হোম গদ্য গল্প পাকিস্তান

পাকিস্তান

পাকিস্তান
1.81K
0

করাচি ১৯৮৭

আয়েরোফ্লতের যে উড়োজাহাজ আমাদের নিয়ে মস্কো যাচ্ছিল, সেটা প্রথমে নামল দিল্লি বিমানবন্দরে। আমরা উড়োজাহাজ থেকে বেরিয়ে এলাম, ট্রানজিট লাউঞ্জে ঘুরে বেড়িয়ে, চা-কফি খেয়ে কাটিয়ে দিলাম এক ঘণ্টা। তারপর উড়াল দিয়ে ঘণ্টাখানেক পর আবার সেটা নামল করাচি বিমানবন্দরে। কিন্তু এবার আর আমাদের নামার অনুমতি নেই। উড়োজাহাজ কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করল : যাত্রীদের নিজ নিজ আসনেই বসে থাকতে হবে। উড়োজাহাজের প্রয়োজনীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সারার পর আবার উড্ডয়ন হবে এক ঘণ্টা পর।

আমার আসন জানালার কাছে। বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, আমাদের বিমানটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন সৈন্য। তাদের হাতে কারবাইন, তারা অস্ত্রগুলো তাক করে আছে আমাদের দিকে।

নিজের অজান্তেই বিড় বিড় করে বললাম : হানাদারের বাচ্চারা!

তখনও আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্যদের ‘আগ্রাসন’ শেষ হয় নি। সুতরাং আয়েরোফ্লতের উড়োজাহাজের দিকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে প্রস্তুত থাকাই পাকিস্তানিদের পক্ষে স্বাভাবিক। পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেক তো ঠুকেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। আর সোভিয়েত বিমানটা এসেছিল ঢাকা থেকে, প্রধানত বাঙালিদের নিয়ে।

১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ছয় বছর। তখন আমি ছিলাম আমার দাদার গ্রামে। মহকুমা ও থানা সদর থেকে অনেক দূরের গ্রামটাতে যাওয়া-আসার তেমন রাস্তাঘাট ছিল না। পাকিস্তানি সৈন্যরা সে গ্রামে যেতে পারে নি, কিংবা কোনো কারণে যায় নি; তাই আমি নিজের চোখে ওদের চেহারা কখনো দেখি নি।

১৯৮৭ সালের ১৭ আগস্ট ২১ বছর বয়সে করাচি বিমানবন্দরে প্রথম দেখে নিজের অজান্তেই আমার মুখে গালি চলে এল। তারপর আমাদের সহযাত্রী বগুড়ার এক ছেলে টয়লেট থেকে বেরিয়ে টিসু পেপার দিয়ে হাত মুছতে মুছতে হাসিমুখে যখন বলল, ‘শালা পাঞ্জাবিগের মাথাত হাগ্যা দিয়া আসলাম।’ তখন আমার মনে হচ্ছিল, আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত ওদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের জন্য কিছু না কিছু করা।


মস্কো ১৯৯০

গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের আট নম্বর হোস্টেলে আমার রুমের দরজায় টোকা পড়ল। আমি দরজা খুললাম। একটা ছেলে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে, ওর ডান পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ওর কোমরের সমান উঁচু এক সুটকেস। হ্যান্ডশেক করার জন্য আমার দিকে ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে সে বলল, ‘ইমতিয়াজ, ফ্রম পাকিস্তান, ইয়োর নিউ রুমমেট।’

আমি ওর দিকে হাত বাড়ালাম না। বলা নেই কওয়া নেই, এক পাকিস্তানি এসে জুটবে আমার রুমমেট হয়ে, আর আমি তাকে আদর করে বুকে টেনে নেব? প্রশ্নই ওঠে না।

নিছক ভদ্রতার খাতিরে দরজার পাল্লাটা খুলে ধরে তাকে ঘরে ঢোকার পথ করে দিলাম।

কিন্তু ছেলেটা আগেই হকচকিয়ে গেছে, সে আর কিছুই বলল না। ঘরে ঢুকেই সুটকেসটাকে মেঝেতে চিত করে শুইয়ে দিয়ে ডালা খুলে কাপড়-চোপড় বের করে নিজের সংসার গোছানোর কাজে লেগে পড়ল।

এতদিন এই ঘরে আমার সঙ্গে যে কম্বোডীয় ছেলেটা থাকত, সে কিছুদিন আগে তার এক স্বদেশি মেয়েকে বিয়ে করেছে। তারপর রুম পেয়েছে ফ্যামিলি হোস্টেলে। সপ্তাহ খানেক আগে চলে গেছে সেখানে। আমার খুব আফসোস, সে চলে যাওয়ার পর থেকে আমি কম্বোডীয় মশলাপাতি দিয়ে রাঁধা খাবার খেতে পারছি না, বিশেষভাবে বঞ্চিত হচ্ছি সে সব খাবারের সুবাস থেকে। এই আফসোসের মধ্যে পাকিস্তানি একটা ছেলেকে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হলো। এ অন্যায় কি মুখ বুজে মেনে নেওয়া যায়?

সিনিয়র টিচারের কাছে ছুটে গেলাম। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের দেখভাল করেন। আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম : ‘আলেকসান্দর পেত্রোভিচ, আমি এখন থার্ড ইয়ারের ছাত্র, প্রস্তুতি অনুষদের বালক নই। কোন দেশের কী ধরনের ছেলেকে আমার রুমমেট করা হবে সে বিষয়ে আমাকে আগেই জানানো উচিত ছিল।’

ভদ্রলোক দেখতে কেজিবির জেনারেলদের মতো : ঠান্ডা পাথুরে ভাবলেশহীন চেহারা। মুখ দেখে মনের ভাব কিছুই বোঝা যায় না। ভয়ানক গোঁয়ার, একবার যা বলবেন তা-ই চূড়ান্ত। ‘না’ বললে শত অনুরোধেও আর ‘হ্যাঁ’ করানো যাবে না।

তিনি আমার কথাগুলো চুপচাপ শুনলেন, আমি থামার পরেও চুপ করে রইলেন। তার চোখেমুখে কোনো ভাবই ফুটল না।

আমি আবার বললাম, ‘আলেকসান্দর পেত্রোভিচ, পাকিস্তানি রুমমেটের সঙ্গে আমি থাকতে পারব না।’

‘কেন?’ তার কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল; মনে হলো আমি যেন আপত্তি জানাতে এসেই অপরাধ করেছি। কিন্তু সে জন্য আমার ভয় লাগল না। জোর দিয়েই বললাম, ‘সম্ভব না। ওকে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দিন।’

‘আপনার আপত্তিটা কিসে?’

‘পাকিস্তানে। আলেকসান্দর পেত্রোভিচ, আমার আপত্তি পাকিস্তানে। আপনি তো বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস জানেন; আপনার অবশ্যই বোঝা উচিত কোনো পাকিস্তানি ছেলের সঙ্গে এক ঘরে বাস করা আমার পক্ষে অসম্ভব।’

তার চোখমুখ আগের মতোই ভাবলেশহীন।

আমি জানি, তিনি ওরিয়েন্টাল হিস্টরির শিক্ষক; দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস তার বেশ ভালোভাবে জানা। পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, সেই যুদ্ধে আমাদের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা, মার্কিনিদের সপ্তম নৌবহরের বিরুদ্ধে সোভিয়েত নৌবহরের যাত্রা—এগুলো এদেশে শুধু যে একাডেমিয়ার লোকজনই জানে তা নয়, অনেক সাধারণ মানুষও জানে। রাস্তায়-পার্কে এমন অনেক বুড়োবুড়ির দেখা আমি পেয়েছি, যারা শেখ মুজিবুর রহমানের নাম জানেন, যুদ্ধের পর চট্টগ্রাম বন্দরকে মাইনমুক্ত করতে গিয়ে কয়েকজন সোভিয়েত সৈন্য যে মারা গিয়েছিল, সেসব কথাও তারা ভোলেন নি।

‘ওকে অন্য রুমে পাঠাতে হবে।’ আমি বললাম।

‘একই কথা বার বার বলার প্রয়োজন নেই। আপনার আপত্তির কারণটা ব্যাখ্যা করুন।’ তিনি যন্ত্রের মতো বললেন।

‘আমার আপত্তির কারণ.., আমার আপত্তির কারণ হলো, ওরা বিনা অপরাধে আমাদের তিরিশ লাখ মানুষকে মেরে ফেলেছে। নিরীহ সাধারণ মানুষ। নারী, শিশু। ওরা রেপ করেছে অনেক। আলেকসান্দর পেত্রোভিচ, পাকিস্তানের কোনো ছেলেকে দেখলে আমার রাগ লাগে, রিপালশান হয়, ইয়া নি মাগু।’

আমি থামলাম, মনে হলো আমার কথাগুলো বক্তৃতার মতো শোনাচ্ছে। আরও মনে হলো, আমার এমন আবেগ দেখে তিনি হয়তো মনে মনে হাসছেন। কিংবা হয়তো ভাবছেন, এবার আমাকে একটা ধমক দিয়ে বলবেন, এই রকমের অন্ধ জাতিবিদ্বেষ নিয়ে মস্কোর গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা আমার উচিত হয় নি। কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে সারা পৃথিবীর সমস্ত জাতির মধ্যে সম্প্রীতি-সৌহার্দ্য গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। এখানে পড়তে আসে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা মিলিয়ে মোট ১১০টা দেশের ছেলেমেয়ে।

কিন্তু আমি দেখতে পেলাম, আলেকসান্দর পেত্রোভিচের পাথুরে নির্বিকার ফ্যাকাশে ফর্সা মুখমণ্ডলে লালচে আভা, ঘন নীল নির্লিপ্ত চোখের কোণে একটুখানি হাসির আভাস।

শান্ত ও দৃঢ় স্বরে বললেন, ‘ওকে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দেবো।’


স্নায়ুযুদ্ধ

সন্ধ্যার পর ঘরে ফিরে দেখতে পেলাম, ইমতিয়াজ রান্নার আয়োজন করছে। খাওয়ার সময় আমি যে ফোল্ডিং টেবিলটা ব্যবহার করি এবং খাওয়া শেষ হলে আলমারির পাশের দেয়ালে গুটিয়ে রাখি, ইমতিয়াজ আমার সেই টেবিলটা পেতে বসেছে। ফ্রিজের মাথায় রাখা আমার প্লাস্টিকের চপিং বোর্ডটা টেবিলে পেতে আমার ছুরি দিয়ে টুকরো টুকরো করে মাংস কাটছে। চপিং বোর্ডের পাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়েছে টেবিলে। পেঁয়াজ ছুলেছে, খোসাগুলি ছড়িয়ে আছে টেবিলজুড়ে।

মেজাজটা একদম খিঁচড়ে গেল। কিন্তু আমার জিনিসপত্রগুলো ও ব্যবহার করছে বলে রাগারাগি করব, বাঙালি এমন ছোটলোকের জাত নয়। বললাম, ‘রুমের মধ্যে এসব কাটাকাটি কেন? আমরা তো কিচেনে গিয়ে এসব করি।’

‘স্যরি ইয়ার,’ ইমতিয়াজ মুখে হাসি ফোটাল। ‘স্যরি’ বলার সময় এরকম করে হাসতে পারে শুধু নির্লজ্জ লোকেরাই। বলল, ‘কিচেনে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে এত ভিড়, কোনো টেবিলে একটু জায়গা পেলাম না। তুমি চিন্তা করো না। কিচ্ছু নোংরা হবে না। আমি সব সাফ-সুতর করে ফেলব।’

কৈফিয়ত লম্বা, কিন্তু মিথ্যা নয়। এই সময়টাতে রান্নাঘরে চুলো আর টেবিল দখলের জন্য সত্যিই হুড়োহুড়ি লেগে যায়।


আমার হাতে রুটিকাটা ছুরি, তাকে খুন করে আমি তিরিশ লাখ শহিদের হত্যার বদলা নিতে উদ্যত।


আর কিছু না বলে চুপচাপ নিজের পড়ার টেবিলটা গোছাতে লাগলাম। ইমতিয়াজ মাংস কাটা শেষ করে আমার টয়লেট পেপারের রোল থেকে বেশ খানিকটা নিয়ে হাত মুছল। আবার ভীষণ রাগ হলো। বাজারে টয়লেট পেপারের ভীষণ আকাল। একটা রোলের জন্য কত দোকান ঘুরে মরতে হয়, আর সে হাত মুছছে টয়লেট পেপার দিয়ে! আর নিয়েছে কতগুলো! অন্তত তিন বার টয়লেট সারার কাজ হয়!

হাত মুছে ইমতিয়াজ সিগারেট ধরাল। আমি ধমক দিয়ে উঠলাম, ‘এই! রুমের মধ্যে সিগারেট ধরালে কেন?’

সে হকচকিয়ে তাকাল, ‘স্যরি স্যরি! কিন্তু তুমি সিগারেট খাও না?’

‘খাই, কিন্তু রুমের ভিতরে না। তুমি সিগারেট নিভাও।’

ইমতিয়াজ আস্ত সিগারেটটা দুমড়ে-মুচড়ে নিভিয়ে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিয়ে অপরাধীর মতো হেসে বলল, ‘স্যরি ইয়ার। আর কক্ষনো হবে না।’

আমি কিছু বললাম না। আসলে মিথ্যা বলেছি ওকে; আমি রুমের ভিতরেই সিগারেট খাই। ফ্রিজের মাথায় পোড়া সিগারেটের ফিল্টারে ভর্তি একটা ক্রিস্টালের ছাইদানি এখনও আছে, ইমতিয়াজ দেখতে পায় নি।

রান্নার জিনিসপত্র নিয়ে করিডরের শেষ মাথায় বারোয়ারি রান্নাঘরে যাওয়ার জন্য ইমতিয়াজ ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি ফ্রিজের মাথা থেকে ছাইদানিটা নামিয়ে ময়লার ঝুড়িতে পোড়া ফিল্টারগুলো ফেললাম। তারপর খবরের কাগজ দিয়ে ছাইদানিটা মুছে পরিষ্কার করে আবার রেখে দিলাম আগের জায়গায়। ইমতিয়াজ যদি এখন ছাইদানিটা দেখে, বুঝতে পারবে না যে ওটা ঘরের ভিতরেই ব্যবহার করা হয়। আমি ওকে মিথ্যা বলেছি এটা ও কখনোই ধরতে পারবে না। ওকে তো শিগগিরই অন্য ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। হয়তো কাল দুপুরের মধ্যেই ওকে ওর নতুন রুম নাম্বার জানানো হবে। সে পর্যন্ত আমি রুমের ভিতরে সিগারেট খাব না, করিডরে গিয়ে খেয়ে আসব। ও কোনোদিনও বুঝতে পারবে না আমি ওকে মিথ্যা বলেছি।

কিন্তু ওর সঙ্গে আর খারাপ ব্যবহার করার দরকার নেই। যা করা দরকার ছিল তা ইতিমধ্যে করা হয়েছে। আমি যে ওকে একটুও পছন্দ করি নি তা ওকে বেশ ভালোভাবেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নীরবে বইয়ের র‌্যাক গোছাতে লাগলাম।

ইমতিয়াজের রান্না শেষ হলো। পেঁয়াজ, কাপসিকাম আর টম্যাটো সস দিয়ে গরুর মাংস রেঁধেছে। দেখলাম, সে ফ্রাইপ্যান থেকে মাংস বেড়ে নিল দুটো প্লেটে। তারপর টেবিলে খবরের কাগজ বিছিয়ে তার ওপর পাউরুটি কাটতে আরম্ভ করল। রুটি কাটতে কাটতে আমার উদ্দেশে বলল, ‘খানা খা লিয়া?’

আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। বিড়বিড় করে বললাম, ‘ফাক ইয়োর উর্দু!’

মনে হয় শুনতে পেল না, কিন্তু ভালো কিছু যে বলি নি তা বোধহয় বুঝতে পারল। আমার নাম ধরে এমন সুরে ডাকল, যেন আমি ওর কত আপন। রুশ ভাষায় বলল আমি যদি ইতিমধ্যে রাতের খাবার খেয়েও থাকি, তবু তার সঙ্গে এখন আমাকে খেতে হবে, কারণ সে কখনো একা খায় না, খেতে পারে না।

শুনে আমার পিত্তি জ্বলে গেল। মনে মনে বললাম, ঢঙ করার আর জায়গা পাও নি! একা খেতে পার না মানে কী? দেশে থাকতে কি খেতে বসার সময় রাস্তা থেকে লোক ধরে নিয়ে আসতে?

রুটি কাটা শেষ করে সে আমার মুখের দিকে হাসিমুখে তাকাল। চোখে নিমন্ত্রণ, ‘কই, এসো!’

‘আমি রাতের খাবার খেয়ে নিয়েছি।’

‘তাতে কী হয়েছে? এসো!’

সাফ জানিয়ে দিলাম আমি খাব না। সে মুখের সামনে খাবার নিয়ে বসে রইল। একটু পর বলল, ‘তুমি যদি একটুখানি অংশ না নাও, আমি তো খেতে পারব না।’ তারপর একটু হাসল। তারপর যা বলল তা এইরকম : আমার পেটে ক্ষুধা না থাক, আমি যেন তার ক্ষুধা-নিবৃত্তির স্বার্থেই একটুখানি অংশগ্রহণ করি।

তার এসব মোলায়েম কথাকে আমার মনে হলো অসহ্য হেঁয়ালি, জঘন্য অভিনয়।

বললাম, ‘আই হেইট পাকিস্তান! আই হেইট অল অফ ইউ, পাকিস্তানিজ!’

হো হো করে হেসে উঠল ইমতিয়াজ, এবং হাত নেড়ে আবার খেতে ডাকল : ‘এসো, আগে খেয়ে নিই, তারপর তোমার সব কথা শুনব। তোমরা বাংলাদেশিরা যে আমাদের ঘৃণা কর তা আমরা খুব জানি। কিন্তু কী আর করা যাবে। যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এখন আর সেসব নিয়ে মন খারাপ করে কী লাভ?’

আমি আর ওকে ভ্রুক্ষেপ করলাম না। খবরের কাগজ টেনে নিয়ে পাতা ওল্টাতে লাগলাম।

একটু পরে ও বলল, ‘তুমি যদি আমার সঙ্গে একটুখানি না খাও, তাহলে সারাটা রাত আমাকে অনাহারেই কাটাতে হবে।’

এবার একটু ধন্দে পড়লাম : এমন জেদ করছে কেন সে? আসলেই কি সে রুমমেটদের সঙ্গে না নিয়ে খায় না? আসলেই কি সে একা খেতে পারে না? নাকি শুধু আমার সঙ্গেই এমন অভিনয় করছে? আমি বাংলাদেশি বলে? এটা কি আরেক ধরনের লড়াই, যে লড়াইয়ে সে আমাকে পরাস্ত করে এই সান্ত্বনা নিয়ে ঘুমাতে চায় যে একজন পাকিস্তানির পক্ষে বাঙালির সব দর্প চূর্ণ করে তাকে বশ মানানো, বোকা বানানো একেবারেই সোজা ব্যাপার?

না। আমি ওর কাছে কিছুতেই হার মানব না। কোনো পাকিস্তানির অন্ন আমি গ্রহণ করব না।

‘কমরেড!’ ইমতিয়াজ ডাকল আমাকে। ইয়ার ছেড়ে এবার কমরেড। গমগমে ভরাট ওর কণ্ঠ, কর্কশ নয়, অতি মোলায়েম।

আমি তাকালাম সরাসরি ওর চোখের দিকে। ওর চোখের কোণে হাসি।

‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ চিরশত্রু দুই দেশ। আমি জানি, পাকিস্তানের নাম শোনামাত্র বাংলাদেশের যে কোনো মানুষের মাথায় রক্ত চড়ে যায়। ঠিক আছে। ইতিহাসের এটাই বিচার। কিন্তু এহেন দুই শত্রুদেশের ছেলে হয়েও যে আমরা একই ভার্সিটিতে পড়তে এলাম, একই ঘরের বাসিন্দা হলাম, এর কি একটা আলাদা মানে নেই?’

‘কী বলতে চাও তুমি?’

‘উই আর অন দ্য সেইম বোট, ব্রাদার!’ হাসতে হাসতে বলল সে, যেন ইয়ার্কি মারছে।

মনে মনে বললাম, তোমার এই নাটকে তোমার সঙ্গে অভিনয়ে যোগ দিচ্ছি না আমি। কিন্তু মুখে কিছুই না বললাম না। ঘর থেকে বেরিয়ে পেছন থেকে বেশ জোরে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিলাম।

দরজা বন্ধ হওয়ার প্রচণ্ড শব্দে আমার আনন্দ হলো। স্বস্তি বোধ হলো এই ভেবে যে, পাকিস্তানিটাকে এতক্ষণে ঠিকমতো আঘাত করা গেল। আমার দুর্ব্যবহারে আহত হয়ে সে নিশ্চয়ই অবাক চোখে চেয়ে আছে বন্ধ দরজার দিকে।

আবার পরের মুহূর্তেই মনে হলো, মোটেও আহত হয় নি, বরং এতক্ষণে ওর আসল পাকিস্তানি চেহারাটা বেরিয়ে পড়েছে। আমাকে বশ করতে পারে নি বলে এখন গালাগাল দিচ্ছে ‘হারামি বাঙালি কা বাচ্চা’ বলে।

কর, গালাগাল কর। তোর সঙ্গে আমি তো শত্রুতাই চাই, বন্ধুত্ব নয়। গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়তে এসেছে, তাদের সবার সঙ্গে আমার মৈত্রী। শুধু পাকিস্তানিদের সঙ্গে নয়।


কমরেড 

বিড়বিড় করে ইমতিয়াজের উদ্দেশে গাল পাড়তে পাড়তে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে বেশ সুন্দর; হোস্টেলের সামনের চত্বরে গাছগুলো বাতাসে দুলছে। বাতাস শীতল, কিন্তু তাতে গ্রীষ্মের আমেজ অটুট। আকাশে অনেক তারা। মনে হলো হোস্টেলের পেছনে বার্চবনটার ভিতরে চলে যাই। কিন্তু দেখা হয়ে গেল এক স্বদেশির সঙ্গে। সে আমার বগলের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে পাকড়াও করে নিয়ে চলল পাশের হোস্টেলে : ‘হাই ভাইয়ের রুমে চলো। আসর বসেছে।’

বার্চবনে ঢোকার প্রশ্নই আর রইল না। গ্রীষ্মের ছুটিতে বাঙালিদের আড্ডা মানে বিরামহীন গল্পগুজব, গান, রান্নাবান্না, গলা পর্যন্ত পান-ভোজন। মাঝে মাঝে বিরক্তি চলে আসে। কিন্তু নিস্তার মেলে না। আমরা, বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা এখানে এমন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছি যেন যূথবদ্ধ একটা গোত্র।

মেডিসিনের ছাত্রদের হোস্টেলে হাই ভাইয়ের রুমে পৌঁছে দেখি আট-দশ জন বাংলাদেশি ছেলেমেয়ে জুটেছে। চলছে ব্যাপক রান্নাবান্না : আর্জেন্টিনার গরু, হাঙ্গেরির দশাসই মুরগি, কুবান হৃদের কুমির-সমান কার্প মাছ, ভিয়েতনামি সুচিকন সুগন্ধী চাল। কী ব্যাপার? কী উপলক্ষে এই মহাভোজের আয়োজন? কোনো উপলক্ষ নেই। এমনি, হাই ভাইয়ের সাধ হয়েছে সবাইকে আজ ভূরিভোজ করাবেন।

ঢাউস একেকটা পাত্রে রান্না চলছে, আর চলছে গ্লাসে গ্লাসে ভোদকা ও কনিয়াক পান। কার্পেটের ওপর বসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছে একজন : আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে..। হাতে তালি বাজিয়ে তার সঙ্গে সুরে-বেসুরে গলা মেলাচ্ছে অন্যরা। নাচার চেষ্টা করছে একজন, কিন্তু সে ইতিমধ্যে মাতাল, নাচতে পারছে না, কেবলই ঢলে ঢলে পড়ে যাচ্ছে।

রান্না শেষে ভূরিভোজ হলো; তারপরও মদ্যপান চলতে থাকল। বিরামহীনভাবে চলবে ভোররাত পর্যন্ত। আমি মাতাল হয়ে বক্তৃতা শুরু করলাম : ‘প্রিয় কমরেডস, আজ আমার রুমে এক হানাদারের বাচ্চা এসে উঠেছে। সে নাকি আজ থেকে আমার রুমমেট। কিন্তু আমি তাকে গ্রহণ করি নি, করতে পারি না। আমি সিনিয়র টিচারের কাছে গিয়ে বলেছি, পাকিস্তানি হানাদারের বাচ্চার সঙ্গে এক ঘরে বসবাস করা আমার পক্ষে অসম্ভব। কেন অসম্ভব আপনি তা বেশ ভালোভাবেই জানেন, যদি আপনি একজন সোভিয়েত সন্তান হয়ে থাকেন। সিনিয়র টিচার আমাকে বললেন, পাকিস্তানিটাকে অন্য ঘরে সরিয়ে নিয়ে যাবেন। আমি ভালো মনে তার কথা বিশ্বাস করেছি। কিন্তু তিনি যদি কথা না রাখেন, আমি যদি ঘরে ফিরে গিয়ে দেখি যে সে এখনো আমার ঘরেই আছে, তাহলে তাকে খুন করে তিরিশ লাখ শহিদের রক্তের বদলা নিয়ে ছাড়ব, দরকার হলে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেবো সাইবেরিয়ার শ্রমশিবিরে..!’

কিন্তু কিসের ঘরে ফেরা, কখন কার্পেটের ওপরেই ঘুমিয়ে পড়েছি টেরও পাই নি। আমার সঙ্গে মেঝেতে কার্পেটের ওপর গাদাগাদি করে আরও তিন-চার জন। যারা খাটে ঘুমাচ্ছিল তাদের কেউ একজন গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে প্রস্রাব করে দিয়েছে আমাদের গায়ে-মাথায়। সকালে ঘুম ভাঙল অ্যামোনিয়ার ঝাঁঝালো দুর্গন্ধে। এক দৌড়ে নিজের হোস্টেলে ফিরে রুমে ঢুকে দেখতে পেলাম ইমতিয়াজ ঘুমাচ্ছে। ঘরের মাঝখানে আমার ফোল্ডিং টেবিলটা তেমনি পাতা রয়েছে। তার ওপর একটা প্লেটে ফালি ফালি করে কাটা পাউরুটি আর দুটি প্লেটে কাপসিকাম দিয়ে রাঁধা গরুর মাংস রয়েছে আগের মতোই।

মানে কী? তবে কি ইমতিয়াজ গত রাতে সত্যিই খায় নি? আমার জন্য অপেক্ষা করে করে অবশেষে ঘুমিয়ে পড়েছে খালি পেটেই? খাবারগুলো ফ্রিজে ঢুকিয়ে না রেখে টেবিলে ওইভাবে, মানে, যেমন ছিল তেমনি রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে? কেন? এ আবার কেমন নাটক? কত্ত বড় অভিনেতা এই শালা হানাদারের বাচ্চা?

ওর খাটের দিকে চেয়ে দেখলাম, দেয়ালের দিকে মুখ করে ঘুমাচ্ছে। আমি ওর পিঠ দেখতে পাচ্ছি। নিশ্বাসের তালে তালে ওর ষাঁড়ের মতো গর্দানটা সামান্য ওঠানামা করছে।

সকাল নটা। গ্রীষ্মের ছুটি চলছে, ক্লাসে যাওয়ার বালাই নেই। কোনো বাধা নেই বেলা বারোটা পর্যন্ত ঘুমানোয়। প্রস্রাবের দুর্গন্ধে ঘুম ভেঙে না গেলে এখনও হাই ভাইয়ের ঘরের মেঝেতেই ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাতাম। ঘুমটা ভেঙে যাওয়ায় বড় সমস্যা হলো, পেটটা ক্ষুধায় জ্বলে যাচ্ছে। টেবিলে ইমতিয়াজের খাবারগুলোর দিকে নির্লজ্জের মতো চেয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। ক্ষুধার্ত মানুষের লজ্জাশরম, নৈতিকতার বালাই থাকে না; সে চুরি করে খায়, ডাকাতি করতেও তার বাধে না। ইমতিয়াজ নিশ্চয়ই ধরে নিয়েছে গভীর রাতে আমি ঘরে ফিরব রাজ্যের ক্ষুধা পেটে নিয়ে, তাই সে টেবিলে আমার জন্য ফাঁদ পেতে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার আগে নিজে নিশ্চয়ই পেট পুরে খেয়েছে, শুধু নাটক করার জন্য তার শূন্য প্লেটটাতে আরেকটু মাংস তুলে নিয়ে দুটো প্লেট পাশাপাশি রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।

কিন্তু অত সোজা নয়। ক্ষুধায় মরে গেলেও আমি কোনো পাকিস্তানি হানাদারের বাচ্চার খাবার স্পর্শ করব না।

সাবান, শ্যাম্পু, তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে গেলাম অ্যামোনিয়ার দুর্গন্ধের একটা বিহিত করতে। উষ্ণ পানির ধারার নিচে দাঁড়িয়ে গোসল করলাম অনেকক্ষণ ধরে। মাথায় শ্যাম্পু করলাম বার বার; কিন্তু মনে হলো প্রস্রাবের দুর্গন্ধটা কোনোভাবেই দূর হচ্ছে না। সারা শরীরে সাবান ঘষি, সাবানের ফেনায় ফেনাময় হয়ে উঠি; কিন্তু পরিচ্ছন্নতার ফুরফুরে অনুভবটা আসে না কোনোভাবেই। অ্যালকোহলের কোনো প্রভাব যদিও দেহযন্ত্রের কোথাও টের পাচ্ছি না, কিন্তু মনে হচ্ছে মাথাটা এখনো পরিষ্কার নয়, অনেকগুলো বুদ্‌বুদ জমা হয়ে আছে মগজের পরতে পরতে। মনের মধ্যে একটা অশান্তি; চিন্তাগুলো অস্থির, এলোমেলো।

গোসল সেরে ঘরে ফিরে দেখি ইমতিয়াজ পাশ ফিরেছে। এখন তার মুখটা দেখতে পাচ্ছি। বড়ই আরামে ঘুমাচ্ছে। কাঁধে ধাক্কা দিয়ে জাগালাম ওকে। সভয়ে বড় বড় চোখ মেলে তাকাল সে: ‘কী! কী হয়েছে?’ মৃদু আর্তনাদ বেরিয়ে এল ওর গলার ভিতর থেকে। ও হয়তো ভেবেছে এখনো অনেক রাত, আমার হাতে রুটিকাটা ছুরি, তাকে খুন করে আমি তিরিশ লাখ শহিদের হত্যার বদলা নিতে উদ্যত।

‘আলেকসান্দর পেত্রোভিচের সঙ্গে কথা বলেছি। তোকে অন্য রুমে চলে যেতে হবে।’ আমি বললাম।

ইমতিয়াজের ঘুমজড়ানো চোখেমুখে এবার একটা দৃঢ়তার ভাব ফুটে উঠল। সে শোয়া থেকে উঠে বসল; তারপর তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল আমার চোখের দিকে : ‘তোর প্রবলেমটা কী?’

