হোম গদ্য গল্প দান্দাল

দান্দাল

দান্দাল
1.20K
0

বাসে বা ট্রেনে যেতে যেতে কোনো সুন্দরী মেয়ের সাথে আমার একটা প্রেম হোক, এ চাওয়াটা আমার দীর্ঘদিনের। ফলে যখনই কোনো জার্নির উপলক্ষ আসে আর আমি একা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই তখনই ব্যাগ গোছাতে গোছাতে বাসে বা ট্রেনে আমার পাশের সিটটায় কোনো একজন সুন্দরী বসবে এ চিন্তা আপনা আপনি মাথায় এসে পড়ে। যদিও দীর্ঘ ভ্রমণ-জীবনে এ পর্যন্ত এমন কখনো ঘটে নি তবু আমার পাশে রূপবতী কেউ একজন বসবে, যেতে যেতে তার সঙ্গে পরিচয় হবে, পরিচয় এক সময় প্রেমের দিকে এগুবে, এ রকম ভাবতে ভাবতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে আমার ভালো লাগে।

সে-বার নোয়াখালী থেকে ঢাকায় আসতে বহুদিন মনে লালন করা আমার সে ইচ্ছাটা পূরণ হতে যাচ্ছিল। ট্রেনের নাম উপকূল এক্সপ্রেস। শোভন চেয়ারের বগি ন-তে আমার সিট। উপকূল এক্সপ্রেস ছেড়ে আসে সোনাপুর থেকে। আমার স্টেশন চৌমুহনী। চৌমুহনী আর সোনাপুরের মাঝখানে আরো একটি স্টেশন মাইজদী। মাইজদী থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনের হুইসল কানে আসার সঙ্গে সঙ্গে মনটা যেন কেমন করে ওঠে। আজ কিছু হবে নাকি!

‘ন’ সামনেই থাকে। ইঞ্জিনের দুটো বগি পরে। আমি জায়গা মতো দাঁড়িয়েছিলাম ফলে যথেষ্ট  ভিড় কাটিয়ে ট্রেনে উঠতে বেশি বেগ পেতে হলো না। আমি আমার সিটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। মনে মনে ভাবছি, জানালার পাশে সিটটা হলে ভালো হয়। চারপাশ দেখতে দেখতে চলে যাওয়া যাবে। ট্রেনে বা বাসে ঘুমুবার অভ্যাস নেই আমার। কিছুতেই ঘুমাতে পারি না। ফলে বাহির দেখতে দেখতে, মোবাইলে পিডিএফ বই পড়তে পড়তে বা কখনো গান শুনতে শুনতে আমার যাত্রাপথ শেষ করতে হয়।


মেয়েটি অবাক হয় না। যেন কেউ একজন আসবে আর এই কথাটাই বলবে, তার অপেক্ষা করছিল।


একটা ব্যাপার লক্ষ করেছি, ট্রেনে যেতে আমাকে একটি অপ্রিয় অভিজ্ঞতায় প্রায়ই পড়তে হয়, যেটা হয়, এক-দুটো স্টেশন পরে উঠলে দেখা যায়, অবধারিতভাবে আমার সিটে কেউ না কেউ বসে আছে। প্রায়ই বসে থাকা লোকটাকে আমার ক্ষুদ্র একটা ইন্টারভিউ দিতে হয়। টিকেট আছে কি না, কত নম্বর সিট, টিকেট দেখান দেখি, এরকম সংশয়মেশা গোয়েন্দাসুলভ প্রশ্ন। আমি সে-সব ক্ষেত্রে অবলীলায় প্রশ্নের উত্তর দিই এবং নিজের টিকেট দেখাই। যতটা সন্দেহের কণ্ঠে লোকটা আমাকে প্রশ্ন করে, আমার টিকেট দেখে ঠিক ততটাই লজ্জিত হয়ে লোকটা যখন সিট ছেড়ে উঠে আসে তখন আমি আয়েশ করে গিয়ে সিটে বসি।

সে বার উপকূল এক্সপ্রেসেও এমনটা হলো। গিয়ে দেখি, আমার সিট ও পাশের সিটে দু’দুটো মেয়ে বসে আছে! এবং দেখতে বেশ! আমার সিটটাও পড়েছে জানালার পাশে।

আমার সিটে একটি মেয়ে বসেছে বলেই মনে হয়, পকেট থেকে টিকেট বের করে আমি নিশ্চিত হতে চাই আসলেই এটি আমার সিট কি না। দেখে মনে হয়, এই মেয়েগুলো বিনা টিকেটে ট্রেন-ভ্রমণ করার কথা না। টিকেটের নম্বর ও ট্রেনের দেয়ালে লেখা নম্বর একই নিশ্চিত করে একটু গাম্ভীর্য নিয়ে আমার সিটে বসা মেয়েটিকে জানাই, ‘এক্সকিউজ মি, ২৪ সিটটা আমার?’

