দোলাচল

দোলাচল
783
0

রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। এখন ঘুমোতে যাবার পালা। অথচ রাহেলা আক্তার পানের বাটা খুলে বসলেন। কী এক বদঅভ্যাস বানিয়েছেন, সারাদিন তো জাবর কাটবেনই, রাতে শোয়ার আগেও তার একখিলি পান মুখে দেয়া চাই। এই নিয়ে স্বামীর সাথে তার কখনো খুনসুটি, কখনো ঝগড়া লাগে। ফরিদ সাহেবের যেদিন মন ভালো থাকে, বলেন, তোমার ছাগল হয়ে জন্মানো উচিত ছিল। ছাগল আর তোমার মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখি নে। রাহেলা আক্তারও কম যান না। ডানহাতের বৃদ্ধ আর মধ্যমা আঙুলের মাঝে চেপে ধরা একখিলি পান খুব কায়দা করে মস্তবড় হা-এর ভেতর গুঁজে দিয়ে বলেন, সেই তবে ভালো ছিল। অন্তত তোমার মতো বেরসিক লোকের মুখ দেখতে হতো না রোজ রোজ। আজ যখন বাটা খুলে উল্টে-পাল্টে পছন্দ মতো পানপাতা বাছেন, তখন কলিংবেল বাজল। কে এল এই সাড়ে এগারোটার রাতে!

চন্দ্রভূমি ছোট্ট এক বাজার এলাকা। এর যা চেহারাসুরত গ্রাম বলাই মানানসই। লোকাল ট্রেন দাঁড়াবার রোগাশোকা একটা স্টেশন আছে বলে করুণা করে লোকে অবশ্য গ্রাম বলে না। বলে চন্দন বাজার। চন্দন বাজারে জীবন বড় নীরব, কোলাহলহীন। ট্রেন আসবার কালে যদিওবা একটু-আধটু হইচই-কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে স্টেশনপাড়া, চলে গেলে আবার নিঝুম। যেন এক শান্ত পুকুরে হঠাৎ কোনো দুষ্টু বালকের ঢিল। জলের ভাঁজে একটু তোলপাড়। তারপর আবার সুনসান। এই চন্দন বাজারের দক্ষিণধারে ফরিদ সাহেবের একতলা ছিমছাম বাড়ি। সরকারি স্কুলে মাস্টারি করতেন এক সময়। এখন রিটায়ার্ড। রিটায়ার্ডের পয়সায় বাড়িটা বানিয়েছেন। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন সাত বছর আগে। ছেলে রিপনের কাপড়ের ব্যবসা। ব্যবসার কাজে সে এখন ঢাকার ইসলামপুরে। বিকেলে কথা হয়েছে মোবাইলে। রিপন ফিরবে কাল সন্ধ্যায়। আজ তবে এল কে!


খুব গোপন এবং উত্তেজনাকর কোনো কাণ্ড ঘটেছে, এখন সেটা বলবার সময়


ফরিদ সাহেব দরজার দিকে এগোলেন। রাহেলা পানে চুন-সুপারি সাজতে সাজতে উপদেশ দিলেন—এত রাত, আগেই খুলবে না। প্রথমে পরিচয় জেনে নিবা। স্ত্রীর উপদেশ কানে তুললেন না ফরিদ সাহেব। অতিথিকে বাইরে দাঁড় করিয়ে জেরা করতে লাগা তার কাছে ছোটলোকি মনে হয়। তিনি দরজা খুলে দিলেন। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে অচেনা এক ছেলে। রিপনের বয়সী। স্যুটপ্যান্ট ছাড়াও তার সারা গায়ে জড়িয়ে আছে সঙ্কোচ। সেই সঙ্কোচ থেকে আবার চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে আভিজাত্য।

ফরিদ সাহেব ভুরুয় গিঁট ফেলে বললেন, আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না!

