হোম গদ্য গল্প প্রথম মৃত্যু

প্রথম মৃত্যু

প্রথম মৃত্যু
204
0

১.
তখন সকাল। রিকশা চলছে। রিকশার সিটের নিচে সামনে দুটো রড আছে। রডগুলোকে বলা হয় টানা। ওই রডের সাথে শিকল দিয়ে ছেলেটির দুই হাত বাঁধা। সিটে তার মা বসা। মা ডান হাতে ছেলের চুল মুঠো করে ধরে রেখেছে। তাকে নেওয়া হচ্ছে হেফজখানায়। বার বার পালিয়ে আসে, তাই এভাবে নেওয়া। আশপাশের লোকজন অবাক চোখে তাদের দেখছে।

ছেলেটির দুই চোখে কান্নার স্রোত। বাড়ির পাশের বর্ষার খাল যেন। স্রোতে স্রোতে কোথায় চলে যায় সে জানে না। এই দৃশ্য কিসমত ভুলতে পারে না, প্রায় মনে পড়ে। মনে পড়লে কষ্ট হয়। কষ্ট পাকা আমের পোকা হয়ে যায়। ওরা বলে কিরা। কালো কিরা মাথার ভেতর কুটকুট কামড়ায়।

২.
রেললাইনের পাশে খোলা জায়গা, এরপর দেয়াল। দেয়ালে লেখা : মুনাফাখোরদের রুখে দাঁড়াও। আঁকাবাঁকা অক্ষরগুলো কিসমত পড়তে পারে।

দেয়ালের ওপারে কলোনির গাছপালা। আরো উপরে আকাশ। আকাশটা এখন নীল। তার ছায়া পড়ে দুপুরটাও নীলচে। প্ল্যাটফরমের থামে হেলান দিয়ে বসে আছে সে। রোদ মাখা নীল আভা চোখে-মুখে। একটা শান্তির ভাব। পেটের দিকে যেতে যেতে শান্তি আর থাকে না। কেননা এখনো খাওয়া হয় নি।

শ্রাবণের দুপুরে আজ সে একা। একা হলে মনটা পাখি হয়ে যায়। ভাবে, উড়ে উড়ে রাসপুরে যাবে। রাসের দেশে আছে লোহার খাঁচা। খাঁচায় একটা পাখি। জুনু খালা বলেছিল, এই পাখি মানুষের ইচ্ছা পূরণ করে। রাক্ষস মেরে পাখিটাকে নিয়ে আসবে।

তাদের মাদ্রাসার পেছনে জঙ্গলে একবার অজগর একটা ছাগল গিলে খেয়েছিল। খিদে তাকে অজগর সাপের মতো গিলে খেতে চায়। গত রাত থেকে পেটে কিছু পড়ে নি। মাকে খুব মনে পড়ছে।

মাঝে মাঝে কোনো কাজই পাওয়া যায় না। তখন শুধু ক্ষুধার্ত বসে থাকা। অন্যদিন বন্ধুরা থাকে, একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে খায়।

দুই রেল পুলিশ হাঁটছে। একজন লাঠির গুঁতা দিয়ে বলে, ভাগ এখান থেকে।

সে দেখে, পুলিশটার চোখ কৈ মাছের চোখের মতো। চারপাশে মাছির ঝাঁক। ডান হাতের কনুইয়ের নিচে ফোঁড়াটা ব্যথায় টনটন করছে। ফোঁড়ায় চাপ দিলে পুঁজ বের হবে। খিদেও যদি ওভাবে বেরিয়ে যেত!


একদিন তারা প্যান্ট খুলে পুতুলিকে দেখেছে। পুতুলির সেকি কান্না আর গালি!


