হোম গদ্য গল্প ধুতুরার বিষ

ধুতুরার বিষ

ধুতুরার বিষ
755
0

১.
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিশাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৪৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে এটলাস মেথড-এর বিশেষ পদ্ধতিতে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিশাবে ঘোষণা করেছে। তবে কেবল আয় বাড়লেই তাকে এখন আর উন্নয়ন বলা যায় না। ফলে কেবল আয় বাড়িয়ে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পর ফাঁদে পড়েছে অসংখ্য দেশ। এর সবচেয়ে বড় উদহারণ ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা। মূলত যারা কেবল আয় বাড়াতেই মনোযোগ দিয়েছে বেশি। অবকাঠামো শিক্ষাসহ মানবসম্পদ উন্নয়নের দিকে নজর দেয় নি।


চ্যানেল সমূহের উত্তপ্ত টকশো দেখে রিমোট হাতে মাঝে মাঝে প্রতিপক্ষের বক্তার মতোই উত্তেজনায় লাফিয়ে ওঠে


২.
বিষয়টি মিডিয়াজুড়ে খবরের হেডলাইন হিশাবে ঘোষিত হতে থাকলেও ঈমান আলী তা শুনতে পায় নি, বাড়ি ফিরে সে এটিএন বাংলা, চ্যানেল আই, এনটিভি ইত্যাদি চ্যানেল সমূহের উত্তপ্ত টকশো দেখে রিমোট হাতে মাঝে মাঝে প্রতিপক্ষের বক্তার মতোই উত্তেজনায় লাফিয়ে ওঠে বটে। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার সংবাদটি তার নজর এড়িয়ে যায় এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে খবরটি প্রথম জানতে পারে মাস ছয়েক পরে যখন তার বেতন আটকে যায়। ডিরেক্টর এমপ্লয়িদের নিয়ে মিটিং করে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে জানান, তিনি আশা করছেন মাস কয়েকের মধ্যেই ডোনারদের সন্তুষ্ট করে বাজেট ছাড়িয়ে আনতে সক্ষম হবেন। ঈমান আলী মোটামুটি বিষণ্ন মনে বাড়ি ফিরেন আর স্ত্রীকে জাতির এই গুরুত্বপূর্ণ সুখবরটি যখন দেন তখন তার মুখে যেন ঝুলে থাকে খুব নিকট আপনজন হারিয়ে মুহ্যমান হবার শোক। এনজিও সেক্টরে চাকরি করে সংসার চালাচ্ছেন দুই দশক, এমন অথৈ সাগরে পড়ার অভিজ্ঞতা প্রথমবার। স্ত্রী যদিও সান্ত্বনা দিয়েছেন—ফানিত ফড়ছ না খিতা? আমার চাকরিডা আছে নানি? আছে বটে, দুজনের আয়েই যেখানে টেনেটুনে চলা, সেখানে একজনের আয়ে কত যে হাবুডুবু পানি থেকে উদ্ধার পাওয়া যাবে তা ভেবে ভেবে প্রথম রাতটি প্রায় নির্ঘুম কাটে ঈমান আলীর। মাস কয়েক পরে অবশ্য বকেয়া বেতনসহ মাস-দুমাস করে টাকা হাতে আসতে লাগলে, টাকার পরিমাণটায় পকেটের সাথে সাথে বুকটাও কেমন উচুঁ হয়ে ওঠে। কাটিয়ে আসা মাসগুলি কায়ক্লেশে, চেয়ে-চিন্তে চলে গেছে বেশ, থেমে তো থাকে নি। বুক পকেটের বকেয়া বেতনের টাকাগুলি নিয়ে সে বাড়িমুখো না হয়ে অন্যপথ ধরে, যে পথটা ক্ষেতের আলপথ বেয়ে ছাল-বাকলা উঠানো, ডাক্তার-ওষুধপথ্যহীন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশ দিয়ে গিয়ে ইট সয়েল করা রাস্তা দিয়ে নতুন গড়ে ওঠা শিল্প এলাকা লাগোয়া গ্রামে ঢুকে গেছে।