ছেলেটা জড়িয়ে পেচিয়ে আমতা আমতা করে বলল, আসলে ব্যাপারটা কিভাবে নেবেন বুঝতে পারছি না।

না, ঠিক আছে, বলুন।

আমার বাড়ি ভেড়ামারায়। এখানে একটা জমির খোঁজে আসছিলাম। রাতের ট্রেনে ফিরে যাব কিন্তু কোথায় যেন ডাকাতরা রেলের পাত উপড়ে ফেলেছে। আজ আর ট্রেন চলবে না। আবার ট্রেন ছাড়া ফেরার অন্যকোনো উপায়ও নেই। একটু থেমে ছেলেটা আবার বলল, বাজারে খোঁজ নিয়েছি, থাকার হোটেল নেই। স্টেশনেও খোঁজ নিয়েছি, তারাও নিরাশ করেছে। এখন আপনি যদি একটা রাতের জন্য….

বাক্য শেষ করল না ছেলেটা। ফরিদ সাহেব খেয়াল করলেন ছেলাটা অতিশয় লাজুক এবং বিনয়ী। সে যখন কথা বলছিল, ফাঁকে ফাঁকে ফরিদ সাহেবের চোখের দিকে তাকাচ্ছিল। কিন্তু যখনই চোখে চোখ পড়ছিল, সঙ্গে সঙ্গে নামিয়ে নিচ্ছিল দৃষ্টি। ফরিদ সাহেব বুঝলেন, ছেলেটা আসলেই বিপদে পড়েছে। একটু ভেবে তিনি দরজা থেকে সরে গিয়ে আমন্ত্রণ জানালেন—আসুন। আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আপদ বিপদ তো মানুষেরই হয়।

ছেলেটা দরজায় পা দেয়ার আগে বলল, একটা কথা আঙ্কেল, আপনি আমার বাবার বয়সী। আপনি সম্বোধন করলে অস্বস্তি হয়।

ফরিদ সাহেবের গাম্ভীর্য তরল হলো—নাম কী তোমার?

জি, রিপন।

ফরিদ সাহেব ঝট করে পেছনে ফিরলেন। শব্দ করে হেসে দিয়ে বললেন, বল কি! তোমার নাম রিপন! আরে আমার ছেলের নামও তো রিপন!

ফরিদ সাহেবের সাথে রিপনও হেসে ফেলল এবার। তবে নিঃশব্দে। সঙ্কোচ এবং জড়তার যে পর্দা ঝুলছিল এতক্ষণ, মোক্ষম বাতাস পেয়ে তা উড়ে গেল। ফরিদ সাহেব রিপনকে গেস্ট রুমে নিয়ে গেলেন। ওদিকে পান চিবানো রাহেলার কৌতূহল বেড়েই চলছিল। ঘরে বসে তিনি হাসির আওয়াজ পাচ্ছিলেন। এখন মোবাইলের যুগ। যে-ই বেড়াতে আসুক, আগে থেকেই মোবাইলে যোগাযোগটা হয়। যোগাযোগ ছাড়া আজ এই মধ্যরাত্রিতে কে এল তিনি অনুমান করতে পারছেন না। কৌতূহল মেটাতে তিনি ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন—দরজায় স্বামীর মুখোমুখি হলেন। ফরিদ সাহেব স্ত্রীর কাঁধ ধরে ঠেলতে ঠেলতে ভেতরে নিয়ে আসলেন। খুব গোপন এবং উত্তেজনাকর কোনো কাণ্ড ঘটেছে, এখন সেটা বলবার সময়—এমন ভঙ্গিতে তিনি খাটের কিনারায় স্ত্রীকে নিয়ে বসলেন। স্ত্রীর গালের কিনারা বেয়ে তখন পানের পিক গড়িয়ে পড়ার উপক্রম। তিনি চোখ নাচিয়ে বললেন, কে আসছে, অ্যা?

ফরিদ সাহেব স্ত্রীর স্বভাব জানেন। আর তাই স্ত্রী যেন আগেই হইচই না বাধায় এই মর্মে ওয়াদা করিয়ে নিলেন। তারপর খুলে বললেন ঘটনা। সবশুনে রসগোল্লার মতো গোল গোল হয়ে উঠল রাহেলার চোখ। পিচিত করে পিকদানিতে তিনি পিক ফেললেন আর একটু আগে করা ওয়াদা বেমালুম ভুলে গিয়ে হইচই বাধালেন—কবে তোমার আক্কেল হবে শুনি! বুড়ো ঝুনো হয়ে গেলে অথচ এখনো তোমার বুদ্ধি হলো না। পথের কে না কে এসে আশ্রয় চাইল অমনি তাকে ঘরে এনে তুললে! আল্লায় জানে কী মতলবে এসেছে ছোকরাটা!

