হোম গদ্য গল্প দর্পণে কার মুখ

দর্পণে কার মুখ

দর্পণে কার মুখ
507
0

সকালটা বড় সুনসান লাগে আজ। বড় শান্ত। উঠোনের এককোণে ভ্যানগাড়িটা পড়ে থাকে নিতান্তই অনাদরে, অবহেলায়। খোলা দরজা দিয়ে উদাস উদাস হাওয়া এসে জাগিয়ে দিতে চায় মগ্ন চৈতন্য। তবু বড় একটা রা করে না ছমির আলি। বিছানায় পড়ে থাকে নিথর, নির্বাক। মাঝে মাঝে অলস চোখে একটু তাকিয়ে দেখে বাইরে দিনের কর্মব্যস্ততা কতটা জমল। পাশের রুমের বউটা রান্নায় লেগেছে। শিল-পাটায় সমানে চলছে তার ব্যস্ত বাটাঘষা। কয়েকটি ভেজা, আধছেঁড়া, রঙিন শাড়ি ঝুলছে টানিয়ে রাখা বাঁশের আড়ে। পেঁপে গাছদুটি শিরদাঁড়া উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে টানটান। মৃদু বাতাসে মাথা নেড়ে নেড়ে তারাও যেন আজকের সকালটিতে নিজেদের অসহযোগ জানাতে চাইছে ছমির আলির সাথে একাত্ম হয়ে। দূরে, বড়ই গাছটা ফ্যাকাসে, মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে একা। সজনে গাছেরও মন খারাপ। কড়ই গাছটা ডালপালা মেলে সাম্রাজ্য বিস্তারের কূটচালে ব্যস্ত। কৃষ্ণচূড়া সবুজে ছেয়ে আছে, ছন্দ তুলে দুলছে। মনে ভারি ফূর্তি তার। উঠোনে কতগুলো বাসন পড়ে আছে এলোমেলো। পাশের খোলা জায়গাটিতে স্তূপ করে রাখা ময়লার উপরে কতগুলো কুকুর শুয়ে আছে। অলস, ছমির আলিরই মতো। তাদের মাথার উপরে এই সাতসকালেই অনেকগুলো কাক উড়ছে, ঘুরছে আর তাড়স্বরে কা কা কা ডেকে চলছে সমানে। বারান্দায় রফিক মিয়ার আমড়ার চাটনিতে মহানন্দে উড়ছে রাজ্যের মাছি। বারান্দায় বসে সেদিকে তাকিয়ে বিকট হা করে হাই তুলছে রফিক মিয়া। রাতের ঘুমের রেশ এখনও লেগে আছে তার চোখে মুখে। বউটার রান্না হলেই খেয়ে বেড়িয়ে পড়তে হবে তাকে। ফেরি করবে হাতে তৈরি মশলাদার আমড়ার চাটনি। সাথে মাছির শরীর থেকে আমদানিকৃত জীবানু ফ্রি। আজকাল ফ্রির বড় কদর।


বড় আজব চিড়িয়া এই মেয়েমানুষ! কী চায়, কী যে আসলে চায় নিজেই জানে না।


জরিনা নেই। কাজে বেরিয়েছে সেই ভোরে। তার আগে হয়ে গেছে একচোট। মেয়ে মানুষের বুদ্ধি! মরা মানুষকে নিয়েও হিংসে করে! পারুল মরেছে শুনে থম ধরেছিল ছমির আলি। তার নাকের পাটা ফুলে উঠেছিল অজান্তেই। দু একফোঁটা জলও গড়িয়েছিল হয়তো চোখে। জরিনা প্রথমে বুঝতে পারে নি। সহমর্মী হয়ে এগিয়ে এসেছিল। গায়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে, কণ্ঠে মধু ঢেলে জানতে চেয়েছিল ছমির আলির মনস্তাপের কারণ। ছমির আলিও গলে গেছিল, জরিনার ভালো মানুষীতে ভুলে সে বেশ একটু ফুঁপিয়ে উঠে বলে ফেলেছিল, পারু আর নাই রে জরি! পারু আর নাই!

শুনেই ছিটকে সরে গেছিল জরিনা। যেন তপ্ত লোহার ছেঁকা খেয়েছে এমন ভঙ্গিতে সরে দাঁড়িয়েছিল দূরে। হাতে থাকা তালপাখাটা ছুঁড়ে দিয়েছিল ছমির আলির শরীর বরাবর। হাত দিয়ে ধরে ফেলেছিল ছমির আলি। পাখাটা যুৎ মতো লাগাতে না পেরে মুখে ঝড় তুলেছিল জরিনা। শাপ শাপান্তে পারুলের নরকেও ঠাঁই না হওয়ার পাকা বন্দোবস্তে অক্লান্ত জরিনাকে থামানোর চেষ্টা বৃথা বুঝে চুপ করে ছিল ছমির আলি। জরিনা আজ তার খাবারের ব্যবস্থা না করে, নিজেও না খেয়ে বেরিয়ে গেছে কাজে। বুঝিয়ে গেছে এসব বেহুদা শোকের মুখ ভরে মোতে না সে। মুখেও বলে গিয়েছে সে কথা।