হৃদয়-অন্তরের নিরুপায় মা স্বামী মারা যাবার পর মাস ছয়েক বসেই ছিল সতীন পুত্রদের ভরসায়। বুড়া মরার সময় পুত্রদের হাতে সঁপে গিয়েছিল তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী সন্তানদের দায়িত্ব। সরল মনে হৃদয়-অন্তরের মা বিশ্বাসও করেছিল সে তার মাতৃহীন সতীন পুত্রদের, মায়ের মতোই। বুড়া থাকতে রেঁধে-খাওয়ানো, বিয়ে-শাদি করানো সতীন পুত্রদের প্রতি কোনো দায়িত্বে অবহেলা করে নি যখন, তখন স্বামীহীন সংসারে তারা অচেনা হয়ে যেতে পারে এমন জটিল হিশাব তার মাথাতেই আসে নি। আসতে সময় লেগেছে মাস ছয়েক। নিজের ছেলেগুলোসহ দিন কয়েক আধাপেট খেয়ে, আর টিকতে না পেরে পাশের বাড়ির ইউপি মেম্বারকে ধরে শেষ পর্যন্ত চাকরিতে ঢুকেছে গ্রাম লাগোয়া গড়ে ওঠা নতুন শিল্পাঞ্চলে। ঘুম থেকে উঠে এক হাঁড়ি খালি ভাত ফুটিয়ে রেখে নাবালক ছেলেগুলোকে আল্লার ওয়াস্তে পঞ্চায়েত উঠানে আর বেওয়ারিশ রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে সাত-সকালে কারখানায় ঢোকে সে। ফিরে সন্ধ্যারাত পার হলে, ছেলেগুলো সারাদিন বাদাইম্যার মতো হল্লা ক’রে ততক্ষণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নুন-মরিচ মাখা ভাত খেয়ে বেহুশের মতো ঘুমিয়ে পড়ে ছেঁড়া চাটাইয়ে। গায়ে মশারা রক্ত খেয়ে যখন একেকটা আথ্রাইটিসের রোগীর মতো আর নড়তে চড়তে পারে না, ঘরে ফিরে তখন দুহাতের তালু লাল হয়ে যায় আত্মজদের রক্তে, নিজের ঘামে শ্রমে যে রক্ত সে যোগান দেয় তাদের গায়ে।

কারখানাতে চাকরিরত অবস্থায়ই রোজগারের বাঁকা পথটা খোলাসা হয় তার কাছে। বারো ঘণ্টা দাঁড়িয়ে পলিথিনের প্যাকেটমোড়ানোর সোজাপথের অফিস ডিউটি সেরে, মেয়েগুলো কিশোরী-যুবতী, বউগুলোও বাঁকা পথে হারিয়ে যায়। কারখানার ভিতরে সূর্য ডোবার অন্ধকার নেমে এলে সামনের রাস্তার নিয়ন সাইন আর বাহারি আলোগুলো জ্বলে ওঠে। পিছনের দিকটার অন্ধকার তখন আরো তীব্র গাঢ় হয়ে ওঠে সামনের দিক থেকে নিয়ন আলোর দৌড়ানি খেয়ে আসা অন্ধকারের সাথে মিশে। সেখানেই দেয়া-নেয়া। কার সাথে কার অন্ধকারে ঠিকঠাক হদিস মেলে না। হাতে গুঁজে দেয়া বিশ পঞ্চাশ টাকা যাই হোক, বাড়তি পাওনা, গোনা বেতনের বাইরে। মন্দ কী? প্রথম প্রথম সারাদিনের শ্রমক্লান্ত শরীর অবসন্নতায় নুয়ে পড়ত। পরে ধীরে ধীরে বুদ্ধি বাড়ে। বিকালের শিফটে সীমিত করে আনে কারখানার ডিউটি। হিশাবের বাইরে বে-হিশাবে যোগ হয় রাতের ডিউটি। পরে একসময় কারখানার চাকরিটাই ছেড়ে দেয় সে। নিজের একখান ঘর যখন আছে, দিনভর দাঁড়িয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি দেয়ার দরকার কী। কয়েক মাসের যাতায়াতে চ্যানেল যা তৈরি হওয়ার হয়ে গেছে। দেশের নানাপ্রান্ত থেকে আসা নানা কিসিমের মানুষ। মন্দ হয় না আয় রোজগার।