আহা! আস্তে বল, শুনবে তো!

শুনলে শুনুক।

আন্দাজে সন্দেহ করো না। চেহারা দেখে মনে হলো ভালো ঘরের ছেলে। চোর বদমাইশ না। তাছাড়া ওর নামও রিপন।

রাহেলা এবার চমকে উঠলেন—ছোকরাটা যে ডাকাত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গোপনে সে সব খবরাখবর নিয়েই তবে ঢুকেছে। আমাদের ছেলেটা বাড়ি নেই, এটাও সে নিশ্চয় জানে। নয়তো এই দিনটায় সে কেন আসবে! আর আমরা যেন তার প্রতি স্নেহশীল হয়ে পড়ি এ জন্য সে রিপন নাম ধারণ করেছে।

আহা! এক নামে কি একাধিক মানুষ থাকে না, রাহেলা!

থাকে। কিন্তু এটা যে ছদ্মনাম বোঝাই যাচ্ছে। মতিন সাহবের বাড়ির কথা মনে নেই তোমার! এক বছরে সব ভুলে গেলে! সেও তো এমনই করে আশ্রয় চাইছিল।

না, ভোলেন নি ফরিদ সাহেব। বিলক্ষণ মনে আছে। গেল বছর, হ্যাঁ গেল বছরই এক শীতের রাতে একটা লোক আশ্রয় নিয়েছিল মতিন সাহেবের বাড়ি। লোকটা বলেছিল, সে ট্রেনে করে খুলনা যাচ্ছিল। পথিমধ্যে এক যুবক তাকে শসা খেতে দেয়। শসা খেয়ে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আর দুর্বৃত্ত তার টাকাপয়সা ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে সে চন্দ্রভূমি স্টেশনে নামে আর মতিন সাহেবের বাড়ির দরজায় নক করে রাতটা থাকার জন্য। লোকটাকে বিশ্বাস করে মতিন সাহেব বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। মধ্যরাতে সবাই যখন ঘুম, লোকটা ঘরের দামি জিনিসপত্র নিয়ে লাপাত্তা। সেই লোকটা না হয় প্রতারক ছিল, তাই বলে পৃথিবীর সবাই প্রতারক!

রাহেলার এক কথা—লোকটাকে তুমি চলে যেতে বল। মানলাম সে ডাকাত না। কিন্তু সম্ভাবনাও যে নেই তা তো না। ঘরভর্তি জিনিসপত্র আমার। তিলে তিলে একটা একটা করে সব জিনিস আমি গড়েছি। তোমার বোকামির কারণে সেসব খোয়াতে পারব না।

ঝড়ের মুখে ফরিদ সাহেবকে বড় কাবু দেখায়। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেন। বলেন, তাই কি হয়! দরজা থেকে ফিরিয়ে দিলে একটা কথা ছিল। এখন সমাদর করে ঘরে তুলে বেরিয়ে যেতে বলা—না রাহেলা, এ আমি পারব না। আমার বিবেক এই শিক্ষা আমাকে দেয় নি।

আঙ্কেল! কথা কাটাকাটির মধ্যখানে ও-ঘর থেকে ছেলেটার ডাক শোনা যায়। আগুনের আঁচ পাওয়া রবারের মতো কুঁকড়ে ওঠেন ফরিদ সাহেব। ছেলেটা কি তবে শুনে ফেলল ঝগড়া! জড়তার চটি পায়ে তিনি আস্তে আস্তে এগিয়ে যান ছেলেটার ঘরে। দেখেন, মিষ্টির একটা প্যাকেট হাতে ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। তনুশ্রীর মিষ্টি। রিপন ডানহাতে মিষ্টির প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, যখন আশ্রয় খুঁজছিলাম তখনই নিয়ত করছিলাম যার বাড়িতেই উঠি, মিষ্টি নিয়ে উঠব। আপনদের বাজারে এর থেকে ভালো মিষ্টি পেলাম না। এই রাখুন।