ছমির আলি বাইরের উদাস সকালের দিকে তাকিয়ে নিজেও ভারি আনমনা হয়ে যায়। পারুলের মৃত্যু সংবাদটা বুকের মধ্যে কেমন একটু ধাক্কার মতো লাগে। মনে হয় যেন ফুসফুস থেকে অনেকটা হাওয়া বের হয়ে গেছে আচমকা। বড় খালি খালি লাগে। কী এক শূন্যতা এসে খামচে ধরে তার বুকের ভেতরটা। ছমির আলি হাঁস-ফাঁস করে। শ্বাস নেয় বড় করে। বিছানা থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না। আজ আর ভ্যানগাড়ি নিয়ে বেরোবে না সে। সংসার জাহান্নামে যাক। একমাত্র মেয়ে টিকলি বাইরের খোলা জায়গায় পা ছড়িয়ে বসে কী যেন খেলছে নিজের মনে। মাঝে মাঝে তার গলার আওয়াজ কানে আসে। সুর করে ছড়া কাটে সে। বাপ-মার ঝগড়া তেমন একটা আমলে নেয় না টিকলি। নিত্য ঘটা এ ব্যাপারটা তার কাছে নিতান্তই ডাল ভাত। ঝগড়া না হলে বরং সে সন্দেহ নিয়ে তাকায়। ভাবে কিছু একটা অনাসৃষ্টি ঘটল হয়তো। সে তাই বাপ-মার ঝগড়া দেখে নিত্যদিনের মতোই সহজ স্বাভাবিকভাবে ঘুম থেকে উঠে খেলতে লাগে। আরেকটু পরেই খিদে পাবে তার, তখন ছমির আলির কাছে এসে বায়না ধরবে—আব্বু, খিদা লাগছে! খাওন দেও!

বাধ্য হয়ে ছমির আলিকে তখন কাছের ভাঙাচোরা, মাছি গিজগিজ করা, নোংরা হোটেলের ডাল পরোটা কাগজের ঠোঙায় নিয়ে ফিরতে হবে। তারপর বাপ বেটি দুজনে ঘরের দাওয়ায় বসে যেন অমৃত খাচ্ছে এমন মুখ করে গোগ্রাসে গিলতে থাকবে সেই পরোটা আর টক, বাসি ডাল। জরিনার এই এক স্বভাব। একটু মেজাজ খারাপ হলেই সে চুলা জ্বালানো বন্ধ করে দেয়। ছমির আলি মনে মনে হাসে। চুলা না জ্বললে ছমির আলির বিশেষ কিছু উনিশ বিশ ঘটে না। সে টিকলিকে নিয়ে বাইরে গিয়ে দিব্যি সেঁটে আসে। মাঝখান থেকে জরিনা নিজেই না খেয়ে কষ্ট করে। বোকামি তবু কমে না তার। বড় আজব চিড়িয়া এই মেয়েমানুষ! কী চায়, কী যে আসলে চায় নিজেই জানে না। নইলে এই যে পারুল মরে গেল আজ, জীবনের যা কিছু পাওনা গণ্ডা, লেনাদেনা তার কিছু মিটিয়ে কিছু বা বাকি রেখেই সে চলে গেল চিরতরে, আর সে ফিরবে না কোনোদিন, কারো পাকা ধানে সে মই দিতে আসবে না আর, আদতে সে তা করতে আসেও নি কখনও, তার এই চলে যাওয়াকে উপলক্ষ করে ছমির আলির মতো নিতান্তই তুচ্ছ, নগণ্য এক ভ্যানচালকের চোখ থেকে যদি গড়ায় দুফোঁটা অশ্রু, যদি ঝরে দুএকটা তপ্ত নিঃশ্বাস, যদি একটু উদাস ব্যাকুল হয় তার মন, কী এমন ক্ষতি হয় তাতে বিশ্ব সংসারের? কী এমন এসে যায় তাতে জরিনার? কোন বাড়া ভাতে ছাই পড়ে তার? তবু বোঝে না জরিনা। তুলকালাম কাণ্ড করে। কেন পারুলকে মনে রাখে ছমির আলি! কেন তাকে ভেবে চোখে জল জমে ছমির আলির! হিংসেয় জ্বলে মরে সে। কী আজব! যে মানুষটা নেই আর, দু’চার দিনে যার শরীরটাও মাটির সাথে মিশে যাবে যেমন মিশে গেছে ইতঃপূর্বে মরে যাওয়া আরও সব মানুষের শরীর, তাকে কেন অত হিংসে করা বাপু? আর যখন পারুল মরে নি, দিব্যি জলজ্যান্ত শ্যামলা এক যুবতি নারী ছিল সে, তখনই বা তাকে হিংসে করার কী ছিল জরিনার?

ছমির আলি তো পারুলের সাথে তালাক হয়ে যাওয়ার পর আর কোনো যোগাযোগ রাখে নি। তবে? হ্যাঁ, পারুলের কথা তার মনে যে পড়ে নি তা নয়। মাঝে মাঝে পারুলের জন্য, তার সেই মজবুত, মূর্তিবৎ শরীরটার জন্য মনটা যে কেমন করত না, শরীরটা মাঝে মাঝে আইঢাই করে নি যে তেমন নয়, তবু সেসব সামলে সুমলে ছমির আলি ঠিকই জরিনার আঁচলের তলেই ছায়া খুঁজেছে। কিন্তু জরিনার সন্দেহ যায় না। সে কুকুরীর তীব্রতা নাকে নিয়ে ছমির আলির মনের অলিতে গলিতে, শরীরের ভাঁজে ভাঁজে খুঁজে চলে পারুলের ঘ্রাণ! সেই প্রথম থেকে আজ অবধি! পায় কি? কে জানে! কিন্তু তার আর জরিনার সম্পর্কের মাঝখানে ঠিক একটি অদৃশ্য দেয়াল হয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে যায় পারুল! অভেদ্য! আজ যখন সে ফোনটা পেল, তার ছোটবেলার বন্ধু মন্টু যখন তাকে জানালো পারুল নেই, তখন পারুলের জন্য ভারি কষ্ট হলো তার। আহা! পারুল! সেই মিষ্টি মেয়ে পারুল! সে কেন চলে যাবে সব ছেড়েছুড়ে এত অল্প বয়সে! সবে ত্রিশের কোটায় ঠেকেছে! কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, খবরটা পেয়ে সাথে সাথে বুকের মধ্যে বেশ একটু স্বস্তির হাওয়াও যেন ক্ষণিকের জন্য এসে দোলা দিয়ে গেল তার মনে! মনে হলো, যাক, এবার আর মিথ্যে সন্দেহ করে নিজেদের সম্পর্কটা অহেতুক বিষিয়ে তুলবে না জরিনা। নিজের সেই স্বার্থপর চিন্তায় নিজেই যখন অস্বস্তিতে কুঁকড়ে উঠেছিল মনে মনে তখনই সব লণ্ডভণ্ড করে দিলো জরিনা। সে তার আচরণে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলো অত সহজে পারুলকে ভুলে যেতে দেবে না ছমির আলিকে! অথচ কী আশ্চর্য! জরিনা চায় ছমির আলি পারুলকে আর না ভাবে, ভুলে যায়! মেয়েমানুষ এত বোকা কেন হয়! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবে ছমির আলি।

