হোম গদ্য গল্প নিমীলিত

নিমীলিত

নিমীলিত
711
0

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘মিলির হাতে স্টেনগান’ গল্পটা পড়তে বলত মিলি। যতদিন ও ছিল, পড়া হয় নি। চলে যাওয়ার পর পড়তে শুরু করি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধৈর্যে কুলায় না। তবু ইলিয়াসের রচনা সমগ্র ১ (মিলিরই দেয়া) উঠতে বসতেই চোখে পড়ে, আর তখন প্রত্যেকবারই ওর কথা কিছু না কিছু মনে পড়ে। অবশ্য, যেদিন ও  বইটা দিয়েছিল, সেদিনের কথাই তুলনামূলক বেশি মনে পড়ে।

সেদিন সোমবার। তারিখ জানা নেই। সন বোধ হয় ২০০৪। বইয়ের শুরুর ফাঁকা পৃষ্ঠায় ও লিখেছে ‘আমার হাতে স্টেনগান কবে দিবা?’ তারপর প্যাঁচানো হাতের লেখায় নিজের নাম ‘মিলি বিষশ্বাস’ আর তারপর তারিখ হিসেবে লেখা ‘সোমবার’। আমার উদ্দেশ্যে লেখা যেকোন কিছুতে ওর প্রণীত—নামের একটা বিকল্প বানান ছিল। যেভাবে কোট করলাম। অর্থাৎ ‘বিশ্বাস’-এর পরিবর্তে ‘বিষশ্বাস’।

নামের বানানটার দিকে তাকিয়ে বহুবছর পর আজও আমার ওকে মনে পড়ছে।

এ বইটা ছিল ও নিজে যেটা পড়েছিল, সেটা। আমাকে আজিজ মার্কেট থেকে নতুন কপি কিনে দিয়েও, নতুন কপিটা নিজে রেখে আমাকে ওর বহুবার পড়া পুরনো কপিটা দেয়। এতে মাইন্ড করে বসতে বসতেও পরে বুঝলাম এর মাধ্যমেই ও মূলত আমার প্রতি নিজের ‘বেশি ভালোবাসা’ প্রকাশ করতে চায়। বোঝাতে চায় প্রতিদিনের আটপৌরে নিজেকেই ও আমার সঙ্গে জড়িত করতে চায়। পুরনো কপির অ্যান্টিক ভ্যালু সম্মন্ধে প্রচলিত সকল ধারণার কথাই একপর্যায় মনে পড়ে গেলে উৎসাহভরেই আমি বইটা নিই।

আর নতুন কপিটায় চাই ওকে কিছু লিখে দিতে। কিন্তু ও রাজি হয় না। বলে, আমি কখনো ওকে কোনো বই কিনে দিই নি। আমি তখন চোখে আঙুল দিয়ে ওর ভুল ভাঙাতে চাই। বলি, “কেন, সেদিনই না তুমি একটা বই নিলে। তোমার কাছে টাকা ছিল না। তখন আমি দাম দিলাম!” কিন্তু এ ঘটনাকে বই কিনে দেওয়া বলা যাবে কিনা, সে ব্যাপারে মিলির সংশয় কাটে না। আমিও ভেবে পাই না, বললে সেটা মিথ্যাই বা হয় কিভাবে। যেহেতু সত্যিই আমি দাম দিয়েছিলাম, আর দামটাও নেহাত খারাপ ছিল না।

প্রদত্ত যুক্তি সন্তোষজনক মনে না হওয়ায় এবং উত্থিত সংশয় না কাটায় মিলি আমার ওপর রেগে যায়। বই পড়ি না জন্য গালমন্দ করে। তবে কিছুক্ষণ পরেই আবার মিলির হাতে স্টেনগান গল্পটা পড়ার জন্য নরমভাবেই অনুরোধ করে। আমি তখন ওকে কথা দেই যে, “আচ্ছা পড়ব।” এবং জানতে চাই, “কী এমন আছে এ গল্পে? শুধু নিজের নামের সঙ্গে মিলের জন্য পড়তে বলো?” তখন মিলি বলে, নাম একটা ব্যাপার। তবে মূল ব্যাপার হলো গল্পের মিলি চায় না লোকটা সুস্থ হয়ে উঠুক। মিলি চায় লোকটা পাগলই থাকুক। শুনে অবাক হতে হয়, এ কেমন চাওয়া। আর, লোকটাই বা কে? মিলি আর কিছু বলে না, শুধু বলে, “পড়েই দেখো না!”


