হোম গদ্য গল্প দুনিয়া দখল

দুনিয়া দখল

দুনিয়া দখল
237
0

এত বড় দুনিয়ায় তার নিজের বলতে এক বিঘা জমি। তাতে একবার মাত্র ধান হয়। পুরোটাই বর্ষার ভরসায়। সেই ধান একবার ঘরে মজুদ করতে পারলে আশ্চর্য স্বস্তি হয় আরু মিঞার। বছরভর ভাতের ভরসা। সে একা মানুষ। খানিক বেচতে পারলে পান বিড়ির খরচও ওঠে আসে। আর যদি কোনো অভুক্ত বাউল ফকির বৈরাগী এসে পড়ল ঘরে তো তাকেও বসিয়ে খাওয়ানো যায় ভরপেট ভাত। আর এমন লোকের আনাগোনা লেগেই আছে আরু মিঞার ঘরে। চাষের সময় এদের কথাও ভাবতে হয় বৈকি তাকে।

ব্যাপারটা বাৎসরিক এক চক্রের মতো। সোজা কথায় ভাতের চাকা। চাকাটা ঘুরতে থাকলে ভাতের অভাব হবে না। বর্ষা এলেই নেমে পড়তে হবে জল কাদার মাঠে। তারপর মাস চারেক ঠেলাঠেলি করলেই ঘুরে যাবে নিজের মতো। তখন শুধু ভাত ফোটাও আর খাও। ফ্যান দিয়ে হোক, নুন দিয়ে হোক….। আর কী চাই। জীবনে এর চেয়ে বড় ভরসা আর কী আছে।


মেঘলা ভিজে ভোরে বনরেখা ঘেঁষা এক ঋতুমতী জমির জাতধর্ম নিয়ে চর্চায় মেতে ওঠে দুই বন্ধু।


মাঝে মাঝে গড়বড় হয়েও যায়। কখনও জলের অভাবে মাটি ফুটিফাটা। রাঢ় বাংলার এই অঞ্চল স্বভাবে রুখা। এমন রোদ দেয় যে মাঠের ফসল মাঠেই পুড়ে খাক। আল্লাহর কী খেয়াল! কখনও আবার বানভাসি চারিদিক। তখন জলে ডুবেই মরে যায় ধান। আল্লাহর এই দুটো মারকে তো হজম করতেই হয়। তখন সরকারি খয়রাতির ভরসায় ধারণ করতে হয় জীবন।

এ বছর আকাশটা ভারি আশা জাগানিয়া। একেবারে গর্ভবতী যুবতীয় মতো। চাষার প্রাণ তো হু হু করবেই এমন করে মাঠের ওপর মেঘ নেমে এলে। চাষার ঘরে তখন সাজো সাজো রব। হাল লাঙ্গল, গরু বলদ, টিলার ট্রাক্টর, বাইসাম দোপহরিয়া….।

কিন্তু কাক ভোরেই বাধা পায় আরু মিঞা। জমিতে তখনও লাঙ্গল ঠেকে নি। সনাতন এসে দাঁড়ায় তার সামনে। হেঁকে বলে, ‘লাঙ্গল এখন নাই দিবার বটে।’

‘কেন্নে গো দোস্ত॥ হইল কী?’

সনাতনের কথা শুনে হতাশ হয় অরু। গ্রামদেবতার পুজো না কী এখনও হয় নি। আর যতক্ষণ তা না হচ্ছে কেউ জমি চাষ করবে না।

অরু বলে, ‘কিন্তু আমি তো মুসলমান?’
সনাতনের যুক্তি, ‘জমিটা তো হিন্দু।’

মেঘলা ভিজে ভোরে বনরেখা ঘেঁষা এক ঋতুমতী জমির জাতধর্ম নিয়ে চর্চায় মেতে ওঠে দুই বন্ধু। বন্ধুই, কারণ গ্রামের নিম্ন বুনিয়াদিতে তারা সহপাঠী ছিল। পরে সনাতন অনেক এগিয়ে যায় রাজনীতি করে। অরু মিঞা চাষী হয়। শুধুই চাষী। তাতে কোনও অসুবিধাও ছিল না অরুর। কারণ তাকে চাষ করতে এমন করে বাধাও দেয় নি কেউ কখনও। এখন সনাতন বলছে, জমিটা তো হিন্দু।