টিকলিকে ডালপরোটা খাইয়ে আবার শুয়ে পড়ে ছমির আলি। শরীরটা যেন বিদ্রোহ করতে চায়। কেমন একটু জ্বর জ্বর লাগে। ভারি দুর্বল লাগে তার। খেতে ইচ্ছে করে না কিছু। সে অদূরে রাখা কলসি থেকে জল গড়িয়ে ঢক ঢক গিলে নেয় এক গ্লাস। তারপর টিকলিকে বাইরে খেলতে পাঠিয়ে শুয়ে পড়ে পুনরায়। দরজা খোলা। বাইরে কলপাড়ে রফিক মিয়ার বউটা স্নান করে অনেক সময় নিয়ে। ফর্সা, মেদবহুল শরীরে অনেকক্ষণ ধরে ডলে ডলে সাবান ঘষে। অন্যদিন দৃশ্যটা বেশ মন দিয়ে দেখে ছমির আলি, ভারি উত্তেজনা বোধ করে ভেতরে ভেতরে। রফিক মিয়ার বউটা ছমির আলির মনোভাব বুঝেই যেন আরও বেশি সময় নেয় স্নানে, আরও বেশি মনোযোগী হয় শরীরের স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে সাবান ঘষায়। দুএকবার ছমির আলির দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসেও দেয়! বেচারা! জরিনাকে তো চেনে না! টের পেলে ছেনালিগিরি ছুটিয়ে একেবারে মুণ্ডু ছিঁড়ে নেবে!

ছমির আলি চোখ সরিয়ে নেয়। কলপাড়ের উপরে, যেখানে পানির ট্যাংকটা বসানো, গাজি ট্যাংক, সেটা সম্ভবত ফুটো হয়ে গেছে। ছড়ছড় পানি পড়ছে কদিন হলো। পড়ুক। বাড়িওয়ালা এখানে থাকে না। বিদ্যুৎ বিল ভাড়াটেদের উপর নয়। ও নিয়ে তাই মাথা যথা নেই কারো। ট্যাংকটার পাশে একটা বিড়াল গোল হয়ে শুয়ে ঘুমোয়। বেশ একটু শীত পড়তে শুরু করেছে। বিড়ালটা শুয়েছে, তার শরীরে ট্যাংকটার ছায়া। আরামের ঘুম দিয়েছে সে।

মন্টুর ফোন আসে সেই সকালে। তখন ভোর ছ টা। অত ভোরে ফোনে বেশ বিরক্ত হয় ছমির আলি। ঘুম ঘুম বিরক্ত গলায় সে বলে—হ্যালো, এত সকালে কী হইচে তোর? এত সকাল সকাল কেউ কাউরে ফোন দেয়?

মন্টু সে সব গায়ে না মেখে জরুরি গলায় বলে—এ ছমির, খবর শুনিচিস? পারুল তো মরে গেচে রে!

বিছানা থেকে উত্তেজনায় উঠে বসে ছমির আলি। তারপর প্রায় চেঁচিয়ে উঠার মতো বলে—কি কইস আবুলতাবুল! পারুল মরবি ক্যা?

—শালা আমার! লজ্জা করে না তোর? এহন কইস পারুল মরবি ক্যা? পারুল মরবি নে তো করবি কী? তার জন্যি মরা ছাড়া আর কী রাহিচিলি তুই?—বলে কট করে লাইন কেটে দেয় মন্টু। আর তারপরই জরিনা ঝড় তুলে নেয় একচোট।

মন্টুর রাগটা বোঝে ছমির আলি। পারুলকে বিয়ে করার জন্য একপায় খাড়া ছিল সে। পারুল রাজি হয় নি। মন্টুর ধারণা ছমির আলির জন্যই পারলের এ আপত্তি। ছমির আলি তা ভাবে না। পারুল মূলত তার আর ছমির আলির সন্তান জুয়েলের কথা চিন্তা করেই দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায় নি। মেয়েমানুষ আর যাই হোক সন্তানের নিরাপত্তাটুকু ঠিক রেখে এগোতে চায়। মন্টু ঝঞ্ঝাট এড়াতে চেয়েছে। সে চেয়েছে পারুল ছমির আলির সন্তানকে হয় ছমির আলিকে দিক, নয়তো পারুলের বাপ-মার কাছে রেখে আসুক। ছমির আলি জরিনার ভয়ে জুয়েলকে আনার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবে নি কখনও, আর বাপ-মার কাছে জুয়েলকে রেখে অন্য কোথাও সংসার করার ইচ্ছেও জাগে নি পারুলের। ফলে পারুলের আর বিয়ে করা হয় নি। ছমির আলি দিব্যি সংসার পেতেছে। জরিনার পীড়াপীড়িতে গ্রাম ছেড়ে শহর ধরেছে। ভ্যানগাড়ি চালায় শহরে। জরিনা মানুষের বাসায় ছুটা কাজ করে।

