হোম গদ্য গল্প পাণ্ডুলিপির গল্প : ঈর্ষাগাছ

পাণ্ডুলিপির গল্প : ঈর্ষাগাছ

পাণ্ডুলিপির গল্প : ঈর্ষাগাছ
450
0

গল্পের নাম ও শিল্পী আল নোমানের প্রচ্ছদই বলে দিচ্ছে বইটির অন্তর্গত সার কথা। মলাটবদ্ধ নয়টি (০৯) ছোটগল্পের মধ্যে নামগল্পটি প্রচ্ছদের মধ্যস্থিত ঈর্ষাগাছ এবং বাকি আটটি গল্প তার দুইপাশে প্রার্থনারূপে (শাখা) সংযুক্ত আছে। প্রার্থনাগুলো সবই আদতে জীবনের এক একটি ভিন্ন ভিন্ন রকমের আর্তি বা চাহিদা। তারই তীব্র আখ্যান মোসাব্বির আহে আলীর প্রথম বই (গল্পগ্রন্থ) ঈর্ষাগাছ ও প্রার্থনাসমূহ


তিরন্দাজ সেজে প্রিয় তিরটা একটু পেছনে টেনে নেয় গল্পকার। প্রিয় তির বলছে এ কারণে যে এই তিরটা সে সবসময়ই জীবনের ভোরবেলার দিকে ছুঁড়তে পছন্দ করে। সেই ছেলেবেলায় গ্রামে তার বন্ধুদের নানান অর্থহীন কাজের মধ্যে একটা আনন্দের কাজ ছিল ডেমো ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা। শীতকালে রোজার মাসের আশেপাশে তাদের গ্রামে ওয়াজ মাহফিলের বন্যা বইত। পকেটে করে চারানা-আটানার বুট-বাদাম নিয়ে বসে যেত ঠিক মওলানার চেয়ারের সামনে। যেন একেকজন একাগ্র নিবিষ্ট শ্রোতা। ইম্পরট্যান্ট গ্যাপে ছোট্টগলায় যতটুকু পারা যায় তাকবিরও মারত মওলানার সাথে। পবিত্র ভাবাবেগে কেঁদেও দিত জায়গায় জায়গায়। প্রতিবার ওয়াজ শেষে দু-এক ওয়াক্ত নামাজ পড়ত মসজিদে গিয়ে। ব্যাস, তারপর শেষ। আর হুজুরের ওয়াজরত সৌম্য চেহারায় সাহাবীদের কাল্পনিক অবয়ব ভেসে উঠত। ওয়াজ শুরুর দিকের যে দোয়াটুকু উনারা করতেন সেটা সবার আগে গল্পকারের মুখস্ত ছিল।


গভীর রাতের স্তব্ধতা চিরে যে সুরেলা বয়ান ভেসে আসত কানে সেগুলোই মগজে গেঁথে যেত তাদের।


মূল বাড়ির ঢালুতে ক্ষেতের মতো খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করে নিত। সমানে শুকনো খড় বিছানো হতো। মা-চাচিদের প্রায়-পরিত্যক্ত শাড়ি-টারি ছিল আচ্ছাদন হিশেবে। বাঁশের শক্ত ডাল দিয়ে মাইকস্ট্যান্ড বানিয়ে তাতে শুকনো ধুন্দল লাগিয়ে মাইক্রোফোনের কাজ দিব্যি চালিয়ে নেওয়া যেত। মাথায় টুপি থাকত তাদের, গোল গলার শাদা ছোট পাঞ্জাবি তো মক্তবের জন্য বানানো ছিলই। ব্যাস। অন্যদিকে শ্রোতাদের লিস্টটা মোটামুটি ছোট ছিল না। সবাই এটাকে অনেকটা তাদের প্যারোডি কর্মকাণ্ড হিশেবেই নিত। ভাই বেরাদার, সমবয়সীদের পাশাপাশি যোগ দিত চাচি-দাদিসহ অন্যান্য বড় আপুমনিরা।