ঈমান আলীর হাতে বিস্কিট আর চিপসের প্যাকেটগুলো দেখে হৃদয়ের উৎফুল্লতার আতিশয্য লুকাতে পারে না হৃদয়-অন্তরের মা, মাইনা পাইছইন মনঅ লয়? তর লাইগ্যাঅ আছে—মুচকি হেসে ঈমান আলী পকেট থেকে এককৌটা জর্দা আর এক প্যাকেট সিগারেট হাতে দেয় তার। হৃদয়-অন্তরের মায়ের আনন্দ আর ধরে না। সন্ধ্যারাতে ঘুমিয়ে কাঁদা ছেলেগুলোর বালিশের কাছে বিস্কিট আর চিপসের প্যাকেটগুলো রেখে নিয়ে এসে বসে ঈমান আলীর গা ঘেঁষে, নিজেরটায় আগুন দিয়ে ঈমান আলীরটাও জ্বালিয়ে দেয়। নিকোটিনের ধোঁয়ায় বার দুয়েক কেশে উঠে হৃদয় কিংবা অন্তর। ঈমান আলী বাঁ হাতে সিগারেট ঠোঁটে ধরে ডান হাতে কাছে টানে হৃদয়-অন্তরের মাকে। সে আহলাদে গলে গলে পড়ে বড়লোকের বাড়ির ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের মোমবাতির মতো—খতদিন ফরে হিগারেটঅ টান দিলাম, বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে জান খালা অইয়া গেছেগা। আবার কাশি দেয় হৃদয় কিংবা অন্তর, বদ্ধ ঘর থেকে বের হতে না পারা গুমোট ধোঁয়ার আক্রমণে। ঐ ইডি আবার উডত নাত গুম থিক্কা?—ঈমান আলীর উৎকণ্ঠার সাথে যোগ হয় বিরক্তি। আরে না, হারাদিন বাদামাইম্মার মতন গুইরা আইঞ্জা অইলেঅই মরার মতন গুমায়, ছিন্তা কইরঅইন না। হৃদয়-অন্তরের মাকে আরো কাছে টানে ঈমান আলী—আইজ আমার হাউস মিডাইয়া দিবি, বাজারের সিডিত যেমন দেখি…। হৃদয়-অন্তরের মা না করে না, ঈমান আলী তার স্পেশাল গেস্ট। ঈমান আলী যেদিন আসে, সেদিন ঘরে আর কারো প্রবেশধিকার নেই।


ঘরে মানুষ ডাকা কি কেবল পেটের খিদের জন্য, শরীরের খিদেটার কথা ভাবেই না কেউ।


৩.
হলুদ প্লাস্টিকের ঢাউস বালতিটায় পুরা মাসের খোরাকি চাল জমা থাকে। মাসের মাঝামাঝিতে শেষ হবার কথা নয়। আপদকালীন সময়ের জন্য কিছু সরিয়ে রাখে লাল প্লাস্টিকের ডিব্বায়। এটাও খালি। ঘটনা কী? বুঝে উঠতে না পেরে মই বেয়ে মাচাঙে ওঠে জোছনা। খোরাকি বাদে ওখানে কিছু চাল জমা থাকে। প্রয়োজন মতো কিংবা দাম বাড়লে বিক্রি করা যায়, ঘরে মজুদ আছে বলে বুকে বেশ বলও থাকে। এখানেও চালের ঢাউস ঝাঁকার শূন্য পেটে কতগুলো তেজপাতা আর শুকনো মরিচ পরে আছে। পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য চালগুলোর গায়ে মাখিয়ে রাখা হয় যেগুলো। বাড়িতে ঢুকেই দাওয়ায় দুবাচ্চা সমেত সীমাকালিকে দেখে জোছনার শ্রান্ত শরীরের সপ্তমে চড়া মেজাজ চাল নাই হওয়ার আকস্মিকতায় ধপ করে নেমে গিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। ঘটনার আগামাথা সে আন্দাজ করতে পারে না। সব চালের ভাণ্ডার একসাথে খালি হয় কী করে? স্মরণকালে কখনো এমনটি ঘটেছে বলে স্মরণে আসে না তার। মাস পেরিয়ে বছর, বছর পেরিয়ে উদ্বৃত্তগুলো বিক্রি করে সে ফি বছর। একমাত্র ছেলেটার ভবিষ্যৎ ভেবে করে রাখা শিক্ষাবীমার কিস্তি দেয়। কিন্তু আজ সব চাল উধাও হয় কী করে? সীমাকালিরে যে সন্দেহ হয় না তা নয়। কখন এসেছে কে জানে, এসে কি বিক্রি করে দিয়েছে সব? ওর কলিজা পুরু। ও পারে না জগতে এমন কাজ আছে বলে মনে হয় না জোছনার। ঘরের চাল কেন, পুরো বাড়িটাই বিক্রি করে দিলে ছানি পড়া চোখে আধাঅন্ধ মা কিছুই টের পাবে না। আগেরবার এসে সোনার আংটি দুখানা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা সন্দেহটাকে আরো ঘনীভূত করে, যদিও বাস্তবতা বিবেচনায় বিষয়টা অসম্ভবই ঠেকে। তবু সন্দেহ আর অস্থিরতা নিয়ে মুখ না খুলে পারে না জোছনা—অ আম্মা, অংকা খিতা খরতাম বেডি, গরঅ দেখি একমুডা চাইলও নাই। ছানি পড়া চোখে বৃদ্ধা ফুলেছা বানু পিটপিটিয়ে তাকায় চারদিকে, বিড়বিড় করে—অ তাই আইলেঅই তরার ঘরঅ চাইল-ডাইল তাকে না…। বুড়ির চোখের ছানি দুফোঁটা জল আটকাতে পারে না।