‘তুই আমার রুমে থাকতে পারবি না।’

‘কেন?’

‘এমনি। তোকে আমার সহ্য হচ্ছে না, ঠিক আছে?’

বিষাক্ত সুরে এই কথা বলে আমি ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথায় চিরুনি চালাতে শুরু করলাম।

‘কেন? সহ্য হচ্ছে না মানে কী? গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় কি তোর মর্জিমাফিক চলবে?’ ইমতিয়াজের গলা শুনতে পেলাম। আয়নার দিকে চেয়েই বললাম, ‘হ্যাঁ, তাই চলবে। আমার রুমমেট কে হবে, সেটা নির্ভর করবে আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। তুই আমার রুমে থাকতে পারবি না। আমি সিনিয়র টিচারকে বলেছি। উনি বলেছেন, তোকে অন্য রুমে যেতে হবে।’

‘ঠিক আছে, যাব। কিন্তু সে জন্য তুই এমন পাগলের মতো আচরণ করছিস কেন? সিনিয়র টিচার বললেই আমি চলে যাব। এ নিয়ে এত হাঙ্গামা করার কী আছে?’

‘হাঙ্গামা কে করল?’

‘তুই করছিস! ঘুমন্ত মানুষকে ধাক্কা দিয়ে তুলে বলছিস, এই ঘরে থাকতে পারবি না। এটা কী? তুই আমাকে অর্ডার করার কে?’

‘আমি এই ঘরের বাসিন্দা। তুই এখানে ইনট্রুডার।’

‘কী?’

‘ইনট্রুডার!’

‘কী করে আমি ইনট্রুডার হলাম? সিনিয়র টিচার না বললে কি আমি এই ঘরে আসতাম? আমি কি জানতাম যে এই ঘরে এক মহান বাঙালি বাস করেন?’

‘কেন? সিনিয়র টিচার যখন তোকে নতুন একটা রুমে সিট দিল, তখন তুই জানতে চাস নি, সেই ঘরে কে থাকে? কার রুমমেট হতে যাচ্ছিস তুই?’

‘না, আমি তা জানতে চাই নি। কারণ আমার তাতে কিছু এসে যায় না। যে-ভার্সিটিতে একশ দশটা দেশের ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করে, সেখানে যে-কেউ যে-কারোর রুমমেট হবে এটাই তো স্বাভাবিক। সে-রকম মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই সবার এখানে আসা উচিত, সব সংকীর্ণ প্রিজুডিস ঝেড়ে ফেলে দিয়ে। তুই কি জানতিস না, এই ভার্সিটিতে পাকিস্তানের ছেলেমেয়েরাও পড়ে?’

‘জানতাম। কিন্তু তার মানে এই না যে পাকিস্তানি কোনো ছেলেকে আমার রুমমেট হতেই হবে।’

‘কেউ তো বলছে না যে তা হতেই হবে।’

‘দ্যাটস ফাইন। তুই দুপুরের মধ্যে চলে যাবি।’

ইমতিয়াজ আর কিছু বলল না। আমি ওর দিকে চেয়ে রইলাম, বোঝার চেষ্টা করলাম, কতটা আঘাত করতে পেরেছি ওকে। কিন্তু বুঝতে পারলাম না। ও খাট থেকে নেমে ওর খাটের পাশের টেবিলে রাখা কলমদানি থেকে টুথব্রাশ হাতে নিল, টেবিলের ড্রয়ার খুলে বের করল ভারতীয় কোলগেট কোম্পানির টুথপেস্টের টিউব, তারপর তোয়ালে কাঁধে ফেলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

আমি গোঁ ধরে বসে রইলাম। ক্ষুধা মরে গেছে। এখন জেদ চেপেছে, ওকে ঘর থেকে বের করেই ছাড়ব। দুপুরের আগেই। এমনভাবে আঘাতের পর আঘাত করতে থাকব যেন ও নিজেই সিনিয়র টিচারের কাছে ছুটে গিয়ে বলে, স্যার, আজই আমাকে অন্য কোনো রুমে সিট দেন।

দাঁত মেজে মুখচোখ ধুয়ে ফিরে এল ইমতিয়াজ। সে ঘরে ঢুকতেই আমি তাকালাম; আমার চোখে তার চোখ পড়ল, এবং সে আমার চোখের দিকে চেয়েই রইল। আমার অস্বস্তি বোধ হলো, নির্লজ্জ আগ্রাসী জাত বলে ওকে মনে মনে গালি দিলাম। মুখে বললাম, ‘ব্যাপারটা আরও তিতা হওয়ার আগেই তোর চলে যাওয়া ভালো।’

ইমতিয়াজ অদ্ভুতভাবে হাসল, তারপর বলল, ‘আমিও ঠিক এই কথাটাই ভাবছিলাম। বরং এখনই চলে যাই। কিন্তু যাব যে, গিয়ে উঠবটা কোথায়? সিনিয়র টিচার আমার জন্য নতুন করে সিট বরাদ্দ না করলে আমি এই বাকসো-পেটরা, হাঁড়ি-বাসন, বইপুস্তক নিয়ে কোথায় গিয়ে উঠতে পারি?’

আমি আর বলার মতো কথা খুঁজে পেলাম না। ইমতিয়াজ তার খাটের কিনারে বসে খাবারের টেবিলের দিকে তাকাল। তারপর, যেন আমাদের মধ্যে কিছুই হয় নি, এমন ভঙ্গিতে বলল, ‘আয়, ব্রেকফাস্ট সেরে ফেলি।’

আমি কিছু না বলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম।

‘কাল রাতে আমি তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম,’ বলে চলল সে, ‘তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টেরই পাই নি। খাবারগুলো ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখব, আবার ভাবলাম, কত রাতে তুই ফিরবি, হয়তো কিছুই খাস নি, ক্ষুধার্ত পেটে ঘুমাবি কী করে..! আয়, বোস। আমি দুপুরে সিনিয়র টিচারের কাছে গিয়ে সিটের কথা বলব।’

আমি মূর্তির মতো বসে রইলাম।

সে বলল, ‘পাকিস্তানিদের ব্যাপারে তোর যে ঘৃণা, বলা যায় প্যাথোজিক্যাল হেট্রেড, এটার পেছনে কি তোর কোনো ব্যক্তিগত কারণ আছে?’

ঘাড় না ফিরিয়েই বললাম, ‘ব্যক্তিগত কারণ থাকতে হবে কেন? তিরিশ লাখ শহিদ যথেষ্ট না?’

‘যথেষ্টরও বেশি। তবু কেন জানি আমার মনে হচ্ছে, তুই ব্যক্তিগতভাবেও অ্যাফেক্টেড। যুদ্ধে তোর আত্মীয়-স্বজনদের কেউ মারা গিয়েছিল?’

আমি চুপ করে রইলাম। ওর সঙ্গে গল্প শুরু করার ইচ্ছা মোটেও নেই।

‘সেভেনটি ওয়ানে আমার বাবা জেল খেটেছিল।’

আমি ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে তাকালাম : ‘কেন?’

‘সেভেনটির ইলেকশানের রেজাল্ট অগ্রাহ্য করে… পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ন্যায়সঙ্গত রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করে… পূর্বাংশের নাগরিকদের ওপর নির্মম সামরিক দমন-পীড়ন চালিয়ে কেন্দ্রীয় কৃর্তপক্ষ পাকিস্তানের অখণ্ডতাকেই হুমকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে.., আমার বাবা এসব কথা লিখেছিল লাহোরের এক বামপন্থি পত্রিকায়..। ইয়াহিয়া খান পত্রিকাটা বন্ধ করে দিয়েছিল, আমার বাবাকে জেলে পাঠিয়েছিল, পত্রিকার সম্পাদক আত্মগোপন করেছিলেন। তখন লোকেরা আমাদের ঘৃণা করত, পাড়াপ্রতিবেশীরা পর্যন্ত কথা বলত না আমাদের সঙ্গে। আমার বাবা নাকি পাকিস্তানের শত্রু, ভারতের দালাল, বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী, পাকিস্তানকে ভাঙতে চায়..।’

আমি ইমতিয়াজের মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে রইলাম। সেও চেয়ে রইল আমার মুখের দিকে। তার দুই চোখের প্রান্ত থেকে একটা হাসি ছড়িয়ে পড়ল দুই কানের গোড়া পর্যন্ত। সে উঠে পানি রাখার শূন্য জারটা হাতে নিয়ে বলল, ‘কমরেড, তুমি খাবার বাড়তে আরম্ভ করো, আমি পানি নিয়ে আসছি।’ তারপর জারটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

আমি এক টুকরো রুটি তুলে নিয়ে কামড় বসালাম।


কনিয়াক ও মহাভারতবর্ষ

১৯৬৫ সালে, যখন ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ চলছিল, সেই সময় ইমতিয়াজের জন্ম, লাহোরে। পরদিন সন্ধ্যায় পেঁয়াজ কাটতে কাটতে বলছিল ইমতিয়াজ। আমি মুরগি কাটছিলাম, চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকালাম, তারপর হাতের ছুরিটা ওর নাক বরাবর তাক করে বললাম, ‘লাহোর? মানে পাঞ্জাব! এ, তুই পাঞ্জাবি?’

‘জরুর হুঁ। কিউ?’

‘শালা কসাইয়ের জাত!’

হো হো হো করে হেসে উঠল ইমতিয়াজ।

আমি আবার মুরগি কাটতে কাটতে বললাম, ‘দাঁত কেলাচ্ছিস কেন? এই টিক্কা খানের বাচ্চা, দাঁত কেলানোর কী হলো?’

‘টিক্কা খানই শুধু পাঞ্জাবি না, পাঞ্জাবি আরও আছে।’ হেসে বলল ইমতিয়াজ।

‘সব পাঞ্জাবিই কসাই। একাত্তরে পাঞ্জাবি সৈন্য বললেই আমাদের দেশের মানুষ বুঝত, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।’

‘মাফ চাই ইয়ার,’ এবার একটু বিরক্ত দেখাল ওকে, ‘তোর মুখে একাত্তর ছাড়া কি আর কোনো প্রসঙ্গ নাই?’

আমি এবার খেপে উঠলাম : আর কী প্রসঙ্গ থাকতে পারে? একজন পাকিস্তানির সামনে পড়লে একজন বাঙালি আর কী প্রসঙ্গে কথা বলতে পারে? একাত্তরে পাকিস্তানিরা বাঙালিদের সঙ্গে যা করেছে, তা তারা ভুলে যেতে পারে, বাঙালিরা ভুলবে কী করে?

ইমতিয়াজ রণে ভঙ্গ দিয়ে ‘মাফ কর দো, মাফ কর দো’ বলে আমার সামনে হাতজোড় করতে লাগল। কিন্তু আমি বললাম, ‘এই অপরাধের কোনো ক্ষমা হয় না, ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ বলে যদি কিছু থেকে থাকে তবে পাকিস্তানিরা, পাঞ্জাবিরা বাঙালিদের ওপর সেই অপরাধ করেছে। বাঙালি কোনোদিন তাদের ক্ষমা করবে না। পাকিস্তানের সরকার বাংলাদেশের সরকারের কাছে আজও ক্ষমা চায় নি। কিন্তু যদি কখনো চায়ও, বাংলাদেশের জনগণ ক্ষমা করবে না।’

ইমতিয়াজ এবার বলল, ‘কিন্তু গোলমালটা তো পাকিয়েছিল পাকিস্তানের আর্মি সরকার, পাকিস্তানের পাবলিকের তাতে কোনো হাত ছিল না। আমার বাবা বলত, শেখ মুজিবের দল যখন প্রায় সবগুলো সিটে জিতে গেল, কিন্তু ইয়াহিয়া তাকে ক্ষমতা না দিয়ে ঢাকার রাস্তায় ট্যাংক নামিয়ে দিল, তখনই আমাদের মাথা হেঁট হয়ে গেল। গোটা পাকিস্তানের জনগণ লা-জওয়াব হয়ে গেল। আর কিছু বলার মুখই থাকল না আমাদের!’

কথা বলতে বলতে মুরগি, পেঁয়াজ, আলু ইত্যাদি কাটা শেষ হলো। প্রচুর হলুদ, মরিচ, জিরা ও ধনের গুঁড়ো মিশিয়ে আমি মুরগি রান্না করলাম বাঙালি কায়দায়। ভিয়েতনামি সুগন্ধী চিকন চালের সঙ্গে রুশি বাটার মিশিয়ে যা রান্না করলাম, তা পোলাও হলো কি না কে জানে। দুজনে খেতে বসলাম। এক বোতল মালদাভীয় কনিয়াক বেশ আগেই খুলেছে ইমতিয়াজ, যখন আমরা কাটাকুটি করছিলাম। রান্না শেষ হতে হতে বোতলের প্রায় অর্ধেকটাই খালি হয়ে গেছে। মুরগি-পোলাও খেতে বসে দেখলাম, খেতে পারে বটে শালা পাঞ্জাবি। আমার পেটেও ক্ষুধা কম নয়। প্রায় দুই কেজি ওজনের একটা মুরগি, আধা কেজি চালের পোলাও, সব হাঁড়ি চেঁচে সাবাড় করে ফেললাম দুজনে, সঙ্গে চলল কনিয়াক।

তারপর অধোয়া প্লেট ও হাড়িপাতিল ঘরের এক কোণে সরিয়ে রেখে আমরা আয়েশ করে পাশাপাশি বসলাম। আমি আমার টেবিলের ড্রয়ার খুলে বের করলাম সিগারেটের প্যাকেট : ডানহিল। মস্কোতে এই সিগারেট মহার্ঘ্য; আগে কেউ ভাবতেই পারত না, ইদানীং পাওয়া যাচ্ছে; তবে অতি উচ্চ মূল্যে। আমি অবশ্য কিনি নি, কেনার সাধ্য রাখি না। আমার স্বদেশি বন্ধুদের অনেকেই ইদানীং কমুনিস্টের খাতা থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে স্পেকুলান্ত, মানে চোরাকারবারিদের খাতায় নাম লিখিয়েছে। কিন্তু স্পেকুলান্ত কথাটা ব্রেজনেভের আমলেও যতটা সাংঘাতিক ছিল, এখন, গর্বাচভের পিরিস্ত্রোইকার পঞ্চম বছরে এসে, তেমন নেই। চোরাকারবারি আর ব্যবসা এখন সমার্থক হয়ে গেছে। আমার স্বদেশি বন্ধুরা এখন সিঙ্গাপুর যাচ্ছে, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি কিনে এনে মস্কোতে চড়া দামে বিক্রি করছে। এক খ্যাপে দুই-তিন হাজার ডলার লাভ। ওরাই আমাকে সিগারেট দেয় : ডানহিল, রথম্যানস, মার্লবোরো, সালেম। আগে আমরা ফুঁকতাম সোভিয়েতদের বা বুলগেরিয়ানদের তৈরি সিগারেট; অত্যন্ত নিকৃষ্ট মানের।

আমি ফস করে সিগারেট ধরাতেই ইমতিয়াজ হা হা করে উঠল : ‘এই! ঘরের মধ্যে সিগারেট জ্বালালি যে?’


