হোম গদ্য গল্প নিঃসঙ্গ মারমেইড

নিঃসঙ্গ মারমেইড

নিঃসঙ্গ মারমেইড
862
0

Two roads diverged in a yellow wood,
And sorry I could not travel both
And be one traveler, long I stood
And looked down one as far as I could
To where it bent in the undergrowth;”

১.
কফি শেষ করেও স্টারবাকের সামনে ছাতার নিচে বসে আছে হায়দার। বিশাল ভ্যানকুভার কনফারেন্স হলে আজ আর ঢুকতে ইচ্ছে করছে না তার। গত দুদিন ধরে উন্নয়ন নিয়ে কপচাকপচি চলছে। আজ তৃতীয় দিন। আজ একটু খোলা বাতাসে যেতে ইচ্ছে করছে তার। রাস্তায় একটা পর্যটন সংস্থার গাড়ি যাচ্ছে—‘হিপ হপ সিটি ট্যুর’ লেখা। কাউন্টারে গিয়ে জিগ্যেস করে জানতে পারল ঘণ্টা-দেড়েকের সিটি ট্যুরে শহরের দর্শনীয় জায়গাগুলো দেখানো হবে, টিকেট চল্লিশ ডলার। দ্রুতই মনের ক্যালকুলেটরে টাকার অঙ্কে গুনে দেখল সে; ‘এ যে ম্যালা ট্যাকা!’ দমে যায় একটু। হিপ হপ চলে গেল। কাউন্টারের লোকটা বলল, “তুমি কম সময় নিয়ে এসেছ। না দেখলে মিস করবে। পয়তাল্লিশ মিনিট পর পর আমাদের গাড়ি আছে, মন চাইলে ঘুরে আসতে পারো। ইচ্ছে করলে কালকেও যেতে পারো। কিন্তু আজকের মতো আবহাওয়া কাল নাও থাকতে পারে। কাল হয়তো ভ্যানকুভারের বিখ্যাত প্যাচপ্যাচে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে।” সিটি ট্যুরের লিফলেট হাতে নিয়ে হায়দার আরেক দফা কফি নিয়ে বসে, সিনসিনারির ছবি তোলে, একজন উন্মূল শাদা চামড়া এসে এক ডলার ভিক্ষা চায়। এক ডলার দিয়ে দেয় তাকে। আবারও হিপ হপের গাড়ি আসে। টিকেট কাটতে গেলে কাউন্টারের লোকটা পাঁচ ডলার ছাড় দেয়।


নিঃসঙ্গ মারমেইডের ভাস্কর্য বসে আছে পাথরের ওপর। চারপাশে নীল জলরাশি যেনবা মারমেইডের নীলাম্বরী।


বাসের যাত্রীরা নানা দেশের, আফ্রিকার একটা দেশের প্রতিনিধিরা দলে-বলে চলেছেন। যাত্রা শুরু হতেই ধারণকৃত ধারাবিবরণী শুরু হয়ে গেল যাতে এই শহরের ইতিহাস বলা শুরু হয়েছে, পরে নানা লোকেশনের বর্ণনা ও অতীত ইতিহাসও শোনা যাবে। জানালার পাশে একটা আসন নিয়ে অসমাপ্ত কফির গ্লাসসহ জমিয়ে বসল হায়দার। একটা জায়গায় এসে দেখা গেল রাস্তার এক পাশে পঞ্চাশ দশকের বাড়িঘরের নমুনা আর অন্যপাশে আশির দশক পরবর্তী ইমারতের নমুনা। এক জায়গায় জানুয়ারির শীতের মধ্যে সাঁতার প্রতিযোগিতা হয়—সেটা দেখানো হলো। পাশেই এক হোটেলে হলিউডের ছবির দৃশ্যায়ন হয়েছিল। তারপর সব বড় শহরের মতোই একটা চায়না টাউন। বাসটা এক জায়গায় কিছুক্ষণ বিরতি দিল। চমৎকার দৃশ্য এখানে— নদী, হারবার, পাহাড়, সেতু, গাছপালা। নদীর অন্য পারের পাহাড় আর গাছগাছালিকে নীলাভ লাগছে। নদীতে এক নিঃসঙ্গ মারমেইডের ভাস্কর্য বসে আছে পাথরের ওপর। চারপাশে নীল জলরাশি যেনবা মারমেইডের নীলাম্বরী। এই মারমেইড বহুরূপী। জাতীয় দিবসে তাকে পরানো হয় আনুষ্ঠানিক পোশাক, অলিম্পিক বা টেরি ফক্স দৌড়ের সময় তার পরনে থাকে খেলার পোশাক।