সে কথা অরুও মানে আবশ্য। তার জমিটা আসলে হিন্দু জমি। কারণ দলিলের দাগে জমিটা পড়ছে নারায়ণপুর মৌজায়। ঘরটা যদিও তার হোসেনডি। অন্য মৌজায়। নায়াণপুরে যেমন দুশো ঘরই হিন্দু চাষী। হোসেনডিতে দেড়শো ঘরই মুসলমান চাষী। তাদের চাষের জমিও যে যার নিজস্ব মৌজায়। জমিটা যেন একটা ছিটমহল। তার তিনপাশে নারায়ণপুর মৌজা। এক পাশে হোসেনডি।

তাতে আরু মিঞার কোনো অসুবিধা কখনও হয় নি যদিও। কারণ গ্রামদেবতার পুজো সময় মতো হয়ে এসেছে তার বাপঠাকুরদার আমল থেকেই, চাষের তোড়জোড় শুরুর আগেই পুজো সম্পন্ন হয়েছে বরাবর। ফলে চাষ করতে গিয়ে কখনও তাকে হিশাব মেলাতে হয় নি ওদের গ্রামদেবতার পুজো হলো কি না। এবারই প্রথম….।

এখন সনাতনের কথায় তার খেয়াল হলো। সত্যিই তো। নারায়ণপুরের কোনো জমিতেই লাঙ্গল পড়ে নি এখনও। অথচ লাগোয়া হোসেনডির প্রায় সব জমিতেই শুরু হয়েছে লাঙ্গল দেওয়া। আরু মিঞা চিন্তিত স্বরে বলে, ‘তাহলে?’

‘তাহলে অপেক্ষা কর যতদিন না পুজো হচ্ছে।’
‘কিন্তু পুজোটা হবে কবে?’

এর উত্তর সনাতনের কাছেও নেই। পরম্পরা মতে গ্রামের একটাই মাত্র পরিবারকে দেওয়া আছে সেই পুজোর দায়িত্ব। সেই বাড়ির কোনো পুরুষই একমাত্র অধিকারী গ্রামদেবতার পুজো করার। এতদিন পর্যন্ত তারা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে এসেছে সেই দায়িত্ব। এবারেই প্রথম তারা বেঁকে বসেছে। বলছে পুজো করবে না।
‘কেন?’

উত্তরে সনাতন চুপ করেই থাকে। আরু আবার তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘পুজো করবে না কেন?’
‘সে অনেক ব্যাপার আছে।’
‘কী ব্যাপার খুলে বল না।’
‘অনেক তাদের দাবি-দাওয়া আছে।’

কী তাদের দাবি-দাওয়া, সনাতন ভেঙে বলে না। তবে এই নিয়ে গ্রামের লোকেও ক্ষেপে আছে ওদের ওপর। কিন্তু দেবতার ভয়েই চুপ করে আছে সবাই। যদি আবর বড় কোনো অনিষ্ট হয়! তার নজিরও তো গ্রামেই আছে। ওদের নিষেধ অগ্রাহ্য করে একটা গাছ কেটেছিল হাড়িরাম। সেই গাছ মাটিতেই পড়ল আর ঘরে তার ছেলেকে সাপে কাটল। ভরসা তখন আবার ওরাই। সেই পাঁচু পুরোহিত। অব্যর্থ ঝাড়ফুঁক। হাড়িরাম গাছ ফেলে ছেলেকে নিয়ে ছুটল পাঁচু পুরোহিতের কাছে। পাঁচু বলর, ‘দেবতার মার। আমার হাতে কিছু নেই।’

হাড়িরাম তার হাতে পায়ে ধরে। পাঁচু বলে, ‘গাছটাকে আবার বাঁচিয়ে তোল। বেঁচে উঠবে তোর ছেলেও।’

