হোম গদ্য গল্প তার সাথে

তার সাথে

তার সাথে
649
0

আমি তখনই জানতাম, আমার জীবন দুঃখময় হবে। কোনো এক ওষুধকোম্পানির রাইটিং প্যাডে এই এক লাইন লিখার পরে সে থমকে যায়, আড়ষ্ট হয়ে যায় তার কলম।

সে গল্প বা কবিতা লিখে নি কখনও। কাগজ-কলমে কাউকে চিঠি লিখার সুযোগও খুব একটা ঘটে নি তার বেলায়। সে যে বিজ্ঞাপনসংস্থায় কাজ করে সেখানে বিজ্ঞাপনচিত্র তৈরির জন্য তাকে স্ক্রিপ্ট লিখতে হয় না। প্রোডাকশন লাইনে ম্যানেজার হিসেবে সে কাজ করে। সেখানে লেখালিখি তার ক্ষেত্রে মোটেই কোনো অভ্যস্ত কাজ নয়। সেজন্যই হয়তো সে গল্পটা গুছিয়ে ভাবতে পারে না, লিখতেও পারে না ঠিক মতো।

মিনিট পনের সময় নিয়ে, ভেবেটেবে তারপর সে পরের লাইনগুলো লিখতে পারে :

ছোট ছোট লাল কাঁকড়ার দল তাদের ডেরার আশপাশ দিয়ে নির্জন বালুকাবেলায় আল্পনা রচনা করেছিল। পা’র চাপ পড়ে যেন কাঁকড়াদের জ্যামিতিক শিল্প নষ্ট না-হয়ে যায় সেজন্য সে সাবধানে পা ফেলে ফেলে সাগরের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। তখন সন্ধ্যা, জোয়ারের সময়। ফুলপ্যান্টটাকে হাঁটুর ওপরে গুটিয়ে সে দাঁড়িয়েছিল চুপচাপ জলের ভেতরে।


পরস্পরের ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছিলাম; চুমু খাচ্ছিলাম ছোট ছোট। আমরা পরস্পর পরস্পরের প্রেম হয়েছিলাম সেদিনেও।


সুন্দর একজন মেয়ে বালুকাবেলা ধরে তাকে অতিক্রম করে উত্তরে হেঁটে যাচ্ছিল। তার একটু আগেই সৈকত-সংলগ্ন একটা জুবুথুবু দোকানে চা খেতে গিয়ে মেয়েটার বিষণ্ন দু’টো চোখ দেখেছিল সে। বেশ দূরে যাওয়ার পরে থেমে গিয়েছিল মেয়েটা এবং জোয়ারের জলে পা ডুবিয়ে আনমনে সে সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়েছিল। সূর্যাস্তের লাল আভার সৌন্দর্য সে দেখছিল কিনা চোখ ভরে তা ছেলেটা জানে নি। তার কেবল মনে হচ্ছিল, মেয়েটার বিষণ্নতায় যেন মুখ ভার করে নিভে যাচ্ছে লাল সূর্যটা, চারদিকে নামছে অন্ধকার—সুন্দর মেয়ের বিষণ্ন চোখের মতো। ছেলেটা তখনই জেনেছিল, তার জীবন দুঃখময় হবে। হয়তো মেয়েটার প্রগাঢ় বিষণ্নতা অজানিতেই ছুঁয়ে গিয়েছিল তার হৃদয়। সে তো জানতই যে মানুষের বিষণ্নতা আত্মীয় খুঁজে বেড়ায়। তা না-পেলে হয়ে মানুষ ওঠে আত্মহন্তারক।

আমি তখনই জানতাম, আমার জীবন দুঃখময় হবে—এ লাইনটা দিয়ে নতুন একটা প্যারাগ্রাফ শুরু করার পরে আর লেখা এগোয় না। তখন সে তার টেবিলের ওপরে রাইটিং প্যাড আর কলমটা রেখে অন্ধকার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। তার মনে হয়, যেন দশ বছর আগে টেকনাফের সৈকতে রচিত সেই ছবিটা সে দেখতে পাচ্ছে এই ক্ষণেও : অস্তগামী সূর্যের ম্রিয়মাণ লাল রং গলে গলে ঢুকে পড়ছে তার নিজের শরীরে, তৈরি করছে অদ্ভুত এক প্রশান্তি—মৃত্যুর মতোই গভীর। তখন উত্তরে ফের তাকালে সে দেখতে পায়, বালুকাবেলা ধরে দূর থেকে তার দিকেই হেঁটে আসছে মেয়েটা। মেয়েটার সাথে তখন সে উপযাজক হয়েই আলাপ করে। সে ভাবে, মানুষের সাথে কেন দেখা হয় মানুষের? মানুষ কেন বারবার দাঁড়ায় অপরের মুখোমুখি—প্রেমে, অবহেলায়, ঘৃণায়? ছেলেটা তা বুঝতে পারে নি কোনোদিন। তখনও সে তা বুঝতে ব্যর্থ হয়।

বালুকাবেলায় বসে বসে সেদিন সন্ধ্যায় এটা-ওটা নিয়ে গল্প করেছিল তারা। জোয়ারের জল দূর থেকে দমকে দমকে ধেয়ে আসছিল তাদের পা’র কাছে। আর তারা তাদের স্যান্ডেল হাতে নিয়ে জল থেকে পিছিয়ে বসছিল বারবার। ব্যাপারটা জলের সাথে মজার একটা খেলাতে পরিণত হয়েছিল তখন।

