হোম গদ্য গল্প ধর্ষিতা তাজুল

ধর্ষিতা তাজুল

ধর্ষিতা তাজুল
347
0

তাজুল আমার বন্ধু। ধর্ষিতা তাজুল। ধর্ষিতা-যুক্ত পুরুষ চরিত্র শুনে হাসি পাচ্ছে কি? কঠিন পুরুষের বুকের সাগরে ঘৃণার পলি জমে যাচ্ছে হয়তো। কেউ কেউ ভাবছেন, ‍উপযুক্ত হয়েছে? এ নপুংসক মানসিকতার-পুরুষ পুরুষজাতির কলঙ্ক! কিছু অপরিণত-মানসী নারীও হয়তো নারী জাগরণের কথা ভাবছেন। আসলে বিষয়টা কতটুকু শারীরিক আর কতটুকু মানসিক? বিষয়টা অদ্ভুত হলেও উপলব্ধির।

ধর্ষিতা তাজুলকে নিয়ে আমি গর্ববোধ করি। মাঝে মাঝে সগর্বে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, তাজুল আমার বন্ধু, ধর্ষিতা তাজুল আমার বন্ধু। ও ছিল আমাদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী, অগ্রগামী। শুধু কি পাঠ্যবইয়ের সীমাবদ্ধতায়? তাজুলের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত ছিল জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়। ও এগিয়ে ছিল আমাদের অনেকের চেয়ে—এগিয়ে আছেও। তবুও তাজুল অপাঙ্‌ক্তেয়! আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ‘জীবনের জন্য’ এখনও সহজ আর কল্যাণকর হতে পারে নি। তাজুলের জীবন রহস্যময়, এখনও। নিকটতম কিছু মানুষ ওর জীবনকে খুব বেশিই প্রভাবিত করেছে, কলংকিত করেছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ঋদ্ধও করেছে। রহস্যাবৃত্তের জীবনকে ভেঙে নতুন তাজুলে পরিণত করেছে। যে তাজুল মনে আর মননে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সমাজ থেকে—অথচ জীবন-বাস্তবতায় ওর বোধশক্তি আমাদের অনেকের চেয়ে উন্নত।


অন্ধসমাজের কিছু মানুষের চোখ তাজুল দেখেছে। যে চোখ করুণার দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। 


তাজুলেরও প্রেম ছিল। অপ্রত্যাশিত? না, তাজুল শরীরে আর মনে পরিপূর্ণ ছিল। তামান্না, তাজুলের আকাঙ্ক্ষিত নারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে তাজুল-তামান্না স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিয়ে করার। যুগল আনন্দ বিচ্ছিন্নভাবে কতটা আর উপভোগ্য হয়? মনের ভাষার সাথে শরীরের ভাষাও প্রয়োজনীয় একটা সময়ের পর। শরীর শরীরের সেই স্পর্শে মনও প্রফুল্ল হয়। দেহ-মনের পরস্পর আনন্দে জীবনে সুখ মিশে থাকে প্রত্যাশাতীত।

তামান্না তাজুলের তিন বছরের জুনিয়র। দুজনই মনোবিজ্ঞানের। উন্নত মন আর বিজ্ঞানমনস্ক ভাবনায় দুজন দুজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। দুজনের পারিবারিক ঐতিহ্য আর বিত্তের ব্যবধান ওদেরকে কখনোই ভাবনায় ফেলে নি। দুজনের ভালোবাসার সম্মানে পরস্পরের অবিভাবকরাও বিষয়টা মেনে নিয়েছে হাসি মুখে। তামান্নার বাবা নেই। মায়ের উপর সংসারের পুরো দায়িত্ব। দুটো গার্মেন্টস, কারখানা এবং অফিস নিপুণ দক্ষতায় সামলে নিচ্ছে তামান্নার কথা ভেবে। এদিকে তাজুলের মা নেই, বাবা ছিলেন মসজিদের ইমাম। বাবা ধর্মে আর কর্মে সমাজের উজ্জ্বল এক পুরুষ। তামান্নার সাথে আমার দেখা হয়েছিল একদিন—কথাও হয়েছিল। নির্মল, সাবলীল এবং পরিমিতিবোধসম্পন্ন একটি মেয়ে। তাজুল আমাকে জিগ্যেস করেছিল তামান্নার ব্যাপারে। কী রকম মনে হলো ওর প্রকৃতি! আমি মেয়েদের খুব ভালো বুঝতে পারি বিষয়টা এমন ছিল না। আমার মৌখিক একটা সমর্থন ওকে উৎসাহ দিবে এমনটা ভেবেই হয়তো কথাটা বলা। আমার স্বস্তির হাসি ও লক্ষ করেছিল। আমি লক্ষ করেছিলাম ওর ভেতরের তৃপ্তি।