মেয়েটি অবাক হয় না। যেন কেউ একজন আসবে আর এই কথাটাই বলবে, তার অপেক্ষা করছিল। বলল, ‘ভাইয়া, কিছু মনে না করলে ২৬ সিটটায় বসবেন আপনি? ওই সিটটা আমাদের।’

আমি একটু হতাশ হলাম। সে নিজে ছাব্বিশে চলে গেলে আমি নির্ঘাত তেইশে বসা মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে বলতে চলে যেতে পারতাম। কিন্তু কী আর করা, এমনিতে ২৪ আর ২৬-এ কোনো পার্থক্য নেই। দুটোই জানালার পাশের সিট।

ছাব্বিশে এসে দেখি পাশের সিটেও একটি মেয়ে আছে। যাক, সিটে সিটে অদলবদলে তাহলে ঠকতে হলো না। আমি মেয়েটিকে ইশারা দেই যে, জানালার পাশে খালি থাকা ২৬-এ আমি বসব। মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে ভেতরে যেতে দেয় আর পিছনে থাকা মেয়েগুলোর সাথে কথা বলে। তখন বুঝতে পারি, ওরা তিনজন এক সাথে যাচ্ছে। আমি আমার ব্যাগটাকে উপরে রাখতে রাখতে মাথা কাত করে আরেকবার পিছনের মেয়েটিকে দেখে নিই। আসলেই মেয়েটি সুন্দর আর হাসিখুশি। এই ভোরে মানে সকাল সাড়ে ছয়টায়ও মেয়েটার ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। রং পিঙ্ক। অফ হোয়াইটের উপর পিঙ্ক কালারের বড় বড় ফুলের জামা পরা ফর্সা মেয়েটা জামার সাথে ম্যাচ করে ঠোঁটে লিপস্টিক মেখেছে। ব্যাগ রাখতে রাখতে এইটুকুর বেশি আর খেয়াল করা গেল না।

শীতের সকাল। বাইরে বেশ ঠান্ডা। কাচের জানালাটা লাগানো ছিল। আমি খোলার চেষ্টা করলাম না। যেহেতু পিছনের মেয়েটার সাথে বসা গেল না আর পাশে থাকা মেয়েটির সঙ্গেই যেতে হবে এবং আমি নিশ্চিত, মেয়েটি এক সময় তার বন্ধুদের মতো জানালা খোলা রাখতে চাইবে, তখন অবশ্যই আমাকে অনুরোধ করবে জানালাটা খুলে দেয়ার, সে অনুরোধের অপেক্ষায় আমি জানালাটা খোলা থেকে বিরত থাকলাম।

পাশে থাকা মেয়েটি কিছুক্ষণের মধ্যেই কানে হেডফোন লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললে আমি চোরা চোখে তাকেও একবার দেখে নিলাম। গায়ের রং একটু শ্যামলা হলেও এই মেয়েটিও সুন্দর। উঁচু নাক। ঠোঁটের ডান দিকে একটা ছোট্ট তিল।

আমার ধারণা, ওরা তিনজনই নোবিপ্রবি’র স্টুডেন্ট। যদি তাই হয় তবে কোনো মতে পরিচয়টা হয়ে গেলে ট্রেনে যেতে যেতে প্রায়ই দেখা হওয়ার সুযোগটা তৈরি হবে। আর আমাকেও যেহেতু ব্যবসার কাজে প্রায়ই নোয়াখালী যেতে হয় সেহেতু চাইলে নোয়াখালী শহরেও চুপিচুপি দেখা করে ফেলা সম্ভব!

একটি মেয়ে সত্যিই আজ পাশে বসেছে আর সে যে বসবে এমন আশা দীর্ঘদিন মনে লালন করছিলাম বলেই ভোরের বাতাস কেটে ছুটে চলা আন্তঃনগর ট্রেনে আমার কল্পনাগুলো অনেক অনেক দূরের সম্ভাবনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেতে থাকে।

পাশে বসা মেয়েটি চোখ বন্ধ রাখায় আমি হাঁস-ফাঁস করি। দুয়েকবার গলা খাকারি দিই, কাজ হয় না।  তখন পিছন থেকে সেই মেয়েটা ডাক দেয়, ‘এই তানিয়া, খাবি?’