বড় মেয়ের নাম জোছনা, ছোট মেয়ের নাম পূর্ণিমা আর মেজো মেয়ে সীমা। যখন ওর জন্ম হয়েছিল তখন কলমে দোয়াত থেকে কালি ঢুকিয়ে লিখত মানুষ। কালো কুচকুচে গায়ের রঙ দেখে কে যে নামটা রেখেছিল মেয়ের আজ আর মনে পড়ে না। সীমাকালি তখন বাজারের সবচেয়ে প্রচলিত দোয়াতের কালি। সীমার সাথে কালি যোগ হয়ে ওর নামটাই স্থায়ী হয়ে গেল ‘সীমাকালি’। বড় দুটোর রূপসৌন্দর্য সর্বাংশে তাদের নামানুযায়ী না হলেও কৈশোরে যৌবনে বেশ ঢলঢলে হলো প্রকৃতির নিয়মে। আর কালো কুৎসিত বদখত মেয়েটি পুরো উল্টা। সারাদিন টো টো করে ঘোরে, কেউ ঠিকঠাক বলতে পারে না। বড় আর ছোট যখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ‘লেইস ফিতা’ নামিয়ে স্নো-পাউডার আর চুড়ি কিনে, মেজোটা তখন মোল্লাবাড়ির নারিকেল গাছের আগায়।

অতিক্রান্ত সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মার হাতে উত্তম-মধ্যম খেয়ে, চুপচাপ খেয়ে-না-খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে চাটাইয়ে। সময় মতো জোছনা-পূর্ণিমার বিয়ে হয়ে গেলেও, সীমাকালিকে নিয়ে অথৈ সমুদ্রে পড়েছিলেন বুড়ি ফুলেছা বানু। একমাত্র ছেলে ভিটেবাড়ি বেচে যখন শ্বশুরবাড়িমুখী, তখন কত ঘটকের হাতে পায়ে ধরে যে বউমরা এক আধবুড়া জামাই খুঁজে সীমাকালিকে গছিয়ে দিতে পেরেছিল ফুলেছা বানু। ঘরে দুইটা সোমত্থ ছেলে আর বেটার বয়স ষাটের কাছাকাছি। উপায় কী? কালো কুচকুচে বদখত দুরন্ত সীমাকালিকে নিয়ে কোথায় ঘুরবে সে? নিজে না হয় বাকি জীবনটা ছ’মাস করে কাটিয়ে দেবে জোছনা পূর্ণিমার সংসারে। তার মৃত্যুর পরই-বা হবে কী মেয়েটার, সাত পাঁচ ভেবে প্রস্তাবটাকে তখন মনে হয়েছিল সোনার হরিণ। আপাত-স্বস্তি এসেছিল তার অনিশ্চিত ভবিষ্যতে। কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হয় নি সে স্বস্তি। নিজের যে জীবনটা এখন উদ্বৃত্ত মনে হচ্ছে, সেই জীবনটাতেই তার চোখের সামনে দুই-দুইখানা ছেলে ধরিয়ে দিয়ে বয়স সত্তরে পৌঁছানোর আগেই পটল তুলেছে জামাই। তারপর থেকেই মেয়েটার এই দুর্গতির জীবন। পেটে ধরা সন্তানের এই অসহ্য জীবনযন্ত্রণা আর মেয়েটার জন্য কিছু করতে না পারার অসহায়ত্ব তার শেষ জীবনটা জাপটে ধরে আছে দুরারোগ্য ব্যাধির মতো।