ছেলেটাকে একটু একটু ডাকাত সন্দেহ করতে লাগলেন।


মিষ্টি দেখে বড় খুশি হয়ে ওঠেন ফরিদ সাহেব। না, লোভ থেকে এই খুশি হয়ে ওঠা নয়, বরং স্ত্রীকে ঘায়েল করার, স্ত্রীর যুক্তি খণ্ডন করার একটি মোক্ষম হাতিয়ার পেয়ে যাওয়ায় এই খুশি। তিনি নিঃসঙ্কোচে প্যাকেটটা হাতে তুলে নেন। মুখে বলেন, ফ্রিজে পোল্ট্রি মুরগির মাংস আছে। তুমি কি পোল্ট্রি খাও, বাবা? না খেলে তোমার আন্টি অন্য কোনো তরকারির ব্যবস্থা করবে।

ছেলেটা এবার হাত চেপে ধরে ফরিদ সহেবের। না না, এই অর্ধরাতে রান্নাবাড়ার ঝামলোয় যাবেন না। আমি হোটেল থেকে খেয়ে এয়েছি। রাতটা থেকে কাল ভোরেই আমি চলে যাব। আমাকে নিয়ে অযথা আপনারা ব্যস্ত হবেন না।

হোটেলে কী খেয়েছে? এখানে তো ভাতের হোটেল নেই।

আপনি জানেন না হয়তো। স্টেশনে একটা ভাতের হোটেল আছে।

ফরিদ সাহেব আর জোরাজুরি করলেন না খাওয়ার। আর করেই বা কী লাভ! যাকে ডাকাত সন্দেহ করছে রাহেলা, তার জন্য তিনি অসময়ে খাওয়ার আয়োজন করবেন না, এ জানা কথা। তিনি মিষ্টির প্যাকেট হাতে ঝুলিয়ে নিজের ঘরে গেলেন। উৎকণ্ঠিত রাহেলার সামনে প্যাকেটটা নাচিয়ে তুলে বললেন, এই দেখ, ছেলেটা আমাদের জন্য মিষ্টি এনেছে। এখনো তুমি তাকে ডাকাত ভাববে! বলো, ডাকাত কি মিষ্টি আনে সঙ্গে করে!

রাহেলা উৎকণ্ঠার গলায় বললেন, এতক্ষণ সন্দেহ করছিলাম, এবার নিশ্চিত হলাম আসলেই সে ডাকাত।

ফরিদ সাহেব অবাক গলায় বললেন, মানে!

রাহেলা একই রকম টনটনে গলায় বললেন, আমি নিশ্চিত মিষ্টির সাথে ঘুমের ওষুধ মাখানো আছে। ওটা খেয়ে আমরা মরণ ঘুম ঘুমাব আর এই সুযোগে সব লুণ্ঠন করে সে পালাবে। আজকাল কত কায়দা উঠেছে লুট করার!

ফরিদ সাহেব থমকে গেলেন। আসলেই তো! ব্যাপারটা তিনি এইভাবে তো ভেবে দেখেন নি! আত্মীয়স্বজন মিষ্টি আনে। পথিক কেন আনবে! নিশ্চয় কোনো ঘাপলা আছে। এবার স্ত্রীর দূরদর্শিতার উপর তিনি প্রসন্ন হয়ে উঠলেন আর ছেলেটাকে একটু একটু ডাকাত সন্দেহ করতে লাগলেন। হতেও তো পারে। দিনকাল যা পড়েছে! এমন ঘটনা পেপার পত্রিকা খুললেই পাওয়া যায়।

রাহেলা সাবধানী গলায় বললেন, খবরদার ওই মিষ্টি তুমি মুখে দেবে না।

ফরিদ সাহেব বললেন, আচ্ছা মুখে দেবো না। এই বলে তিনি প্যাকেট খুলে একটা মিষ্টি বের করলেন। নাকের কাছে ধরে ওষুধ ওষুধ কোনো গন্ধ পাওয়া যায় কী না পরীক্ষা করতে লাগলেন। তেমন কোনো গন্ধ পাওয়া গেল না। তিনি বললেন, স্বাভাবিক মিষ্টির মতোই।

তা হোক। তবু তুমি খাবে না। এবং এক্ষুণি প্যাকেট ফিরিয়ে দিয়ে তাকে চলে যেতে বল।

ফরিদ সাহেব বললেন, থাকতে যখন দিয়েছি কিভাবে চলে যেতে বলি! দেখাই যাক না কী হয়!

খুব সাহস দেখাচ্ছ!

