হোম গদ্য গল্প নাটোর থেকে বগুড়া

নাটোর থেকে বগুড়া

নাটোর থেকে বগুড়া
76
0

বাস থেকে  নাটোরে নেমে দেখি এগারোটা দশ। পঁচুর হোটেলে রুটি-গরুর মাংস খেয়ে যখন মাদ্রাসার মোড়ে এলাম তখন সাড়ে এগারটা পার হয়ে গেছে। ইমু বলল, আজও মনে হয় ঝামেলায় পড়লাম, অনু। বাস তো পাওয়া যাবেই না। মাইক্রোতে যাওয়া তো রিস্ক হয়ে যাবে। ট্রাকই একমাত্র ভরসা এখন। কিন্তু ট্রাক পেতে আজও গ্যাঞ্জাম হবে। শালার কোন দুঃখে যে এমবিএটা করতে গেলাম। তাও আবার বগুড়া থেকে রাজশাহীতে!

বলে রাখি, আমি ইউল্যাব থেকে বিবিএ কমপ্লিট করেছি। আর ইমু একটা ব্যাংকে চাকরি করে। আমার এমবিএটা কমপ্লিট করা দরকার। ও বলল, তাহলে আমিও করে ফেলি। ব্যস। ভর্তি হয়ে গেলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভিনিং সেশনে। শনিবার আমাদের ফিরতেই হয়। কারণ রোববার ইমুর অফিস। সমস্যা হলো আমাদের ক্লাশ শেষ হয় রাত নয়টায়। কিন্তু রাজশাহী থেকে বগুড়াগামী শেষ বাসটি যায় বিকেল পাঁচটায়। এজন্য প্রথমে আমাদের নাটোরে আসতে হয়। নাটোরে আসতে রাত এগারটার মতো বাজে।

এখানে আরেকটা সমস্যা। নাটোর থেকে বগুড়ার সর্বশেষ বাস যায় রাত পৌনে নয়টায়। এজন্য হয় বরিশাল থেকে দিনাজপুরগামী বাসের জন্য ওয়েট করতে হয়। অথবা আসতে হয় ট্রাকে চড়ে। সে-এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।

আমরা বরিশাল হতে দিনাজপুরগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করছি না। কারণ ওটা আসবে রাত সাড়ে তিনটায়। ততক্ষণ বসে থাকাটা খুব কষ্টের হয়ে যাবে। ফলে যথারীতি ট্রাকের জন্য অপেক্ষা করছি আমরা। এমন সময়ে খবির মিয়া খবর নিয়ে এল বগুড়ায় একটা বাস যাবে। প্রথমে বিশ্বাস করলাম না। কিন্তু খবির মিয়া প্রায়ই আমাদেরকে ট্রাক ধরিয়ে দেয়। এমন একটা সময়ে আমরা এসে পড়েছি যে সবাই সবাইকে সন্দেহ করি, ভয় পাই। খবির মিয়া ট্রাক ড্রাইভাকে আশ্বস্ত করে আমরা ভালো মানুষ। কোনা সমস্যা নেই। খবির মিয়াকে আমরা যেমন বিশ্বাস করি ট্রাক ড্রাইভারও বিশ্বাস করে।

আমরা গেলাম বাসের কাছে মোটামুটি তার জোরাজুরিতেই। গিয়ে দেখি সত্যিই একটা বাস। বাসভর্তি মানুষ। তারা যেন আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমি হেলপারকে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই, কোথায় যাবেন? সে জোরে বলে উঠল, ‘বগড়া বগড়া’।


দেখি বৃক্ষের ফাঁক দিয়ে আমাদের বাসটি চলতে চলতে একটা সরু গলির ভিতর ঢুকে গেল। তখনই সবাই আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়ল। দুই একজন নাচতে শুরু করল। তারপর একে একে সবাই। সব শেষে উঠল তাদের কথিত মৃত দাদি।


আমি ক্রস চেকিং-এর মতো করে জিজ্ঞেস করলাম আবার, সিংড়া গিয়ে নামিয়ে দিবেন না তো আবার? এ-সময়ে তো বগুড়ার বাস থাকার কথা নয়। আমার এ কথা শুনে হেলপার বাসের গায়ে কয়েকটা থাবা দিল। তার মানে বাস ছেড়ে দেবার ইঙ্গিত। যে লোকটা আমাদেরকে বাসের কাছে নিয়ে এসেছিল সে বলল এবার, ‘ভাবি আসলে হইসে কী একশাতে ম্যালা প্যাসেনদার পাওয়া গেল তো তাই ইসপেশাল টিপ। তারাতাড়ি উইঠ্যা পড়েন।’

ততক্ষণ বাসের ওয়ার্ম আপ শেষ হয়েছে। শুরু করেছে যাত্রা। আমরা তার কথা বিশ্বাস করে উঠে পড়লাম। যেহেতু শেষে উঠেছি সিট হলো পেছনের দিকে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যাক আজ অন্তত ট্রাকের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেলাম।

কিন্তু ইমু এই স্বস্তি থেকে রেহাই দিল না। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস করে বলল, অনু, একটা জিনিস লক্ষ করেছ। বাসের সব যাত্রীই অসম্ভব কালো। তাদের প্রত্যেকের মাথা নেড়ে। তাদের বয়সও কাছাকাছি। মোটামুটি বাইশ-চব্বিশ।

