হোম গদ্য গল্প প্রাকটিস

প্রাকটিস

প্রাকটিস
939
0

একটা খুনের আকাঙ্ক্ষা তাকে পেয়ে বসেছে। আগে ইচ্ছাটা ছিল অঙ্গহানি পর্যায়ে। হাত-পা কিছু নয়—পুরুষ-ইন্দ্রিয় সে কেটে নিতে চায়। নিখুঁত করে। তাকে বেঁচে থাকতে হবে অঙ্গহীন। প্রতিরাতে স্ত্রীর সঙ্গে শয্যায় গিয়ে তার চিৎকার সে শুনতে চায়। কল্পনা মেলে সে দৃশ্য উপভোগ করবে অথবা এখনো তা সে উপভোগ করে।

ইতিহাসের ছাত্র হয়েও সে মানে ইদ্রিস সরকার এনাটমি বিদ্যা রপ্ত করতে মরিয়া। বন্ধুস্থানীয় ডাক্তারা তো বিরক্তই। উপরন্তু এই জাতীয় লোককে সময় দিতে চান না বিশেষজ্ঞ সার্জনরাও। কোনো ডাক্তারের কাছে কোনো রোগী গিয়ে যদি জানতে চান, পুরুষাঙ্গ কেটে ফেললে মানুষ বাঁচে কিনা? অথবা কোয়ার্টারভাগ কাটলে তাতে সক্ষমতা থাকে কিনা? ইদ্রিস সরকার বিরক্ত। তিনি জানেন যেকোনো জ্ঞানই চাইলে রপ্ত করা সম্ভব। সে নীলক্ষেত চষে কিনে আনে সোভিয়েত প্রগতি প্রকাশনীর দুটো বই। এনাটোমি ও ফিজিওলজি। সারাদিন অফিস-টফিস-শেয়ারমার্কেট ঘুরে রাতে বসেন বই নিয়ে। মনে রাখার সুবিধার্থে মেডিকেল টার্মগুলোর পরিভাষাও সৃষ্টি করেন। সেগুলো বড় অদ্ভুত।


কোনো ভিডিও ক্লিপই তার সহ্য হয় না। সে ভেবেছিল একটা পাশবিক আনন্দের পাশাপাশি ট্রেনিংও নিয়ে নেবে। প্রথমে দেখে সৌদি আরবে এক কোপে বাঙালির শিরচ্ছেদের দৃশ্য।


একদিন অফিসে ফুরফুরে মেজাজ। কলিগরা ভ্রূ উঁচু করে টিপ্পনী কাটে। সে হেসে জানায় তার মোবাইল ফোনে দুটো ভিডিও ক্লিপ আছে। এরপর মোটামুটি অফিস গরম। কেউ অসময় চা সিঙ্গারা খাওয়াচ্ছে। কেউ ফিসফাস করছে, কোনো নারী কলিগের কিনা। ইদ্রিস সরকার মিষ্টি হেসে প্যান্টের পেছন পকেট থেকে চিরুনি বের করে কানের দিককার বড় বড় চুলগুলো তার বিশাল টাকের উপর ছড়িয়ে দেয়। কোনো কথা বলে না। নারী কলিগরা কাষ্ঠমুখ। যদিও একটুআধটু ভালো সম্পর্ক। রিকশায় বাসায় পৌঁছে দেওয়া। হাল্কাচালের প্রেমালাপ ছাড়া অফিস চলে কী করে। তবে কী বাথরুমে গোপন ক্যামেরা? কেউ কেউ একবার ঘুরেও দেখে আসে।

ইদ্রিস সরকার সোজা বাসার উদ্দেশ্যে রিকশা ধরে। গলির মুখে নেমে কমলা, চা-পাতা, সিগারেট কিনে। আজ সে উপভোগ করতে চায় সবটা। একবার ভাবে হোটেল থেকে খেয়ে যাবে কিনা। বাসায় রান্না হলো কি হলো না, তার চেয়ে ব্রেড-ডিম কিনে নিলেই হয়। সকালটাও চালোনো যাবে।