অদূরে বুড়ো কোমর দুলিয়ে নেচে বিরানি বিক্রি করছে। সুর করে বলে, বাংলা বিরানি খাইবানি অ আমার বাঙালি।একটু আগে একটুখানি বিরানি চেয়েছিল। বুড়ো বলেছিল, হারামজাদা শয়তান, কাজ করে খা-গা।

৩.
কিসমত শুয়ে পড়ল দুই নম্বর প্ল্যাটফরমে। ঘুমিয়েও পড়ল। স্বপ্ন দেখে, পেট ভরে মেজবানের মাংস খেয়েছে। হাত ভাঁজ করে বাহু টিপে দেখে। বাঘের থাবার মতো শক্ত বাহু। মুসলিম হলের পাশে হাতুড়ি চালিয়ে ইট ভাঙছে। শরীরে ইটের রং। বন্ধু মেহরাজকে বলে, আমি সব পারি। মেহরাজ ফেলে দেওয়া দইয়ের হাঁড়ি দেয়। হাঁড়িটা সে আকাশের দিকে ছুঁড়ে মারে।

এই স্থানে সকালে তারা নেচেছিল। পেপসি ও কোকের বোতলের ছিপি নিয়ে গোলাকার বসে যায়। ওখান থেকে চারটা আলাদা করে। শুরু হয় কড়ি খেলা। বড় কেঁচোর মতো তাদের আঙুল। কেতকুতুনি দিলে বুড়োরা যেভাবে হাসে, ছিপিগুলো তাদের হাতে তেমন নাচে। দুই হাতের তালুয় ঝাঁকায়। তারপর দারুণ কায়দায় ছুঁড়ে মারে। চারটা ছিপি একসাথে চিত হয়ে পড়লে রাজা হওয়া যায়। তিনটা একসাথে চিত থাকলে কুকুর। দুটা চিত থাকলে সাক্ষী। একটা ছিপি চিত থাকলে চোর।

ওদের মধ্যে আছে কিসমত, মেহরাজ, পুতুলি, ফোকলা দাঁতের মেয়ে কফি, আল-আমিন, সাইফুল, সুজন ও সুমন। খেলছে কিসমত, মেহরাজ, কফি ও আল-আমিন।

কেউ চোর, কেউ সাক্ষী বা কুকুর হয়। শেষে মেহরাজ হয় রাজা। পুলিশকে আসতে দেখে খেলা ফেলে দৌড় দেয়। কয়েকজন ঘুমপাতালি উঠে দৌড়ায়। পাগলিটা ইট নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বলে, আমার নাম আফ্রিকা, দেশ আমার আফ্রিকা। তোরে খাইয়া যাইবাম।

কিছুক্ষণ পর একই দৃশ্য। তাদের আসরও বসে। কফি বলে, রাজা রাজা কেমুন আছ?

মেহরাজ বলে, ভালা আছি।

আল-আমিন বলে, রাজা রাজা কী করছ?

রাজা বলে, আল্লারে ডাকছি।

কিসমত বলে, এই-ওই, আই-ঢাই, হেনতেন অনেক করছে। এর বিচার কর।

রাজা বলে, দুইজনের পা ধইরা মাপ চা, দুই গালে দশবার থাপ্পড় খা।

খেলতে খেলতে হাসে, হাসতে হাসতে ছিপিগুলো আকাশের দিকে ছুঁড়ে দেয়।

রেলযাত্রীর ব্যাগ বহন, কাগজ টোকাই, রেয়াজউদ্দিন বাজারে মুটেগিরি—এমন কোনো কাজ নেই করে না। সুমনের পছন্দ ক্রিকেট খেলা। সে প্রায় বলে, আমি অলরাউন্ডার। তাই সবাই তাকে অলরাউন্ডার বলে ভেঙায়।

রোজগার ভালো হলে নানা রকম খেলা, হৈ হল্লা আর হাসি-ঠাট্টায় সময় কাটায়। দুপুরে একসাথে ফুটপাতের বিরানি খায়। কয়েকজন সিগারেট টানে, কেউ মিথ্যা মিথ্যা কোক খায়। দেয়ালের চিপায় গিয়ে কেউ কেউ গাঁজা বা ডান্ডি খায়।

মেহরাজের বয়স বার/তের। সে একবার সাজুগুজু করে বগির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মেয়ের কাছে গিয়েছিল। মেয়েটা গালি দিলে সে টাকা বের করে। তখন মেয়েটা তাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। সে এসে তাদের সব বলেছে। সেইসব কথা তারা আগে শোনে নি। এরপর একদিন তারা প্যান্ট খুলে পুতুলিকে দেখেছে। পুতুলির সেকি কান্না আর গালি!

