হোম গদ্য গল্প প্রেমের অসুখ

প্রেমের অসুখ

প্রেমের অসুখ
976
0

সুস্মিতার প্রেম হয় না। কেন হয় না? জানতে হলে কষ্ট করে এই গল্পের ভেতরে আপনাকে ঢুকতে হবে। অবশ্য গল্পে ঢুকতে খুব বেশি কষ্ট হওয়ার কথা না। কারণ, লোকে বলে, এই লেখকের ভাষা সহজ। পড়তে কোথাও আটকায় না। লেখক নিজেও তার সহজ ভাষার গৌরব করেন উপরে উপরে। কিন্তু বিব্রত হন ভেতরে ভেতরে। কারণ, কঠিন ভাষা তিনি জানেন না। জানেন না বলে বাধ্য হয়ে সহজ ভাষায় লেখেন আর তৃপ্ত হওয়ার ভান করেন। এটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ। এর সাথে সুস্মিতার প্রেম না হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।

বাবা-মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে সুস্মিতাদের সংসার। শহরের ধারে পুরনো ধাচের পূর্বপুরুষের ভিটেয় তাদের বসবাস। কালচে রঙের একতলা বাড়ির অনেক জায়গায় ফাটল ধরেছে। কোথাও বেরিয়েছে পরগাছা। ছাদে উঠার সিঁড়ির রেলিং অনেক আগেই ভেঙে গেছে। ছাদের রেলিং কয়েক জায়গায় খসে পড়েছে। তাই সুস্মিতার ছোট ভাই মিথুনের একা একা ছাদে ওঠা বারণ।

উঠোনের উত্তর পাশে মিথুনের চুলের মতো ঝাঁকড়া একটা তুলশি গাছ। সাবিতা বিশ্বাস প্রতিদিন গোসলের আগে গাছের গোড়া লেপে ঝকঝকে করে রাখেন। সন্ধ্যায় প্রণাম করেন। সুস্মিতার বাবা হরিহর বিশ্বাসের ছোট ব্যবসা। মঙ্গলবাড়িয়া বাজারে জুয়েলারির দোকান। হরিহর তার স্বর্গীয় বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন এই ব্যবসা। দোকানটাই তাদের খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, যেভাবে তারা বাঁচিয়ে রেখেছে উঠোনের তুলশি গাছকে।


সুস্মিতার কথায় মাথায় হাত ওঠে পারুলের—মিয়া হয়ে তুই ক্যাম্মা আগ বাড়ায়ে পেমের প্রস্তাব দিবি! মানসম্মান কিছু থাকপিন মনে করছিস!