আজ তাজুুলের বাবা বেঁচে নেই। ইমাম মোখলেছ মারা গিয়েছেন সেই কবে। উনাকে কি তাজুলের বাবা বলা যায়? তাজুলের বাবাই। তবে তাজুল ইমাম মোখলেছের সন্তান নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় উনার পরিচালিত এতিম খানাতে তাজুলকে আবিষ্কার করেন অভিভাবকহীন এতিম একটা শিশুছেলে হিশেবে। তখন যুদ্ধের শেষ সময়, পরিবেশ বেশ উত্তপ্ত। আপন জীবনের নিরাপত্তা নিয়েই মানুষ শঙ্কিত, চিন্তিত। সেই সময়ে, কিছুদিন পূর্বে জন্ম নেওয়া একটা দুধের শিশুকে কিভাবে বুকে তুলে নেওয়া যায়? ইমাম সাহেব ভাবনায় পড়েন। ভাবনার ফলাফল মাসুম শিশুটার অনুকূলে যায়। তাজুলকে বুকে তুলে ইমাম সাহেব আলিঙ্গনাবদ্ধ করেন। এক্ষেত্রে তাজুলের মিষ্টি মুখের প্রতি ভালো লাগা কিংবা আশ্রয়হীন এতিম একটা শিশুর জন্য দায়িত্ববোধ কাজ করেছে বিষয়টা তেমন নয়। নিঃসন্তান দম্পতির সন্তান না হওয়া স্ত্রীর অন্তরের চাওয়াকে প্রাধান্য দিতেই ইমামের এমন সিদ্ধান্ত।

ইমাম সাহেব তাজুলকে বুকে তুলে নেওয়ার পর এতিমখানার খাদেমের কাছ থেকে জানতে পারেন তাজুলের মায়ের সম্পর্কে। নার্গিস তাজুলের মা, একজন ধর্ষিতা নারী। তাজুলের বাবার কোনো পরিচয় খাদেম বলতে পারে নি। পরবর্তীতে লোকমুখে জেনেছে তাজুলের বাবা আব্দুর রাজ্জাক মুক্তিবাহিনীতে গিয়েছিল স্ত্রীকে মায়ের কাছে রেখে। নার্গিস তখন গর্ভবতী। কোনো এক রাজাকারের মাধ্যমে পাকবাহিনীর লোকেরা তাজুলের মাকে ধর্ষণ করে। তাজুল তখন মায়ের গর্ভে। আতঙ্ক আর শঙ্কায় সত্তরোর্ধ্ব তাজুলের দাদি মারা যায় তার কিছুদিন পর। দেহ-মনে রক্তাক্ত নার্গিস প্রচণ্ড ভেঙে পড়ে মানসিক যন্ত্রণায়। হয়তো-বা মা নার্গিসও তখন মারা যেত। তাজুলকে জন্ম দেওয়ার জন্যই কি বেঁচে ছিল প্রকৃতির ইচ্ছায়!

