হোম গদ্য গল্প দুই বন্ধু

দুই বন্ধু

দুই বন্ধু
1.22K
0

দুই বন্ধুর একজন রবিউল হুসাইন, অন্যজন আব্দুর রহমান। একই গ্রামে, নুরপুরে, কাছাকাছি তাদের বাড়ি। সেই ছেলেবেলায় নদীতে ন্যাংটো হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার বয়স থেকে একসাথে বেড়ে ওঠা তাদের। তখন থেকেই বন্ধুত্ব। দুজনের পরিবারই ধার্মিক তাই ফাইভ পাশ করার পর দুজনকে ভর্তি করে দেয়া হয় স্থানীয় জেলার নামকরা কওমি মাদরাসা মদিনাতুল উলুমে। তখন আর কতটুকুনই বা বয়স! দশ-এগারো। বাড়ির নরম বিছানা ছেড়ে, মায়ের হাতের সুস্বাদু রান্না ছেড়ে, সকাল-সন্ধ্যার বিরামহীন খেলাধুলা ছেড়ে কারই-বা যেতে ইচ্ছে করে নিয়ম-কানুনে ঠাঁসা জেলখানার মতো আটকা-জীবন কওমি মাদরাসায়। তবু রাজি হয়েছিল ওরা। আব্দুর রহমানের সাথে থাকতে পারবে বলে রাজি হয়েছিল রবিউল আর রবিউলের সাথে থাকতে পারবে বলে আপত্তি করে নি আব্দুর রহমান। হাবিব দর্জিকে দিয়ে নতুন পাঞ্জাবি-পায়জামা বানিয়ে টোল-টুপলা পিঠে ঝুলিয়ে এক সকালে তারা বাবাদের সাথে রওনা হয় মাদরাসায়। বিশ মাইলের পথ অথচ মনে হয় পুলসিরাতের মতো দীর্ঘ আর গা-ছমছমানো এক ক্লান্তিকর ভ্রমণ। প্রথম দুটো সপ্তাহ খুব খারাপ কেটেছিল মারাসায়। বাড়িতে সূর্য পুরোপুরি তাপ ছড়িয়ে দিলেও মায়েরা তাদের ঘুম ভাঙাতে পারত না। অথচ মারাসায় ফজরের আজানের আগেই ঘুম থেকে উঠে ওযু-এস্তেঞ্জা সেরে পড়তে বসতে হয়। ঘুমানোর জন্য খাট কিংবা চৌকি নেই। মেঝেতে অল্প একটু জায়গা বরাদ্দ বিছানা পাতার জন্য। খাওয়ার কষ্ট তো আছেই। মাপা চালের ভাত। লাবড়া তরকারির ভেতর কী কী সবজি থাকে বলা দুষ্কর। ঝাল যদি বেশি হয় তো লবণ হয় না। লবণ যদি হয় ঠিকঠাক তো হলুদের গন্ধ বের হয়। বোর্ডিং-এর সামনে দীর্ঘ এক লাইন রচনা করে তিনবেলার ভাত উঠাতে হয়। সেই লাইনের ভেতরেও চলে দুর্নীতি। খাতিরের মানুষকে পেছন থেকে আগে ঢুকিয়ে দেয় কেউ কেউ। এরচে’ না খেয়ে থাকাই বরং সহজ। কয়েক শ ছাত্রের জন্য কয়েকটা মাত্র টয়লেট। সেই টয়লেট সব সময়ই কর্মব্যস্ত। সেখানেও লাইন। এক নাম্বার এস্তেঞ্জা না-হয় এক মিনিটে সারা হয়ে যায়। কিন্তু দুই নাম্বার? সেখানে দুই মিনিটের বেশি থাকার উপায় নেই। বাইরে থেকে সিগন্যাল আসে—ঠক ঠক। তার মতো আরো অনেকে তলপেটের চাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিরিয়ালে। প্রথম প্রথম দুই বন্ধুর মনে হতো পালিয়ে যাবে। এই কয়েদী জীবন কতদিনই-বা বয়ে নেয়া যায়! কিন্তু মানুষ পারে না এমন কিছু নেই। সময় গড়াতে  থাকলে সবকিছুই সহজ আর স্বাভাবিক হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। তখন এই চিনতে না পারা তরকারি, পায়খানার জন্য সিরিয়াল কিংবা রাত থাকতেই ঘুম থেকে জেগে উঠার ভেতর অন্য রকম আনন্দ তারা উপভোগ করতে থাকে। হয়তো অভ্যাস।