জরিনার শহরে আসার কারণটা বেশ বোঝে ছমির আলি। জরিনা আসলে চেয়েছে পারুল যেন কোনোভাবেই ছমির আলির চোখের সামনে না আসে, কিংবা ছমির আলি যেন পারুলের ছায়াও মাড়াতে না পারে আর। ছমির আলি আপত্তি করে নি। ক্ষেতমজুর হিশেবে কাজ করে খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না তাদের দিন। ফলে শহরে সে খুশি মনেই এসেছে। পারুলের সাথে দেখা না হওয়া তার কাছে বড় কোনো ঘটনা ছিল না। কেননা গ্রামে থাকলেও পারুলের সাথে দেখা তার বড় একটা হতো না। যদি-বা পথচলতি দেখা হয়েও যেত কখনও সখনও, পারুল এবং সে দুজনই অপরিচিত দুজন মানুষের মতোই যে যার পথে চলে যেত। যেন কেউ কাউকে কোনোদিন চিনত না তারা, চেনে না। পারুল মূলত বাস করে যতটা না ছমির আলির মনে তার চেয়ে ঢের বেশি বাস করে জরিনার সন্দেহবাতিকগ্রস্ত, ঈর্ষাকাতর অন্তরে। বোকা, নির্বোধ মেয়েমানুষটাকে কিছুতেই বোঝাতে পারে না ছমির আলি যে, যদি পারুলের প্রতি সত্যিই অত দরদ থাকত তার তাহলে সে পারুলকে তালাক দিত না। জরিনার এক কথা, পারুলকে ছমির তালাক দেয় নি, ছমিরের বাপ-মা বাধ্য করেছে তালাক দিতে।


জরিনার নির্বুদ্ধিতাই তাকে বারবার স্মরণ করায় পারুলের মুখ।


টিকলি স্নান সেরে খাবার চাইতেই মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ওঠে ছমির আলির। জরিনা এখনও ফেরে নি কাজ সেরে। কখন ফিরবে ঠিক নেই তারও। বিছানা ছেড়ে উঠে দরজার সাথে লাগানো শার্টটা গায়ে জড়ায় সে, টিকলিকে নিয়ে হোটেলে এসে বসে। অন্যদিন এ সময় সে বাইরে থাকে, ভ্যানগাড়ি নিয়ে তাকে অনেকদূর যেতে হয়। সে ‍যদি বাইরে থাকত আজও, তাহলে কী খেত এখন টিকলি? ভাবতে গিয়ে থেমে যায়। অন্যদিন টিকলিকে সাথে করে নিয়ে যায় জরিনা। আজ তার উপর রাগ করে টিকলিকে রেখে গেছে। রাগ হলেই সে অমন করে, বাঁধা রুটিন।

ডিমের ঝোল আর আলু ভর্তার অর্ডার দেয় ছমির আলি। টিকলি খায়, ঝালে তার চোখ মুখ লাল হয়ে ওঠে, জিব বের করে সে ঝাল তাড়ানোর চেষ্টা করে, পানি খায় একটু পর পর। ছমির আলিও খেয়ে নেয়। সকালে না খাওয়ায় ভারি খিদে পায় তারও। টেবিলে ছড়িয়ে থাকা এঁটো প্লেট, ডালের দাগ, দু চারটে শাদা শাদা ভাত, মাছের কাঁটা ইত্যাকার দ্রব্যগুলোকে অগ্রাহ্য করে তারা বাপ-বেটি গোগ্রাসে গেলে ডিমের ঝোল দিয়ে মাখা প্রায় লাল হয়ে উঠা ভাতের এক একটি লোকমা। তাদের মাথার উপরে, টেবিলে, চারপাশে, কখনও কখনও ভাতের থালার উপরে ভনভন ওড়ে নীল, খয়েরি আর কালোর মিশেলের অদ্ভুত চোখের বড় বড় একেকটা মাছি। সেসব অগ্রাহ্য করেই খেয়ে নেয় তারা। টিকলি খাওয়া শেষ করে পানি খায় অনেকটা। তার ছোট্ট, চিলতে পেটটা ফুলে ঢোল হয়ে ওঠে। অদূরে রাখা বালতির পানি মগে নিয়ে সে হাত ধোয়, পরনের প্যান্টে মুছে নেয় হাত। প্যান্টটায় সাথে সাথে হলুদ রঙের ধ্যাবড়া ছোপ পড়ে যায়, ড্যাবড্যাব চোখ মেলে সে ছোপ তাকিয়ে থাকে জগৎ সংসারের সীমাহীন বৈপরীত্যের দিকে। টিকলি জিব অর্ধেক বের করে বড় বড় শ্বাস ফেলে। বড্ড ঝাল দেয় এরা। টাকা গুনে দিয়ে বেরিয়ে আসে ছমির আলি। টিকলিকে ঘরে পাঠিয়ে সে দোকানের পাশে রাখা বেঞ্চে বসে বিড়ি ধরায়। একবারে অনেকটা বাতাস সে চালান করে দেয় ফুসফুসে। খাক, ফুসফুস খুব করে ধোঁয়া খাক আজ। বড্ড খালি লাগছে জায়গাটা। ছমির আলি বোঝে না মূলত ফুসফুস নয় অন্য একটা জায়গায় শূন্যতা বাসা বেঁধেছে তার, তার নাম হৃৎপিণ্ড! পারুল যে এতদিনও ওখানে ছিল তার, ভ্যানচালক, অশিক্ষিত, মূর্খ ছমির আলি তা টের পায় নি তেমন করে আগে। সে ভাবত জরিনার নির্বুদ্ধিতাই তাকে বারবার স্মরণ করায় পারুলের মুখ। আজ দেখছে, না, শুধু তাই ই নয়, পারুল তার কোনো এক জায়গায় ছিল, ছিলই! সংগোপনে, চুপিচুপি পারুল বাস করেছে তার মধ্যে এতদিন। তবে কি তা টের পেয়েই জরিনা উঠতে বসতে অমন শাপ শাপান্ত করে পারুলকে! কী করে টের পেল সে, যা ছমির আলি নিজেও এতদিন বোঝে নি তেমন করে!