সুস্মিতা এবার কলেজে উঠেছে। স্কুলে থাকতে কলেজ সম্পর্কে সে নানা রকম রং-বেরঙের গল্প শুনত। স্কুল বদ্ধ পুকুর। কলেজ হলো বহমান নদী। এখানে নদীর স্রোতের মতোই ভেসে চলা যায় যেদিক খুশি সেদিক। স্যারদের গাইডেন্সি কম। পড়ালেখার চাপও নাকি কম। স্কুলের মতো প্রতিদিন ক্লাশে দাঁড়িয়ে মুখস্ত পড়া বলতে হয় না। স্যাররা আসেন, লেকচার দেন, চলে যান। কলেজের সবচে’ আকর্ষণীয় বিষয় প্রেম। এখানে নাকি সহজে সবার প্রেম হয়ে যায়। সুস্মিতার সাধ—কোনো একটা ভালো ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়ানো। জীবনের সুখ দুঃখগুলো ভাগাভাগি করা। এই ভাবনা একদিনে দানা বাঁধে নি। কাছের বান্ধবী পারুল তাকে প্রেমের ব্যাপারে লোভী করে তুলেছে। ক্লাস টেনে থাকতেই সিফাতের সাথে পারুলের প্রেম। সিফাত সরকারি কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। দেখতে ভালো। ছাত্র ভালো। শোনা যায়, পড়ালেখা শেষ হলেই তার দামি চাকরি হয়ে যাবে। তবে সিফাতের যে জিনিস সবচে’ বেশি ভালো লাগে সুস্মিতার, তা ওর সাহস। সিফতের সাহস, প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করার ক্ষমতা সম্পর্কে সবাই অবগত। একবার, পারুলরা তখন স্কুলে পড়ে, শওকত স্যারের সাইকেল চুরি হলো। অফিসের দক্ষিণ পাশে বকুল গাছের তলায় হিরো সাইকেল তালা মেরে রেখেছিলেন শওকত স্যার। স্যার বিস্কিট খেয়ে জানলা দিয়ে কুলি করতে গিয়ে দেখেন সাইকেল নেই বকুল তলায়। ভাবলেন, একটু পাশে রেখেছেন, জানলা দিয়ে জায়গাটা নজরে আসছে না। তবু মনের খচখচানি দূর করতে তিনি বাইরে আসলেন দেখতে। নেই, কোথাও নেই। কে নিয়েছে কেউ দেখে নি। এমনিতে স্যারের অভাব চলছে। স্ত্রীর সিজার করাতে গিয়ে একগাদা পয়সা বেরিয়ে গেছে হাসপাতালে। এই অবস্থায় নতুন সাইকেল তিনি সহজে কিনতে পারবেন না। প্রতিদিন রিকশা ভাড়া দিয়ে আসা যাওয়া করাও প্রায় অসম্ভব। তিনি ঘামতে লাগলেন। ছাত্রছাত্রীরা চারপাশে খোঁজা শুরু করল। কোথাও নেই। ঘটনাক্রমে ওই সময় স্কুলে এসেছিল সিফাত। শওকত স্যারের কাছে তার কী একটা দরকার ছিল। ঘটনা শুনে সে দৌড়ে গেল রাস্তায়। দেখল অল্পবয়সী একটা ছেলে স্যারের সাইকেল চালিয়ে হারুর মোড় পার হচ্ছে, ঝড়ের গতিতে। সিফাত সাইকেলের পেছনে দৌড় শুরু করল। কিন্তু চোরের সাথে তার দূরত্ব কেবল বাড়ছেই। সে বুঝল, দৌড়ে চোরের নাগাল পাওয়া যাবে না। সে দৌড়ের উপর আবার ছুটে আসল স্কুলে। আলফাজ স্যারের মোটর সাইকেল নিয়ে ধাওয়া লাগাল চোরের পেছনে। তামালতলার এই রাস্তার আর কোনো শাখা প্রশাখা নেই। চোরকে তাই সোজা একই রাস্তা ধরে চলতে হলো। সিফাত খুব সহজে চোরের নাগাল পেয়ে গেল। এক পথচারীর সহযোগিতায় সে যখন চোরের কলার ধরে নিয়ে আসল স্কুলে, হইচই পড়ে গেছে স্কুলজুড়ে। ক্লাস অফ। সুস্মিতা পারুলসহ সকল ছাত্রছাত্রী বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছে কাণ্ড। এর আগেই সিফাতের সাথে পারুলের প্রেম হয়ে গেছে। সিফাতের কীর্তির গর্বে পারুলের তাই পা পড়ছে না মাটিতে। পারুলের চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে সিফাত তার মনের মানুষ। কিন্তু বলতে পারছে না। দুচারজন কাছের মানুষ ছাড়া কেউই জানে না তাদের প্রণয়ের কাহিনি। গ্রামের, মফস্বলের প্রেমের প্রকৃত আনন্দ এই গোপনীয়তায়।