মাদরাসায় একবছর যেতে না যেতে উস্তাদদের নসিহত শুনে শুনে বন্ধুত্বের পাশাপাশি জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আর আদর্শটাও বড় হয়ে ওঠে তাদের। তারা বুঝতে পারে আর সব মানুষের মতো নয় তাদের জীবন। একটা মহান দায়িত্বের জন্য আল্লাহ তায়ালা তাদের মনোনীন করেছেন। নবিগণের ওয়ারিশ। নবিজি বলেছেন, আল উলামা-উ-ওরাসাতুল আম্বিয়া। আলেমগণ নবিদের ওয়ারিশ। নবিদের যে কাজ ছিল, বড় হয়ে, পড়াশোনা শেষ করে সেই একই কাজ তাদেরও করে যেতে হবে আমরণ। এ বড় সৌভাগ্য। ঝুঁকিপূর্ণও।


মদিনাতুল উলুমে থাকতে দুজনের মাথায় ছিল জালি টুপি। ঢাকায় এসে দুজনের টুপিতে পরির্বতন এসেছে।


মদিনাতুল উলুম মাদরাসায় কাফিয়া জামাত শেষ হলে তারা ঢাকার বড় কোনো মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। উপরের জামাতের বড় ভাইদের সাথে আলাপ-সালাপ করে তারা উপলব্ধি করে, এলেমের মারকায এখন ঢাকা। মফস্বলে পড়ে থেকে এলেমের স্বাদ পুরোপুরি লাভ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া যুগ বদলেছে। একজন মানুষের চলার পথে শুধু কিতাবের জ্ঞানই যথেষ্ট নয় এখন। বদলে যাওয়া সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে কিতাবের এলেমের বাইরে আরো অনেক জ্ঞানের প্রয়োজন। আর সেটা অর্জনের জন্য ঢাকায় বসবাসের বিকল্প নেই। রবিউল হুসাইন আর আব্দুর রহমান তাই ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করে ফেলে। অবশ্যই সেটা গোপনে। কারণ উস্তাদগণ জানতে পারলে আটকে দেবে। তারা জেহেনি (মেধাবী) ছাত্র। পড়াশোনার মাঝপথে তাদের ছাড়তে চাইবে না মদিনাতুল উলুম মাদরাসা। কিন্তু যতই গোপনে তারা চলে যাওয়ার শলাপরামর্শ করুক, কথায় বলে, দেয়ালেরও কান আছে। দেয়ালের সেই কানের সহযোগিতায় মাদরাসার নাজিমে তালিমাত অর্থাৎ শিক্ষা সচিবের কানে পৌঁছে যায় সংবাদ। তিনি নিজ কামরায় ডেকে পাঠান প্রিয় দুই ছাত্রকে। দুই বন্ধু অস্বীকার করতে পারে না ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনার খবর। নাজিমে তালিমাত সাহেব কতক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর এক মাদরাসায় পূর্ণ শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার ফায়দা দলিল প্রমাণ দিয়ে তিনি বোঝাতে থাকেন প্রিয় দুই ছাত্রকে। কিন্তু ছাত্রদ্বয় বুঝেও বোঝে না। তাদের মাথায় ঢাকার ভূত। তখন নাজিমে তালিমাত সাহেব দ্বিতীয় ঘুঁটি চালেন। এই দুই