ছমির আলি চোখ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকে রাস্তার দিকে। ব্যস্ত রাস্তায় লোকজনের যাতায়াত, গাড়ির আসা যাওয়া দেখে আনমনে। বুকের মধ্যে পারুলের মুখটা মনে করে কেমন মুচড়ে ওঠে তার। ইচ্ছে করে হাউমাউ করে একবার কাঁদে। আহা! কি মিষ্টি দেখতে ছিল পারুল! পারুল আসলে শ্যামলাও ছিল না তো, ছিল কালো। কিন্তু মুখখানা ভারি মিষ্টি ছিল পারুলের। ছমির আলি তখন উনিশে পড়েছে মাত্র, পারুল পনেরোয়। ঐ বয়সে গাঁয়ের অনেক মেয়েরই বিয়ে হয়ে যায়, পারুলের জন্যও পাত্রের খোঁজ চলছিল এ গাঁয়ে সে গাঁয়ে। ছমির আলির সাথে এর মধ্যেই পারুলের বেশ ভাব হয়ে গেল কবে কবে। পারুলের সাথে দেখা করার জন্য, কথা বলার জন্য বুকের মধ্যে বড় আঁকু-পাঁকু করে বেচারা ছমির আলির। ছোট সে গ্রামের মধ্যে আড়াল কোথায়, আবডাল কোথায়, যেখানে দু দণ্ড শান্তিতে নিরিবিলি বসে কথা বলা যায়! পারুলও হাঁস-ফাঁস করে তার জন্য, বেশ বোঝে ছমির আলি। অনেক ভেবে চিন্তে একটা উপায় সে বের করে অতঃপর। গাঁয়ের বড় যে পুকুরটা আছে, মালিথা বাড়ির পুকুর, সে ‍পুকুরপাড়ে বেশ বড় একটা ঝোপ আছে, অনেক গাছগাছালি তাতে, অনেক ঘন ঝোপ। দিনের বেলাও অন্ধকার জমে থাকে সে ঝোপের মধ্যে। গা ছমছমে একটা ভয় এসে কেমন ভারি করে তোলে শরীর। ছমির আলি ঠিক করে এখন থেকে ঐ ঝোপের আড়ালে দেখা করবে তারা। পারুল রাজি হয় না প্রথমে। ভয় পায়। সে বলে ওখানে ভূত থাকে, যাবে না। অনেক বলে কয়ে হাতে পায়ে ধরে তবে তাকে রাজি করায় ছমির আলি।

বেশ চলছিল। ঝোপের আড়ালে বসে হৃদয়ের লেনাদেনা বেশ চলছিল ছমির আলি আর পারুলের। কিন্তু শুধু হৃদয়ের লেনাদেনা পানসে হয়ে গেল অচিরেই। জেগে উঠল শরীর। পারুল আপত্তি করলেও ছমির আলি অগ্রাহ্য করল পারলের সে দুর্বল প্রতিরোধ। প্রায় নিয়ম করেই এরপর ঝোপের আড়ালে মিলিত হয় তারা, গোপনে। কিন্তু গোপন কথাটি বেশিদিন আর গোপন থাকল না শেষে। একদিন ছমির আলি আর পারুলের নিভৃত আলাপ কোনো এক পথচারীর কানে এলো, সে কান পেতে শুনল ঝোপের ভেতরের মৃদু ফিসফাস। অতঃপর কৌতূহলে সন্তর্পণে ঢুকে পড়ল ঝোপের মধ্যে। আড়াল থেকে দেখে নিল অভিসার। সাবধানে ফিরে গিয়ে গাঁয়ের মোড়ল শ্রেণির লোকজন জড়ো করে ফিরে এলো সে।

বেঞ্চে বসে খাখা দুপুরের রৌদ্দুরের দিকে তাকিয়ে চোখে কেমন ঘোর লেগে যায় ছমির আলির। ভর দুপুরের রোদে শহরটাকে কেমন নৃত্যরত মনে হয়। মনে হয় গাড়ি, মানুষ, এমনকি বিল্ডিংগুলোও অদ্ভুত ছন্দ তুলে নাচে। চোখ রগড়ে আবার তাকায় ছমির আলি। মাথা ঝাঁকায় এপাশ ওপাশ। হাত দিয়ে জোরে থাবড়া দেয় মাথায়। আবার তাকায়। না, সব ঠিক আছে। পরনের লুঙ্গিটা একটু গুটিয়ে নিয়ে বেঞ্চে পা তুলে আয়েশ করে বসে সে। দোকানিকে বলে এক কাপ আদা চা দিতে। মাথাটা বড্ড ধরেছে। আজ আর সন্ধ্যের আগে বাসা মুখো হবে না সে। বাসায় গেলেই জরিনা তার পেটের ভাগাড়ে জমা সব গালি উগড়ে দেবে আজ। যত দেরিতে যাবে সে, জরিনা তত ক্লান্ত হবে, তারপর এক সময় ঘুমিয়ে পড়বে। জরিনা রাত জাগতে পারে না। সন্ধ্যের পরপরই ঘুমিয়ে পড়ে সে। রং চায়ের কোনা ভাঙা নোংরা কাপে চুমুক দিতে দিতে পারুল আর তার বিয়ের কথা ভাবে ছমির আলি।