প্রাচীন সেই অর্জুন গাছ তখন পুরোপুরি ধরাশায়ী। তাকে বাঁচিয়ে তোলার কথা কল্পনাই করা যায় না।

অসহায় বাপ হাড়িরাম। আর তোর বউ, সন্তানশোকে পাগল মা। গোটা গ্রাম সেদিন বোবা হয়ে দেখেছিল আশ্চর্য এক লড়াই। ধরাশায়ী অর্জুন গাছকে বাঁচিয়ে তোলার অবুঝ এক প্রয়াস। গ্রামের লোকের হাতে-পায়ে ধরে তারা সাহায্য চেয়েছিল। কী সাহায্য সে তারাও জানে না। গ্রামের লোকেও জানে না। বোবা হয়ে পড়েছিল গোটা গ্রাম। বিকট অস্বস্তি নিয়ে শুধু দেখেছিল শোকে পাগল বাপ-মাকে। কেমন করে দু’জনে মিলে গোবর-মাটি লেপেছিল অর্জুন গাছের কাটা ক্ষতে। বালতি বালতি জল ঢেলেছিল কাটা গাছের ঘায়ে। মাটি আর জল…. জল আর মাটি… মাটি আর জল..। যতক্ষণ না নিথর হয়ে পড়ে তাদের সন্তান। গ্রামের পরে ডুবে যায় সূর্য।


আল্লায় কী করবে। ওদিকে তো ওদের গ্রামদেবতা। আল্লাহ কি গিয়ে লড়াই করবে ওদের দেবতার সঙ্গে।


গ্রামের লোক সেই ভয়ে জোরাজুরিও করতে পারে না পুরোহিত পরিবারের ওপর। মানতেও পারে না তাদের দাবি। ওদিকে চাষের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে একদিন একদিন করে। চারপাশের সমস্ত খেতে লাঙ্গল দেওয়া চলছে। চারা ধান অঙ্কুরিত হচ্ছে নানা দিকে। শুধু নারায়ণপুরের জমি এখনও পড়ে আছে অক্ষত। এখনও তাকে রজস্বলা করে তুলতে পারে নি তারা।

কার দোষে? কার দোষে সে প্রশ্ন করছে সবাই। উত্তর নেই কারো কাছে। আসলে উত্তর আছে দুটো। দোষ গ্রামদেবতার। অথবা তার পুরোহিতের। দেবতার যদি দোষ না থাকত তাহলে পুজো অন্য কেউ করলে নেবে না কেন? নেবে না যে সে কথা দেবতা বলে নি যদিও। লোকে ধরেই নিয়েছে নেবে না। তাই সাহস করে কেউ আর এগিয়েও আসে না। এলেও বাকি গ্রাম কি তাকে মানবে! তাহলে দোষটা আখেরে কার? দেবতার দোষ ধরতে নেই। দোষ ঐ পাঁচুর বংশেরই।

সনাতন আরুকে বলতে পারে না যে পাঁচুর সব চেয়ে বড় দাবিটাই হলো তার জমি। আরুর ছিটমহল জমিটার তিন পাশে পাঁচুর জমি। ঐটুকুর জন্য একটা খিঁচ রয়ে গেছে পাঁচুর মনে। বংশানুক্রমে তার বাপদাদাতেও আফসোস করে গেছে ওই নিয়ে। তাই পাঁচুর দাবি, আরুর জমি তার নামে লিখিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে গিয়ে সে করবে গ্রামদেবতার পুজো।

তার বাকি দাবিগুলো না হয় গ্রামের লোকে এক হয়ে মিটিয়ে দিতেও পারে। প্রত্যেকে নতুন ফসলের খানিকটা দক্ষিণা হিশাবে দিয়ে আসে ওদের বরাবর। সেই দক্ষিণা না হয় বাড়িয়ে দেওয়া যাবে খানিকটা। তাদের ঘরের পিছন দিয়ে গ্রামের যে রাস্তা, সেই রাস্তাও না হয় গ্রামের লোকে চাঁদা তুলে ওদেরই কাছ থেকে কিনে নিয়ে বারোয়ারি রাস্তা করে নেবে। এছাড়া গ্রামের সরকারি জমির গাছ মাছ জল মাটি নিয়ে ওদের দাবি অন্যায্য হলেও মেনে নেবে। কিন্তু আরুর জমি কী করে লিখিয়ে দেবে ওদের নামে।

