হোম গদ্য গল্প পাণ্ডুলিপির গল্প : জীবন সায়াহ্নে

পাণ্ডুলিপির গল্প : জীবন সায়াহ্নে

পাণ্ডুলিপির গল্প : জীবন সায়াহ্নে
156
0

[২০১৮ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে মহ্‌সীন চৌধুরী জয়ের প্রথম গল্পগ্রন্থ অদৃশ্য আলোর চোখঅদৃশ্য আলোর চোখ থেকে ‘জীবন সায়াহ্নে’ গল্প পরস্পরের পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন মির্জা মুজাহিদ। প্রকাশ করেছে ‘অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি’।  বইটি পাওয়া যাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ৩৩১ নং স্টল-এ।]


বিছানার চারদিকে ঝাঁক বেধে বসা অন্ধকারে শুয়ে আছি। অথর্ব জীবনের পাশে অন্ধকার সাক্ষী হিশেবে মন্দ নয়। আলো? বাহ্যিক আলো জীবনকে আর কতটুকু আশান্বিত করবে? প্রকৃতার্থে আলো এখন ভয়েরই নাম। ঝলসে দেয় আমার চোখ। পোড়া শরীরে অস্থিরতা জাগায়। তাই ‘মন আর প্রাণ’ উজার করে প্রার্থনায় রত হয়ে অন্ধকারে মিশে যাই। বাস্তবে চলে প্রতীক্ষা। এক জীবন অতিক্রমের প্রতীক্ষা। জীবন স্বপ্নহীন, আশাহীন—শূন্যতায় ঘেরা জীবনের চতুর্দিক। বেঁচে থাকার দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত প্রাণ শেষ যাত্রার পথে পা বাড়াতে চায় নিরুদ্বেগে, নির্দ্বিধায়।

‘আশিতে আসিও না।’ এরকম শুনেছি বহুবার। আমিও কম বলি নি তুমুল আড্ডায় কিংবা একান্তে, নিজেকে। আশি বছর পার করেছি। আজ একাশিতম জন্মদিন। আমার পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কেউ মনে রাখে নি এই উৎসবের কথা। উৎসব কি? একটা সময় তো আমার অজান্তেও উদ্‌যাপন হতো অতি নাটুকে আয়োজনগুলো। কৃপাপ্রার্থীদের মূল্যায়ন ছিল এমন, যেন তাদের জীবনে আজকের দিনটিই সবচেয়ে প্রিয়। হায় জীবন! জীবন আমাকে দীর্ঘকাল ধরে বয়ে চলেছে। আমি চলছি কি? শ্লথ জীবনচাকা। অথর্ব, খর্বকায় এক জীবন্মৃতের দায়ভার এ দেহ। শরীরের চাহিদায় কেটেছে জীবনের বহু বছর। আজ শুধু চামড়ার কান্না। কত লুব্ধতা কাজ করেছে এ শরীর ঘিরে। এখনও স্মৃতি মুছে দিতে পারে নি ঘোর-লাগা সেই বিছানার উচ্ছ্বাস।

প্রথম প্রথম শুয়েছি জীবনের তাগিদে, অতঃপর শরীরের তাগিদ—জীবন বাস্তবতায় স্বাচ্ছন্দ্য পেতে সব শেষে মেতে উঠেছি কিছু না ভেবেই। প্রথমে স্বামীর সাথেই শুরু। স্বামী! স্বামীই বটে… অথর্ব হোক, অকর্মা হোক, দেন মোহরের বাকিতে অনৈতিক মিলনে হোক, ভালোবাসা আর সামাজিক মানদণ্ডে মেনে নিয়েছে শরীর, মন…


জগতের নিয়মই এটা, মেয়েরা ফুর্তি করলে টাকা পায় আর পুরুষ ফুর্তি করলে টাকা যায়।


কিন্তু এভাবে কতদিন? কতদিন চলে শরীরের ক্ষুধা মিটিয়ে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার মুগ্ধতা! মুখ তো পেটের যন্ত্রণায় সর্বগ্রাসী হাঁ নিয়ে চিৎকার করে ওঠে। কিছুদিন পর বুঝতে অসুবিধা হয় নি—ক্ষুধা বেড়ে গেলে ভালোবাসা কমে যায়। কমে যায় আদর করার ক্ষমতা, আদর গ্রহণের তৃষ্ণাও।

কী অদ্ভুতরকম ছিল সেই দিনগুলো। অথচ বিয়ের দু’মাস যেতে না যেতেই স্বামী নিরুদ্দেশ। শ্বশুর বাড়ির লোকজনও কিছু বলতে পারে না। কোনো চিঠিপত্র নেই। যুবতী স্ত্রীর খোঁজ নেওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করে নি। সদ্য বিবাহিত নারীর চাওয়ায়, প্রত্যাশায়, স্বপ্নে যে আনন্দগুলো একত্রে জড়ো হয়ে কাছে এসে ভিড়ে, তখন তার সবগুলোই দুঃস্বপ্ন হয়ে দূরে সরে গেল। সীমাহীন দুঃচিন্তার মাঝে পেট আর শরীরের ক্ষুধা এ বুকে যতটা না যন্ত্রণার উদ্রেক করেছিল তার চেয়ে চতুর্গুণ আতঙ্ক আর অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল স্বামী হারানোর চিন্তা। একা, আগামীর জীবন বয়ে বেড়ানোর কল্পনাতঙ্ক।