আবার বাঁশি বাজে। সবাই একটু আগের মহড়া দেয়। পুলিশ ঘুমন্ত বালিকাকে হেঁচকা টানে তোলে। মেয়েটার কণ্ঠার হাড় দেখে মনে হয় বহুদিন কিছু খায় নি। তখন পাগলি চিৎকার করে, মারে মা, ও মা। ইটটা মেহগনিগাছের দিকে ছুঁড়ে মারে।

এ সময় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়। সবাই ছাদের তলে আসতে থাকে। গ্রিলের পশ্চিম পাশে সেজেগুজে বাচ্চা কোলে মেয়েটা অপেক্ষা করছে। অদূরে লুঙ্গির মধ্যে ডুবে একজন ঘুমাচ্ছে।

তারা ছিপিগুলো নিয়ে রাজাকে কেন্দ্র করে ঘোরে, নাচে। কফি বলে, রাজা খাইছে গাঁজা।

সুজন বলে, রাজা খায় ডান্ডি। সে একটা পলিথিনে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে খাওয়ার ভঙ্গি করে।

সাইফুল মুখে গামছা পেচিয়ে শুয়ে পড়ে। আল-আমিন তার পাশে বসে থাকে। সে কয়েক দিন আগে ঢাকা থেকে এসেছে।তার বাড়ি যশোর আর সাইফুলের কুমিল্লায়।

কিসমত বলে, কাইল রাইতে একখান স্বফন দ্যাখছি।

কী?

দ্যাখছি, বড় অ্যাকটা ঘরে শুইয়া আছি।

তারপর?

লাম্বা কাইল্লা একখান বাঘ লাফ দিয়া ঢুকছে। আমি তো ডরাইয়া অক্করে আইগ্গা দিছি।

সবাই হাসে। কিসমত বলে, বাঘডা আমারে না খাইয়া কী করল, গু খাইতে লাগল।

সবাই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়।

আমি আস্তে আস্তে লুকাইলাম।

কোথায়?

প্যান্টের ভিত্রে।

অলরাউন্ডার সুমন বলে, প্যান্ট হয়ে গেছস?

তারা একজন আরেকজনের গায়ে ঢলে পড়ে। পুতুলির বগলের কাছে জামা ছেঁড়া। সেদিকে তাকিয়ে কিসমত বলে, গু খাইয়া বাঘডা আর আমারে খুঁইজ্জা পায় না।

৪.
দুপুরের রোদ সরে গেছে। মাথার উপর জমেছে এক খণ্ড মেঘ। আট বছরের কিসমতের পকেটে দলামোচড়া একটা ফাইভ স্টার। অদূরে বাদাম বিক্রেতা ঝিমাচ্ছে। তার কাছ থেকে ম্যাচ নেয়। সিগারেট ধরিয়ে আগের জায়গায় বসে। ধোঁয়াগুলো উড়ে ধোঁয়ার দিঘি হয়ে যায়। দিঘির পাশে দেখা যায় একটা বাড়ি। বাড়ির আশপাশে অনেক গাছপালা। পেয়ারাগাছে পেয়ারা ধরেছে। বড় জামগাছটার নিচে লাল কুকুরছানা বসে আছে। ছানাটার নাম ভুলু। মাদ্রাসা থেকে যখন বাড়ি আসত, সে যেখানে যেত, ভুলুও লাফিয়ে লাফিয়ে যেত।

তার কয়েকজন বন্ধু আছে। তাদের সঙ্গে খেলতে যায়। ফুটবল তার প্রিয় খেলা। সে মেসিকে চেনে। বড় হলে মেসির মতো হবে—এই স্বপ্নের কথা বন্ধুরা জানে। তাই খেলার সময় তারা তাকে ডাকে মেসি। কী সুন্দর পাস দিত! তার সাথে কেউ পারত না।

বল খেলার কথা ভাবতে ভাবতে শান্তির পরশটা আবার পায়। আকাশের দিকে তাকায়। জুনু খালা গল্প বলার সময় একবার বলেছিল, মানুষ হইল আসমানের লাহান। সেই কথা মনে পড়ে।

