হোম গদ্য গল্প দুরন্ত হাওয়ার বিকেল

দুরন্ত হাওয়ার বিকেল

দুরন্ত হাওয়ার বিকেল
352
0
11090462_920522811326174_783808097_o
অলংকরণ : সারাজাত সৌম

 

দুপুর হলে কলেজটা বাসি লাশের মতো হা মেলে পড়ে থাকে। একটা মাছিও থাকে না ভন ভন করে উড়ে বেড়ানোর মতো। তখন ভাঙা দেয়ালের খোড়ল থেকে বেরিয়ে আসে এ বাড়ির বনেদি আত্মাটা। নূপুরের নিক্কণ, এস্রাজের লহরি, রমণীর হাসির কলরোলে মুখরিত হয়ে ওঠে তার সাবেকি দিনগুলো। ডরমিটরির জলে-নুনে ক্ষয়া জানালাগুলোর ফাঁক দিয়ে পুরো কলেজটা দেখা যায়। কল্পনার ঐরাবত হেলে-দুলে হেঁটে আসে নবীনচন্দ্র রায়বাহাদুরকে নিয়ে। তার পেছনে অশ্বারোহীদের সারি। দূরে ফাঁসির মঞ্চ সাজানো। বিদ্রোহী প্রজাদের শিক্ষা দানের ক্ষুদ্র আয়োজন। শিক্ষক স্বয়ং মহারাজ। মঞ্চের নিচে লাশ কেটে টুকরো করার মেশিন। ফাঁস থেকে লাশ ছেড়ে দিলে মেশিনের হাঙরটা গপ করে গিলে ফেলবে। তার পর পুরো একটা মানুষকে কোরমার সাইজে টুকরো টুকরো করে ছেড়ে দেবে গড়াইয়ের বুকে। বোয়াল কাতল ঘাঘট মানুষের মাংস খেয়ে খেয়ে পুষ্ট হবে। আবার সেই মাছ খাবে মানুষ। কী ভয়ানক জীবনচক্র! একটু পরেই নড়ে উঠবে লাশখেকো মেশিনটা।

মহারাজ মহামূল্যের মণিমাণিক্যে সজ্জিত আসনে বসে অভিযোগ শুনছেন। এত দূর থেকে পুরো কথোপকথন শুনতে পাচ্ছে না রাইসুল। কিন্তু ঠিকই সে বুঝতে পারছে কী কথা হচ্ছে সেখানে। লিপ-রিডিং বলে একটা জিনিস শেখানো হয় গোয়েন্দাদের। ঠোঁটের নড়াচড়া দেখেই বলে দেয়া যায় কী কথা হচ্ছে। রাইসুল এখন সে কথা পড়ার জাদুটা জেনে গেছে। দূর থেকে ঠোঁটের বিক্ষেপণ দেখে দেখেই সে কথা সাজিয়ে নিচ্ছে।
বেশ মোটাসোটা গোঁফঅলা এক অমাত্য এল লাল খেরোয় মোড়ানো দস্তাবেজ হাতে। মহারাজকে কুর্নিশ করে শুরু করল তার বক্তব্য, ‘মহারাজ, এই সেই বিদ্রোহী, যে কিনা আপনার রাজস্ব ব্যবস্থার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এমনকি তার পরগনার প্রজাদের আপনার—’
মহারাজ ক্ষুব্ধ। দুটো চোখ তার জ্বলছে অগ্নিগর্ভের ন্যায়।
অভিযুক্তের মাথা কালো কাপড়ে ঢাকা। কাপড়ের ঠুলি সরাতেই সবাই অবাক। অভিযুক্ত রাজার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। চোখাচোখি হতেই রাজা দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলেন। সভাসদের অনেকের মুখেই কৌতুকের নকশা। রাজা তাতে ভীষণ বিব্রত।

● বিয়ের আগে এক সময় এই এলাকার সকল যুবতীকে তিন দিন নবীনচন্দ্রের হারেমে কয়েদ খাটতে হতো 

