হোম গদ্য গল্প পাণ্ডুলিপি থেকে : কুড়ি বছর পরের একদিন

পাণ্ডুলিপি থেকে : কুড়ি বছর পরের একদিন

পাণ্ডুলিপি থেকে : কুড়ি বছর পরের একদিন
285
0

 ২০১৮ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হচ্ছে শিল্পী নাজনীনের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ বিভ্রম । বিভ্রম থেকে ‘কুড়ি বছর পরের একদিন’ গল্প পরস্পরের পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন কবি সঞ্জীব পুরোহিত। প্রকাশ করেছে অা‌দিত্য অনীক প্রকাশনী।  


অথৈ হাঁটে। ফুটপাথ ধরে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হোঁচট খায় বেশ ক বার। জানালা দিয়ে দৃশ্যটা দেখে বুকের মধ্যে কেমন একটু শিরশির করে ওঠে। কষ্ট। কেমন দলা পাকাতে থাকে, ঢেউ তুলতে চায়, মোচড়ায়। বৃষ্টিতে ফুটপাত আর রাস্তা আলাদা করা মুশকিল। প্রচণ্ড জ্যাম। বাসের জানালার পাশের সিটে বসে আমি ধীরে ধীরে অথৈকে হারিয়ে যেতে দেখি। বাস শম্বুক গতিকে এগোয় কী এগোয় না। সেদিকে তেমন নজর করি না। অথৈর সাথে আজ দেখা না হলেই ভালো হতো। বহু বছর তো দেখা হয় নি আমাদের। তাতে তেমন কোনো সমস্যা হয় নি কারোরই। আর অথৈ তেমন ভালো বন্ধুও ছিল না আমার। তবু হঠাৎ কেন দেখা হলো আজ! কেন সে আমাকে এমন এলোমেলো করে দিয়ে চলে যায়!

সকাল থেকে অঝরে ঝরছে আকাশ। রাস্তায় একহাঁটু পানি। বৃষ্টি দেখে মন কেমন করে উঠতেই বসকে বলে অফিস থেকে কেটে পড়ি তাড়াতাড়ি। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাস পেয়ে লাফিয়ে উঠে দেখি সিট খালি নেই। কোনোমতে বাসে উঠে, দাঁড়িয়ে টাল সামলানোর চেষ্টা করতেই কানে আসে, কেউ একজন নাম ধরে ডাকে। চমকে শব্দ লক্ষ করে খুঁজি। কে? কে হতে পারে! এই বাসের মধ্যে কোনো নারীকণ্ঠ আমার নাম ধরে ডাকতে পারে, তা খুব অসম্ভব নয়, কিন্তু যে নামে ডাকে, তা প্রায় অসম্ভব! এ নামে খুব কাছের কিছু মানুষ ছাড়া আর কেউ আমাকে চেনে না। শব্দটা আবার শুনতে পাই।—তুমি স্বাতী না?


লেসবিয়ান শব্দটা সে সময় আমাদের অনেকেরই জানা নেই। আমরা হইহই করে উঠি, লেসবিয়ান


হ্যাঁ! কিন্তু আপনাকে তো… বিস্মিত আমি অবাক হয়ে নেকাবে মুখ ঢাকা মহিলাটির দিকে তাকিয়ে থাকি। স্মৃতি হাতড়াই। শুধু ভেসে থাকা দুটি চোখ, মোটাসোটা গিন্নিবান্নি একটি শরীর। না। মনে পড়ে না। স্মৃতি আমাকে একলা ফেলে চম্পট দেয়। আমি হাবুডুবু খাই। মহিলাটি এবার নেকাব খুলে ফেলে। বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠে যায় আমার। আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠে বলি, অথৈ! তুই!