এ সময় হিজড়াটা এসে পাশে বসে। গালে গুঁতা দিয়ে বলে, হাই লালুভুলু, ভুলাইয়া দিমু ভুলভুলাইয়া। তার মুখে স্নিগ্ধতা।যাহ্ বলে মুখ সরায় কিসমত। খিদে আবার করাত চালায়। একটু আগে দোকানদারের কাছে হাত পেতেছিল। ঝাঁঝাল কণ্ঠে দোকানদার বলেছিল, যদ্দুর খাইছস তদ্দুর পায়খানা কর। কয় ট্যাকা আছে বাইর কর। দোকানদার যেন প্যান্ট খুলে দিয়েছে। খুব লজ্জা পেয়েছিল।

তাদের দুটি রাজহাঁস আছে। অনেক সময় সে ভাত খাওয়াত। দোকানদারের কথায় ওগুলো মাটির হাঁস হয়ে যায়। হাঁসগুলো তার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন সে ভাবতে চায়, তার কাছে একটা ইচ্ছেপূরণ পাখি থাকবে। পাখিকে বলবে, আকাশটাকে পায়ের কাছে নিয়ে আয়। আকাশ হবে কুপি বাত্তি। কুপির ভেতর থেকে একটা দৈত্য বেরিয়ে জিজ্ঞেস করবে, কী চাও মালিক? সে বলবে, আইসক্রিম খাব। দৈত্য তখন মেঘ দিয়ে আইসক্রিম বানাবে। বন্ধুদের নিয়ে ইচ্ছে মতো খাবে।

জিন্নার কথা মনে পড়ল এ সময়। জিন্নাকে কখনো হাসতে দেখে নি। মুখের বাম পাশে একটা ঘা। ওটা দেখলে মনে হয়, তার মা-বাবা ওই ঘায়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে। সবসময় ধুলায় ভরা কালো সুয়েটার পরে। মানুষের পা ধরায় ওস্তাদ। মাঝে মধ্যে তারা জানতে চায়, ভিক্ষা করস ক্যান? অসহায় মুখে সে বলে, ভাত খামু।


অদ্ভুত ভঙ্গিতে হিজড়া বলে, আমি? আমি হইলাম নাই মানুষ।


নিজের নাম কাউকে বলে না। জিজ্ঞেস করলে বলে, জানি না। তারা তাকে প্রথমে ডাকত জানি না। একসময় জানি না হয়ে গেল জিন্না। সে বলে, তার কেউ নাই। কিসমত ভাবে, নিশ্চয় কেউ না কেউ আছে। তারা তো কেউ একা না। এখানে তারও কত বন্ধু।

ছেলেটা খুব ক্ষুধার্ত—হিজড়া তা বুঝতে পারে। তার কাছে একটা ডায়নিস ছিল। বের করে অর্ধেক ছিঁড়ে দেয়। দুই কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে আয়েশ করে বসে।
ডায়নিস পেয়ে কিসমতের মনে জোয়ার আসে। যেন ভরা জোয়ারের কর্ণফুলী। সদরঘাট ও ব্রিজঘাটে কত ঘুরেছে!ঘড়ঘড় করা রেলের ইঞ্জিনটার দিকে তাকায়। মনে হয়, অনেক বাঘ-সিংহ ওখানে লুকিয়ে আছে। রাস্তায় মাইকে লোকটা চিৎকার করে, আসেন আসেন, লটারি নেন। মাত্র দশ টাকায় চল্লিশ লাখ টাকা পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ।

হিজড়াটা দেখে, ছেলেটার চোখের কোনায় পানি। চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, হায় হায়রে, ওই ব্যাটা, কান্দস ক্যান?

কিসমতের কান্নার ফোঁটা চায়ে পড়ে।

হিজড়ার কী যেন মনে পড়েছে, মেঘের দিকে তাকিয়ে বলে, জগতে মানুষ দুই রহম। অ্যাকডা মানুষরে টাইনা বুকে নেয়। আরেকডা মানুষ কিথা করে জানস? মানুষরে পকেটে রাহে।

কিসমত জিজ্ঞেস করে, তুমি?