রাইসুলের পেট ঠেলে হাসি পায়। রাজাকে দূর থেকে পুরো কার্টুনের মতো দেখাচ্ছে। এ যেন মটু-পাতলুর রাজা। কী হাস্যকরই না ছিল সে সময়ের রাষ্ট্রব্যবস্থা! এসব কথা মাহবুব সাদিকের সামনে তুললে আসর জমে যায়। তিনি ইসলামিক হিস্ট্রির টিচার। ইতিহাসের আদিরসাত্মক উপাদানগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে ভালোবাসেন। জমিয়ে রাখেন মগজের কোঠরে কোঠরে। অনুকূল পরিবেশ পেলে ছেড়ে দেন দেদারে। সেদিন স্টাফ রুমে বসে আলাপ হচ্ছিল।
এই এলাকার মেয়েরা কেমন?
ভালো।
ভালো মানে, বলেন অতীব ভালো। দরিদ্র এলাকা। প্রপার নিউট্রেশন হয় না। গায়ে একটু মাংস লাগলে এরা কেমন খোলতাই ছাড়ে জানেন—
না, জানি না।
জানেন না তো ভালো। জেনে নিন।—কানের গোড়ায় ফিস ফিস করে বললেন।
রাইসুল হেসে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু দমবার পাত্র নয় মাহবুব।
এখানকার মেয়েরা এত সুন্দরী কেন জানেন?
মাথা নাড়ায় রাইসুল। অর্থহীন আন্দোলন। এর দ্বারা হ্যাঁ না কিছু বোঝা যায় না।
ব্লু ব্লাড। রক্তের কারণে। বিয়ের আগে একসময় এই এলাকার সকল যুবতীকে তিন দিন নবীনচন্দ্রের হারেমে কয়েদ খাটতে হতো।
কী বলেন! রাইসুলের রোমকূপ দাঁড়িয়ে যায়।
আরে মিয়া অবাক হওয়া তো মাত্র শুরু। শুনেন আরেক ঘটনা। তখনই শুরু হলো হট্টগোল। মাহবুব সাদিক ছুট লাগালেন।
যাই ভাই, আপনার প্রিন্সিপালের চেয়ারের একটু জোর বাড়াইয়া দিয়া আসি।
মাহবুব স্টুডেন্ট লাইফে ঘাগু লিডার ছিলেন। গরমে নরমে সিচিউশন হ্যান্ডেল করতে তার কোন জুড়ি নেই।


সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাইসুলের একটানা ক্লাস। সিংগল ম্যান ডিপার্টমেন্ট। তার উপর বাংলা। সব শ্রেণিতেই বিচরণ। দুপুর দেড়টা-দু’টা পর্যন্ত দম ফেলবার সময় থাকে না তার। তারপর হুট করে সব কেমন যেন পাল্টে যায়। নিস্তরঙ্গ অখণ্ড অবসর। সারা কলেজ খাঁ খাঁ করে। তখন ডরমিটরিতে শুয়ে বসেও সময় কাটে না। দুপুরে একটা ভাতঘুম দিয়ে নিয়ে বিকেলে হাঁটতে বের হয় গড়াইয়ের তীর ঘেঁষে। নদী আর নদী নেই। কোথাও যেন ছিপ এঁটে গেছে। পারলে রাইসুল নিজ হাতে সেই ছিপ সরিয়ে দিত। সে পারে না। যা পারে তা হলো নদীর কলবল আওয়াজ শুনে উল্টাপাল্টা সব ভাবতে। কেমন ছিল তখন সেই নদীটা? প্রকট প্রমত্তারূপিণী। কোল জুড়ে হাওয়ায় ফোলা পোয়াতি বজরার সারি। ইতিহাসের পাতা থেকে সেই হাওয়া এসে ঝাপ্টা খায় তার নাকে মুখে। কিন্নরীদের হাসির দমকে মুখরিত হয়ে ওঠে চারিধার। নিস্তরঙ্গ দুপুরটা মুছে যায় দুরন্ত হাওয়ার বিকেলে। পাশে শওকত না থাকলে সজীব থাকে—নারীর শরীরের জিওগ্রাফি যার মুখস্ত। ক্লাসে ধরণীর কার্টোগ্রাফি পড়ালেও মনে মনে এঁকে যায় ইপ্সিত রমণীর দেহের আদরা।
মালগুলা খাসা না রে—
ধ্যাৎ স্টুডেন্ট না!—রাইসুল কল্পনার ঐরাবতের রাশ টেনে ধরে। লেডিস হোস্টেলের মেয়েগুলোকে দেখে তার পোশাকি অস্তিত্বটা ফিরে পায়। হিসাবি মনটা সক্রিয় হয়ে ওঠে। মুহূর্তের উত্তেজনায় কোনো ভুল করা যাবে না। সারাজীবন দীর্ঘ সরলরেখার মতো পড়ে আছে সামনে। এই মেছো-মফস্বলে হাঁটু গেড়ে ফেললে বাকিটা জীবন জল কাদায় কাটাতে হবে। এখনই অন্ধ বন্ধ করো না পাখা। এরকম উপজেলা শহরে সিভিল সার্ভিস দিয়ে আসা ছেলে ছোকড়ার অনেক ডিমান্ড। প্রতিটা মেয়ে মনে মনে আলোর ফাঁদ পেতে বসে আছে এদের ধরবার জন্য। আর বাপ-মায়েদের কথা নাইবা বলল। অতএব সাধু সাবধান।
স্যার, কয়টা ঢেউ গুনলেন। খিল খিল হাসির অওয়াজে চির ধরল আকাশে। রাইসুল অপেক্ষাকৃত অধিক সুন্দরীর দিকে চোখ তুলে তাকায়। লরিয়েল পন্ডস এদের মুখে ওঠে না। হলুদ আর বেশনই ভরসা। তা দিয়ে এত খোলতাই আসে কী করে! আলো থেকে চোখ বাঁচাতে মুখ ফিরিয়ে নেয় রাইসুল। উদাসী কণ্ঠে বলে ওঠে, ঢেউ গোনা ছাড়া আর কিবা করার আছে এখানে?
স্যার আমাদের প্রাইভেট পড়াবেন?
সজীব তখন ঝনঝন করে ওঠে, এই তোদের খুব পয়সা হইছে? খাবি এক চড়।
তারপর সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়টা হাসিঠাট্টায় কাটে। মফস্বলের সুন্দরীরা বিভিন্ন বাহানায় নিজেদের উপস্থাপন করার চেষ্টা করে তাদের সামনে। কাজল কারিনার পোজে হাত পা নাড়ায়। বিস্ময় বা আনন্দ প্রকাশ করে। কিন্তু মুখে লেগে থাকে জল-কাদার গন্ধ। এই কিছুক্ষণের জন্য তারা সবাই নিজ নিজ শ্রেণিগত অবস্থান ভুলে গিয়ে বিকেলটাকে উপভোগ করে। দুরন্ত হাওয়ার বিকেল। মেয়েগুলোই যেন সেই হাওয়া নিয়ে আসে। রাইসুল-শওকতদের ভুলিয়ে দেয়ার জন্য। লম্বা কোনো বন্ধ হলে দুয়েকদিনের মধ্যে হোস্টেল খালি হয়ে যায়। বিকেলের এই আড্ডা তখন আর থাকে না। গড়াই তখন গড়িয়ে চলে নিস্তরঙ্গ দেহটিকে নিয়ে। বিকেলটা যেন অবসাদে ম্লান হয়ে যায়। তাই বন্ধের সাথে সাথে রাইসুল ঢাকার বাসে উঠে পড়ে। ছুটির দিনগুলোতে ফুলার রোডের ফুটপাথে বসে সে তার বন্ধু-বান্ধবদের কলেজের গল্প করে। তার ছাত্র-ছাত্রীদের বোকা বোকা কথা আর কাজগুলো আড্ডার উপজীব্য হয়ে ওঠে। সবাই দম ছেড়ে হাসে।