সেই বিপদে, দুঃসময়ে আমার সখি আনোয়ারা সাহায্যের হাত বাড়াল। গ্রামের কিছু জমি, গয়না বন্ধকের ব্যবস্থা করে ওর সাথে কুয়েত নিয়ে গেল। বাবার জমি আর মায়ের গয়না আমার দুঃসময়ের সাথী হলো। কুয়েত! নতুন পরিবেশ, নতুন ভাষা। সখি সবটাই বুঝে তাদের মুখের ভাষা, এমনকি চোখের ভাষাও। কিন্তু আমার বুঝতে তো একটু সময়ই লাগল। সাহেবের নজর খারাপ। সখির শরীরের স্বাদ নিয়েছে এ পশু। আমার অভুক্ত শরীরের প্রতিও তার ভোক্তার চোখ। কতদিন আর বিরত থাকব? শরীরের ছটফটানি প্রথমাবস্থায় ছিল না কিন্তু টাকার টানাটানি তো ছিলই। বন্ধকি জমি মুক্ত করতে এ ছাড়া আর উপায় কী? চামড়ার উপর দিয়েই যাক সব। ভেতরে প্রবেশ না-করুক কোনো পাপ।

বেঁচে থাকলে—প্রকৃতি বাঁচিয়ে রাখলে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আশা-নিরাশা, স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গের মাঝেই বাঁচিয়ে রাখেন। দুঃখ যেমন বেশিদিন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সুখও তেমনি ঝড়ো হাওয়ার মাঝে পড়া মোমের আগুনের মতো দপ করে নিভে যায় না। স্বামী ফিরে এল। আমিও বছরখানির বিদেশ করে বাড়িতে ফিরে এলাম। স্বামী নতুন করে বিয়ে করে নি। হতাশার জীবন নিয়ে শুধু ছুটে বেরিয়েছে দেশের এ পথ থেকে ও পথ। আমরা নতুন করে পরস্পরের সান্নিধ্য পেলাম। আনন্দে মেতে উঠা আমাদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী আনন্দের ফল স্বরূপ দুবছরের মধ্যে দুটো কন্যা সন্তান কোলে এল। কী ফুটফুটে চেহারা দুটোর। গর্ভ থেকেই যেন কতকিছু শিখে এসেছে। সখিকে ওদের কাহিনি বলি আর গর্বে আমার বুক ফুলে ওঠে। দুটোর মুখই যেন অপার মায়া দিয়ে বাঁধানো। সুন্দর চোখগুলোর ভেতর প্রবেশ করতে ইচ্ছে হয়। চুমোয় চুমোয় লাল করে দেই ওদের চেহারাসূর্য। যখন-তখন প্রস্রাব পায়খানা করে দেয়। আর সেকি কান্না। ওদের কান্না তো আমার সহ্য হয় না। মুহূর্তেই সব পরিষ্কার করে ফেলি। আপন গর্ভের টুকরা বলেই হয়তো মনে এতটুকু খারাপ লাগা কাজ করে নি কোনোদিন। দুর্গন্ধ কিংবা ঘৃণা ভেতরে প্রবেশই করে নি—তবে আর খারাপ লাগবে কেন? মাঝে মাঝে কষ্ট হতো, নিজের প্রতি ঘৃণা জন্মাত এই ভেবে যে, কুয়েতে আমি কতকিছুই না করেছি। সামান্য টাকার জন্য নারীত্বকে বিক্রি করে ভোগের সামগ্রীতে পরিণত হয়েছি। এসবের প্রভাব কি সন্তানদের উপর পড়বে না? ভয়ে আমার গা শিউরে উঠত। কান্না পেত। আমার কান্না দেখে বাচ্চাদুটো বিহ্বল চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকত। কী নিষ্পাপ চোখ, কী মায়া চাহনিতে। বড় হলে ওদের মায়া আরো বৃদ্ধি পাবে নিশ্চয়ই। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করেছি এ কথা ভেবে যে, আমার স্বামী অন্তত কুয়েতের অনৈতিকতার বিষয়টা সম্পর্কে কিছুই জানে না।