তার মানে সে তানিয়া। তানিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে উত্তর দেয়, ‘না তন্বি আপু, আমি এখন খাব না। আপনারা খান।’

ঐ মেয়েটির নাম তাহলে তন্বী! কী সুন্দর নাম। মেয়েটির মতোই। অফ হোয়াইটের উপর পিঙ্ক কালারের বড় বড় ফুলের মতো বা তার ঠোঁটে মাখা লিপস্টিকের মতোই সুন্দর মনে হয় নামটা। আরো মনে হয়, তন্বী নামটা এমন মেয়েরই হওয়া উচিত। আহা, এই মেয়েটির পাশে বসতে পারলাম না!

তন্বী তখন তানিয়াকে তাড়া দেয়, ‘খেলে এখনই খা, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।’

তানিয়া তখন কানের হেডফোন নামিয়ে ভাঁজ করে ব্যাগে ভরে তন্বীর কাছ থেকে একটা হটপট নেয়। হটপটে সম্ভবত ভুনা খিচুরি হবে। আমার নাকে মাংসের ঘ্রাণ এসে লাগে। তানিয়া তার ওড়না ও ব্যাগের একটা অংশ দিয়ে আমাকে যথাসম্ভব আড়াল করে কাঁটাচামচ দিয়ে খেতে শুরু করে। আমাকে তার আড়াল করার চেষ্টা দেখে একটু খারাপ লাগে। এমন করে আড়াল করে যেন ও খেতে থাকলে আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকব আর আমার তাকানোয় ওর ওপর ক্ষতিকর নজর লাগবে।

একটু অভিমান হয়। আমার ব্যাগেও তো খাবার আছে। ভোরেই স্টেশন থেকে একটা অলটাইম কেক আর মটর ভাজা কিনেছি। এত সকালে খাওয়ার অভ্যাস নেই তাই একটু বেলা হওয়ার অপেক্ষা করছি। কিন্তু মেয়েটির এমন ভাবলেশহীন খাওয়া আর আমাকে আড়াল করার চেষ্টায় বারবার মন বলছে, এখনই ব্যাগ থেকে মটরভাজার প্যাকেটটা বের করি আর ওকে শুনিয়ে শুনিয়ে কটরকটর করে মটরদানা চিবুতে থাকি।

এমন সময় পত্রিকাওয়ালা এলে ব্যস্ত হওয়ার ভঙ্গিতে একটি পত্রিকা কিনি এবং দুহাতে পত্রিকা খুলে মাঝখানের সম্পাদকীয় পাতায় মুখ নামিয়ে আমিও মেয়েটির থেকে নিজেকে আড়াল করে ওকে একটু বুঝিয়ে দিই যে, তার খাবারের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই আমার।

তানিয়া বেশিক্ষণ খায় না। সে তার পালা শেষ করে তন্বীর পাশে থাকা অপর মেয়েটির কাছে হটপট চালান করে, ‘নে, তুই শেষ কর।’

তানিয়া টিসু দিয়ে একটুখানি ঠোঁট মুছে সে-টিসু আবার ভাঁজ করে ব্যাগে রেখে দেয় আর হেডফোন বের করে কানে লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। ভেবেছিলাম, ও আমার কাছ থেকে পত্রিকার একটা পাতা পড়তে চাইবে কিন্তু ওদিকে সে কোনো আগ্রহ দেখায় না ফলে ট্রেনে যেতে যেতে একটা সুন্দরী মেয়ের সাথে গল্প করার বা গল্প করতে করতে আরো সামনে এগিয়ে যাওয়ার যে ভাবনা আমি এতকাল ভেবে এসেছিলাম বা একটু আগেও ভাবতে ভাবতে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম, পাশে একটা সুন্দরী মেয়ে থাকা সত্ত্বেও সে আশা আমার পূরণ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখি না। তখন আমাকে কিছুটা অস্থিরতায় পায়।

আমি ক্ষুধা অনুভব করি এবং কেক খেয়ে সশব্দে মটর দানা চিবুবো সিদ্ধান্ত নিই। পত্রিকা ভাঁজ করে সিটের উপর রেখে ব্যাগ নামাতে আমি উঠে দাঁড়াই। তানিয়া একটু নড়ে ওঠে। চোখ বন্ধ রাখলেও সে যে হেডফোনে কিছু একটা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে নি, এটা বোঝা গেল।

