হোম গদ্য গল্প দিনগত কপটতা

দিনগত কপটতা

দিনগত কপটতা
875
0

যে বেঞ্চটায় আমরা বসলাম, তার কাছাকাছি একটা বেঞ্চে মেয়েটা শুয়ে ছিল। কেবল শুয়ে নয়, সে আসলে অঘোরে ঘুমাচ্ছিল। মধ্য দুপুরে খানিকটা রোদের মধ্যে সে কী করে ওভাবে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে, তার দিকে চোখ গেলে কয়েকবার আমার মাথায় এই ভাবনাটা এল। তারপর ভাবলাম, যখন ঘুমিয়েছে তখন হয় ওখানে ছায়াই ছিল, পরে সূর্যের নড়াচড়ায় হিজল গাছের ছায়া সরে গেছে। তবে বাতাসটা ধোঁকা দেয় নি, মাঝেমধ্যেই তার মলিন শাড়িটাতে দোলা দিয়ে যাচ্ছিল। হাঁটুর কাছাকাছি আঁটোসাঁটো করে পেঁচিয়ে রাখা শাড়িটা বাতাসের ধাক্কায় প্রায়ই তার পা-দুটোকে আরো ইঞ্চি দুয়েক উন্মুক্ত করে ফেলছে। খানিক দূর থেকে স্পষ্ট না হলেও মনে হলো তার মুখটা সামান্য খোলা, গালের উপরে এলোমোলা চুলের ওড়াউড়ি।

‘অ্যাই, তুই তখন থেকে ওই দিকে কী দেখিস?’

উপলের প্রশ্নে আমি তার দিকে ফিরে তাকালাম। হেসে বললাম, ‘কিছু না।’

‘এই ভরদুুপুরে আমরা এইখানে কেন আসলাম বল তো? আর আসার পর থেকে হা করে এক দিকে তাকায়েই-বা আছিস কেন?’


ধোঁয়া আর ধুলায় আচ্ছন্ন শহরটার মাঝখানে মরূদ্যানের মতো টুকরো সবুজ জায়গাটা আমার কাছে বিস্ময়কর বলে মনে হতো।


উপলের মোটর বাইকে চড়ে আমরা দুজন পল্টন থেকে ফিরছিলাম। এরকম আরো কয়েকবার ওই রাস্তাটা ধরে ফিরেছি। বারবার আমার চোখ চলে যেত রাস্তার পাশের রমনা পার্কের দিকে। মফস্বল শহর থেকে এসেছি বলেই হয়তো আমি এমন, কিছু গাছ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে, বাতাসে হেলছে-দুলছে দেখলে আমার মনোযোগ সেদিকে যাবেই। আমার বয়সী অন্য অনেকে হয়তো ওই সামান্য দৃশ্যের মধ্যে কোনো বিশেষত্ব খুঁজে পাবে না। এই শহরে আসার পর থেকে ইটের দেয়াল দেখতে দেখতে আমার ক্লান্ত লাগে। এখানে দৃষ্টি প্রসারিত হতে পারে না; শুধুই প্রতিফলনের মতো দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফেরত আসে। এখানে থাকলে মানুষের স্বভাবও হয়তো বদলে যায়। কোনো অন্যায়-অনাচার কেউ মনে রাখে না বেশিদিন। তাদের ভাবনার রাস্তায়ও শুধু দেয়াল আর দেয়াল। তবে আগে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তারা ঘুরে দাঁড়াত, এখন দেয়াল পেলে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আত্মকেন্দ্রিক মানুষের ভিড়ে রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট পাঁচিলের ওপরের গ্রিল গলে রমনা পার্ক বরাবর আমাকে ডাকত। ধোঁয়া আর ধুলায় আচ্ছন্ন শহরটার মাঝখানে মরূদ্যানের মতো টুকরো সবুজ জায়গাটা আমার কাছে বিস্ময়কর বলে মনে হতো। সেদিন তাড়া ছিল না, তাই উপলকে বললাম, ‘সামনের একটা গেটে দাঁড়া তো, এখানে একটু ঢুকব।’

উপল নিশ্চিত অবাক হলো। বলল, পহেলা বৈশাখ ছাড়া এই পার্কের গেট সে কখনো মাড়ায় নি। গেটের কাছে এক গার্ডের কাছাকাছি মোটর বাইক রেখে আমরা পার্কে ঢুকলাম। কিছুদূর হাঁটার পরে উপলকেও অনেকটা আমার মতোই অবাক হতে দেখলাম।

‘জানিস, পহেলা বৈশাখে পার্কটা একদম অন্যরকম, শুধু মানুষ আর মানুষ। লাল শাড়ি আর টিপ থেকে চোখ সরায়ে পার্কটার দিকে কখনো তাকানোই হয় নাই।’