ফারজানা আর অঞ্জনা হাঁটতে পারে। দৌড়ে এসে আমার বুকের উপর আছড়ে পরে শূন্যতা দূর করে। পরস্পর নিয়ম করে সেই বুকের স্তন্য পান করে ঘুমিয়ে থাকে। এ এক অপার্থিব আনন্দ। সারাদিন ওদের নিয়েই কেটে যায়। এত মায়া আমার মধ্যে কী করে তৈরি হলো তাই ভাবি মাঝে মাঝে, একান্তে। অন্যসব স্বাদ যেন আমাকে স্পর্শই করে না। মেয়ে দুটোর স্বাদ পূরণই যেন আমার কর্তব্য। তবে সংসারনামক জীবনে জটিলতার অন্ত নেই। স্বামী তো কিছুই করছে না। প্রতিদিন নিয়ম করে সকালে বাইরে যায় আর রাতে ফিরে আসে। কাজ খুঁজে? কিন্তু কাজ খোঁজার কোনো লক্ষণই আমার চোখে পড়ে নি। আমাকে কি আবারও কুয়েত যেতে হবে? সংসারের স্বার্থে, ফুটফুটে দুটো মেয়ের স্বার্থে? এমন জীবন কি কারো কাম্য হয়?

স্বামী ভেতরে ভেতরে ঠিক বুঝতে পেরেছিল। প্রকাশ্যে বললে আমি বুঝতে পারি। স্বামীর সন্দেহ ঠিক। যদিও আমি অস্বীকার করি। আমার প্রকাশভঙ্গি ছিল রাগত। তবে কেন চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছিল? অস্বীকারের মধ্যেও কি মেনে নেওয়ার একধরনের প্রবণতা কাজ করেছে?

শুরুতে আমিই স্বামীকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলাম—
‘সারাদিন তুমি বাইরে কী করো?’

‘সারাদিন আমি বাইরে কি করি সেই কৈফিয়ত নেওয়ার জন্যেই তোমাকে ঘরে এনেছি, তাই না?’

‘সংসারে টাকা দাও। আমি কৈফিয়ত চাইব না। আমার টাকা দিয়া তুমি বাহিরের মেয়ে নিয়া ফুর্তি করবা, এটা তো মেনে নেব না।’

‘তুমি যে ফুর্তি করে টাকা রোজগার করো সেটা তো আমি ঠিক মেনে নিয়েছি। জগতের নিয়মই এটা, মেয়েরা ফুর্তি করলে টাকা পায় আর পুরুষ ফুর্তি করলে টাকা যায়।’

আমি কিছুটা সময় বিহ্বল ছিলাম। ‘আমি ফুর্তি করে টাকা রোজগার করি? কথাটা বলতে তোমার বাধল না?’

‘তুমি ফুর্তি করতে পারবা আর আমি বলতে পারব না?’

আজ বিছানায় শুয়ে এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে কাপড় নষ্ট করে ফেলছি টেরই পাই নি। এভাবে কাপড় নষ্ট অবস্থায় কতটা সময় থাকতে হবে আমার আল্লাহ-ই জানে। চলার ক্ষমতা নেই। কাজের মেয়েটা দয়া করে এগিয়ে এলে তবে হয়তো কিছুটা সময় পর নিস্তার পাব। অবশ্য দুর্গন্ধ নিয়ে বসে থাকতে থাকতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ছোট মেয়েটা একদিন এ অবস্থা দেখে বমি করে দিয়েছিল। অসহ্য হয়ে কী সব বলাবলি করে গালমন্দ করছিল আমাকে আর কাজের মেয়েটাকে। কষ্টের হাসি এসেছিল আমার মুখে। ও কিন্তু আমার কোলেতেই সব করত। আর আমি পরম মমতায় হাসি মুখে সব পরিষ্কার করতাম। মেয়েটা এখন আর এদিয়ে পা দেয় না। জাহান্নামও নাকি এরচেয়ে সুন্দর হয়। আমি হতবাক! নির্বাক হয়ে দুর্গন্ধ নিয়ে বসে থাকি। কাজের মেয়েটা এসে হয়তো কিছুটা সময় বকাঝকা করবে—রাগে অসহ্য হয়ে শরীরকে ঝাঁকি দিয়ে খাটের কিছুটা দূরে ফেলে দিবে—তবুও তো পরিষ্কার করবে।

সেই সময়ে স্বামীর কাছ থেকে লাঞ্ছিত হয়ে দেশে আর থাকতে পারলাম না। কুয়েত চলে এলাম। শেফালি নামে স্বামীর দূরসম্পর্কের এক ভাগ্নি আমার মেয়েদের দায়িত্ব নিল। শেফালির বয়স পনের-ষোল হবে। স্বামী পরিত্যক্তা। তখনও ছোট মেয়েটা হয় নি, ছেলেটাও না—বড় মেয়েদুটো যাবার সময় কথা বলতে পারত। কী সব ভাঙা ভাঙা শব্দ বলে আর কান্না করে। জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে পরস্পরের অজ্ঞান হয়ে যাবার অবস্থা। স্বামী কান্না করে নি। অন্য ঘরে চুপ করে বসে ছিল।