তাজুলের বিয়ে ঠিক হবার পূর্ব মুহূর্তে ইমাম সাহেব ওর জন্মপরিচয় তুলে ধরে। এতে তাজুলের মানসিক অবস্থা যাই হোক না কেন, ইমাম সাহেব নিজেকে দায়মুক্ত করতে চেয়েছেন। প্রতিটি মানুষেরই জন্মপরিচয় জানার অধিকার আছে। তাজুলের জন্মপরিচয়ে কতটা কলঙ্ক মিশে সেটা ভেবে দেখা কি খুব গুরুত্বপূর্ণ? তাজুলের মা তো আর পতিতা ছিল না। মা পতিতা হলেও তাজুল তো আর পতিত নয়। মা ধর্ষিতা হলেই-বা কী? ধর্ষণ তো বিপরীত পক্ষ থেকে জোরপূর্বক অপরাধ। সেখানে নারীর কোনো অংশগ্রহণ থাকে কি? নারীর পক্ষ থেকে যদি কিছু থেকেই থাকে তা হলো ঘৃণা। পশুর প্রতি মানুষের ঘৃণা। আমার দৃষ্টিতে তাজুলের মা-ও একজন মুক্তিযোদ্ধা। স্বামী মুক্তিযোদ্ধাকে সহযোগিতার মাধ্যমে এ নারীর মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ আছে। মুক্তিযোদ্ধা হলেও এ নারী আজ ধর্ষিতা! এ সমাজ ধর্ষিতা নারীর সকল পরিচয় কেড়ে নেয়। ধর্ষিতার পরিচয় হয়ে যায় শুধুই ধর্ষিতা। কিন্তু এ সমাজের মূল্যায়নে তাজুলের কী? অন্ধসমাজের মূল্যায়নে সত্য, সুন্দর মূল্যহীন হয়ে যায় না। তাজুল সত্যের সন্ধান পেয়েছে। তাজুল আজ ব্যথিত হলেও গর্বিত।

এ ঘটনা বলার সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না। একান্ত পারিবারির কথা আমার মতো নিকট-সম্পর্কের মানুষের সামনেও বলা যায় না। কিন্তু তাজুল আমাকে না জানিয়ে পারে নি—জানিয়েছে তামান্নাকেও। ঘটনা শোনার সময় তাজুলের মানসিক অবস্থা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমাকে বলার সময় ওর মুখাবয়ব ছিল ঘোর বিষণ্নতায় ঢাকা। রক্তশূন্য ফ্যাকাশে চেহারায় নিশ্চল বসেছিল বিছানায়। প্রচণ্ড মর্মাহত হয়েছিল। চোখদুটো যেন মৃত কোনো নগরীর প্রবেশ পথ। পুরো অস্তিত্ব নড়ে যাবার মতো ঘটনা ছিল এটা, নিঃসন্দেহে। লক্ষ করেছিলাম, প্রথম তিনমাস ও ঘর থেকে বেরই হয় নি পারতপক্ষে। সমাজ-জীবন ছিন্ন করেছিল, আত্মীয়দের এড়িয়ে চলেছিল, নামধারী কিছু বন্ধুর সঙ্গ ত্যাগ করেছিল। এছাড়া আর কী করতে পারতো? প্রথম প্রথম অন্ধসমাজের কিছু মানুষের চোখ তাজুল দেখেছে। যে চোখ করুণার দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। কারো চোখে ঘৃণা আর বিদ্রূপও খেলা করেছে অন্ধ-বোধে।

শহরের বাহিরে ছিলাম বেশ কিছুদিন। এসে শুনি ইমাম সাবেব মারা গেছেন আজ তিনদিন হলো। কথাটা শুনে মনটা ব্যথায় পূর্ণ হয়ে যায়। ইমাম সাহেব মানুষ হিশেবে ছিলেন অতুলনীয়। শ্রদ্ধার আসনে বসে ছিলেন, থাকবেনও। শেষ দেখা দেখতে পারলাম না—তারপরও হাতমুখ ধুয়ে, অর্থাৎ শরীরে ফ্রেস আর ভগ্ন হৃদয় নিয়ে তাড়াতাড়ি তাজুলের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। ভেবে ভেবে অস্থিরতায় মরি, তাজুলের আর কেউ রইল না। ইমাম সাহেবের স্ত্রী মারা গেছেন তাজুলকে ছোট রেখেই—বয়স আর কত তখন, পাঁচ কী ছয়। তারপর ইমাম সাহেব আর বিয়ে করে নি। তাজুলের কথা ভেবেই কি?