সুস্মিতা খেয়াল করে দেখল, পারুলের চোখেমুখে ঝলমলে আলো। আনন্দ আর উত্তেজনা আগুনের আঁচে হাঁড়ির মুখে উথলে উঠা দুধের মতো তার শরীর বেয়ে উপচে পড়ছে। সেই থেকে সুস্মিতার শখ অথবা সাধ—সিফাতের মতো দুরন্ত, চালু, সাহসী একটা ছেলের প্রেমিকা হওয়া। পারুল খুব সুখী। প্রেমের সুখ তো আছেই, পথে-ঘাটে চলতেও তার অনেক সুবিধা। সুন্দরী মেয়েদের যারা উত্যক্ত করে, সেই বখাটেরা জানে পারুল সিফাতের হবু বউ। তাই টিজ করা দূরে থাক, পারুলের গায়ে ফুলের একটা টোকাও তারা দেয় না।

কলেজে উঠেই মনে মনে সিফাতের মতো ছেলে খুঁজতে শুরু করে সুস্মিতা। দুইমাসের আসা যাওয়ায় সুজন নামের একটা ছেলেকে সে গোপনে নির্বাচন করে ফেলে। সুজন কলেজে এক বছরের সিনিয়র তার। মাঝে মাঝে মোটর সাইকেল নিয়ে কলেজে আসে। চোখে থাকে সানগ্লাস। বোঝা যায়, ওরা বেশ অবস্থাপন্ন। কলেজের যে কোনো ফাংশন কিংবা হট্টগোল—সবখানেই সুজন নেতা। স্যারদের সাথেও তার ভালো কানেকশন। তাই রেগুলার ক্লাস না করেও পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো। সুস্মিতা মাঝে মাঝে চোখ বুজে নিজের ডানপাশে সুজনকে কল্পনা করে। দুজনকে বেশ ভালো মানাবে বলেই তার ধারণা। মনে মনে সে বাইকের পেছনে ওঠে। আলতো করে ডান হাত রাখে সুজনের চওড়া কাঁধে। ধীরে ধীরে বাইকের গতি বাড়ে আর সুস্মিতার বেয়াড়া চুল আরো বেয়াড়া হয়ে ওঠে। হঠাৎ অতর্কিত ব্রেক কষলে সুস্মিতার বুক গিয়ে লাগে সুজনের সটান পিঠে। লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে সুস্মিতার ফর্সা মুখ। সে আদুরে ভঙ্গিতে সুজনের কান টেনে দিয়ে বলে—খুব তো তুমি!

একদিন ক্লাসের ফাঁকে মনের কথা পারুলকে শেয়ার করে সুস্মিতা। সুজনকে তার পছন্দ। পারুল যেন কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেয়। সুস্মিতার কথায় মাথায় হাত ওঠে পারুলের—মিয়া হয়ে তুই ক্যাম্মা আগ বাড়ায়ে পেমের প্রস্তাব দিবি! মানসম্মান কিছু থাকপিন মনে করছিস!

সুস্মিতা বলে, দ্যাখ পারু, এই সিস্টেম এখন থেকে চেঞ্জ করা লাগবি। সারা জীবন ছাওয়ালরাই ক্যান আগে আগে প্রেমের প্রস্তাব দিবি! আমারে কি পছন্দ অপছন্দ বলে কিছু নি!

একা তুই এই সিস্টেম চেঞ্জ কত্তি পারবিনেন। ইডা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। ছাওয়ালরাই আগে আমারে কাছ আসবি। বললি তুই বিশ্বাস করবিনেন, সিফাতের আমি টানা ছয় মাস নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাইছি তারপর একসেপ্ট করছি। প্রথমেই যদি হাসি মুকি রাজি হয়ে যাতাম, সে কি আমার এত ভালোবাইসত! বাইসত না। বেশি ভালোবাসা পাওয়ার এইডে একমাত্র সিস্টেম। নিজির দামডা আগে ধরে রাখা লাগবি। তাহলি ছ্যামড়ারাও তোর দাম দিবি।

তুই আর আমি সুমান না। তোর বাটখারা দিয়ে আমাক মাপিসনে। সিফাত তোর পিছনে ঘুরত। সুজন তো আমার পিছনে ঘোরে না। তাহলি দামডা নেব ক্যাম্মা আর নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাবই বা ক্যাম্মা! এর ভিতর যদি অন্য কারুর সাথে সুজনের লাইন হয়ে যায়! এমনি রুবির ভাবসাব আমার ভালো ঠেকে না। ও ক্যামুন ক্যামুন করে সুজনের দিক তাকায় খালি।

তাই যদি হয় তাহলি সুজনের বাদ দিয়ে দে। দুনিয়ায় ছাওয়ালের অভাব নাকি!