নিজেকে ফিরে পেতে শক্ত হতে হয়েছিল। কুয়েতের জীবনে আবারও সেই একই অবস্থা। প্রচুর টাকা উপার্জন করছি। শরীর সোনার হরিণ হয়ে আমাকে সঙ্গ দিয়েছে। প্রায় এক যুগ কাটিয়ে দিলাম। জমি কিনেছি। বাড়ি বানিয়েছি। স্বর্ণ-গয়নাসহ জীবনের প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছুই গড়েছি। মেয়েরা চিঠি লিখে প্রতিনিয়ত চলে আসতে বলে। মায়ের প্রতি তাদের কত মায়া। আবদারেরও শেষ নেই। এটা আনতে হবে, ওটা আনতে হবে। ওদের জন্যই তো সব। আবদার মেটাতে আর আপত্তি কী। আমার প্রতি স্বামীর কোনো আবদার নেই। কিছুদিন অন্তর অন্তর টাকা তো পাচ্ছেই। সেই টাকাতেই চলে তার যাবতীয় আবদারের যোগান। আমাকে দেশে আনতে তার কোনো তাড়া নেই। একটিবারের জন্য বলেও না। স্বামী কামুক চরিত্রের এক লোক। প্রতিনিয়ত খোঁজে নতুন নারী-শরীর। সবই মেনে নিয়েছি। সংসার টিকিয়ে রাখার স্বার্থে জীবন মানুষকে উদার হতে শিখায়। তাই অনেক কিছু জেনেও জানি নি, দেখেও দেখি নি, শুনেও শুনি নি। বুঝতে পেরেছি, মানুষ রঙ্গমঞ্চে নয়, জীবনের মঞ্চেই নিপুণ অভিনয় করে।

কিন্তু কতদিন? সীমা অতিক্রম হলে কিভাবে মেনে নিতে পারি? সেই বাচ্চা মেয়েটার সাথে, দূরসম্পর্কের ভাগ্নির সাথেও শরীরী খেলায় মেতে উঠতে হবে! এতটা নীচ হওয়া মানুষের পক্ষে কী করে সম্ভব? দেশে এসে ভাগ্নিকে তাড়াতে গায়ে হাত পর্যন্ত তুলতে হলো। কিছুতেই যাবে না এ সংসার ছেড়ে। এ সংসার ওকে নাকি নিঃস্ব করে দিয়েছে। স্বামীর সাথে তুমুল বাক-বিতণ্ডা হলো। অতঃপর রাত নেমে এল। স্বামী যাবতীয় নীচতা ভুলে বিছানার উপর চলে এল। চাহিদা পূরণের পর স্বাভাবিক হয়ে গেল ওর প্রকৃতি, আচরণ।

মেয়ে দুটো তখন অনেক বড়। মানুষ হিশেবে খুব বড় হয় নি বুঝতে পেরেছি। পড়াশোনা করল না সেই অর্থে। জীবনবোধ ওদের মধ্যে গড়ে ওঠে নি নিঃসন্দেহে। শুধু চাহিদা আর চাহিদা। দেহের সৌন্দর্য ঠিক রাখতেই ওদের সারাটা দিন চলে যায়। পাশের বাড়ির বখাটে ছেলেদের সাথেও দেখি নানারকম ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলে। নিছক ছেলেমানুষি ওদের মধ্যে থাকলেও শরীর অন্য কথা বলে। আমার ভয় হলো। এদিকে আমার গর্ভে আবার সন্তান এল। আমিও তাই চাচ্ছিলাম। স্বামী ও সংসার হাতে রাখতে আরেকটি সন্তানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি। ছেলে হলো। এবার স্বামী খুব খুশি। বংশের প্রদীপ। মৃত্যুর পর মাটিও দিতে পারবে। প্রায়ই দেখি ছেলেকে নিয়ে আনন্দে মেতে থাকতে। দুটো মেয়ের ক্ষেত্রে যা হয় নি। ছেলেটাও বাড়ির সবার আদর পেয়ে পেয়ে কেমন বড় হয়ে উঠতে লাগল। হাঁটতে শিখে গেছে। মা বলে ডাকতে পারে। আমার কলিজার টুকরা। প্রথম সন্তানের মতো এতটা মায়া ও জাগাতে পারে নি সত্যি, তবুও ছেলে বলে কথা! কী এক আশ্চর্য প্রবাহ বুকের ভেতর কাজ করে। দিন চলে যাচ্ছিল নিয়ম করে। স্বস্তির সাথে। স্বামীর আদরেও সন্তুষ্ট ছিলাম। আবারও গর্ভে সন্তান। মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি, এ সন্তানগুলো কি মানুষ হবে? স্বামী তো এখনও অগণিত নারী-শরীর চেখে বাড়িতে ফিরে। মাঝে মাঝে স্বামীর সাথে মিলনে আমার শরীর গুলিয়ে ওঠে। তবুও কিছু বলতে পারি না। কী বলব! আমার শরীরেও যে কুয়েতি দুভাইয়ের আচড় লেগে আছে। আমাকে প্রতিনিয়ত খামছে ধরেছে, কামড়েছে, ধর্ষণ করেছে। কোন মুখে আমি পবিত্র শরীরের কথা বলব। স্বামী তো মানতে পারবেই না—আমার মনও সায় দেয় না।