গাঁয়ের লোকজন ছমির আলি আর পারুলকে ঝোপের মধ্যে অশোভন অবস্থায় আবিষ্কার করে যেন ভীষণ বড় কোনো দাঁও মেরে ফেলল সেদিন। তাদেরকে আটকে রাখা হলো গ্রামের মোড়লের কাচারি ঘরের কোণার রুমটাতে । সারাদিন সে রুমে আটক রইল তারা। প্রিয়, আরাধ্য মানুষটা, তার ছায়া, অবয়ব এমনকি নিঃশ্বাসও যে অমন অসহ্য জ্বালা ধরায় শরীরে ও মনে, সে কথা হয়তো কোনোদিন জানা হতো না ছমির আলির। সেদিন, সেই পুরো একটি দিন সে আর পারুল যখন আটক রইল ছোট্ট, দরজা-জানালা বাইরে থেকে বন্ধ প্রায়ান্ধকার সেই রুমটাতে, পারুলকে বড় অসহ্য ঠেকল সেদিন। তার দিকে ফিরে তাকাতে পর্যন্ত ইচ্ছে করল না ছমির আলির। পারুলও ভয়ে কাঠ হয়ে বসে রইল দূরে। থেকে থেকে তার মৃদু ফোঁপানির আওয়াজ শুনল ছমির আলি। তার নিজের মনে তখন একই সাথে লজ্জা, ভয়, ক্ষোভ, অনিশ্চয়তা আর হতাশা মিলে অদ্ভুত এক নিস্পৃহতা দানা বেঁধেছে। পারুলকে সেদিন মনে হলো তার জীবনে আসা মস্ত এক অভিশাপ। পারুলের কান্নার শব্দ, তার ভারি দীর্ঘশ্বাস, ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠা সেই কিশোরী পেলব শরীর, ছমির আলির কাছে তখন তা সাক্ষাৎ এক ত্রাস। সে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল পাথরের মতো অনড়, অবিচল। পারুল তার মনোভাব বুঝল হয়তো। সেও দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে রইল কোনো কথা না বলে। ভয়ে, লজ্জায়, কি হবে, সে ভাবনায় মুখখানা শুকিয়ে আরও কালো, আরও ছোট হয়ে গেল তার।

বাইরে জোর শোরগোল, কানাঘুষা আর হাসির শব্দ শোনা গেল দিনভর। সন্ধ্যায় খুলে গেল রুমের দরজা। হাজির করা হলো ছমির আলি আর পারুলের বাপ-মাকে। অপমানে, লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়া দুটি পরিবারকে এক গ্রাম লোকের সামনে উপস্থিত করে তাদেরকে বাক্যবাণে বিদ্ধ করা হলো, সমস্ত  গ্রাম তাদের মুখের উপর থুতু ছেটাল, কেননা তারা তাদের সন্তানদের মানুষ করতে পারে নি, ছমির আলি আর পারুলের এ পদস্খলন গ্রামের উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েদের উপর কু প্রভাব ফেলবে। আর এ সব তাদেরই দোষ, যেহেতু সন্তানদের নৈতিক শিক্ষাদানে ভীষণভাবে ব্যর্থ হয়েছে তারা। তাদের অপমানিত, ব্যথিত, লজ্জিত মুখের সামনে, তাদের হেঁট হয়ে যাওয়া মাথার সামনে দাঁড়িয়ে, আঙুল তুলে তুলে এসব ভরি ভারি বাক্যগুলো গ্রামের মাতবর শ্রেণির লোকগুলো বয়ান করল, ধারাবাহিকভাবে। তারপর ঘোষণা দেয়া হলো মোল্লা ডেকে ছমির আলি আর পারুলের কবুল পড়ানো হবে, আজ, এক্ষুণি। প্রতিবাদ করার সাহস বা পরিস্থিতি কোনোটাই নয় তখন। এরচেয়ে ভালো কোনো সমাধান আদতে ছিলও না সে মুহূর্তে।

