হোম গদ্য গল্প ধর্মহীন পল্লব নগরী

ধর্মহীন পল্লব নগরী

ধর্মহীন পল্লব নগরী
541
1

১ম কিস্তি

উচ্চ পদস্থ সরকারি বুইড়া তার পাইক-পিয়াদা নিয়া খিছুড়ি খাইবার চইলা গেলে জামবানু শুইয়্যা শুইয়্যা খালি দেলখুশ ভাইয়ের কতা ভাবে

ধর্মহীন পল্লব নগরীতে একদিন ভোজসভার আয়োজন হইল। তেরশ গরু আর পাঁচ হাজার বকরি জবাই হইয়া গেল। অভদ্র যোনিধারীরা পিঁয়াইজ, রহুন, আদা বাটিতে নাগিল। চাইল ডাইল আর সবজির পাহাড় জমিয়্যা গেল। ছ্যাদর লুকেরা তিন দিন আগ হইতেই বাসায় খাওন-দাওন বদ্দ করিয়্যা দিল। মাহেন্দ্রক্ষণ চলিয়্যা আসিবে বলিয়্যা চন্দ্র মাগী তার সমস্ত শুভা মেলিয়্যা ধরিল রাইতের বেলা। তাই দেখিয়া উতলা হইল নটী মেয়েরা। কুন্তলে ফুল গুঁজিয়্যা, ক্যাত্তলায় সুরভি ঢালিয়্যা ঈষৎ ঝুলন্ত বক্ষ কাঁচুলির ঠেকনা দ্বারা টান টান কইরা ফালাইল। পাহাইড়া আর চইরা ছ্যাদরেরা গঞ্জের হাটে পাঁচ পাহাড়ি ধান বেচিয়া পকেটে দুই দশ টঙ্কা গুঁজিয়্যা লইল। তাহাদে ম্যালা করিল পল্লব নগরীতে। কিন্তু পল্লব নগরীর জাইর‌্যা ছ্যারারা জানে এই পথে পাহাইড়া ও চইরা ছ্যাড়ারা আহে। তাই তাহারা তাহাদের বাবারামলের ড্যাগার নইয়্যা ওঁৎ পাতিয়া বসিয়া রহিল পল্লব নগরীর ঘোপে ঘাপে। পাহাইড়া ও চইরা ছ্যারারাও ইহা জানে, বাপের আমল হইতে। তাই উহারা নিজেদের গাঁয়ে মারামারি কাটাকাটি করিয়্যা গোত্রে গোত্রে বিভক্ত থাকিলেও, পল্লব নগরীতে আহাকালে জোট বাঁধিয়্যা নেয়, কুছের ট্যাকা রক্ষাকল্পে। কিন্তু সচরাচর উহা রক্ষা হয় না। যাহাদের রক্ষা হয় উহারাই কেবল নটীমাগীদের নধর বক্ষে মাথা গুঞ্জিবার আমোদ লভিতে পারে। বাকিরা কেবল বক্ষাভিমুখে চাহিয়া চাহিয়্যা গুস্তর বদলে আলু দ্বারা রান্না করা ঢেলক্যা খিছুড়ি চাটিতে তাহে।


কারম তেরশ গোরুর বারশ নিরানব্বইডাই ঢিপ ফিরিজের তলে জাগা পায়। মাত্র একটা গোরু পাঁচ হাজার ডেছকির খিছুড়িতে আশ্রয় নিয়্যা কুনোরূপ ডিফারেছ তৈরি করা পারে না যে, এইটা মান্সোর খিছুড়ি না সব্জি খিছুড়ি? তয় খাসির কেস আলাদা। নগরীর জাইর‌্যা পুলাপানের নিগ্যা অর্ধেক খাসি দিয়্যা আগেই বিরানি পাকাইয়া রাখতে হয়। নেহেলে খাইতে বইসা ওরা বিরানিতে গুস্ত না পাইলে পাচকের বিচি কাইটা গুস্ত বানাইতে পারে—এই ডরে সেইখানে কুনো চুরি-চামারি চলে না। খাসির গুর্দা, সিন্যা, কইলজা মাইটা ফ্যাঁপড়া দিয়্যা একটা ঘ্যাঁটও তৈরি কইরা রাহে, যাতে চাহিবামাত্র উহা চাটনিস্বরূপ সরবরাহ করিতে পারে। তাছাড়া পল্লব নগরীর গণ্যমান্যি লুকেরাও এইদিন বিশেষ মনস্কামনা পূর্ণ করিতে আসে। সারা বছর ভাল খানা খাইতে খাইতে ইহাদের জিবল্যায় চর পড়িয়্যা যায়। এইদিন উহারা আসে জিবল্যার চয়রা ছাড়াইতে। কাঁচা মইচ পিয়াইজ ভাইঙ্গা ইহারা এইদিন পেলেটের পর পেলেট বিরানি উড়াইতে তাহে। ইহাদের কারও কারও জিবল্যা ভালো খানা খাইতে খাইতে এতই তিতিবিরক্ত থাকে যে উহারা বিরানির বদলে গরিবের ঢেলকা খিছুড়ির পাইল্যায় জিবল্যা বসাইয়্যা দেয়, অরুচির জার্ম ছাড়াইতে। গরম গরম ঢেলকা খিছুড়ি জিবল্যায় পড়ামাত্র ডাইরেক একশম শুরু হইয়া যায়। দীর্ঘ দিনের অরুচির জার্ম ছাড়িতে থাকে। ফিরিয়্যা আসিতে তাহে উহাদের আগের জীবন, ফিরিয়্যা আসিতে তাথে কঠিন ক্ষিদায় না খাইয়্যা থাকনের চিতি। তাই ইহারা দল বাইন্ধা এইদিন কেবল নিজেরাই খাইতে আহে না, পিছে খানসামা পিওন আর্দালিও লইয়্যা আসে। উহারা টিফিন কেরিয়ার হইতে শুরু করিয়্যা ঘটি-বাটি-ডেচকি ভর্তি করিয়্যা খিছুড়ি লইয়া অন্দর মহলে ছুটিয়্যা যায়। বেগম হইতে বান্দি সকলেই এইদিন খিছুড়ি চাটিতে তাহে। জামবানু তার বুইড়া জামাইয়ের পীড়নে এমনেই মন মেজাজ খারাপ নিয়্যা শুইয়্যা আছিল—চাইর পরী লাগাইনা পালঙ্কে। এই টাইমে বান্দি বাটিভর্তি ঢেলকা খিছুড়ি নিয়্যা আহে। রাগে শইলড্যা জ্বইলা যায়, না অন্য কারণে জ্বলে, জামবানু ঠিক ঠাহর করা পারে না। তয় জাইরা বুইড়া এহনও কাছে আহে, মজার মজার চুটকি কয় আর খালি হাতাপাতি খেলে। জামবানু বুইড়ার কামের বাণে আহত হয় ঠিকি, কিন্তু নিহত হইয়্যা পারে না। কুনোমতেই। অথচ তার নিহত হইবার খুব শক জাগে। উচ্চ পদস্থ সরকারি বুইড়া তার পাইক-পিয়াদা নিয়া খিছুড়ি খাইবার চইলা গেলে জামবানু শুইয়্যা শুইয়্যা খালি দেলখুশ ভাইয়ের কতা ভাবে।


