হোম গদ্য গল্প নিমজ্জন

নিমজ্জন

নিমজ্জন
185
0

১.
হাসপাতালের দীর্ঘ করিডোরে অন্যান্য রোগীদের গা-ছাড়া অ্যাটেনডেন্স-এর মাঝে ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে আছে রাত্রি। অপারেশান থিয়েটারে তার স্বামীর অপারেশান হচ্ছে। সিভিয়ার ধরনের ব্রেইন ইনজুরি। কেউ একটা ভারী রড দিয়ে তার স্বামী মঈনের মাথায় আঘাত করেছে। গল গল করে রক্ত বের হচ্ছিল একাধারে কান ও ক্ষত স্থান থেকে।

আজ, ঠিক আজই মঈনকে কথাটা জানাতে চেয়েছিল রাত্রি। কারণ গতকাল মঈনের এম.এ. পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে। সেশন জট ছাড়াও ব্রেক অফ স্ট্যাডি ছিল তাই বেশ দেরি হয়েছে লেখাপড়া শেষ করতে। রাত্রি ভেবেছিল, আজ-আজই কথাটা জানাবে মঈনকে। বাড়ি ফিরলেই কানে কানে বলবে কথাটা… কিন্তু এভাবে যে হঠাৎ করে, সবকিছু…! রাত্রির সব ভাবনাগুলো কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।

তার শাশুড়ি নিঃশব্দে কেঁদে চলেছেন পাশে বসে। রাত্রি কাঁদতেও যেন ভুলে গেছে। সে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে ‘ওটি’র দিকে। লাল আলোটা জ্বলছে তো জ্বলছেই। এক সময় দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর শেষে খুলে গেল অপারেশান থিয়েটারের ভারী দরজাটা। এপ্রোন পরা ডাক্তাররা বেরিয়ে আসছেন দ্রুত পায়ে। মঈনের বাবা ও আরো কয়েকজন যাচ্ছেন ডাক্তারের পিছু পিছু। রাত্রি নড়তে পারছে না, তার পা দুটো যেন পাথর হয়ে গেছে। সে ঐভাবেই তাকিয়ে আছে দরজাটার দিকে। অতঃপর তার শরীরে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়ে একটা স্ট্রেচার বের হয়ে এল, যদিও ঐ স্ট্রেচারে শোয়ানো মানুষটাকে চেনা যায় না। তার দুচোখ তুলোয় ঢাকা, মুখে অক্সিজেনমাক্স পরানো, সারা শরীরে অসংখ্য জায়গায় সরু সরু পাইপ লাগানো এক অচেনা অচেতন শরীর! যে তখন পর্যন্ত তার বেঁচে থাকার কথা ঘোষণা করছে। স্ট্রেচারের চারপাশ ঘিরে তার রাজনৈতিক সতীর্থরা। ওখানে শুয়ে আছে মঈন। একটি বড় রাজনৈতিক দলের ছোট কর্মী। কেউ কেউ বলে ক্যাডার। যার বয়স এখন সাতাশ।


মধ্যবিত্তদের মাঝে শ্রেণি বিভাজনটা আগে এতগুলো ধাপে ছিল না।


রাত্রির দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে লোনা পানিতে। স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা ঐ মানুষটাকে ঘিরে কোলাহল হুড়োহুড়ি ছাপিয়ে রাত্রির চোখের সামনে ভেসে ওঠে দু’বছর আগের এক দুপুরের ছবি। তখন ও অনার্স শেষ করেছে মাত্র, এদিকে বাড়িতে বিয়ের আলাপ চলছে। রাত্রিও বেঁকে বসেছে। মাকে জানাল বিয়ে না, মাস্টার্সে ভর্তি হবে। কিন্তু মা শর্ত দিলেন। যদি মঈনের সাথে সব রকম সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবেই খুলবে মাস্টার্সে পড়ার দুয়ার। মঈনের সাথে তার সম্পর্কটা বাবা-মা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না।

