হোম গদ্য গল্প নিখোঁজ শুকতারা

নিখোঁজ শুকতারা

নিখোঁজ শুকতারা
224
0

বেঁচে থাকলে আজ ও ৫৮ বছরের!

হাতের আঙুল গুনে হিশেব করেন হোসনে আরা। নাহ, ছেলেকে এই বয়সে ভাবতে পারেন না তিনি। বাম পাশে সিঁথি করা, বড় বড় চোখের ভেতর সরল বাংলাদেশ আঁকা ওমন টগবগে ছেলেটাকে হুট করে ৫৮ বছরের  বৃদ্ধ ভাবতে একদমই ইচ্ছে করে না তার। এই একটা দিন, এই দিন, সারা দিন তিনি একা একা ঘুরে বেড়ান, ইচ্ছে করে ফুলার রোডে হাঁটেন, বড় বড় জারুল গাছের দিকে তাকান, ঝালমুড়ি খান—এমনকি এই দিনে তিনি মিষ্টিও খান, ঢাকা কলেজের সামনে একটা মিষ্টির দোকান তার খুব প্রিয়।

অথচ এর পরের দিন ষোলই ডিসেম্বর; সারাদিন ঘরে নামাজ পড়েন, একটি বারের জন্য বাইরে আসেন না।

এই অভ্যাসটা দীর্ঘ জীবনের। নজরুল হারিয়ে যাওয়ার পর এই ৩৯টা বছর তিনি একই রকম। ৮৮’র বন্যার সময় মোহাম্মদপুরের এই বাসায় পানি উঠে যায়, সেইবার তিনি নজরুলের শেষ স্মৃতিটুকু হারিয়ে ফেলেন, একটা বাক্স ভর্তি নজরুলের সমস্ত জিনিস, তার মধ্যে একটা টকটকে লাল শার্টটার কথাই তিনি শুধু মনে রেখেছেন। নজরুলের ভীষণ প্রিয় ছিল! এই শার্টটা পরা অবস্থায় সে প্রথমবার কলেজে গিয়েছিল, এই শার্টটা পরেই কি ও শেষ বার বেরিয়ে গিয়েছিল—মনে পড়ে না! মেহেদি গাছের নিচে তখন এক দলা অন্ধকার, অন্ধকারে রং চেনা যায় না।


মা, তুমি শুধু মাথা-ভর্তি চুলটাই দেখলে, বাংলাদেশটা দেখলে না!


নজরুল হাসলে টোল পড়ত, তিনি বলতেন ছেলেদের গালে টোল পড়া ভালো না। হোসনে আরা জানেন এ পাড়ায় সে সময় ওই রকম ফর্সা আর ওমন সরল মুখের আর একটা ছেলেও ছিল না, পাড়ার উঠতি যুবতীদের মতো হোসনে আরাও নজরুলের ঝলমল কৈশোর পেরুনো নতুন দিনগুলোর আঁচ পেতেন, এখানে ওখানে, বইয়ের ফাঁকে, টেবিলের কোণায় টুকটাক মেয়েলি চিঠি পান নি এমন নয়! হোসনে আরা আঁচলে চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে ভাবেন, অথচ এসব বিষয়ে কী রকম নিরুত্তাপ ছিল নজরুল! নিজের ছেলেকেই আশ্চর্য লাগে!

দুপুরে ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে পড়ে খেতে চাইত। আসার সময়টা সে হিশেব করেই আসত, বাবার টিফিন টাইম পেরুনোর ঠিক আগে, দশ মিনিটের মাথায়। অফিস কাছে থাকাতে নজরুলের বাবা বাসাতেই লাঞ্চ সারতেন। নতুন গজানো দাড়ির সাথে অবাধে বাড়তে দেওয়া চুলের কলিটা যেখানে মিশেছে সেখানে প্রায়ই ঘামে ভিজে চুপচাপ হয়ে থাকত। হোসনে আরার খুব কষ্ট হতো ছেলেটাকে দেখে—কিন্তু অতসব ভাববার মতো যথাযথ সময় ছেলেটা কখনোই দিত না। চেয়ারটা টান দিয়েই দড়াম করে বসে পড়ত।

—মা, সত্যি কথা হলো কিছুই বুঝতে পারছি না, কিসব আলোচনা টালোচনা… কী যে হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু যে ঠিক কী চাচ্ছেন!