ছাত্রের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করেন। এমনকি দুপুরে উস্তাদদের জন্য যে স্পেশাল তরকারি পাকানো হয়, মুফতে সেই স্পেশাল তরকারি অফার করেন দুজনকে। আর খানা তো আগে থেকেই ফ্রি। তবু কাজ হয় না। তখন অধৈর্য নাজিমে তালিমাত সাহেব যা বলেন, তা বদদোয়ার পর্যায়ে পড়ে যায়। আর একারণেই আমরা তা উচ্চারণ করতে চাই না। যখন জেলা শহর ছেড়ে ঢাকা যাওয়ার নিয়ত পাকা করে ফেলে নুরপুরের দুই বন্ধু তখন নুরপুরের এক বৃদ্ধও ভিন্ন ধারার এক নিয়ত পোক্ত করে ফেলেন। এই বৃদ্ধ নুরপুরের সাবেক চেয়ারম্যান। পরপর দুইবার নির্বাচিত হওয়া চেয়ারম্যান জনাব আতিয়ার ইসলাম। ক্ষমতায় থাকাকালীন প্রচুর ধন-সম্পদ করেছেন। তখন যৌবন ছিল। রক্ত গরম ছিল। টাকার জন্য সুপথ-কুপথের তোয়াক্কা করেন নি। শোনা যায়, তবে নিশ্চিত না, নির্বাচনে জয়ী হতে একবার নাকি জনপ্রিয় এক প্রতিপক্ষকে খুন পর্যন্ত করেছেন। সেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী চেয়ারম্যান এখন শুধু সাবেক চেয়ারম্যানই নন, সাবেক যৌবনও। এতদিন দুনিয়া করেছেন। এখন, এই বৃদ্ধ বয়সে আখেরাতের জন্য কিছু করতে ভেতর থেকে বারবার তাড়া আসছে। আখেরাতের পুঁজি সঞ্চয়ের জন্য তিনি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে চান। জমিজিরাত, টাকা-পয়সার কোনো অভাব তার নেই। বাড়ির দক্ষিণ পাশে দুই বিঘা জমি খালি খালি পড়ে আছে। এই জমিটুকু মাদরাসর জন্য ওয়াকফ করার ইচ্ছা। সেই সাথে মৃত্যুর পর মাদরাসার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার বাসনা। যেন কবরে বসে ছেলেদের কোরআন তেলাওয়াত শুনতে পারেন। ঢাকায় যাওয়ার আগে কিছুদিন বাবা-মার কাছে সময় দেয় আব্দুর রহমান আর রবিউল ইসলাম। তখন চেয়ারম্যান সাহেব এই দুই তালবে এলেমের কাছে নিজের শেষ জীবনের ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেন। শুনে দুজনই খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। রবিউল জোশে নবিজির একটা হাদিসই শুনিয়ে দেয়যখন কোনো ব্যক্তি ইন্তেকাল করে তখন তার সমুদয় আমল বন্ধ হয়ে যায়। শুধুমাত্র তিনটা আমল ব্যতীত। তার মধ্যে একটা হলো সদকায়ে জারিয়া। চাচা, আপনি যা করতে চাচ্ছেন তা খুবই ফায়দাজনক এবং এটা সদকায়ে জারিয়া। আপনার মাদরাসায় পড়ে যত মানুষ এলেম শিখবে, সেই মোতাবেক আমল করবে, সবার ভালো কাজের সোয়াব আপনি কবরে বসে পাবেন। এরচে’ লাভজনক তিজারত আর হয় না।