এভাবে টেকনাফে রাত নামলে আরও নির্জন হয়ে পড়েছিল জায়গাটা। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা ভেবে তখন তারা কক্সবাজার-শহরে ফিরে যাওয়ার জন্য বাসে উঠেছিল।

সে যে ফ্লাটটাতে ভাড়া থাকে, এই মুহূর্তে, সেই ফ্লাটটার বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সে একটা সিগারেট টানছে এবং সে তার মাথার ভেতরে সাজাতে চেষ্টা করছে গল্পটার পরবর্তী লাইনগুলো। তারপর সে ফিরে আসছে তার নিজের ঘরটায়। শ্যাওরাপাড়ায় আট শ স্কোয়ার ফিটের এই ছোট্ট ফ্লাটটাতে সে ছাড়া আর কেউ থাকে না এখন। একদা পাশের ঘরটায় তার পুত্র থাকত। সেই তরুণ পড়তে চলে গেছে কোনো এক দূরশহরে। ড্রইং-কাম-ডাইনিংও প্রায় শূন্য—বেতের সোফা, পুরনো টেলিভিশন এবং ছোট একটা ডাইনিং টেবিল ছাড়া সেখানে আর কিছু নেই। রান্নাঘরটা গোছানো। প্রতিরাতে খাওয়ার পরে সে নিজেই ধুয়ে রাখে ব্যবহৃত প্লেট-বর্তন। তার নিজের ঘরটা আকারে ছোট। ঘরটায় বসানো আছে অপ্রশস্ত একটা বিছানা, চেস্ট অফ ড্রয়ার্স আর ছোট একটা টেবিল। সেই টেবিলে বসে ফ্লোরেসেন্ট বাতির উজ্জ্বল আলোতে সে আবার লিখতে বসে :

আমার নাম বাচ্চু। বয়স পাঁচপান্নো। গ্রাম : পাতুয়াইর, উনিয়ন : মাইজখাপন, থানা : কিশোরগজ্ঞ সদর। জায়গাটা নীলগজ্ঞ রেলস্টেশনের খুব কাছে। আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে আমার প্রিয় ফুলেশ্বরী নদী। আমার কৈশোরেই আমার পিতা-মাতা দু’জনেই গত হয়েছেন। মালিবাগে মামা’র বাড়িতে বড় হয়েছি আমি; পড়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগে। আমি কিঞ্চিৎ হাইপারটেন্সিভ। হৃৎরোগ ইনিস্টিটিউটের এক ডাক্তার আমাকে বলেছে, যাদের জীবন জটিল হয়ে যায় তাদের শরীরের রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। শরীর নামের সিস্টেম কোনো জটিলতা পছন্দ করে না, মানুষ নিজেও তা পছন্দ করে না হয়তো।

একটু আগে যে মেয়েটার কথা লিখছিলাম, তার নাম চম্পক। ইন্টারনেটে সার্চ করে আমি দেখেছি, চম্পক একটা রাগের নাম, ফুলের নামও বটে। এখন থেকে দশ বছর আগে তারা শান্তিবাগে থাকত। চম্পকের সাথে যখন আমার দেখা হয় তখন তার বয়স কেবল তিরিশ পেরিয়েছে। নিরাপদ জলের বিধান সংক্রান্ত একটা এনজিও-ও সাথে সে জড়িত ছিল। গোটা চারেক বিজ্ঞাপনচিত্র তৈরির কাজে আমাকে কক্সবাজার-এলাকাতে থাকতে হচ্ছিল সেই সময়টায়। সারা দিন বিজ্ঞাপনচিত্রের শুটিংয়ের কাজে ব্যস্ত থাকছিলাম আমি। তখন এক কর্মহীন দিনে নির্জন টেকনাফের সাগরবেলায় সুন্দর মেয়ের সাথে পরিচয় ঘটেছিল আমার।

এটুকু লিখার পরে আর কোনো শব্দই কাগজে প্রকাশিত হয় না। শব্দগুলো সব আটকে বসে আছে কোথাও। কাজেই পরবর্তী বাক্যের প্রত্যাশায় ডান হাতের আঙুলগুলোর ফাঁকে বলপয়েন্ট কলমটাকে নাচাতে থাকে বাচ্চু। সে দেখেছে, তার একজন কবিবন্ধু এভাবেই আটকে যাওয়া লেখার জট ছোটায়। মজার ব্যাপার হলো, এভাবে একসময় জটও ছুটে যায় বাচ্চুর কলমের। স্মৃতি থেকে বাচ্চু আবার লিখতে বসে তখন :

সেদিন টেকনাফ থেকে চম্পক আর আমি বাসে চেপে কক্সবাজার-শহরে ফিরেছিলাম। হাওয়াবদলে গিয়ে কক্সবাজার-শহরের কলাতলিতে জনৈক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছিল চম্পক আর তার দুই বন্ধু। আমাদের অফিসের প্রডাকশন ইউনিটের সাথে আমি থাকছিলাম সুগন্ধা-পয়েন্টের কাছের মাঝারি মানের একটা হোটেলে। কক্সবাজার-শহরটা খুব ছোট বলেই চম্পকদের সাথে বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট বা রাস্তায় প্রায়শই দেখা হয়ে যাচ্ছিল আমার। লাগাতার শুটিংয়ের ফাঁকে আমরা দু’জন একবার কক্সবাজারের সৈকতে সূর্যাস্ত দেখতেও গিয়েছিলাম; সূর্যাস্তের পরেও অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আমরা ভরাকোটালের সাগরের কুলকুল আওয়াজ শুনেছিলাম। আমাদের দু’জনের মাঝে তখন মূলত নৈঃশব্দ্যই জেগে ছিল অনড় হয়ে। নৈঃশব্দ্য জন্ম দিয়েছিল অজস্র না-বলা কথার। সেসব কথারা আমাদেরকে প্রলুব্ধ করেছিল নিভৃতে দু’দণ্ড সময় কাটানোর জন্য। তাই আমার হোটেলের রুমে গল্প করতে গিয়েছিলাম আমরা।