তারপর গপগপ করে খেতে খেতে আর কী কী বলে তার পরিপূর্ণ অর্থ ক্ষুধার তাড়নায় স্পষ্ট হতো না।

—আচ্ছা, তোর মাথা-ভর্তি চুলগুলো কাটিস না ক্যান?

—মা, তুমি শুধু মাথা-ভর্তি চুলটাই দেখলে, বাংলাদেশটা দেখলে না!

—আমার অত কিছু দেখার দরকার নেই, আজ বাবা তোকে দেখবে। খাওয়ার পর বলেছে বাসায় থাকতে, কী যেন কথা আছে।

এই সব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তিনি হেসে উঠেন। এতদিন আগেকার এইসব কথোপকথন তিনি বেশ উপভোগ করেন! কথার লেজে কথা আটকে বাবার চোখ রাঙানিটাকে এমন ভাবে কোমল করে তুলত—হোসনে আরার মনে হয় ছেলেটা বেঁচে থাকলে আজ অন্তত একটা টাউট মন্ত্রী হতে পারত।

—মা, তুমি না শুধু কথা ঘোরাও।

—কথা আমি ঘোরাই, না তুই?

—বলো না, সাতচল্লিশে তুমি কোথায় ছিলে?

—ওসব মনে নেই, তোকে আজ অবশ্যই বাসায় থাকতে বলেছে, কোত্থাও যাবি না।

—আচ্ছা মা, সাতচল্লিশে তুমি কতটুকু ছিলে?

—তোর খাওয়া দাওয়া কিন্তু ভীষণ কমে গেছে, যুদ্ধ যদি সত্যিই বেঁধে যায় তাহলে এই টিংটিং এ শরীরটা নিয়ে পাকিস্তানীরাও দয়া দেখাবে বুঝলি, তোকে ওরা মারবে না!

—আবারও কথা ঘোরালে!

এবার আর পারা গেল না, হোসনে আরা বলেন, সাতচল্লিশে শুধু বুঝতাম তোর নানা, এই তোর মতো করে বেড়াত। কী যেন সারাদিন, টো টো, তোর নানুর সাথে সারাদিন এটা সেটা নিয়ে ঝগড়া!

একগ্লাস পানি ঢকঢক করে গিলতে গিলতে বলে, তোমাদের সবকিছু ওইভাবে ছেড়ে ছুড়ে আসতে কষ্ট হয় নি মা?

—বিনোদ বিহারী লেনের কথা খুব মনে পড়ে! আমাদের স্কুলটা—গেটের সামনে কান্তি দার বরই আচার! আর মনে পড়ে একটা ইংরেজ ছোকরা, আমাদের পাড়ায় প্রায়ই আসত। দেখতেও বেশ! তবে বোকা-সোকা, একদিন তোর নানার ধমকে লাল হয়ে গিয়েছিল রক্ত জবার মতো। খুব মায়া হয়েছিল সেদিন! এরপর থেকে আমি ওকে দেখলেই হাসতাম, ও লজ্জা পেত।

—তোমার কি শুধু এটুকুই মনে আছে?

—তুই কিন্তু খাওয়ার পর কোত্থাও যাবি না।

—আরেকটু বলো না মা, তোমার বিনোদ বিহারী লেনের কথা!

—কী ব্যাপার, বাংলাদেশ বাদ দিয়ে মাথায় আবার বিনোদ বিহারী লেন ঢুকল কেন আবার?