কথাটা সনাতন আরুকে না বললেও আরুর কানে ঠিক চলে যায়। আর শুনে থেকে তার শান্তি স্বস্তি সব গেছে। দুশ্চিন্তায় তার ঘুম খাওয়া পর্যন্ত ছুটে যাওয়ার জোগাড়। এত বড় অনর্থের মূলে কি না সে আর তার জমি! ভাবতেই অপরাধী মনে হয় নিজেকে। যেন দোষটা আসলে তারই। যদিও সে জানে তার কোনো হাত নেই এসবের ওপর। তবুও…।

আরুর দিদি থাকে গ্রামেই। সে বিব্রত হয় তার ভাইটার হাল দেখে। সে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে বলে, ‘আল্লাহর উপর ভরসা রাখো…।’

আরু খেপে উঠে বলে, ‘আরে আল্লায় কী করবে। ওদিকে তো ওদের গ্রামদেবতা। আল্লাহ কি গিয়ে লড়াই করবে ওদের দেবতার সঙ্গে।’

ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সেই উপর মহলের লড়াইয়ের দিকেই এগোয়। আল্লাহ আর দেবতা। কারণ নারায়ণপুরের বেশির ভাগ লোকেই চায় আরুর জমি পাঁচুর নামে করে দেওয়া হোক। কিন্তু হোসেনডির লোক বলে, ‘কোটি টাকা দিলেও ও জমি আরু ছাড়বে না।’ আরু কিছু বলে না। পাঁচুও নীরবে অপেক্ষা করে।

শেষে ঘন ঘন মিটিং হতে থাকে। সমাধানসূত্রের খোঁজে। দুই গ্রামেই। প্রথমে আলাদা আলাদা করে। তারপর দিন ঠিক হয় এক যৌথ মিটিংয়ের। দুই গ্রামের সীমান্তে। আরু মিঞার জমিতেই। যদিও মিটিংয়ের দিন দেখা যায় পাঁচুর জমিও চলে এসেছে যৌথ ভিড়ের পরিসরের আওতায়। রিলিফের ত্রিপল আরুর জমিতে পাতা হলেও, ভিড় জমেছে সীমানা উপচে।

দুই গ্রামের মোড়ল মুরুব্বিরা মুখোমুখি বসেছে কালো ত্রিপলের ওপর। পায়ে পায়ে ধুলোর এলোমেলো ছবি ফুটেছে ত্রিপলে। যেন মাথার ওপর আকাশটারই প্রতিচ্ছবি। কালো আকাশে ধুলোটে ছোপের মতো মেঘ। চাষার চোখে আশা জাগানিয়া। কিন্তু চাষারা সব এখন শান্তিসভার মেম্বার। তাই কালো মেঘের ভেতর তারা হয়রানি দেখে মুখ তুলে। তাড়া দিয়ে সমস্বরে বলে, ‘শুরু কর শুরু কর! বৃষ্টি আসছে।’

যেন কোনো বিপদ আসছে। কোনো ঝুট-ঝামেলা। অবাঞ্চিত কোনো পেরেসানি। না এলেই যা ছিল ভালো। তাই তাড়া দেয় দুদিকের জনগণ।

‘বন্ধুগণ, আপনারা জানেন…।’

পরিস্থিতি সবিস্তারে ব্যাখ্যা করতে থাকে নারায়ণপুরের পঞ্চায়েত সদস্য নিবারণ। আসলে যা সবারই জানা। মাঝ পথে কেউ তাকে থামিয়ে বলে,

‘আসল কথায় আসো। আরুর জমি দিবে কি নাই দিবে?’