একগাদা চিনি মেশানো চা খেতে খেতে সেদিন অপরিসর ঘরটার সোফায় বসে থাকা চম্পককে আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম তাকে এত বিষণ্ন দেখায় কেন। ভীষণ রূঢ় ভঙ্গিতে চম্পক আমাকে বলেছিল, তার বিষণ্নতার কারণ নিয়ে আলোচনায় সে মোটেই আগ্রহী নয়। আমার মতো মধ্যচল্লিশের একজন পুরুষের বিবাহবিচ্ছেদ বা বিবাহবিচ্ছেদ-পরবর্তী নারীসঙ্গের গল্প শোনার কোনো প্রয়োজনও নেই তার। তথ্য হিসেবে এসবের বয়ান অবশ্য ঠিকই আছে।

চম্পকের ঘোষণা শুনে আমি বরঞ্চ স্বস্তিই বোধ করি। চম্পক বলেছিল, তবে একজন শিশুর মনঃস্তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। মা ছাড়া চলতে নিশ্চয় তার খুব কষ্ট হয়! হয়তো চলে যাওয়ার সময় মা তার ছেলেকে সাথে নিয়ে গেলেই ভালো করতেন! এভাবে আমার ছেলে কুশলকে নিয়ে আমরা যখন কথা বলছিলাম তখন একসময় আমি দেখতে পাই, চম্পকের চোখ জলে টলমল করছে। সে ধরা গলায় আমাকে বলছে—শিশুদের কষ্ট সহ্য করাটা কঠিন কাজ!

তারপর আমাদের ভেতরে আবারও মূর্ত হয় নৈঃশব্দ্য। তখন হঠাৎ করে আমি আবেগে আপ্লুত হই, বিষণ্নতার ঘোরেই হবে হয়তো এবং আমি চম্পককে বলে বসি—আপনার সাথে হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না আমার! তবে একটা কিছু থাকুক দু’জন মানুষের সংযোগের স্মৃতি হয়ে। এবং আমি চম্পকের ঠোঁটে চুমু খাওয়ার ইচ্ছে ব্যক্ত করি।

আমার ইচ্ছের কথা শুনে মেয়েটার হালকা বাদামি চোখে নিমিষে জ্বলে ওঠে খরতা। সে আমাকে বলে, ‘এটা কিন্তু অন্যায় আবদার আপনার! কথাটা আপনি উচ্চারণ না-করলেও পারতেন!’ এমন কঠিন মন্তব্য শোনার পরে চরম অস্বস্তিতে বিছানা থেকে ছিটকে উঠে যাই আমি। নিজেকে শাপশাপান্ত করতে করতে বারান্দায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট খাই। আমি কামনা করি, চম্পক যেন আমার ঘর ছেড়ে চলে যায়; মুক্তি দেয় আমাকে ভয়ানক অস্বস্তি থেকে!

সিগারেট শেষ করে ঘরে ফিরে দেখি, সোফাতে ঠিক একই ভঙ্গিতে বসে আছে চম্পক। তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আমার শরীরের ভেতরে ঘন হয়ে আসে চম্পক এবং আমার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে সে আলতো করে চুমু খায়। আমি মনে করতে পারি না যে কতক্ষণ সময় অতিক্রান্ত হয়েছিল তখন। চম্পকের চুমুর কতটুকু উত্তর আমি দিয়েছিলাম সেদিন তাও আর স্মরণ হয় না আমার। এটুকু কেবল আমার মনে আছে, চম্পকের পাতলা ঠোঁট থেকে কিছুতেই বিযুক্ত হতে চাই নি আমি কেননা তেমন মায়াময় স্পর্শ তার আগে আমি পাই নি কোথাও—প্রাক্তন স্ত্রী’র কাছ থেকে নয়, আমার প্রেমিকাদের কাছ থেকেও নয়। এতই অসাধারণ ছিল চম্পকের গভীর আর অগভীর চুম্বনগুলো! একথা মানতেই হবে যে চুমুপর্বের এক পর্যায়ে শারীরিক ঘোর তৈরি হয়েছিল আমাদের দু’জনেরই ভেতরে, পরিবর্তিত হয়েছিল চুম্বনের ভাষা, শ্বাস-প্রশ্বাস প্রগাঢ় হয়ে উঠেছিল দু’জনেরই। তখন আমার আলিঙ্গন থেকে বেরিয়ে গিয়ে চম্পক বলেছিল—থাক! এর বেশি নয়! এবং সে ফের সোফায় বসেছিল মাথা নিচু করে।