অথৈ এবার বড় করে শ্বাস ছাড়ে। শেষ অব্দি তাকে যে চিনেছি, সে কারণে সম্ভবত নিশ্চিন্ত বোধ করে কিছুটা। নেকাবে পুনরায় মুখ ঢাকতে ঢাকতে বলে, এদিকে আয়।

ততক্ষণে আমি নিজেই অনেকটা এগিয়ে গেছি সেদিকে। ওর পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে থাকি আমরা। হঠাৎ দেখা হওয়ার উচ্ছ্বাস সামলে নিয়ে সহজ হয়ে উঠি দুজনেই। আর তখন অনিবার্যভাবে দুটি নাম আমাদের স্মৃতিতে হানা দেয়। দীপ্তি আর রতন। আমরা বহু পেছনে ফিরে যাই। বিশ বছর আমাদের সামনে থেকে নিমেষে উধাও হয়ে যায়। চোখের সামনে থেকে মুহূর্তে মিলিয়ে যায় বাসভর্তি মানুষের ভিড়, জ্যামে ভরা ঢাকা শহর, জলে উপচে পড়া রাজপথ আর আমাদের বয়ে চলা এই জীবনের গ্লানি।

গার্লস কলেজ-হোস্টেলের দোতলার রুমটাতে আমরা নিজেদেরকে আবিষ্কার করে হইহই করে উঠি। কখনও হোস্টেলের লম্বা করিডরে, কখনও ডাইনিং-এ আবার কখনো-বা কলেজের সবুজ মাঠে। দীপ্তি আগের মতোই আড্ডা মাতিয়ে তোলে। বরাবর অথৈর গা ঘেঁষে বসে সে। এখনও ব্যতিক্রম হয় না তার। উপস্থিত আমরা সে নিয়ে আড়ালে কানাঘুষা করি। বাঁকা চোখে তাকাই। দীপ্তি বা অথৈ কেউই সে সব গ্রাহ্য করে না।

আমাদের অধিকাংশ বন্ধুই অজপাড়াগাঁ থেকে এসএসসি পাস করা। সদ্য শহরের কলেজে পা রাখায় সবারই আধুনিক হওয়ার প্রাণান্ত প্রয়াস। গা থেকে গাঁয়ের গন্ধ মুছে ফেলার সবারই আপ্রাণ চেষ্টা। কথায়, পোশাকে, ব্যবহারে কোনোমতেই যেন গাঁইয়া ভুত বলে কেউ বুঝতে না পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি সবার। শুধু দীপ্তি আর আমি একটু ব্যতিক্রম। দীপ্তি ব্যতিক্রম কারণ সে অতি আধুনিক, তার শৈশব, কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জেলা শহরে। আর আমি ব্যতিক্রম কারণ আমি জানি, হাজার চেষ্টাতেও আমার গা থেকে গাঁয়ের গন্ধ মুছবে না। আমি হলাম দীপ্তির ভাষায়, অরিজিনাল গাঁইয়া প্রোডাক্ট!

ফলে দীপ্তির প্রতি সবার যেমন বাড়তি সমীহ আর তোয়াজ, তেমনি আমার প্রতি সবার সুক্ষ্ণ অবজ্ঞা আর কিছুটা ঈর্ষামিশ্রিত ভয়। অবজ্ঞা গাঁইয়া বলে, ঈর্ষা আর ভয় পড়াশোনায় অন্য অনেকের চেয়ে ভালো বলে।

আমাদের আড্ডার বিষয়বস্তু খুবই সাধারণ। বেশিরভাগ সময়ই তা সিনেমা, নাটক, হালফ্যাশানের কোনো পোশাক, ইত্যাদি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে। তবে দীপ্তির সেক্স নিয়ে আলাপের দিকে খুব ঝোঁক। আমাদের মধ্যে মালা বিবাহিত, তার বর ঢাকা ভার্সিটির স্টুডেন্ট। দীপ্তি মাঝে মাঝেই মালাকে হোস্টেলে ধরে আনে, তার কাছ থেকে নানারকম গল্প শুনতে চায়। মেয়েরাও ভিড় করে, হাঁ করে শোনে, হেসে লুটোপুটি খায়। তবে এসব আলোচনায় দীপ্তি আমাকে রাখতে চায় না। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলে, এই, তুই যা! মাস্টারনি মার্কা মুখ করে এখানে থাকতে পারবি না!