মাচান থেকে নামতে নামতে গায়ের ওড়না দিয়ে ঘাড়ের মুখের ঘাম মুছে জোছনা, এর কতক পরিশ্রমের কতক উদ্ভ্রান্ততার। এত চাল গেল কই? অফিস থেকে ফিরে, পরনের পোশাকখানাও খুলার ফুসরত মেলে নি আজকে। যখন তখন এসে হাজির হওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত মেহমান এরা। বাচ্চা দুটো বদের হাড্ডি। কোনো আদব-কায়দার ধারে নাই, এসেই ছেলের বই ছেঁড়ে, বিছানায় বসে চিনি মাখিয়ে মুড়ি খায়, সারা বিছানা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, ফুল ভলিউমে টিভি ছাড়ে—যেন হনুমানের লঙ্কাকাণ্ড। অন্য সময় ধমকা-ধমকি করে সে। কিন্তু আজ এই চাল উধাও হয়ে যাবার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া জোছনা বাচ্চাদের এই লঙ্কাকাণ্ড অগ্রাহ্য করে ফুলেছা বানুর গায়ে হাত রাখে—অ মা বিশ্বাস করঅ বেডি, সব নু খালি, ঘরঅ একমুডা চাইলঅ নু নাই, অহন অত্তোগুলা মাইনষে খামু কিতা রাইতে? কথাটা শুনেই কিনা কে জানে, সীমাকালির ছোট ছেলেটা তারস্বরে চিৎকার ধরে—অ মা খিদা লাগছে, ভাত খামু। জোছনা ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া অবস্থা এবার উদ্ভ্রান্তিতে পৌঁছায়। ভাদ্রের রোদে সারাদিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে পোয়াতি মেয়েদের তালিকা সংগ্রহ করতে করতে ঘামে শ্রমে ক্লান্ত নিজের অসহ্য হয়ে উঠা মেজাজ আর ঘরে চাল না থাকায় আকস্মিক ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়াটা না হয় সামলানো গেল সহোদরার দিকে তাকিয়ে, কিন্তু বাচ্চার বাপ এসে ঘরে এই লঙ্কাকাণ্ড দেখলে তো উপায় নেই। বেচারা এমনিতেই সীমাকালির ছায়া মাড়াতে পারে না। তার উপর সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরে যদি দেখে এই হাল, আজ আর উপায় নেই। গেল বার সীমাকালি ফিরে যাবার পর আংটি দুখানার হদিস না পাওয়া গেলে, আর নানা তথ্য-প্রমাণে সীমাকালিই দোষী সাব্যস্ত হলে, বাচ্চার বাপ শাসিয়েছিল, ফের যদি এরা এই বাড়িতে ঢোকে তবে জোছনাকে বাইন তালাক দেবে সে। না, সে ঘরে ফেরার আগেই যেভাবেই হোক সামাল দিতে হবে পরিস্থিতি। ছেলের অব্যাহত চিৎকারের মুখেও ঘরের এককোণে বসে সীমাকালিকে টুকুস টুকুস উকুন মারতে দেখে রাগে পিত্তি জ্বলে যায় জোছনার। গলা উঁচিয়ে ধমক দেয়—ঐ পুলাডা চিল্ল্যাইতাছে হুনছ না? থামাছ না কেরে? সীমাকালি রুষে উঠে অপুষ্ট ছেলেটার পিঠে দুমদুম কিল লাগায় আরো দ্বিগুণ রোষে। ছেলেটার চেঁচানোর স্বর আরো বাড়ে। জোছনার মায়া হয়, দৌড়ে গিয়ে আগলায় ছেলেটাকে—নিজের বিগাড় পুলাডার উপরে ঝারতাছস কেরে? আঁচলে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে সীমাকালি। গতকাল সালিশ-বৈঠক করে কুলটা-চরিত্রহীনা-বেশ্যা সাব্যস্ত করে স্বামীর ভিটা থেকে তাড়ানো হয়েছে ওকে। গ্রামের পঞ্চায়েত মুরুব্বিদের বারবার জিজ্ঞেস করেছে, যাবে কোথায় সে! স্বামীর ভিটাবাড়ির উপরে কি তার ছেলেদের অধিকার নাই। সুবিচারের বদলে তার এসব প্রশ্ন বেদাত-বেয়াদবি পরিগণিত হয়ে তার শাস্তি আরো গুরুতর হয়েছে। প্রকাশ্যে একশত দোররা…।