মারমেইড দেখে হায়দারের মনে পড়ে গেল আরেক মারমেইডের কথা। জিনিয়া মৎস্যকন্যা হতে চেয়েছিল। সেই জিনিয়া এখন বোস্টনে থাকে। ইচ্ছে করেই কানাডা আসবার সময় আমেরিকার ভিসা সংগ্রহের ব্যাপারে দ্বিধায় ছিল হায়দার। পাছে বোস্টন গিয়ে জিনিয়ার সাথে দেখা করতে ইচ্ছে জাগে।

জানালার বাইরে স্ট্যানলি পার্কের মনোরম দৃশ্যগুলো পার হয়ে যাচ্ছে আর হায়দারের মনে পড়ে যাচ্ছে কক্সবাজারের ঝাউবনে হারানো দুপুরের স্মৃতি। আজকের এই ঠান্ডা দুপুরে সে যদি গিয়ে জিনিয়ার সামনে হাজির হতো, তাহলে উষ্ণ আমন্ত্রণ মিলত কি! জিনিয়ার ডুপ্লেক্স বাড়ির ছবি ফেসবুকের সুবাদে মনের পর্দায় ভেসে উঠছে। কিন্তু সে কেন দেখা করতে যেত সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেই বলে ও পথ মাড়ায় নি। কিন্তু দেখা না করেও মনের মুক্তি মিলছে না। সে তীব্রভাবে ভাবছে দেখা করবার কথা। জিনিয়া হায়দারকে দেখে হয়তো বেশ অবাক হতো।

জিনিয়া সেবারে কক্সবাজারে এসেছিল লবণ চাষ নিয়ে টেলিভিশনে একটা প্রতিবেদন করবে বলে। সে কখনও কক্সবাজারের উপর কোনো প্রতিবেদন করে নি, চিনেও না কাউকে। স্থানীয় সাংবাদিক মানিক বৈরাগী কয়েকজন সাক্ষাৎকারদাতা ঠিক করে দিল। মানিকের সাথে হায়দারের জানাশোনার সুবাদে হায়দার একজন ভোক্তা হিশেবে সাক্ষাৎকার দেবে। এইভাবে জিনিয়ার সাথে হায়দারের পরিচয়।

এরপর জিনিয়া আরো কয়েকবার কক্সবাজারে এসেছে। হায়দার তাকে সময় দিয়েছে। ওরা সময় কাটিয়েছে হিমছড়িতে, ওরা সময় কাটিয়েছে ইনানীতে, ওরা সময় কাটিয়েছে নির্জনে; ওরা ঘুরে বেড়িয়েছে মহেশখালি থেকে টেকনাফ। বাতাসের তোড়ে আনত ঝাউগাছের মতো কবে কিভাবে যেন হায়দার ঝুঁকে পড়েছে জিনিয়ার দিকে। জিনিয়া খুব ঘন ঘন আসতে পারত না। একদিন সন্ধ্যায় সুগন্ধা বিচে ছাতার নিচে বসে হেঁয়ালি করে জিনিয়া বলেছিল, “আমি যদি মৎস্যকন্যা হতাম! এই সমুদ্রে থাকতাম। রোজ সন্ধ্যায় সৈকতে এসে আপনার সাথে দেখা করে যেতাম।” হায়দারের মুখে কথা জোগায় না, বুকের মধ্য হাওয়ার ঝাপটায় ঝাউবনের সংক্রামক শিরশির শব্দ। সে ভাবে জিনিয়া ওকে ভীষণ ভালোবাসে। মুগ্ধ হয়ে জিনিয়ার কথা শোনে সে। বলাবলির তো আর কিছু নেই। ওরা তো দুজনে দুজনার।


এক সুন্দর সকালে জিনিয়া হায়দারকে বলল, বাসা থেকে বেরিয়ে যাও!