অখণ্ড ভারতের বুকে চূড়ান্ত কোপটা মেরেছিলেন জওহরলাল।


মনে পড়ে গেল, ওকে বলেছিলাম আমি ঘরের ভিতরে সিগারেট খাই না। মিথ্যে বলেছিলাম বটে। কিন্তু সেটা ফাঁস হোক তা আমি চাই না, এখনো নয়। আমি ওর দিকে প্যাকেটটা এগিয়ে ধরে বললাম, ‘খাবার খেয়ে আয়েশ করে বসেছি, মনের সুখে সিগারেটে টান দিতে এখন কি করিডরে যেতে হবে? সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানার পরিশ্রম করতে হবে? সোভিয়েত দেশ বলে কি নিয়মগুলো এতই রিজিড হতে হবে?’

ইমতিয়াজ চোখ বড় বড় করে বলল, ‘কাকে বলছিস এসব কথা? আমাকে? এটা কি আমার ঘর?’

‘না না, তোকে বলছি না। নিজেকেই বলছি। তুই নিজেই ভেবে দ্যাখ তো একবার, এই ভরপেটে করিডরের শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে.., পা দুইটা তো শরীরের ভারটাই তো বহন করতে পারবে না।’

আমার কথা শুনে ইমতিয়াজ হাসতে শুরু করল। হাসতে হাসতেই আমার পাশ থেকে উঠে গিয়ে ফ্রিজের মাথার এক কোণ থেকে নামিয়ে আনল আমার ক্রিস্টালের ছাইদানিটা। তার পর সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘পাঞ্জাবিরা সবাই খারাপ না।’

আমি তির্যক স্বরে বললাম, ‘হ্যাঁ, পাঞ্জাবিদের মধ্যে ফেরেশতাও আছে। তাদের একজনের নাম ইমতিয়াজ।’

ইমতিয়াজ হো হো করে হেসে উঠল। তারপর হঠাৎ বলল, ‘ভগৎ সিংএর নাম শুনেছিস?’

আমার ঠিক মনে পড়ল না, কিন্তু একটু একটু মনে হলো, শুনে থাকব। হঠাৎ মনে পড়ে গেল : ‘শহিদ ভগৎ সিং? শুনি নি আবার?’

‘সে একজন পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন।’

আমি চুপ করে রইলাম। ভগৎ সিং সম্পর্কে বেশি কিছু জানি না; অনেক আগে বোধহয় তার সম্পর্কে কোনো লেখা পড়েছিলাম। কিন্তু আজ আর সেসব মনে নেই।

‘ভগৎ সিংয়ের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। লাহোর জেলখানায় বন্দি। ফাঁসি হবে। আরেক রাজবন্দি তাকে জিগ্যেস করেছিলেন, তোমার আত্মীয়-স্বজনরা কেউ তোমাকে দেখতে এল না যে? তখন ভগৎ সিং কী বলেছিলেন জানিস?’

আমি তাকালাম ইমতিয়াজের মুখের দিকে।

‘ভগৎ বলেছিলেন, আমার আত্মার আত্মীয় তো ক্ষুদিরাম বোস। তার কাছেই আমি যাচ্ছি। ক্ষুদিরামের রক্তের সঙ্গে মিলিত হবে ভগৎ সিং-এর রক্ত।’

আমি অবাক হলাম : ‘তুই ক্ষুদিরাম সম্পর্কেও জানিস?’

‘জানব না কেন? বেঙ্গলের স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবীদের সঙ্গে পাঞ্জাবের বিপ্লবীদের খুব ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আমি অবশ্য সে সব বেশি কিছু জানি না, আমার বাবা জানেন। তার মুখে শুনেছি। কিছু বইপত্র অবশ্য পড়েছিলাম, বাবাই পড়িয়েছিল। ক্ষুদিরাম বোস আর সূর্য সেনের কথাও শুনেছিলাম বাবার মুখেই। তুই যদি কখনো আমাদের বাড়ি যাস, বাবার সঙ্গে তোর অনেক আলাপ হবে। দেখিস, বাবা তোকে কত কিছু বলে।’

গল্পে গল্পে ইমতিয়াজ আরও জানাল, ঢাকায় ওর বাবার অনেক বন্ধু ছিল। বাংলাদেশ আলাদা হয়ে যাওয়ার পরেও তাদের কয়েকজনের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল, তারা ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির লোকজন।

‘আমার বাবা কিন্তু বেশ আগে থেকেই জানতেন, বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে না। থাকা সম্ভব হবে না। মাঝখানে ভারত না থাকলে অবশ্য সম্ভব হতো। বাবা আরও কী বলত জানিস? ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ ভাগ করেছে আসলে পাঞ্জাব আর বেঙ্গলকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। এই দুটি অঞ্চলের মানুষ নাকি ব্রিটিশদের জ্বালিয়েছে সবচেয়ে বেশি। তাই ওরা চলে যাওয়ার আগে পাঞ্জাব আর বেঙ্গলের এমন অঙ্গহানি করে দিয়ে গেছে যে সেই ক্ষতি কোনো কালেও পূরণ আর হওয়ার নয়।’

একটু পর গ্লাসে আবার কনিয়াক ঢালতে ঢালতে সে বলল, ‘আমার বাবা কিন্তু চেয়েছিলেন, পাকিস্তান যেন না ভাঙে।’

‘বাংলাদেশ যেন স্বাধীন না হয়?’

‘না মানে, বাবার আফসোস হতো, আহারে দেশটা ভেঙে যাবে..।’

‘কেন ভাঙবে না? পাকিস্তানের অংশ হয়ে কেন থাকতে হবে বাংলাদেশকে? কী যুক্তিতে? পাকিস্তান একটা দেশ হলো? রাষ্ট্র হলো? ওটা যে টিকবে না, টেকার নয়, তা তো শুরুতেই বুঝে গিয়েছিল সবাই, যাদের মাথায় একটু ঘিলু ছিল।’

ইমতিয়াজ আর কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দিকে গেল না। শুধু বলল, এক সঙ্গে থাকলেই ভালো হতো।

‘হ্যাঁ, ভালো হতো!’ আমার গলা হঠাৎ চড়া হয়ে উঠল, ‘ভালো হতো তোদের, পশ্চিম পাকিস্তানি রক্তচোষা শোষকদের, যারা বাঙালিদের রক্ত ইচ্ছামতো চুষে খেতে পারছিল। শুধু ইকোনোমিক এক্সপ্লোয়টেশানই না, কথায় কথায় অপমান… তোরা তো আমাদের প্রভু হয়ে মাথায় চেপে বসেছিলি..! মিলিটারিতে, সিভিল সার্ভিসে বড় বড় পোস্টে কজন বাঙালিকে তোরা উপরে উঠতে দিয়েছিলি? পাকিস্তান আর্মিতে কজন অফিসার বাঙালি ছিল? ও, বাঙালি ননমার্শাল জাত, বন্দুকই ধরতে জানে না? জানে কি না তা তো দেখতেই পেলি শেষে!’

আমি বকবক করে চললাম, কনিয়াকের উত্তাপে আমার কথাগুলো বক্তৃতার মতো হয়ে উঠল। মুখে প্রায় ফেনা এসে গেল। ইমতিয়াজ একটা খালি গ্লাসে পানি ঢেলে দিয়ে আমাকে বলল, ‘পানি পিলে, পানি পিলে!’

আমি এবার থামলাম। আমার একটু হাসি পেল। গ্লাসের সবটুকু পানি খেয়ে একটু ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা করলাম। তখন ইমতিয়াজ বলল, ‘সবচেয়ে ভালো হতো কী, জানিস?’

আমি হাতের পিঠে ঠোঁট মুছতে মুছতে ওর চোখের দিকে তাকালাম।

‘সবচেয়ে ভালো হতো গোটা ভারতবর্ষ অখণ্ড থাকলে। তাহলে পাঞ্জাবও ভাঙত না, বাংলাও দুভাগ হতো না। তার চেয়ে বড় কথা, তুই-আমি সবাই হতাম এক অখণ্ড ভারতবর্ষের নাগরিক। মহাভারতবর্ষ! কত্ত বড় দেশ! কী বিরাট একটা নেশন! চিন্তা করতে পারিস? আজ সারা দুনিয়ায় আমাদের কী রকম মর্যাদা থাকত, একবার ভেবে দেখেছিস?’

আমি বললাম, ‘তা ঠিক। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা, বিপ্লব হলে গোটা ভারতবর্ষে এক সঙ্গে হতো।’

ইমতিয়াজ হেসে বলল, ‘তুই এখনও বিপ্লব নিয়ে আছিস?’

আমি বললাম, ‘তুই কী ভাবিস? বিপ্লব আর হবে না?’

‘পাগল হয়েছিস?’ হাসল ইমতিয়াজ। খালি গ্লাসে কনিয়াক ঢালতে ঢালতে হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টাল : ‘আমার এক চাচা আর্মি অফিসার ছিল। সিভিল ওয়ারের সময় তার পোস্টিং ছিল ইস্ট পাকিস্তানে।’

‘সিভিল ওয়ার মানে?’ আমি দপ করে জ্বলে উঠলাম।

‘সেভেনটি ওয়ানে।’

‘শালা বাঞ্চত! সেভেনটি ওয়ানে সিভিল ওয়ার হয়েছিল?’

বিভ্রান্ত চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাল ইমতিয়াজ : ‘গল্তি কিয়া ইয়ার?’

‘উর্দু মারাবি না, হানাদারের বাচ্চা!’

‘এ! তু ড্রাঙ্ক হো গেয়্যা?’

‘ইউ শাট আপ!’

‘নেহি নেহি, আভি পিনা মাৎ..!’ বলতে বলতে ইমতিয়াজ আমার হাত থেকে গ্লাসটা কেড়ে নিতে চাইল। আমি আমার গ্লাসসুদ্ধ হাতটা সরিয়ে নিয়ে ওর চোখের দিকে চেয়ে বললাম, ‘সেভেনটি ওয়ানে সিভিল ওয়ার হয়েছিল? বল, ওটা গৃহযুদ্ধ ছিল?’

‘নিশ্চয়ই! ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি..!’

‘চুপ হারামজাদা! কে তোদের ভাই?’

‘হে হে হে, তু ড্রাঙ্ক হো গেয়্যা! নাউ স্টপ ড্রিংকিং, মেরে ভাই!’

‘সেভেনটি ওয়ানে সিভিল ওয়ার হয়েছিল, না? সেই সিভিল ওয়ারে তোরা মেরেছিস তিরিশ লাখ বাঙালিকে, আর বাঙালিরা মেরেছে কজন পাকিস্তানিকে? সিভিল ওয়ার মানে কী? এই হারামজাদা, সিভিল ওয়ার কাকে বলে?’

হা হা হা করে হেসে উঠল ইমতিয়াজ: ‘স্যরি ইয়ার, দ্যাট ওয়াজ অ্যান ওয়ার অফ ইনডিপেডেন্স, রাইট? বাংলায় কেমন করে বলে?’

‘মুক্তিযুদ্ধ। বল, মুক্তিযুদ্ধ!’

‘মুক্তিযুদ্ধ।’ হেসে বলল ইমতিয়াজ।

আমি বললাম, ‘বল, জয় বাংলা।’

ইমতিয়াজ ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে উপরে তুলে ধরে হাসতে হাসতে বলল, ‘জয় বাংলা!’

আমি বললাম, ‘বল, বাংলাদেশ চিরঞ্জীব হোক!’

‘কেয়া? বেঙ্গলি বহত ডিফিকাল্ট ল্যাঙ্গুয়েজ, ইয়ার!’

‘তাহলে বল, লং লিভ বাংলাদেশ!’

ইমতিয়াজ হাসতে হাসতে বলল, ‘লং লিভ বাংলাদেশ! লং লিভ পাকিস্তান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ!’

‘বাড়তি কথা বলিস কেন?’ ধমক দিয়ে বললাম, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো ফ্রেন্ডশিপ নাই। পাকিস্তান আজ পর্যন্ত ক্ষমা চায় নি। দরকার নাই। কোনো দিন যদি ক্ষমা যদি চায়ও, তবুও ফ্রেন্ডশিপ হবে না।’

এ-সময়  দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। ইমতিয়াজ উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। যেন তার জানা ছিল, যে এসেছে সে আমার কেউ নয়, আমার কাছে আসে নি, এসেছে তারই কাছে। ইমতিয়াজ দরজা খুললে দেখতে পেলাম একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে, উজ্জ্বল হাসিমুখ। ইমতিয়াজ তাকে ভেতরে আমন্ত্রণ জানাল। মেয়েটি ঘরে ঢুকে আমার দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে সম্ভাষণ জানাল রুশ ভাষায় : দোব্রে ভিয়েচের! মানে শুভ সন্ধ্যা। আমি সৌজন্যময় হেসে সম্ভাষণের উত্তর দিলাম। ইমতিয়াজ মেয়েটিকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল : ‘রূপিন্দর, আমার বন্ধু।’

আমি রূপিন্দরের দিকে ডান হাত বাড়িয়ে দিলাম। রূপিন্দরও হেসে ডান হাত বাড়াল। আমি ওর হাতটি ধরলাম : কোমল, মসৃণ হাত। মুখে অমলিন হাসি।

‘ইউ অলসো ফ্রম পাকিস্তান?’ আমার জিজ্ঞাসা।

‘ফ্রম ইন্ডিয়া।’ স্মিত হেসে বলল রূপিন্দর।

‘ফ্রম পাঞ্জাব,’ যোগ করল ইমতিয়াজ, আমার মুখের দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে সে বলল, ‘হিয়ার আর টু পাঞ্জাবিজ নাউ, রাইট বিফোর ইয়োর আইজ!’