পরদিন চম্পক আর তার বন্ধুদের সাথে কোনো একটা রেস্টুরেন্টে আমি রাতের খাবার খেয়েছিলাম। তারপর চম্পক আর আমি কফি খেয়েছিলাম আমার রুমে বসে। বিছানায় মাথা রাখার বোর্ডে হেলান দিয়ে মহেশখালি-ভ্রমণের গল্প করছিল চম্পক। এক সময়ে আমি সোফা থেকে উঠে গিয়ে তার কোলে গুটিশুটি মেরে শুয়েছিলাম। চুপ করে টিভির খবরে চোখ রেখেছিলাম আমি। আমার চুলে ধীরে ধীরে বিলি কেটে দিচ্ছিল চম্পক। আমার উদ্যোগেই চুমু-বিনিময়ও ঘটেছিল তখন। হয়তো সত্যিই চম্পক মায়ায় পড়েছিল আমার! আর আমার কী হলো—চম্পকের আদর আমাকে ঘিরে ধরল আষ্টেপৃষ্ঠে, যেমন করে সাগরের বুকে কোনো নৌকাকে আচমকা পেঁচিয়ে নেয় ঘন কুয়াশা। চম্পকও পেঁচাল আমাকে তেমন করে। তখন বিবশ হয়ে গেলাম আমি।

দিনদুয়েক পরের সন্ধ্যায় উখিয়াতে শুটিং শেষ করে কক্সবাজার-শহরে ফিরেছিলাম আমি যথারীতি; ফোন করেছিলাম আমি চম্পককে। কলাতলি থেকে চম্পক রিকশায় চেপে সুগন্ধা-পয়েন্টে এলে আমরা দু’জনে একটা রেস্টুরেন্টে বসেছিলাম; খেয়েছিলাম রূপচান্দার দো-পেঁয়াজা আর ভাত। তারপর আমরা সৈকত ধরে একটু হাঁটাহাঁটি করে বসেছিলাম গিয়ে আমার হোটলের রুমে। সোফায় পাশাপাশি বসে টিভিতে খবর দেখছিলাম আমরা আর গল্প করছিলাম। সারাটা ক্ষণ আমার হাতের আঙুলগুলো তার হাতের আঙুল দিয়ে স্পর্শ করছিল চম্পক। আর আমরা থেকে থেকে পরস্পরের ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছিলাম; চুমু খাচ্ছিলাম ছোট ছোট। আমরা পরস্পর পরস্পরের প্রেম হয়েছিলাম সেদিনেও।


কেন মানুষকে অধিকার করতে চান? ভালোবাসা কি অধিকারের বিষয়?


আমি তখনই জানতাম, চম্পকের চুমুগুলোই শেষপর্যন্ত আমার জীবনের শেষ্ঠ চুম্বন হবে কেননা তার চুমু থেকে ঝরে ঝরে পড়ছিল গভীর মমতা। আমার মনে হচ্ছিল, হয়তো আমি আর কোনো মেয়ের ঠোঁটে চুমু খেতে পারব না কোনোদিন, কোনো মেয়েকে আমি আমার অধর স্পর্শ করার অনুমতিও হয়তো দিতে পারব না।

সেই প্রথম আমি অনুধাবন করি, এই পৃথিবীর সকল মানুষই তাদের হৃদয়ে সমানভাবে মায়ামমতা ধরে না। এটা তাদের দোষ বলে বিবেচনা করার সুযোগ নেই অবশ্য। আর তাছাড়া মায়ামমতা, আদর—এসব লেনদেনের ক্ষেত্রে সকলেই যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারবে—এমনটাও নয়! চম্পক এখানেই অতুলনীয়।

চম্পক আর আমার ঘনিষ্ঠতার আর কোনো গল্প বলতে বাকি নেই। তার পরদিনই চম্পক ফিরে গিয়েছিল ঢাকায়, আমি ফিরেছিলাম আরও পরে।

অনেকক্ষণ ধরে টেবিলে বসে লিখতে লিখতে এবার ক্লাক্তি লাগে বাচ্চুর। তাই সে টেবিল থেকে উঠে গিয়ে বিছানায় উপুর হয়ে শোয়। তার সামনে খুলে রাখা রাইটিং প্যাডটায় সে লিখে :

এবং সত্যিই আমার জীবন দুঃখময় হয়েছিল। কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফিরে আসার পরেও চম্পকের মায়ামমতার কথা আমি ভুলতে পারছিলাম না কিছুতেই। হয়তো এইই হয় : প্রকৃতি কেবল চায়, নারী আর পুরুষ পরস্পরের কাছে আসুক—আত্মার, দেহের। হয়তো এক সেকেন্ড পাশাপাশি হাঁটবে তারা, হয়তো দশ মিনিট তারা তেষ্টোবে পরস্পরের ছায়ায়, হয়তোবা পাশাপাশি তাদের একযুগ কাটবে মমতায় বা অভ্যেসে। তারপর তারা আবার ছিটকে যাবে পৃথিবীর পথে কোথাও। বিচিত্র নয় যে তারা কেউ কেউ হয়তো একসাথে থেকে যেতে পারবে সারাজীবন। সম্পর্কের ফলাফল যেটাই হোক না কেন মিথস্ক্রিয়াই লক্ষ্য এখানে। এর বেশি কিছু হিসেব হয়তো প্রকৃতির কাছে নেই। নিজের মনকে এমন একটা নৈর্ব্যক্তিক যুক্তি দিতে চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম অবিরত। আমি যে শূন্যতার ভেতরে বসবাস করছিলাম সেখানে বস্তুতপক্ষে এমন কোনো যুক্তির অবকাশ ছিল না একফোঁটাও।