‘দেখ, কত-রকম সবুজ, না?’ বিশাল একটা জারুল গাছের দিকে তাকিয়ে বললাম আমি।

কিছুদূর হেঁটে আমরা ওই বেঞ্চে বসলাম। বসলাম মানে দখল করলাম। প্রতিটা বেঞ্চই দুজন করে মানুষের দখলে ছিল। ওই বেঞ্চের দুজন উঠে যাওয়াতে আমরা সেদিকে দ্রুত পা চালালাম। তাদের শরীরের ফেলে যাওয়া তাপ তখনো বসার জায়গাটার মোজাইকের উপরে লেগে ছিল।

বসার পরপরই আমার চোখ গেল ওই মেয়েটার দিকে। একাই একটা বেঞ্চে লম্বালম্বি শুয়ে আছে। ভরদুপুরে, এমন খোলা জায়গায় কী করে ঘুমাতে পারে মানুষ! ছোটকালে বিশাল ছায়া করা গাছের নিচে সবুজ ঘাসের মাঠ পেলে হয়তো আমার শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করত, কিন্তু এখন হাজার ইচ্ছে হলেও, এমনকি কোনো একটা বেঞ্চ খালি পেলেও কি আমি শুয়ে পড়ব? মেয়েটির ব্যাপারে আমার কৌতূহল হচ্ছিল। অনেকক্ষণ ধরে বসে ছিলাম, পাশ ফেরে নি বা এতটুকু নড়ে নি সে। কোনোদিন এমন করে ঘুমালে মা বলত, ‘এভাবে নাকে তেল দিয়ে ঘুমানোর কী হলো? ঘুমের ওষুধ খেয়েছিস নাকি?’ ঘুমের ওষুধ খাওয়ার প্রশ্ন নেই। আর নাকে তেল দিয়ে ঘুমানো কি আদৌ সম্ভব? কেউ চাইলে নাকে তেল ঢেলে দেখতে পারে, ঘুমানো তো দূরের কথা জেগে থাকাও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

উপল বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ। ভালোই লাগতেছে এইখানে। তুই বলাতে আসা হইল।’

‘হুম, এই গরমেও এইখানে বাতাস আর কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা। আচ্ছা, তুই সত্যি ঢাকায় এত বছর থাকতেও এইখানে আসিস নাই?’

‘নাহ্, কখনো ঢোকার কথা মনে হয় নাই।’

‘আমাকে ছোটবেলা বাবা আনছিল একবার। রাস্তায় জ্যাম থাকায় আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেছিল। ফ্লাড লাইটের ফকফকা আলোয় শত শত চড়ুই পাখি ঘাসের পোকা খুঁটে খাচ্ছিল। আমি বাবাকে জিজ্ঞাসা করছিলাম, আলো দেখে কি ওরা মনে করল দিন হয়ে গেছে?’

কথা বলতে বলতে আমার চোখ আবার চলে গেল শুয়ে থাকা মেয়েটার বেঞ্চের দিকে। দুজন গার্ড তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। একজন হাতের লাঠি দিয়ে তার উরুতে গুঁতো দিয়ে কিছু একটা বলল। দু’তিনবার গুঁতানোর পরে মেয়েটা ধীরে সুস্থে উঠে বসল। মেটে রঙের ছাপা শাড়িটা ঝুপ করে গোড়ালি স্পর্শ করল কিন্তু বুক থেকে গেল খসে। ব্লাউজের শেষ হুকটা খোলা। মেয়েটা সেসব অগ্রাহ্য করে প্রথমে বিক্ষিপ্ত চুলগুলো হাতে পেঁচিয়ে পেছনে একটা খোঁপা বানাল। গার্ডদের দিকে একেবারেই না তাকিয়ে হাঁটু ভাজ করে বেঞ্চে পা ওঠাল। তারপর বড় একটা হাই তুলে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ ডলে নিল। কোল থেকে আঁচলটা নিয়ে মুখ থেকে একদিকে গড়িয়ে আসা লালা মুছল। আর তখন কেন যেন দেখতে কুৎসিত লাগল তাকে। পরমুহূর্তে দুই গার্ডের মাঝখান দিয়ে লেকের দিকে তাকিয়ে থাকা মুখটাতে অদ্ভুত মায়া আর উদাসীনতা লক্ষ করলাম। গার্ডরা তাকে হয়তো কিছু কথা বলল, শেষে মনে হলো হতাশ হয়ে চলে গেল। এই বেঞ্চগুলোতে ঘুমিয়ে থাকা কি নিয়মের বাইরে? হতে পারে। তাকে হয়তো সেটাই মনে করিয়ে দেয়া হলো।

‘আচ্ছা, এখানে এসে তুই এইরকম চুপ মেরে গেলি কেন বল তো? তার চেয়ে চল ওঠি, খিদা লাগে নাই?’