হে পুরুষ! মাটি দিয়েছে চাপা—অবশেষে শান্ত হয়েছে তোমার শিশ্নবীর।


ভাবতে ভাবতে আমি মুষড়ে যাই। আমাদের মিলিত পাপাচারে ওদের শরীর কতটুকু পবিত্রতা ধারণ করবে? কান্না আসে। জীবন এক নারকীয় যন্ত্রণা হয়ে শরীর মনে ভর করে। ঘৃণা হয়। মরে যেতে ইচ্ছে হয়। এদিকে পাপী শরীর আর মন মরে যেতেও ভয় পায়।

এবার মেয়ে হলো। ফুটফুটে চেহারা। ও যেন স্বামী এবং আমার দুজনের চেহারাই দখল করে আছে। দুজনের চরিত্র দখল করলে তো এ মেয়ে এক পশুতে রূপান্তরিত হবে। ভয় হয়। ওর চেহারায় চোখ রাখলেই কেঁপে ওঠে শরীর। অতঃপর সময়ের নিয়মে চলে গেল আরো পাঁচ-ছয়টি বছর। অর্থের জোগান দিতে আবারও কুয়েত যেতে হবে। এবার বড় মেয়ে দুটোকেও সাথে নিয়ে গেলাম। পড়াশোনা করে নি। বখাটে ছেলেদের সাথে মেলামেশা করে। কিভাবে ভদ্র ঘরে মেয়েদের বিয়ে দেবো? মায়ের সাথে থাকলে জীবনের অনেক প্রতিকূলতাই ওদের স্পর্শ করতে পারবে না।

মেয়েরা খুব বেশি দিন আমার কাছে থাকল না। কোনোরকম একটা বছর পার করেছে। মানুষের বাড়িতে কাজ করতে ওদের ভালো লাগবে কেন? জীবনসংগ্রাম কী তা তো ওরা উপলব্ধি করতে পারে নি। আমি ফিরতে পারলাম না। সংসারের কঠিন দায় আমাকে কবে নিস্তার দিতে পারবে, নিস্তার আদৌ দিবে কিনা তাও বুঝতে পারছিলাম না। দেশে ফিরে কিছুদিন যেতে না যেতে দু’মেয়ে বিয়ে করে ফেলল। ওদের বাবার সম্মতি ছিল। আমার জন্য অপেক্ষা কিংবা আমার সম্মতি নেওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে নি। স্বামীর শরীর নাকি খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। মদে মজে মানুষটা মুমূর্ষু অবস্থায় পৌঁছেছে। অথচ বলে, মেয়েদের চিন্তায় চিন্তিত হয়েই নাকি এমনটা করেছে। আমার কি কোনো চিন্তা নেই? আমি কি শুধু টাকা রোজগারের মেশিন? অভিমানে স্থির করলাম আর দেশেই ফিরব না।

পাঁচ বছর পর ছেলেটাও বিয়ে করল। আমারই বোনের মেয়ে। আমাদের বিয়ের পরপর এ ব্যাপারে কথাও হয়েছিল—আমার ছেলে হলে আর ওর মেয়ে হলে আমরা পরস্পর নতুন করে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হবো। কিন্তু কেন যেন বিয়ের কথা শুনে রাগান্বিত হয়ে গেলাম। পশুর মতো আচরণ করতে ইচ্ছে হলো। ছেলের বউয়ের চুলগুলো ছিঁড়তে পারলে বেশ হতো। দ্রুত কাগজ-পত্র ঠিক করে দেশে ফিরে এলাম। আমার রণমূর্তি দেখে বাড়ির সবাই তটস্থ। আমার টাকাতেই সংসার চলে। মেয়েরা শ্বশুর বাড়ি গেছে সত্যি, তবে মোটা অঙ্কের পণ এবং নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা আমাকেই মেটাতে হচ্ছে। আমি ছেলেকে ডেকে পরিষ্কার জানিয়ে দিলাম বিয়েতে আমার অসম্মতির কথা। এ বিয়ে মানা আমার পক্ষে অসম্ভব। তালাক দিতে হবে। আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ভালো পরিবার দেখে এবং মোটা অঙ্কের পণ নিয়ে তোমার বিয়ে দেবো। অথচ আমি নিজেও জানি, আমার বোনঝি খুবই সুন্দরী। কেন যে বিয়েটা মানতে পারছি না তা আমি নিজেও জানি না। ছোট বোন চোখের সামনেই আমার স্বামীর সাথে রংঢং করে কথা বলত বলে? বিনা কারণে পরস্পর পরস্পরের গায়ে হাত রাখত বলে? এটাই কি তবে সমস্যা? নাকি আমাকে না জানিয়ে নিজের ইচ্ছেতে ছেলে বিয়ে করে ফেলছে বলে? সেই অভিমান আর রাগ থেকেই কি আমার এমন পশুসুলভ আচরণ?