তাজুলের বাড়িতে পৌঁছে অবাক হয়েছিলাম। বাড়িটাই মরে পরে আছে যেন। ভেতরের পরিবেশ এতটাই নাজুক যে, মৃত্যুময় চিত্র খুব সুন্দরভাবে ফুটে আছে। তাজুলকে মনে হচ্ছিল মৃত্যুপথযাত্রী কোনো এক পথিক। দুতিনদিন পেটে কিছু পড়েছে বলেও মনে হয় নি। আমি কথা না বাড়িয়ে হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আসি।  খাবার-প্লেট সামনে তুলে ধরার পর দেখি টপ টপ করে বেদনাশ্রু ঝরে পড়ছে খাবারের উপর। জোর করাতে তাজুল কিছুটা খাবার খেল। ও ভেঙে পড়েছে। কী করে সহ্য করা সম্ভব চিরবিদায়ের মর্মবেদনা! তাজুলকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলাম, ‘চাচার চারদিনের খরচ তো করতে হবে। কত জনের আয়োজন করব? আমি সব ব্যবস্থা করে রাখব, তুমি এ নিয়ে কিছু চিন্তা করো না।’


মানুষের জীবনে শরীরও কথা বলে, সেই শরীরের ভাষাও বোঝা দরকার সময় থাকতে। 


তাজুল চোখে কান্না নিয়ে বলেছিল, ‘বাবা চারদিনের খরচ করতে নিষেধ করে গেছেন। জানো বন্ধু, শেষ সময়ে বাবা আমার হাত ধরে বলেছে এরকম : “খোকা, তুমি ভেঙে পড়বা না। মনে রাখবা, সবার জীবন একরকম হয় না। তবুও জীবনকে ভালোবাসতে হয়। তুমি তোমার বাবা-মাকে নিয়ে গর্ববোধ করবা। তোমার বাবা-মায়ের আদর্শ ছিল। তোমাকে তাদের আদর্শ মতোই মানুষ করতে চেয়েছি। আমি মনে করি, তোমার জন্ম এবং জীবনে সৃষ্টিকর্তার রহমত আছে। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো, বাবা। আমার জন্য তামান্নার সাথে তোমার বিয়েটা ভেঙে গেছে। সম্ভব হলে সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার জন্য দোয়া করবা। তোমার দোয়া আমার প্রয়োজন। এতেই আমি খুশি হব, ভালো থাকব। অযথা চারদিন, চল্লিশদিনের খরচ করবা না। এ প্রচলিত বিদাত আমাদের ধর্মে নেই। তোমার জন্য আমার দোয়া সব সময় থাকবে। আল্লাহর ইচ্ছায় তুমি জীবনে সুখী হবে, বাবা।”’

তখনই আমি জানতে পারি তামান্নার সাথে তাজুলের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার কথা। তামান্নার মা এ সম্পর্ক তৈরিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাজুলের জন্মপরিচয় নেই। তাজুল কি আসলেই ওর বাবার সন্তান নাকি পাক আর্মিদের অবৈধ ফসল? বাবার সন্তান হলেও ধর্ষিতা মহিলার সন্তানের সাথে কিভাবে সম্পর্ক করা যায়? তামান্নার কী অভিমত তা জানতে আমি ব্যাকুল হয়েছিলাম। মায়ের মত-ই নাকি তামান্নার মত, এ কথা জেনে আমি মর্মাহত হয়েছি। তামান্নার প্রতি আমার যে বিশ্বাস আর সম্মান জমে ছিল, সেই বিশ্বাস থেকে ওর এ মতামত প্রত্যাশিত ছিল না। আমি তাজুলকে বলেছিলাম, জন্ম-পরিচয়ের বিষয়টা বিয়ের পর জানাতে। যদি আগে জানাতেই হয় তবে শুধু তামান্নাকে জানাতে, ওর মাকে নয়। বন্ধু তাজুল আমার কথা শুনে নি। ও কোনোরকম গোপনীয়তার পক্ষে ছিল না। মিথ্যা দিয়ে সম্পর্ক শুরু করতে চায় নি। তাজুল বলেছিল, ‘যারা আমার মাকে সম্মান দিতে পারবে না, তাদের সাথে কেন সম্পর্ক রাখব?’ যাদের মানসিকবোধ জাগে নি তাদের সাথে তাজুলের মতো মানুষের সম্পর্ক হবে না তা আমিও জানি। আগেই বলেছি, তাজুল বোধে আর প্রজ্ঞায় অনেকের চেয়ে এগিয়ে। বন্ধুকে নিয়ে আমার গর্বের জাগয়া তো সেখানেই।