‘খিদা তো লাগছে। তার চেয়ে বেশি লাগছে পিপাসা। কিন্তু আরো কিছুক্ষণ থাকতে ইচ্ছা করতেছে যে… তুই এক কাজ কর, দেখ না আশেপাশে কিছু পাওয়া যায় কিনা। শিঙ্গাড়া হইলেই চলত। আর পানি আনবি কিন্তু।’

‘যাব? কিন্তু তোকে একা বসে থাকতে হবে যে এইখানে? জায়গাটা কেমন খালি খালি।’

‘তাতে কী হইছে? ওই দ্যাখ, একটা মেয়ে এতক্ষণ একা একাই ঘুমাইতেছিল এইখানে।’

‘গাধা কোথাকার। ওই মেয়ে আর তুই এক? ও তো এখানেই ঘুমাবে, সারারাতও এইখানেই থাকবে।’

খেয়াল করলাম মেয়েটার কথা বলতে গিয়ে উপলের চোখ-মুখ বদলে গেল। নিষিদ্ধ বিষয় নিয়ে আলোচনার মতো আনন্দ আর লজ্জা মাখানো চেহারা। না দেখার ভান করে বললাম, ‘যা তো, যা। আমি ঠিক আছি।’


আমারই মতো একটা মেয়ে কী করে ওরকম একটা জীবনে ঢুকে পড়ে?


উপল গেটের দিকে যেতে লাগল। বসে থাকা মেয়েটি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে উপলের পেছনে হাঁটা দিল। উপলের চেয়ে দ্রুত পা চালিয়ে সে তাকে ধরে ফেলল। দূর থেকে দেখেও বুঝলাম মেয়েটা উপলকে দাঁড়াতে বলছে হয়তো কিছু বলবে বলে, কিন্তু উপল দাঁড়াচ্ছে না, বরং মনে হলো হাঁটার গতি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে মাথা দুলিয়ে মেয়েটার কথার কোনো জবাবও হয়তো সে দিচ্ছে। আমি সেদিকে অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম, ওই মেয়ের উপলের কাছে কী প্রয়োজন থাকতে পারে! উপল অগ্রাহ্য করলেও সে বেশ অনেকটা পাল্লা দেবার মতো করে পাশে পাশে হেঁটে এগোল। তারপর একসময় হঠাৎ থমকে দাঁড়াল, আঁচলটা দিয়ে মুখ আর ঘাড় ভালোভাবে মুছে নিল আর ধীর পায়ে নিজের বেঞ্চের দিকে এগোতে লাগল। কিন্তু সে সরে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই ততক্ষণে সেখানে দুজন এসে বসে গেছে। তার জায়গা হলো আমার বেঞ্চের কাছাকাছি একটা হিজল গাছের গোড়ায়। খানিকটা কাছে থেকে দেখলাম বলেই হয়তো তার চলাফেরা বা চেহারার মধ্যে কোথাও যেন একটা চেনা-চেনা ভাব লুকিয়ে আছে বলে মনে হলো। পরমুহূর্তেই সেই চিন্তাকে উড়িয়ে দিলাম। মেয়েটার বয়স হয়তো আমারই মতো হবে, আঠারো কি উনিশ, বড়জোর বিশ। যে বয়সেরই হোক, ওর মতো একটা মেয়েকে আমার পক্ষে চেনার কোনো কারণ নেই। তাছাড়া পার্কটাই যদি বিচরণের জায়গা হয়ে থাকে তবে তো চেনা হতেই পারে না। ওখানে এর আগে কখনো আমি ওভাবে আসি নি বা বসি নি। মেয়েটি গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে আগের মতোই উদাস হয়ে লেকের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তার দিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে অন্যকিছু ভাবার চেষ্টা করছিলাম। অথচ ঘুরেফিরে কেবল তার দিকেই চোখ চলে যাচ্ছিল। মন থেকে কিছুতেই কেন যেন তার কথা সরাতে পারছিলাম না। আমি কত স্বপ্ন নিয়ে মফস্বল শহর থেকে দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছি, আর আমারই মতো একটা মেয়ে কী করে ওরকম একটা জীবনে ঢুকে পড়ে? আমার ইচ্ছা করছিল তাকে ডেকে কিছু কথা জানতে। একদম কাছেই সে, সামান্য জোরে ডাকলেই শুনতে পাবে। কিন্তু তার দিকে তাকিয়ে দ্বিধায় ভুগতে থাকলাম। একবার হাত প্রায় উঠেই গেল, হাতছানি দিয়ে ডাকব, কিন্তু পরমুহূর্তে মনে হলো, সে আমার প্রশ্নের জবাব দেবেই-বা কেন। সে তো বিরক্তও হতে পারে। তাই হাতটা গুটিয়ে কোলের উপরে রেখে দিলাম। ভাবার চেষ্টা করলাম কেন তার প্রতি বা তার কাজের প্রতি আমার কৌতূহল হচ্ছে। এটুকু বিশ্বাস অন্তত আমার ছিল যে কেউ মনের আনন্দে অন্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এদিকে পা মাড়ায় না। হয়তো কিছু মানুষের অসাধুতাই কাউকে এখানে এনে দাঁড় করাতে পারে। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানোর মতো করে মাথার ভেতরে একটা পুরোনো স্মৃতি খেলে গেল। সেই স্মৃতি নিয়ে যতবার ভাবতাম, ততবার কেঁপে ওঠতাম। লেকের পানির উপরে বাতাস ছুঁয়ে যাবার দাগগুলো ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিল। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে হুট করে মেয়েটার দিকে তাকালাম। এর সাথে কী রকম প্রতারণা হয়েছিল? তবে চিন্তাটা আবার চট করেই বদলে গেল উপলকে আসতে দেখে, হাতে একটা কাগজের ঠোঙা, আরেক হাতে বড় একটা পানির বোতল।

‘এই নে, শিঙ্গাড়া পাই নি। সামোসা পেলাম, তাই নিয়ে এলাম, চলবে?’