● স্যার ফোন তো আমি দেই না, দেন আপনে… হি হি হি 


বৈকালিক ভ্রমণ শেষে ডরমিটরিতে ফেরার পর কিছুই করার থাকে না রাইসুলের। বই পড়ার অভ্যাসটাও নষ্ট হয়ে গেছে। আর পরীক্ষা-টরিক্ষা দিতে ভালো লাগে না। ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন আপাতত ইস্তফা। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করা বা খাতা কাটার কাজ থাকে। কোনো কাজ না থাকলে সন্ধ্যা রাতেই বিছানায় গা এলিয়ে দেয় রাইসুল। বিছানা তার কাছে ভাবনার চারণক্ষেত্র। ছাদের কড়ি-বর্গাগুলোর দিকে অপলক তাকিয়ে বিগত দিনের কথা ভাবে রাইসুল। কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। নাখালপাড়ার ঘিঞ্জি গলিটা তার চোখের উপর ভেসে ওঠে। কখনো ভাবে নি সেই গলি সেই বড়ো রাস্তার মোড় পেরিয়ে কোথাও থাকতে হবে। নাখালপাড়ার প্রেমে পড়ে কয়েকদিন সলিমুল্লায় থেকে আবার ফিরে এসেছিল। শেষমেশ সেই নাখালপাড়া ছাড়তে হলো। সরকারি চাকরির সূত্রে চলে আসতে হলো এই অজ পাড়াগাঁয়। নামে উপজেলা সদর হলেও পাঁচ মিনিট হেঁটে গেলে নগর সভ্যতার কোনো নাম গন্ধ থাকে না। প্রথম প্রথম এসে কলেজের পরের সময়গুলোকে মনে হত মিউট টাইম। কী করে যেন চিত্রপটের সকল শব্দ তুলে নেয়া হয়ে গেছে। নাখালপাড়ার বাসিন্দা বলেই হয়ত এই শব্দের প্রতি ঔদাসীন্য কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না রাইসুল। তার কাছে শব্দহীন একটা জগৎ মানে মৃত্যুর অন্যরূপ। নাখালপাড়া মাঝরাতেও জেগে থাকে ট্রাকের ঘর্ঘর আওয়াজে। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে রাইসুল। অনেক রাতে খাওয়াও হয় না। শেষ রাতে ক্ষুধায় পেটটা মোচড় দিয়ে উঠলে টেবিলে বেড়ে রাখা ঠান্ডা ভাত তরকারি খেয়ে নেয়।
এই সরল নিস্তরঙ্গ জীবনের মধ্যে কী করে যেন একটা টেলিফোন এসে ঢুকে পড়ল হঠাৎ। প্রায় রাতে একটা মেয়ে ফোন করে। কেমন আছেন কী করছেন কী খেয়েছেন—এই ধরনের সাধারণ সব প্রশ্ন। প্রথম প্রথম অস্বস্তিকর লাগত। সন্দেহ হতো। কিন্তু দু’তিন দিন কথা বলার পর রাইসুলের মনে হলো, বেশ তো! সময় কাটানোর একটা ভালো উপায় পাওয়া গেল। তারপর রাইসুলই নিজ থেকে মেয়েটিকে ফোন করতে লাগল। কথা জমতে থাকে। মেয়েটি খুব চটপটে। কণ্ঠে এক ধরনের আকর্ষণ আছে।
কিন্তু মেয়েটাকে যতটা চতুর ভেবেছিল রাইসুল ততটা আসলে নয়। একদিন কথায় কথায় বলে ফেলল, স্যার আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?
রাইসুলের শিরদাঁড়া বয়ে একটা হিমবাহ যেন নেমে এলো।
কে, কে তুমি?
আমি মুক্তা। হি হি হি…
হাসিটা গরম সিসার মতো তার কানে গিয়ে বিঁধছিল। অতর্কিতে একটা চড় এসে লাগল যেন ওর গালে।
তুমি এটা এত দিন বলো নি কেন?
বললে তো আপনি কথা বলতেন না।
তুমি আর আমাকে ফোন দিবা না।
স্যার ফোন তো আমি দেই না, দেন আপনে… হি হি হি
রাইসুল লাইন কেটে দেয়। নিজের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। বিকেলে আর হাঁটতে বের হয় না। হোস্টেলের মেয়েগুলোকে এত প্রশ্রয় দেয়া ঠিক হচ্ছে না। এদের কেউ একজন নিশ্চয়ই মুক্তা। বিষয়টা শওকতের নজরে পড়ল কি না জানি না; কিন্তু সে খুব করে চেপে ধরল রাইসুলকে।
ওই মিয়া কি হইছে তোমার? হঠাৎ এমন ম্যান্দা মাইরা গেলা ক্যান? বাতে পাইছে নি?
না কিছু না। এমনেই। সব একঘেয়ে লাগছে।
শওকত ধুরন্ধর প্রকৃতির ছেলে। জেরার মুখে রহস্যের ছিপ উড়ে যায়। একসময় পুরো ঘটনা কবুল করে রাইসুল।
শওকত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে, এই নি ব্যাটা মানুষ হইছ? রাজহংস হও। রাজহাঁস। পানিতে থাকবা, গায়ে পানি লাগব না। হে হে হে…
কেমনে?
উত্তরটা করার সুযোগ হয়ে ওঠে না। তখনই সেল ফোন বেজে ওঠে। প্রিন্সিপালের জরুরি হুকুম। সবাইকে সেজেগুজে কলেজের গেটে গিয়ে দাঁড়াতে। ভিআইপি আসছে।