চেয়ারম্যান এবার দ্বিতীয় প্রস্তাব পাড়েনমাদারাসা তিনি করবেন, তবে পরিচালনার যাবতীয় দায়িত্ব নিতে হবে আব্দুর রহমান আর রবিউলকে। দুই বন্ধু আপত্তি জানায়তা কী করে হয়! এখনো আমরা ছাত্র। দাওরা হাদিস শেষ করতে কমছে কম এখনো চার বছর লাগবে।

চেয়ারম্যান সাহেব বলেন, তোমরা আমার ছেলের মতো। এই কাজ অন্য কারো হাতে দেবো না। আমার নিয়ত পাক্কা নিয়ত। তোমরা পড়া শেষ করে ফিরে আসো, আমি অপেক্ষা করব। দুই বন্ধু বড় খুশি হয়ে ওঠে এবার। লেখাপড়ার পাঠ চুকার আগেই যদি খেদমতের (চাকরি) ব্যবস্থা হয়ে যায়, এরচে’ নির্ভরতা আর আছে কিসে! দুই বন্ধু সেই ফূর্তি নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমায়। ভর্তির জন্য দুজনেরই প্রথম পছন্দ জামেয়া হোছাইনিয়া মাদরাসা। এটা তখনকার কথা, যখন ছেলেরা মফস্বলের মাদরাসাগুলোকে শূন্য করে ছুটে যাচ্ছে ঢাকায়। কেন যে যাচ্ছে, বেশিরভাগ ছেলেই তা জানে না। অনেকটা ঘোরের বশে আর কিছুটা গুজবের পাল্লায় পড়ে রাজধানীর দিকে তাদের যাত্রা। এই যে মফস্বল থেকে ছুটে আসা তালবে এলেমদের দীর্ঘ মিছিল, স্বভাবতই ভীড় বাড়তে থাকে ঢাকার মাদরাসাগুলোয়। বিশেষ করে যেখানে থাকা-খাওয়া আর পড়ার মান ভালো, সেখানে ঈদের আগের রাতের কসমেটিকসের দোকানের মতো ভীড়। জামেয়া হোছাইনিয়া তেমনই এক উপচে পড়া দোকান। সেখানে সব আবেদনকারীকে ভর্তি করে নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ, আসন সীমিত। লিখিত এবং মৌখিকদুই ধরনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণদেরই কেবল সুযোগ দেয়া হয় ভর্তির। রবিউলের কপাল ভালো, সে উভয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যায়। আর আব্দুর রহমান, সে লিখিত পরীক্ষায় পাশ করলেও ধরা খায় মৌখিকে। তাকে জামেয়া হোছাইনিয়ার জন্য অনুপোযুক্ত ঘোষণা করা হয়। অকৃতকার্য আব্দুর রহমানকে তাই ভর্তি হতে হয় দ্বিতীয় পছন্দ জামেয়া কারিমিয়া মাদরাসায়। ঢাকায় এসেই দুই বন্ধু জীবনে প্রথমবারের মতো বিচ্ছিন্নতার কবলে পড়ে। তবে এতদিনে তাদের বয়স বেড়েছে, তরল আবেগ ঘন হয়েছে, জীবনের মহৎ একটা লক্ষ্যও সামনে এসেছে। তাই সাময়িকের এই বিচ্ছিন্নতা তাদের কাবু করতে পারে না। তারা ওয়াদা করে, সপ্তাহের একদিন, ছুটির দিন শুক্রবারে তারা পরস্পরের সাথে দেখা করবে। আর মোবইলের যোগাযোগ তো থাকবেই। যদিও দুজনের মাদরাসাতেই মোবাইল নিষিদ্ধ। এভাবে চারটা বছর গেলেই চেয়ারম্যান সাহেবের প্রস্তাবিত মাদারাসার দায়িত্ব নিয়ে আবার তারা এক হয়ে যাবে। গোটা একটা জীবনের বিপরীতে চারটে বছর আর কয়দিন!

প্রতি শুক্রবারই দুই বন্ধুর দেখা হয়। এক শুক্রবার আব্দুর রহমান যায় রবিউলের হোছাইনিয়া মাদরাসায়। আরেক শুক্রবার রবিউল আসে আব্দুর রহমানের কারিমিয়া মাদরাসায়। মদিনাতুল উলুমে থাকতে দুজনের মাথায় ছিল জালি টুপি। ঢাকায় এসে দুজনের টুপিতে পরির্বতন এসেছে। রবিউলের মাথায় উঠেছে কিস্তি টুপি আর আব্দুর রহমানের পাঁচকুল্লি। আব্দুর রহমান যখন রবিউলের কাছে যায়, হোছাইনিয়া মাদরাসায়, দেখে, সেখানে সবার মাথায় কিস্তি টুপি। তাদের মাঝে একলা আব্দুর রহমান পাঁচকুল্লিওয়ালা। অধিকাংশ ছেলে কেমন তাচ্ছিল্যের চোখে তাকায় আব্দুর রহমানের মাথার দিকে, তাজমহলের গম্বুজের মতো তার পাঁচকুল্লি টুপির দিকে। অস্বস্তির কাঁটা বিচ্ছুর হুল হয়ে ফোটে তার সারা গায়। একদিন না পেরে বন্ধুর কাছে সে অভিযোগ করে বসেতোদের মাদরাসার ছেলেরা এমন ক্যান রে! তারা যেভাবে আমার টুপির দিকে তাকায়, যেন এটা টুপি নয়, আবু জহেলের মুখোশ।


জামেয়া হোছাইনিয়ায় পড়া রবিউল জমিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় হতে থাকে আর আব্দুর রহমান বড় হয় চরমোনাইর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। ফলে দুজনের চেতনার ধারা প্রবাহিত হয় ভিন্ন ভিন্ন দুটি খাতে।


রবিউল সঙ্গে সঙ্গে লুফে নেয় কথাটা। বলে, হ্যাঁ, কথা তো সেটাই! আমিও যখন কিস্তি টুপি পরে তোদের মাদরাসায় যাই, তোদের পাঁচকুল্লি ভাইরা এমন করে তাকায় যেন জীবনে এই জিনিস দেখে নি। অথচ আকাবেরে দেওবন্দের অনেকে এই কিস্তি টুপি পরেছেন। এই টুপির সাথে দেওবন্দের ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে।

তোর কি ধারণা শুধু কিস্তি টুপি পরলেই আকাবেরে দেওবন্দের অনুসরণ করা হয়?