কেক খেয়ে গলায় বোতল থেকে পানি ঢালি। হাতে নেয়ার আগে প্রচণ্ড ইচ্ছা হলেও কেন জানি মটরভাজার প্যাকেটটা না ছিঁড়ে আবার ব্যাগে রেখে দিই। তারপর ব্যাগটা আবার উপরে তুলে রাখতে রাখতে আরো একবার তন্বীকে দেখে নিই। মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে ট্রেনের বাইরে ছুটে চলা বাড়িঘর-ঝোপঝাড় আর ফসল দেখছে অথবা কিছু ভাবছে। আমি আমার ব্যাগটা ভেতরে ঠেলে ঠেলে অযথাই আরো ভেতরে দেয়ার চেষ্টা করতে করতে তন্বীকে যতটা পারা যায় দেখে নিই, তন্বী আমার দিকে তাকায় না।

আমি আমার সিটে বসে পড়ি। তখন দেখি, তানিয়া তার মোবাইলে ফেসবুকে ঢুকেছে। পাশের সিটে থেকে তখন আড় চোখে তার আইডিটা দেখে ফেলার চেষ্টা করি, পারি না। স্ক্রিনের উপর ও অনবরত ডান হাতের বুড়ো আঙুল টেনে যাচ্ছে। কিছু যে পড়ছে না, সেটা বোঝা যাচ্ছে। তখন আমি আমার মোবাইল বের করি এবং আমিও দ্রুত ফেসবুকে ঢুকে পড়ি। আমার সর্বোচ্চ লাইক পাওয়া স্টেটাসটা খুঁজে বের করে মোবাইলটা তানিয়ার দিকে হালকা কাত করে পড়তে থাকি। ডিসপ্লেতে শতভাগ লাইট দিয়ে রাখি যাতে তানিয়া একটু চেষ্টা করলেই দেখতে পারে। কিন্তু তানিয়া দেখে না। সে তার মতো মোবাইলে আঙুল চালিয়েই যায় আর আমিও আমার মোবাইল কাত করে পড়ার ভান করতেই থাকি। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ গেলে চিন্তা করি, যেহেতু কাজ হচ্ছে না মানে তানিয়া দেখছে না আর রাস্তায় ফোন চার্জ দেয়ার সিস্টেমও নাই সেহেতু শুধু শুধু মোবাইলের চার্জ নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। তখন আমিও পকেট থেকে হেডফোন বের করে কানে লাগিয়ে দিই। নচিকেতা গাইতে থাকে, ‘আমি সূর্যের থেকে ভালোবাসা নিয়ে, রাঙাব হৃদয় তার রং দিয়ে, পোশাকি প্রেমের প্রয়োজনবোধ করি না।’

পাশে থাকা একটি মেয়ের কাছ থেকে কোনো রকম সাড়া বা আহ্বান না পেয়ে চলন্ত ট্রেনে আমার অভিমানী মন ভীষণ জীবনবাদী হয়ে ওঠে। ‘নচিকেতা’ তখন ভালো লাগতে থাকে। তার গানে এতই মনোযোগ আসে যে, ট্রেনে বা বাসে যে ব্যাপারটা আমার কখনোই হয় না, আমি ঘুমিয়ে পড়ি!

ঘুম ভাঙল তানিয়ার ডাকে, ‘এই যে ভাইয়া, আপনার মোবাইল পড়ে গেছে।’


‘আমি এ উপন্যাসটা বহুবার পড়েছি। এতবার পড়েছি যে এর যে কোনো একটা ছেঁড়া পাতা হাতে পড়লেও আমি ঠিক বুঝতে পারব।’


মোবাইলটা কোলের ওপর রেখে গান শুনছিলাম। ট্রেনের ঝাঁকুনিতে নিচে পড়ে গেছে। তড়িঘড়ি করে হাতে নিয়ে কোথাও ভাঙল কী না পরীক্ষা করে দেখি, না, ঠিকই আছে। কোনো ক্ষতি হয় নি। পড়ে যাওয়া মোবাইলের জন্য ডেকে তোলায় তানিয়াকে একটি ধন্যবাদ দেয়ার সুযোগ আসে। একটু হেসে মুখে কৃতজ্ঞতার একটা ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি, ‘থ্যাংক ইউ।’