নাহ্, ঐ ছেলের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। মেয়েকে তখনই বিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। তাই রাত্রির উচ্চ শিক্ষার কথা না ভেবে বিয়েটাই মুখ্য হয়ে উঠেছিল বাবা মায়ের কাছে। একজন রাজনৈতিক দলের ক্যাডারের সাথে মেয়ের কোনো ধরনের সম্পর্ককে মেনে নিতে পারেন না রাত্রির সরকারি চাকুরে বাবা। অথচ রাত্রি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না মঈনকে কেন বাবা-মায়ের এতটা অপছন্দ। রাজনীতি নিশ্চয়ই খারাপ কোনো কাজ হতে পারে না। আর মঈনও কোনো খারাপ ছেলে না। মঈনের রাজনীতিতে আসার ঘটনা আর পাঁচটা ছেলের এ সময়ে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার মতোই একটা ঘটনা। যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কলেজে পড়তে এসে হোস্টেলের সিট পাওয়া থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার বিল্ড-আপটাও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। মঈনের মতে এদেশের মধ্যবিত্তদের মাঝে শ্রেণি বিভাজনটা আগে এতগুলো ধাপে ছিল না। ছিল না এতটা চোখে পড়ার মতো শ্রেণি বৈষম্যও। বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, মধ্য-মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের মাঝে এই নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমাজে যেন কোনো স্থানই নাই। একটা সামান্য কেরানি বা পিয়ন-এর চাকরি পেতে গেলেও টাকার জোর নইলে রাজনৈতিক জোর লাগে। একটু বড় হলেই ছেলে-মেয়েরা কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি হয়। মুখোমুখি হয় বিত্ত বৈষম্যের শ্রেণিবিভাজনের। কেউ তাদের বলে না যে, নিজের চিন্তা ভাবনাকে উন্নত করার জন্য বিদ্যাচর্চার দরকার। ক্লাস সেভেন কী এইটে উঠলেই তাদেরকে একথা জানিয়ে দেয়া হয় যে, লেখাপড়া করতে হয় শুধু চাকরি পাবার জন্যে। তাই একাডেমিক বই-এর বাইরে সব রকম জ্ঞানগর্ভ বই ছেড়ে ‘কারেণ্ট অ্যাফেয়ার্স’-এর গাইড বই নিয়ে পড়ে থাক।

অথচ একথা সত্য যে, সব কটা ডিগ্রি থাকলেও চাকরি পাবার নিশ্চয়তা নেই। সেখানে দরকার ঐ মামা-চাচা বা রাজনৈতিক নেতার জোর। সে কথা মঈন তার বড় ভাইদের দেখে আগেই বুঝে গিয়েছিল। তাছাড়া ছাত্র হিশেবেও সে খুব একটা ভালো ছিল না। রিটায়ার বাবার টাকার জোর নেই—তাই আগেভাগেই রাজনৈতিক দলে ঢুকে পড়াটা বেটার মনে করেছিল ও। কিন্তু বিধি বাম। এখানেও কী এক চালে পড়ে লিডার হতে পারল না, হয়ে গেল ক্যাডার। নষ্টের কাতারে শামিল করল নিজেকে। ছাত্রজীবনেই স্বাচ্ছন্দ্যের হাতছানিতে গা ভাসায় যারা তারা ‘ক্যাডার’। তাদের হাতে থাকে অস্ত্র। ক্যাডার মানেই পাওয়ার অ্যান্ড ওয়েলথ। প্রেস্টিজ চুলোয় যাক। আজকের দিনে পাওয়ার অ্যান্ড ওয়েলথ  যার প্রেস্টিজও তার। সুতরাং ক্যাডারদের গুরুত্বও কম না। এখন সত্যিকার অর্থে রাজনীতি কে করে! দেশের জন্য, জনগণের ভোগান্তি লাঘবের কথা কে বলে? এখন রাজনীতি মানে তো অন্তর্দলীয় কোন্দল। নিজেরা নিজেরা দলাদলি করে পার্টি নমিনেশান হাতান একজন নেতা আর তার কাছে তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ক্যাডাররাই! পেশি-শক্তির বলে। এভাবেই অদেখা শ্রেণির লড়াইয়ে উচুতলার মানুষেরা গরীবের সংগ্রাম করার অধিকার কেড়ে নেয়। কেড়ে নেয় অজ্ঞ কর্মীদের রাজনৈতিক অধিকারও। এভাবেই ধীরে ধীরে সব অধিকার হাতছাড়া হয়ে পুজিবাদের করাল গ্রাসে বিলীন হয়। মঈন ক্যাডার হিশেবে কখনো কোনো অ্যাকশানে যায় নি। তারপরও অপবাদটা কপালে রাজটিকার মতো জ্বলজ্বল করে।