প্লেটে হাত ধুতে ধুতে বলল, নাহ, এমনি, ভাবছি কিছু মানুষ এপার-ওপার হলো অথচ তাদের কেউ জানত না তারা কোথায় যাচ্ছে, এই প্রাণের ভিটে-মাটি ছেড়ে ওদিকে কেমন ভিটে মাটি পাবে? বা আদৌ পাবে কিনা! আশ্চর্য লাগে মা!

ধোয়া হাতটা প্লেটের উপর আরো কিছুক্ষণ ধরে রাখে নজরুল। বৃষ্টির পর পাতা চুয়ে অবশিষ্ট পানিটুকু মাটিতে নেমে আসার ভঙ্গিতে হাত ধোয়া পানি প্লেটে পড়তে থাকে, সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নজরুল বলে ওঠে, আমাদের মনে হয় আবারও ভিটে মাটি ছাড়তে হবে, মা।

—এবার যদি ছাড়তেই হয় তাহলে সোজা চিটাগাং থেকে জাহাজের খালাসি হবি, আমেরিকায়। তোর ওই নাক বোচা গায়কের কনসার্টের সামনের সারিতে জায়গা পাবি—ভেবে দেখেছিস?

কিছুক্ষণের বিষণ্নতাকে দূরে বিস্ফোরিত ককটেল অথবা গুলির আওয়াজটা মুছে দেয়।

—সেই ইংরেজের কথা আর মনে পড়ে মা?

—হুম, খুব মনে পড়ে। মনে হয় ভালোও বেসেছিলাম!

—এই সেরেছে, আব্বাকে এসব বলো না কিন্তু!

—তোদের নেতা আসলে কী চায় বলত?

—মুক্তি।

—তাহলে টেবিলে সেটা আসবে বলে মনে করিস? এই যে তোর মতো হাজার ছেলে আর আমার মতো হাজার মা’দেরকে যে মুক্তির নামে স্বপ্ন গেলানো হচ্ছে—এটার মাশুল কে দেবে রে?

হোসনে আরা আবার বলে উঠেন, হাতে শুধু স্লোগান নিয়ে মিছিল করে লাশ হয়ে ফিরে আসলে বুঝি স্বাধীনতা হয়? ওরা অস্ত্রের ভাষায় কথা বলছে, প্রতিদিন তরতাজা ছেলেরা মারা যাচ্ছে আর তোর নেতা আলোচনার টেবিলে!

—অস্ত্র কোথায় পাব মা?

—সেটা আমি কী বুঝি, সবার আগে ওটার ব্যবস্থাই করতে বলো।

—তুমি রাজনীতি বোঝ?


নজরুলকে বিদায় দিয়ে এসে হোসনে আরা দুইদিন শুধু নির্বাক থেকেছেন।


হোসনে আরা কিছুটা ধীর গলায় বলেন, জানিস, ওই ইংরেজটা যাবার সময় শেষবার এসেছিল কথা বলতে, আমি বলি নি। এখন মাঝে মাঝে ভাবি—যারা কথা বলতে এত ভয় পায়, এত বোকা-সোকা, তারা আবার এত এত রাজ্য শাসন করল কিভাবে?

—রাজনীতি অন্য জিনিস মা।

—তাই হবে হয়তো।

বেলা পড়ে আসে।

আজ ১৫ ডিসেম্বর। শরীর আর সাড়া দেয় না। খুব ইচ্ছে করছে ফুলার রোডটা ঘুরে আসতে। জারুল গাছগুলো আজো কি সেভাবে দাঁড়িয়ে আছে! নজরুলের খুব ইচ্ছে ছিল ফিজিক্স নিয়ে পড়ার। ওর পছন্দের বিষয় ছিল এটা। হোসনে আরা চাইলেই যেতে পারেন, ইমরুল গাড়ি রেখে গেছে, ও জানে মা আজ বেরুবেন।