খবরদার, যা বলিছিস বলিছিস। আর কইসনে। অনেক ভাবেচিন্তে সুজনের সিলেক্ট করিছি। বাদ দিয়া অসম্ভব।

তাহলি এক কাজ কর, কিছুদিন সুজনের সামনে যায়ে ইলিক ঝিলিক মারা শুরু কর। যাতে ও বুঝতি পারে তুই ওরে লাইক করিস। এইডে ও বুঝলিই কাজ হয়ে যাবিন। তখন দেখবি ও নিজিই তোর পিছনে ঘুরা শুরু করেছে। এইসব ছ্যামড়ারে আমার ভালো করে চিনা আছে।

পারুলের পরামর্শ পছন্দ হয় সুস্মিতার। অতঃপর সে কলেজে এসে সুজনের নজরে পড়ার মতো আচরণ শুরু করে। সুজনের সামনে প্রায়ই তার হাত থেকে বই পড়ে যায়। সুজন কলপাড়ে পানি খেতে গেলে তারও পিপাসা লাগে। ক্লাস না থাকলে সুজন তার বন্ধুদের সাথে কাঠবাদাম গাছতলায় আড্ডা মারে। এসময় সুস্মিতা দোতলার বারান্দায় এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, যেন সুজন মাথা তুললেই দুজনের চোখাচোখি হয়।

সুস্মিতার এই গায়ে পড়া আচরণ সুজন খেয়াল করে। কখনো সে সুস্মিাতার দিকে তাকিয়েও থাকে। কিন্তু সেই চাহনিতে কোনো প্রশ্রয় নেই। কোনো মুগ্ধতা নেই। আছে নির্লিপ্ততা আর উদাস উদাস ভাব। সুস্মিতার গা জ্বলে যায়। হাল ছেড়ে দিয়ে আবার পারুলকে ধরে। এভাবে কাজ হবে না। ডাইরেক্ট অ্যাকশন নিতে হবে। পারুল কথা দেয়, সে এই ব্যাপারে সুজনের সাথে কথা বলবে।

পরদিন দুরুদুরু বুকে কলেজে আসে সুস্মিতা। পাওয়ার আশা আর হারানোর ভয় মিলেমিশে আশ্চর্য এক পাণ্ডুলিপি তৈরি হয় তার মনের জানালায়। পারুল জানায়—সুজন তোকে পছন্দ করে।

আনন্দে সুস্মিতা দুইহাত সামনের দিকে ছুঁড়ে মারে। যেন সে পেস বোলার। মাত্রই কোনো বাঘা ব্যাটসম্যানের ইউকেট উপড়ে দিয়েছে।

কিন্তু…

কিন্তু কী? সুস্মিতার মুখ ফ্যাকাশে দেখায়।

তোক ভালোবাসতি আপত্তি নি সুজনের। কিন্তু তোদের ধর্ম যে আলাদা আলাদা। তুই হিন্দু, সুজন মুসলমান। তোদের পেম-ভালোবাস-বিয়ে তো সমাজ মানে নেবে না। সুজন তাই জড়াবে না তোর সাতে।


সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভেতর বেড়ে উঠা সুস্মিতা এতকাল পর প্রেমের প্রেক্ষাপটের সামনে দাঁড়িয়ে তার হিন্দু পরিচয় মুখ্য হয়ে উঠলে সে হোঁচট খায়।