চম্পকের সাথে স্বল্পমেয়াদী সখ্যের পরে রুকসানা নামের জনৈক যুবতীর সাথে ফেসবুকে চ্যাট জমে ওঠে আমার। প্রোফাইল দেখে বুঝতে পারা গিয়েছিল যে রুকসানার চেহারাসুরত এবং শরীর দুইই খুব সুন্দর। সেই জন্যই নিশ্চয় আমি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকব। কিছুদিন পরে সামনাসামনি দেখা করার বিষয়ে আমি তাকে প্রলুব্ধও করি। আমার আগ্রহেই তখন সেই বন্ধুত্ব গড়ায় বেশ গভীরে। আমি লক্ষ করে দেখি, শৃঙ্গারকালে রুকসানার ঠোঁটে আমি চুমু দিতে পারছি না। এমনকি আমি রুকসানার আবেগঘন চুমুও এড়িয়ে যেতে চাইছি—আমি আমার ঠোঁট সরিয়ে নিচ্ছি দূরে বারবার। সঙ্গমের উত্তুঙ্গ মুহূর্তে আমি ফের রুকসানার ঠোঁটে যখন চুমু খেতে যাই তখন সেই চুমু বড় বিস্বাদ লাগে আমার কাছে।

রুকসানার ক্ষেত্রে আমার শিথিলতা আবিষ্কার করার পরে আমি রীতিমতো ভরকে যাই! চম্পকের প্রতি মোহ যদি আমাকে এভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে তবে তো বরবাদ হয়ে যাবে আমার যৌনজীবন! আমার আশঙ্কাই সত্য হয়েছিল! কিছুদিন বাদেই আমার শরীরের ভাষার ফাঁকটা যে কোথায় তা মোটামুটিভাবে বুঝে নিয়েছিল রুকসানা। ফলত, সে আমার সাথে সম্পর্ক ছেদ করেছিল একসময়।

কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার পরে চম্পকের সাথে আমার দেখা হয়েছিল বার তিনেক। আমার উদ্যোগেই একদিন আমরা দু’জনে কফি খেতে গিয়েছিলাম গুলশানের কোনো একটা কফিশপে। আরেকদিন সাত রওজাতে গিয়ে আমার দু’জনে হাজির বিরিয়ানি খেয়েছিলাম, সেটাও আমার জোরাজুরিতেই। তাছাড়া একবার আমি তাকে রমনাপার্কে হাঁটতে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। এসেছিল সে। কিন্তু মেয়েটা কোনোদিনই আমাদের ভেতরের দূরত্ব আর ভাঙে নি।

চম্পকের চুমুর জন্য আমি ভয়ংকর অধীরতা নিয়ে আমার অফিসের কাজে যাচ্ছিলাম, শংকরের সিটি কাফে-তে আড্ডা দিচ্ছিলাম বন্ধুদের সাথে, মা-হারা সন্তানকে নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছিলাম এই শহরের কোথাও, রান্না করছিলাম প্রতিনিয়ত। তখন একদিন গুলশানের একটা কফিশপে দেখা হলে চুমুর প্রসঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থনে নেমেছিল চম্পক। চম্পক আমাকে বলেছিল, কক্সবাজারে সে সজ্ঞানে আমাকে চুমু খেয়েছে। আশা করা যায় যে সেজন্য তাকে কোনো কৈফিয়ত দিতে হবে না! মৃদু হাসিতে আমি তাকে বলেছিলাম : নাহ্! দিতে হবে না কখনই। ততদিনে, সঙ্গত কারণেই, রুকসানার সাথে আমার সম্পর্কের বিপর্যয় ঘটে গেছে যা চম্পককে জানানোর কোনো প্রয়োজন বোধ করি নি আর।

তাছাড়া চম্পক আমাকে বলেছিল, সে আমাকে চুমু খেয়েছে মানে এই নয় যে আমি ভেবে বসব যে সে আমাকে ভালবেসেছে। আমাকে দেখে তার ভেতরে মমতা জেগেছিল মাত্র। মানুষ তো স্পর্শ দিয়েও তার মমতা প্রকাশ করে—তাই না? কাজেই দয়া করে আমি যেন তার প্রেমে পড়ে না-যাই! এটা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন, আমার সাথে সে গভীর কোনো সম্পর্ক তৈরি করতে চায় না। তাই আমি যেন তার প্রেমে পড়ে গিয়ে শুধু শুধু আমার নিজের জীবন আরেকপ্রস্থ জটিল না-করে ফেলি। সিধা রাস্তাতেই বরং চলাটা ভালো। তাইই নয় কি?