আমি হেসে বললাম, ‘ভারতীয় পাঞ্জাবিদের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নাই।’

রূপিন্দর হেসে জিগ্যেস করল, ‘পাকিস্তানি পাঞ্জাবিদের বিরুদ্ধে আছে বুঝি?’

আমি ওকে বললাম, ‘তুমি জান না, একাত্তরে পাকিস্তানি পাঞ্জাবিরা আমাদের কী করেছে?’

‘জানি তো একটু একটু। কিন্তু সে তো ছিল পুরো পাকিস্তানের ব্যাপার, পাঞ্জাবিদের বিরুদ্ধে আলাদা করে কী অভিযোগ তোমার?

আমি বললাম, ‘টিক্কা খান আর নিয়াজি দুজনেই পাঞ্জাবি, জান তো? এই দুই পাঞ্জাবি কসাই ছিল আমাদের তিরিশ লাখ মানুষকে কচুকাটা করার কসাই-সর্দার। তাই আমরা পাঞ্জাবিদের সহ্য করতে পারি না।’

‘আই আন্ডারস্ট্যান্ড,’ এবার ইংরেজিতে বলল রূপিন্দর, ‘বাট ইউ নো, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, দি উর্দু পোয়েট? হি ওয়াজ এ পাঞ্জাবি ঠু।’

আমি চুপ করে রইলাম।

‘পোয়েট মোহাম্মদ ইকবালও একজন পাঞ্জাবি।’ রূপিন্দরের সঙ্গে যোগ করল ইমতিয়াজ।

আমি নীরব, প্রতিক্রিয়াহীন রইলাম। ছোটবেলায় শুনতাম ‘মহাকবি ইকবাল’; কিন্তু পছন্দ করতাম না তাকে, যদিও তার সম্পর্কে কিছুই জানতাম না।

ইমতিয়াজ আমাকে বলল, ‘তাহলে, দেখতেই পাচ্ছিস, এভাবে জেনারালাইজ করা ঠিক না! টিক্কা খানের দুষ্কর্মের দায় তাহমিদুল হক বইতে যাবে না।’

‘হু ইজ তাহমিদুল হক?’ আমার জিজ্ঞাসা।

‘আরেকজন পাঞ্জাবি। আমার বাবা,’ বলল ইমতিয়াজ, ‘যার সঙ্গে আচরণ করা হয়েছিল গণশত্রুর মতো। এবং শুধু আমার বাবা একা না, তার মতো আরও অনেকেই ছিল।… সব দেশে, সব কালেই থাকে, থাকতে হয়। নইলে মানুষের এই সভ্যতা বহু আগেই ধ্বংস হয়ে যেত।’ ইমতিয়াজের কথাগুলো বক্তৃতার মতো শোনাতে আরম্ভ করলে রূপিন্দর ওকে থামাল এক গ্লাস পানি খেতে চাওয়ার অজুহাতে।

শুধু পানি খেতে দেবো রূপিন্দরকে? বিব্রতকর পরিস্থিতি দেখা দিল ইমতিয়াজ ও আমার জন্য। কারণ আমরা দুজনে মুরগির মাংস ও পোলাওয়ের হাড়ি শূন্য করে ফেলেছি অনেক আগেই। কনিয়াকের সহযোগে সেসব খাদ্যের বারো আনা হজমও হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। তবে ভাগ্য আমাদের ভালো যে ফ্রিজটা একদম খালি নয়। পাউরুটি, অ্যাপ্রিকটের জেলি আর পনির বের করল ইমতিয়াজ। পাউরুটি কেটে জেলি মাখাল, তারপর মোটা মোটা ফালি করে কাটল পনির। আর আমাদের দুই গ্লাসের সঙ্গে যোগ দিল তৃতীয় একটি গ্লাস। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কনিয়াকভরা বোতলটি থেকে ইমতিয়াজ তিনটি গ্লাসে অল্প করে ঢালল। এই পরিমিতি সম্ভবত রূপিন্দরের প্রতি সমীহবশত।

ইমতিয়াজ একটা গ্লাস এগিয়ে ধরল রূপিন্দরের দিকে। রূপিন্দর রুটির টুকরোয় মৃদু কামড় দিয়ে সাদরে হেসে হাতে নিল কনিয়াকের গ্লাস, মিটি মিটি চোখে তাকাল আমার চোখের দিকে। তারপর স্মিত হাসল ইমতিয়াজের মুখের দিকে চেয়ে। সাদর আমন্ত্রণসূচক মাথা নাড়ল ইমতিয়াজ। তারপর তিনটা কাচের গ্লাসের সমবেত টুং টাং শব্দের সঙ্গে ইমতিয়াজ রুশ ভাষায় যে টোস্ট বলল, বাংলায় তার মানে দাঁড়ায় এ রকম : আমরা পান করছি উপমহাদেশীয় সংহতির জন্য।

একটু পর রূপিন্দর আমাকে জিগ্যেস করল, ‘তোমার জন্ম ঢাকায়?’

‘না। অন্য এক শহরে। তোমার?’ আমি ওকে জিগ্যেস করলাম।

‘দিল্লিতে,’ বলল রূপিন্দর, ‘কিন্তু আমার পুর্বপুরুষেরা এসেছে পাকিস্তান থেকে। আমার বাবা-চাচাদের জন্ম শিয়ালকোট শহরে।’

‘শিয়ালকোট?’ আমি বললাম, ‘ছেলেবেলায় আমরা শিয়ালকোটের তৈরি ফুটবল খেলেছি।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘শিয়ালকোট এক সময় খেলাধুলার সরঞ্জাম তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল। শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেটের ব্যাট, ব্যাডমিন্টনের র‌্যাকেট, আরও অনেক কিছু তৈরি হতো। খুব উন্নত মানের। ইউরোপেও রপ্তানি হতো।’

রূপিন্দর বলল, ‘আমি অবশ্য সে সব জানি না।’

‘আমি জানি, কারণ ওটা আমার দেশের শহর। ইন ফ্যাক্ট আমার দাদার বাড়ি শিয়ালকোটে। আমার বাবা-চাচাদের জন্মও সেখানেই।’ বলল ইমতিয়াজ।

আমি হেসে বললাম, ‘তার মানে, তোমাদের শিকড় একই জায়গায়?’

দুজনেই হাসল।

রূপিন্দর বলল, ‘ইমতিয়াজের বাবা-চাচারা শিয়ালকোট ছেড়ে লাহোর গিয়ে থিতু হয়েছিলেন নিজের ইচ্ছায়। কিন্তু আমার দাদু ও বাবা-চাচাদের শিয়ালকোট ছাড়তে হয়েছে প্রাণের ভয়ে।’

‘তা ঠিক।’ মাথা নেড়ে বলল ইমতিয়াজ।

একটু নীরবতা। তারপর রূপিন্দর কিছু বলতে যাচ্ছে, তার আগেই ইমতিয়াজ বলে উঠল, ‘আমার বাবা কিন্তু লাহোর ছেড়ে করাচি আসতে বাধ্য হয়েছেন।’

‘কেন?’ আমি জানতে চাইলাম।

ইমতিয়াজ বলল, ‘তোকে বলেছিলাম, সেভেনটি ওয়ানে লাহোরে যে-পত্রিকায় বাবা কাজ করত, সেখানে পঁচিশে মার্চের রাতে ঢাকায় আর্মি ক্র্যাকডাউনের সমালোচনা করায় গভমেন্ট পত্রিকাটি বন্ধ করে দিয়েছিল, বাবা ও তার কয়েকজন সহকর্মীকে জেলে পাঠিয়েছিল। তারপর জেল থেকে বেরিয়ে বাবা কী করবেন? রুজি-রুটি বন্ধ। চলে গেলেন করাচি। ওখানে একটা কাজ খুঁজে নিলেন..।’

রূপিন্দর বলল, ‘কিন্তু এর চেয়ে অনেক ভয়ংকর ছিল দেশবিভাগের ঘটনা। আমার দাদা-দাদি, বাবা ও চাচারা প্রাণ হাতে করে শিয়ালকোট ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। প্রথমে অমৃতসর। পরে দিল্লিতে স্থায়ী হন। শিয়ালকোটে আমার দাদার দোতলা একটা বাড়ি ছিল, বাড়ির সামনে ও পেছনে ছিল দুটি বাগান। পেছনের বাগানটিতে ছিল এক পীরের কবর। দাদিমা প্রত্যেক সন্ধ্যায় সেই পীরের কবরে প্রদীপ জ্বেলে দিতেন; বিপদে-আপদে ছুটে যেতেন পীরের কবরের পাশে। শিয়ালকোট ছেড়ে দিল্লি আসার তিন মাস পরেই দাদি মারা গেলেন। তার ছয় মাস পরে গেলেন দাদাও।’

‘নাইনটিন ফরটিসেভেন! সাত দিয়ে যদি একটাও আনলাকি সংখ্যা থেকে থাকে, তবে সেটা হচ্ছে ফরটিসেভেন।’ বলল ইমতিয়াজ।

রূপিন্দর আমাকে বলল, ‘তোমার বাবা-চাচারা পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিতাড়িত নয় তো?’

‘না না,’ আমি বললাম, ‘দেশবিভাগের কারণে আমার পূর্বপূরুষদের ভিটেমাটি ছাড়তে হয় নি।’

‘ইউ আর লাকি দেন।’ বলল রূপিন্দর, ‘আমি তো চারদিকে কেবলই রিফিউজি দেখি। যার সঙ্গেই পরিচয় হয়, দেখি সে-ই রিফিউজি। আমার বাবা আজ পর্যন্ত মেনে নিতে পারেন নি যে পাকিস্তান যেতে হলে তাকে ভিসা নিতে হবে। শিয়ালকোট আমাদের চৌদ্দপুরুষের শহর। আমার দাদা ছিলেন সেখানকার বিখ্যাত ডাক্তার। অজস্র রোগী তার, অধিকাংশই মুসলমান। সবাই তাকে ভীষণ ভালোবাসত, অসম্ভব শ্রদ্ধা করত। তিনি কখনো কল্পনাও করেন নি যে ওই শহর ছেড়ে তাকে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে।’

ইমতিয়াজ বলল, ‘আসলে শিয়ালকোটে সহিংসতা ছিল না। ওখানকার স্থায়ী সব সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে খুবই সম্প্রীতি ছিল। প্রবলেমটা শুরু হলো ইন্ডিয়া থেকে যখন মুসলমানরা তাড়া খেয়ে আসতে লাগল। ইন্ডিয়ায় হিন্দুদের তাড়া খেয়ে এসে ওরা পাকিস্তানে হিন্দুদের ওপর চড়াও হতে লাগল। টু নেশন থিয়োরির ন্যাচারাল কনসিকোয়েন্স!’

রূপিন্দর ইমতিয়াজকে বলল, ‘টু নেশন থিয়োরি কাদের ছিল? কারা পাকিস্তান চেয়েছিল?’

ইমতিয়াজ দেখতে পেল রূপিন্দরের মুখটা লাল হয়ে উঠেছে, ঠোঁট দুটি শক্ত। সে হাত জোড় করে ইয়ার্কি মারার ঢঙে বলল : ‘মাফি মাংতা হুঁ। অন্তত আমি পাকিস্তান চাই নাই। আমার বাবাও চান নাই।’

তারপর সে আমার দিকে তাকাল, হেসে বলল, ‘সো ফার আই নো, অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল ঢাকায়। ওই দলটির জন্ম না হলে পাকিস্তান সৃষ্টি সম্ভব ছিল না।’

আমি ভালো বেকায়দায় পড়ে গেলাম। ইতিহাস সম্পর্কে আমার ধারণা এতই সামান্য যে ধরতে পারলাম না ইমতিয়াজ চাপা মারল কি না। কী বলা যায় যখন ভাবছি, তখন আমাকে উদ্ধার করল রূপিন্দর: ‘মুসলিম লীগের জন্ম কোথায় হয়েছে সেটা ইমপর্টেন্ট না। মুসলমানদের জন্য আলাদা একটা রাষ্ট্রের কথা প্রথম তুলেছিলেন আল্লামা ইকবাল, আমাদের মহান পাঞ্জাবি কবি!’

‘মাফি মাংতা হুঁ! মাফি মাংতা হুঁ!’ ইমতিয়াজ হাতজোড় করে হাসতে লাগল। তারপর গ্লাসে গ্লাসে আবার বেশ খানিকটা করে কনিয়াক ঢেলে দিল।

আবার তিনটা কাচের গ্লাস বেজে উঠল টুং টাং শব্দে। ইমতিয়াজ টোস্ট বলল : ‘লং লিভ বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান! লং লিভ ফ্রেন্ডশিপ!’


করাচি ১৯৯১

‘পাকিস্তান নামটাই আমি পছন্দ করি নি। শুধু এইটুকু জায়গাই পাক-পবিত্র, আর অবশিষ্ট পুরো পৃথিবীটাই নাপাক?’ বলছিলেন ইমতিয়াজের বাবা তাহমিদুল হক, ওদের করাচির বাড়িতে।

আমি শীতের ছুটিতে দেশে বেড়াতে যাচ্ছিলাম, পথে নামতে হলো করাচিতে। সপ্তাহ খানেক আগে ইমতিয়াজও বাড়ি এসেছে ছুটি কাটাতে। তার আগে মস্কোতে যখন ও শুনেছিল আমিও এবার দেশে বেড়াতে যাচ্ছি, এবং আরোফ্লোতের ফ্লাইট ঢাকা যাবে করাচি হয়ে, তখন সে জেদ ধরেছিল, করাচিতে নামতে হবে আমাকে, যেতেই হবে ওদের বাড়ি, অন্তত তিন দিন থাকতে হবে ওদের সঙ্গে।

কিন্তু আমি মন থেকে সায় পাচ্ছিলাম না। চার বছর পর দেশে বেড়াতে যাব, মস্কো থেকে উড়াল দিয়ে এক নিমেষে ঢাকায় নামার জন্য মন উতলা হয়ে থাকবে। মাঝখানে কোথাও নামতে পারব না। সাফ বলে দিলাম ওকে, ‘এটা অসম্ভব।’


ইন্ডিয়া যদি তোমাদের মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য না-ও করত, তবু নিয়াজির বাহিনীর পক্ষে ওই যুদ্ধে চূড়ান্তভাবে জেতা সম্ভব ছিল না।


‘তুই একটা বোকা।’ হেসে  বলেছিল ইমতিয়াজ, ‘এরকম সুযোগ পাবি আর কখনো? দু বছর পর তো দেশেই ফিরে যাবি, পাকিস্তান বেড়াতে যাওয়ার কোনো সুযোগ বা উপলক্ষ্য আর থাকবে তখন? আমি তো ভাবি, মস্কো থেকে দেশে যাওয়ার পথে প্লেনটা যদি ঢাকার উপর দিয়ে যেত, আমি ঢাকায় নামতাম। থাকতাম দিনদুয়েক, ঘুরেফিরে দেখতাম। কিন্তু এমনিতেই জানি, কোনো দিনই যাওয়া হবে না। ভেবে দ্যাখ, কী করবি। দাওয়াত দিয়ে রাখলাম।’