আমি অগত্যা চলে আসি। দীপ্তি মাঝে মাঝে আমার রুমেও আসে। আমার টেবিলে সবসময় অনেক রকমের বই থাকে। গল্পের বই, কবিতার বই, উপন্যাস। দীপ্তি নেড়েচেড়ে দেখে। তারপর বলে, কী সব বই যে তুই পড়িস! তোর কাছে ঐ বই নাই?

কোন বই? আমি বেকুবের মতো প্রশ্ন করি।

দুর! গাধা কোথাকার! ঐ যে কথা কম, কাজ বেশি, ঐ বই!

আমি মহাফাঁপড়ে পড়ি। এমন বইয়ের নাম তো জীবনে শুনি নি! গাড়লের মতো আমি বলি, কথা কম কাজ বেশি সে আবার কী বই? কার লেখা?

বিরক্ত হয়ে দীপ্তি উঠে পড়ে। আমার চোখ থেকে চশমাটা একটানে খুলে নিয়ে সশব্দে টেবিলে রেখে, আমাকে—

বোকা, বালের বই পড়ে, বাল ছেঁড়ে সারাদিন—ইত্যাদি বলতে বলতে চলে যায়। আমি হতবাক হয়ে দীপ্তির রাগের কারণ খুঁজি।

দীপ্তি আর অথৈ সবসময় একে অন্যের সাথে আঠার মতো সেঁটে থাকে। যেন প্রেমিক প্রেমিকা। এমনকি ওরা ঘুমোয়ও একসাথে। ওদের ঘুমুনোর ভঙ্গিটা এত দৃষ্টিকটু যে সবারই তা চোখে লাগে। ওরা যখন একে অন্যের সাথে কথা বলে এমনকি তাও আমাদের কানে অন্যরকম শোনায়। ও রকম সুরে বন্ধু কখনও বন্ধুর সাথে কথা বলে না। মালা একদিন বলে বসল, জানিস, ওরা আসলে লেসবিয়ান!

লেসবিয়ান শব্দটা সে সময় আমাদের অনেকেরই জানা নেই। আমরা হইহই করে উঠি, লেসবিয়ান মানে কী রে!

মালা এদিক ওদিক দেখে নিয়ে ষড়যন্ত্রীর মুখে আমাদের দিকে তাকায়। তারপর বিজ্ঞের মতো বলে, এটা জানিস না! লেসবিয়ান মানে হল মেয়েতে মেয়েতে সেক্স করা!

আমরা ভুত দেখার মতো চমকে উঠি। অবাক হই। বইপত্রে এমনটা পড়েছি বটে কিন্তু বাস্তবে যে এমন হয় সে ভেবে শিউরে উঠি। অনেকে ছি ছি করে। অনেকে আবার ঘেন্নায় নাক মুখ কুঁচকে আর ওদের সাথে মিশবে না বলে মনস্থির করে। আমি গম্ভীরভাবে সবাইকে বুঝানোর চেষ্টা করি যে, এটা এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা। আমাদের আসলে ওদেরকে বন্ধু হিসেবে বুঝানো উচিত। প্রয়োজনে ওদের পরিবারের লোকজনকে জানিয়ে সতর্ক করা উচিত। এ ব্যাপারে আমি ছোটখাট একটা বক্তৃতা মতো দিয়ে ফেলি। আমার বক্তৃতা ওদের উপর কতটুকু প্রভাব ফেলে জানি না, তবে পরিবারের লোকজনকে জানানোর ব্যাপারটা মনে হয় অনেকেরই মনঃপূত হয়। পরিবারের লোকজনকে জানালে ওদেরকে কতখানি হেনস্থা হতে হবে, কতটা শাস্তি ওদেরকে দেয়া হবে সে দৃশ্য কল্পনা করে অনেকেই নড়েচড়ে ওঠে, পুলকিত হয়ে ওঠে মনে মনে। কিভাবে জানানো যায় সে ব্যাপারে মতামত চায়।


অবাক হয়ে দেখি কিভাবে ডায়ানা তেরেজার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে নিজের জনপ্রিয়তার পাল্লা ভারি করে