অন্তত একটা ক্ষেত্রে তো হয়। শোন আব্দুর রহমান, তোর যদি খারাপ লাগে তবে পাঁচকুল্লি খুলে কিস্তি টুপি পরে আসবি আমাদের মাদরাসায়।

তুই-ও যখন আমাদের মাদরাসায় আসবি, কিস্তি টুপি খুলে পাঁচকুল্লি পরে আসবি। তাহলে কেউ তোকে ঘাঁটবে না।

দুই বন্ধুর মনোমালিন্যের সূত্রপাত্র টুপি দিয়ে। ক্রমে তা বাড়তেই থাকে। এই মনোমালিন্যের পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখে দুজনের দুই দৃষ্টিভঙ্গির মাদারাসা। রবিউলের হোছাইনিয়া মাদরাসা জমিয়তের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। এর ছাত্ররাও তাই। হোছাইন আহমদ মাদানির নাম থেকে গ্রহণ করা হয়েছে মাদরাসার নামজামেয়া হোছাইনিয়া। আব্দুর রহমানের কারিমিয়া মাদরাসা চরমোনাই পীরের রাজনৈতিক আদর্শ দ্বারা পরিচালিত। এর ছাত্ররাও সেই আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত। চরমোনাইর মরহুম পীর ফজলুল করীমের নাম থেকে এসেছে মাদরাসার নামজামেয়া কারিমিয়া। জামেয়া হোছাইনিয়ায় পড়া রবিউল জমিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় হতে থাকে আর আব্দুর রহমান বড় হয় চরমোনাইর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। ফলে দুজনের চেতনার ধারা প্রবাহিত হয় ভিন্ন ভিন্ন দুটি খাতে। এর প্রভাব পড়তে থাকে দুজনের বন্ধুত্বে। এই যে সেদিন রবিউল দেওবন্দের ঐতিহ্যের কথা বলল, বলল তারা খাঁটি দেওবন্দি, তর্কের এই জায়গায় ছাড় দিতে রাজি নয় আব্দুর রহমান। সে বলে, তোরা শুধু মুখে মুখে দেওবন্দি, কাজের বেলায় নেই। যে নারী নেতৃত্ব হারাম, সেই নারীর পেছনে তোরা ঘুরঘুর করিস ক্ষমতার জন্য। সুন্দরী ম্যাডামের পাশে বসে মিটিং করিস, ইফতার পার্টি করিস, ভোটের সময় ম্যাডামের জন্য ভোট চাস। এই তোদের দেওবন্দিয়াত! নারী নেতৃত্ব হারাম বলে তোদের সুবিধাবাদ জিন্দাবাদমার্কা জোটে আমরা শরিক হই নি। আর সেজন্য তোরা আমাদের আম্লীগের দালাল বলিস।

তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হয় রবিউলও। সে বলে, তোরা হলি এক নাম্বার গোলআলু। তোদের পীর দেখতে যেমন গোলআলু, কাজকামেও গোলআলু। তোরা কখন কী করবি নিজেরাই বুঝিস না। নাস্তিকদের আশ্রয়দাতা আম্লীগ নিজেদের স্বার্থে তোদের ব্যবহার করে। টয়লেট পেপারের মতো তোরা ব্যবহার হোস। তোদের আকিদায় অনেক সমস্যা। বেদাতে ভরপুর তোদের আমল। এই যে তোরা দলবেঁধে উচ্চস্বরে জিকির করিস, জিকিরের এশকে লাফালাফি করিস, মাহফিলের সময় বাঁশ বেয়ে ছামিয়ানার উপর উঠে যাস, বল, রসুল স. বা কোনো সাহাবি এমন জিকির করেছে? কেউ করে নি। আর নারী নেতৃত্ব আমরাও হারাম মনে করি। ম্যাডামের সাথে আমরা আছি এটা সাময়িক। এর পেছনে হেকমত আছে। হিযবুশ শয়তানকে ঠেকানোর জন্য আমরা জোটের ঢাল ব্যবহার করছি। মাথামোটা তোরা হেকমতের কী বুঝবি রে!