গল্পকারের কন্ঠ নাকি সুমিষ্ট ছিল, তার আম্মা আর আপুরা বলত। পক্ষপাত কী না জানি না। এক দাদি তো তার ওয়াজের সদাভক্ত ছিল। তার মতে যুক্তিবাদী-মাধবপুরীদের মতোই নাকি ওয়াজের টান তার সুশ্রাব্য। তখন সরাইলসহ পুরো বি. বাড়িয়ায় যুক্তিবাদী আর আমিনীরা হিট। মাথার আঁচল টেনে এনে দুই ঠোঁটের ভেতর দাঁতে চেপে ছোট্ট প্যান্ডেলে খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকত ঔ দাদি। কী শরমিন্দা ছিল যে তার চাহনী! তাদের ডেমো ওয়াজ মাহফিলের এজেন্ডায় থাকত গতদিনগুলোতে এপাড়া-ওপাড়ায় হওয়া ওয়াজগুলোর জনপ্রিয় ও আলোচিত বয়ানগুলো। গভীর রাতের স্তব্ধতা চিরে যে সুরেলা বয়ান ভেসে আসত কানে সেগুলোই মগজে গেঁথে যেত তাদের। পরের দিন বা তার কিছুদিন পর সেই টপিকগুলো নিয়ে ওয়াজ জমে যেত। শুরু করত আসরের পর থেকে। চলত মাগরিব হয়ে এশা পর্যন্ত। তারপর যেন হঠাৎ করেই রাত গভীর হয়ে যেত। মাগরিবের পরপর রাতের খাবারের জন্য চুপিচুপি ঘরে যেত গল্পকার। খাওয়া চলাকালীন ঐ সময়টায় মন অস্থির হয়ে থাকত। কী জানি কী হচ্ছে তাদের মাহফিলে এই ভেবে।

সমস্যা সব জায়গায়ই থাকে। ওখানেও ছিল। ওর সমবয়সীরাই মূলত ঐ অদ্ভুত আয়োজনের আয়োজক ছিল। আর বয়সে ছোটরা এটা সেটা তাদের ফরমায়েশ মোতাবেক জোগাড় করে বেশ নিবিষ্ট মনে ওয়াজ শুনতে বসে যেত। কিন্তু ভেজাল বাজত ওয়ায়েজিন ও তাদের জন্য বরাদ্দকৃত সময় ও ক্রম নিয়ে। উদ্বোধনী মওলানা হিশেবে কারো তেমন আগ্রহ না থাকলেও সমাপনী বক্তা হিশেবে সবার আগ্রহ ছিল চরমে। ওরা মূলত তিনজন ওয়ায়েজিন পাড়ায় জনপ্রিয় ছিল। আরো দু-একজন ছিল তবে তাদের বাসা মাহফিলের স্থান থেকে দূরে হওয়ায় তেমন পাত্তা পেত না। মন চাইলে এক আধটু ওদের প্রক্সি হিশেবে সুযোগ দিত। ওদের নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা তাদের ছিল না। মূলত এই তিনজনই ছিল মূল প্রতিদ্বন্দ্বী।  ঠান্ডা মাথার গুটিবাজ।

ছহুল, রেহান আর গল্পকার। ছহুল ওয়াজ করতে আসলে মাথায় সবুজ রংয়ের পাগড়ি বেঁধে আসত। পাগড়ি বেঁধে দিত ওরই ছোট মামা। চোখে কাশেমী হুজুরের মতো সুরমাও মাখত সে। যেন পুরোদস্তুর মওলানা। তখন বিখ্যাত সব ওয়ায়েজিনদের নামের শেষে জন্মস্থান, বংশ সম্বলিত বিশেষণধর্মী সুশ্রাব্য টাইটেল থাকত—যেমন : সরাইলের সরাইলী, বেলালপুরের বেলালী, সোহাগপুরের সোহাগপুরী ইত্যাদি। ছহুলেরও ঠিক তেমন একটা নাম ছিল ছহুল হোসাইন কোরাইশি। এই নামটা ও নিয়েছিল মালিহাতা গ্রামে এক মাহফিলে ওয়াজ থেকে। মওলানা সেদিন মক্কার কোরাইশ বংশের শান বয়ান করেছিলেন দীর্ঘ ওয়াজে। বিমুগ্ধতাবশত পরেরদিনই ছহুল এই নামটি ধারণ করে।