২.
রাত্রির বিয়ের জন্য তার মা-বাবা যে পাত্রটি নির্বাচন করেছিল সেও সমাজের ঐ সুবিধাভোগী গোত্রেরই একজন। বাবা বড় ব্যবসায়ী, ছেলেও বাবার ব্যবসায় ঢুকে পড়েছে। আজ যেমন মঈনকে ঘিরে, তার স্ট্রেচার ঘিরে চাপা কোলাহল। সেদিনও ছিল। সেই দিন দুপুরেও ঘর ভরা উচ্চ কোলাহল ছিল ঠিক এমনই।

গায়ে হলুদের সরঞ্জাম এসে গেছে রাত্রির। ঘরের ভেতরে ব্যাপক হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। রাত্রির কম বয়সী কাজিনরা তুমুল উৎসাহে বরের বাড়ি থেকে পাঠানো প্রতিটি জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আর এক একটা মন্তব্য ছুড়ে দিচ্ছে; সেই সাথে হি হি হাসি। রাত্রির আজ যেমন দিশেহারা অবস্থা সেদিনও ছিল তেমন। সেই হাসি, কোলাহল কিছুই যেন স্পর্শ করছিল না তাকে। হলুদ কাঞ্জিভরম পরা নববধূর গলায়-কানে ফুলের গহনা। মাথার সিঁথি ঢেকে আছে ফুলের টায়রায়, বেলি ফুলে জড়ানো খোপা সব কিছু যেন জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে রাত্রির ওপরে। ও সেল ফোনটা মুঠো করে বসেছিল। বোনেরা হাতে মেহেদী পরাবে এবার। রাত্রি হাতটা দাও ভাই! মেহেদীর টিউব হাতে তাড়া দেয় দূর-সম্পর্কের এক ভাবি। এই মহিলার সব কিছুতেই অতি উৎসাহ। ঘুষখোর স্বামীকে তুষ্ট রাখতে ‘স্টার প্লাসের’ প্লাস্টিক মেয়েদের মতো ঝলমলে শাড়ি আর গহনায় ডিসপ্লে করে নিজেকে—নিজের ভেতরের অজ্ঞতা মলিনতাকে। সর্বক্ষণ উৎসব খোঁজে এরা। তাদের শাড়ি গহনার ঐ বীভৎস জৌলুস জনসম্মুখে প্রদর্শনের আশায়।


ভালোবাসার বদলে ভালোবাসা দিলেই গড়ে ওঠে সম্পর্ক।


কই রাত্রি হাতটা দাও! ফের তাড়া দেয় মোহনা ভাবি। রাত্রি যেন কিছুই শুনতে পায় না। হাতের মুঠোয় ওভাবেই ফোনটা চেপে বসে থাকে। ফোন করবে মঈন, নিশ্চয়ই ফোন করবে তাকে। কিন্তু কখন? মঈন কি জানে না? মঈন কি শেষবারের মতোও তাকে বলবে না কিছু! কী হলো, হাতটা দাও! ডান হাতে ফোনটা ধরে অগত্যা বাঁ হাতটা মেলে ধরে ও। ঠিক তখনই মেসেজটা আসে ফোনে, চার লাইন কবিতায়—

‘কোনোদিন, আচমকা একদিন
ভালোবাসা এসে যদি হুট করে বলে বসে—
চলো, যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাই
যাবে?’

কবিতার পর মঈন লিখেছে, আমি আসব, রাত ভোর হবার আগেই।

রাত্রি এবার তার অপর হাতটাও মেলে ধরে মেহেদীর টিউবের নিচে। সেদিন, সেইদিনই রাত ভোর হবার আগেই মঈনের হাত ধরে বেরিয়ে পড়ে ও। মঈনকে ছাড়া জীবনে আর কাউকে ভাবতে পারে নি। তাই একটা অনিশ্চিত জীবন, একটা ভবিষ্যৎহীন জীবন বেছে নিয়েছিল। এর পেছনে ভালোবাসা যেমন ছিল তারচেয়েও বেশি মুখ্য হয়ে উঠেছিল আর একটা বিষয়, শ্রেণি বৈষম্যের কাছে মঈনকে পরাজিত হতে দিতে চায় নি। শুধুমাত্র নিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য মঈনকে তো ছোট করা যায় না। সম্পর্ককে ছোট করতে পারে না।  শুধু ভালোবাসলেই কি সব সময় সম্পর্ক গড়ে ওঠে? ভালোবাসার বদলে ভালোবাসা দিলেই গড়ে ওঠে সম্পর্ক। সেই সম্পর্ককে কোনো কিছুর বিনিময়ে অপমান করা যায় না। ভোগ বিলাসের হাতছানিতে সবকিছু যাক, অন্তত ভালোবাসা টিকে থাক এখনো। তাই বাবা-মায়ের কাছে মনে মনে ক্ষমা চেয়ে নেয় রাত্রি।