ডরমিটরির সব শিক্ষক সেজেগুজে কলেজ গেটে গিয়ে দাঁড়ালো। যারা ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন তারাও এলেন। একটু পর গাড়ির বহর। কলকাতার বিখ্যাত সংগীত-শিল্পী নীলিমা রায় এসেছেন। সঙ্গে তার পরিবার এবং জেলা প্রশাসনের লোকজন। প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল। নীলিমা রায় ঘুরে ঘুরে দেখলেন কলেজ ভবনটা। আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লেন। নবীনচন্দ্র রায়বাহাদুরের বংশধর তিনি। তার জন্মের আগেই তাদের পরিবার দেশান্তরিত হয়েছে। ছোটবেলায় তিনি এই বাড়ির অনেক গল্প শুনেছেন তার মা-ঠাকুরমার কাছে। এখন দেখতে এসেছেন। কলেজ ভবনটি ঘুরে দেখা শেষ হলে শিক্ষকদের সঙ্গে চা-চক্রে মিলিত হলেন। অনেক আবেগ অনেক স্মৃতির কথা বললেন তিনি। নীলিমা রায় চলে যাওয়ার পর কলেজ গেটে টিচারদের আড্ডা বসল। যথারীতি সেই আড্ডার মধ্যমণি মাহবুব সাদিক।
কার বেদনায় কে কাঁদে। বলেই মাহবুব হো হো করে হেসে উঠেন।
কী বলতে চাও মাহবুব খুইল্যা বলো।—ইসহাক স্যার রহস্যের গন্ধ পেয়ে ঘাঁই মারলেন।
না, নীলিমা রায়ের কথা বলছি।
তো।
নবীনচন্দ্রের জন্য তার মায়া দেখে আমার হাসি পাইল।
মানে?
তিনি যে এত কান্নাকাটি করলেন, আর নবীনচন্দ্রের জন্য এত মায়া দেখালেন, তার লাইব্রেরি সমাজসেবার গুণপনা করলেন, তিনি নবীনচন্দ্রকে কতটুকু জানেন?
কী বলেন স্যার?
একজন দাবি করলেই কি তিনি কারো বংশধর হয়ে যান?
হোয়াট!
আমার জানা মতে নবীনচন্দ্রের কোনো বৈধ উত্তরাধিকারই নেই। কারণ তার কোনো বৈধ স্ত্রীর গর্ভাধানের কোনো ঘটনা জানা যায় না?
তাহলে প্রতাপচন্দ্র রায়বাহাদুর?
শোন শামীম, আমি বই পুস্তকে পাইছি, নবীনচন্দ্ররা ৭ প্রজন্ম ধরে নিঃসন্তান। এমনকি নবীনচন্দ্র নিজেও পালকসন্তান ছিলেন?
কী বলেন!
হুম। অনাচারের চূড়ান্ত করেও এরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের স্ত্রীদের গর্ভে একটা সন্তান জন্ম দিতে পারে নি। অথচ খবর নিয়ে দেখো, হাটে মাঠে বিলে ঘাটে কত লোক এদের রক্ত শরীরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এটাই রে ভাই ইতিহাসের ট্র্যাজেডি।
মাহবুব সাদিকের কথা শোনার পর সবাই যেন ইতিহাসের চোরাবালিতে হাবুডুবু খেতে লাগল।