চম্পকের কথায় আমি নিথর হয়ে গিয়েছিলাম কেননা ততদিনে চম্পকের প্রতি তৈরি হয়ে গেছে আমার অসম্ভব পক্ষপাত এবং সেখান থেকে ফেরত যাওয়ার কোনো উপায় আর অবশিষ্ট ছিল না আমার হাতে। একথাটাও সেদিন গুলশানের কফিশপে বসে চম্পকের কথার পিঠে বলতে পারি নি আমি।

সাত রওজাতে আমরা দু’জনে যেদিন বিরিয়ানি খেতে গিয়েছিলাম সেদিনও চম্পককে বলা হয় নি যে আমি তার চুমুর প্রতীক্ষাতে বসে থাকি অনুক্ষণ। কিন্তু কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার পরে চম্পক আমাকে সেই প্রবেশাধিকার আর দেয় নি কোনোদিন। আর তাছাড়া আগ বাড়িয়ে আগ্রহটা জানালে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা ছিল ষোল আনা।

চম্পক বিয়ে করে ফেলার পরে তার সাথে আমি আর যোগাযোগ রাখি নি। আমি যেন তাকে ফোন করতেও প্রলুব্ধ না-হই সেজন্য আমার মোবাইল ফোনের অ্যাড্রেস বুক থেকে আমি মুছে ফেলি তার ফোন নম্বর। সে তো কোনোদিনই নিজে থেকে আমাকে খুঁজত না, খোঁজেও নি! কাজেই বিচ্ছিন্নতা সহজ হয়েছিল।

আমার মনে পড়ছে, কক্সবাজারের সাগরবেলার ভিড় থেকে খানিকটা দূরে হেঁটে যেতে যেতে একদা আমি চম্পককে বলেছিলাম, দশ বছর মতো আগে আমার কোনো জরুরি সঙ্গ ছিল না। সে সময়ে কফিটফি খেতে গেছি কোনো কোনো মেয়ের সাথে—এই যা। তখন কেন দেখা হলো না তার সাথে! এটা কি আমার প্রতি প্রকৃতির অবিচার নয়?

হাসতে হাসতে চম্পক বলেছিল, ‘কেন মানুষকে অধিকার করতে চান? ভালোবাসা কি অধিকারের বিষয়? ব্যাপারটাকে এভাবে দেখলেই তো হয় : আপনার সাথে আমার দেখা হলো। নাও তো হতে পারত সেটা!’ এর বেশি কিছু চম্পক আমাকে বলে নি।

তবে চম্পকের কথায় মন শান্ত হয় নি আমার। আমার কেবল মনে হচ্ছিল—আমার ক্লান্ত, উৎক্ষিপ্ত জীবনে চলার জন্য চম্পকের মমতাই জরুরি ছিল সবচাইতে বেশি যে মমতার কিয়দংশ মাত্র আমি কক্সবাজারে প্রত্যক্ষ করেছিলাম। কিন্তু চম্পকের মমতায় আমার আর বসে থাকা হলো না! আমার উৎক্ষিপ্ততা আরও বেড়ে গেল!

এখন রাত প্রায় দেড়টা। খিদেও লেগেছে বাচ্চুর। তাই গেল রাতের খাবারদাবার সে একটা প্লেটে সাজিয়ে মাইক্রোওয়েভে গরম করে নেয়। রাতের খানা খাওয়া শেষ করে সে বারান্দার চেয়ারে বসে একটা সিগারেট টানে যথারীতি। তার মনে পড়ে যায়, শংকরে আজ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে ফেরার পথে, অনেকদিন পরে তার চম্পকের কথা মনে পড়েছিল। রাত এগারটার দিকে শংকরমোড় থেকে টেম্পোতে উঠেছিল সে। রাতের নির্জন সাতাশ নম্বর রোড ধরে টেম্পোটা ছুটে চলছিল ফার্মগেট বরাবর। তখন তার মনে হয়েছিল, কেন সে চম্পকভিন্ন কোনো নারীর ঠোঁটে চুমু খেতে পারে না তা কাগজ-কলমে লিখে রাখা যেতে পারে। বাচ্চু আসলে চম্পককে জানাতে চায় ব্যাপারটা; অনুযোগ তুলতে চায় : আমি তো আপনার সাথে থাকতে চেয়েছিলাম। আপনি আমাকে এড়িয়ে গেলেন। দেখলেন তো, আমার জীবনটা কিভাবে বরবাদ হয়ে গেল তারপর? বাচ্চুর মনে হয়, হয়তো কোনো একদিন তার জীবনের এই গল্পটা পৌঁছুবে চম্পকের হাতে। কিভাবে, তা সে জানে না।

কাজেই বাসায় ফিরে কাগজ-কলমে চম্পকের সাথে ভুতগ্রস্তের মতো কথা বলতে শুরু করে বাচ্চু। লেখার তোড়ে সে দূরশহরবাসী পুত্রকে ফোন করতে বেমালুম ভুলে যায়।

ভাবনার এ পর্যায়ে এসে শেষ হয়ে যায় সিগারেটটা এবং ঘরে ঢুকে বিছানা থেকে রাইটিং প্যাডটা তুলে নিয়ে ফের টেবিলে গিয়ে বসে বাচ্চু। তারপর সে লিখতে শুরু করে নতুন একটা প্যারাগ্যাফ :