সুস্মিতা মুহূর্তে ফুটো বেলুন হয়ে যায়। যেন উইকেট সে ঠিকই উপড়েছিল কিন্তু ডেলিভারিটা ছিল নো বলের। সুস্মিতা ঝড়ের আগের নদীর মতো গম্ভীর। এই প্রথম নিজেকে তার আর সব মানুষ থেকে আলাদা লাগে। হিন্দু হিন্দু লাগে। যে মহল্লায় তাদের বাস, সেখানে তারাই একমাত্র হিন্দু পরিবার। শৈশব থেকে সে এই মহল্লাতেই বড় হয়েছে। নিজেকে কখনো তার হিন্দু বা সংখ্যালঘু মনে হয় নি। সংখ্যালঘুত্বের সুযোগে কেউ কোনো দিন অপমানসূচক কথা বলে নি। উল্টো প্রতিবেশীরা সব সময় তাদের প্রতি বাড়তি সহানুভূতি দেখিয়েছে। ঈদে কিংবা পুজোয় সবাই একসাথে আনন্দ ফুর্তি করেছে। মুসলমান বাচ্চাদের বুকে কফকাশি জমলে ওদের মায়েরা এসে সুস্মিতাদের তুলশিপাতা নিয়ে গেছে। আবার সুস্মিতার হাত রাঙানোর দরকার পড়লে জয়নাল কাকার বাড়ি গিয়ে মেহেদি পাতা তুলে এনেছে। কেউ বলে নি, তুই হিন্দু, তোক মেন্দিপাতা দিয়া যাবি নে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভেতর বেড়ে উঠা সুস্মিতা এতকাল পর প্রেমের প্রেক্ষাপটের সামনে দাঁড়িয়ে তার হিন্দু পরিচয় মুখ্য হয়ে উঠলে সে হোঁচট খায়। চাঁদের হাট ডিগ্রি কলেজের বেঞ্চে বসে সুস্মিতা সারা গা হাতিয়ে হাতিয়ে তার হিন্দুত্ব খোঁজার চেষ্টা করে। একবার পারুলের আর একবার নিজের চোখ-নাক-গাল-চিবুক স্পর্শ করে দুজনের পার্থক্য ধরার চেষ্টা করে। মুসলমান পারুল আর হিন্দু সুস্মিতার শরীরী কোনো পার্থক্য না পেয়ে সে হতাশ হয়।

এরপর থেকে সুস্মিতা বড্ড চুপচাপ হয়ে যায়। না, সুজনের শোকে নয়। সুজনকে তো সেদিনই সে মনের উঠোন থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে। এখন তার মনের উঠোন তাদের তুলশিতলার মতোই ঝকঝকে। চুপচাপ হওয়ার কারণ—নতুন পরিচয় আবিষ্কারের ধাক্কা।

এক সন্ধ্যায় সাবিতা তুলশিতলায় প্রদীপ জ্বালাচ্ছিলেন। সুস্মিতা মায়ের কাঁধ ছুঁয়ে বলে, আচ্ছা মা, হিন্দু হয়ে কি মুসলমান ছাওয়ালের বিয়ে করা যায়?

মেয়ের দিকে বড় বড় চোখে তাকান সাবিতা। টানা টানা গলায় বলেন, ত্ইু কি কোনো মুসলমানের ছাওয়ালেক..

না মা, মাঝপথে মাকে থামিয়ে দেয় সুস্মিতা, আমি কোনো মুসলমানকে বিয়ে করি নি। এমনি জানতি ইচ্ছে করল।

দ্যাখ সুসি, তুই সবই জানিস, আমরা গরিব। দুনিয়ায় কিছুই নি আমারে। থাকার মুদি আছে খালি ওই ধর্ম। ওইডারে নষ্ট করবি নে, তোর দোহাই লাগে। তাছাড়া..।

তাছাড়া?