চিঠি লিখে জানানো যেতে পারে। আমাদের নাম পরিচয় গোপন রেখে—বিজ্ঞের মতো বলি আমি। আমার প্রতি হঠাৎ সবার গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় বেশ একটু আনন্দ হয় আমার। শেষ পর্যন্ত সাব্যস্ত হয়, প্রথমে বন্ধু হিশেবে আমরা ওদেরকে সতর্ক করব, বোঝাব। এসব কতখানি গর্হিত কাজ, এসব করলে পরকালে যে নিশ্চিত দোজখের দাউদাউ আগুনে লাকড়ির মতো পুড়তে হবে অনন্তকাল ধরে, সে ব্যাপারে ওয়াজ নসিহত করব। তাতে কাজ না হলে তখন চিঠি লেখা হবে এবং এ দায়িত্বটা আমার উপর বর্তায়, যেহেতু আমি ভালো চিঠি লিখতে পারি। নিজের প্রেমিককে ছাড়াও কলেজের অন্য অনেকের প্রেমিককে মাসে বেশ কয়েকটা চিঠি লেখার পবিত্র দায়িত্ব আমি খুব গুরুত্বের সাথে পালন করি। এতে ঝঞ্ঝাটও কম নয়। বেশ ক বার ধরা খেয়েছি। অন্যের প্রেমিক শেষে আমার প্রেমিক বনে গেছে।

যা হোক, পরিকল্পনামাফিক এগোনোর আগেই হুট করে প্রিন্সেস ডায়ানা আর তার প্রেমিক ডোডির মৃত্যু সংবাদে আমরা একটু মর্মাহত হয়ে পড়ি। অনেকে আবার প্রিন্সেস ডায়ানার নাম পর্যন্ত তখনও শোনে নি। তাদেরকে সবিস্তারে প্রিন্সেস ডায়ানা সম্পর্কে বয়ান করার ব্যস্ততা কাটতে না কাটতেই শোনা যায় মাদার তেরেজাও পটল তুলেছেন। আরও একধাপ ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ডায়ানার চেয়ে তেরেজাকে চেনানো বেশি কঠিন হয়ে ওঠে। ডায়ানার ঝা চকচকে চেহারা দেখে অনেকেই তাকে চিনতে আগ্রহী হলেও তেরেজার কুঁচকানো হাড্ডিসার চেহারা দেখে তাকে চেনায় কেউ তেমন একটা আগ্রহ দেখায় না এবং এটা খুব অন্যায় বলে মনে হয় আমার। আমি ডায়ানার চেয়ে তেরেজাকে চেনানো অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করি এবং অবাক হয়ে দেখি কিভাবে ডায়ানা তেরেজার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে নিজের জনপ্রিয়তার পাল্লা ভারি করে তোলে। অথচ ডায়ানার মৃত্যু সংবাদে তেরেজা রীতিমতো শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন! আমি বন্ধুদের সেকথা বলি। তারা বরং ডায়ানা আর ডোডির প্রেম নিয়ে আগ্রহ দেখায়, ডায়ানার জীবন কাহিনি শুনতে চায়। আমি দুঃখিত হই। এটাকে ডায়ানার চরম স্বার্থপরতা মনে হয় আমার। যত যাই হোক তেরেজার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা একদম উচিত নয় তার, মনে মনে রায় দিই আমি।

এরমধ্যেই ঘটে যায় অঘটন। সারা কলেজে ছি ছি পড়ে যায়। তদন্ত কমিটি বসে। রাজনৈতিক নেতা ফেতার আনাগোনা শুরু হয় কলেজে, আমাদের সব পরিকল্পনা মাঠে মারা যায়।