হিপ হপ ট্যুরিস্ট বাস এসে থামে একটা চত্বরে। বড় একটা সড়কদ্বীপের মাঝখানে অনেকগুলো হাস্যময় মুখের ভাস্কর্য। হাসি সংক্রামক। যাত্রীদের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়েছে। হায়দার নিজের জীবনের একটা সন্ধিক্ষণের স্মৃতিতে ভেসে যাচ্ছে, পাথরের হাসি বা কান্নায় তার কিছু আসছে বা যাচ্ছে না। জিনিয়ার মুখোমুখি হবার ইচ্ছেটা তীব্র হয়ে উঠছে, অথচ দেশ ছাড়ার আগে এমন কিছু কল্পনাও করে নি সে। বৈদ্যুতিক বাস নিজের গতিতে ছুটে চলেছে।

২.
হায়দার আর জিনিয়া বিয়ে করেছিল। বিয়ের পরপরই এক সাথে চলে আসে এলদোরাদো শহরে। জিনিয়া কাজের ব্যাপারে বা বৈষয়িক ব্যাপারে যতটা সচেতন, হায়দার তার উল্টো। এ শহর ওদের মতো করে প্রতিদিনই নতুন নতুন আগন্তুকে ভরে উঠছে, এক সময়ে নতুনেরা মিশে যাচ্ছে পুরনো অধিবাসীদের সাথে, তৈরি হচ্ছে নতুন সমাজ, বেড়ে যাচ্ছে নানামুখী জটিলতা। প্রায়ই দেশি কমিউনিটির অনুষ্ঠান হয়, আড্ডা, খানাপিনা হয়। নিজেদের যোগাযোগের জায়গাটা খুব দৃঢ়। হায়দার আর জিনিয়া অনুষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত যেতে থাকে। অনুষ্ঠানগুলোতে জিনিয়ার গানের কদর আছে। আর হায়দারের জন্যেও একটা বিশেষ কাজ তৈরি হয়ে যায়; এই শহরে হায়দার ঘুরে বেড়ায় আগন্তুকদেরকে নিয়ে। নবাগত মানুষটিকে এলদোরাদো শহর চেনাতে হবে, চাকরির জায়গাগুলোতে ঢুঁ দিতে হবে তাকে নিয়ে, ফাঁকে ফাঁকে সাইট সীয়িং। হায়দার এই কাজটি খুব আন্তরিকতার সাথে করত। এ ছাড়াও কারো আত্মীয়-স্বজনকে অন্য শহর থেকে নিয়ে আসতে হবে, হাসপাতালে সময় দিতে হবে কিংবা এয়ারপোর্টে কাউকে পৌঁছে দিতে হবে—এ সব কাজে সবার আগে ছিল হায়দার। সবাই এ কথা জানে যে হায়দারকে অনুরোধ করলে সে কখনো তা ফেলে দিতে পারে না।

জিনিয়া শুরুতে তেমন আমল দেয় নি, কিন্তু ধীরে ধীরে ব্যাপারটি হায়দারকে গ্রাস করে নিতে থাকল, ওর ব্যবসাপত্রের ক্ষতি হতে থাকল, ওদের মেয়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে সময় না পেয়ে ধীরে ধীরে কেমন বিষণ্ণ  হয়ে যেতে থাকল। এসব দেখে হায়দারের প্রতি হতাশ হয়ে জিনিয়া আরো ভালো চাকরি খুঁজতে খুঁজতে এমন একটা চাকরি পেয়ে গেল যে হায়দারের আয়ের প্রায় চারগুণ আয় করতে শুরু করল। এই অনুকূল পরিবেশে হায়দার আরো বেশি বেশি পরোপকারে মন দিল আর জিনিয়া ব্যস্ত হয়ে উঠল। ঘরে হায়দারের আয়-রোজগারের আর কোনো দরকারই পড়ল না বলে হায়দার কাজকর্ম ছেড়েই দিল একরকম।

এক সুন্দর সকালে জিনিয়া হায়দারকে বলল, “বাসা থেকে বেরিয়ে যাও! যাদের জন্য সারাদিন এ-শহর ও-শহর ঘুরে বেড়াও তাদের বাসায় যাও!”