৩.
রাত্রির বাবা মঈনের বিরুদ্ধে কন্যা অপহরণের মামলা করতে পারতেন। করেন নি সেই যা বাঁচোয়া। নইলে এখনকার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের জন্য সব রকমের অপবাদই খুব মানিয়ে যায়। কেউ তার প্রতিবাদ করে না। বাবা-মা’র কাছে মনে মনে হাজারবার ক্ষমা চাইলেও তারা হয়তো রাত্রিকে ক্ষমা করেন নি। তাই তো এত আনন্দের দিনে আজ এমন একটা অঘটন ঘটল রাত্রির জীবনে। রাত্রি বিয়ের আগে কোনো সমস্যায় পড়লেই তার বড় বোন রুপাকে অভিযোগ করে বলত, তোমরা আমার এমন একটা নাম রাখতে গেলে কেন আপু? এই নামটাই আমার কাল হলো। আঁধার পেরিয়ে আর যে বের হতে পারি না। রাতে বুঝি আর কেউ জন্মায় না! সে জন্য রাত্রি নাম দিতে হবে!

রুপা বলত, দূর বোকা মেয়ে, রাত্রি মানেই অন্ধকার তোকে কে বলল? রাত মানেই তো জ্যোৎস্নার আলো, রাত মানেই তারা-ভরা আকাশ, শত ক্লান্তির অবসান, অসংখ্য রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। রাত মানে কত বৈচিত্র্য তুই জানিস না!

হ্যাঁ হবে হয়তো বৈচিত্র্য! জীবনের সেই ক্লেদহীন বৈচিত্র্যকে খুঁজতেই রাত্রি মঈনকে বলেছিল এই ঘুণে ধরা রাজনীতি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে। মঈন রাত্রিকে সহসা চটাতে চায় না তারপরও বলে, এমন দিনের স্বপ্ন দেখ কেন রাত্রি, যেদিন কখনো আসবে না। নিয়মের ব্যত্যয় এখন ঘটানো আর আমাদের সাধ্যে নেই। সবকিছুই এক অদৃশ্য টাকা, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক চালে বন্দি। সাধারণ, খুব সাধারণরা যে সেই জালে আটকে আছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে জীবন নিয়ে বেরিয়ে আসার নিশ্চয়তা যে এদেশ আর দিতে পারে না। যেমন পারে না শিক্ষিত মাত্রেই চাকরির নিশ্চয়তা দিতে! পারে না আরো অনেক কিছুই…। তারপরও, আমি ওসব শুনতে চাই না। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসো প্লিজ, প্লিজ!

যথা আজ্ঞা দেবী! মঈন হাত বাড়িয়ে রাত্রির কোমর ধরার চেষ্টা করে, রাত্রি দ্রুত সরে যায়, আগে ওসব ছাড় তারপর! মঈন জানে সহজে ফেরা যায় না, তারপরও! সেই চেষ্টাই করে আসছিল বেশ কিছুদিন ধরে। ধীরে ধীরে সরে আসছিল সবকিছু ছেড়ে। নতুন এক জীবনের পথে যেখানে সংগ্রাম আছে অথচ তারই হাত ধরে আছে স্বস্তি আর নিশ্চয়তা। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারল না, নাকি এগোতে দিল না তাকে!