রবিউলের প্রতিটি কথাই হুল হয়ে ফোটে আব্দুর রহমানের চামড়ায়। সব সে সহ্য করতে পারে, কিন্তু পীর সাহেবকে গোলআলু বলাটা তার সহ্য হয় না। রাগে লাল হয়ে ওঠে তার ফর্সা মুখ। বেশি রাগের কারণেই হয়তো সে কথা বলতে পারে না কিছুক্ষণ। সামান্য বিরতি নিয়ে সে রাগ সামলায়। তারপর ঠান্ডা গলায় বলে, পীর সাহেবকে গোলআলু বললি এতে কিন্তু তোর গিবতের গোনা হলো। গিবত করা নিশ্চয় তোদের আদর্শ নয়।

রবিউল আগের মতোই চেপে ধরে আব্দুর রহমানকেধুরোহ! গিবত পেলি কোথায়! সিয়াসাতের মুনাযারায় গিবত বলে কিছু নাই।

প্রথম প্রথম রবিউলের জন্য খুব কষ্ট হতো আব্দুর রহমানের। জমিয়তের খপ্পরে পড়ে এভাবেই বদলে গেল তার বন্ধু! এই একই অনুভূতি হতো রবিউলেরও। তার বন্ধুটা এভাবেই চরমোনাইয়ের মগজ ধোলাইয়ের শিকার হলো! বেদনাবোধের তাড়না থেকে প্রথম দিকে দুজনেই দুজনকে সংশোধন করার এবং নিজ নিজ দলে টানার চেষ্টা করত। দুজনের সম্পর্কের মাঝে যতদিন সহানুভূতি ছিল, সংশোধনের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। এখন সেই সহানুভূতি আর অবশিষ্ট নেই। বন্ধু নয়, প্রতিপক্ষ ভাবতে এখন তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

একবার শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে জমিয়তে ইসলাম সমাবেশ ডাকে মুক্তাঙ্গনে। সমাবেশ করতে দেয় না পুলিশ। লাঠিচার্য খেয়ে মাদরাসায় ফিরে আসে রবিউলরা। আব্দুর রহমান মনে মনে খুশি হয় এতে। সে ফোন দেয় রবিউলকে। ব্যঙ্গ করে বলে, পুলিশের প্যাদানি ক্যামন লাগল রে রবি! রেগে ফোন কেটে দেয় রবিউল। আরেকবার রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রতিবাদে জনসমাবেশ ডাকে পীর সাহেব চরমোনাই। জমিয়তের মতোই হয় তাদের পরিণতি। অপমানের শোধ নিতে রবিউল ফোন দিয়ে খোঁচা মারে আব্দুর রহমানকে। রাগে রবিউলের নাম্বার ব্লকলিস্টে পুরে দেয় আব্দুর রহমান।


আজান হলে এক মসজিদে নামাজে যায়, মুখোমুখি দেখাও হয়, তবে দরকারি টুকটাক কথার বাইরে অন্যকিছু হয় না।


ঢাকার মাদরাসাগুলোয় বছরে সাধারণত তিনটে পরীক্ষা হয়। প্রথম সাময়িক, দ্বিতীয় সাময়িক এবং বার্ষিক। এবং এই পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হয় কাছাকাছি সময়ে। পরীক্ষার পর এক সপ্তাহ থেকে দশদিনের ছুটি পায় ছাত্ররা। পরীক্ষার ছুটিতে রবিউল আর আব্দুর রহমান গ্রামে বেড়াতে আসে। আগে একসাথে আসত দুজন। এখন আলাদা। একটা সময় দুজন দুজনের বাড়িতে পড়ে থাকত। এখন কেউ কারো বাড়ি যায় না। আজান হলে এক মসজিদে নামাজে যায়, মুখোমুখি দেখাও হয়, তবে দরকারি টুকটাক কথার বাইরে অন্যকিছু হয় না। তাদের মায়েরা অবাক হয়। রবিউলের মা জিজ্ঞেস করে, কিরে, আব্দুর রহমান আসে না ক্যান! রবিউল পাশ কাটায়ব্যস্ত হয়তো। আব্দুর রহমানও মায়ের প্রশ্নে পাশ কাটায়রবিউল হয়তো ব্যস্ত, তাই আসে না। তারপর তারা মোবাইলে ঢাকাইয়া বন্ধুদের সাথে গল্পে মগ্ন হয়।