মিলিকে বোঝাই, এটা খুব বড় কোনো দুর্ঘটনা নয়। মা একজন সম্পূর্ণ মানসিক ভারসাম্যহীন পাগল। তাছাড়া ভুল তো আমাদেরই, কারোরই দরজা বন্ধ করতে খেয়াল নেই


সেদিন যে সত্যিই সোমবার ছিল তার একটা বড় প্রমাণ হলো বইটা চোখে পড়লে সবসময় চলতি দিনটাকে আমার একটা স্যাঁতস্যাতে মঙ্গলবার বলে মনে হতে থাকে। অর্থাৎ সবভাবেই দিনটাকে আমার বইটা পাওয়ার পরেরদিন বলে মনে হয়।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রচনা সমগ্র ১ দেওয়ার পরের দিনই প্রথমবারের মতো মিলি আমাদের বাড়িতে আসে।

বাড়িতে এসে বইটাকে একইভাবে প্যাকেটজাত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে হতাশ হয় মিলি। হতাশাগ্রস্ত মিলির জন্য মেরী বিস্কিট আর ট্যাংয়ের শরবত নিয়ে আসে মা। মিলি তখন মায়ের কাছে আহ্লাদী স্বরে আমার বিরুদ্ধে একগাদা অভিযোগ পেশ করে।

পেশকৃত অভিযোগগুলো শুনে ভ্যাবাচেকা খাওয়া আমার মা—আমার হয়ে ওর কাছে রীতিমতো সিরিয়াস ভঙ্গিতে ক্ষমা চেয়ে বসলে যারপরনাই বিব্রত হয় ও। আমার হাসি পায়। মা কতটা সহজ সরল, আর তার সেন্স অব হিউমার যে কতটা তলানিতে, মিলি হয়ত কল্পনাও করতে পারে নি।

সারল্যের একাধিক প্রমাণ দিতে এমনকি একপর্যায়ে মা আমাদের দুজনের মাঝখানে মোড়া পেতে বসে পড়ে।

আমি চেয়ারে আর মিলি খাটে পা তুলে বসেছে—মাঝখানে মা। বিস্কিট বা শরবত কোনোটাই নিচ্ছে না দেখে মা উঠে একটা বিস্কিট ভেঙে দু’টুকরো করে মিলিকে একটা টুকরো খাইয়ে দিতে চাইলে, বলতে গেলে ভয় পেয়ে ওঠে মিলি।

“কী করছেন!” বলে পেছনে সরে গিয়েই ঘটনা বুঝতে পেরে পরে “সরি, আমি নিচ্ছি, আপনিও নিন না” বলে কয়েক ঢোকে পুরো একগ্লাস শরবত খেয়ে ফেলে। মা আবারও ভাঙা বিস্কিট নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় দ্রুত দুইটা বিস্কিটও খায়। আমি মাকে চলে যেতে বলি। মা উঠে চলে যেতে যেতে দুইবার পেছন ফিরে মিলির দিকে তাকিয়ে করুণ করে হাসে।

মিলিকে জানাই, “মা খুব স্বাভাবিক না। মানসিকভাবে অসুস্থ।” মিলি বোকা করে হাসে। নেমে, হেঁটে পুরো রুমটা ঘুরে দেখে। আমি ওর পেনড্রাইভ থেকে ওর কিছু ছবি ডেস্কটপে কপি করে রাখি।

একটা ছবিতে ওর বুকের খাঁজ স্পষ্ট জন্য জানতে চাই, ছবিটা কার তোলা?

ও বলে, “কারো না। নিজেই তুলেছি।”

আমি বলি, “আচ্ছা, মিলি, হচ্ছে যে, আমি কি তোমার স্তন দেখতে পারি?”

বাসায় এসে এধরনের প্রস্তাবের জন্য প্রস্তুত ছিল বলেই হয়ত খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখায় না ও। তাই বলে উচ্ছ্বসিতও হয় না। স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।

বলি, “না মানে ছোটবেলা থেকেই দেখছি, ধরো কোনো পৃষ্ঠায় কোথাও যদি ‘স্তন’ শব্দটা থাকে, ধরা যাক, ১৩ নাম্বার লাইনের চতুর্থ শব্দটা হলো ‘স্তন’—তখন হয় কী, পুরো পৃষ্ঠার খবর নেই, প্রথমেই চোখ ওই শব্দটায় গিয়ে স্থির হয়। হতে পারে এতে আমার পাঠাভ্যাসেরও ক্ষতি হয়েছে। ফলে একটা কৌতূহল আর কি।”