জবাবে তানিয়া কেবল একটু হাসি দেয়। কথা বলে না।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি প্রথম টের পাই নি। তবে দীর্ঘঘুম বা সঙ্গমের পর শরীরে যেমন একটা আরাম জড়ানো আলস্য তৈরি হয় তেমনি মনে হলো, বেশ আরাম লাগছে। মাথাটা হালকা হয়ে এসেছে। নতুন হোটেলে কাটানো গত রাতের অনিদ্রার অসুবিধাটুকু কেটে গেছে। তখন কোথায় এসেছি দেখতে জানালাটা খোলার চেষ্টা করি। কিন্তু জানালাটা খোলে না। মনে হয়, কাচের জানালাটা ফ্রেমের সাথে স্থায়ীভাবে আটকে আছে। এমন হওয়ার কথা না, ভেবে আমি প্রাণপণে নানা কায়দায় জানালাটা খোলার চেষ্টা করেও যখন পারি না তখন তানিয়া কথা বলে, ‘ভাইয়া, এটা খুলবে না। আমরা ট্রেনে উঠেই এটেনন্ডেন্টকে বলে চেষ্টা করিয়েছিলাম। তিনিও পারেন নি। বলে গেছেন, এটা এমনই।’

খানিকটা রাগ এসে গেল আমার। ২৬ ছেড়ে ২৪-এ বসার বুঝি এই কারণ! আমি তখন তানিয়াকে বাইরে যাওয়ার ইঙ্গিত করলে সে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে যাবার জায়গা করে দেয়। সিট থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আরো একবার তন্বীর দিকে তাকাই। তন্বী এবার চোখ বন্ধ করে ঘুমুচ্ছে মনে হলো। আহা, কী সুন্দর তার চোখ বন্ধ রাখার ভঙ্গি। চোখে মুখে কপাল থেকে নেমে আসা কয়েকটা চুল এসে বাড়ি দিচ্ছে। কী যে ভালো লাগে দেখতে। উঠতে উঠতে এর চেয়ে বেশি কিছু খেয়াল করা সম্ভব না। আমি ফ্রেশ হতে বাথরুমের দিকে রওয়ানা দিই।

স্টেশনের নাম আখাউড়া জংশন। আখাউড়ায় ট্রেনটি প্রায় মিনিট বিশেক দাঁড়িয়ে থাকে। এই ফাঁকে আমি ট্রেন থেকে নেমে একটু দূরে গিয়ে আমার জানালার মুখোমুখি দাঁড়াই যেখান থেকে তন্বীকে সরাসরি দেখা যাবে। প্লাটফরমের এ অংশটায় দাঁড়িয়ে আছে মোটামোটা লোহার গ্রিল। আমি লোহার গ্রিলে একটা পা পিছন থেকে উপরে তুলে ঠেস দিই আর কাছেই ডাকতে থাকা ডাবওয়ালার সাথে ডাবের দরদাম করার চেষ্টা করি। তন্বী বা ওর সাথের কেউ ডাব খায় কি না বা ডাবওয়ালাকে ডাকে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখি ও একটি বড় ডাবের অর্ডার দেই। বড় এজন্য যে, আমি চাই, এটা খেতে খেতে পুরো বিশটা মিনিট কেটে যাক, ফলে ডাবওয়ালার ‘এইটা কচি হবে না’ পরামর্শ না শুনে বড়টাই কাটতে বলি। ডাবওয়ালা ডাব কেটে ভেতরে পিঙ্ক কালারের একটা স্ট্র ঢুকিয়ে আমার হাতে দেয়। আহারে পিঙ্ক! স্ট্রটা দেখে খুশি হই কেননা স্ট্রটা বারবার তন্বীর লিপস্টিকমাখা ঠোঁটগুলোকে মনে করিয়ে দিচ্ছে!

দাম মিটিয়ে ডাবওয়ালাকে বিদায় দিয়ে স্ট্রতে চুমুক দিতে দিতে আমি তন্বীর দিকে তাকাই। তন্বী পাশের সিটে বসা মেয়েটির সাথে কী যেন বলছে। আমার দিকে মনোযোগ নেই। আমি তার দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে আমার জানালায়ও চোখ রাখি যাতে ও আমাকে দেখে বুঝতে পারে তার সামনের সিটে বসা লোকটা আমিই যার সাথে সে জানালার পাশের সিট অদলবদল করেছে এবং ওর জন্য জানালা খুলতে না পারার অসুবিধাটা সেক্রিফাইস করার লোকটাও আমিই। আমি অনেকক্ষণ পিঙ্ক কালারের স্ট্রতে ঠোঁট দিয়ে রাখি। তন্বী মাঝে মাঝে জানালার বাইরে তাকালে ওর পিঙ্ক কালারের ঠোঁট চোখে পড়ে। ওর মুখে রোদ এসে লাগে আর ও ওর পাশের মেয়েটির দিকে ঘাড় ফেরায়।