ছেলে একদিন রাতে আমার রুমে এসে বলল, ‘মা, আমি তোমার প্রস্তাবে রাজি, তবে তোমাকেও আমার একটা কথা রাখতে হবে।’

আমি প্রতিনিয়ত পরাজয়ের চিন্তায় ভেতরে ভেতরে মরে যাচ্ছিলাম। আমার সংসার, আমার রোজগার আর আমিই কিনা পরাজিত হয়ে সবার সামনে ছোট হব! ছেলের কথায় জয়ের আশা দেখে মনটা নেচে উঠল।

‘তোমার শর্ত কী বলো তো?’

শফিক বলল, ‘আমাকে দক্ষিণ পাড়ার বাড়িটা লিখে দিতে হবে।’

আমি তো অবাক। কিছুটা সময় নির্বাক হয়ে রইলাম। এ ছেলে বৈষয়িক বিষয়ে কবে এত পাকা হলো? ওই বাড়িটাকে আমার সম্পত্তির অর্ধেকই বলা চলে। প্রায় পাঁচ কাঠা জমির উপর বাড়িটা নির্মিত। বাকি অর্ধেকের মধ্যে জমি-জামা আছে, এই বাড়িটা আছে।

কিন্তু ছেলে নাছোড় বান্দা। অন্যথায় আমার কথা ও রাখতে পারবে না।

ছেলে বোনের মেয়েকে তালাক দিল। এ নিয়ে দুপরিবারের মধ্যে প্রচণ্ড ঝামেলা। মামলা-মোকাদ্দমায় গেল না সত্যি, তবে যেকোনো সময় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। অথচ আমার স্বামীর এ বিষয়টা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। মদ আর নারী নিয়ে ও বেশ মজে আছে। কিছুদিন পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে আমি দক্ষিণ পাড়ার বাড়িটা শফিকের নামে লিখে দেওয়ার জন্য এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগলাম। বাড়ির কারো কারো হয়তো এ বিষয়ে কিছুটা সন্দেহ হলো। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও ওদের চোখ যেন কথা বলতে চাইছে। এ পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই স্বামীর শরীর খারাপ হতে লাগল। কিছুদিনের মধ্যে একেবারেই মুমূর্ষু অবস্থা যেন। এক রাতে তিনি আমাকে শুয়ে শুয়ে বললেন, ‘সারাজীবন অনেক কষ্ট করেছ। এই বাড়ি, জায়গা-জমি সবই তোমার। আবেগের বশে এ সম্পত্তি নষ্ট করো না।’

আমি থতমত খেয়ে গেলাম। স্বামী কি সব জানে?

‘তুমি কী বলতে চাচ্ছ? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘আমি কিছুই বলতে চাচ্ছি না। আসলে আমার বলার যোগ্যতা এবং ক্ষমতা কোনোটাই নেই।’

আমি সারারাত জেগে ভাবতে থাকলাম। আর স্বামী গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

সকালে উঠে দেখি ছোট মেয়ে কল্পনা বাড়িতে নেই। অনেকটা সময় অপেক্ষার পর ওর রুম তল্লাশি করে বুঝলাম, পাশের গ্রামের আবু সালামের সাথে পালিয়ে গেছে। চিরকুটে লিখে গেছে খোঁজার কোনোরকম চেষ্টা না করতে। সুদখোর পরিবারের ছেলেকে বিয়ে করেছে শুনে স্বামী তো রেগে আগুন।

স্বামী বলেছিল, ‘মদখোর ভালো, তবে সুদখোর ভালো না। এ মেয়ে কখনোই সুখী হতে পারবে না।’

আমার গয়না যা ছিল সব নিয়ে গেছে। নগদ কিছু টাকাও নিয়েছে। এই ছেলে-মেয়েদের আমি জন্ম দিয়েছি? আমার মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা। স্বামী বাহিরের মেয়েদের নিয়ে মেতে আছে আর আমি কুয়েতি দুই ভাইয়ের সাথে। সখি বলেছিল, কুয়েতি দুই ভাই-ই নাকি মারা গেছে। এ দুঃখের মাঝেও আমার বলতে ইচ্ছে হলো, ‘হে পুরুষ! মাটি দিয়েছে চাপা—অবশেষে শান্ত হয়েছে তোমার শিশ্নবীর।’ মেয়ের শোকে বাবা বিছানা নিল। অসুখটা খুব গুরুতর মনে হয় নি। বোধহয় বুকে অকল্পনীয় ব্যথা অনুভব করেছে। তা না হলে কেন দুদিনের মধ্যেই আমাদের সবাইকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেল।

কিছুদিন পর হলেও স্বামীর কথার মর্ম আমি বুঝতে পেরেছি। ছেলের নামে বাড়ি লিখে দিয়েছি সত্যি—তবে আমি মারা গেলেই বাড়ির দলিল শফিকের হাতে পৌঁছাবে। বিশ্বস্ত সখির সাথে সেই মোতাবেকই কথা হয়েছে। দলিল সখি এবং তার ছেলেদের হেফাজতে থাকবে। ছেলে আমার কথা মানতে পারল না। রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। কবে আমি মরব আর কবে বাড়ির দখল নিবে—এতটা ধৈর্য সইবে কেন?