দেখি মিলি খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছে। আর শেষ হতেই, “বাহ বেশ গুছিয়ে বলেছো তো” বলে প্রশংসা করে। ফলে তেমন কোনো ভূমিকা ছাড়াই ওর নিপলে আঙুল বুলাতে শুরু করি। তার কিছুক্ষণ পর একটা খুব পুরনো নিয়ম অনুযায়ী আমরা যখন খাটে,—ধাক্কা দিয়ে থামিয়ে হঠাৎ মিলি আমাকে দেখায়, মা এসে বিস্কিট আর শরবতের ট্রে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। মলিন ও নির্বিকার। কখন এসেছে, ট্রে নিয়েছে, কিছুই টের পাই নি আমরা।

মিলিকে বোঝাই, এটা খুব বড় কোনো দুর্ঘটনা নয়। মা একজন সম্পূর্ণ মানসিক ভারসাম্যহীন পাগল। তাছাড়া ভুল তো আমাদেরই, কারোরই দরজা বন্ধ করতে খেয়াল নেই। তাই না? কিন্তু মিলি কোনো কথা বলে না। খুব ব্যস্ত নয় ভঙ্গিতে অনেকক্ষণ ধরে ব্রায়ের হুক লাগায়। অভিব্যক্তিহীন চেহারায়। আমি বলি, “কই কিছু বলো!” শান্তকণ্ঠে ও জানায়, “আমি বেরুব, তুমি বেরোও আমার সঙ্গে।”

আমি প্রতিবাদ করি, “আরে! এখনই কী যাবে? দুপুরে খেয়েদেয়ে বিকালে একসঙ্গে বের হই।”

তখনই ভাবী এসে দরজায় নক করে।

“আসতে পারি?”

ততক্ষণে মিলির হয়ে গেছে দেখে আমি অনুমতি দিয়ে দেই।

“আসো ভাবী।”

“তোমার ভাই তোমাকে ডাকে।”

“কেন?”

“তুমি নাকি ঘরে এক মেয়ে এনেছো। মা বলে বেড়াচ্ছেন।”

শুনে মিলি হাসবে না কাঁদবে বুঝতে না পারা এক আর্ত হা মেলে রাখে। আর এক্ষুণি চলে যেতে চায়। আমিও আর বাধা দিই না। ওকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। বেরিয়ে আসতে আসতে বড়ভাইয়ের চেঁচামেচি কানে আসে—“আধপাগলা মায়েরে গোনায় ধরে না.. সামনে বসাইয়া গার্লফ্রেন্ড চোদে’…


আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একজন ভক্ত পাঠক হিসেবে ঢাকায় পুরাতন ধরনের একটা বাড়ি থাকার কারণেই ও আমার প্রেমে পড়ে যায়


মিলি ভয় পেয়ে আমার দিকে তাকায়। আমি ওকে আশ্বস্ত করার বা সাহস দেওয়ার একটা অমূলক মুখভঙ্গি করি।

আগের দিন বইটা দিতে দিতে মিলিই আবদার করছিল, আমাদের বাড়িতে আসবে। তখনই যে আমি না করেছিলাম—সে কথাটাই ওকে মনে করিয়ে দিই।

“আগেই বলছিলাম, আমাদের বাড়িতে আসার কিছু নেই।”

“তোমার মা যে পাগল তা তো বলো নি?”

“সেরকম কোনো প্রসঙ্গ আসে নি যে বলব!” আমি যুক্তি দিই।

“কালকেই তো গল্পটা নিয়ে কথা হচ্ছিল, গল্পে একটা পাগল থাকে আর মিলি চায় না পাগলটা সুস্থ হোক।” রেফারেন্সসহ পাল্টা যুক্তি দেয় মিলি।

আমি বলি, “দেখো তোমার গল্পটা নিয়ে আমি চিন্তিত না।”

“তাহলে তুমি কী নিয়ে চিন্তিত?”

“তোমাকে একটা সিএনজি ঠিক করে দেবো?” শান্তিনগর মোড়ে পৌঁছে ওকে জিগ্যেস করি।

“না লাগবে না, আমি বাসে যাব।”

“আমার ওপর রাগ করছো মিলি? আমার কোনো দোষ আছে?”