ডাব খাওয়া শেষ হয়ে গেলেও খালি ডাবটা হাতে ধরে রাখি। এমন সময় ট্রেন হুইসল বাজায় আর তন্বী জানালা দিয়ে মাথা বের করে বাইরে তাকায়। ট্রেন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে। আমি নড়ি না। কিছুটা চলতে থাকা ট্রেনে উঠে পড়তে আমার সমস্যা হবে না ভেবে আরেকটু অপেক্ষা করি, দেখি, তন্বী আমাকে ডাক দেয় কি না যে, ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে, উঠে আসেন। তন্বী ডাকে না আর ট্রেনও আমাকে হতাশ করে গতি বাড়িয়ে দিলে আমি দৌড়ে এসে ট্রেনে উঠি। আর আমার সিটের কাছে এসে এই প্রথম অকৃতজ্ঞ তন্বীর দিকে না তাকিয়েই সিটে বসে পড়ি। ওরা তিনজন তখন কী নিয়ে কথা আর হাসিতে মেতে ওঠে। তানিয়া সিটের উপর হাঁটুর ভর দিয়ে তন্বীর দিকে ফিরে কথায় যোগ দেয়। আমি এদের কারো সাথে কোনো সুবিধা করতে পারি না।

তখন আমি আর কিছুতেই ওদের দিকে তাকাব না সিদ্ধান্ত নিই আর মোবাইলে পিডিএফ বই পড়ায় সিরিয়াস হই। মোবাইলটা আমি হরিজেন্টালি ধরি আর জুম করে পড়তে থাকি। এমন সময় আমাকে অবাক করে দিয়ে তানিয়া তার সিটে বসে কথা বলে, ‘আপনি কি উপকণ্ঠে পড়ছেন?’

আমি তানিয়ার দিকে তখন সরাসরি তাকাই, ‘হ্যাঁ, কী করে বুঝলেন?’

তানিয়া খুব সহজভাবে স্বীকার করে, ‘আমি এ উপন্যাসটা বহুবার পড়েছি। এতবার পড়েছি যে এর যে কোনো একটা ছেঁড়া পাতা হাতে পড়লেও আমি ঠিক বুঝতে পারব।’

আমি এবার তার দিকে একটু ঘাড় ঘুরিয়ে বলি, ‘আপনি বুঝি সাহিত্যের স্টুডেন্ট?’

ও হেসে ফেলে, ‘না, আমি ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ থেকে বিবিএ করেছি। তবে অবসরে আমি প্রচুর বই পড়ি। উপকণ্ঠে আমার প্রিয় উপন্যাসের একটি।’

এই তো, এটাই চেয়েছিলাম। এভাবেই হোক। আমার পাশে একটা মেয়ে বসা থাকবে আর এভাবেই কথা বলবে, এমনটাই সব সময় চেয়ে এসেছি। অনেকক্ষণ পর মনে হলো, আজ ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতে যাচ্ছে। চৌমুহনী স্টেশনে ট্রেনে উঠতে উঠতেই এমনটা মনে হয়েছিল। তানিয়ার আগ্রহে মনের ভেতর একটা খুশির চোরা স্রোত কোথা থেকে এসে এতক্ষণ ধরে তানিয়া, তন্বী বা তাদের সাথে তৈরি হওয়া অভিমানের বরফটাকে দ্রুত গলিয়ে দেয়। আমি কথা চালিয়ে যেতে থাকি, ‘নোয়াখালীর কোথায় আপনাদের বাড়ি?’

ও হেসে ফেলে। লক্ষ করি, তানিয়া খুব সুন্দর করে হাসে। তার হাসির সাথে সাথে ঠোঁটের পাশের তিলটা নড়ে। দেখতে ভালো লাগছে।

‘আমরা নোয়াখালী বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমার পিছনের সিটে একটা মেয়ে আছে না? ওদের বাড়ি। আমরা এক সাথে ইস্ট-ওয়েস্টে পড়েছি।’

‘আর আপনাদের তন্বী আপু?’

তন্বীর কথা শুনে তানিয়া আমার দিকে পুলিশি নজরে তাকায়। আমিও হেসে জবাব দিই, ‘আপনিই একবার এ নামে ডেকেছিলেন।’

ও হাসে, ‘তন্বী আপু আমাদের এক বছরের সিনিয়র। কদিন আগে আমাদের একই সঙ্গে চাকরি হয়েছে।’

আমি তানিয়াকে আরো ঘাটাবার চেষ্টা করি, ‘আপনারা বুঝি চাকরি করেন?’

তানিয়া উত্তর দিতে দেরি করে না, ‘জ্বি, ঢাকাতে। আপনি?’