এই অস্থির সংসারজীবনের ভেতর দিয়ে বেশ কয়েক বছর অতিক্রান্ত হলো। তখন আমি একাই বসত করছি এ বাড়িতে। কাজের মেয়েটা নাম মাত্র মাঝে মাঝে থাকে। এক সন্ধ্যায় বড় দুই মেয়ে এল বেড়াতে। বহুদিন পরই বলা চলে। বাবার মৃত্যুর সময় এসেছিল। দুদিন যেতে না যেতে আবার চলে যায়। বড় সংসার ফেলে এখানেই-বা আসতে যাবে কেন? শেষবার এসে দুই মেয়েই দুতিনদিন আমার খুব সেবা করল। বাড়িতে ওরাই বাজার করাল। নাতি-নাতনিরা পুরো বাড়িটাকে মাথায় করে রাখল। বহুদিন পর আমি যেন সেই পুরনো আমিতে চলে গেলাম। যখন আমি দুটো ফুটফুটে বাচ্চার মা। তখন কত স্বপ্ন, কত আশা নিয়ে ওদের চেহারামুবারকে তাকিয়ে থাকতাম। স্মৃতি! চোখে পানি চলে এল। অনেক দিন পর বাড়িতে জান্নাতি হাওয়া প্রবেশ করল।

রাতে আমাকে একা পেয়ে দুই মেয়ে কাছে এল। বড় মেয়ে বলল, ‘মা, আমরা তো তোমার পর ছিলাম না। তবে কেন আমাদের এভাবে বঞ্চিত করলা?’

কথাটা আমার বুকে যেয়ে বিঁধল। ‘তোমাদের কিভাবে বঞ্চিত করলাম? আমার আদর-ভালোবাসা তো তোমরাই বেশি পেয়েছ।’

‘আমাদের সংসারের কী বেহাল অবস্থা তা তো তুমি জানোই। বলো তো তুমি আমাদের জন্য কী রেখে যাবে?’

‘আমার মৃত্যুর পর দক্ষিণ পাড়ার বাড়িটা শফিক পাবে। আর বাকি সম্পত্তি তো তোরা তিন বোনই পাবি।’

দ্বিতীয় মেয়ে বলে, ‘মা যে কী বলে না। শোন, তোমার মৃত্যুর পর দক্ষিণ পাড়ার বাড়ি তো শফিক  পাবেই। বাকি সম্পত্তিতেও ও সিংহভাগ পাবে, তুমি আমদের নামে দলিল করে না দিলে।’


আবারও বাড়ি সুনসান। মাঝে মাঝে একা ঘরে বিছানায় নিজের ছায়া দেখে নিজেই কেঁপে উঠি।


বড় মেয়ে বলে, ‘মা, তোমার ছোট মেয়ে তো আমাদের বঞ্চিত করে সব স্বর্ণ নিয়ে গেল। বেশকিছু নগদ টাকাও নিয়েছে। শফিক পেল, কল্পনা পেল। তবে আমরা দুবোন কেন বঞ্চিত হব? তোমার নাতি-নাতনিদের দিকে তাকিয়ে হলেও আমাদের নামে দশ শতাংশ জমি লিখে দাও।’

সত্যিই তো, এ বিষয়টা তো আমার মাথায় খেলে নি। আমার মৃত্যুর পর ছেলে হিশেবে শফিকই তো সিংহভাগ জমি নিয়ে নিবে। এ মেয়েদেরকে কেনই বা বঞ্চিত করব? এ দুটো মেয়ের সাথে আমার কত স্মৃতি মিশে আছে। ওদের জন্য কিছু করে যেতে না পারলে তো মৃত্যুর পরও শান্তি পাব না। দশ শতাংশ নয়, ছয় শতাংশ জমি আমি ওদের নামে লিখে দিলাম। সম্পত্তি বুঝে পেয়ে মেয়েরা দুদিন পরই চলে গেল। আবারও বাড়ি সুনসান। মাঝে মাঝে একা ঘরে বিছানায় নিজের ছায়া দেখে নিজেই কেঁপে উঠি।

আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। সারা শরীরে পানি জমার কারণে ঠিক মতো হাঁটাচলা করতে পারি না। তারওপর ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। হাঁটাচলা এক্ষেত্রে খুবই জরুরি ছিল। হাই প্রেশারের সমস্যাও দীর্ঘদিন যাবৎ। বাজার করার লোক নেই। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার লোক নেই। কাজের মেয়েটা এই আছে তো এই নেই। রান্নাও নিজের হাতে করতে হয়। সখি মাঝে মাঝে ভাত-তরকারি রান্না করে পাঠিয়ে দেয়। এভাবে কি মানুষের জীবন চলে? শেষ সময়ে এই কি ছিল তবে ভবিতব্য? ছেলেকে খবরের পর খবর দিয়েও কোনোভাবেই আনা গেল না। আমার বোনের মেয়ের সাথেই নাকি এখন থাকে। আমি চুক্তি ভঙ্গ করেছি—ও কেন চুক্তিবদ্ধ থাকবে। তালাক হলো কী হলো না এসব ভেবে দেখার সময় কোথায়। আগে দুনিয়া বেঁচে থাকুক, তারপর অন্য চিন্তা। বড় দুই মেয়েও আমাকে দেখতে আসবে না। তাদেরও ক্ষোভের অন্ত নেই। ওদেরকে অসহায় অবস্থায় দেশে রেখে সারাজীবন বিদেশে ফুর্তি করেছি। দশ শতাংশ পাওনা জমির মধ্যেও সম্পূর্ণটা দেই নি। এমন মা থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।