তখন ইরাকের সাদ্দাম হোসেন তাদের মতো সব ইসলামপ্রাণ দেশে খুবই আবেগের জায়গায় আছে।


ওদেরই নির্ধারণ করা উপস্থাপক আমির মিয়া যখন একদিন ছহুলের নামের সাথে কোরাইশি নামটি যোগ করে নাম ঘোষণা করে তখন ওরা অবাক হয়ে গিয়েছিল, অনেকে মুখ টিপে হেসেও ছিল। গল্পকারেরও রাগ হয়েছিল—টাইটেল নেয়ায়। কী দামি টাইটেল! এটা ছহুলের থাকবে কেন? আর ও কী এমন বক্তা হলো যে এরকম সত্যি সত্যি মওলানাদের টাইটেল নিয়ে নেবে! ফলে গল্পকার আর রেহান কিছুদিনের জন্য একজোট হয়ে যায়। নিজ স্বার্থবিরোধী হলে জোট বাঁধা জরুরি। তাই ছহুলের এমন নাম ধারণে তলে তলে কষ্টে সে। নিয়মিত শ্রোতারা ছহুলের টাইটেলে চমৎকৃত হয়। মা-চাচি-আপা-আর পোলাপানরা নাম শুনেই বক্তার ভক্ত বনে যায়। আর এদিকে তাদের হিংসালতা লতিয়ে চরমে ওঠে। কিন্তু সমস্যা গাঢ় হয় পরেরদিন যখন রেহানও পল্টি নেয়।

তখন ইরাকের সাদ্দাম হোসেন তাদের মতো সব ইসলামপ্রাণ দেশে খুবই আবেগের জায়গায় আছে। হাটে-গঞ্জে ইরাক-পশ্চিমা যুদ্ধের পোস্টার বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। পোস্টারের উপরের দিকে জেট প্লেন আর তা থেকে মোনাজাতরত সেনা-পোশাকে সাদ্দাম হোসেনের উপর নিক্ষিপ্ত হচ্ছে বোমারাশি। আহ্ কী আবেগ। আবেগ তখন পথে ঘাটে মসজিদ মাদ্রাসায় ফেটেফুটে পড়ছে সবখানে। এরকম অস্থির সময়ে রেহান ছহুলের মতোই নতুন টাইটেল ধারণ করে। সময়োপযোগী টাইটেল। রেহানুর রহমান ইরাকি।

গল্পকার তো থ। আরে কয় কী! রেহানও পল্টি নিল! ওকে একবারও কইল না! ওইদিন ওর সমাপনী বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু উপস্থাপক কেন জানি কে বা কার আঙুলিহেলনে রেহানের নাম ঘোষণা করে দিল। গল্পকার অবাক, ছহুলও অবাক! ছহুল ভাবছে ওর দেখাদেখি এ কাণ্ড করেছে রেহান। আর গল্পকার ভেবেছে সে-ই কেবল টাইটেলবিহীন রয়ে গেল! কী হলো এটা? কিছুই বুঝল না বললও না। ভেতরে ভেতরে সহ্য করে গেল। কারণ শ্রোতাদের মধ্যে ওর নিজেদের আত্মীয়-স্বজন ও ছোটরা ছিল। শুধু শুধু শ্রোতা নষ্ট করে লাভ তো নাই। তাই অবধারিতভাবে গতকালের বিরোধী পার্টির সাথে এবার এলায়েন্স করল গল্পকার। গতকালের শত্রু আজ স্বার্থের নিমিত্তে বন্ধু। ওরা মিলে গেল। এদিকে গল্পকারের চেয়ে রেহানকে ছহুলের বেশি হিংসা। কারণ ইরাকি টাইটেলটা জমে গেছে। সব শ্রোতারা মজায় আছে।

টাইটেল পেয়ে রেহানের ওয়াজের কারিশমাও বেড়ে গেছে। কারণ কোরাইশি থেকে ইরাকি টাইটেলটা বেশি সাম্প্রতিক ছিল তখন। গল্পকার মহা টেনশনে। ছহুল একটু একটু রেহানের দিকে আর একটু একটু ওর পক্ষে। টের পেল রেহানের জনপ্রিয়তা ছহুলকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে। গল্পকার বুঝতে পারছিল। তাই শ্রোতাদের কাছে একটু একটু জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিল। সবাই বলাবলি করছিল যেন সেও জব্বর একটা টাইটেল নেয়। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিল না অথবা চাচ্ছিলই না। সে বরং চেষ্টা করছিল যেন বয়ানে ভিন্নতা আনতে পারে। প্রতিদিনকার হাইলাইট ওয়াজ আর ভালো লাগছিল না। তার মনে হলো টাইটেলে বেশি দিন শ্রোতারা আটকে থাকবে না। আটকাতে পারে কেবল বয়ান বৈচিত্র্যে ও উপস্থাপন ভঙ্গিতে। যেই ভাবা সেই কাজ। বাসায় সকাল বিকাল ভাবতে থাকে। কী করা যায়? কী করা যায়? মাথায় কিছু আসে না।