কী মনে করে হঠাৎ রাজি হয়ে গেলাম। ইমতিয়াজ একদিন আমাকে ধরে নিয়ে গেল মস্কোর পাকিস্তান দূতাবাসে, সেখানে আমার পাসপোর্টে পাকিস্তানের সাত দিনের ট্রানজিট ভিসা লাগিয়ে নিল। কিন্তু পাকিস্তান যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই আমার হচ্ছিল না। মস্কো বিমানবন্দরে বিমানে উঠে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, করাচিতে প্লেন থেকে নামবই না। কিন্তু প্লেন করাচি বিমানবন্দরে নামার পর ইমতিয়াজের মুখটা ভেসে উঠল।

করাচি বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে করে ইমতিয়াজ আমাকে সোজা ওদের বাড়ি নিয়ে এল। পরিচয় করিয়ে দিল ওর মা-বাবার সঙ্গে। বলল, আমি নাকি ওর ভাই, মস্কোতে আমরা এক ঘরে থাকি, এক পাতে খাই। ইমতিয়াজের মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, ওর বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। জিগ্যেস করলেন বাংলাদেশের কোন শহরে আমার বাড়ি, বামপন্থি দলগুলোর কোনটির সঙ্গে আমার যোগাযোগ, বা আমি কোনো দলের সদস্য কি না ইত্যাদি।

বিকেলে একটা পুরোনো টয়োটা গাড়িতে করে ইমতিয়াজ আমাকে নিয়ে বের হলো করাচি শহর ঘুরে দেখাতে। মস্কোর তুলনায় খুবই নিষ্প্রভ, অপিরচ্ছন্ন শহর করাচি। আমার মোটেও ভালো লাগল না ঘুরে বেড়াতে; সন্ধ্যা হতে না হতে বাড়ি ফিরে এলাম। ইমতিয়াজের বাবা গল্প শুরু করলেন।

‘আমি একাই শুধু পবিত্র, বাকি সবাই অপবিত্র—এটা তো গোঁড়া ব্রাহ্মণ আর কট্টর ইহুদিদের মনোভাব। তা ছাড়া তুমি দ্যাখো, পাকিস্তানের ভাবনাটার মধ্যে একটা পরাজয়ের মনোভাবও ছিল। আমি মুসলমান, অখণ্ড ভারতবর্ষে নিজের অধিকার নিয়ে টিকে থাকতে পারব না, হিন্দুদের সঙ্গে পেরে উঠব না, তাই আমাকে এক কোণে একটা আলাদা দেশ বানিয়ে দাও, তাহলেই আমি সন্তুষ্ট—এটা তো হীনম্মন্যতা। আমি তো গোটা ভারতবর্ষের সন্তান; গোটা ভারতবর্ষ আমার মাতৃভূমি। আমি আমার মাতৃভূমির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক জীবন গড়ে তোলার অংশীদার, যেমন তুমি হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান, পার্সি, তুমিও অংশীদার। মুসলমান বলে আমি আমার এই অধিকার বিসর্জন দিতে রাজি নই। আমার মায়ের আঙিনার এক কোণে আলাদা ঘর তুলে আমি কেন ভিন্ন হতে যাব?..’

বলে চললেন ইমতিয়াজের বাবা। আমি মন দিয়ে শুনছি, নাকি তার কথাগুলো আমার এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বের হয়ে বাতাসে হারিয়ে যাচ্ছে, সে সব তিনি খেয়ালই করছেন না। আমি আসলে তার সব কথা মন দিয়ে শুনছি না; এ রকম অতীতচারিতায় আমার আগ্রহ কম। অন্তত ভারত-বিভাগের মতো দূরবর্তী বিষয় নিয়ে। বরং তিনি যদি একাত্তর নিয়ে কিছু বলতেন, তাহলে হয়তো নতুন কিছু জানা যেত, বোঝা যেত, যা আগে জানা-বোঝার সুযোগ পাই নি।

কিন্তু তিনি ভারত-বিভাগ নিয়েই বলে চললেন আরও অনেক কথা। মুসলিম লীগের অনেক সমালোচনা করলেন, কিন্তু গিয়ে শেষে দোষারোপ করলেন নেহরুকে; বললেন, ‘অখণ্ড ভারতের বুকে চূড়ান্ত কোপটা মেরেছিলেন জওহরলাল।’

আমি যেন একটু চমকে উঠলাম, রূপিন্দরের কথা মনে পড়ল। মস্কোতে এ নিয়ে ইমতিয়াজের সঙ্গে ওর ঝগড়া লাগার উপক্রম হতে যাচ্ছিল, কিন্তু ইমতিয়াজ হেসে মাফ চেয়ে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গিয়েছিল বলে তা ঘটে নি। রূপিন্দরের মতো আমিও জানতাম ভারত বিভাগের জন্য মুসলিম লীগই দায়ী। আমার ভাসা ভাসা ধারণা, এর মূল হোতা ছিলেন জিন্না।

‘খেয়াল করো,’ আমাকে বললেন তাহমিদুল হক, যেন-বা আমি তার সমসাময়িক, দেশবিভাগের সময়কার রাজনৈতিক ঘটনাবলির প্রত্যক্ষদর্শী, ‘ক্যাবিনেট মিশনের পরিকল্পনায় জিন্না ও মুসলিম লীগ শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছিল। কংগ্রেস অনেক কষ্টে তাদের রাজি করিয়েছিল। জিন্না যে খুশি মনে রাজি হয়েছিলেন তা নয়। এর চেয়ে ভালো কিছু পাওয়া যায় নি বলেই রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু সব পয়মাল করলেন জওহরলাল, হুট করে এক বিবৃতি দিয়ে বসলেন যে কংগ্রেস প্রয়োজনে ক্যাবিনেট মিশনের পরিকল্পনা রদবদল করবে। ব্যাস, জিন্না বেঁকে বসলেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি আবার নতুন করে তুললেন। ভারত ভাঙার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল মুসলিম লীগ। জওহরলাল সেই সুযোগ তাদের হাতে ধরিয়ে দিলেন। আমি আজও বুঝে উঠতে পারলাম না, এটা জওহরলালের নির্বুদ্ধিতা ছিল, নাকি শয়তানি ছিল।..’

আমি এক ফাঁকে একাত্তরের প্রসঙ্গ তুললাম। পরিহাসের মতো এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠল তার চোখেমুখে। বললেন, ‘দ্যাখা বেটা, যে পাকিস্তান আমি মোটেও চাই নি, সেই পাকিস্তান যেন টিকে থাকে, যেন ভেঙে না যায় সে জন্য কত কিছুই না করলাম। জেল পর্যন্ত খাটলাম, প্রাণপ্রিয় লাহোর ছেড়ে এই বিদঘুটে করাচি শহরে চলে আসতে বাধ্য হলাম।’

‘ইমতিয়াজের কাছে শুনেছি আপনাদের সেই পত্রিকার কথা।’ আমি বললাম।

‘মার্চের আঠাশ তারিখে আমরা একটা সম্পাদকীয় লিখেছিলাম, ঢাকায় আর্মি অ্যাকশানের সমালোচনা ছিল তাতে। খুব কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয় নি। কিন্তু ভাষার সুরে তো কিছু এসে যায় না। আর্মি আমাদের পত্রিকার অফিসে চড়াও হলো। ধরে নিয়ে গেল আমাকেসহ আরও তিনজনকে। সম্পাদক তখন অফিসে ছিলেন না। তাকে ধরতে পারে নি। পরদিন থেকে পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হলো। আমাদের পাঠানো হলো কারাগারে। কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজও আমাদের মতামতের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু উনি বিখ্যাত লোক, উনাকে ধরে নি। আই এ রেহমানের নাম শুনেছ কি? উনি আমাদের সহকর্মী ছিলেন। উনাকে আর্মি খুঁজে পায় নি।’

‘আপনারা সাংবাদিক, বাংলাদেশে পাকিস্তানি আর্মি কেমন নৃশংসতা চালাচ্ছিল তা জানতে পারছিলেন। কিন্তু এখানকার সাধারণ মানুষের মনোভাব কেমন ছিল? তারা কি সব খবর জানতে পাচ্ছিল?’

‘না। তারা খবর পাচ্ছিল না। তা ছাড়া আগে থেকেই একটা হোস্টাইল মনোভাব তৈরি হচ্ছিল। ইস্ট পাকিস্তানে আনরেস্ট বেড়ে উঠলে এখানকার জনসাধারণের ধারণা হয়েছিল, ওসব হচ্ছে ভারতের ইন্ধনে। ভারত পাকিস্তানকে ভাঙতে চায়। শেখ সাহেব ও তার দলকে ভারত ব্যবহার করছে। তারা ইস্ট পাকিস্তানের অবাঙালিদের মারছে। এখানকার মেইনস্ট্রিম মিডিয়া তো সামরিক জান্তাকেই সার্ভ করছিল। আমরা বললাম, শেখ সাহেবের দল মাত্র দুটো বাদে সবগুলো আসনে জয়ী হয়েছে, সুতরাং সবকিছু হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক পন্থায়। নির্বাচন দিলাম, লোকে ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করল, এখন আমরা সেটা মানব না, অ্যাসেমব্লি ডাকব না, ডেকে আবার বাতিল করে দেবো—এভাবে তো কোনো ফয়সালা হওয়ার নয়। কিন্তু এরা ভাবল বল প্রয়োগ করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, বাঙালি সোজা হয়ে যাবে। কী মূর্খ আর অদূরদর্শী! যে দিন রাতে ঢাকার রাস্তায় ট্যাংক নামিয়ে দিল, সে দিনই আমরা বুঝে ফেললাম যে সব শেষ। পাকিস্তানের দফা রফা। পাকিস্তান আর টিকবে না। নিজের দেশের নিরীহ লোকজনকে এইভাবে কেউ মারে? কিছুদিন আগে এক পত্রিকায় নিয়াজির এক সাক্ষাৎকার পড়লাম, উনি এখনও বলছেন, যুদ্ধে তার বাহিনী জিতত। কত্ত বড় বেয়াকুফ! একটা ভূখণ্ডের পুরো জনগোষ্ঠীকে তোমরা হোস্টাইল করে ফেলেছ, ওখানে তুমি কাকে মেরে যুদ্ধে জিতবে? কতজনকে মারবে? হাজার মাইল দূরের সেই ভূখণ্ডে গিয়ে কতদিন ধরে তুমি যুদ্ধ করবে? আর যুদ্ধ করে তুমি করবেই বা কী? ওখানকার পথের ভিখারিটাকেও তুমি শত্রু বানিয়ে ফেলেছ। ইন্ডিয়া যদি তোমাদের মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য না-ও করত, তবু নিয়াজির বাহিনীর পক্ষে ওই যুদ্ধে চূড়ান্তভাবে জেতা সম্ভব ছিল না। কারণ ওটা ছিল একটা জনযুদ্ধ। কোনো জনযুদ্ধেই বহিরাগত কোনো বাহিনী শেষ পর্যন্ত জিততে পারে না।’

আমি বললাম, ‘পাকিস্তানি আর্মি সেটা বুঝতে পারে নি কেন?’

তিনি বললেন, ‘বেয়াকুফ আর শয়তান ছিল সব। ইয়াহিয়া, নিয়াজি, ভুট্টো সবগুলি ছিল শয়তান।’

এর মধ্যে ইমতিয়াজ এসে আমাকে বলল, ‘মেজর চাচার সঙ্গে দেখা করতে চাও? তাহলে চলো, এই ফাঁকে ঘুরে আসি। পরে আর দেখা হবে না, চাচা কাল সকালে লাহোর যাচ্ছেন।’

আমি ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘তাহলে এক্ষুনি চলো। উনার সঙ্গে দেখা না হলে আমার এই সফর তো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে!’

ইমতিয়াজের বাবা বললেন, ‘কিন্তু ডিনারটা এখানেই করবে, কেমন?’ ইমতিয়াজের দিকে চেয়ে বললেন, ‘ওরা খেয়ে আসার জন্য পীড়াপীড়ি করলে বলো, মা এখানে রান্নাবান্না করেছেন।’

ইমতিয়াজ তার বাবাকে আশ্বস্ত করে আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। পায়ে হাঁটা পথ, পাঁচ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম ইমতিয়াজের সেই সেই চাচার বাসায়, যার কথা মস্কোতে সে আমাকে বলেছিল। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন মেজর হিসেবে একাত্তরের পুরোটা সময় পূর্ব পাকিস্তানে দায়িত্বরত ছিলেন।

পরিচয়ের পরেই তিনি আরম্ভ করলেন জুলফিকার আলি ভুট্টোর মুণ্ডুপাত: ‘এ ভিশাস পলিটিশিয়ান হি ওয়াজ! সাচ এ শ্রুড, দ্যাট হি ফুল্ড দ্য হোল পাকিস্তান আর্মি!’

‘ইয়াহিয়ার কোনো দোষ ছিল না?’ আমি বললাম।

‘পাগল আর মদ্যপের দোষ ধরতে নেই, বাছা!’ হাসতে হাসতে বলেন প্রাক্তন মেজর সাহেব।

‘কিন্তু আপনারা কী করেছিলেন? আপনারা, যারা অফিসার ছিলেন?’

‘আর্মি চলে কম্যান্ড সিস্টেমে। আমরা ছিলাম হুকুমের দাস।’

‘নির্বিচারে নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষ মারার হুকুম পালন করছিলেন দাসের মতো?’

‘একাত্তরে তোমার বয়স কত ছিল?’ একটু তির্যক মনে হলো তার কণ্ঠ।

‘ছয়।’ আমি অপ্ররোচিত থাকার চেষ্টা করলাম।

‘ছয় মাস, না ছয় বছর?’

‘ছয় বছর।’

‘অল দ্য সেইম। ইউ হ্যাভবিন ব্রট আপ উইথ মিথস অ্যান্ড লেজেন্ডস অ্যাবাউট সেভেন্টি ওয়ান, মাই বয়!’

‘ইউ আর রং, আঙ্কেল।’

‘ওয়েল, হোয়াট ডু ইউ নো?’

‘ইউ কিল্ড, জাস্ট ম্যাসাকারড ইনোসেন্ট পিপল।’

‘হাউ মেনি? থ্রি মিলিয়ন?’

‘ইউ টেল মি হাউ মেনি।’

‘নট ইভেন হাফ এ মিলিয়ন, আই থিংক।’

‘ইউ থিংক? হাহ্!’

আমার কণ্ঠে ও চোখমুখের অভিব্যক্তিতে সম্ভবত তীব্র ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ল। প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি এবার চুপ মেরে গেলেন। গভীর মনোযোগের সঙ্গে চেয়ে রইলেন আমার মুখের দিকে। তার পর ধীরে ধীরে বললেন, ‘আফটার অল ওটা ছিল একটা যুদ্ধ। তুমি তো জান, যুদ্ধ মানে কী। শত্রুকে মারার সর্বাত্মক চেষ্টা। বাঙালি গেরিলা ফাইটারস ট্রাইড দিয়ার বেস্ট, দি ইন্ডিয়ানস ট্রাইড দিয়ার বেস্ট, টু কিল অল অফ আস। দ্য হোল টেরিটোরি অফ ইস্ট পাকিস্তান বিকেম এ ডেথ-ট্র্যাপ, এ ডেডলি কগ্মায়ার ফর আস…!’