আমরা রাতে দোতলার যে রুমটাতে আড্ডা দিই সেটাতে সিনিয়ররা কেউ থাকে না। ফলে দরজা বন্ধ করে আমরা মনের সুখে বকি, চেঁচামেচি করি। সন্ধ্যার পরপরই বিদ্যুৎ চলে যায়। আমরা কোনো কোনোদিন মোমবাতি জ্বালি, কোনো কোনোদিন অন্ধকারেই আড্ডা দিই। খুব প্রয়োজন হলে টর্চ জ্বালি, আবার নিভিয়ে দিই। হোস্টেলের প্রাচীর বেশ উঁচু, তার পেছনে ফাঁকা মাঠ। দিনে দোতলা থেকে পরিষ্কার দেখা যায়। হোস্টেলের সামনের দিকে শানবাঁধানো বড় পুকুর। সেখানে অনেকেই দিনের বেলা গোসল করতে যায়। সাঁতার কাটে। পুকুরের শেষে উঁচু প্রাচীর। প্রাচীর ঘেঁষে একটা চারতলা বাড়ি। সেখানে তৃতীয় তলায় ছেলেদের মেস। জানালা দিয়ে প্রায়ই ছেলেদেরকে উঁকিঝুঁকি মারতে দেখা যায়। বিশেষ করে মেয়েরা যখন গোসল করতে যায় সে সময় জানালার পাশে অনেক ছেলেকেই সুপার গ্লু হয়ে সেঁটে থাকতে দেখা যায়।

একদিন প্রাইভেট পড়ে ফিরে দীপ্তি খুব চেঁচামেচি করে। এ তল্লাটের বিটকেল ছেলেটা, স্থানীয় নেতার চামচা রতন, তাকে পথে প্রায়দিনই বিরক্ত করে, সেদিন নাকি রীতিমত হুমকি দেয় একা পেয়ে। আমরা হল সুপারের কাছে নালিশ করায় তিনি ব্যাপারটা দেখার আশ্বাস দেন। এরমধ্যেই দীপ্তির বাতিক ওঠে সাঁতার শেখার। প্রতিদিন দুপুরে, ক্লাস শেষে সে অথৈকে নিয়ে পানিতে নেমে দাপাদাপি, জড়াজড়ি করে। আমাদের তখন আবার মনে পড়ে যায়, আমাদেরকে অতি মহান এক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নামতে হবে। কিন্তু দীপ্তি আর অথৈ পানিতে নামার পরপরই ও পাশের তিনতলার জানালায় চামচা রতনের চাঁদবদন দেখা যেতে থাকে এবং যতক্ষণ ওরা পুকুরে থাকে ততক্ষণ তার চাঁদবদন আর নড়েচড়ে না। দীপ্তি আবার সুপারের কাছে নালিশ করায় এবার হাতে নাতে ফল পাওয়া যায়। ওপাশের তিনতলা থেকে বড় একটি ঢিল উড়ে এসে দীপ্তি বা অথৈ এর গায়ে না লেগে সিনিয়র একটি মেয়ের মাথায় লেগে তার মাথা ফেটে যায়। বিচারস্বরূপ, অনির্দিষ্টকাল সকলের পুকুরে নামা বন্ধের নির্দেশ আসে।

কিন্তু তাতে ঝামেলা কমে না। দোতলায় যে রুমে আমরা সন্ধ্যায় আড্ডা দিই তার পাশের খোলা মাঠে রতন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারে গাঁজার আড্ডা বসায়। বিদ্যুৎ চলে গেলে সে মাঝে মাঝেই আমাদের হোস্টেলের রুমগুলো লক্ষ করে টর্চ মারে। রাতে আমরা তাদেরকে দেখতে না পেলেও তারা আমাদের দেখতে পায়। তাদের সম্মিলিত হাসির শব্দ ভেসে আসে। মাঝে মাঝে, যখন বিদ্যুৎ থাকে না, তখন তাদের ছায়ার নড়াচড়া চোখে পড়ে। অনেক সময় তারা ইচ্ছে করে আমাদের হোস্টেলের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হিসু করে, অশ্লীল উক্তি ছুঁড়ে দেয়। আমরা না শোনার ভান করি। দীপ্তির মতো দু চার জন আবার পাল্টা উক্তিও ছোঁড়ে। কিন্তু এবার সিনিয়র মেয়েটার মাথা ফাটার পর আমাদের সবারই মেজাজ খারাপ হয়। আরও মেজাজ খারাপ হয় এমন অদ্ভুত বিচার দেখে। দীপ্তি রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, শুয়োরের বাচ্চা রতন! তোর বাপরে যদি আমি না চুদছি তো আমার নাম দীপ্তি না!