জামবানু পালঙ্কে শুইয়্যা দেলখুশ ভাইকে ভাপতে যায়, আর তেখনই ঢেলকা খিছুড়ি সুবাস ছড়ায়। জামবানু আর সহ্য করা পারে না, খিদ্যার জ্বালা। তাই দেলকুশ ভাইরে থুইয়্যা খিছুড়ি খাওয়া শুরু করে। আর বান্দি আম্বিয়্যা চৌকাঠে বসিয়্যা গামলাভর্তি খিছুড়ি মারিতে থাকে। খিছুড়ি খায় আর মায়ের কতা মুনে করে। চোক দিয়্যা পানি পড়ে আর নাক দিয়্যা হিনাত। পুরানা দিনের কত কতা তার মুনে পড়িয়া যায়! আম্বিয়্যার মাও বাইত্তে আইল টুলেরে কয় আলমারি, আতিরে কয় ফইটক্যার বাচ্চা, রেলেরে কয় টেনগাড়ি… যবুনার পাড়ে আম্বিয়্যাগো বাড়ি আছিল, কুকুরিয়্যার চড়ে। একদিন যবুনা আম্বিয়্যাগো ক্ষ্যাত খাইল, ক্ষ্যাতের ফসল খাইল, বাড়ি খাইল, ঘর খাইল, আম্বিয়্যার আব্বারেও খাইয়্যা ফালাইল। তেখন আম্বিয়্যারে নিয়্যা আম্বিয়্যার মাও ধর্মহীন পল্লব নগরীতে আইছিল ভিক্ক্যা করবার। জাইর‌্যা পুলাহান শইল স্বাস্ত্য দেইহা আম্বিয়্যার মাওরে কয়, তুমি ভিক্কা করো ক্যা? যুয়ান বয়স! আহো তুমারে কাম দেই। এই কইয়্যা আম্বিয়্যার মাওরে এক হুনা বাড়িতে নিয়্যা মুখ ছাফা দিয়্যা ধইরা তিন চাইর জনে মিল্যা কামের জ্বালা দেয়। বেয়ুশ আম্বিয়্যার মাও ম্যালাক্ষণ বাদে চেতন পাইয়্যা দ্যাহে আম্বিয়্যা তার কানতাছে। অক্তে ভাইস্যা গেতাছে তার নিজের পাউ। উইঠা খাড়ানের হক্তি নাই, তেমু খাড়ায়। আম্বিয়্যারে নিয়্যা আবর ম্যালা করে। আম্বিয়্যা ডাইন আত দিয়্যা ঢেলকা খিছুড়ি খায় আর কান্দে। বাউ আত দিয়্যা চোকের পানি আর হিন্যাত মুছে। আম্বিয়্যার মাও বাইত্তে আইল টুলেরেও কয় আলমারি, আতিরে কয় ফইটক্যার বাচ্চা, টেনেরে কয় রেলগাড়ি…

Abu Mustafiz

আবু মুস্তাফিজ

জন্ম ১৭ অক্টোবর, ১৯৭৬, টাঙ্গাইল। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, সরকার ও রাজনীতি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : ব্যবসায়।

প্রকাশিত বই :
গল্প—
লুহার তালা [শুদ্ধস্বর, ২০১০]
একটি প্রাকৃতিক সাইন্স ফিকশন: শিন্টু ধর্মাবলম্বী রাজা, সবুজ ভদ্রমহিলা ও একজন অভদ্র সামুকামী [গুরুচণ্ডা৯, কলিকাতা, ২০১২]
ট্যাকারে ট্যাকা [শুদ্ধস্বর, ২০১৪]

ই-মেইল : abumustafiz@gmail.com
Abu Mustafiz