অদ্ভুত ভঙ্গিতে হিজড়া বলে, আমি? আমি হইলাম নাই মানুষ।

আমি?

তুই? তুই ত ছেঁড়া মানুষ।

ক্যান?

তুই স্টেশনে পড়ে থাহিস। মা-বোন নাই, নেশা-ভান করস, বিড়ি খাস।

নেশা-উশা করি না ত।

নেশা-উশা করি না ত। হিজড়াটা ভেঙায়। তারপর বলে, মিথ্যা কইস না শয়তানের ছা।

সে হাসে। গত রাতে গাঁজায় টান দিয়েছিল। সেই কথা মনে পড়ে। মনে হয়েছিল নাকের ভেতর রেলগাড়ি চলছে। হিজড়ার চোখের দিকে চায়। তার কিছু ভালো লাগে না। মেঘটা ভেঙে পড়লে বেশ হতো। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ত, সে বকের মতো উড়ে জুনু খালার বাড়ি যেত। খালা পিঠা বানাত। গল্প শুনতে শুনতে ধোঁয়া ওঠা পিঠা খেত।

৫.
গত বছর শীতের কথা। ঘরের পেছনে ছোট্ট জলাশয়ে বাবা ও সে মাছ ধরছিল। একটা শিং মাছ ধরতে গিয়ে কাঁটার গুঁতা খায়। গুঁতা খেয়েই কান্নাকাটি করে। মা কানে থানকুনি পাতা দেয়। এটা দিলে নাকি ব্যথা কমে যায়। কানে থানকুনি পাতা নিয়ে বাবার মাছ ধরা দেখে। টাকি, শিং, কৈ মাছ ধরা পড়ল। গোসল করে পান্তাভাত খেয়ে বাবা বাজারে যায়। সেও সঙ্গে যায়। নতুন লাগানো ধানের চারার মতো ঝুঁকে বসে। হাতায় শিং মাছ নাচে।

বানরমুখো বুড়ো মাছ বিক্রেতা বলে, শিং পরি নাচেরে, বিষ ঝাইড়া নাচে।

পৌষের শীত কানের লতিতে কাঁপন তুলছে। সারা সকাল ভিজে আঙুলগুলো গর্ত গর্ত। বাবা বিড়ির ধোঁয়া ছাড়ছে। সে খেজুর রসে যে মজা পায়, বাবা মনে হয় বিড়িতে তা পাচ্ছে।

ভাবে, মাছগুলো না বেচলে ভালো হতো। মাকে বলত, শিমের বিচি দিয়ে রাধ। মা রাঁধত। চাকা চাকা কেটে আলুও দিত। খেতে কত মজা হতো!

৬.
পালিয়ে এসেছে প্রায় বছরখানেক হলো। বেশ কয়েকবার চট্টগ্রামের মেজবান খেয়েছে। একবার গলায় ছোট হাড় আটকে গিয়েছিল। সঙ্গীরা নিয়ে গিয়েছিল ডাক্তারের কাছে। অনেক কষ্ট পেয়েছে। তখন স্টেশনের কোনায় শুয়ে বিরানি বুড়োর ছড়া শুনত। মাঝেমধ্যে বুড়ো বলত, ‘যশুরে কই খাইবিনি?’

অনেক কথা মনে পড়ছে। বাবা হেফজখানায় ভর্তি করানোর পর কতবার পালিয়ে এসেছে! কত পিটা খেয়েছে, তার কি হিশাব আছে! সবাইকে খুব নিষ্ঠুর মনে হতো।

তবে মা-বাবার মনে ছিল আনন্দ। বিশেষ করে বাবার মনে। ধান রোপণ হয়ে গেলে কিংবা ফসল কাটার আগে কিছুদিন বাবার কাজ থাকত না। তখন আড্ডা দিয়ে সময় পার করত। ওই সময়ে প্রায় মাকে বলত, যে কোরানে হাফেজ হয়, মৃত্যুর পর তার বুক পচে না। ছেলে হাফেজ হলে মা-বাবাও বেহেশতে যায়।