ভালো লাগছে না। ইমরুলটা সারাদিন অফিসেই থাকে, এত টাকা দিয়ে কী হয়? ইমরুল নজরুলের ঠিক উল্টো স্বভাবের। দেশ টেশ ওর কাছে বেশি কিছু নয়। ক’দিনের ব্যবধানে নিকেতনে আরেকটি ফ্লাট কিনেছে ও। মাকে অনেকবার বলেছে, হোসনে আরার ভালো লাগে না। মোহাম্মদপুরের এই দোতলা বাড়িটার মায়া ছাড়তে পারে নি। বউ-মা বিষয়টা নিয়ে ছাই চাপা আগুনের মতো জ্বলছে, তা তিনি বোঝেন।

এই পুরোনো ঘিঞ্জি, ঐতিহাসিক পুরনো কমোডের গন্ধওয়ালা বাথরুম ভালো না লাগাটাই স্বাভাবিক। তবে মা বেঁচে থাকতে এটা ইমরুল হতে দেবে না, হোসনে আরা জানেন। কিন্তু ইমরুলের ইচ্ছে করে নতুন কেনা ফ্লাটে মাকে নিয়ে উঠতে—হোসনে আরা অনেক বার বলেছে, তোমরা যাও, শুধু আমার গাড়িটা আমাকে দিয়ে যেও, যখন ইচ্ছে হবে আমি যেয়ে দাদুটাকে দেখে আসব।

হোসনে আরা সেটা মন থেকেই বলেছিল, বলেও। ইমরুল এদিক দিয়ে এখনো ভালো, এটাকে বাড়তে দেয় না।

হোসনে আরার মনে হয় ইমরুলের ছেলেটা নজরুলের স্বভাব পেয়েছে। সারাদিন দাদিকে এটা ওটা প্রশ্ন করে ব্যস্ত রাখে। উত্তর দিতে কষ্ট হয় কিন্তু হোসনে আরার খুব ভালো লাগে এটা। নজরুলও এমন করত। সারাদিন মায়ের আঁচল ধরে ঘুরত, আর বাবাকে ভয় পেত যমের মতো। অথচ হোসনে আরার যত প্রশ্রয়ের অনুমোদন সব তো সেখান থেকেই আসত। নজরুল কোনোদিন জানল না তার বাবার শাসনের আড়ালে কতটুকু আদর ছিল।

বেলা আরো পড়ে এল…

এই সেদিনও দোতলার এই জানালা দিয়ে বেড়ি বাঁধটা দেখা যেত, এখন জানালার ও পাশে উঠে গেছে ১৪ তলা। আকাশটাও খেয়ে ফেলেছে। ইদানীং বাড়িটাতে থাকতে কষ্ট হয়। আকাশ দেখা যায় না। হোসনে আরার আকাশ দেখা অভ্যেস। গভীর রাতে খুট খুট করে সিঁড়ি ঘরের জঞ্জাল সরিয়ে ছাদের দরজা খোলেন।  নজরুল যেদিন চলে গেল, সেদিন খুব গরম। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, ৬ দিন যাবৎ ঢাকায় বিদ্যুৎ নেই।

তখন দোতলা ছিল না। বাড়ির সামনে একটু জায়গা ঘিরে সেখানে একটা মেহেদি গাছ লাগানো ছিল। সেটার অবাধ্য কিছু ডাল পাঁচিলের ওপারে নুয়ে পড়লে কেউ কেউ রাস্তা থেকেই ওটাকে মুড়ে পাতা নিয়ে যেত। তার পাশেই ছিল একটা টিনের গেট। ক্ষয়ে যাওয়া, যার নিচ দিয়ে এ বাড়ির বিড়াল ও বাড়ি আর ও বাড়ির বিড়ালটা এ বাড়িতে আসে যায়।

একদিন গভীর রাতে টিনের দরজায় ধাক্কা দিতে ক্যাচ ক্যাচ করে খুলে গেলে নজরুলের বাবা সূরা ইয়াসিন আওড়ান। কিন্তু মেহেদী গাছের নিচে দাঁড়ানো অবয়ব সে রকম কিছু নয় বলে হোসনে আরা দরজা খোলেন। এই জন্মের ছায়াটাকে কিভাবে ভোলেন তিনি?