সাহস না। আমরা একটু সাবধানে থাকি তাহলেই তো হয়।

তুমি যা ভালো বোঝ করো। পরে কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবা না।

আঙ্কেল! ছেলেটা আবার ডাকছে। ফরিদ সাহেব গেলেন। ছেলেটা বাথরুমে যাবে। অতিথি-ঘরে লাগোয়া বাথরুম নেই। তিনি বাইরের বাথরুম দেখিয়ে দিয়ে কী ভেবে অতিথি-ঘরে ঢুকলেন। এ-ঘরের দেয়ালে দামি একটা ঘড়ি ঝুলানো। রিপনের বিয়ের সময় কে যেন দিয়েছিল। তিনি চট করে ঘড়িটা নামিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। রাহেলা বললেন, টেবিলের উপর একটা ফুলদানি আছে। ওটাও নিয়ে এস। ফরিদ সাহেব ছুটলেন। ফিরে এসে দামি ফুলদানিটা জমা দিলেন রাহেলার হাতে। রাহেলা বললেন, বিছানার দামি চাদরটা তুলে নরমাল কোনো চাদর বিছিয়ে দেবো? ফরিদ সাহেব বললেন, থাক। অতসবের সময় হবে না। হলোও না। ছেলেটা বাথরুম থেকে বেরিয়ে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। একটু পরে ফরিদ সাহেব পা টিপে টিপে দরজার সামনে গেলেন। পরীক্ষা করে দেখলেন, দরজা শুধুই ভেজানো। ভেতর থেকে বন্ধ করা হয় নি। ফরিদ সাহেব উত্তেজিত অবস্থায় ফিরে এলেন স্ত্রীর কাছে। ফিসফিস করে বললেন, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে নি। তারমানে মাঝরাত্রে উঠার মতলব আছে।

রাহেলা গলা চড়ে গেল—বলেছিলাম না লোকটা ডাকাত! এবার হলো তো।

কী করি বলো তো! আমার মাথায় কিছু কাজ করছে না।

কিছুক্ষণ ভেবে রাহেলা একটা বুদ্ধি বের করলেন—বাইরে থেকে আস্তে করে একটা তালা ঝুলিয়ে দাও। যেন বের হতে না পারে।

ফরিদ সাহেব লুফে নিলেন প্রস্তাব। সঙ্গে সঙ্গে অতিথি-ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিলেন বাইরে থেকে। ফিরে এসে বললেন, রিপনকে খবরটা জানাব?

না না। ও বাইরে আছে, ওকে টেনশনে ফেলে কাজ নেই। এক কাজ কারো তুমি, আমার ভাইয়ের কাছে একটা ফোন দাও। ওর জানাশোনা পুলিশ আছে।

ফরিদ সাহেব মোবইল হাতে নিয়ে লিস্ট থেকে নাম্বার বের করতে করতে কী ভেবে বললেন, না থাক। আগেই জানিয়ে কাজ নেই। নাম্বারটা রেডি থাক মোবাইলে। তেমন কিছু ঘটলে তখন ফোন দেয়া যাবে। একটু থামলেন ফরিদ সাহেব। শীতল চোখে তাকালেন স্ত্রীর দিকে। নীরব রাত। তবু কেমন ঝিম ধরানো একটা শব্দ হচ্ছে। এ কি রাতের নিজস্ব শব্দ! তিনি বললেন, ছেলেটা বলেছিল কোথায় নাকি ডাকাতরা রেলের পাত উপড়ে ফেলেছে। ঘটনা সত্য কিনা একবার খোঁজ নিয়ে আসব স্টেশনে গিয়ে?

আর আমি?

তুমি থাকো।

মাথা খারাপ তোমার! ডাকাতের সাথে একা এক বাড়িতে থাকব! বউমা বাড়ি থাকলে তবু কথা ছিল। এমন বিপদের দিনে কেন যে সুমির বাপের বাড়ি যাওয়ার বাই উঠল!

তাহলে থাক। খোঁজ নিয়ে কাজ নেই।

রাত বেড়ে চলেছে। রাতের সাথে বেড়ে চলেছে উৎকণ্ঠা। ফরিদ সাহেব আর রাহেলার চোখে ঘুম নেই। তারা অস্থির পায়ে ঘরের মেঝেতে পায়চারি করছেন। কখনো বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে অতিথি-ঘরের দরজায় গিয়ে কান পাতছেন। ডাকাতটা কি তার তৎপরতা শুরু করল!