জীবনবাস্তবতায় বেশ কিছুদিন কেটে যায়। বিয়ে করেছি। স্ত্রী আর সংসারে সময় দিতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারওপর নতুন চাকরি। তাজুলের সাথে খুব বেশি দেখা হচ্ছিল না। বিয়ে করার পর আমার মনে মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, স্বার্থপর হয়ে গেলাম কি? নিজে বিয়ে করে ফেললাম, অথচ তাজুল যে অবিবাহিত রয়ে গেল সেদিকে খুব বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না। আমি ছাড়া ওর আর কে আছে? ওকে নিয়ে কয়েক মিনিট ভাববে এরকম মানুষও পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। নিকটতম একটা সঙ্গী জীবনকে সর্বোত্তম উপায়ে সঙ্গ দিতে পারে। এর জন্যেই বিয়েটা গুরুত্বপূর্ণ। সত্যি নয় কি, একজন সঙ্গী জীবনকে নানাভাবে আন্দোলিত করে, সঙ্গ দেয়। প্রকৃতি ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ অবস্থার মধ্য দিয়ে হলেও সময়কে নিয়ে ঠিক এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। এদিকে মানুষের জীবনে শরীরও কথা বলে, সেই শরীরের ভাষাও বোঝা দরকার সময় থাকতে। স্থির সিদ্ধান্ত এবং কিছু দিনের পরিশ্রমে স্ত্রীর বান্ধবীদের মধ্য হতে তিনটা মেয়ের সম্মতি পাওয়া গেল। ওরা তাজুলের যোগ্যতাকে বেশি মূল্যায়ন করেছে। তাজুলের মা-বাবা আর পরিবার নিয়ে ওদের কোনো মাথা-ব্যথা নেই। এমনই তো হওয়া উচিত—ব্যক্তি পরিচয়টাই হোক মুখ্য। ‘আকাশ, তোমাকে চিনব কিভাবে? বিশালতায় ঠাঁই নাও।’ আমাদের অন্ধসমাজ তাজুলের বাবা-মাকে মূল্যায়ন করবে না আমি জানি। ওদের উদ্দেশ্যে মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে হয়, তোমরা চোখেই শুধু দেখে গেলে, ঘুমন্ত বোধ এখনও জেগে ওঠে নি।

এক সন্ধ্যায় তাজুলের বাড়িতে এসে হাজির হলাম। সেই তাজুলই আছে, যে তাজুল মুখ থেকে হাসি সরিয়ে নিয়েছে। শরীর থেকে কর্মোদ্দীপ্ত মনোভাব দূরে রেখেছে। আশা-আকাঙ্ক্ষার চিন্তা মন থেকে তুলে নিয়েছে। এ তাজুল জীবন্মৃত! দুজন বের হলাম অন্ধকারে, আলোর সন্ধান পাবার অভিপ্রায়ে। কিছুটা সময় কাটলো বাতাসের সাথে, নদীর স্রোতস্নিগ্ধ জলের সাথে। তারপর বিয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে ওকে বোঝাতে লাগলাম। জীবনের চলার পথ মসৃণ করার জন্য একটা সঙ্গী তো নিশ্চয়ই দরকার। মানুষ কি একা চলতে পারে সঠিকভাবে? গল্প করা হোক, বুদ্ধি-পরামর্শ হোক, রোগে-শোকে পাশে থেকে হোক কিংবা শরীরে শরীরে ভালোবাসা বিনিময় হোক, একটা সঙ্গী জীবনের জন্য প্রয়োজন, জীবন-স্বস্তির জন্য প্রয়োজন। আমার কথা শুনে তাজুল হাসল, এ হাসি ভেতরের হাসি নয় বুঝতে পেরেছি। এ হাসি হাসি নয়, অভিনয়। ও আমার কথার মর্ম বুঝতে পেরেছে আমি নিশ্চিত। তবুও ও মানতে পারছে না ওর নিজস্ব অভিমান কিংবা আতঙ্কিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে। এ পরিস্থিতিতে আমাদের কথা খুব বেশি এগোয় নি। আমি যতটা সময় ছিলাম ওকে লক্ষ করে গেছি। দেখলাম, ও যেন জীবন থেকে বিতাড়িত কোনো এক জীব। ওর বিশ্বাস, ভাবনা কি বহমান নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছে? আর নদী বয়ে নিয়ে যাচ্ছে আপন নিয়মে, অজানা কোনো এক দেশে। আকাশের দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ছেড়ে দিচ্ছে—এ নিঃশ্বাস হয়তো পুরো আকাশ ভ্রমণে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে, খেই হারিয়ে ফেলছে। সেদিনের মতো চলে এলাম বাড়ির পথে, তাজুলকে পৌঁছে দেওয়ার পর।