 ● নিজের ছাত্রীর সঙ্গে প্রেমভাব নিয়ে কথা বলা, কেমন না ব্যাপারটা!
আচ্ছা, টিচাররা কি ছাত্রী বিয়ে করে না  


টেলিফোনের আলাপনের কথা ভুলে গিয়ে স্বাভাবিক হতে লাগল রাইসুল। রাজহংস হওয়ার চেষ্টা। বিকেলে আড্ডায় যায়। মেয়েরা আসে। কথা হয়। শামীম শওকত সজীবরাও যোগ দেয়। এ নিয়ে এলাকায় দু’চারকথা যে হয় না তা নয়। কিন্তু দুর্বল মানুষের এলাকা। কেউ সামনে এসে কথা বলবার সাহস পায় না। মাঝে মাঝে ভাইস প্রিন্সিপাল স্যার রুমে ডেকে নিয়ে ইঙ্গিত করে, রাইসুল সাহেব, বিয়েশাদির কথা কিছু ভাবছেন? ভেবে চিন্তে আগাইয়েন। সারা জীবনের ব্যাপার কিন্তু।

বিকেলের আড্ডায় দিন দিন সভ্য বাড়ছে। ডিগ্রি ক্লাসের দু’চারটি নতুন মেয়ে এসেছে। এর মধ্যে একটা মেয়ে এসে চুপচাপ বসে থাকে এক পাশে। সকলের কথা শোনে। আড্ডা শেষ হওয়ার আগেই বিরক্ত মুখ করে চলে যায়। শুভ্র পরিপাটি এক মেয়ে। প্রথম দর্শনেই একটা ধাক্কা খেয়েছিল রাইসুল। মেয়েটা যেহেতু মুখ খোলে না, রাইসুলেরও আগ বাড়িয়ে কথা বলার অভ্যাস নেই, তাই মেয়েটার সঙ্গে আর পরিচয় হলো না। পরে জানা গেল মেয়েটার নাম বীথিকা রায়—এই পর্যন্ত। হয়ত হিন্দু না হলে আগ্রহ দেখানো যেত। মনে মনে ভাবে রাইসুল। এ রকম একটা চাঁদপানা মুখের দিকে তাকিয়ে ক্যারিয়ার ফ্যারিয়ার দিব্যি ভুলে থাকা যায়। যাই হোক, বীথিকা রায় কাচারি বাড়ির কেয়ার টেকারের ভাতিজি। এই পর্যন্ত খবরও জুটিয়েছে রাইসুল। কিন্তু যে মানুষটার খবর নেয়ার জন্য রাইসুল উদগ্রীব তার কোনো খোঁজ নেই। প্রায় রাতে ডরমিটরির নির্জনতা ঝামা পাথরের মতো চেপে বসে রাইসুলের বুকের উপর। তখন সব ভুলে গিয়ে ফোনবুক থেকে মুক্তা নামের মেয়েটির নম্বর সে বের করে। ফোন করতে গিয়ে আবার আত্মসম্মানে বাধে। নিজের ছাত্রীর সঙ্গে প্রেমভাব নিয়ে কথা বলা, কেমন না ব্যাপারটা! আচ্ছা, টিচাররা কি ছাত্রী বিয়ে করে না। এটা কি নতুন কিছু। তারপরও মন সায় দেয় না রাইসুলের।


