হোম গদ্য গল্প দি লাস্ট প্রিন্সেস

দি লাস্ট প্রিন্সেস

দি লাস্ট প্রিন্সেস
629
0

হায়দ্রাবাদের শীতের রোদে খসসা টেনে একটু আরাম করে বসেন বৃদ্ধা লায়লা উমাহানি বেগম। আশমানগড়ের ঘিঞ্জি বস্তির এই কোনায় ফোকর গলিয়ে চিলতে আলো আসে। সকালের সেই আলোর পথ বেয়ে বুঝিবা আসে কত সব অভিজাত স্মৃতি। কী অপূর্ব কণ্ঠ ছিল তার। নিয়মিত রেওয়াজ করে সেই অর্জন। একটা গজল আজকাল তার খুব মনে পড়ে। বাহাদুর শাহ জাফরের একটি অপ্রকাশিত শের। খিন্ন গলায় উমাহানি ভাঁজেন :

“হোতে হোতে হো গ্যায়া, মানহোস মুঝসে আইনা
পহলে মুঝকো দেখতা থা, অব তো ও রোতা ভি হ্যায় … ”


কিন্তু আত্মসমর্পণ করার শর্ত ভঙ্গ করে হডসন বিনা বিচারে শাহজাদাদের গুলি করে হত্যা করে বাহাদুর শাহকে তাঁদের রক্ত পান করতে বাধ্য করান বলে কথিত আছে।


১৮৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক মোগল মুদ্রার পরিবর্তে ইংল্যান্ডের রাজার প্রতিকৃতি সংবলিত নতুন মুদ্রা চালু করার মধ্য দিয়েই মূলত মোগল সম্রাটের ক্ষমতার শেষ চিহ্নটুকু মুছে গেল। আর এর ঠিক দুবছর পরেই দ্বিতীয় আকবর থেকে রাজ্যহীন রাজত্ব লাভ করেন সিরাজুদ্দীন মুহম্মদ বাহাদুর শাহ জাফর। ইংরেজদের দেওয়া বার্ষিক এক লক্ষ টাকা বৃত্তিভোগী পুতুল সম্রাট তিনি। সিপাহী বিপ্লবের সময় বিদ্রোহীরা দিল্লি দখল করে অশীতিপর জাফরকে স্বাধীন সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু ইংরেজরা দিল্লি দখল করে এবং মেজর হডসন মোগল সম্রাট হুমায়ুনের সমাধি সৌধ থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে; এবং তাঁর পুত্র এবং পৌত্রগণও হডসনের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু আত্মসমর্পণ করার শর্ত ভঙ্গ করে হডসন বিনা বিচারে শাহজাদাদের গুলি করে হত্যা করে বাহাদুর শাহকে তাঁদের রক্ত পান করতে বাধ্য করান বলে কথিত আছে।

বাহাদুর শাহ আজ আর নেই। আছে তাঁর বংশের শেষ প্রদীপ লায়লা উমাহানি বেগম। মোগল বংশের শেষ জীবিত শলতে, যে-বংশ পৃথিবীতে সর্বাধিক সংখ্যক সম্রাটের জন্মদাত্রী। উমাহানির চার ছেলে : জিয়াউদ্দিন, মাসিউদ্দিন, আরিফুদ্দিন, ও সাজিবুদ্দিন। আরিফুদ্দিন এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। বড় জিয়াউদ্দিন কোনো ঝুঁকি নেন নি। টানা ৩৫  বছর সাদামাটা আর নিরাপদ চাকরি করে এখন অবসরে আছেন। সামান্য পেনসন পান কিন্তু আছে এক খানদানি মেজাজ। মাসে অন্তত দুবার কানের লতিকায় লাগানো চাই  দাহ-আল-ঔদ। এর দাম দিতে দম ফুরোয়। তবু চাই। এক ফোঁটার ভগ্নাংশ লাগালে সপ্তাহ জুড়ে টানা বেহেস্তি মৌতাত। প্রপিতামহ মির্জা পেয়ারের শরীর থেকে নাকি চব্বিশ ঘণ্টাই বের হত এর ভুরভুর সৌরভ। দাদু মির্জা পেয়ারের জীবন ছিল প্রচণ্ড বাদশাহি শৌখিন হালের। গান-বাজনা, সাজগোজ ও অন্যান্যের সঙ্গে ছিল রাজাকাত-কা-খানা। এছাড়া মুখে রুচত না। তার ছিল উমদা গন্ধ ও স্বাদ, একবার খেলে ভোলা যায় না। এই রাজাকাত-কা-খানার রেসিপি চর্চাই মাসিউদ্দিনের ধ্যানজ্ঞান। বাজারের মোগলাই খানা তার কাছে নস্যি। প্রকৃত চুঘতাই-ঘরানার স্বাদ ফিরিয়ে আনার জন্য বিস্তর গবেষণা করে চলছেন মাসিউদ্দিন।