এই দেশে হিন্দু হয়ে তুই কোনো মুসলমানরে বিয়ে কত্তি পারবিনেন। কত্তি গেলি তোকও মুসলমান হওয়া লাগবি। মুসলমান হলি আমারে সাতে তোর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবি। সেই জন্যি কচ্ছি, খবরদার সুসি, ভুল করিস নে।

আচ্ছা মা, তুমি আমাক নিয়ে কুনু চিন্তা কোরো না। সুস্মিতা মায়ের কাঁধে আলতো করে মাথা রাখে। মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।

রাতে ঘুম ধরা দেয় না সাবিতার চোখে। মেয়েটার জন্য দুশ্চিন্তা হয়। বুকের ভেতর পাথরের মতো ভারি কিছু একটা আটকে থাকে। স্বামীর পরিকল্পনার সাথে তিনিও কি হাত মেলাবেন!

হরিহর বিশ্বাস সবকিছু বেচেটেচে প্রায়ই ওপারে চলে যাওয়ার কথা বলেন। তার বড় ভাই তারপদ বিশ্বাসও চলে গেছে বছর সাতেক আগে, এখানকার শিকড় উপড়ে। এখানে হরিহর ঝুঁকির ভেতর আছেন তা কিন্তু নয়। দেশের নানা জায়গায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবর শুনলেও তিনি নিজে কখনো ওসবের মুখে পড়েন নি। বরং মুসলমানদের সাথে তার সম্পর্ক খুবই গাঢ়। তবু কোথায় যেন এটা কাঁটা বিঁধে আছে। সুখ আছে কিন্তু স্বস্তি নেই। দোকানে বসলে পরিচিতজনরা তাকে নমস্কার জানায়। কিন্তু হরিহর আগ বাড়িয়ে কাউকে নমস্কার দিতে পারেন না। তাকে তখন সালামই দিতে হয় পথচারী কিংবা কাস্টমারকে। তারাপদকে তিনি দাদা ডাকতেন। তারাপদ চলে গেছে, সাথে নিয়ে গেছে দাদা ডাকটাও। এখানে দাদার মতো অনেকেই আছে। কিন্তু কাউকে দাদা সম্বোধনে ডাকতে পারেন না। ডাকতে হয় ভাই। এই রকম ছোটখাটো বিষয়, অন্যরা যা ধর্তব্যের ভেতরই রাখে না, হরিহরকে তা অস্বস্তিতে ফেলে রাখে দিনরাত। তাছাড়া পরিবেশ এখন ভালো আছে, এই সুদিন সব সময় থাকবে তার ঠিক কি। হরিহর তাই মাঝে মাঝেই স্ত্রীকে ওপারে চলে যাওয়ার কথা বলেন। সেখানে তার অনেক আত্মীয়-স্বজন। স্বস্তিকর নিরাপদ এক জীবন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।

এতদিন স্বামীর কথা কানেই তোলেন নি সাবিতা। এই বাড়ি তার শাড়ির আঁচলের মতোই চেনা এবং পরিচিত। গেটের মুখে দুটো নারকেল গাছ তার বিয়ের বয়সের সাক্ষী। এ-বাড়ি বউ হয়ে আসার এক মাসের মাথায় গাছদুটো লাগিয়েছিলেন তিনি। পলেস্তরা খসা দেয়ালে কান পাতলে এখনো হয়তো শোনা যাবে স্বর্গীয় শ্বশুর শাশুড়ির কণ্ঠস্বর। এইসব ছেড়েছুড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না সাবিতা। কিন্তু সুস্মিতা আজ যা বলল, ভয় ধরে গেছে সাবিতার। সুস্মিতার এই বয়সটাকে তিনি চেনেন। বড়ই পিছলা এই সময়। মেয়েরা বড় বড় সকল দুর্ঘটনা এই বয়সে ঘটায়। ভগবান না করুক, মেয়ে কোনো মুসলমানের ছেলের সাথে জড়িয়ে গেলে বিরাট বিপদ হবে। এই বিপদ এড়াতে স্বামীর দেশত্যাগের ইচ্ছা নিজের ভেতর নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেন সাবিতা।