হায়দার ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগের জায়গাগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকল। আড্ডাগুলোতে জিনিয়া  অপরিহার্য। হায়দারকে কেউ আর ডাকে না।

পরাজিত, বিধ্বস্ত অবস্থায় হায়দার দেশে ফিরে এসেছিল।

৩.
পরদিন সকালে হায়দারের লেকচার ছিল। ভালোয় ভালোয় শেষ হয়ে যাবার পর আবারও কনফারেন্স হলের বাইরে কফিশপে এল। আজ সকাল থেকে পরিবেশ মেঘলা। কনকনে হাওয়া। মাথার হুডটা লাগিয়ে ভাবছে আজ দুপুরে আবারও নিরুদ্দেশ যাত্রা করতে হবে। শিখ এক ড্রাইভার ইশারায় ডাকছে কি তাকে? দুপুরের আগে দরকারি একটা সেশন আছে মনে পড়ে গেল। হলের দিকে ফিরতে ফিরতে ওয়াই-ফাই এর আওতায় এসে যেতেই বন্ধু মোহাম্মদ আলীর মেসেজ পেল, “দুপুরে কী করছিস? আয় একসাথে লাঞ্চ করি।” সাথে সাথেই উত্তর দিয়ে দিল, “ওকে”। মোহাম্মদ আলী খুব ব্যস্তমানুষ, অনেক ঘোরাঘুরির কাজ করে। কনফারেন্সের আগের দিন এয়ারপোর্ট থেকে তুলে বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। রাতে হোটেলে পৌঁছে দিয়েছে। আজ হয়তো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানোর সুযোগ আছে।


হায়দারের ইনটুইশন বলছে, সতর্ক থাকতে; কিন্তু হায়দার কেঁপে উঠল, ঠান্ডায় নাকি অন্য কোনো কারণে বুঝতে পারছে না।


ম্যাকডোনাল্ডস-এ মজাদার খাবার খাইয়ে আলী ওকে সোজা নিয়ে গেল দুঘণ্টা দূরের একদ্বীপে! শহরের সাথে নাড়ির যোগ আছে এই গ্রানভিল আইল্যান্ডের। আজকের আবহাওয়া আবারও রোদেলা হয়ে উঠেছে। সারি সারি ব্যক্তিগত বোট রাখা আছে নদীতে। এখানেও এক মনোহর সেতু আছে। পার্কিং-এ গাড়ি রেখে ওরা একটা টিম হর্টনের কফি শপে ঢুকতে যাবে এমন সময় একটা গাড়ির নাম্বার প্লেট দেখে চমকে গেল হায়দার। গাড়িটা এসেছে বোস্টন থেকে! নাম্বার প্লেটে লাল অক্ষরের নাম্বারের সাথে নীল রঙে লেখা আছে ম্যাসাচুসেটস—দা স্পিরিট অফ আমেরিকা! যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি রাজ্যেরই গাড়ির নাম্বার প্লেটে এক একটি স্বতন্ত্র শ্লোগান থাকে সেটা তার জানা ছিল।

হায়দারের ইনটুইশন বলছে, সতর্ক থাকতে; কিন্তু হায়দার কেঁপে উঠল, ঠান্ডায় নাকি অন্য কোনো কারণে বুঝতে পারছে না। ওর মন বলছে কফিশপে ঢুকলেই জিনিয়ার সাথে দেখা হয়ে যাবে। দেখা হয়ে গেলে কী কী হতে পারে ভেবে পাচ্ছে না। যদি দেখে ভেতরে জিনিয়া নাই তাহলেও সেটা মেনে নেওয়া শক্ত হয়ে যাবে।

*
কিছুক্ষণ পর দুই বন্ধু যখন দ্বীপের অন্য দিকটায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল, সূর্যের হাসি মাখা বিকেলের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করছিল, তখন টিম হর্টনের কফিশপ থেকে এক ‘নিঃসঙ্গ মৎস্যকন্যা’ বের হয়ে লাল-নীল নাম্বারপ্লেটওয়ালা গাড়িতে উঠে বসেছে।

মোশতাক আহমদ

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮; টাঙ্গাইল।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক, জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে একটি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
সড়ক নম্বর দুঃখ/ বাড়ি নম্বর কষ্ট [দিনরাত্রি, ১৯৮৯]
পঁচিশ বছর বয়স [সড়ক প্রকাশ, ১৯৯৪]
মেঘপুরাণ [পাঠসূত্র, ২০১০]
ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি [পাঠসূত্র, ২০১৫]
বুকপকেটে পাথরকুচি [চৈতন্য, ২০১৭]

প্রবন্ধ—
তিন ভুবনের যাত্রী [এ লিটল বিট, ২০১৬]

ই-মেইল : mostaque.aha@gmail.com

Latest posts by মোশতাক আহমদ (see all)