কিসমতের মনে পড়ে, তাকে বেঁধে রিকশায় করে নেওয়ার সময় অনেক কেঁদেছিল। হেফজখানায় যাওয়ার পর হুজুর এমন মার মারল, রাগে, অভিমানে সে টু শব্দ করে নি।

মাকে বলত, আসার আগের দিনও বলেছে, মারে, আমার ভাল্লাগে না।

হাফেজ হলে কী লাভ হবে মা তাকে বোঝাত। সে বুঝতে চাইত না। তখন মা বলত, তোর বাবায় মারব।

ছাগলছানা উঠানে তিড়িং বিড়িং করে। সে ভাবে, কেউ বুঝে না।

তাকে আরো অপেক্ষা করতে হয়। দুই মাস পর ছুটি পায়। বাড়ি যায় দুদিনের জন্য। প্রথম রাত কাটানোর পর ভোরে কেউ কিছু বোঝার আগেই পালিয়ে যায়। সকালে ট্রেন ছিল না। বাসে ময়মনসিংহ যায়। সেখান থেকে ট্রেনে চেপে ঢাকা। কমলাপুর থেকে সন্ধ্যার পর আরেকটা ট্রেনে চড়ে। কোথায় যাচ্ছে জানে না। ভোরে শেষ স্টেশনে ট্রেন থামলে জানতে পারে সে চিটাগাং এসেছে। টিটির কানমলা খায়। শরীরে ত্রিশ-চল্লিশ ভাগ পিটা, কানমলায় কী হবে?

৭.
অগ্রহায়ণ মাসের শেষের দিকে চলে যেত খালার বাড়ি। তখন ধান কাটা শেষ, ধান নেওয়াও প্রায় শেষ। উঠানে, ঘাটায় খড়। চারপাশে ধানের গন্ধ। মোটামুটি শীত পড়ে।

জুনু খালার শাশুড়ি তো গল্পের খনি। বড় মা উঠানে খড়ের গাদায় বসে গল্প বলত : বহু দূরে ছিল একটা দেশ। সেই দেশে ছিল অত্যাচারী এক রাজা। রাজার দুই রানি। বড় রানি খুবই ভালো। প্রজাদের দুঃখে তার মন কাঁদে। তাদের জন্য যথাসাধ্য করে। ছোট রানির ষড়যন্ত্রে একদিন রাজা তাকে তাড়িয়ে দিল।

রানি কোথায় যাবে? হাঁটতে হাঁটতে রাজ্যের বাইরে চলে যায়। পথে পড়ে একটা বন। আশপাশে কোনো মানুষ নেই। বনের মধ্যে একটা কুঁড়েঘর। ঘরে একটা পাখি। তাকে দেখে পাখিটা বলে, মেহমান এসেছে। কী সুন্দর পাখি! পাখির কথা শুনে রানি অবাক।

রানি ওই ঘরেই থেকে যায়। পাখিকে আদর করে, তার সঙ্গে কত কত গল্প করে! গল্প শুনতে শুনতে পাখিটা একদিন রূপবান এক রাজপুত্র হয়ে যায়। তারপর রানিকে বলে, মা! আমি তোমার ছেলে। জন্মের পর ছোট মার ষড়যন্ত্রে পাখি হয়ে গিয়েছিলাম।


ওইদিন সে দাঁতের ফাঁকে ব্লেডের টুকরো রেখেছিল। মাঝেমধ্যে ব্লেডে একটু চাপ দেয়। এতে মাড়ি কেটে রক্ত বের হয়। ডান্ডির গন্ধ শুঁকার পর রক্তের নোনতা স্বাদে নেশা জমে।


৮.
রেলের পুরনো বগি। কয়েক জায়গায় রং উঠে গেছে। দরজার বাম পাশে গু লেগে আছে। রাত আটটা-নয়টা হবে। কিসমত বগির ভেতর শুয়ে আছে। পাশে বসে আছে জিন্না।

বিকালে হিজড়া বলেছিল, তোরে দেখলে মায়া হয়রে। এখন সেই কথা মনে পড়ে।

সে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি এত সাজুগুজু করো ক্যান?