সামোসা শুনে আমার ভুরু কুচকে গেল।

‘কী রে, কোনো সমস্যা?’

‘আচ্ছা, উপল, তোর কি মনে হয় না সামোসার ভেতরে আজেবাজে জিনিস থাকে?’

‘মানে? আমার কাছে তো শিঙ্গাড়ার ভেতরের গাদাখানেক আলুর চেয়ে সামোসাই বেশি ভালো লাগে। বেশ কুড়মুড়ে।’

‘না, মানে আমার মনে হয় কী, আগের দিনে হোটেলে যা যা গুঁড়োটুড়ো, মানুষের উচ্ছিষ্ট, এর ভেতরের পুরটা সেসব মিলিয়ে—’

‘চুপ কর। যত্তসব আজেবাজে কথা।’

উপলের ধমকে আমি সামোসায় কামড় বসালাম। গরম ছিল, ভালোই লাগছিল বটে। তবে সে অনেকগুলো এনেছিল। আমি তো একটার বেশি ওই জিনিস গলা দিয়ে নামাতে পারব না, তাই ইচ্ছে করছিল গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসা মেয়েটাকে দিয়ে আসি। কিন্তু কেন দেবো, সে তো ভিক্ষুক নয়, আর উপলও খেপে যেতে পারে। তবে উপলকে বলে দেখা যেতে পারে ভেবে বললাম, ‘অ্যাই, ওই মেয়েটা তখন তোর পেছনে পেছনে গিয়ে কী বলল রে?’

‘কী আবার, বুঝিস না?’

‘বল না, কী বলল।’

‘কী আর, খরিদ্দার খুঁজতেছে।’

‘এই দিনে-দুপুরে?’

‘না না, পরের কথা বলছে। বলছে যে সে এখানেই থাকে, আশেপাশে।’

‘তুই কী বললি?’

‘কী আবার, বললাম, আচ্ছা।’

‘আচ্ছা বললি!’

‘মানে কথা বাড়িয়ে কী লাভ, তাই আচ্ছা বলে কথা শেষ করলাম।’

‘ও।’

আমি লেকের পানির দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকাতে উপল বলল, ‘তুই মনে হয় আমার কথা শুনে হতাশ হইলি?’

‘না রে, একটা ঘটনা আমার প্রায়ই মনে পড়ে, রাতের পর রাত ঘুমাইতে পারি না সেইটা ভাবতে ভাবতে। কোনোদিন কাউকে বলতে ইচ্ছা করে নাই লজ্জায়। হঠাৎ কারণ ছাড়াই সেই ঘটনাটা কেন জানি মনে পড়ল।’

‘তাই নাকি, কী এমন ব্যাপার? বল তো শুনি?’

‘নাহ্, পরে একদিন বলব।’

‘ধুর, তোর মুডের সাথে পারা যায় না।’

আমার উপরে বিরক্ত হয়ে উপল দূরের একটা পিচ্চি চা-অলাকে ডাকল। বড় ফ্লাস্ক থেকে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দুটো কাপে আমাদের জন্য চা ঢালল সে। ঢেলে দিয়ে আরেক বেঞ্চের দিকে চলে গেল দেখে দুই চুমুকের চা আমি ধীরে ধীরে অনেক চুমুকে খাবার চেষ্টা করছিলাম। মন থেকে সেই ঘটনাটা কিছুতেই সরছিল না। উপল রাগ করে চুপ করেছে বলেই হয়তো ঘটনাটা মাথা থেকে আর নড়ল না।


আমি জানতাম এটা চরম অন্যায় হচ্ছে, কিন্তু জানি না কেন প্রতিবাদের শক্তি জোটাতে পারি নি।