মাসি এখন হায়দ্রাবাদের একটি পাঁচতারা হোটেলের খাদ্য বিশারদ। কিন্তু সেখানে পাকাপাকি ভাবে চাকরি করবেন না। বাদশাহি সম্মানে তা বাধে। রান্না তো তাঁর কাছে বংশপরম্পরা এক প্রচণ্ড আবেগ, প্যাশন। অভাবের কাছে একে বিকোনো যায় না। তার চেয়ে না খেয়ে থাকা ভি আচ্ছা। বরং পরামর্শদাতা হওয়া যায়। তাতে টাকা কম পেলেও কিছু যায় আসে না। পেছন থেকে সাহায্য করছেন উমাহানি বেগম, তাঁর গুণী গরিব মা। উমাহানির স্মৃতিও ক্ষুরধার। কিছুই তিনি ভোলেন নি। শুনেছেন পূর্বপুরুষ গ্রেট মোগলদের সত্য আর কল্পনামিশ্রিত কাহিনি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তা তেমনি অম্লান ও চিত্তাকর্ষক, গর্ব ও আনন্দের। খাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিল না আকবর বাদশাহর। রাত তিনটেয় ঘুম থেকে উঠে একশ তিন রকম ডালের সাথে টাটকা ফুলকো লুুচি চাইতেন। এক সের ঘিয়ে একটি লুচি ভাজা হত, তারপর সেই ঘি ফেলে দেওয়া হতো, নোকররাও তা ব্যবহার করতে পারত না। সঙ্গে কোয়েলের মাংস।


চার বছরের বন্দি জীবনে সম্রাটের দাঁত মাজার জন্য এক ধরনের কাঠ কয়লা দেওয়া হতো। সম্রাট তা দিয়ে দেয়ালে দুএক লাইন শায়ের টুকে রাখতেন।


ইংরেজ এক ক্যাপ্টেনের প্রায় পরিত্যক্ত এক-কামরার ঘরে শেষ চার বছর কাটিয়েছেন হিন্দুস্থানের শাহেনশাহ। ঘরে একটা পাটের দড়ির খাটিয়া ছাড়া আর কিছু ছিল না। একখানা চেয়ার, টুল, কুশন বা বসার গদি, না একটা মাদুর পর্যন্ত। তোশকহীন দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে শুয়ে সারা গায়ে দাগ পড়ে গিয়েছিল। উকুনে ভরে গিয়েছিল শাহানশার শরীর। অথচ জেলখানায় রাজবন্দিরাও এর চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত, সেই ইংরেজ আমলেই। চার বছরের বন্দি জীবনে সম্রাটের দাঁত মাজার জন্য এক ধরনের কাঠ কয়লা দেওয়া হতো। সম্রাট তা দিয়ে দেয়ালে দুএক লাইন শায়ের টুকে রাখতেন। অথবা টুকিটাকি কিছু বিষয়। ইংরেজ প্রহরীর চোখে পড়লেই সঙ্গে সঙ্গে তাতে সাদা রঙ পড়ে যেত। স্মৃতি ও শারীরিক যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ সম্রাট শেষ বছরটিতে ঘাড় ঘোরাতে পারতেন না। পক্ষাঘাত হয়ে গিয়েছিল। ঘরের বাইরের জুজুবা বা কুল গাছটি নিয়ে শায়ের লিখেছিলেন। তার ফল তিনি খেতে পান নি। কুলের কাঁটার ঘা সহ্য করেছেন। আহা জুজুবা ফলের বৃক্ষ! সম্রাট বাহাদুর শাহ, লাল ইংরেজদের ভাষায় ‘অ্যা ব্রিটিশ সাবজেক্ট, প্রিজনার অ্যান্ড টিউটুলার কিং অব দিল্লি।’

