ২০১৭]
তোতন তোতন ডাক পাড়ি [শিশুতোষ গল্প, ছিন্নপত্র প্রকাশনী, ২০১৭]

ই-মেইল : 81naznin@gmail.com
শিল্পী নাজনীন

Latest posts by শিল্পী নাজনীন (see all)