এভাবেই সময় কেটে যাচ্ছিল দিন-রাতের নিয়মিত কার্য সম্পাদনে। অফিস করে বাড়িতে পৌঁছা মাত্র স্ত্রীর মুখে শুনলাম তাজুল খবর পাঠিয়েছিল। শুনে রীতিমতো আশ্চর্য হলাম। তাজুলের পক্ষ থেকে কখনো খবর আসে এমনটাই তো ভুলে গিয়েছিলাম। কাল-বিলম্ব না করে ছুটে গেলাম তাজুলের বাড়িতে। ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখি অপরিচিত এক মেয়ে তাজুলের বিছানায় শুয়ে আছে। আমি অপ্রস্তুত হয়ে যাই, মেয়েটিও। তাজুল পাশের রুম থেকে ভেতরে এসে পরিচয় করিয়ে দিল। তাজুল বিয়ে করেছে। নতুন বউ। বউকে খুব একটা সুন্দরী বলা যাবে না, তবে ভরাট শরীরে দেখতে মন্দ লাগে নি। চেহারায় তথাকথিত জাদু না থাকলেও মাধুর্য মিশে ছিল। তামান্নার মতো ঔজ্জ্বল্য নেই, তবে তরুণীর সারল্য আছে মনে হলো। আমার বিশ্লেষণের এ ভাবটাকে মুগ্ধতাই বলা চলে। তাজুলের নতুন বউয়ের সাথে খুব বেশি কথা হয় নি। মেয়েটাকে কেমন পরিশ্রান্ত মনে হয়েছিল। সন্ধ্যাও ঘনিয়ে এসেছিল। আমরা দু’বন্ধু আবারও বের হলাম। নদীর সাথে সাথে হেঁটে বেড়ালাম পার ধরে। সেদিন তাজুল যে খুব প্রফুল্ল ছিল বিষয়টা তা নয়। তবে মানসিক প্রশান্তির একটা ছাপ ওর চেহারায় আলোর মতো খেলা করছিল। তাজুল বিয়ে করেছে এক ধর্ষিতা নারীকে। শুনে চমকে উঠেছিলাম। আজ বুঝি বিস্ময়ের দিন—বিস্ময়ের পর বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য। তাজুল বিয়ে করেছে জেনে, বুঝে এবং নিজের আগ্রহে। ও কি এজন্যেই এতদিন বিয়ে করে নি? অপেক্ষা করেছিল? এ কি মায়ের প্রতি সম্মান নাকি ঋণ স্বীকার? প্রথমে ওর কাজকে খেয়ালি আর অযৌক্তিক মনে হলেও পরে ঠিক বুঝতে পেরেছি ওর মনের সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ। মানবিক মন না থাকলে এরকম সাহসী কাজ কেউ করতে পারে? জড়িয়ে ধরেছিলাম ওকে, ওর অন্তরের সৌন্দর্যকে। স্বস্তি নিয়ে হাসি মুখে বাড়ির পথে রওয়ানা হয়েছিলাম—তাজুলকে রেখে ওর বাড়িতে। সেই বাড়িতে আরো রেখে এসেছিলাম আমার যাবতীয় মুগ্ধতা, সম্মান আর আশীর্বাদ।