বাসায় ঢুকে উহ্ যা গরম। লোডশেডিং কতক্ষণ চলবে? সহ্য হচ্ছে না। কাজ এগিয়ে নিতে একহালি ডিম সিদ্ধ দেয়। কমলা তো কখন থেকেই চিবুচ্ছে। সাথে ঘন ঘন সিগারেট। তার বাসায় ঠান্ডা নামে শেষরাতে। ছয়তলার চিলেকোঠায় তখন নিবিড় নির্জনতা। তিনি ফ্লোরে পাতা বিছানার চারদিকে পানি ভর্তি বালতি, চওড়া বোল রাখেন। ফ্রিজ থেকে যতটুকু পারে বরফ মেশান। ফ্যানের বাতাসে যদি ঘর কিছুটা ঠান্ডা হয়। ছাদের গেটটাও লক করে রাখেন। এই উৎসব তার একার।

কিন্তু দুর্ভাগ্য। কোনো ভিডিও ক্লিপই তার সহ্য হয় না। সে ভেবেছিল একটা পাশবিক আনন্দের পাশাপাশি ট্রেনিংও নিয়ে নেবে। প্রথমে দেখে সৌদি আরবে এক কোপে বাঙালির শিরচ্ছেদের দৃশ্য। তার মাথা ঘুরতে থাকে। সিগারেট ঠোঁটে চেপেই টাকের ওপর একটু পানি মেশানো হাত বুলায়। তারপরের দৃশ্য ডোমের লাশ কাটা। এবং নাড়িভূড়ি মোচড় দিয়ে বমি। ভাঙা ভাঙা ডিমের সাদা অংশ। তরল। টুকরোটাকরো আনন্দ কিছুই বাদ নেই। তারমধ্যেই সে পড়ে থাকে। ভোররাতে বাথরুমের তাড়ায় সারা ঘর পানিতে সয়লাব। এবং ডাযেরিয়া। একবার দুবার তিনবার। বমি বমি ভাব। এবং তার এনাটোমি বিদ্যা বিফলে যায়।


এসময় সিদ্দিকের মুঠোমধ্যে থাকা একটি স্তন থেকে দুধ ফিনকি দিয়ে বের হয়। এক বাচ্চার ঘুম ভেঙে যায়। সিদ্দিক ওপর থেকে নেমে বাচ্চাকে ঘুম পাড়ায়। স্ত্রীর ভাষ্য মতে, এরপর সিদ্দিক তাকে ‘আবারো করে’।


শরীরটা তার বেশ কাহিল লাগছে। একবার ভেবেছে ফোন করে ছুটি নিয়ে নেবে। আবার সারাদিন বাসায় থেকেও লাভ নেই। পরিষ্কার করতে করতেই দিন চলে যাবে। ঠিক সময়েই সে অফিসে উপস্থিত হলে, তার মুখ দেখে কলিগদের উচ্ছাস বা উৎকণ্ঠা দুটোই দপ করে নিভে যায়। সে যেন প্রিয়জনের মৃত আঙুল স্পর্শ করে এসেছে। কানের কাছে বড় বড় চুলগুলো ঝুলে থেকে বিশাল টাক ফুটে আছে উৎকট হয়ে। নিজেকে প্রবোধ দেয়। তার ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই বলে ভরসা করে ন্যাচারাল পানিশমেন্টে। তাতে তার কী? তার জ্বালা মিটবে? না, এসব নিয়ে ভাবতে গেলে তার ব্লাড প্রেসারে আগুন জ্বলে। সে তার মায়ের মুখ মনে করতে চায়। ছেলেমেয়েদের কচি কচি মুখ। ধানক্ষেত। আলের ধারে নুয়ে পড়া হিজল গাছ। ভেসাল জালে টেংরা-পুটির দাপাদাপি। তার সুখ নেই। সে আবার ওই ঘটনাটার চিত্রায়ন করতে থাকে। যাতে তার স্ত্রীকে দোষ থেকে বাঁচাতে পারে। যা হয়েছে তা যেন নিতান্তই ধর্ষণ। ধর্ষণ। কিন্তু তবু ধর্ষণ কত দিনমাসব্যাপী চলে! স্ত্রী কেন প্রতিবাদ করল না।

ইদ্রিস সরকার কখন অফিস থেকে বের হয়ে গেছে কেউ জানে না। টের পেলেও তার চেহারার ওই অবস্থা দেখে ঊর্ধ্বতন কর্তারা রূঢ়তা দেখায় নি। অথবা লাগাতার হরতালে সবার মনেই ঢিলেঢালা ভাব।