বাবার পোস্টিং ছিল তখন রংপুরে। ধাপ নামে একটা জায়গায় থাকতাম আমরা। কিছু মহিলা ছিল গ্রাম থেকে মেয়েদের দল বেঁধে নিয়ে আসত আর বাসায় বাসায় কাজ করার জন্য দিয়ে যেত। আমাদের বাড়িতেও একজনের জায়গা হলো, নাম ময়না। ষোল কি সতের বছর বয়সে ময়নার নাকি বিয়েশাদিও হয়ে গেছে তখন। আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, তবে আমার চেয়ে বেশি বয়সী মনে হতো না তাকে আমার। তার উচ্ছলতা বা চঞ্চলতা এত বেশি ছিল যে কদিনেই তাকে আপন মনে হতে লাগল। মাকে দেখে আমার যেমন মনে হবার কথা, বিয়ে হলেই হয়তো মেয়েদের সমস্ত উচ্ছ্বাস ব্লটিং পেপার দিয়ে শুষে নেয়া হয়, ময়নাকে দেখে আমার সেই ধারণা পালটে গেল। বছর দেড়েক ময়না আমাদের বাড়ির সবকিছু সামলে হাসিখুশি কাটিয়ে দিল। তারপর হঠাৎ একদিন সে পড়ল ভয়ানক অসুখে। ডিহাইড্রেশন হতে হতে তার শরীরে ভয়ানক কিছু সমস্যা হয়ে গেল। বাবা-মা প্রথমে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধপত্র কিনে দিলেন, কিন্তু ময়নার অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হতে লাগল। এমন একটা অবস্থা হলো যে তখন তাকেই সারাক্ষণ দেখেশুনে রাখতে হয় আমাদের। নিজেদের ঘরের কাজ তো হচ্ছেই না উলটো ময়না আমাদের মাঝখানে আস্ত একটা বিপদ হয়ে দাঁড়াল। একটা সময়ে এমন হলো যে ময়নাকে দেখাশোনার জন্য তার ঘর থেকে এনে তোশক-বালিশসমেত আমার ঘরের মেঝেতে এনে রাখা হলো। আমার প্রিয় ময়না আমারই পরীক্ষার পড়াশোনা আর ব্যক্তিগত চলাফেরার ভেতরে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়াল। ‘আপা, পানি খাব।’ ‘আপা, বাথরুমে যাব।’ ‘আপা, পেটে ব্যথা’ ময়নার নানান দাবিদাওয়া চলতে লাগল। পরের দুদিনে তার অবস্থার সাংঘাতিক অবনতি হলো। ময়নার স্বামীকে খবর দেয়া হলো, কিন্তু কেন যেন লোকটা এসে পৌঁছল না। আমার মন বলছিল ময়নাকে হাসপাতালে নেয়া দরকার, কিন্তু বাবা-মা বাসায় রেখে ডাক্তারের দেয়া ওষুধই চালাচ্ছিলেন। ময়নাকে হাসপাতালে রাখা বা চিকিৎসার জন্য যে অনেক টাকা বেরিয়ে যাবে সে নিয়ে তারা চিন্তিত ছিলেন। আমিও সেটা বুঝে চুপ করে ছিলাম। কিন্তু তারপর রাতারাতি ময়নার শরীর প্যারালাইসিসের মতো হয়ে গেল। তাকে তুলে ধরে সামান্য কিছু খাইয়ে দিতে হয়। আমার অশান্তি চরমে উঠে গেল। কদিন গোসলে না যাওয়া ময়নার শরীরের গন্ধ আমার ঘরের সবখানে ঘুরে ঘুরে ঘরটাকে গুমোট করে তুলল। ভেবে পাচ্ছিলাম না কী করে এর থেকে মুক্তি পাই! মাঝে মাঝে ভালোভাবে শ্বাস নেবার জন্য বসার ঘরে বই নিয়ে গিয়ে বসে থাকতাম। বাবা-মা ময়নাকে নিয়ে কী ভাবছিলেন আমার জানা নেই, কিন্তু আমরা সবাই ছিলাম নির্বিকার। হয়তো আমরা ধরে নিয়েছিলাম, এভাবে পড়ে থাকতে থাকতেই সে ভালো হয়ে ওঠবে কদিন পর আর বাসার সমস্ত কাজ নিজে হাতে তুলে নিয়ে আমাদের মুক্তি দেবে। আমরা হয়তো অপেক্ষায় ছিলাম।

তারপর এক রাতে ময়নার অবস্থা এত খারাপ হলো যে অস্থিরতায় চেঁচামেচি করতে থাকল সে। ‘আপা, আমি মনে হয় বাঁচব না,’ ক্রমাগত একটাই কথা তার মুখে লেগে ছিল। আমি সারারাত তার পাশে বসে থাকলাম। ভোর হতেই দেখলাম যে মহিলা ময়নাকে আমাদের বাড়িতে রেখে গিয়েছিল তাকে ডাকা হয়েছে। সেদিন সকালেই কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে ময়নাকে তার সঙ্গে বাসে তুলে দেয়া হলো। আমি জানতাম এটা চরম অন্যায় হচ্ছে, কিন্তু জানি না কেন প্রতিবাদের শক্তি জোটাতে পারি নি। তবে ময়নাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবার পরেই চিৎকার করে কাঁদা শুরু করলাম, ‘বাবা, ময়না যদি এখন মারা যায়? কেন এভাবে বের করে দিলেন?’

‘যাবেই তো। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাঁচবে না। কিন্তু আমাদের বাড়িতে মারা গেলে কত বড় পুলিশি ঝামেলা হবে, তুমি জানো?’

‘তাই বলে আমরা ওকে এভাবে একা একা মরার জন্য ভাগিয়ে দেবো, বাবা?’