হিজড়া হেসে বলেছিল, সাজতে হয়রে।

তুমি তো ওই মাইয়াগুলার মতন না।

ও কোনো জবাব দেয় নি।

জিন্না দলামোড়চা হয়ে সুয়েটারের ভেতর ঢুকে পড়ে। একটু পর তার নাক ডাকা শুরু হয়।

কিসমতের মনে পড়ে মায়ের মুখটা। মায়ের কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ে। স্বপ্ন দেখে, সে বল খেলছে। মেসির মতোই বল নিয়ে এগিয়ে যায়। গোল করে, একটা, দুইটা, তিনটা। হ্যাট্রিক করার পর তার ঘুম ভেঙে যায়।

৯.
পরদিন সন্ধ্যায় মেহরাজ তাকে ডেকে নেয়। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের উল্টোদিকে ফুটপাতের এক কোনায় বসে। ওখানে আরো কয়েকটা ছেলে আছে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। তাদের হাতে পলিথিন।মেহরাজ ফুঁ দিয়ে একটা পলিথিন ফুলিয়ে নাক-মুখ তাতে ঢুকিয়ে কিছুক্ষণ চেপে ধরে। ভেতরে হলুদাভ আঠাল জিনিস। ওটা আসলে গাম। কিছুক্ষণ গন্ধ শোঁকার পর কিসমতকে দেয়। সে ইতস্তত করে। মেহরাজ তার মুখে চেপে ধরে বলে, খিদা লাগত না, নাক দিয়া টান।

কিসমত দেখে, একটা ছেলে ফুটপাতে চোখ বুঁজে শুয়ে আছে। সাহস করে টান দেয়। ফুটপাতে শুয়ে থাকা ছেলেটি বলে, ডান্ডি খাস? তারপর হেসে সাহস দেয়, এইডা লইলে নিশা অয়, ঘুম আইয়ে। খিদা লাগে না, দুনিয়াদারির কুনু হুঁশ থাহে না।

মেহরাজ বলে, এডি খাইলে দুনিয়াদারি রঙিন রঙিন লাগে।

কয়েক দিন আগে মেহরাজ একটা কাজ করেছিল। কিসমতকে সে কথা জানায়। ওইদিন সে দাঁতের ফাঁকে ব্লেডের টুকরো রেখেছিল। মাঝেমধ্যে ব্লেডে একটু চাপ দেয়। এতে মাড়ি কেটে রক্ত বের হয়। ডান্ডির গন্ধ শুঁকার পর রক্তের নোনতা স্বাদে নেশা জমে।

বিতিকিচ্ছিরি একটা স্বাদ কিসমতের নাকে-মুখে, মগজে ছড়িয়ে পড়তে চায়। খকখক কেশে চোখ বুঁজে শুয়ে থাকা বুড়ো মনে হয় নিজেকে। অদূরে রাস্তার মাঝখানে মাজারের কাঠচাঁপার ফুলগুলোকে মনে হয় একেকটা বেলুন। সে বলে, মা বেলুন, বোন বেলুন, খালা বেলুন। বেলুন হয়ে উড়ে বাড়িতে চলে যেতে ইচ্ছে করে।

এ সময় তালগাছের মতো লম্বা টহল পুলিশটা এসে তার পাছায় লাথি মারে।

শিং মাছের বিষের মতো রাগ এসে ভর করে। দৌড়ে পালাতে পালাতে সে গালি দেয়, বিশ্রী একটা গালি।

জাহেদ মোতালেব

জাহেদ মোতালেব

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৭৪; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
খেলাবুড়া [গল্প, ২০১১]
লাল পা [গল্প; ২০১৩]
বিকেল অথবা বাঘের গল্প [অনুগল্প; ২০১৫]
রক্তরেখা [উপন্যাস; বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

শিশুদের বই—
লা লা পা পা [গল্প, ২০০৯]
মুড়ি বুড়ি [গল্প, ২০১৪]

ই-মেইল : jahedmotaleb@yahoo.co.uk
জাহেদ মোতালেব

Latest posts by জাহেদ মোতালেব (see all)