তাজুলের বাড়িতে সুখের ছোঁয়া লেগে সময় চলে যাচ্ছিল। তাজুলকে দেখছি দিবসের দুবেলাতেই সুখের স্পর্শ রেখে যাচ্ছে। যদিও কিছু সামাজিক অন্ধদের সমালোচনাও চলছিল। এতদিন ওদের চোখের ভাষাই তাজুলকে কষ্ট দিতো কিন্তু এখন শুরু হয়েছে মুখের ভাষার নোংরা বয়ান। সরাসরি হয়তো নিন্দা করে না, তবে সাধু বয়ানের ভাষার ভেতরে নিন্দাই লুকিয়ে রাখে। কোনো কোনো মুরব্বি এভাবে বলে ফেলে, ‘শেষ পর্যন্ত ধর্ষিতাকেই বিয়া করতে হইল তোমার? দেশে কি আর মাইয়ালোক আছিল না?’ তাজুল এসব কথা শুনে ব্যথিত হয়েছে বারবার। ধর্ষিতা মেয়েকে বিয়ে করাতে আপত্তি কী? এ ধর্ষিতা কি কোনো বাবার মেয়ে না? কোনো ভাইয়ের বোন না? দিনের পর দিন, মাসের পর মাস চলে যাচ্ছিল এসব আলোচনা-সমালোচনায়। তাজুল সংসারে যতটা সুখী, সমাজ-জীবনে ঠিক ততটাই অসুখী। একদিন ও স্থির সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেলল, এ সমাজে আর থাকবে না। এ সমাজ মানুষের জন্য নয়। নতুন কোনো সমাজের গোড়া পত্তন করতে চায় তাজুল। এরকম পরিস্থিতিতে ও আমার পরামর্শ নেয়, সাহায্য চায়। বন্ধুর ভালোর জন্য আমি সর্বোত্তম পথ অবলম্বন করি। তাই বাড়ি বিক্রির সিদ্ধান্তকে স্বাগতম জানিয়েছি, সানন্দে।


অন্ধ সমাজের আমূল নাড়াতে বন্ধুর মতো আর ক’জন পারে? আমি গর্বিত, তাজুল আমার বন্ধু। ধর্ষিতা তাজুল আমার বন্ধু!


বাড়ি বিক্রির কথা ফাইনাল হয়ে গেছে। এরই মধ্যে তাজুলের প্রথম সন্তান হলো। কন্যা সন্তান। বন্ধুর জীবনে এ এক পরম তৃপ্তির পাওয়া। ওর প্রত্যাশা পূরণ করেছে এ রাজকন্যা। তাজুল জানে কন্যাসন্তান হওয়ার পেছনে পিতার ভূমিকাই মুখ্য। এ কথা ভেবে ভেবে তাজুলের চেহারা থেকে পুলক আর সরে না। কন্যাকে নিয়েই সারাক্ষণ মেতে থাকে। এ সন্তানের ভেতর ও কি মায়ের অস্তিত্ব খুঁজে পায়? আমি তাজুলের কন্যাকে দেখে গিয়েছি জন্মের দুদিন পরই। এ রাজকন্যা যেন চোখে জ্যোতি বাড়িয়ে দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ফুটফুটে কন্যাকে নিয়েও মুখরোচক নিন্দা ছড়িয়ে পড়েছে অন্ধ সমাজের অলিতেগলিতে। কেউ কেউ বলছে, এ মেয়ে তো তাজুলের না। তাজুলের বউ ধর্ষিতা হয়ে এ সন্তান গর্ভে ধরেছিল। কিছু বর্বর বলছে, মা ধর্ষিতা, বউ ধর্ষিতা, এ মেয়েও হয়তো একদিন ধর্ষিতা হবে। আমি ভেবে ভেবে অবাক হই, মানুষ কিরকম নোংরা মানসিকতার হতে পারে! ওদের কাছে ধর্ষিতা হওয়া কি নির্ধারিত কোনো বিষয়?