‘শোনো, যার ভাগ্যে যা আছে তার তাই হবে। তুমি কেন মনে করছ আমরা ওকে মরতে দিলাম? আমরা কি ওর চিকিৎসা করাই নি?’

‘কোথায় তেমন চিকিৎসা, বাবা? ওকে তো হসপিটালে—’

মা এসে আমাদের মাঝখানে দাঁড়ালেন। আমার দিকে চোখ রাঙিয়ে বললেন, ‘এসব কী হচ্ছে, শিমু? বাবার সঙ্গে এভাবে চিৎকার করে কথা বলছ কেন?’

মা আমাকে ঠেলে আমার ঘরে নিয়ে গেলেন। বিছানায় ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘আদরে আদরে ভীষণ বেয়াদব হয়ে গেছ দেখি!’

আমি বিছানায় পড়ে পড়ে কাঁদলাম অনেকক্ষণ। মা আমার কান্না অগ্রাহ্য করে মেঝেতে পড়ে থাকা তোশক গোল করে পেঁচিয়ে তার ভেতরে ময়নার ব্যবহার করা বালিশ-চাদর মুহূর্তেই অদৃশ্য করে ফেললেন। হ্যাঁচকা টানে পাটিসাপটার মতো গোটানো তোশকটা বাইরে নিয়ে গেলেন। আমার ঘরের বাইরে করিডোরে দাঁড়িয়ে বাবাকে বললেন, ‘মেয়েটা তো এমনই। মনে নেই, সেবারে বেড়ালটা মারা গেল বলে কেমন পাগলের মতো কাঁদল? ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করো না।’ বাবার অস্থির পায়চারির শব্দ শুনলাম তারপরেও। আমার সামান্য খারাপ লাগা নিয়ে তাদের কত চিন্তা! ফিরে এসে মা ঘরের সব জানালা খুলে জোরে ফ্যান ছেড়ে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ময়নার শরীরের ফেলে যাওয়া গন্ধ আমার ঘর থেকে উধাও হয়ে গেল। আমার ঘর আগের মতো হয়ে যাবার পর বিছানা থেকে উঠলাম আমি, মায়ের সঙ্গে ঘরবাড়ি গোছানোতে হাত লাগালাম। দুদিনেই আমাদের বাড়ির সব কোণ থেকে ময়নার সমস্ত স্মৃতি আমরা সফলভাবে বিদায় করতে সক্ষম হলাম। কাপড়চোপড় তো ময়নার সঙ্গেই পোটলা করে দেয়া হয়েছিল, তার নিয়মিত ব্যবহারের গ্লাস-প্লেট, চায়ের কাপ, এরকম সমস্ত জিনিস মা রান্নাঘর থেকে কোথাও সরিয়ে ফেলল। মা হয়তো ভাবত সেসব দেখলে আমার খারাপ লাগবে। অথচ তার পর থেকে হলো কী, গভীর রাতেও আমি আমার ঘরের মোজাইকের মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। শাদার উপরে কালো ছিটেফোঁটার দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার চোখ ঘোলা হয়ে আসত। তারপর মনে হতো ওখানে স্বচ্ছ ময়না শুয়ে আছে। অতিরিক্ত অসুস্থতায় সে তার শরীরের রঙ হারিয়েছে। তাকে ভেদ করে আমি মেঝেও দেখতে পেতাম। ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ সে বলে ওঠত, ‘আপা, বড় কষ্ট, পানি খাব।’ তার কথার প্রতিধ্বনি হতে থাকত ঘরময় আর মুহূর্তেই তার ঘামের ময়লা ময়লা গন্ধে ঘরটা ভরে যেত। রাতবিরাতে আমি জানালা খুলতে যেতাম না। ময়নার গায়ের গন্ধ টেনে টেনে একসময় ঘুমিয়ে পড়তাম।

‘শিমু, চল আরেক কাপ চা নেই। আরো দুই কাপও নেয়া যায়, কী বলিস? দুই চুমুক করে করে তিন কাপে ছয় চুমুক।’

উপলের কথায় ভাবনা থেকে ফিরে এলাম। রাজি হলাম। উপল পিচ্চি চা-অলাকে ইশারা করে ডাকল। পিচ্চি চা ঢেলে দিতে দিতে উপল তার সঙ্গে গল্প জুড়ল।

‘নাম কী? বয়স কত?’

পিচ্চি উত্তর দেবার আগে হলদে দাঁত বের করে হাসল। মনে হলো ওসব নামধামের উত্তর দেবার চেয়ে তার বিস্তৃত হাসিটা দেখানো জরুরি।

উপল বলল, ‘এই চা কে বানাইছে? পাতাই তো দেয় নাই। তাতে সুবিধা আছে অবশ্য, কাপড়ে পড়লে রঙ ধরবে না।’