বিকেল গড়িয়ে আসে। রোদ মরে যায়। ছমির আলির আর বসে থাকতে ইচ্ছে করে না। কোমড় ব্যথা করে তার। শরীর বিছানা চায়। সে চা আর বিড়ির দাম মিটিয়ে ওঠে পড়ে। কোথায় যাবে? বাসায় এতক্ষণে জরিনা এসে গেছে। এখন বাসায় যাওয়া মানে তার মুখে ঝড় শুরু হওয়া। আজ আর ওসব সহ্য হবে না ছমির আলির। সে রাস্তা পার হয়ে কাছের প্রাইমারি স্কুলের খোলা মাঠটায় ঢোকে। ছেলেমেয়েরা এই শেষ বিকেলে খেলতে লেগেছে। তাদের শোরগোলে কান পাতা দায়। ছমির আলি কোণার দিকের খালি একচিলতে জায়গা দেখে শুয়ে পড়ে। বুকটা হু হু করে তার। পারুলও নিশ্চয়ই শুয়েছে এতক্ষণে! সেই ভোররাতে মরেছে, এতক্ষণ কি আর মাটি হয়ে যায় নি তার! কারও জন্য তো অপেক্ষায় থাকে নি, থাকার কথা নয় পারুলের মরদেহের, যেখানে জীবিতাবস্থায়ই কখনও কারও অপেক্ষায় ছিল না পারুল! কিন্তু সত্যিই কি ছিল না? সত্যিই কি কোনোদিন সে অপেক্ষায় ছিল না এই হতভাগ্য, নির্বোধ ছমির আলির? নইলে সে কেন জুয়েলকে আগলেই বাঁচতে চাইল শুধু? কেন সে জুয়েলকে ছমির আলির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে শুরু করল না নতুন জীবন? মা! পারুল মাতৃত্বের কাছে হেরে গেল! শুধু ছমির আলিই পিতৃত্বের টান অনুভব করে নি, অন্তত তখন করে নি। জুয়েলের কচি মুখটা মনে করার চেষ্টা করে ছমির আলি। মনে পড়ে না তেমন। কেমন ঝাপসা একটা অবয়ব এক মুহূর্তের জন্য মনের আয়নায় উঁকি দিয়েই আবার কোথায় মিলিয়ে যায়। বুকের মধ্যে কেমন টনটন করে তার।

সে রাতে মোল্লা ডেকে বিয়ে পড়িয়ে পারুলকে ছমির আলির বাড়িতে তুলে দিয়ে তবে গাঁ সুদ্ধ লোক বিদায় নেয়। ঘোরতর অনাচার থেকে সমাজকে রক্ষা করতে পারার বিজয়োল্লাস নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যায় গ্রামের মানুষ। কিন্তু ছমির আলির পরিবার আর পারুলের পরিবারের চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়ে যায় সে রাতে। ছমির আলির বুড়ো বাপ অপমানে, লজ্জায় সারা রাত বসে থাকে ঘরের দাওয়ায়। ছমিরের মা পারুলকে জ্যান্ত এক ডাইনি আখ্যা দিয়ে সারারাত বিলাপ করে, কান ঝালাপালা করে তোলে বাড়ির সবার, পাড়া-প্রতিবেশিদের। পারুল আর ছমির আলি একই ঘরে, একই বিছানার দু প্রান্তে দুজন শুয়ে থাকে, নির্ঘুম, নিশ্চুপ। পারুলের পরিবার ঘরের কোণায় মুখ লুকোয় লজ্জায়, অপমানে।

কদিন গেলে সহজ স্বাভাবিক হয়ে আসে পুরো গ্রাম। শুধু পারুলের প্রতি স্বাভাবিক হতে পারে না ছমির আলি আর তার পরিবার। সে দিনের সে ঘটনার পর থেকে পারুলের প্রতি তীব্র অনাসক্তি টের পায় ছমির আলি নিজের ভেতর। পারুল আর টানে না তাকে। পারুলও যেন ছমির আলিকে কেমন এড়িয়েই চলতে চায় ইদানীং! অদ্ভুত! তবু শেষ পর্যন্ত হয়তো স্বাভাবিক সুর বাজতে পারত তাদের সম্পর্কে। বাদ সাধল ছমির আলির বাপ-মা। বিশেষত ছমির আলির মা। সে কোনোমতেই পারুলকে মেনে নিতে রাজি নয়। তার বদ্ধমূল বিশ্বাস পারুল অভিশপ্ত, ডাইনি! সে তার আলাভোলা ছেলেটাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে সর্বনাশ করেছে।


পারুলকে তালাক দিতে পেরে বরং হাঁফ ছেড়ে বাঁচে ছমির আলি।


ছমির আলির মনেও কি তার মার এ ভাবনা ছায়া ফেলে! নইলে পারুলকে অত অসহ্য কেন লাগে তার! যে পারুলকে একটু কাছে পাওয়ার জন্য ছটফটিয়ে মরত সে, জলজ্যান্ত সে পারুলকে সারারাত পাশে পেয়েও কেন সে ফিরেও তাকায় না? কেন সে পারুলের স্পর্শও এড়িয়ে যেতে চায় সচেতনভাবেই! পারুলের বাপ-মা গাঁয়ের মাতবর গোছের লোকজনকে হাত করে, পারুলকে বিয়ের ক মাস যেতে না যেতেই বাড়ি থেকে বের করে দেয়, ছমির আলিকে দিয়ে সই করিয়ে নেয় তালাকনামায়। সেজন্য অবশ্য তেমন কোনো কষ্ট করতে হয় নি তাদের। পারুলকে তালাক দিতে পেরে বরং হাঁফ ছেড়ে বাঁচে ছমির আলি। অনেক বড় একটা বোঝা ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে পেরে খুব নির্ভার বোধ করে সে। পারুল তখন ছ মাসের পোয়াতি! এত বড় অন্যায়টা ছমির আলির বাপের জোড়া গরু বিক্রি করা টাকার জোরে দিব্যি চোখে ঠুলি পড়ে হজম করে নেয় সমাজের মাতবর গোছের লোকেরা, ইতঃপূর্বে যারা সমাজ উদ্ধারে জান প্রাণ সঁপে দিয়েছিল । পারুল ফিরে যায় তার সহায় সম্বলহীন বাপের ঘরে, বিনা প্রতিবাদে।