‘অ্যান্ড ইউ সাকসিডেড টু কিল থ্রি মিলিয়ন! অর হাফ এ মিলিয়ন, ইন ইউর এস্টিমেট?’ আমার কণ্ঠে তীব্র শ্লেষ।

‘তোমাদের লোকেরাও কিন্তু কম মারে নি, বেটা! অবাঙালিদের মেরে কচুকাটা করেছিল। আমি প্রথমে যে-এলাকায় ছিলাম, সেখানে আমাদের কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিল সাধারণ লোকেরা। তাদের ঘরবাড়ি লুট হয়ে যাচ্ছে, মেয়েদের ধরে নিয়ে রেপ করছে, শিশুদের মারছে। ওরা এসে বলল, আমাদের বাঁচান স্যার, শেখের লোকেরা আমাদের শেষ করে ফেলল।’

‘কোথায় এটা? কোন এলাকায়?’

‘সারা ইস্ট পাকিস্তানেই, যেখানে যেখানে অবাঙালি ছিল। আমি প্রথম দিকে ছিলাম রংপুর ক্যান্টনমেন্টে। বাঙালিদের অত্যাচারে সাধারণ অবাঙালিরা এসে আমাদের অনুরোধ করতে লাগল, আপনারা আসেন স্যার, আমাদের বাঁচান।’

‘কোথা থেকে তারা এসেছিল?’

তিনি উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘তুমি খোঁজ নিয়ে দেখো, চিটাগাঙে কী হয়েছে, খুলনায় কী হয়েছে, নওগাঁ, সান্তাহার, ফুলবাড়ি, সৈয়দপুর, পাবর্তীপুরের দিকে কী হয়েছে.., সব জায়গার নাম এখন আমার মনেও নেই।’

আমি বললাম, ‘ওসব ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বিরোধ-সংঘাত। কিন্তু আপনারা তো ছিলেন রাষ্ট্রীয় বাহিনী। একটা নিয়মিত সামরিক বাহিনীর সশস্ত্র লোক; আপনারা কেন নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিলেন?’

‘গণহত্যা? এটা তোমাদের ভুল ধারণা।’

‘পঁচিশে মার্চের রাতে ঢাকায় আপনারা যা করেছিলেন, সেটা গণহত্যা ছিল না?’

‘তা আমি বলতে পারব না। আমি তখন ঢাকায় ছিলাম না।’

‘ব্যক্তিগতভাবে আপনার কথা তো বলছি না। আপনাদের পুরো বাহিনী…।’

‘আমি তো তোমাকে বলেছিই, ভুট্টো সাহেব গোটা আর্মি লিডারশিপকে বোকা বানিয়েছিলেন। আমাদের বসেরা ডিস্টারবিং এলিমেন্টগুলোর ওপর হঠাৎ প্রচণ্ড একটা আঘাত হেনে স্তম্ভিত, আতঙ্কিত করে দিতে চেয়েছিলেন। শক অ্যান্ড অ স্ট্র্যাটেজি। তারা ভেবেছিলেন, মার দিলেই সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু ওটা একটা ভুল স্ট্র্যাটেজি ছিল। মারাত্মক ভুল। কিন্তু এমন দুয়েকটি ঘটনা ছাড়া, নিয়মিতভাবে যখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল, তখন ম্যাস কিলিং যেটা তোমরা বলে থাক, সে রকমটা হয় নি। আমি যতদূর জানি।’

‘সারা বাংলাদেশ জুড়ে শত শত গণকবর আছে। এখনও অনেক গণকবর অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।’

‘পাঁচ-দশটা লোককে একটা গর্তের মধ্যে কবর দিলেই সেটাকে গণকবর বলা যায় না। তা ছাড়া ওই সব গণকবরে তুমি অবাঙালিদের হাড়গোরও পাবে। অবাঙালিদের মেরে মেরে কুয়ো ভর্তি করা হয়েছে।’

‘কিন্তু একটা কথা বলেন তো, রক্তপাত শুরু করেছিল কারা? বাঙালি-অবাঙালি যাই বলেন, এত এত নিরীহ সাধারণ মানুষের মৃত্যুর প্রধান দায়টা কার?’

‘প্রথমত ভুট্টোর, তারপর ইয়াহিয়ার। নিয়াজি-টিক্কা খানদের হিসাবেই নিলাম না। ওরা ছিল হুকুমের দাস। আমরা অফিসার ও জওয়ানরাও। আফটার অল আর্মি চলে কম্যান্ড সিস্টেমে।’

‘কিন্তু আপনার কি খারাপ লাগে না? সেসব রক্তপাতের ঘটনাগুলো মনে পড়লে খারাপ লাগে না?’

ভদ্রলোক একটা লম্বা শ্বাস ফেললেন। তারপর নীরব হয়ে গেলেন।

এবার আমার খারাপ লাগতে শুরু করল : আমি এখানে অতিথি, সৌজন্য বলে একটা ব্যাপার তো আছে। আমার কর্কশ কথাবার্তা ও বিরূপ অভিব্যক্তি স্বাভাবিক সৌজন্যের সীমা পেরিয়ে একটা তিক্ত পর্যায়ে চলে গেছে। এখন আমার একটু সংযত হওয়া উচিত।

হঠাৎ আমার ভিতরে এক ধরনের অস্বস্তি শুরু হলো। ইচ্ছে হলো ভদ্রলোকের সামনে থেকে দ্রুত চলে যাই। আমাদের আলাপের মাঝখানে ইমতিয়াজ উঠে বাড়ির ভিতরে চলে গেছে; আমি তার সন্ধানে একবার অন্দরমহলের দিকে তাকালাম। প্রাক্তন মেজর সাহেব সেটা লক্ষ করলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, ‘ইমতিয়াজ কি তোমাকে আমার ছেলেটার কথা বলেছে?’

আমি কিছু বুঝতে পারলাম না। চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকালাম তার দিকে।

তিনি বললেন, ‘আমার একটা ছেলে আছে। সে বাঙালি।’

‘মানে?’ আমি আকাশ থেকে পড়লাম।

‘তোমার বাড়ি বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে?’

‘নর্থবেঙ্গলে, কেন?’

‘সেপ্টেম্বরের দিকে আমার পোস্টিং ছিল ফরিদপুরে। একটা নদীর তীরে ছিল আমাদের ক্যাম্প। ভাটিয়াপাড়া ক্যাম্প, নদীটার নাম মধুমতি। নদী দিয়ে স্পিডবোটে করে এক বিকেলে যাচ্ছি.., আমরা বের হলেই আশেপাশের গ্রামের মানুষেরা ভয়ে পালাতে আরম্ভ করত…।’

‘কারণ আপনারা নির্বিচারে গুলি ছুড়তেন, ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিতেন, লোকজনকে লাইন করে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে পাখির মতো মারতেন..।’

‘দাঁড়াও বেটা, দাঁড়াও! মাথা ঠান্ডা করে একটু মন দিয়ে শোনো!’

আমি চুপ করলাম।

মেজর সাহেব বলে চললেন, ‘সেপ্টেম্বরের এক বিকেলে কয়েকজন সোলজার সঙ্গে নিয়ে স্পিডবোটে নদীর উজানের দিকে যাচ্ছি। জাস্ট দেখতে। একটা গ্রামের পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখি, নদীর খাড়া পাড়ে একটা ভাঙা বাড়ির উঠান থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে বেরিয়ে আসছে দুই-আড়াই বছরের একটা বাচ্চা ছেলে। সম্পূর্ণ উলঙ্গ, কোমরে শুধু একটা কালো সুতা বাঁধা। ছেলেটার হাতে একটা সেদ্ধ ডিম, ডিমটা মনে হয় তখনও গরম ছিল, সে একবার সেটা এক হাতে নিচ্ছে, আবার অন্য হাতে নিচ্ছে, আর ফুঁ দিচ্ছে। এই করতে করতে সে এসে একদম নদীর কিনারে দাঁড়াল, তারপর আমাদের স্পিডবোট দেখে অবাক হয়ে চেয়ে রইল, তার হাত থেকে ডিমটা পড়ে গেল। আমি সিপাইদের বললাম, ওকে ধরে নিয়ে এসো। সৈন্যরা সঙ্গে সঙ্গে স্পিডবোট পাড়ে ভেড়াল, ছেলেটা অবাক হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। সারা গ্রামের সমস্ত মানুষ পালিয়ে গেছে, বাড়িটার উঠানে একটা হাঁসমুরগি পর্যন্ত নেই। শুধু বাচ্চা ছেলেটার কথাই ভুলে গেছে সবাই। আমার সোলজাররা ওকে ধরে নিয়ে স্পিডবোটে তুলল। তখন সে কান্না শুরু করে দিল।’

ভদ্রলোক থামলেন।

আমি বললাম, ‘আপনি ওকে এখানে নিয়ে এলেন?’

‘আমার কি তখন চলে আসার উপায় ছিল? পাঠিয়ে দিলাম।’

‘কেন?’

‘আমার কোনও সন্তান ছিল না।’

‘সে এখন কোথায়?’

‘লন্ডন। ব্যারিস্টারি পড়তে গেছে।’

‘ওর এই সব কিছু মনে আছে?’

‘না। ওর বয়স ছিল মাত্র দুই কি আড়াই বছর।’

‘পরে ওকে বলেছেন সব কথা?’

‘এখনও বলা হয় নি।’

‘বলবেন?’

‘বলব। আগে ওর পড়াশোনা শেষ হোক।’

‘সব কিছু শোনার পর ও যদি বাংলাদেশে ফিরে যেতে চায়?’

‘যদি বলছ কেন? অবশ্যই যেতে চাইবে, এবং যাবে। আমরা কেন তাকে ধরে রাখব?’

‘পরেও আপনাদের কোনো ছেলেমেয়ে হয় নি?’

‘না।’

আমার একটুও বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না যে প্রাক্তন মেজর সাহেব চুরি করে নিয়ে যাওয়া বাঙালি ছেলেটাকে কোনোদিন সত্য কাহিনিটা বলবেন। হয়তো আমাকেও বলতেন না, আমার কথার ফাঁদে পড়ে, নিজের মহত্ত্ব দেখাবার লোভে আগুপিছু কিছুই চিন্তা না করে বলে ফেলেছেন। বলেছেন বলে পরে নিশ্চয়ই পস্তাবেন এবং মনে মনে বিপদ গুনবেন এই ভেবে যে ইমতিয়াজের মাধ্যমে আমি কোনোভাবে সেই ছেলেটার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে সব সত্য কথা বলে দেবো।

ইমতিয়াজের সঙ্গে এক বছর ধরে একই ঘরে থাকি, কত কথাই না সে আমাকে বলেছে, কিন্তু গল্প-উপন্যাসের চেয়েও নাটকীয় এই ঘটনার কথা সে আমাকে ভুলেও কোনো দিন বলে নি। কেন?

ওই দিন রাতেই সে-কথা আমি ইমতিয়াজকে জিজ্ঞাসা করি।

সে অভিনয় করে: ‘ও হো, তাই তো! তাই তো! বলি নি কেন!’


ফারহানা

ভূ-ভারতে এমন সুন্দর মেয়ে থাকতে পারে এ আমার কল্পনায়ও ছিল না। সুন্দরীরা সব জড়ো হয়েছে মস্কোতে : রুশি, উক্রেনীয়, বেলারুশ সুন্দরীদের রকম-সকমই আলাদা। লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান, ইয়েমেন, পেরু, বলিভিয়া, একুয়েডরের সুন্দরীরাও একেকটা বিস্ময়! তাকালেই মাথা ঘুরে যায়, সরে যায় পায়ের তলার মাটি। কিন্তু তাই বলে পাকিস্তানে! পোড়-খাওয়া তামাটে চামড়ার ইমতিয়াজের বোন যে আরমেনিয়ার শ্রেষ্ঠ রূপসীকেও লজ্জা দিতে পারে, খোদার কসম, আমি স্বপ্নেও ভাবি নি।

মস্কোতে ইমতিয়াজ আমাকে বলেছিল তার একটা ছোট বোন আছে, সে করাচির এক কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ে। রুশ সাহিত্যের পণ্ডিত পুশকিন থেকে শুরু করে পাস্তেরনাক পর্যন্ত সব পড়ে শেষ করেছে। বুলগাকোভকে নিয়ে অনর্গল বক্তৃতা করতে পারে। কিন্তু ওর সম্পর্কে আসল সত্যটাই সে আমাকে বলে নি : তার ছোট বোনটি আসলে এক পাঞ্জাবি অপ্সরা!


সুন্দরীরা জ্ঞানের কথা বললে নিজেকে আমার খুব দুর্বল মনে হয়।


ফারহানাকে প্রথম দেখলাম ডিনারের টেবিলে। কাঁধ পর্যন্ত ঘন মিশকালো চুল, লম্বাটে মুখমণ্ডল, টিকোল নাক, কাটা কাটা ঠোঁট, জ্বলজ্বলে বড় বড় চোখ। ওর রঙ ও রূপের বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করা অর্থহীন, কারণ ওটা আমার সাধ্যের অতীত। বরং বলা যেতে পারে ওর বিস্ময়কর অসঙ্কোচ, সপ্রতিভ ভাবভঙ্গি, কথাবার্তা ও জ্ঞানগম্যির কথা। আমার সঙ্গে এমনভাবে আলাপ শুরু করল যেন, আমাদের পরিচয় অনেক দিনের।

প্রথমেই আমাকে জিগ্যেস করল: ‘হোয়াট ইজ রিয়েলি গোয়িং টু হ্যাপেন উইথ সোভিয়েত সিস্টেম?’

আমি ভড়কে গেলাম : সুন্দরীরা জ্ঞানের কথা বললে নিজেকে আমার খুব দুর্বল মনে হয়। আমি জ্ঞানী লোক নই; কিন্তু যেটুকু বিদ্যাবুদ্ধি আমার আছে বলে বিশ্বাস করি, তাতেও জীবনে কোনো রূপসীর মুখে বুদ্ধিদীপ্ত একটি কথাও শুনি নি, ফলে তাদের মোকাবিলা করতে অসুবিধা হয় নি।

কিন্তু ফারহানা একই সঙ্গে রূপসী ও বুদ্ধিমতী : এটা বড়ই বিপদের কথা। কী কথায় আমার বিদ্যাবুদ্ধির ঘাটতি ধরা পড়ে যায় কে জানে।

ফারহানার আক্রমণ থেকে আমাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এল ইমতিয়াজ। বোনের দিকে চেয়ে সে ঠাট্টার সুরে বলল, ‘খেতে বসে জ্ঞানের আলাপ করতে নেই। বদহজম হয়ে যাবে।’

ফারহানা মৃদু হাসল। ওদের বাবার মুখেও হাসির আভাস দেখা গেল। তিনি আমার দিকে চেয়ে বললেন, ‘তোমাদের কী মনে হয়? আসলে কোন দিকে এগোচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন?’

ইমতিয়াজ বলল, ‘দেখা যাক।’

ফারহানা আমার দিকে তাকাল : ‘হোয়াট ডু ইউ সি?’