পিচ্চি আরো বিস্তৃত হেসে চলে গেল। পাশে হিজলের গুঁড়িতে মেয়েটা তখনো অবিন্যস্তভাবে বসে আছে। আমি উপলের মতো তার কাছে গিয়ে কেন নির্দ্বিধায় বলতে পারি না, নাম কী? বয়স কত? কোথায় যেন বাধছিল। আমি তার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধায় মানুষ হয়েছি, এটাই শেষপর্যন্ত আমাকে অপরাধী করে তুলল? অপরাধই বটে, আর সেবারে তো অপরাধই হয়েছিল! ময়নাকে মৃতপ্রায় অবস্থায় রংপুর শহর থেকে পীরগাছার বাসে উঠিয়ে দেবার মাস চারেক পরে স্কুল থেকে ফেরার পথে আমি সেই মহিলাকে দেখেছিলাম। ছুটে গিয়ে তার কাছে ময়নার খবর জানতে চাইলাম। আমার প্রশ্ন শুনে হা করে তাকিয়ে থাকল সে। তারপর দুবার পানের পিক ফেলে নিয়ে আমাকে কোনোরকমে চিনতে পারল।

‘বুঝতে পারছেন না? ওই যে, ময়নাকে দিয়ে গেছিলেন না আমাদের বাসায়? তার খবর কী?’

‘ও, ওই ময়নার কথা কওছেন? কোন্ঠে ময়না? সেদিনোতে না মলছে।’

আমি চমকে উঠলাম। ময়নাকে নিয়ে অনেক দুঃস্বপ্ন আমি দেখেছি কিন্তু সবকিছুর পরেও কেন যেন আমার মনে হতো ঘরে গিয়ে, স্বামীর কাছে গিয়ে সে ঠিক হলে হতেও পারে।

‘কী বলেন, আর চিকিৎসা হয় নাই?’

‘বাসত যাইতে যাইতেই তো শ্যাষ। এলা কয়া কী হইবে? তোমরাই না উয়াক বাড়ির থেকি বাইর করি দিনেন—’


‘কী হলো, কেঁপে ওঠলি কেন?’ উপলের গলায় বিস্ময়।


মহিলার হয়তো তাড়া ছিল কিংবা আমার মতো মানুষের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ময়নাকে নিয়ে কথা বলার তার কাছে কোনো মানে নেই। আরো দুবার পানের পিক ফেলে আমার দিকে আপাদমস্তক একটা দৃষ্টি দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আমি পেছন পেছন ছুটে গিয়ে তাকে ধরলাম।

‘আচ্ছা, তখন ময়নার স্বামী কেন আসে নি তাকে নিতে? আমরা যে খবর দিয়েছিলাম?’

‘চায় নাই গো, আপা, বাঁচাইবার চায় নাই তাক।’

‘আশ্চর্য কথা তো! ময়না যে প্রতিমাসে টাকা পাঠাত, ঘরের চালে নতুন টিন লাগাবে বলে ঈদের সময়ে একসাথে কিছু টাকা নিল, লাগাইছিল টিন?’

‘লাগায় নাই আবার? সেই ঘরত নতুন বউ নিয়া আছে এখন ময়নার স্বামী।’

মহিলা আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেয় নি। হনহন করে হাঁটা ধরেছিল। বাড়ি ফিরে আমিও ময়নার মৃত্যুর ব্যাপারে কাউকে কিছুই বললাম না। রাতের খাবারের পর আমার টেবিলে গরম দুধ চলে এল, আমি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়লাম। আবছা অন্ধকারে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, ময়নার কষ্টের টাকায় বানানো ছাদের নিচে অন্য কাউকে নিয়ে ঘুমাতে কেমন লাগে ময়নার স্বামীর? বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে পাশ ফিরলাম। মেঝের দিকে চোখ গেল, আমারই-বা কেমন লাগে এই মেঝেতে স্বচ্ছ ময়নার সঙ্গে থাকতে? ‘খুব ব্যথা, আপা, পানি দ্যান’—ময়নার গলা বাজতেই আমি কান চেপে ধরলাম। অথচ নাকে সেই উৎকট গন্ধটা লেগেই থাকল। আমার তিনটা হাত হলে নাকটাও চেপে ধরতাম। রাগে আর কান্নায় আমার সমস্ত চিৎকারসমেত আমি বালিশের নিচে আত্মগোপন করলাম।

‘কী হলো, কেঁপে উঠলি কেন?’ উপলের গলায় বিস্ময়।

‘কই না তো!’

‘পরিষ্কার কেঁপে উঠতে দেখলাম আমি। যাই হোক, পার্ক দেখতে এসে এরকম উদাস হয়ে যাওয়ার কী মানে হয়? এক জায়গায় বসে থেকেইবা কী, চল, ওদিকটায় একটু ঘুরে এসে বের হই।’

‘হ্যাঁ, চল।’