ডিগ্রির বাংলা ক্লাসে স্টুডেন্ট খুব একটা হয় না। আর ফার্স্ট পিরিয়ড হলে তো কথাই নেই। মাঝে মাঝে ছাত্র নেই বলে ক্লাস নেয় না রাইসুল। কিন্তু কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী আছে, ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক না কেন ক্লাসে এসে হাজির হবে। এদের জন্য ইচ্ছে থাকার পরও ফাঁকি দেয়া যায় না। এই ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড়ে বীথিকা রায়ের মুখটা উজ্জ্বল। মেয়েটা এত গভীর চোখ করে তাকায়, মনে হয় অনেক কথা বলার আছে তার। কিন্তু ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে মেয়েটি বইগুলো বুকে টেনে নিয়ে হন হন করে চলে যায়। তখন রাইসুলের মনে হয় এ তার ভ্রমচিন্তা। কিন্তু সেদিন সবাই চলে যাওয়ার পরও বীথিকা থেকে গেলে। ধীর পায়ে রাইসুলের পাশে এসে দাঁড়াল। কী কারণে যেন রাইসুলের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো তৎক্ষণাৎ। মনে হচ্ছিল তার মনের সব কথা পড়ে ফেলেছে মেয়েটি। এবার জেরা করতে বসবে।
স্যার, আপনি আমাকে একটু ইংরেজিটা দেখিয়ে দেবেন।
আমি কি ইংরেজির টিচার?
কেন স্যার, আগে তো বাশার স্যার আমাদের পড়াতেন। আর ইংরেজির সাইফুল স্যার তো প্রাইভেট পড়ান না।
ও, সাইফুল স্যার যেহেতু প্রাইভেট পড়ান না তাই আমাকে পড়াতে হবে?
না তা না—
শোন, আমি প্রাইভেট পড়াই না। পড়াবও না। যদি কিছু বুঝতে অসুবিধা হয় তাহলে নির্দ্বিধায় আমাকে বলো। আমি তোমাকে সাহায্য করব।
না স্যার, লাগবে না।
মুখটা গম্ভীর করে নতশিরে মেয়েটি চলে গেল।
দুপুরে মোবাইলে এমএমএস পেল রাইসুল। মুক্তার এমএমএস। হৃদয়ভাঙার একটা এনিমেটেড ছবি।
এমএমএসটা পেয়ে মনে হলো এতদিন ধরে মরে পড়ে থাকা গড়াই নদীটি যেন ফুলে ফেঁপে উঠেছে। এই আবেগের উন্মত্ত ধারা কোনো বাধ আর আটকে রাখতে পারবে না। সাত-পাঁচ কিছু না ভেবেই মুক্তাকে ফোন লাগালো রাইসুল। এই বীথিকা রায় আর কেউ নয়, মুক্তা। মেয়েটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। রাইসুলও ভাষাহীন। ভাষাহীনতার মধ্যে দিয়ে একটা দুপুর কাটল। কথা হলো না তেমন কিছুই, কিন্তু ফোনের ক্রেডিট শেষ হয়ে গেল।


আবার রাতগুলো কথায় কথায় ভরে উঠতে লাগল। দিনগুলো মায়াকল্পনায়। ডিগ্রির বাংলা ক্লাসের জন্য দুই নর-নারী ব্যাকুল হয়ে থাকে। অন্য কেউ না এলেও ক্লাস হয়।