ইদ্রিস সরকার স্ত্রীর বর্ণনা মতে চিত্র সাজাতে থাকে: ধরা যাক, সিদ্দিক এসেছে সন্ধ্যায়। বচ্চারা পড়ছে ভেতর ঘরে। তার স্ত্রী ও সিদ্দিক বসেছে বারান্দায়। বিদ্যুৎ চলে যায়। বাচ্চারা একসঙ্গে বলে উঠল—মা, মোমবাতি, মোমবাতি। সিদ্দিক ম্যাচের কাঠি জ্বেলে দেখে তার স্ত্রীর মুখ। ধরে নেই হাস্যমুখ। তার স্ত্রী সে ভেতর ঘর থেকে মোমবাতি নিয়ে এল বারান্দায়। সিদ্দিক দ্বিতীয় কাঠি জ্বালাবার চেষ্টা করে কিন্তু না জ্বেলে পেছন থেকে তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কানে চুম্বন করে। এখানে তার স্ত্রী ভাষ্য, সে রাগ দেখিয়ে ভেতর ঘরে চলে যায়।

পরের দিন সন্ধ্যা। এ বাসায় যারা নিয়মিত যাতায়াত করে। সুমন। মাসুম। কাঁকন। মিজান। লিটু। এরা সিডিসেট ভাড়া করে নিয়ে আসে। তার স্ত্রী ও বাচ্চারা মিলে একসঙ্গে সিনেমা দেখে। রাতের বেলা আনুমানিক ১০ টায় স্ত্রী ও বাচ্চারা ঘুমুতে ভেতর ঘরে যায়। ওরা মধ্যরাত পর্যন্ত সিডি দেখে—তার স্ত্রী পরে জেনেছে এরপর তারা পর্নোগ্রাফি দেখে। মধ্যরাতে সবাই চলে যায়। বারান্দায় ঘুমানোর কথা বলে সিদ্দিক এ বাসায় থাকে।

গায়ের ওপর ভার অনুভব করে তার স্ত্রী দেখে—স্ত্রীর ভাষায় ‘সিদ্দিক করতেছে’। স্ত্রী চেচিয়ে বলে, ‘তুমি?’ এসময় সিদ্দিকের মুঠোমধ্যে থাকা একটি স্তন থেকে দুধ ফিনকি দিয়ে বের হয়। এক বাচ্চার ঘুম ভেঙে যায়। সিদ্দিক ওপর থেকে নেমে বাচ্চাকে ঘুম পাড়ায়। স্ত্রীর ভাষ্য মতে, এরপর সিদ্দিক তাকে ‘আবারো করে’। যা সে টের পায় নি ঘুমিয়ে পড়েছিল বলে।


লাল কালিতে লেখা স্ত্রীকে কেটে একশ ছাপ্পানো টুকরা করা উচিত। সিদ্দিককে বাঁচিয়ে রেখে বিশেষ অঙ্গহানি।


এ পর্যন্ত এসে ইদ্রিস সরকারের অনেকগুলো প্রশ্ন ফাইন্ডআউট করে। যা তার নোটবুকে লেখা আছে। স্ত্রীর উত্তর ও তার মন্তব্যও যুক্ত আছে সেখানে। এরপর সিদ্দিক তার স্ত্রীকে প্রেম নিবেদন করে। তার স্ত্রী প্রত্যাখ্যান করে। তবু যখন-তখন সিদ্দিক এ বাসায় আসে সুযোগ পেলেই জোর করে ‘করে’। সবাইকে বলে দেবার হুমকি দেয়। তার স্ত্রী সিদ্দিকদের বাড়ির ফ্রিজে মাছ রাখতে গেলে তাকে পাজাকোলে নিয়ে ওপর তলায় নামাজের চৌকিতে শুইয়ে ‘করে’। এরকম মাঝেমধ্যে মাছ রাখতে বা ফের নিতে গেলে এমন ঘটনা ঘটে।