আমি বললাম, ‘ঠিক বুঝতে পারি না। একবার মনে হয়, সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। আবার মনে হয়, না, একেবারে সব শেষ হয়ে যাবে না। সব কিছুর পরেও সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকে থাকবে।’

ফারহানা বলল, ‘এই শেষের কথাটা কিন্তু তোমার অবজারভেশন না, উইশফুল থিংকিং। সোভিয়েত সিস্টেম ফেইল করলে তুমি কষ্ট পাবে, সেজন্য তুমি বিশ্বাস করতে চাও না যে সেটা ঘটবে।’

‘লুক, হিয়ার কেম লেডি অ্যারিস্টোটল!’ টিটকারি ছুড়ে দিল ইমতিয়াজ।

ফারহানা ভাইয়ের দিকে চেয়ে চোখ পাকাল, হাসল, তারপর বলল, ‘কিন্তু সোভিয়েত সিস্টেম আর টিকবে না, আমরা কেউ চাই বা না চাই..।’

১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে করাচিতে ফারহানা যখন এই কথা বলেছিল, তখনও গর্বাচভের বিরুদ্ধে ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটে নি। কিন্তু তার ছয় মাসের মাথায় যে সে-ঘটনা ঘটে যাবে, এবং তার মাত্র তিন মাস পরেই যে পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিলয় ঘটবে এই দিব্যজ্ঞান ফারহানা কোথায় পেয়েছিল কে জানে।

তার চেয়ে বড় বিস্ময়ের কথা, সোভিয়েত ইউনিয়নের ধ্বংসস্তূপের ওপর টলোমলো পায়ে ধুঁকছিল যে পুঁজিবাদপ্রত্যাশী রাশিয়া, মদ্যপ ইয়েলৎসিনের হাতে পড়ে সর্বব্যাপী সঙ্কটে যার দশা-বিপর্যয়, সেই দেশের রাজধানীতেই গিয়ে হাজির হয়েছিল ফারহানা, ১৯৯২ সালের আগস্ট মাসে, রুশ সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার উদ্দেশ্যে।

আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির ফলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া বৃত্তির অর্থ কানাকড়িতে পরিণত হয়েছে এবং আর্থিক সঙ্কটে আমাদের অনাহারী দশা। চোরাকারবারি বন্ধুদের বদান্যতায় কোনোমতে দিনগুজরান।

সেই হাহাকারের মধ্যে ফারহানাকে মস্কোতে পেয়ে আমার ধড়ে প্রাণ ফিরে আসে; আমি তার প্রেমে পড়ে যাই। কিন্তু সে-কথা তাকে জানানোর সাহস জোটে না; একতরফা গোপন প্রেম গুমরে মরতে থাকলে তীক্ষ্ণধী ফারহানা টের পেয়ে যায় এবং অকপটে আমাকে এই কথাগুলো বলে : ‘আমাদের খানদানে মেয়েদের বিয়ে হয় কাজিনদের সঙ্গে। বাবা-চাচারা কমিউনিস্ট হলে কী হবে, চৌদ্দপুরুষের বাঁধা নিয়মের বাইরে পা রাখার মতো বিপ্লবী তারা হতে পারে নি। তাছাড়া থিওরিটিক্যালি ডিক্লাসড হও আর যাই হও, ফিউডাল হেরিটেজের গৌরব মনের গভীরে কাজ করেই চলে। নইলে এই সোভিয়েতরা কেন জারদের আমলের সব হেরিটেজ রক্ষা করতে কোটি কোটি রুবল খরচ করে মিউজিয়ামগুলো মেনটেইন করেছে সত্তর বছর ধরে? ক্লাস কনশাসনেসের কথা বলে কেন তারা সব ধ্বংস করে ফেলে নি? ফ্যামিলি লেভেলেও ওই একই মেন্টালিটি কাজ করে। তুমি খেয়াল করো দেখো, সত্যিকারের কমুনিস্ট বলতে যা বোঝায়, মানে আগাপাশতলা ডিক্লাসড, তারাও খানদানের আভিজাত্যের মোহ থেকে বের হতে পারে না। মেজর চাচার একটা ছেলে আছে, তুমি শুনেছ নিশ্চয়? লন্ডন গেছে পড়াশোনা করতে। ও আমাকে খুব পছন্দ করে। কিন্তু আমি জানি ওর সঙ্গে আমার বিয়ে হবে না। কারণ ওর শরীরে আমাদের খানদানের রক্ত নেই। ও বাঙালি। ’

আমি অবাক : ‘তুমি কী করে জান? তোমার জন্ম কবে?’

‘আমি সব জানি।’

‘ছেলেটা কি জানে যে সে বাঙালি?’

‘জানে। কিন্তু ও যে জানে, এটা আমি ছাড়া আমাদের বংশের কেউ জানে না।’

‘ও কিভাবে জানতে পেল?’

‘আমি ওকে বলেছি।’

‘তুমি কার কাছে শুনেছ?’

ফারহানা আমার এই জিজ্ঞাসা মেটায় নি।

১৯৯৩ সালের আগস্টে মস্কোর পাট চুকিয়ে দেশে ফিরে এলাম। ইমতিয়াজ ও ফারহানার সঙ্গে সব যোগাযোগ চিরতরে ছিন্ন হয়ে গেল।


আলফাডাঙা ২০০৩

‘মজার একটা গল্প বলি আপনাকে,’ মধুমতির তীরে বসে মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা নিয়ে গল্প করতে করতে হঠাৎ বললেন হুমায়ুন কবির, সাবেক নৌ-কমান্ডো, মুক্তিযুদ্ধের সময় মংলা-সুন্দরবন এলাকায় বুকে লিমপেড মাইন বেঁধে মাইলের পর মাইল গোপনে সাঁতরে গিয়ে বিদেশি জাহাজ ডুবানো ছিল যার প্রধান কাজ। ১৯৯৬ সালে, যখন দৈনিক ভোরের কাগজে কাজ করি, মুক্তিযুদ্ধে নৌ-কমান্ডোদের নিয়ে একটি ফিচার লেখার সুবাদে পরিচয় ঘটে তার সঙ্গে। তারপর গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। আমি তার গ্রামে মাঝেমাঝেই যাই। তার গল্প শুনি: তিনি চান আমি তার কাহিনিগুলি লিখি।

২০০৩ সালে তিনি আমাকে এই কাহিনি বললেন।

‘পানাইল বাজারে এক ছেলে আসছে, বাংলা বলতে পারে না, উর্দু বলে আর ইংলিশ বলে। সে ভ্যানগাড়ির উপরে দাঁড়ায়ে আছে, ভ্যানগাড়িতে মাইক লাগান। সে বলে দিচ্ছে, আর এক লোক মাইকে বলতেছে, যুদ্ধের সময় কার ছেলে হারায়ে গেছে, প্রমাণ দিয়ে ছেলেকে নিয়ে যান।

‘তিন চার দিন ধরে পানাইল বাজার, আলফাডাঙা বাজার সব জায়গায় মাইকিং করে। অনেক লোকে যায়, দেখে কিন্তু প্রমাণ মিলে না। তারপর একদিন এক লোক ওই ছেলেকে দেখে কাছে আগায়ে যায়, হালকা-হালকা চিনতে পারে। ছেলেকে বলে, তুমি আমাদের ইমরান না? ছেলে বলে, প্রমাণ কী? তখন ওই লোক এক মহিলাকে নিয়ে আসে। মহিলা তাড়াতাড়ি ছেলের জামার পিছন দিক টান দিয়ে তুলে দেখে পিঠের মধ্যে একটা দাগ। দেখেই সে ছেলেকে জড়ায়ে ধরে কান্না, আমার ইমরান, এইটা আমার ইমরান। ছোটবেলায় নাকি বটির উপর পড়ে গেছিল, সেই কাটার দাগ। তখন ছেলেটা বুঝল, এটাই তার মা। বাড়িতে গেল। তার ছয়টা বোন, একটা ভাই। খুব গরিব। বাবা মারা গেছে..।’

বহু বছর পর আমার মনে পড়ে গেল ইমরান, ফারহানা, তাদের বাবা, এবং বিশেষ করে মেজর চাচার কথা। প্রাক্তন মেজর সাহেব আমাকে বলেছিলেন ফরিদপুর, মধুমতি নদীর কথা। অবিশ্বাস্য, অলৌকিক মনে হলো।

‘ওই যে ওদিকে,’ নদীর ভাটির দিকে হাত দিয়ে দেখিয়ে বলেন হুমায়ুন, ‘ভাইট্টাপাড়ায় ছিল পাকিস্তানি আর্মির বিরাট ক্যাম্প। ছেলেটা পরে তার মাকে বলিছে সব কাহিনি। সে বড় হইছে পাকিস্তানের করাচি শহরে। লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে আসিছে…।’

হুমায়ুন কবিরের পরের কথাগুলো আমার কানে আর ঢুকতে পারে না, মনে হয় কাহিনির বাকি অংশটা আমার জানা। মেজর সাহেব, মেজর ফাহমিদ উল হক, আমাকে বলেছিলেন যে তিনি তার বাঙালি ছেলেটাকে সব বলবেন, ছেলেটা চাইলে তিনি তাকে স্বদেশে সত্যিকারের মা-বাবার কাছে ফিরে যেতে দেবেন, জোর করে ধরে রাখবেন না।

‘এক পাকিস্তানি আর্মি অফিসার ইমরানকে নিয়ে গেছিল।’ বলে চললেন হুমায়ুন কবির, ‘ওই ভাইট্টাপাড়ায় ছিল তাদের ক্যাম্প। একদিন ওদের গ্রামে পাকবাহিনী হামলা করিছে, সব লোক পালায়ে গেছে, খালি ওই ছোট্ট বাচ্চাটা ছাড়া পড়িছে। পরে সবাই বাড়ি ফিরে আর বাচ্চারে পায় নাই। সবাই মনে করিছে নদীতে পড়ে গেছে ছেলেটা। পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করিছে। জেলেদের বলে রাখিছে, একটা বাচ্চা ছেলের লাশ পাওয়া গেলে যেন নিয়ে আসে। কিন্তু পাওয়া যাবে কিভাবে? আর্মি অফিসারটার বউয়ের কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয় না, তাই পাকিস্তান নিয়ে গেছে। নিজের ছেলের মতন করে মানুষ করিছে। অনেক ধনী লোক, কয়েকটা নাকি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিক, আরো কী কী সব ব্যবসা আছে। বুড়া হয়ে অসুস্থ হইছে, একদিন ছেলেকে কাছে ডেকে নিয়ে বলিছে, বাবা, এই হচ্ছে সত্য ঘটনা, ডায়রি বার করে জায়গার নাম বলিছে, নদীর নাম বলিছে, সব কিছু বলিছে। এখন তুমি যাও, মা-বাবার খোঁজ করো, আমি তো আর বেশিদিন নাই..।’

‘ছেলেটা এখন কোথায়?’ আমি জিগ্যেস করলাম।

‘আবার চলে গেছে পাকিস্তান।’

‘কতদিন ছিল এখানে?’

‘বেশি না, দিন সাতেক। ভাঙা ঘরবাড়ি, আর সে করাচি শহরে ধনী ঘরে বড় হইছে, এখানে থাকে কিভাবে? বাড়িতে টয়লেট-বাথরুম নাই..। যাওয়ার সময় কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে গেছে।’

‘কতদিন আগের ঘটনা এটা?’

‘তা বছর দুয়েক হবে।’

‘তারপর আর আসে নি?’

‘না। সেই যে চলে গেছে, তারপর আর কোনো খোঁজ-খবরই নাই।’

‘কী বলে গিয়েছিল?’

‘বলে গেছিল ছয় মাস পরেই আবার আসবে। কিন্তু আর আসে নি। মা বুড়ি হয়ে গেছিল, অনেক অসুখ-বিসুখে ভুগে মারা গেছে গত বছর। কিন্তু সেই ছেলে অত সয়সম্পত্তির মায়া ত্যাগ করে কি আর আসে?’

হুমায়ুন থামলেন।

মাঘের শীর্ণ মধুমতির বুক থেকে শীতল বাতাসের ঢেউ বয়ে এল বিস্তীর্ণ বালুচরের উপর দিয়ে। মেজর সাহেবের মুখটা মনে পড়ল। তিনি কি আজও বেঁচে আছেন?

ফারহানা এখন কোথায়? কার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে ওর?

মশিউল আলম

জন্ম ১৫ জুলাই, ১৯৬৬; জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই :
গল্পগ্রন্থ—
১. রূপালী রুই ও অন্যান্য গল্প [সাহানা, ১৯৯৪]
২. মাংসের কারবার [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০২]
৩. আবেদালির মৃত্যুর পর [ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০০৪]
৪. পাকিস্তান মাওলা ব্রাদার্স [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১১]

উপন্যাস—
১. আমি শুধু মেয়েটিকে বাঁচাতে চেয়েছি [মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৯]
২. তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত [মাওলা ব্রার্দাস, ২০০০]
৩. নাবিলাচরিত [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০১]
৪. ২০৯৯ [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ২০০১]
৫. ঘোড়ামাসুদ [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৫]
৬. প্রিসিলা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০১]
৭. বাবা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৯]
৮. বারে বারে ফিরে আসি [জনান্তিক, ২০১১]
৯. জুবোফস্কি বুলভার [প্রথমা, ২০১১]
১০. দ্বিতীয় খুনের কাহিনি [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৫]
১১. কাল্লু ও রেজাউলের সত্য জীবন [আলোঘর প্রকাশনা, ২০১৬]
১২. যেভাবে নাই হয়ে গেলাম [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৬]

শিশু সাহিত্য [উপন্যাস]—
১. তুমুল ও হ্যারি পটার [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৫]
২. তুমুলের আঙুলরহস্য [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৫]
৩. বিড়াল কাহিনি [চন্দ্রাবতী একাডেমি, ২০১৬]

কলাম সংকলন—
১. জাহাঙ্গীর গেট খোলা আছে [অনন্যা, ২০১১]
২. বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়েছিল কে ও অন্যান্য নিবন্ধ (আলোঘর প্রকাশনা, ২০১৭]

অনুবাদ—
১. প্লেটোর ইউটোপিয়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ : বার্ট্রান্ড রাসেল [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ১৯৯৭]
২. অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স ও অন্যান্য প্রসঙ্গ : বার্ট্রান্ড রাসেল [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ১৯৯৯]
৩. সক্রেটিসের আগে : বার্ট্রান্ড রাসেল [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ২০০৩]
৪. সাদা রাত : ফিওদর দস্তইয়েফস্কি [বাংলা একাডেমি ২০০০, অবসর প্রকাশনা সংস্থা ২০১৬]
৫. বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি : আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম [মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৯]
৬. উইকিলিকসে বাংলাদেশ : মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তার অনূদিত সংকলন [প্রথমা প্রকাশন ২০১৩]
৭. দ্য গুড মুসলিম : তাহমিমা আনাম [প্রথমা প্রকাশন ২০১৫]

ই-মেইল : mashiul.alam@gmail.com

Latest posts by মশিউল আলম (see all)