পাল্টা প্রশ্নে আমি স্মার্টলি স্বীকার করি, ‘আমি ছোটখাট একটা বিজনেস করি।’

তানিয়া আগ্রহ দেখায়, ‘কীসের বিজনেস?’

আমি হাত দিয়ে শূন্যে একটা স্কয়ার আঁকি, ‘অর্নামেন্ট-বক্সের।’

তানিয়ার কাছে এ শব্দগুলো নতুন মনে হয়, ‘এটা আবার কেমন বিজনেস?’

লম্বা কথা বলার সুযোগ পেয়ে ওর কাছে আমি আমার ব্যবসাটাকে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করি, ‘ঢাকায় আমার একটা ফ্যাক্ট্রি আছে। দক্ষিণখানে। আমরা নানা ডিজাইনের গয়নার বক্স বানাই। ডিজাইন আমি নিজেই করি। আর চাহিদা অনুযায়ী সারা দেশে সাপ্লাই দেই।’

তানিয়া মনে হয় চিনতে পারে, ‘ও, লাল লাল কাপড়ের বক্সগুলো যে?’

আমি মাথা নাড়াই, ‘হ্যাঁ।’

ও আরেকটু ক্লিয়ার হতে চায়, ‘ওগুলো না গয়নার সাথেই থাকে?’

আমি ওকে বুঝিয়ে দিই, ‘থাকে। কিন্তু গয়নার দোকানীরা তো কেবল গয়না বানায়। বক্সগুলো সাপ্লাই দেই আমরা।’

তানিয়া যেন নতুন কিছু শুনল, ‘এটা তো আগে জানতাম না।’

কথা চলতে থাকে। তানিয়ার সাথে কথা বলতে বলতে খেয়াল করি নি, আমরা আশুগঞ্জে হওয়া নতুন ব্রিজের উপর দিয়ে মেঘনা পেরিয়ে গেছি। অন্য যে কোনো সময়, আশুগঞ্জ থেকে ট্রেনটা ছাড়লেই আমি জানালা দিয়ে নতুন হওয়া সিলভার কালারের রেলব্রিজটা পার হতে হতে বাইরে তাকিয়ে থাকি। ব্রিজটা দেখতে দেখতে ভৈরব চলে যাই। আজ টেরই পেলাম না!

তানিয়ার সাথে কথা এগুচ্ছে আর ঢাকার সাথে দূরত্বও যেন দ্রুত কমে আসছে। ভৈরব-নরসিংদী-ঘোড়াশাল যেন এক উড়াল দিয়ে পার হয়ে গেল। আমার সময় কমে আসে। আমি এবার সরাসরি তানিয়াকে প্রশ্ন করি, ‘কিছু মনে করবেন না, একটা কথা বলি?’

তানিয়া একটু অবাক হয়, ‘বলুন?’

‘আপনার তন্বী আপুর কি বিয়ে হয়েছে?’

‘না তো, কেন?’

‘না, আমার এক কাজিনের জন্য ভাবছিলাম…’

তানিয়া তখন তন্বীর বিষয়টা এক কথায় শেষ করে দেয়, ‘সরি ভাইয়া, তন্বী আপুর অ্যাফেয়ার আছে।’

তন্বীর অ্যাফেয়ারের কথা শুনে তন্বী বা তানিয়া কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করার আর ইচ্ছা হয় না। আমার কেন যেন মন খারাপ হয়ে আসে। এবং বুঝতে পারি, তানিয়ার সামনে আমার চেহারার পরিবর্তনটা আমি লুকোতে পারছি না। তখন তানিয়া আগ্রহী হয়, ‘কিছু মনে করবেন না, আপনি কি ম্যারেড?’

আমি সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিই, ‘নাহ!’

তানিয়া এবার গলা নামিয়ে একটু আস্তে করে বলে, ‘আপনার সাথে কিন্তু আমার একটা ব্যাপারে অনেক মিল।’

এবার আমি আগ্রহ দেখাই, ‘কোন ব্যাপারটায়?’

ও ডান হাতটা নাড়িয়ে নাড়িয়ে ব্যাখ্যা করে, ‘এই যে আপনি অনেক পড়েন। কমার্সের স্টুডেন্ট হয়েও প্রচুর বই পড়েন।’

আমি স্বীকার করি, ‘ও তাই তো।’


কী করি, কী করি, ভাবতে ভাবতে একবার কেটে দিয়ে আস্তে করে ওর নাম্বারটা আপাতত ব্লক লিস্টে টুকে ফেলি।


তানিয়া এবার আখাউড়া স্টেশনের কথা মনে করিয়ে দেয়, ‘আর এই যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডাব খান? এটাও আমার পছন্দ। আমরা বিকেলে প্রায়ই ডাব খেতে রামপুরা ব্রিজে যেতাম।’

তানিয়ার কথা শুনে মনটা আনন্দে নাচতে থাকে। আখাউড়া স্টেশনে দাঁড়িয়ে ডাব খাওয়ার সময় বন্ধ জানালার ওপাশে থেকে ও তাহলে আমাকে খেয়াল করেছে!