পিচ্চি চায়ের কাপ নিয়ে চলে গেলে আমরা উঠলাম। পাশে তাকিয়ে দেখলাম, গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে আলুথালু শাড়ির বাঁধনে মেয়েটা তখনো একাই বসে আছে। কোনো উপযুক্ত খরিদ্দার পায় নি হয়তো। এর মধ্যে একটা বেঞ্চ খালিও হয়েছিল, সে উঠে দখল করতে যায় নি। সে হয়তো খুব ক্লান্ত। আমার জানতে ইচ্ছে করল, দিনে কতবার বা কী করে দিনের পর দিন… অথচ এখনো তার শরীরে কমনীয়তা লেগে আছে। জানতে চাইলে আমার অহেতুক কৌতূহল ভেবে সে নিশ্চয় বিরক্ত হবে। সেই যে ময়নাকে যে মহিলা আমাদের বাড়ি থেকে শেষবারের মতো নিয়ে গিয়েছিল, আমার প্রশ্ন শুনে তার মতো জোরে হাঁটা দিতে পারে। আমি উপলকে অনুসরণ করলাম। কিছুদূর এগোনোর পরেও পেছনে ফিরে দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। দেখলাম মেয়েটা গুঁড়ি থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে, হাত উপরে তুলে শরীর বাঁকিয়ে আড়মোড়া ভাঙছে। সে হয়তো উপলের ব্যাপারে কোনো আশায় ছিল। আমরা উঠে পড়াতে জায়গা পরিবর্তনের কথা ভেবেছে। আর আমারও তখন কী যে হলো, হাতের ঠোঙাটা উপলকে দেখিয়ে বললাম, ‘তুই একটু দাঁড়া তো, আমি এই সামোসাগুলো মেয়েটাকে দিয়ে আসি।’

উপল আমাকে আটকাতে চেয়েছিল, আমি না দেখার ভান করে দ্রুত রওনা দিলাম। মেয়েটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। কিছুটা বিরক্তও কি?

‘কিছু যদি মনে না করো, এগুলো রাখবে?’

‘কী?’

‘সামোসা। আমরা খেলাম তো, বাকিগুলো।’

মেয়েটা হাত বাড়িয়ে ঠোঙাটা নিল। কাছে আসতেই আমি তার গায়ের ঘাম ঘাম গন্ধটা পেলাম। আবারো অসুস্থ আর চলাফেরার শক্তিবিহীন ময়না এসে দাঁড়াল আমাদের মাঝখানে। ভাবলাম, যারা এর কাছে আসে, তারা হয়তো এই গন্ধ ভালোবেসেই আসে। কাছে এসে তাকে আগের মতো কমনীয়ও লাগল না। বয়সটা আমার মতো হলেও, তার চোখের পাশে ভাজ পড়েছে, রোদে পোড়ার চিহ্ন মুখে স্পষ্ট।

‘আচ্ছা, তোমার নাম কী?’

‘পারভিন। ক্যান, আপা?’

‘এমনি। কোথা থেকে আসছ, মানে বাড়ি কোথায় তোমার?’

‘বাড়ি রংপুর।’

‘তাই নাকি! রংপুরের কোথায়?’

‘পীরগাছা।’

‘আচ্ছা, তুমি ময়নাকে চিনতে নাকি?’ সমুদ্রে খড়কুটো খুঁজে পেয়ে যাবার মতো প্রশ্ন করলাম আমি।

‘কোন ময়না?’ নির্লিপ্ত মুখে বলল পারভিন।

‘পীরগাছার ময়না। বাসে রংপুর থেকে পীরগাছা যেতে যেতে মরে গিয়েছিল। চিনতে?’

‘হা হা হা… মরবই তো! সেইখানে অনেক ময়না ছিল, আপা। আমি কাউরে চিনি না, আমারেও কেউ চেনে না।’

মেয়েটির মুখে বিরক্তি ফুটে ওঠার আগেই আমার চলে যাওয়া উচিত বলে মনে হলো। ময়নার কথা উঠে যাওয়াতে তাকে যা যা বলব ভেবেছিলাম, কিছুই আর বলতে ইচ্ছে করল না। শেষ কথাটা বলার সময়ে মেয়েটা হাসল ঠিকই, অথচ গলাটা কঠিন হয়ে এল। আমি তাকে ফেলে উপলের দিকে হেঁটে গেলাম। আমার পা দুটো কোনো কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক রকমের ভারি মনে হলো। জানি না কেন, বহু বছর আগের সেই একই অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মনে হলো, আমি মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছি; আমি ময়নাকে ছাড়িয়ে সরে যাচ্ছি।

আফসানা বেগম

আফসানা বেগম

জন্ম ২৯ অক্টোবর, ১৯৭২, ঢাকা। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা: ব্যবসা।

প্রকাশিত বই:
অনুবাদ: ঝাঁপ ও অন্যান্য গল্প ( নাদিন গোর্ডিমার), রোমান সাম্রাজ্য (আইজ্যাক আসিমভ), লেখালেখি তাদের ভাবনা (এগারো লেখকের প্রবন্ধ), পলাতক (এলিস মানরো)
ফিকশন: দশটি প্রতিবিম্বের পাশে (গল্প ), জীবন যখন থমকে দাঁড়ায় (উপন্যাস), প্রতিচ্ছায়া (উপন্যাস)

ই মেইল : afsana_29@yahoo.com.au
আফসানা বেগম

Latest posts by আফসানা বেগম (see all)