ওদিকে কয়দিনের ভেতর ধাক্কা সামলে সুস্মিতা আবার প্রেমের সন্ধানে নেমে পড়ে নতুন উদ্যমে। এবার তার প্রথম টার্গেট স্বজাতির ভেতর সাহসী ছেলে খুঁজে বের করা। কদিনের খোঁজাখুঁজির পর সুস্মিতা হতাশ হয়ে পড়ে। কারণ, এলাকায় হিন্দু ছেলের বড় আকাল। তাদের কলেজে হিন্দু ছেলে মোটে চারটে। এদের কাউকেই পছন্দ না সুস্মিতার। পারুলকে দিয়ে মায়ের ফোনে সে ফেসবুক একাউন্ট খুলে নেয়। সুন্দর মুখের প্রোফাইল পিকচারের কল্যাণে অল্পদিনে সে অনেক বন্ধু পেয়ে যায়। ইনবক্সে নানা রকম মেসেজ আসে। কেউ কেউ প্রেমের প্রস্তাবও দেয়। সুস্মিতা খুঁটে খুঁটে সবার প্রোফাইলে ঢুকে রিলিজন চেক করে। তার এলাকায় যেমন হিন্দু ছেলের সঙ্কট, একই ঘটনা ফেসবুকেও। পছন্দের কোনো ছেলের ধর্মই হিন্দু নয়। বিরক্ত হয়ে একদিন সে মায়ের কাছে আশ্রয় নেয়। মা যেন ঘাবড়ে না যায় তাই হাসির ছলে বলে, জানো মা, অনেক মুসলমান ছ্যামড়া আমাক না চিনে ভালোবাসার প্রস্তাব দেয়। আমিও কম নাকি, সাতে সাতে কয়ে দি—আমি হিন্দু। হিন্দুক বিয়ে কত্তি পারবা? ছ্যামড়াগুলোর চিহারা তখুন যা হয় না! দেখার মতো। এরপর সুস্মিতা আসল ঘুঁটি চালে—আচ্ছা মা, তুমার কখনো এমুন সমস্যা হয় নি? তুমিও তো এক সময় আমার মতো ছিলে।

সাবিতা কতক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন অবাক চোখে। চাইলেই তার কথার জবাব দেয়া যায়।  কিন্তু জবাব না দিয়ে তিনি ভিন্ন প্রসঙ্গ তোলেন—তোর বাবা একেনে থাকতি চায় না।

থাকতি চায় না মানে! কোনে যাবি?

ভারতে।

তাহলে তো ভালোই হয়। ওকেনে গেলি অনেক হিন্দু ছ্যামড়া পাওয়া যাবিন, তাই না মা! হি হি।

একেন তে চলে গেলি তোর খারাপ লাগবিনেন?

তা তো ইট্টু লাগবিনিই। কিন্তু ওকেনে তো অনেক আত্মীয়-স্বজন আছে। বড়া কাকারা আছে। ওই জাগার কলেজও মনে হয় বড়। অনেক ছাওয়াল মিয়া পড়ে। গেলি পারে আনন্দই হবি নি।

তুই কি যাতি চাস ভারতে?

তুমরা যদি যাও আমু রাজি।


আমি কোথাও যাব না মা। ছাওয়াল মিয়ার প্রেমের চাইতে দেশপ্রেম অনেক বড়। আমি এই দ্যাশেই থাকপ।


সেদিন রাতে স্বামীকে মেয়ের সঙ্কটের কথা খুলে বলেন সাবিতা। হরিহর বিশ্বাসের মাথার ভেতর আগে থেকেই দেশত্যাগের পোকা কুটকুট করে কামড়াচ্ছিল। এবার স্ত্রীর সমর্থন পেয়ে মাথার ভেতরের পোকাটা বাইরে চলে আসে। তবু তিনি শেষবারের মতো ঠান্ডা মাথায় ভাবেন। বড় ভাই তারাপদের কাছে ফোনে পরামর্শ চান। তারাপদ ওখানকার স্বাচ্ছন্দ্যময় নিরাপদ জীবনের লোভ দেখান। পরামর্শ দেন—বাড়িঘর আর দোকানপাট ভালো দামে বেচে আসতে পারলে ওখানে ভালোভাবে জীবন শুরু করা সম্ভব। তাছাড়া গুছিয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত তারা দাদার বাড়িতেই থাকতে পারবে।