আমাদের সম্মিলিত হাসির শব্দে দীপ্তি আরও ক্ষেপে যায়। রাগ হলে সে অদ্ভুত সব গালি দেয়। যা আমরা শুনেও এমনকি কানে আঙুল দিই।

সেদিন সন্ধ্যায় যথারীতি বিদ্যুৎ চলে যায়। দোতলার রুমে অন্ধকারে আমরা আড্ডামগ্ন। এমন সময় রতনের খিস্তি শোনা যায়। গাঁজা খেয়ে সে প্রায়দিনই হোস্টেলের দিকে মুখ করে এমন খিস্তি করে। সাথে তার চামচাগুলোও। দীপ্তি তার টর্চ নিয়ে জানালা দিয়ে সেদিকে তাক করে সুইচ টিপে দেয়। আমি চোখ সরিয়ে নিই। অনেকেই লজ্জায় সরে আসে। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এ ওর মুখের দিকে প্রথমে আমরা উজবুকের মতো তাকিয়ে থাকি। তারপর সারা রুমে হিহিহি হাসির জোয়ার ছোটে। দীপ্তির কোনো বিকার নেই। সে অকম্পিত হাতে টর্চ সোজা মাঠের দিকে ধরে রাখে। ওপাশ থেকে প্রথমে বিস্ময়সূচক দুয়েকটি শব্দ আসে, তারপর সব চুপচাপ। দীপ্তি টর্চ নিভিয়ে বসে পড়ে মেঝেতে। হিহিহি চলতে থাকে আমাদের। মালা সেদিন হোস্টেলেই ছিল। সে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে বলে, হিহিহি… হেব্বি জিনিস রে, হিহিহি…

বাকিরাও যে যার মতো মন্তব্য করে, হাসে।

পরদিন কেমন একটু থমথমে হয়ে ওঠে পরিবেশ। বাতাসে কেমন একটা বিপদ বিপদ গন্ধ ভেসে আসে। অফিসে ডাক পড়ে দীপ্তির। আমাদের মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে যায়। কিন্তু রতন শুধু দীপ্তিকেই অভিযুক্ত করে। বলে, সে সন্ধ্যায় হিসু করছিল মাঠে, সে সময় দীপ্তি তার উপর টর্চ ফেলেছে। খারাপ কথা বলেছে। তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। রতন শুধু দীপ্তির নামেই অভিযোগ করায় তদন্ত শেষে দীপ্তিকে টিসি দিয়ে কলেজ থেকে বের করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আমাদের জনহিতকর পরিকল্পনা মাঠে মারা যায়। অথৈর হাউমাউ কান্না, আমাদের হা হুতাশ, কলেজ কর্তৃপক্ষের ছি ছিক্কার, শিক্ষকদের তিরস্কার আর রতনের দেঁতোহাসি সাথে নিয়ে কলেজ ছাড়ে দীপ্তি। আমাদের কারও সাহস হয় না তার সাজা মওকুফের প্রার্থনা করার কিংবা তার হয়ে সাফাই গাওয়ার। দীপ্তি কোনো কিছুর তোয়াক্কা করে না। সে যেন কিছুই হয় নি, বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছে ভাব করে কলেজ ছাড়ে। এরপর থেকে দীপ্তি আর অথৈর চিঠি চালাচালি হয়, আমরা লুকিয়ে সেসব চিঠি পড়ি, ফিসফাস করি, এমন চিঠি তো প্রেমিক প্রেমিকারাই শুধু লেখে, বলি আমরা। এবং এভাবেই একসময় আমাদের কলেজ জীবন শেষ হয়ে যায়। আমরা যে যার পথে ছিটকে যাই যথা নিয়মে।


প্রাণপনে সংযত রাখি নিজেকে। সব সময় বৃষ্টি নামতে নেই। জলাবদ্ধতায় বিপত্তি বাড়ে খুব।