এখানে আমার মামতো বোন তান্নির কথা একটু বলতে চাই। তান্নি আমার পাঁচ বছরের ছোট। তার বয়স যখন ষোল এবং আমার একুশ তখন থেকে আমরা পরস্পরের শরীরের মোহে পড়ে যাই। আমার আট বছরের বিবাহিত জীবনবাদে আমাদের ভেতরে শারীরিক অনুভূতির লেনদেন চালু আছে এখনও। কোনো অবস্থাতেই আমার সাথে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতে একেবারের জন্য হলেও কুন্ঠিত হয় নি তান্নি। আমার প্রতি অসম্ভব দুর্বলতার কারণে তান্নিকে ভীষণ পছন্দ আমার। যা হোক, রুকসানার সাথে আমার সম্পর্ক চুকে যাওয়ার পরে আমি ভীত হলাম এজন্য যে তান্নির শরীরের প্রতি আমার সহজাত পক্ষপাতটাও এভাবে হুমরি খেয়ে না-পড়ে যায় আবার! কাজেই মালিবাগে আমার মামার বাসায় অথবা সিদ্ধেশ্বরীতে তান্নি আর তান্নির স্বামীর বাসায় বেড়াতে যাওয়াটা আমি সচেতনভাবেই তখন বন্ধ রাখি। কাজটা সুবিধে হয় এজন্য যে তান্নি আমাকে সেই দিনগুলোতে খোঁজে না, হয়তো তার নানা ব্যস্ততার কারণেই! নিজের এবং তার বাবা-মা’র সংসার নিয়ে আসলে সারাক্ষণই ব্যস্ত থাকে তান্নি।

কোনো এক শুক্রবারে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে, তান্নির ফোন আসে। আমি প্রমাদ গুনি। তান্নি আমাকে জিজ্ঞাসা করে : আজকে কি তুমি অনেক ব্যস্ত থাকবে? এধরনের প্রশ্ন আসলে একটা সংকেত। এর অর্থ হলো, হার্ডওয়ারের ব্যবসার কাজে ঢাকার বাহিরে গেছে তান্নির স্বামী, হয়তোবা চীনের কুম্মিং বা গোয়াংজুতে। শঙ্কিত হলেও আমি তখন অভ্যাসের বশে সহজেই তান্নির শরীরের কুহকে পড়ে যাই। কাজেই সেদিন সন্ধ্যেবেলায় আমার বালকপুত্র কুশলকে নিয়ে তান্নির বাসায় বেড়াতে যাই আমি। নিচতলায় নিনটেন্ডো গিয়ার নিয়ে কুশল গেইম খেলতে বসে তান্নির মেয়েটার সাথে। আমি জানতাম, তারপর কী হবে : চটজলদি চা শেষ করেই তান্নি আমাকে বলবে—চল, দোতলাতে গিয়ে বসি। তান্নিকে আমি যন্ত্রের মতো অনুসরণ করে পৌঁছুব গিয়ে দোতলার বসার ঘরের পাশের অন্ধকার স্টাডিরুমটায় এবং তখন পঁচিশ বছর আগে সূচিত দুই শরীরের জান্তব বিনিময় শুরু হবেই। হলোও তাইই। যেমনটা আশঙ্কা করেছিলাম, সেই শুক্রবারে ঠিকই ছন্দপতন ঘটে যায় আমার ভেতরে—তান্নির ঠোঁটে আমি আর বেশুমার চুমু খেতে পারি নি সেদিন। আমি তার চুমুর উত্তর দিতেও কুন্ঠিত হচ্ছিলাম বারবার। আমাদের শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তখন এতই ব্যস্ত ছিল যে আমার কুন্ঠা লক্ষ করে না তান্নি। বেঁচে যাই আমি সেই যাত্রায়।

তবে মাস তিনেক পরে আবারও তান্নির সাথে তাদের স্টাডিরুমে গেলে আমি ধরা পড়ে যাই ঠিকই। প্রবল বিস্ময়ে আমাকে প্রশ্ন করে তান্নি, ‘কী হয়েছে তোমার, বল তো? খাপছাড়া লাগে কেন এমন?’

আমি তখন তান্নিকে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ চুম্বনের গল্পটা বলি।

ঈর্ষার বশেই তান্নি আমার বাম গালে সর্বশক্তি দিয়ে একটা চড় কষে। আচমকা আঘাতে আমি ভারসাম্য হারিয়ে ডিভান থেকে মেঝেতে পড়ে যাই।

নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে তান্নি আমাকে বলে, ‘তুমি আর কোনোদিন এভাবে আসবে না!’

তান্নির ব্যক্তিগত অপমানের দিকটা আমি ঠিকঠাক বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু শারীরিক মুক্তির একমাত্র জায়গাটাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়তে হয় আমাকে। তবে আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে কিছুদিন পরেই আবার ঠিকঠাক হয়ে যায় তান্নি। তাদের বাসার স্টাডিরুমের ডিভানে গা এলিয়ে দিয়ে বসে একদিন সে আমাকে বলে, ‘স্বাভাবিক হতে চেষ্টা কর তো এবার! ভালো লাগে না এই সব ছাতার মাথা!’


আমি তখনই জানতাম, আমার জীবন দুঃখময় হবে কেননা একজন নারীর বিষণ্ন ছবি আমার চোখে স্থির হয়ে গিয়েছিল সেদিন।