মরা বাপের কথা এ যাবৎকাল রাখতে না পারলেও সেই সময় মহান উদারতায় তা রক্ষা করেছে সতীনের ছেলেরা। ভিটে থেকে উচ্ছেদ করেছে ঠিক, দোররার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। নিজ জন্মের উপরে ঘেন্না ধরে গেছে, বিয়ের পর না একটা ভালো কাপড়, না একদিন ভালো খানাদানা, না একটু আদর সোহাগ। ঘরে মানুষ ডাকা কি কেবল পেটের খিদের জন্য, শরীরের খিদেটার কথা ভাবেই না কেউ। ছেলেদুটো নিয়ে এই বোনের সংসারে আপাতত আশ্রয় নেয়া ছাড়া তো আর কোনো উপায় ছিল না তার। আজ তাকে দেখেই বোন কিনা বলে ঘরে চাল নেই। কাল বিকাল থেকে আজ এই ভরসন্ধ্যা চব্বিশ ঘণ্টার উপরে দানা পড়ে নি পেটে। খিদের যন্ত্রণা তার ফোঁপানোর মাত্রাটা আরো বাড়িয়ে দেয়। জোছনা আবারো ধমক দেয় অনুজাকে—কান্দিস না, কান্দিস না। বাইচ্চার বাপ আইউক, ব্যবস্থা একডা অইবনে। বলতে না বলতে বাচ্চার বাপ ঘরে ঢোকে। চুপ করে যায় সীমাকালি। গায়ের জামাখানা খুলতে খুলতে বাচ্চার বাপ গোয়েন্দা চোখে পর্যবেক্ষণ করে ঘরের পরিস্থিতি। বাচ্চা দুটো ভয়ে এককোণে জড়ো হয়ে থাকে ছুঁয়ে দেয়া কেরার মতো। জোছনা তড়িঘড়ি একগ্লাস লেবু পাতার শরবত সামনে ধরে। ঢকঢক খেয়ে, টাঙানো দড়ি থেকে গামছাটা টান মেরে নিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে হাই তোলা শেষ করলে জোছনা কথাখানা পাড়ে—হুনছনি গরনু একমুডা চাইলঅ নাই, বাইচ্চাডি খাইব খিতা রাইতে, ইকটু যাও নে বাজারের দিকঅ। তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে বাচ্চার বাপ—হারাদিন খাইট্টা আইয়া খই একটু আরাম খরমু, রাবণের গুষ্ঠির লাইগ্যা অহন দৌড়াও চাইল আনতায়। বাচ্চার বাপের উচ্চস্বরে পুরো ঘর ডুবে যায় পিনপতন নিস্তবদ্ধতায়। ছেড়ে রাখা শার্টখানা আবার গায়ে গলাতে গলাতে বাচ্চার বাপ বলতে থাকে—নিত্য বিছার, নিত্য সালিশ…। তাইর বদনাম হুনতে হুনতে কান দুইখান আর নাই। অহন আইয়া উডছে আমার ঘরঅ। সইহ্যেরঅ একডা সীমা আছে।


বুক থেকে যে শ্বাসটি বেরিয়ে আসে তা দীর্ঘশ্বাস না স্বস্তির শ্বাস ঠিক বোঝা যায় না।