“অবশ্যই আছে। তুমি স্তন দেখতে চাইলে। জানোই নিজের ঘরের কেমন পরিস্থিতি! আমি তো জানতাম না। তুমিই কখনো বলো নি।”

তা অবশ্য ঠিক। মিলিকে আমাদের পারিবারিক ব্যাপারে তেমন কিছুই বলা হয় নি। শুধু পরিচয়ের প্রথম দিন একবার বলেছিলাম, “শান্তিনগরে আমাদের একটা পুরাতন ধরনের নিজস্ব বাড়ি আছে।” আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একজন ভক্ত পাঠক হিসেবে ঢাকায় পুরাতন ধরনের একটা বাড়ি থাকার কারণেই ও আমার প্রেমে পড়ে যায়।

ওই দিনের পর থেকে আমার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ায় মিলি। ফোন করলে রিসিভ করে না। মেসেজেরও রিপ্লাই দেয় না। একরাতে কল দিয়ে ফোনে ওকে ওয়েটিং পাই। কেটে ঘণ্টাখানেক পরে আবারও কল দিলে তখনও ওয়েটিং। টানা কয়েকবার কল দিতে থাকি। নো রেসপন্স। কারো সঙ্গে কথা বলছে মিলি।

প্রায় ভোরের দিকে ও আমাকে কলব্যাক করে আর জানায় ওইদিনের পর থেকে ওর কিছু মানসিক সমস্যা হচ্ছে, আর সে ব্যাপারেই ওর কোনো এক আমেরিকায় থাকা সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করছিল।

“কী সমস্যা দেখা দিয়েছে তোমার?” জানতে চাই।

বলে, অন্ধকারে তাকালেই নাকি ও আজকাল ট্রে হাতে মায়ের চলে যাওয়ার দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছে। যেতে যেতে পেছন ফিরে মায়ের করুণ করে হাসিটাও দিনকে দিন স্পষ্ট হচ্ছে।

“এই সমস্যার কথা তুমি তোমার সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধুকে বলেছ?”

আরো জানতে চাই, “কী বলেছ, ভদ্রমহিলা আমার মা, এটাও বলেছ? সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধু ছেলে না মেয়ে?”

জানায়, সবই বলেছে, সাইকিয়াট্রিস্টদের কাছে কিছুই গোপন করতে হয় না।

“বেশ। কিন্তু আমেরিকান সাইকিয়াট্রিস্ট কেন? চলো তোমাকে ঢাকাতেই কারো চেম্বারে নিয়ে যাই।”

কিন্তু আমার এ প্রস্তাবে গুরুত্ব না দিয়ে পরবর্তী দিনগুলোতেও মিলি ওর ওই সাইকিয়াট্রিস্ট ছেলে বন্ধুটির কাছ থেকেই সারারাতব্যাপী মনোচিকিৎসা গ্রহণ করতে থাকে।

আমার সঙ্গে মিলির আর দেখা হয় না—সন্দেহ করি, এসবই হয়ত হচ্ছে সাইকিয়াট্রিস্ট বন্ধুটির পরামর্শের ভিত্তিতে।

একদিন জানতে চাই, “তোমার চিকিৎসার কদ্দূর?” বলল, ওষুধ খাচ্ছে। আর, এটা একটা ধারাবাহিক প্রসেস। ধীরে ধীরে ঠিক হবে, কিছু বাছাবাছিও আছে, সব মেনে চললে ঠিক হয়ে যাবে।

বলি, “চলো দেখা করি, অনেকদিন দেখা হয় না।” তখন ও জানায়, চিকিৎসার অংশ হিসেবেই এখন আমার সঙ্গে ওর দেখা করা নিষেধ। কারণ ওই ঘটনার আমি একটা বড় অংশ। ফলে আমার সঙ্গে দেখা হলে ওর ওসব প্রবণতা আরো বেড়ে যেতে পারে।

কয়েক মাস চলে যায়। এরমধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে দুয়েকবার আমাদের দেখা হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি বুঝে ফেলি, আমার সঙ্গে মিলির আর কোনো সম্পর্ক নেই।

ততদিনে শান্তিনগরের বাড়ি ছেড়ে জিগাতলায় এক বন্ধুর ফ্ল্যাটে এসে উঠি। সত্যি বলতে নিজের ভবিষ্যত নিয়ে আমি চিন্তিত ছিলাম। আমাদের বংশে পুরুষ মানুষদের কিছুই করা হয়ে ওঠে না বলে একটা পারিবারিক মিথ চালু আছে। দাদাকে দেখেছি বসে খেতে, বাবাকেও তাই, সবশেষ আমার বড়ভাই বসে খায়। আমার একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল, আমি অন্তত কিছু করে খাব। বন্ধুকে বলি, “তোদের পত্রিকা অফিসে কি একটা কাজ জুটিয়ে দিতে পারিস?”

হেসে উড়িয়ে দেয়। “তুই হলি নবাবের বেটা। চাকরি বাকরি করার দরকার কী তোর?”