মাসিউদ্দিনকে দেখলে মনে হবে এখনও তিনি সেই স্বপ্নের রান্নাঘরেই থেকে গিয়েছেন। পোশাকটাই যা বদলে গিয়েছে। চোগা-চাপকানের বদলে টেরিকটের জামা। স্বপ্নের রান্নাঘরের বিশেষজ্ঞ খানসামারা যে শুধু ইরান, আফগানিস্তান, তুর্কি বা বালাগ থেকে আসতেন তা-ই নয়। দামাস্কাস, বাগদাদ, এমনকি আরব থেকেও নিয়ে আসা হতো ওস্তাদ বাবুর্চি। সেখানকার রান্নার ধাঁচের সঙ্গে ভারতের শস্য ও মশলা মিশিয়ে এখানকার আবহাওয়ার উপযুক্ত ডায়েটের ব্যবস্থা প্রথম করেন জাহাঙ্গীর। বন্য পশু-পাখির সঙ্গে মিলে যেতে থাকে চন্দনভস্ম, কেওড়া, গুলাব। সদাব্যস্ত সামরিক বাহিনীর পক্ষে উপাদেয় ও চটজলদি খাদ্যের সন্ধানই জন্ম দেয় সেই সব খাবারের, যা আজ ফাস্ট ফুড নামে লক্ষ লক্ষ রসনাকে তৃপ্ত করছে। সৃষ্টি হয় শুকনো কাবাব, লস্কর-ই-নান, দম-কা-বাইগনের।

এসব তো রয়েছেই। তবে, সেই আমলের সবচেয়ে চমকপ্রদ বস্তুটির নামকুশতা গোলি। চমকপ্রদ, কারণ ওই ‘ম্যাজিক গোলি’ই ছিল মোগলদের সুবিশাল হারেম বজায় রাখার আসল রহস্য।  উমাহানির  ছোট ছেলে সাজিউদ্দিনই সেই ম্যাজিক-গুলির রহস্যটা ভাঙলেন। সৌদি আরব থেকে ফিরে ছোটখাট একটি স্কুল গড়েছেন এই সাজিউদ্দিন। এঁরও অবসর কাটে পুরনো রেসিপির চর্চায়। অবশ্য কুশতা গোলি কখনও চেখে দেখার সুযোগ পান নি সাজি। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়। বিশ থেকে পঁচিশটি বিশেষ জাতের মুরগিকে বিশেষ যত্ন নিয়ে পালন করা হত। অন্যান্য মুরগির সঙ্গেই থাকত তারা। এই বিশেষ মুরগিগুলোকে বাদাম, পেস্তা, আখরোট, চিলকোজা, আখরখোরাসহ ২০ থেকে ২৫ রকমের শস্য দুধের সঙ্গে লেই করে খাওয়ানো হতো। সঙ্গে থাকত নিক্তিতে মাপা স্বর্ণ ও রৌপ্যভস্ম। মুরগিগুলো যখন তিন মাসের হয়ে যেত তখন তাদের একটিকে কেটে সসেজ বানিয়ে বাকিদের খাওয়ানো হতো। এই পদ্ধতিটি চলতে চলতে মুরগির সংখ্যা কমে আসত পাঁচ-দশটিতে। ততদিনে তারা আরও বেড়ে উঠত। সেই ‘তৈরি মুরগিগুলি’কে শেষ পর্যন্ত কেটে তাদের মাংস দিয়ে গোলি বানানো হতো। এই গোলির অনেক গুণ। আশি বছরের বৃদ্ধকে খাওয়ালে তার যৌবন ফিরে আসবে বিশ-বাইশে। হারেম বজায় রাখার জন্য এই গোলি অত্যাবশ্যক ছিল সেই সময়। আর এই রেওয়াজ ধরে রেখেছিলেন মির্জা পেয়ারে অবধি। এই গোলি তৈরির সমস্ত উপকরণের হদিশ রয়েছে জিয়াউদ্দিন টুসির কাছে। কিন্তু, সেই জাত্যভিমান! রাজকীয় ঐতিহ্যের ব্যাপার। এই জিনিসটি আমজনতার জন্য বলে তিনি মনে করেন না। তাই তার শুলুকও দিতে চান না সবাইকে।


ওরা বাবরকে বলে বাবুর। নামেই বাগান, আসলে পাঁচ তলা বাড়ির সমান পেল্লায় এক ব্রোঞ্জের বাবর। বাবর সংগ্রহশালা, পার্ক, বাবরের সমাধি, পাঠাগার—সব মিলিয়ে সে এক বিরাট কাণ্ড।