আমি একপলকে সবাইকে দেখে চিৎকার দিতে যাব তখন ইমু আমার মুখে হাত দিল। আমাকে শান্ত করে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল আসলে ব্যাপারটা কী। একটু চিন্তাও করল মনে হয়। আমি তো ভয়ে কাঁপছি। বাসের ভেতরে একটা ছোট মৃদু লাইট জ্বলছে। তাও সামনের দিকে। আলো সামনে নিয়ে আলো ভেদ করে শাঁ শাঁ করে এগিয়ে চলছে বাস। কালো পিচ দেখা যাচ্ছে। দুপাশে সবুজের সারি। অন্ধকারে সেগুলো কালো হয়ে গেছে। ইমু এবার একটা কাজ করল, একজনকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই, আপনারা কোন জায়গা থেকে এসেছেন আর যাবেনই-বা কোথায়?’  সে বলল, ‘যেখান থেকে এসেছি সেখানেই যাব।’

আধ্যাত্মিক কথাবার্তা। ‘তাহলে এখন কোথা থেকে এলেন।’ ইমুর বা আমার মুখের দিকে না তাকিয়েই সে উত্তর দিল, ‘এসেছিলাম মড়া পোড়াতে। আমাদের এক দাদি মারা গেছে। তাকে পোড়ালাম।’

ইমু বোধহয় এবার ভয় পেয়েছে। ‘কী বলেন আপনি?’

‘বিশ্বাস হয় না? এক দাদিকে পুড়িয়ে এলাম। আরেক দাদি মারা গেল। তাকে নিয়ে যাচ্ছি বগুড়ায়। ওই দেখেন।’ বলে সামনের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাল।

আমার তো গলা শুকিয়ে কাঠ। ইমু আমাকে শক্ত করে ধরে থাকার ইঙ্গিত দিল। আমি ওইদিকে তাকাতে চাচ্ছি না। কিন্তু বারবার চোখ চলে যাচ্ছে। আরো জোরে ইমুকে জড়িয়ে ধরছি। ইমু বলল, ‘বাইরে তাকাও। দেখো কী সুন্দর দৃশ্য।’ সামনে তাকালাম। দেখি বৃক্ষের ফাঁক দিয়ে আমাদের বাসটি চলতে চলতে একটা সরু গলির ভিতর ঢুকে গেল। তখনই সবাই আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়ল। দুই একজন নাচতে শুরু করল। তারপর একে একে সবাই। সব শেষে উঠল তাদের কথিত মৃত দাদি। সে নৃত্য শুরু করতেই অন্য সবাই থেমে গিয়ে সিটে বসে চুপ হয়ে গেল। পরিস্থিতি শান্ত হলে হেলপার এগিয়ে এল আমাদের দিকে। আপনারা কোথায় নামবেন? তিনমাথায় নাকি চারমাথায়?

ইমু বলল যেকোনো মাথায় নামালেই হবে। সামনে কোনো বন্দর দেখলে সেখানেই নামিয়ে দিন।’

হেলপার একথা শুনে আমাদের দিকে তাকাল। কোনো কথা বলল না। আমি তার চোখের দিকে তাকালাম। এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। তারপর কিছু মনে নেই। এভাবে কতক্ষণ কেটে গেছে আমরা কেউ জানি না। একসময় দেখি বাস চলছে না। হেলপার এসে বলছে আপনারা নামবেন না?

আমরা নামলাম। নেমে দেখি আমাদেরকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে আমাদের বাসার কাছেই। বাস কখনোই এই আবাসিক এলাকায় আসে না। আমরাও বলি নি এখানে নামব।

এমরান কবির

জন্ম ০৫ এপ্রিল, ১৯৭৯; সার্টিফিকেটে ০৯ নভেম্বর ১৯৮০। জন্মস্থান বগুড়ার কৃষ্ণপুরে।

শিক্ষা : রসায়ন শাস্ত্রে অনার্স-মাস্টার্স, এবং মার্কেটিং-এ এমবিএ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : অধুনালুপ্ত দৈনিক আজকের কাগজ-এ সাব-এডিটর হিশেবে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবনে প্রবেশ। বর্তমানে একটি অসরকারি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়ায় কর্মরত।

সম্পাদনা : ছোটকাগজ থার্ডম্যাগ, সেন্ট্রাল জেল, পরিধি।

প্রকাশিত গ্রন্থ—

কী সুন্দর মিথ্যাগুলো [কাব্যগ্রন্থ, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০১১]
নিদ্রাগহন মহাশূন্যে [গল্পগ্রন্থ, ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১২]
পালকভরা সূর্যাস্ত [কাব্যগ্রন্থ, গদ্যপদ্য প্রকাশনী, ২০১৩]
আমি লিখেছি এইসব, আমি লিখি নাই [গদ্যগ্রন্থ, বাঙলায়ন, ২০১৪]
নীল বোতাম [উপন্যাস, বেহুলাবাংলা, ২০১৬]

পুরস্কার ও সম্মাননা—

জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার, ২০১০।
পাঠকপণ্য পাঠশালা সম্মাননা, ২০১২।

ই-মেইল : kobir_bangladesh@yahoo.com

Latest posts by এমরান কবির (see all)