অনুভূতিহীন রোবটে ছেয়ে যাচ্ছে সংসার, সমাজ, রাষ্ট্র।


যখনই সবকিছু ছেড়ে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা তখনই তার ক্যাডার পরিচয়টা প্রকট হয়ে উঠতে থাকে নিজের দলের কাছেই। চলতে থাকে পুলিশে ধরিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র। দল থেকে এই সব কর্মীকে বহিষ্কার করে দিয়ে দলকে জনগণের সামনে পূত-পবিত্র হিশেবে জাহির করার প্রক্রিয়াও। কোনো কিছুই বাদ পড়ে না। তবে একটা প্রমাণ খুব দরকার। কোনো টেন্ডারবাজি চাঁদাবাজিতে তো পাওয়া যায় না মঈনকে। ধরিয়ে দিতে হলে একটা চাক্ষুষ প্রমাণ তো চাই! বড্ড বাড় বেড়েছে ওর! কথাটা সবার মুখে মুখে, চোখে চোখে ফেরে।

এভাবে সব প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হচ্ছিল এমনই সময়ে…  কী এক কথা কাটাকাটির সূত্র ধরে… মঈন এখন আইসিইউতে সব স্বপ্ন বুকে নিয়ে শুয়ে আছে। ডাক্তার ৭২ ঘণ্টার আগে কিছুই বলতে পারবে না। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা মঈনকে যে কথাটা বলতেই হবে রাত্রির। এর পরে যদি হাতে আর সময় না থাকে! যদি ফুরিয়ে আসে সবকিছু, সবকিছুই! তাই কাঁচের দেয়ালের ওপার থেকে কানে কানে কথাটা বলবে রাত্রি, তাকে যে আজ বলতেই হবে। মঈন নিশ্চয়ই শুনতে পাবে তার কথা!

শোন মঈন, প্রিয় বন্ধু আমার! আমার ভেতরে বাস করছে এক ছোট্ট মঈন। তার কথা আজো তোমাকে বলা হয় নি, জানি না আর বলা হবে কিনা। তবে একটা মাংসপিণ্ড থেকে ধীরে ধীরে সে একদিন মানুষে পরিণত হবে। আচ্ছা বলো তো, স্বপ্নগুলো কি বুনে দেবো ওর ভেতরেও? ভীষণ ভয় করছে যে! বলব ওকে? দেখাব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে? বলব? দেখ সোনা, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের উজ্জ্বল হাতছানিতে আজ নিয়ন সাইনে ঢেকে যাচ্ছে আমাদের আকাশ। প্রয়োজনহীন ভোগ্যপণ্যে, ঝলমলে কসমেটিক্সে, রং ফর্সা করার ক্রিমে সয়লাব শপিংমলগুলো। যা প্রতিনিয়ত মানুষকে বিবেকহীন হতে উৎসাহ দেয়। জড়ায় দুর্নীতির জালে। তৈরি করছে টাকার নেশায় ছুটে চলা বহুজাতিক কোম্পানির দাসদের। অনুভূতিহীন রোবটে ছেয়ে যাচ্ছে সংসার, সমাজ, রাষ্ট্র। যেখানে দুদণ্ড ফুরসত নেই কারো। এই অন্ধকার সময়ের বিপরীতে আলো জ্বালাতে পারবে সে! যেখানে মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলে সৃষ্ট বৈষম্য দীর্ঘতর হবে না, মানুষ বৈষম্যকে জিইয়ে রাখবে না, ব্যবধানকে দীর্ঘতর হতে দেবে না। যে আলো আমরা জ্বালাতে ব্যর্থ হচ্ছি প্রতিমুহূর্তে..। ও পারবে নিশ্চয়ই! কী বলো, পারবে না?

গাজী তানজিয়া

জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭। বাংলাদেশ।

শিক্ষা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ।

পেশা : উন্নত কৃষি গবেষণা।

প্রকাশিত গ্রন্থ :

জাতিস্মর [উপন্যাস; বাংলা প্রকাশ, ২০১০]
পৃথিবীলোক [উপন্যাস; বাংলা প্রকাশ, ২০১১]
বায়বীয় রঙ [উপন্যাস; অ্যাডর্ন, ২০১৩]
কালের নায়ক [উপন্যাস; অ্যাডর্ন, ২০১৪]
আন্ডারগ্রাউন্ড [উপন্যাস; মনদুয়ার, ২০১৭]
সবুজঘাসে মুক্তবেশে [কিশোরগল্প সংকলন; বাংলায়ন, ১০১২]
অরক্ষিত দেশে অবরুদ্ধ সময়ে [নিবন্ধ সংকলন; আদর্শ, ২০১২]

ই-মেইল : gtanzia@gmail.com

Latest posts by গাজী তানজিয়া (see all)