বাজারের ব্যাগখানা নিয়ে বাচ্চার বাপ বের হয়ে গেলে এবার জোছনা আর ফুলেছা বানু সীমাকালির দুধারে দুজন বসে। যদিও জোছনার চাকরি একটা আছে, তাতেই গত ক’মাস ধরে সংসার চলেছে, তবু বাচ্চার বাপ বিগড়ে গিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু করলে ছেলে আর প্রায় অন্ধ মাকে নিয়ে কই দাঁড়াবে সে? ফুলেছা বানুও ভীত হয়। মেজো মেয়ের জন্য যদি নিজের ঠাঁইখানাও হারাতে হয়। দুজনে মিলে বুদ্ধি দেয়—বিয়ানে দুই চাইরশ টেকা লইয়া যাইছ গা। ভাবিছ না, দুই এক মাস বাসা ভাড়া আমি টানুম নে। তর দুলাভাইরে জানাইতাম না। ফুলেছা বানুও সীমাকালির মাথায় হাত বুলায়, পরামর্শ দেয়—খুঁজলে বাসা একখান ঠিকঅই ফাইবে। দেহস না তর লাইগ্যা জোছনার সংসারঅ কী অশান্তি লাগছে। সীমাকালি পায়ের নখে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে নিশ্চুপ সব শুনে। তারপর হঠাৎ ছেলেদুটোর হাতে ধরে টান দিয়ে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। বড় রাস্তায় ওঠার মোড়ে ঈমান আলীর সাথে দেখা হয় তার। চাল নিয়ে ফিরছে সে। ফিরতি পথ ধরা সীমাকালিকে দেখে বিস্ময়ে জানতে চায় সে—কই যাস অত রাত্রে? তরার লাইগ্যা নু চাইল লইয়া যাইতাছি। সীমাকালি প্রশ্নটার ধারে কাছে যায় না। জিজ্ঞেস করে—দুলাভাই ধুতুরার বীজ দিয়া কী হাছাঅই বিষ হয়? উত্তরের অপেক্ষা না করে হনহন হাঁটা দেয় উল্টা পথে।

৪.
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙতে বেশ দেরি হয়ে যায় জোছনার। সর্বনাশ! ছেলের স্কুলে যাবার সময় হয়ে এসেছে। ভাত রান্না করে তাকেও বের হতে হবে কাজে। জোছনা ভাত বসানোর জন্য অভ্যাসগত হলুদ প্লাস্টিকের বালতিতে হাত দেয় চালের খোঁজে, বালতি ঠিক চালে ভর্তি। লাল প্লাস্টিকের ডিব্বাটা খোলে সে, এটাও ভর্তি। অধিকতর নিশ্চিত হবার জন্য মই বেয়ে আবার মাচানে ওঠে সে, সেখানেও ঝাঁকা ভর্তি চালের উপরই নিরীহ শুয়ে আছে শুকনো মরিচ, তেজপাতা। জোছনা ঘামতে থাকে। তবে কী দেখল সে কাল? ঠিক তখন মোবাইলটা বেজে ওঠে, সংবাদ আসে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে সীমাকালি। সতীনের বড় ছেলে বশির বখত যখন খবরটা বলে তখন পাশ থেকে কে যেন বলতে থাকে—কুনজাত বিষ খাইল তে? সীমাকালির মাথার কাছে ধুতুরার বীজ আর ইদুর মারার বিষের খালি বোতল দুটোই পাওয়া গেছে। কোনটিতে মৃত্যু হয়েছে তার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে। পুলিশ লাশ নিয়ে গেছে।

এ পর্যন্ত বৃত্তান্ত শুনে জোছনা যখন ফোনটা ঈমান আলীর হাতে দেয়, তখন বুক থেকে যে শ্বাসটি বেরিয়ে আসে তা দীর্ঘশ্বাস না স্বস্তির শ্বাস ঠিক বোঝা যায় না।

Ruma Modak

রুমা মোদক

জন্ম ৭ মে ১৯৭০, হবিগঞ্জ। এমএ (বাংলা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বি.এড।

প্রকাশিত বই :
নির্বিশঙ্ক অভিলাষ [বিশাকা, ২০০০]
ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলি [ঐতিহ্য, ২০১৫]

ই-মেইল: kabbyapaddya@gmail.com
Ruma Modak

Latest posts by রুমা মোদক (see all)