এখানেও ইদ্রিসের কতগুলো প্রশ্ন। স্ত্রীর উত্তর। নিজের মন্তব্য। লাল কালিতে লেখা স্ত্রীকে কেটে একশ ছাপ্পানো টুকরা করা উচিত। সিদ্দিককে বাঁচিয়ে রেখে বিশেষ অঙ্গহানি। যদিও সে স্ত্রীকে ভালোবাসে বলে তাকে হত্যার কথা বাদ রাখে। সন্তানদের লালন-পালনের কথাই সম্ভবত ভাবে। ভাবতে ভাবতে ইদ্রিস সরকারের মাথা গরম হয়ে যায়। রেলস্টেশন মাঠে আকাশে মুখ রেখে শুয়ে পড়ে। তার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ একটি বিন্দুতে এসে মেলে। তার বেঁচে থাকা অর্থহীন। ছেলেমেয়েদের প্রতি কোনো টান অনুভব করে না। দুটোকে খুন করে থানায় এসে সারেন্ডার করবে। পরে বিচার শেষে নিজ হাতেই পড়ে নেবে ফাঁসির দড়ি। এটাই তার পক্ষে সমাধান।

ইদ্রিস সরকার পাশ ফিরে চোখ খোলে। দূরে ছেলেমেয়েদের ছোটাছুটি। অল্প পরিসরে ৫/৬ টি ছেলে ক্রিকেট খেলে। বাদামওয়ালা ঘুরছে এদিক-সেদিক। আরো দূরে দেয়াল ঘেঁষে এয়ার গান দিয়ে গুলি করে বেলুন ফুটাচ্ছে কেউ কেউ। সে চোখ বন্ধ করে। পাশ ফেরে। হঠাৎ চমকে ওঠে। শোয়া থেকে উঠে বেলুন ফুটানোর দিকে যায়। নিয়মকানুন জানে। অস্ত্রের ওজন দেখে। নিশানা ঠিক রাখতে চাই প্রাকটিস। প্রাকটিস মেইকস এ পারফেক্ট ম্যান। মনে মনে বলে।

এরপর সে প্রায়ই, বলা যায় প্রতিদিনই এসে টার্গেট প্রাকটিস করে। নির্মল আনন্দ তার কখনো পাশব হয়ে ওঠে। কখনো পাশব আনন্দ নির্মল হয়ে ওঠে। ফেরার সময় সন্ধ্যায় তার ওপর ভর করে রহস্য। দক্ষিণ দিকে পরিত্যক্ত লাইন ধরে একমনে হাঁটে। একটা দুটো সিগারেট ফুকে। এর শেষ দিকে লাইন ছেড়ে দুটো মালবাহী কামড়া। লতাগুল্মঝোপ। ঘামাচির মতো বাড়ছে মরিচা। তার একটিতে মানুষের ফিসফাস। আনাগোনা। কারো কারো ঠোঁটে কড়কড়ে রঙিন লিপস্টিক। ঝাপসা অন্ধকারেও চিকচিক করে গ্রীবা ও গাল। থৈ থৈ গভীর নাভী। এসবে তার রুচি নেই যদিও। সে শুরু করতে ভালোবাসে শূন্য থেকে। ধীরে ধীরে চরমে উঠে প্রবেশ করে অরণ্যে। লুকানো জলে। কিন্তু এখানে এলেই দ্রুততা। ট্রেন হুইসেল দিচ্ছে। কেউ দোলাচ্ছে সবুজ পতাকা। যাত্রীদের হুড়াহুড়ি। হকারদের চিৎকার। তবু সে এখানে আসে। দ্রুত কামড়ায় লাফিয়ে ওঠে। আবার লাফিয়ে নামে স্টেশন দেখেই।

টার্গেট প্রাকটিস। এবং সন্ধ্যা। লতাগুল্মঝোপ। তাকে যেন নিদান দেয়। তার ব্লাড প্রেসারের আগুন কমে আসে। বন্দুকের দোকানে আর ঢোকা হয় না। যেন সে ক্রমে প্রতিশোধ নিচ্ছে। প্রতিশোধ নিচ্ছে। যার মাত্রা, সে ভাবে, প্রতিশোধের সীমাকেও সে ছাপিয়ে যেতে পারে না।

Zahid Sohag

জাহিদ সোহাগ

জন্ম ১০ মার্চ ১৯৮৩; কুলপদ্বি, মাদারিপুর। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর (ঢাকা কলেজ), এলএলবি (নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয়) এবং পিএইচডি গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই:
কবিতা—
আর্তনাদও এক বায়বীয় ঘোড়া [২০০৮]
অসুখের শিরোনাম [২০১২]
দুপুর [২০১৪]
ব্যক্তিগত পরিখা [২০১৫]

ই-মেইল : zahidsohag@gmail.com
Zahid Sohag