হঠাৎ কোথায় যেন ঘণ্টা বাজল। রাহেলা চমকে উঠলেন। বললেন, দেখেছ! ট্রেন নাকি বন্ধ! তাহলে ঘণ্টা বাজল কিসের! ছোকরাটা আমাদের ভুলভাল বুঝিয়েছে।

ঘণ্টাধ্বনি ফরিদ সাহেবেরও কানে গেছে। কিন্তু এটা ট্রেনের ঘণ্টা কী না নিশ্চিত হতে পারছেন না। এত রাত পর্যন্ত তিনি কখনোই জেগে থাকেন না। হেলে পড়া এই শেষ রাতের ঘণ্টধ্বনির সাথে তার পরিচয় নেই।


কাঁটাভর্তি আলপথে হাঁটার মতো খুব সাবধানে পা ফেলে পৌঁছলেন অতিথি-ঘরের সামনে।


পায়চারি করতে করতে দুজনেরই পা ব্যথা হয়ে গিয়েছিল। কিছুটা সময় বসে বিশ্রাম নেয়া যাক এই বাহানায় তারা বিছনায় পা ছড়িয়ে বসলেন। এবং এর অল্পক্ষণ পরেই তারা ঘুমিয়ে গেলেন। ঘুম যখন ভাঙল, ভোর পেরিয়ে সকাল। সূর্য পুরোপুরি তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে। সজনে গাছের ডালে দুইদল শালিক কিচমিচ ঝগড়া করছে। ফুটে ওঠা রোদের প্রভাব আর শালিকের ঝগড়ায় প্রথমে ঘুম ভাঙল রাহেলা বেগমের। আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলতে তুলতে তার মনে পড়ল রাতের কথা। অমনি মাঝপথে আটকা পড়ে গেল হাই। তড়াক লাফিয়ে উঠে তিনি স্বামীকে ডেকে তুললেন। দুজন একসাথে জানালায় চোখ রেখে দেখলেন লোহার শিকে উজ্জ্বল আলো। আলো! আলো! আর ভয় নেই। দুজনই উঠলেন। কয়েক সেকেন্ড পরস্পরে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। তারপর কাঁটাভর্তি আলপথে হাঁটার মতো খুব সাবধানে পা ফেলে পৌঁছলেন অতিথি-ঘরের সামনে। দরজায় রাতের মতোই ঝুলে আছে তালা। ঘরভর্তি নীরবতা। ফরিদ সাহেব জানলার পাল্লা আলতো ফাঁক করে উঁকি দিলেন ভেতরে। ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে সকাল। ছেলেটা সকালের আলো গায়ে মেখে ঘুমিয়ে আছে নির্বিকার। আহা কী নিষ্পাপ ঘুম! ফরিদ সাহেবের বুক থেকে চিন্তার একটা পাথর সরে গেল। স্ত্রীর সম্মতি নিয়ে তিনি খুব আস্তে, যেন তালাও টের না পায়, চাবি ঘুরালেন তালার পেটে। খুলে গেল দুয়ার। গুড মর্নিং। আড়মোড়া ভেঙে ছেলেটা উঠল। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতে হতে রাহেলার নাস্তা তৈরি হয়ে গেল। নাস্তা খেয়ে খুব খুব কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল পথে। ফরিদ সাহেব দরজা বন্ধ করে ফিরে এলেন ঘরে। পাতিলে জমাট বাধা দইয়ের মতো খাটের কোণায় তখন স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন রাহেলা। পরিবেশ হালকা করার জন্য ফরিদ সাহেব হাসি হাসি মুখে স্ত্রীর দিকে চোখ নাচিয়ে বললেন, এবার তাহলে মিষ্টি খাওয়া যায়, কী বলো!

সাব্বির জাদিদ

জন্ম ১৭ আগস্ট, ১৯৯৪; কুষ্টিয়া। কথাসাহিত্যিক।

শিক্ষা : ইসলামিক স্টাডিজ, অনার্স, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

প্রকাশিত গ্রন্থ —
একটি শোক সংবাদ [গল্পগ্রন্থ, ঐতিহ্য, ২০১৭]

ই-মেইল : sabbirjadid52@gmail.com

Latest posts by সাব্বির জাদিদ (see all)