—কী হচ্ছে এসব?

—দেখতেই তো পাচ্ছ, আমার সময় একটু কম মা। দুটো প্যান্ট আর শার্ট দাও। বেরুতে হবে।

একটু দূরে বারান্দায় নজরুলের বাবা এইসব কথোপকথন শোনেন। কিছুই বলতে পারেন না। ছেলেটা যে পাগল হয়ে গেছে সেটা হয়তো বুঝে গেছেন বলে চুপ থাকেন।

গেটের বাইরে থেকে একটা কণ্ঠস্বর তাড়া দেয়। সময় খুব অল্প। ওরা আগরতলা যাবে। নামটা তিনবছর আগেও খুব শোনা যেত। ষড়যন্ত্র মামলায় কত কী হলো। সেই পানি ঘোলা করে এখন যুবকের দল প্রকাশ্যে আগরতলায় যায়—বারান্দায় দাঁড়িয়ে এইসব ভাবতে থাকেন প্রায়ই নজরুলকে হারিয়ে ফেলা নজরুলের বাবা মোহাম্মদ মোস্তাকিম, সিনিয়র প্রকৌশলী, পূর্ব পাকিস্তান রেডিও।

নজরুলকে বিদায় দিয়ে এসে হোসনে আরা দুইদিন শুধু নির্বাক থেকেছেন।

সকাল হলেই আরো একটি ষোলই ডিসেম্বরের ভোর।

প্রথম প্রথম ৮/১০ বছর ফিরে আসার অপেক্ষাটা থাকত, এখন আর নেই। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সারা দেশে ছুটির আমেজ। সারাদিন কোথাও বের হন নি হোসনে আরা। আকাশ দেখতে ইচ্ছে করছে। ইমরুল, তার বউ, দাদু ভাই কেউ জেগে নেই। কেউ একজন তো তাকে ছাদ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসুক! ইমরুলের বাবাকে খুব মনে পড়ে, সরকারি চাকরি করতে করতে লোকটার ভেতরের সত্তা মরে গিয়েছিল। অফিসের বাইরে আরেকটা জীবন আছে, তার বাড়ির আঙিনায় মেহেদি গাছ আছে, তার ডালে সকাল বেলা চড়ুই শালিক ঝগড়া করে, তার বাড়ির ছাদে টবে লাগানো হাসনাহেনা আছে, চামেলি আছে—তারা প্রায়ই ফুটে থাকে অথবা আজ হোসনে আরার খুব শরীর খারাপ—এসবের কোনো খবরই তার কাছে অব্দি কোনোদিন আসত না!

এমন নির্লিপ্ত একটা মানুষের ঔরসে নজরুল জন্মাল কী করে? প্রশ্নটা করার মতো সময় তিনি পান নি। একদিন অফিসে যাওয়ার আগে বুকে ব্যথা করতে করতে বিছানায় শুয়ে পড়ল। দুইদিনের বেশি আর সহ্য করতে পারেন নি। নজরুলের ফিরে না আসার ব্যথাটা বুকের ভেতর জমিয়ে রাখতে রাখতেই কিনা…

আজ রাতে হোসনে আরার ছাদে যেতেই হবে।

আজকের আকাশটা তাকে দেখতেই হবে। ভেতরে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। পা টিপে টিপে কোনোমতে সিঁড়ির গোড়ায় আসতেই তার হাঁপানিটা সহ্যের সীমা পেরিয়ে যেতে থাকে। মাত্র ১২ ফুট দূরত্ব পেরিয়েছেন, কিন্তু দমে গেলে চলবে কেন? এখনো দশটা সিঁড়ি তাকে পেরুতেই হবে। যে করেই হোক। ক্ষীণ আলোটা কোত্থেকে যেন ঠিকরে পড়ে আছে সিঁড়ির গায়ে, সেই আলোর সূত্র ধরে তিনি ৪টি সিঁড়ি উঠে আসেন, সিঁড়ির হাতল শক্ত করে ধরেন, বুঝতে পারেন তিনি ঘামছেন। তারপরও আর একটু, আর একটু উঠলেই সিঁড়ির দরজাটা… অতঃপর খোলা আকাশ। অনেক তারা। একটু ঠান্ডা বাতাস।