“তাও। আমি চাই নিজে একটা কিছু করি।”

তখন ও কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট যোগ্যতাগুলোর সাথে আমি কতটা কানেক্টেড, নানান ধরনের প্রশ্ন করে তা বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই ব্যাটে বলে না হওয়ায় শেষে ওই কথাটিতেই ফিরে আসে, “ধুর। তুই হচ্ছিস নবাবের বেটা। তুই চাকরি করবি কেন!”


বেশ কিছু এলোমেলো নোট হাতে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ওকে বুথের ভেতরে রেখে বেরিয়ে এসে দেখি—একটা দ্রুতগামী ট্রাকের পেছন পেছন একটা ব্রা উড়ে যাচ্ছে পিলখানার দিকে


আমাদের বাড়ির সামনে ছোটখাট যে মার্কেটটা, ওটাও আমাদেরই। ওখান থেকে মাসে যা আসে, আর বড়ভাই সাধ্যমতো ঠকিয়েও যা দেয়, তাতে আমার ভালোই চলে যায়। একদিন টাকা তুলতে জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে এসে মিলিকে দেখলাম। উচ্ছ্বসিত হয়ে কাছে গিয়ে প্রথমবারের মতো ওকে জানালাম, “ওই বাড়ি আমি ছেড়ে দিয়েছি।”

অবশ্য তাতে যে ততদিনে মিলির আর কিছুই এসে যায় না, সেটাও আমার অজানা নয়। শুনেছি, পুরান ঢাকায় বাড়ি—এমন কার সাথে যেন ওর এখন সম্পর্ক চলছে। সাম্প্রতিক প্রেমিকটিকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পটি পড়াতে পেরেছে কিনা জানতে চাইলে ও বলে, “ওই গল্প ওর আগেই পড়া।” বরং মিলি নামের কাউকেই নাকি ও খুঁজে বেড়াচ্ছিল।

“আর তোমাকে পেয়ে গেল?”

“হ্যাঁ। আমিও ওকে।”

“আর তোমার ওই সমস্যাটা, দূর হয়ে গেল?”

“কোনটা যেন?”…

“ওই যে আমার মাকে দেখতে পাওয়া। ট্রে হাতে”…

“ওহ! ওটা প্রায় ঠিক হয়ে গেছে।”—অস্বস্তির একটা গা ঝাড়া দিয়ে ও বলে।

আমি টাকা তুলব বলে বিদায় নিতে চাইলে মিলি বলে “আমাকে ক্ষমা করে দিও।”

শুনে আমি অল্পই হাসি। আর বলি, “তাহলে এসো, কিছু টাকা নিয়ে যাও।”

“টাকা নিয়ে যাব মানে!” ও বুঝতে পারে না। আমিও না।

“মানে কিছু না। আমি তো টাকা তুলতে বের হলাম। তোমার সঙ্গে দেখা”…

“তাতে কী হলো?”

“তেমন কিছু না। আমি আমার টাকা তোলার সঙ্গে তোমার একটা স্মৃতি রাখতে চাই।”

“কেন?” সন্দেহজনক দৃষ্টি মেলে ও জানতে চায়।

“কারণ আমার ধারণা, আমাকেও সারা জীবন টাকা তুলেই কাটাতে হবে।”

বুঝে বা না বুঝে, মিলি আর কথা বাড়ায় না। রাস্তা পার হয়ে আমার সঙ্গে নির্ধারিত বুথের ভেতর ঢোকে।

মোট বিশ হাজার টাকা তুলি। দশ হাজার নিজে রেখে বাকি দশ হাজার টাকা মিলিকে দিই।

বেশ কিছু এলোমেলো নোট হাতে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ওকে বুথের ভেতরে রেখে বেরিয়ে এসে দেখি—একটা দ্রুতগামী ট্রাকের পেছন পেছন একটা ব্রা উড়ে যাচ্ছে পিলখানার দিকে। সেদিকেই হাঁটা দিই।

Tanim Kabir

তানিম কবির

জন্ম ২৫ মার্চ, ফেনী।

প্রকাশিত বই :
ওই অর্থে [কবিতা, শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
সকলই সকল [কবিতা, শুদ্ধস্বর, ২০১৫]
মাই আমব্রেলা [কবিতা, আদর্শ, ২০১৬]
ইয়োলো ক্যাব [গল্প, ঐতিহ্য, ২০১৬]
ঘরপলায়নসমূহ [আত্মজীবনী, ঐতিহ্য, ২০১৭]

ই-মেইল : tanimkabir@gmail.com
Tanim Kabir