এসব রটনার প্রেক্ষিতে তাজুল প্রচণ্ড ভেঙে পড়ে। এক সন্ধ্যায় আমরা আবারও বের হলাম। নদীর সাথে সময় কাটালে আমাদের মন ভালো হয়ে যায়। নদী যেন কষ্টগুলো স্রোতে স্রোতে বহুদূর বয়ে নিয়ে যায়। গত কিছুদিনের তুলনায় সেদিন তাজুলকে কিছুটা হলেও প্রাঞ্জল মনে হচ্ছিল। তবে ভেতরে ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে সেটা ঠিক বুঝতে পেরেছি। আমাকে কিছু বলতে চায়। আমি সানন্দে সম্মতি জানিয়েছি। তাজুল বলে যাচ্ছিল আর আমি নির্বাকের মতো শুনে যাচ্ছিলাম। প্রতিউত্তরে কোনো কথা বলতে পারি নি, কিছু যোগ করতে পারি নি, কিংবা কোনো কথার প্রতিবাদ করতে পারি নি। শুধুমাত্র বন্ধুর শেষ কথার উত্তর দিতে পেরেছিলাম। তাজুল বলেছিল, ‘বন্ধু, তুমি তো লেখক। আমাকে নিয়ে লিখবে তো?’ আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছি। চোখে কি আনন্দাশ্রু চলে এসেছিল! বুকের সাথে বুক মিলিয়ে বলেছি, ‘তোমাকে নিয়ে লিখতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব, বন্ধু।’

তাজুলের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছি দুদিন হলো। সব অতীত বুকে নিয়ে আজ তাজুলকে নিয়ে লিখতে বসেছি। তাজুল আমার বন্ধু, ভাই অথবা তারচেয়ে বেশি অব্যক্ত কোনো সম্পর্কের আত্মীয়। তাজুল এ সমাজ ছেড়ে চলে যেতে চায়। তাজুল মনে মনে আতঙ্কিত, হয়তো এ অন্ধ সমাজের কোনো কীট ওর মেয়েকেও ধর্ষণ করবে। এ সমাজ তখন ফুটফুটে বাচ্চাটাকেই হেয় করবে, ওর আত্মমর্যাদাকে বিদ্রূপ করবে, ওর নারীত্বের কোনোই মূল্য দিবে না! যেমন মূল্য পায় নি ওর মা, স্ত্রী এবং অগণিত বোনেরা। তাজুল এ সমস্ত ধর্ষিতা নারীদের পক্ষে কথা বলতে চায়। তাদের সম্মানে জীবন উৎসর্গ করতে চায়। অচিন মায়ের মুখ ওকে প্রায়ই ব্যথিত করে। মায়ের আত্মচিৎকার ওর মনকে আন্দোলিত করে। মাকে মা বলার আশা ওর পূরণ হয় নি। মেয়েকে সঠিকভাবে মানুষ করার স্বপ্নও ওর চোখে ধূসর হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। এ আতঙ্কিত মন নিয়ে মানুষ কতদিন বাঁচবে? এর নাম কি বেঁচে থাকা? তাজুল কি বেঁচে ছিল এতদিন? তাজুলকে কি ধর্ষণ করা হয় নি? তাজুল ভ্রূণ অবস্থাতেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ওর মায়ের ভেতর দিয়ে ওকে ধর্ষণ করা হয়েছে। তাজুলের মনকে ধর্ষণ করেছে তামান্না, তামান্নার মা। ওর মানসিক-বলকে ধর্ষণ করেছে অন্ধসমাজ। তাজুল এ সমাজকে ঘৃণা করে। পছন্দ করে মাকে, মেয়েকে, পছন্দ করে ধর্ষিতা নারীকে। ওর মায়ের সম্মানে, ওর নিজের ভ্রূণের কান্নার সান্ত্বনায়, অগণিত বোনের দীর্ঘশ্বাসের কথা স্মরণে ও হলফনামার মাধ্যমে নিজের নামটাই পরিবর্তন করে ফেলল। আজ থেকে আমার বন্ধু তাজুল আহমেদ নয়, ধর্ষিতা তাজুল। ধর্ষিতা তাজুলই যুদ্ধ করতে জানে, ধর্ষিতা তাজুলই যুদ্ধে জয়ী হবে। অন্ধ সমাজের আমূল নাড়াতে বন্ধুর মতো আর ক’জন পারে? আমি গর্বিত, তাজুল আমার বন্ধু। ধর্ষিতা তাজুল আমার বন্ধু!

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৮৪, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ। কবি ও কথাসাহিত্যিক। ঢাকা সিটি কলেজ থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই —
অদৃশ্য আলোর চোখ [গল্পগ্রন্থ, অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি, ২০১৮]

সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘শীতলক্ষ্যা’।

ই-মেইল : joychironton@gmail.com

Latest posts by মহ্‌সীন চৌধুরী জয় (see all)