আল্লাহ-রসুল-নবী সম্পর্কিত যেকোনো কিছুকে মা দাদিরা তখন কিতাবই বলত।


তখন মাথায় একটা প্লান আসে গল্পকারের। তখন ঘরে ছিল কিতাব—বিষাদ সিন্ধু। তার আম্মার অনুরোধে তার আব্বা ঢাকা থেকে এনেছিলেন। সে কিতাব বলেই জানত ঐ ঢাউস বইটাকে। হাদিসের বইকেও ওরা কেতাব বলত, তাই আল্লাহ-রসুল-নবী সম্পর্কিত যেকোনো কিছুকে মা দাদিরা তখন কিতাবই বলত। সে পড়া শুরু করে। সারা দিনরাত পড়ে মহররম পর্বে আসে। আহ্ এসেই তো চোখে জল। তখন তার বয়স দশ-বারো হবে হয়তো। রাগ-আবেগ-মায়া-হিংসা সবই জোয়ারের পানির মতো নতুন আর ভয়ংকর পরিমাণে মনের মধ্যে মজুদ করা। যাই হোক—হাহাকার, ক্রোধ আর সৃজনীশক্তি নিয়ে সে ওইদিন বয়ান করতে নামল।

রমজান মাস কেবল ঢুকেছিল সেদিন। গল্পকারকে প্রথমে বয়ান করতে বলা হলো। সে বয়ান শুরু করে। মীর মোশাররফ হোসেনের বয়ান সে আউড়াতে লাগে। হুবহু তো নয়ই সাথে তার মতো করে তৈরি করা আবেগ নিয়ে সে ওইদিন শ্রোতাদের কানে ঝাপিয়ে পড়ে। বয়ান এগোয়। যেন ফোরাত নদী তাদের বাড়ির ছোট্ট ভাটির ক্ষেতটাতে এসে ভাসতে থাকে। তার বয়ান শ্রোতামণ্ডলীর সবাইকে রাতের দিকে নিয়ে যায়। সে টাইটেল ছাড়াই মাহফিলকে এশার তারাবিহ্ সময়ের দিকে নিতে থাকে। ফলে সেদিন আর বিশেষ বা সমাপনী বক্তার কোনো সুযোগ বা সময় অবশিষ্ট থাকে না। ছহুল হুসাইন কোরাইশি আর রেহানুর রহমান ইরাকিরা হয়তো আবার স্বাভাবিকভাবেই গল্পকারের বিরুদ্ধে নতুন এলায়েন্স করেছিল সেদিন। যেমনটা গল্পকার নিজে আর রেহান করেছিল একদিন। আর ভাবছিল তাদেরই ক্রমাগত বয়ানকৃত নীতিকথাগুলো বুঝি ক্রমশ বানোয়াট ও তাদের আবেগের মারাত্মক অধীন হয়ে থাকছে সবসময় যেখানে সবার নিজেকে জাহিরই শেষ কথা।

ওই রাতের পরেরদিন সকাল। কিন্তু কী অবাক কাণ্ড হলো! সেবারের মাসখানেক ধরে হয়ে আসা পিচ্চি ছেলেগুলোর ওই ডেমো ছোট্ট মাহ্ফিলের ঘরটি গ্রামবাসী দুমড়ানো মোচড়ানো অবস্থায় আবিষ্কার করে।

মোসাব্বির আহে আলী

জন্ম ০৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮৬; পূরবীপ্রাঙ্গন, বারিধারা, ঢাকা।

শিক্ষা : বস্ত্র প্রকৌশলে স্নাতক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : বস্ত্র প্রকৌশলী।

সম্পাদনা :
ছোটকাগজ 'নীলঘুড়ি'।

ই-মেইল : sabbir.lit052@gmail.com

Latest posts by মোসাব্বির আহে আলী (see all)