ও পাশ থেকে সমবেত কণ্ঠে হুঙ্কার ওঠে, ‘নাই দিব… নাই দিব… নাই দিব…।’

মোড়ল-মুরুব্বিরা এমন আচমকা হুঙ্কারে খানিক হকচকিয়েই যায়। কিন্তু তারা সামলে উঠার আগেই নারায়ণপুরের জনতা ফেটে পড়ে জেদি হুঙ্কারে, ‘লিঞ ছাইড়ব… লিবই লিব… লিব লিব…।’

মুরুব্বিরা ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। আকাশে দু’হাত তুলে ঘুরে দাঁড়ায় যে যার গ্রামের জনতার দিকে। মুখে আওড়ায় আন্তর্জাতিক মন্ত্র—‘শান্তি… শান্তি… শান্তি…।’

শান্তি আসে। হুঙ্কার থেমে যায়। মুরুব্বিরা আবার গুছিয়ে বসে মুখোমুখি। শুরু হয় আলোচনা। পরবর্তী বক্তা হুসেনডির পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা শুরু করেন তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে।

কিন্তু দু’দিকের জনতা পুরো চুপ থাকে না। সমবেত হুঙ্কার না ছাড়লেও টুকরো মন্তব্য ছুড়তেই থাকে একে অপরের দিকে। দুষ্টুমির কাগজের ডেলা বা কুঠো-কাঠির মতো। মন্তব্যের উৎসবমুখ দেখা না গেলেও মাথার ওপর দিয়ে ছিটকে উড়ে এলে লাগে কানে। গায়েও। আর সেই সব মন্তব্যের ওড়াউড়ি চলতেই থাকে। দুদিক থেকেই সমান তালে। ক্রমশ বাড়তে থাকে তাদের সংখ্যা। বাড়তে থাকে তাদের ছিটকে ওঠার গাড়ি। এমনকি তারা বাড়তে থাকে দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে।

এক সময় এতই মাত্রাধিক্য হয়ে যায় তাদের সঞ্চরণ যে মনে হয় মাথার ওপর এক ঝাঁক পতঙ্গ ওড়াউড়ি করছে। অপকারী বিষপতঙ্গ। মানুষতে উত্ত্যক্ত করাই যেন তাদের কাজ।

ক্রমশ যেন আরও বেপেরোয়া হয়ে ওঠে পতঙ্গগুলো। কোনো ওঠা-বা অতিমাত্রায় আগ্রহী। সক্রিয়। তীব্র বেগে ছিটকে যায় আকাশের দিকে। তার দেখাদেখি অন্যরাও ধেয়ে যায় আকাশের দিকে। এক সময় কেউ কেউ পৌঁছেও যায় মেঘ পর্যন্ত। আর খুঁচিয়ে দিয়ে আসে আশঙ্কার কালো মেঘ। বারবার প্ররোচিত করতে থাকে এমনিতেই নিচু হয়ে আসা মেঘটাকে।


ত্রিপলের ওপর মানুষের গলে পড়া মাংস আর ঝরে পড়া রক্তের অংশ। অবশিষ্ট অংশ বাঁচিয়ে বাকিরা পালিয়েছে যে যার ঘরে।