কী করে মরল পারুল? কী হয়েছিল তার? ভাবনাটা মাথার মধ্যে উঁকি দিয়েই পুনরায় হারিয়ে যায়। কী হবে ওসব জেনে! তালাক দেয়ার পর পারুলের প্রতি সেই হারানো টানটা একটু একটু করে ফিরেছিল ছমির আলির। পারুলেরও কি? জানা হয় নি। জানার আর কোনো উপায় ছিল না, রাখে নি ছমির আলির বাপ-মা। অল্পদিনের মধ্যেই ছেলেকে বিয়ে করিয়ে আনল তারা। আর তারপর থেকেই জরিনার মা-চণ্ডিমূর্তিতে অভ্যস্ত হয়ে গেল ছমির আলিও। পারুলের ছেলে, ছমির আলিরও ছেলে বটে সে, জুয়েল, জন্মানোর পর তার মুখটাও ইচ্ছে করে দেখা হয় নি তার, নেহাত চলতি পথে কখনও দেখা না হয়ে গেলে। তার মুখটা ঝট করে উঁকি দেয় আবার ছমির আলির মনে। ছেলেটার মুখে যেন ছমির আলির মুখটাই বসিয়ে দিয়েছে কেউ! মনে হতেই বুকের ভেতরটা পুড়ে যেতে চায় ছমির! আহারে! আহারে!… ডুকরে ওঠে ছমির আলি।

খেলা শেষে যে যার ঘরে ফিরে গেছে শিশুরা। রাত নেমে এসেছে কখন। শূন্য মাঠের শিশির ভেজা ঘাসের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে ছমির আলি তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। আকাশ ভর্তি তারা। পারুল কি এতক্ষণে চলে গেছে ওখানে? কোন তারাটা হয়ে গেছে সে? আতিপাতি খুঁজতে থাকে ছমির আলি। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

রাত গাঢ় হলে নিঃশব্দে ঘরের দিকে পা বাড়ায় ছমির আলি। জরিনা এতক্ষণে ঘুমিয়েছে নিশ্চিত, টিকলিও। আজ রাতে আর কোনো কটুবাক্য শুনতে হবে না তাকে, ভেবে ভারি স্বস্তি পায় সে। সন্তর্পণে ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই চমকে ওঠে ভূত দেখার মতো। জরিনা! চোখে আগুন নিয়ে তাকিয়ে আছে ছমির আলির দিকে। বাঘিনীর জ্বলজ্বলে, হিংস্র চোখে তাকিয়ে থাকে সে। তারপর সাপের মতো হিসহিসে, শীতল স্বরে সে প্রশ্ন করে—কই আছিলা সারাদিন?

ছমির আলির ভারি ক্লান্ত লাগে হঠাৎ। অবসন্ন, মিইয়ে যাওয়া গলায় সে উত্তর দেয়—বাইরে।

জরিনা পলকহীন তাকিয়ে থাকে তার দিকে। অন্তর্ভেদী সে দৃষ্টির সামনে কুঁকড়ে যায় ছমির আলি, অস্বস্তিতে নামিয়ে নেয় চোখ। আড়াল খোঁজে সে। না পেয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে ঘরের মধ্যে। আসামির মতো মাথা নিচু করে সে চুপচাপ অপেক্ষা করে জরিনার খিস্তি শুরুর। জরিনা তাকিয়ে থাকে, তার চোখ জ্বলে, নাকের পাটা ফুলে ওঠে, ঠোঁট তিরতির কাঁপে। তারপর হঠাৎ কী হয় তার—মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয় । কাঁপা কাঁপা, ভেজা গলায় বলে ওঠে—সকালে দ্যাশে য্যায়া ছাওয়ালডাক নিয়াস পা!

চমকে ওঠে বেকুবের মতো ড্যাবডেবে চোখে অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকে ছমির আলি। মুখে কোনো কথা ফোটে না তার। মনে হয় ভুল শুনেছে সে। নিশ্চয়ই অন্যকিছু বলছে জরিনা! সে তাই বিস্মিত, হতভম্ব মুখে প্রশ্ন করে—কী কও?

একই কথা স্পষ্ট, ভেজাকণ্ঠে আবার বলে জরিনা। এবার তার কণ্ঠ আরও জোরাল শোনায়। ছমির আলি অদ্ভুত, অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে জরিনার দিকে। এই জরিনাকে চেনে না সে। তার মনে হয় সামনে বসে থাকা ঐ নারী, সে জরিনা নয়, পারুল! মুহূর্তে তীব্র ভাঙচুর টের পায় ছমির আলি নিজের ভেতর। সে ছুটে যায়! সমস্ত ভুলে গিয়ে জরিনাকে জড়িয়ে ধরে সে হাহাকার করে ওঠে—পারু! পারু!

পারুলের শীতল, কাফনে মোড়া শরীর ততক্ষণে অনেক দূরের অন্ধকার কোনো এক গ্রামের কবরে মাটিতে মিশে যাওয়ার প্রহর গোনে। ছমির আলির হাহাকার বাতাসের কানে প্রতিধ্বনি তুলে শূন্যে মিলিয়ে যায়। হেমন্তের হাওয়ায় বেজে উঠে তীব্র সে সুর। ছমির আলির কানে একটি শব্দ এসে আছড়ে পড়ে বারবার—পারু! পারু!

শিল্পী নাজনীন

শিল্পী নাজনীন

জন্ম ১৪ জুলাই, ১৯৮১; কুষ্টিয়া। কবি, কথাচিত্রী।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই :
ছিন্নডানার ফড়িঙ [উপন্যাস, কাা বুকস, ২০১৬]
আদম গন্দম ও অন্যান্য [গল্পগ্রন্থ, ছিন্নপত্র প্রকাশনী, ২০১৭]
তোতন তোতন ডাক পাড়ি [শিশুতোষ গল্প, ছিন্নপত্র প্রকাশনী, ২০১৭]

ই-মেইল : 81naznin@gmail.com
শিল্পী নাজনীন