কয়েকদিনের ভেতর মহল্লাবাসী জেনে যায়, তারাপদের মতো হরিহর বিশ্বাসও উপড়ে ফেলছে এদেশের শিকড়। কিন্তু যাওয়ার আগে সবকিছু বেচে গোছগাছ করে তবেই তো পা বাড়ানো। সেটা অনেক দিনের ফ্যারা। হরিহর তাই সিদ্ধান্ত নেন পরিবারকে কলকাতায় দাদার কাছে রেখে ফিরে আসবেন। সব বিক্রিবাট্টা করে একবারে চূড়ান্ত যাওয়া যাবেন।

কলকতা যাওয়ার আগের দিন বিকালে ছাদে বসে সুস্মিতা বাংলাদেশের আকাশ দেখে। এক ঝাঁক বক মহাশূন্যে মালা বানিয়ে উড়ে যাচ্ছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে। সুস্মিতার একটু মন খারাপ হয়। এরপর হয়তো আর কোনো দিন এই ছাদে বসে তার আকাশ দেখা হবে না। সাবিতা গোছগাছ করছেন। মিথুন ঘুড়ির নাটাই ঠিক করছে উঠোনে বসে। বাংলাদেশের ঘুড়ি এরপর কলকাতায় উড়বে। চুলোর পাশের হাঁড়িপাতিল সরাতে গিয়ে সাবিতার চোখ পড়ে তুলশি গাছের উপর। গাছটাকে আজ কি একটু ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে! সাবিতার খেয়াল হয়, গোছগাছের ব্যস্ততায় আজ জল ছিটানো হয় নি পাতায়। বিক্রির পর বাড়িটা কেমন মালিকের হাতে পড়বে, তাদের কাছে গাছটার আদৌ কোনো গুরুত্ব থাকবে কি না—চিন্তিত হন সাবিতা। তিনি গাছটা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। বেঁচে থেকে অসম্মানিত হওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। সাবিতা মিথুনকে কোদাল আনতে বলেন ঘর থেকে। কোদালের প্রথম কোপটা ছাদ থেকে দেখে সুস্মিতা আঁতকে ওঠে। এই বাড়ির উঠোনে তার নাড়ি  পোঁতা আছে। এতদিন বাদে সেই নাড়িটা যেন তার বুকের মাটিতে টান মেরে ধরে। তার মনে হয়, তুলশি গাছ কাটা পড়লে তার নাড়িও কাটা পড়ে যাবে। তুলশির প্রতিটা পাতা, বাড়ির প্রতিটা ইট, উঠোনের মুঠো মুঠো ধুলো যেন এক সাথে সুস্মিতার নাম ধরে ডাকতে থাকে। সুস্মিতার মস্তিষ্কের কোষে কোষে ধ্বনিত হয় এই দেশের পাখির গান। সে লাফিয়ে লাফিয়ে ছাদ থেকে নেমে আসে নিচে। খপ করে ধরে ফেলে মায়ের কোদালহাত। কোদালটা কেড়ে নিয়ে সে তুলশির জীর্ণ পাতায় হাত বুলায়। অনুনয়ের গলায় বলে, এই দেশ ছাড়ে আমি কোথাও যাব না মা। ছাওয়াল মিয়ার প্রেমের চাইতে দেশপ্রেম অনেক বড়। আমি এই দ্যাশেই থাকপ।

সাব্বির জাদিদ

জন্ম ১৭ আগস্ট, ১৯৯৪; কুষ্টিয়া। কথাসাহিত্যিক।

শিক্ষা : ইসলামিক স্টাডিজ, অনার্স, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

প্রকাশিত গ্রন্থ —
একটি শোক সংবাদ [গল্পগ্রন্থ, ঐতিহ্য, ২০১৭]

ই-মেইল : sabbirjadid52@gmail.com

Latest posts by সাব্বির জাদিদ (see all)