আমি খুশিমনে মেনে নিই, ‘আসলেই তো আমাদের মাঝে অনেক মিল।’

ও তখন প্রশ্ন করে, ‘আপনি কোথায় নামবেন?’

বলি, ‘এয়ারপোর্ট।’

আমি না চাইতেও ও আমাকে ওদের গন্তব্য জানিয়ে দেয়, ‘আমরা কমলাপুর নামব।’

বিজ্ঞের মতো বলি, ‘আমার আধা ঘণ্টা পর।’

তখন আচমকা তানিয়া আমাকে একটি প্রস্তাব দেয়, ‘আচ্ছা, আজকের পর কি আমরা আবার কথা বলতে পারি না?’

আমি ওর চোখের দিকে তাকাই, ‘শিওর, কেন নয়?’

সহসা করা ওর প্রস্তাবের রেশ ধরে আমরা দ্রুত পরস্পরের মোবাইল নাম্বার বিনিময় করি। এবং দুজন দুজনকে মিসড কল দিয়ে নাম্বারটা নিশ্চিত করি।

এয়ারপোর্ট স্টেশন কাছে চলে আসে। আমি আমার ব্যাগ উপর থেকে নামিয়ে হাতে নিই।

ট্রেন থেকে নামতে নামতে আমার মোবাইলে বাসা থেকে কল আসে। রিসিভ করতেই আমার চার বছরের মেয়ে সুর করে ডেকে ওঠে, ‘বাবা, তুমি এখনো আসতেছ না কেন? আম্মু এতবার ফোন দিতেছে, ধরতেছ না?’

মেয়ের ফোন পেয়ে এতক্ষণ পর আমার যেন ঘোর কাটে।

‘ফোন সাইলেন্ট ছিল আব্বু। এখনই আসতেছি। এই তো আর কয়েক মিনিট।’

‘আম্মু আজ কী রান্না করতেছে বল তো?’

‘কী রান্না করতেছে তোমার আম্মু?’

‘তোমার প্রিয় ভুনা খিচুরি।’

‘ওয়াও, ভুনা খিচুরি?’

‘হু। আর গরুর মাংস।’

‘আচ্ছা আম্মু, আজ আমরা একে সাথে খেতে বসব।’

‘তুমি এক্ষুনি চলে আস বাবা। রাস্তায় কিন্তু একটুও দেরি করবা না।’

‘এই যে মা, এক্ষুনি চলে আসতেছি।’

মেয়ের সাথে কথা বলতে বলতে আমি প্লাটফরম পেরোতে থাকি আর একটু আগে সেভ করা তানিয়ার নাম্বার থেকে অনবরত কল আসতে থাকে। মেয়ের কথায় রান্নাঘরে মেয়ের মায়ের ঘর্মাক্ত মুখটাও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কমলাপুরের দিকে চলতে শুরু করা ট্রেনের দিকে তখন আমি আর তাকাতে সাহস করি না কিন্তু তানিয়ার মোবাইল থেকে কল আসতেই থাকে। একটু পরেই বাসা, একটু পরেই স্ত্রী-কন্যা। কী করি, কী করি, ভাবতে ভাবতে একবার কেটে দিয়ে আস্তে করে ওর নাম্বারটা আপাতত ব্লক লিস্টে টুকে ফেলি।

শাহ ইয়াছিন

শাহ ইয়াছিন বাহাদুর

জন্ম ০৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২; বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক। উপ-সহকারী প্রকৌশলী, বাংলাদেশ টেলিভিশন, নোয়াখালী উপকেন্দ্র, নোয়াখালী।

প্রকাশিত বই :
অন্ধকারের কাছাকাছি [গল্প, মুক্তদেশ, ২০১১]
জলপট্টি [গল্প, পুথিনিলয়, ২০১৬]

সম্মাননা : কেমুসাস (কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট) তরুণ সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৪।

ই-মেইল : yeasinbahadur@gmail.com
শাহ ইয়াছিন

Latest posts by শাহ ইয়াছিন বাহাদুর (see all)