এবার আরো দু সিঁড়ি উঠে আসেন, কিন্তু আর পারছেন না। দুটো পা যেন পৃথিবীর সমস্ত বোঝা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামান্য শক্তিটুকুও উধাও! ভাবছেন, সিঁড়ি থেকে যদি পড়ে যান তাহলে সকালে তাকে নিয়ে ইমরুলের দৌড়াদৌড়ি, বউ-মার চাপা বিরক্তি, দাদু ভাইটার কান্নাকাটি—নাহ! এসবের চেয়ে তাকে যে করেই হোক আরো চারটা সিঁড়ি উঠতেই হবে। একটা জেদ চেপে বসে হোসনে আরার মাংস পেশিতে, নজরুলের মতো।


আকাশটা হাসছে—তার ডান গালে টোল। আকাশের গালে টোল পড়া কি ভালো?


পা’টা কি একটু নড়ে উঠল?

উপরে তাকাতেই চোখে পড়ে সিঁড়ির দরজার রংটা অন্ধকারেও লাল, জ্বলছে যেন। এই লালটা নজরুলের শার্ট ছাড়া অন্য কোথাও দেখেন নি হোসনে আরা। দরজাটার আহ্বানে সাড়া দিতেই কি পা দুটো হালকা হয়ে গেল! আরো দুটো সিঁড়ি তিনি পার হয়ে গেলেন। দরজা খুলে তিনি ডান পা’টা ছাদে রাখতেই একটা ঠান্ডা সুন্দর ও নরম বাতাস হোসনে আরার বুকের পাজর ভেদ করে উত্তপ্ত হৃৎপিণ্ডে ঢুকে পড়ে, তিনি আরামে চোখ বুঁজতে বুঁজতে লোহার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পড়েন।

আহ, যেন জীবনটাই এতদিন বেঁচে ছিল এই রাতের ছাঁদটা দেখার জন্য। ঢাকায় কি বিদ্যুৎ নেই, সারাটা শহর ওমন কালো কেন?

হোসনে আরা ধীরে ধীরে মাথাটা উপরে উঠালে দেখতে পান আকাশ-ভরা তারা। তারা ভর্তি এমন ঢাকার আকাশ শেষ কবে দেখেছেন তিনি? তারা কি অতীত হয়ে ফিরে আসে? একেকটা তারার রং একেক রকম, কোনোটা উজ্জ্বল একাত্তর, কোনোটা টিপ টিপ করে জ্বলা সাতচল্লিশ, কোনোটা বা ম্রিয়মাণ ইংরেজ ছেলেটার অভিমান নিয়ে জ্বলছে। হোসনে আরা ভাবতে থাকেন, তবুও তো একটা মুক্ত আকাশ পাওয়া গেল!

বিনোদ বিহারী লেনের আকাশটা এত সুন্দর হতে পারত না। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয় আকশটা একটু ডান দিকে হেলে আছে, বাঁ-পাশে সিঁথি কাটা চুলের মতো।

আকাশটা হাসছে—তার ডান গালে টোল। আকাশের গালে টোল পড়া কি ভালো?

মির্জা মুজাহিদ

মির্জা মুজাহিদ

জন্ম ২৫ জানুয়ারি, নড়াইল। চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছেন। পেশা : ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, স্পেলবাউন্ড কমিউনিকেশন লিমিটেড।

প্রকাশিত বই : বিপ্রতীপ [গল্প], একুশে বইমেলা ২০১৬, অনুপ্রাণন প্রকাশন।

ই-মেইল : me@mirzamuzahid.net
মির্জা মুজাহিদ

Latest posts by মির্জা মুজাহিদ (see all)