ছোট মেয়ে এসেছিল স্বামীকে নিয়ে। ছোট মেয়েটারও একই অভিযোগ। ওকেই সবচেয়ে বেশি ঠকিয়েছি। এ পরিস্থিতিতে এসে ও এখন একটা চুক্তি করতে চায়। চুক্তি! আমি কিছুটা সময় নির্বাক! মা-মেয়ের মধ্যে আবার কী চুক্তি হতে পারে? জামাই বাজার করে দিবে, ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাবে, অর্থাৎ আমার যাবতীয় সমস্যার ব্যাপারে খোঁজ-খবর রাখবে। এতটা মূল্যবান সময় নষ্ট করবে তার বিনিময়ে ওর তো কিছু পাওয়া উচিত। যেখানে ছেলে করছে না, সেখানে মেয়ে-জামাই করবে। চার শতাংশ জমি লিখে দিতে হবে।

কিছুক্ষণ বিমূঢ়ের মতো বসে ছিলাম। পরবর্তীতে ভাবনায় এল, এরচেয়ে ভালো কিছু আমার মতো পাপিষ্ঠার সন্তানদের থেকে আশা করাও বোকামি। নষ্ট শরীর থেকেই ওরা জন্ম নিয়েছে। ওদের মানসিকতা আর কত উন্নত হবে? সখির সাথে পরামর্শ করে দুদিন পর সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম। দুই শতাংশ জমি ছোট মেয়ের নামে লিখে দিলাম। বাকি রইল দুই শতাংশ জমি আর এই বাড়িটা। ব্যাংকেও কিছু টাকা জমা আছে। এগুলোও হয়তো একদিন শেষ হয়ে যাবে। শেষ সময়ে না খেতে পেয়ে মৃত্যু হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

একাশিতম জন্মদিনে এসে বিছানায় শুয়ে শুয়ে দীর্ঘ এক জীবনের কথা ভেবে যাই প্রতিনিয়ত। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, পূর্ণতা-অপূর্ণতা, রাগ, ঈর্ষা, অভিশাপ, প্রেম-ভালোবাসা এসবের কিছুই আমাকে আর আলোড়িত করে না। আল্লাহর তরেই আমার জীবন সমর্পিত। এখন ঘুরে দাঁড়াবার সময় আর নেই। যাবতীয় হতাশা দূরে ঠেলে নতুন উদ্যমে কাজ করার শক্তিও নেই। আমার শরীরের নোংরা চামড়াতে মসৃণতা নেই। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে জাদু নেই। সন্তান-সন্ততি আমার পাশে নেই। চোখের কোনায় পানি জমল নাকি? আমি একটি ফোঁটা পানিও নিচে পড়তে দিতে চাই না। মনে হচ্ছে, চোখের এক একটি ফোঁটা পানি সমুদ্র হয়ে আমার সন্তানদের গ্রাস করবে—তাদের জীবন তছনছ করে দিবে। যাবতীয় ভুলগুলো, পাপগুলো আমার সঙ্গে আছে। এই পাপমোচনের কোনো উপায়ও আমার জানা নেই। যা কিছু ভালো ছিল তার বাহবা পাবারও সুযোগ নেই—দরকারও নেই।

জীবন সায়াহ্নে এসে মনে হচ্ছে মানুষ মূলত একাই। মানুষের সংগ্রাম একার—মুক্তিও একা যাত্রী হয়ে চলে। এ মুক্তির পথ সহজ সুন্দর হলেই মানুষের জীবন সার্থক হয়। মুক্তির পথ মৃত্যুর থেকে সর্বোত্তম আর কী হতে পারে? মৃত্যুর দুয়ারে এসে প্রার্থনা করতে ইচ্ছে জাগে—আর কারো জীবনে যেন এমনটা না হয়—জন্মদিনে এসে কেউ যেন মৃত্যু উদ্‌যাপনের স্বপ্ন না দেখে।

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৮৪, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ। কবি ও কথাসাহিত্যিক। ঢাকা সিটি কলেজ থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই —
অদৃশ্য আলোর চোখ [গল্পগ্রন্থ, অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি, ২০১৮]

সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘শীতলক্ষ্যা’।

ই-মেইল : joychironton@gmail.com

Latest posts by মহ্‌সীন চৌধুরী জয় (see all)