আসলে চারজন বৈধ ছাড়াও প্রায় চল্লিশ জন খাওয়ায়েশ ছিল বাহাদুর শাহের। এই ‘খাওয়ায়েশ’ ব্যাপারটি বেশ অদ্ভুত। এঁরা নর্তকী, তওয়ায়েফ বা বাইজি নন। এমনকি রক্ষিতাও নন। অবৈধ স্ত্রী বলা চলতে পারে। তাঁদের আলাদা হাভেলি থাকত। তাঁরা মাসোহারা পেতেন। যথেষ্ট সম্মানও। পতিজ্ঞানে সেবা করতেন বাদশাহের। এমনকি তাঁদের স্ত্রীদের সাথেও যথেষ্ট ভালো সম্পর্ক থাকত এই খাওয়ায়েশদের।

লায়লা উমাহানি বেগমই বাবরের শেষতম বংশ। মাসিউদ্দিন, সাজিউদ্দিন কন্যাবংশের। হোক কন্যা বংশের, তারা ভারতে সম্মান না পেলেও পূর্বপুরুষ জহিরুদ্দিন শাহ বাবরের মাতৃভূমি উজবেকিস্তানে পেয়ে আসছেন রাজকীয় সম্মান। বাহাদুর শাহ জাফরের মৃত্যুর পর প্রায় সার্ধশত বছর হয়ে যাওয়ার পরেও ভারতে তাঁর দেহাবশেষ ফিরে আসে নি মিয়ানমার থেকে। কিন্তু উজবেকিস্তানের স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যে কাবুল থেকে বাবরের জানাজা কবর উজবেক সরকার উড়িয়ে নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, নতুন কবর ঘিরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল বাবর পার্ক। এখন এই পার্ক উজবেক রাজধানী শহরের অন্যতম দ্রষ্টব্য স্থান।

মাসিউদ্দিন, জিয়াউদ্দিন ও সাজিউদ্দিন গেলেন বাবর উৎসবে উজবেকিস্তানে। ১৪৯৪ সালে উজবেকিস্তান থেকে পায়ে হেঁটে সপরিবারে, বাবর আফগানিস্তানের কাবুল হয়ে হিন্দুস্তানে পা রেখেছিলেন। আর অদৃশ্যের লেখায় প্রায় পাঁচশত বছর পর ওই একই পথে আপাদমস্তক ফারকোটে আবৃত মাসিউদ্দিনের তিন ভাই উজবেকিস্তানে গিয়েছিলেন। ভারতে এক ইঞ্চি জমিও তাদের নিজস্ব নয়, তাতে কী আসে যায়, উজবেকিস্তান বরাবরই মাথায় করে রাখতে চেয়েছে এই পরিবারকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতার পর পরই উজবেকিস্তানের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো বাবরের জন্মোৎসব। আর তার এক দশক না যেতেই সে উৎসবে যোগ দিতে গেলেন তিন ভাই—তাসখন্দে বাবরের জন্মের ৫১০ বছর উপলক্ষে প্রায় ৩০০ একর জমির উপর ‘বাগে-বাবুরি’র উদ্বোধনের সময়। বাগে-বাবুরি অর্থাৎ বাবরের বাগান। ওরা বাবরকে বলে বাবুর। নামেই বাগান, আসলে পাঁচ তলা বাড়ির সমান পেল্লায় এক ব্রোঞ্জের বাবর। বাবর সংগ্রহশালা, পার্ক, বাবরের সমাধি, পাঠাগার—সব মিলিয়ে সে এক বিরাট কাণ্ড। সেখানে গিয়ে কোথায় যেন এক টান অনুভব করলেন মাসি ভাইয়েরা, এর নাম কি মাতৃভূমির টান! কিন্তু মাতৃভূমি তো ভারত, উজবেকিস্তান তো সুদূর পূর্বপুরুষের মাতৃভূমি। তবে কি মানুষের মাতৃভূমি একাধিক থাকে?

ছেলের ঘরের নাতিরা একে একে জড়ো হয়। জবুথবু হয়ে দাদির গা ঘেষে রোদ পোহায়। চোখের মধ্যে সজীব ভোরের অবশিষ্ট ঘুম নিয়ে খুদে মোগলরা শোনে শীতের রোদের মতোই রঙিন আর মহার্ঘ সব অতীত। কিন্তু রূপকথার মতো তেমন কিছুই আর ঘটে না সহসা।

অস্ট্রিক আর্যু
অস্ট্রিক আর্যু

Latest posts by অস্ট্রিক আর্যু (see all)