নুরপুরের আতিয়ার ইসলামের কথা মনে পড়ে? পড়ার তো কথা! সেই সে প্রতাপশালী সাবেক চেয়ারম্যান, যিনি দিনকে দিন বুড়ো হয়ে চলেছেন। পূর্বপাপ ঢাকতে সদকায়ে জারিয়ার ছোয়াবের আশায় একখানা মাদরাসা গড়ার নিয়ত বুকে নিয়ে যিনি দিন গুজরান করছেন নুরপুরের দোতলা বাড়িতে। রবিউল আর আব্দুর রহমান বিভিন্ন ছুটিতে বাড়ি আসে আর বৃদ্ধ ছুটে যান তাদের কাছেবাপ, তোমাদের পড়ালেখা কি শেষ হলো!

চার বছর পর দাওরা হাদিস শেষ করে দুই বন্ধু যখন ফিরে আসে গ্রামে, আনন্দে কেঁদে ফেলেন বৃদ্ধ। এই দিন পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকবেন, ভাবেন নি। সবই উপর ওয়ালার মহিমা। কাজের লোক দিয়ে তিনি দুই বন্ধুকে ডেকে পাঠান বাড়িতে, মাদরাসার ব্যাপারে আলাপ সালাপ সেরে নিতে। কিন্তু দুই বন্ধুকে একসাথে পাওয়া যায় না। একে পাওয়া যায় তো ওকে পাওয়া যায় না। ওকে পাওয়া যায় তো এ গায়েব থাকে। শেষে উপায় না পেয়ে দুজনকে আলাদা আলাদাভাবে ধরেন বৃদ্ধ। প্রথমে সাক্ষাৎ হয় আব্দুর রহমানের সাথে। বৃদ্ধ সাত সাগরের বিস্ময় নিয়ে শোনেন, আব্দুর রহমান বলছে, চাচা, মাদরাসা করবেন খুব ভালো কথা। কিন্তু মাদরাসার দায়িত্ব একা আমাকে দিতে হবে। রবিউলকে যদি রাখেন, আমি থাকতে পারব না। ওর সাথে কাজ করা সম্ভব না। শিক্ষক নিয়ে চিন্তা করবেন না। ঢাকায় আমার অনেক মাওলানা বন্ধু আছে, তাদেরকে ডেকে নেব। অনেক দিনের অপেক্ষা ভেঙে কাঙ্ক্ষিত দিনটি আসার পর আব্দুর রহমানের নেতিবাচক কথা শুনে বৃদ্ধ একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। ছেলেটার কথার কোনো মর্ম তিনি উদ্ধার করতে না পেরে বলেন, রবিউল থাকলে কী সমস্যা? আব্দুর রহমান বলে, আপনি জেনারেল শিক্ষিত মানুষ। এগুলো বুঝবেন না। ওর অনেক সমস্যা আছে। ভেঙে পড়া বৃদ্ধ বিড়বিড় করেনআমি এগুলো বুঝব না! কূলকিনারা না পেয়ে বৃদ্ধ এবার রবিউলের কাছে ছোটেন। রবিউলও একই কথা বলে। ফটোকপিই যেন। আব্দুর রহমান থাকলে সে থাকবে না। আব্দুর রহমানের অনেক সমস্যা। এবার অবলম্বনহীন শিশু-মেহগনি গাছের মতো নুয়ে পড়েন বৃদ্ধ। তার দৃষ্টি ঘোলা হয়ে ওঠে। কতক্ষণ কাঠ হয়ে থেকে কোমর সোজা করে দাঁড়িয়ে দূরাগত গলায় তিনি বলেন, আমি আল্লাহর কাছে জবান দিছি, তোমাদের দুজনের হাত দিয়ে চালু করব আমার মাদরাসা। আল্লাহকে দেয়া জবানের বরখেলাপ আমি করতে পারব না। তোমরা একসাথে যখন থাকবা না, এই মাদরাসা হবে না।

সাব্বির জাদিদ

জন্ম ১৭ আগস্ট, ১৯৯৪; কুষ্টিয়া। কথাসাহিত্যিক।

শিক্ষা : ইসলামিক স্টাডিজ, অনার্স, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

প্রকাশিত গ্রন্থ —
একটি শোক সংবাদ [গল্পগ্রন্থ, ঐতিহ্য, ২০১৭]

ই-মেইল : sabbirjadid52@gmail.com

Latest posts by সাব্বির জাদিদ (see all)