রাইসুল খুব সচেতন, সম্পর্কটা যেন প্রেমের পরিণতির দিকে না এগোয়। সে বোঝায় বীথিকাকে, দুজন নর-নারী একজন আরেকজনকে পছন্দ করতেই পারে, তাই বলে—
তাই বলে কী স্যার, বলেন না।
কী বলব। বলার আগেই তো তুমি সব বুঝে যাও।
স্যার আমি কিছুই বুঝি না। আমার মাথায় কিসসু ঢুকে না। কারণ সারাক্ষণ আমার মাথাটা ব্যথা করে। মনে হয় মাথাটা কেটে ফেলি।
তুমি বুঝি খুব টেনশন কর।
স্যার টেনশন ছাড়া এই জীবনে আর আছে কী!
বীথিকা তার দুঃখের গল্প বলে। তার বাবা ছোট থাকতেই মারা গেছেন তিন মেয়ে রেখে। মা ছোটখাটো হাতের কাজ করে আর কাকাদের দান-অনুগ্রহে সংসার চালান। তাদের তিন বোনেরই পড়াশোনায় খুব আগ্রহ। দেখতে-শুনতেও খারাপ না। ও এসএসসি দেয়ার পর থেকেই কাকারা বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছে। নিজের ঐকান্তিক চেষ্টায় সে এত দূর এসেছে। সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। কিন্তু কাকারা চায় এখনি সে বিয়ে করে ফেলুক।

● মুর্শিদাবাদী এক দরিদ্র মুসলমানের মেয়েকে কী করে যেন রায়বাহাদুরের মনে ধরে গিয়েছিল 

রাইসুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, বিয়ে তো আগে পরে করতেই হবে মুক্তা।
ভালো পাত্র পেলে তো আমার আপত্তি নেই স্যার।
কী রকম পাত্র চাও?
ঠিক আপনার মতো ছেলে স্যার।
রাইসুলের মনে হয় হঠাৎ করে সে একটা শক খেলো। তার দুটো কান গরম হয়ে ওঠে। মেয়েটা কি তাকে নিয়েই ভাবছে?
কী বলছ তা বুঝে বলছো কি?
হুম।
শোন ধর্ম একটা বড়ো ফ্যাক্টর। নিজের বিশ্বাস ভেঙে কেউ খুব একটা সুখী হতে পারে না মুক্তা।
বিশ্বাসটা যদি চাপিয়ে দেয়া হয়, সেটা ভাঙতে ক্ষতি কি স্যার?
মানে? কী বলতে চাও তুমি?
আপনি কি জানেন স্যার, আমরা নবীনচন্দ্র রায়বাহাদুরের বংশধর।
জানতাম না তো!
অন্যরা স্বীকার করতে না চাইলেও, এই নীল রক্ত নিয়ে আমাদের অহংকারের অন্ত নেই। বিয়ের সম্বন্ধ এলে আগে জাতপাতের বিচারে বসে যান কাকা-জ্যাঠারা।
সেটা তো স্বাভাবিক। তোমাদের ধর্মে তো বর্ণপ্রথা এখনো…
অথচ এই নীল রক্তে নানা ধর্মবর্ণের রক্ত দেদারে মিলেছে। নবীনচন্দ্র বড় ধূর্ত লোক ছিলেন। এসব মিশ্রণকে তিনি স্বীকৃতি দেন নি কখনো। বন্ধ করে রেখে গেছেন অন্ধকার দুয়ারগুলোকে।
ভেরি ইন্টারেস্টিং তো।
এরকম এক অন্ধকার পর্বের নাম বিমলা দাসী। মুর্শিদাবাদী এক দরিদ্র মুসলমানের মেয়েকে কী করে যেন রায়বাহাদুরের মনে ধরে গিয়েছিল। রাজগৃহে রাখার জন্য তার নাম পাল্টে দিয়েছিলেন। তার গর্ভেই আমার ঠাকুর্দার জন্ম। এবার বলেন তো স্যার, বিমলা দাসীর বংশধরের কী বিশ্বাস হওয়া উচিৎ?
মরা গড়াই হঠাৎ যেন ছল ছল করে উঠল। কথা বলে উঠল তার পাথরে চাপা প্রাণটা। মুগ্ধ চোখে রাইসুল দেখতে লাগল দুরন্ত হাওয়ার বিকেলটাকে। হাজার প্রশ্নে মুখরিত দুরন্ত সেই হাওয়া।