অবস্থা বেগতিক দেখে আবার উঠে দাঁড়ায় দুই গ্রামের মুরুব্বিরা। আকাশে দু’হাত তুলে ঘুরে দাঁড়ায় যে যার দলের দিকে। গলা তুলে আওড়ায় আন্তর্জাতিক মন্ত্র—শান্তি… শান্তি..। কিন্তু এবার তারা মন্ত্র শেষ করতেই পারে না। তার আগেই বোধহয় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় কালো মেঘের। তাই শেষ রক্ষা আর হয় না। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ফেটে পড়ে মেঘ। সহস্র শাখাযুক্ত ইস্পাতি অস্ত্রের মতো ভিড়ের দিকে ধেয়ে আসে আঘাত। নিমেষে বিস্রস্ত হয়ে পড়ে জনতা। আকাশ আর মাটির মাঝে আটকে পড়া মানুষগুলো ছুটোছুটি করে দিক্‌ভ্রান্তের মতো। কিন্তু খোলা মাঠের ভেতর কোথাও পায় না আত্মরক্ষার অবলম্বন। আকাশ থেকে নেমে আসা আঘাতের সামনে উন্মুক্ত থাকে তাদের মাথা, তাদের বুক পিঠ। নশ্বর মানবশরীর। একের পর এক আঘাতে ধরাশায়ী হতে থাকে গোটা মানুষ। যত পতন হয় মানুষের ততই যেন ধ্বংসের নেশা ধরে যায় আকাশের। ততই তীব্রতর হয় তার হুঙ্কার। তার ইস্পাতি ঝলকের প্রহরী। সেই বিষপতঙ্গেরা বুঝিবা বাঁকে বাঁকে উগরে দেয় তাদের তরল বিষ। সেই বিষ অঝোর ধারায় ঝরে পড়ে মানুষগুলোর ওপর। আর তাদের শরীর থেকে টেনে বার করে আনে তাজা রুক্ত। ধুলো কাদার সাথে মানুষের রক্ত জমে ওঠে রিলিফের কালো ত্রিপলের ওপর। বিষের বর্ষণ আরও প্রবল হয় ক্রমে। তার ঘনত্বে ঝাপসা হয়ে আসে চারিদিক। আর সেই ঝাপসার ভেতর দেখা যায় গলে গলে পড়ছে মানুষের দেহ। রক্ত মাংস মিশে যাচ্ছে মাটিতে। প্রেত-ছায়ার মতো অবয়বেরা শুধু ছুটে পালাচ্ছে প্রাণপণে। যেদিকে চোখ যায়, পথ খোলা পায়, সেদিকেই দৌড় দেয় অবয়বগুলো।

এক সময় আর কাউকে দেখা যায় না ত্রিসীমানায়। নির্জনে পড়ে থাকে আরুর জমি। তার জমি ঘিরে পাঁচুর জমি। তারই মাঝে রিলিফের কালো ত্রিপল। ত্রিপলের ওপর মানুষের গলে পড়া মাংস আর ঝরে পড়া রক্তের অংশ। অবশিষ্ট অংশ বাঁচিয়ে বাকিরা পালিয়েছে যে যার ঘরে। পালাতে পারে নি তিনজন। তাদের একশো শতাংশ মাংস রক্ত স্তূপ করে পড়ে আছে ত্রিপলের ওপর। আকাশ থেকে তখনও বিষের বর্ষণ চলছে তাদের দেহ ঘিরে। থেকে থেকে নেমে আসছে ইস্পাতি আঘাত। কিন্তু তাদের কোনো সাড়া নেই। তারা পড়ে আছে নির্বিকার, আরু আর পাঁচুর জমির মিলিত কাদা মাটির ওপর।

তারপর কখন যে সেই কালো মেঘ নামতে নামতে ছুঁয়ে দিল মাটি আর হয়ে গেল থমথমে রাত, লোকে বুঝতেও পারল না। ধানের মাঠের দুপাশে দুটো গ্রাম পড়ে রইল অন্ধকারে গা ঢেকে। নিঃশব্দে।

তবু সকাল হলো সকালের নিয়মেই। কালো মেঘ সরে গিয়ে আকাশ ছেয়ে গেল নীল আলোয়। মাঠের পারে নরম রোদ। রিলিফের কালো ত্রিপল আধ শুকনো। আর তার ওপর তিনটে মৃতদেহ। দুটো আল্লাহর। একট দেবতার। দেবতার মৃতদেহের ওপর প্লাস্টিকে মোড়া কিছু কাগজ।

পুলিশ আসে মাঠে। দেহগুলো তোলার আগে বার করে কাগজগুলো। জমির দলিল। আর একটা চিঠি। তাতে লেখা, ‘আমার এক বিঘা জমি দান করে গেলাম নারায়ণপুরের গ্রামদেবতাকে। বদলে দখল নিলাম গোটা দুনিয়ার।’

—আরাবুল হাসান

বিমল লামা

জন্ম ৪ জুলাই, ১৯৬৮; পুরুলিয়া, কলকাতা, ভারত।

ই-মেইল : bimallama82@gmail.com

Latest posts by বিমল লামা (see all)