বাসের মধ্যে অথৈ আর আমি নিজেদের পথ থেকে ছিটকে পড়ি আবার, আবার ফিরে যাই সেই কলেজ হোস্টেলে, সেই শিহরন তোলা দিনগুলোতে। নেকাব জড়ানো এই অথৈকে আমার সেই অথৈ বলে চিনতে কষ্ট হয় খুব। কি উচ্ছল, উদ্দাম ছিল অথৈ! অথচ এখন! মুখে নেকাব, থলথলে, গিন্নিবান্নি চেহারার এই অথৈ যেন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে কোনো এক খোলসের আড়ালে, শামুকের মধ্যে যেন ঢুকে গেছে সে। অথৈ এর পাশে সিট খালি হতেই বসে পড়েছি কখন, খেয়াল করি নি নিজেই। কথা বলে যাচ্ছি একের পর এক। আমাদের মনের মধ্যে পদ্মের মতো ভেসে ওঠে তখনকার এক একটা দিন। আমরা এখনকার খোঁজ খবর নিই, ফোন নাম্বার আদান প্রদান করি, কিন্তু মনে মনে সেসব দিনের ছবিগুলোর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি। কী মধুর ছিল সে সব একেকটা দিন ভাবতে ভাবতে অদ্ভুত এক আনন্দে মন ভরে ওঠে আমাদের। সম্বিত ফেরে হঠাৎ অথৈ যখন বলে, স্বাতী, আমি এবার নামবো রে। এসে পড়েছি।

—বলে সে উঠে দাঁড়ায়। দরজার দিকে এগোতে এগোতে যেন হঠাৎ মনে পড়ে এমনভাবে পেছন ফেরে অথৈ, বলে, ওহ্! স্বাতী! তোকে তো বলা হয় নি রে, দীপ্তি মারা গেছে! ক্যান্সার হয়েছিল। দু বছরের একটা মেয়ে রেখে মারা গেছে! যাই রে! ফোন করিস!

দীপ্তি ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যায়। হারিয়ে যায় যেন। না, দীপ্তি নয় তো! অথৈ! আমি জানি, অথৈও হারিয়ে যাচ্ছে। আর কোনোদিন দেখা হবে না আমাদের। না হোক। আজ এই দেখাটারও কোনো প্রয়োজন ছিল না। দীপ্তি আমার মধ্যে এতদিন বেঁচে ছিল। অথৈ এর সাথে দেখা না হলে দীপ্তি বেঁচেই থাকত আমার মধ্যে। কী অদ্ভুত বিচার প্রকৃতির! কেন আজ এভাবে দেখা হয়ে গেল অথৈর সাথে? কী প্রয়োজন ছিল এর! ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে অথৈর ছায়া। জোর বৃষ্টি হচ্ছে আজ। ঢাকা শহর ডুবে যাচ্ছে জলে। জ্যামে স্থাণু দাঁড়িয়ে আছে বাস। আমি ঝাপসা চোখে বৃষ্টির দিকে, অথৈ এর অপস্রিয়মাণ ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার ভেতরের নদীটাতে উথলে ওঠে জল, উছলে পড়ে ঢেউ। প্রাণপনে সংযত রাখি নিজেকে। সব সময় বৃষ্টি নামতে নেই। জলাবদ্ধতায় বিপত্তি বাড়ে খুব।

শিল্পী নাজনীন

শিল্পী নাজনীন

জন্ম ১৪ জুলাই, ১৯৮১; কুষ্টিয়া। কবি, কথাচিত্রী।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই :
ছিন্নডানার ফড়িঙ [উপন্যাস, কাা বুকস, ২০১৬]
আদম গন্দম ও অন্যান্য [গল্পগ্রন্থ, ছিন্নপত্র প্রকাশনী, ২০১৭]
তোতন তোতন ডাক পাড়ি [শিশুতোষ গল্প, ছিন্নপত্র প্রকাশনী, ২০১৭]

ই-মেইল : 81naznin@gmail.com
শিল্পী নাজনীন