এটুকু লেখার পরে বাচ্চু থামে কেননা তখন সমস্যা দেখা দেয় দুটো : প্রথমত, তার জীবনের শ্রেষ্ঠ চুম্বনবিষয়ক আলোচনার ভেতরে বেনোজলে ঢুকে পড়ছে তার একজীবনের নানান অপ্রাসঙ্গিক স্মৃতি এবং দ্বিতীয়ত, কক্সবাজারে চম্পকের সাথে যাপিতকালের স্মৃতি অণুতে-পরমাণুতে ভেঙে ভেঙে সবিস্তারে কলমে চলে আসতে চাইছে বারবার। কিন্তু কলমের প্রকাশের গতি তো আর মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তির গতির সাথে পাল্লা দিতে পারে না! তাই কলমের সীমাবদ্ধতার কারণে বিমূঢ় হয়ে বসে থাকে বাচ্চু। চিন্তনকে আরও কেন্দ্রীভূত করার জন্য বারান্দায় গিয়ে সে একটা সিগারেট ধরায়। লেখার তোড়ে সে খেয়ালই করে নি যে বাইরে কালবোশেখি শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। রাতের আকাশ মেঘেমেঘে হয়েছে আরও অন্ধকার। তমসাবৃত আকাশে চিড়িক দিয়ে উঠছে রুপালি বিদ্যুৎরেখা। বাসার সামনের মেঘশিরিষ আর মেহগনির দল পাগলের মতো এদিক-ওদিক দুলছে ঝড়ো হাওয়ায়। একটু পরেই শোঁ-শোঁ বাতাসের সাথে নেমে আসে মাতাল বৃষ্টি। বাচ্চুর তখন মনে পড়ে কক্সবাজারে ফেলে আসা এক বৃষ্টিস্নাত বিকেলের কথা।

চরাচর অন্ধকার করে ফেলা বৃষ্টিতে চুপচাপ ভিজতে ভিজতে সাগরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিল চম্পক। বাইরের পৃথিবীতে ঘটতে থাকা উথালপাথালে একবারের জন্যও ভাঙে না তার প্রস্তরীভূত ভঙ্গি, তার মুখোমণ্ডলের কঠিন রেখাগুলোতে কোনো পরিবর্তন আসে না, তার হালকা বাদামি চোখের তারা, সুদীর্ঘ অক্ষিপল্লব স্থির হয়ে থাকে তেমনই। চম্পককে তখন মার্বেলপাথরে খোদিত কোনো ভাস্কর্য ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। এদিকে চম্পকের বিষণ্নতায় মাখামাখি হয়ে গভীর কালো বর্ণ ধারণ করেছে সাগরের ওপরে ঝুলে থাকা মেঘ। বাচ্চু দেখতে পায়, সাগরের বুক থেকে বৃষ্টিতে ঢেকে যাওয়া বেলাভূমিতে ধেয়ে আসছে কালো মেঘের কণা। মেঘ আর জোর বৃষ্টির আবরণ সরিয়ে বাচ্চু তাকায় অপার্থিব, স্থাণু এক নারীর বিস্ফারিত চোখের দিকে। সেই নারীর অন্তর্গত বিষণ্নতা তখন বাচ্চুর মাথার ভেতরে এক লহমায় ঢুকে যায়।

সিগারেট টেনে ঘরে ফিরে এসে বাচ্চু লিখে : আমি তখনই জানতাম, আমার জীবন দুঃখময় হবে কেননা একজন নারীর বিষণ্ন ছবি আমার চোখে স্থির হয়ে গিয়েছিল সেদিন। এটুকু লিখার পরে আবারও থেমে যেতে হয় তাকে। সে লক্ষ করে দেখে, গল্পটার বেশির ভাগ প্যারাগ্রাফ শুরু হচ্ছে এই একভাবে—আমি তখনই জানতাম, আমার জীবন দুঃখময় হবে…। ঘটনাটাকে ‘পুনরাবৃত্তি’ বলতেই হবে। তবে এই পুনরাবৃত্তির পেছনে সে একটা যুক্তি খাড়া করতে চেষ্টা করে : স্মৃতিরোমন্থন মনোটোনিক একটা প্রক্রিয়াতে পর্যবসিত হতে বাধ্য কেননা পুরাঘটিত কোনো ঘটনার মাত্রা পরিবর্তন করে ফেলতে মানুষ এখনও শেখে নি। তবু পুনরাবৃত্তি এড়ানোর জন্য সে শুরুর বাক্যটাকে ফেলে দিয়ে নতুন করে পরের প্যারাগ্রাফটা লিখতে বসে :

গেল শুক্রবারে আমি মৌসুমী জ্বরে আক্রান্ত হই। একটা বিজ্ঞাপনচিত্রের টেকের শিডিউল থাকলেও তা বাতিল করে আমি তখন জ্বরের প্রকোপে চুপচাপ আমার বিছানাতে পড়ে আছি। ফোনে কথা বলার সময় আমার শরীরের বেহাল অবস্থার কথা জেনে তান্নি এসেছে সাহায্যের জন্য। প্যারাসিটামল আমি সকালেই খেয়েছিলাম। তাও জ্বর সরছে না দেখে আমার কপালে জলপট্টি করে দিচ্ছে তান্নি। তান্নি আমাকে বলছে, ‘আরেকবার বিয়েশাদি করলেই পারতে তুমি! এই দেখ, তোমার শরীরে ভাটা লেগেছে এখন! তোমাকে দেখবেটা কে, শুনি? আমার জায়গা থেকে তো আর এভাবে তোমার সেবা করাটাকে পারমিট করে না!’

চম্পকের মমতার কথা, তার আদরের কথা আমার মনে পড়ে যায় সেই মুহূর্তে। চম্পক তার অজানিতেই আমাকে শিখিয়েছিল : এই পৃথিবীর সকল মানুষের স্পর্শ মায়ামমতা ধরে না, প্রশমিত করতে পারে না আমাদের ক্লান্তি আর উৎক্ষিপ্ততাকে। নিজের জীবন দিয়ে আমি তা উপলব্ধি করেছি। অনেকদিন পরে তান্নিকে আমি আবারও এসব বলি। আমার সবচাইতে কাছের নারী হিসেবে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ চুমুর গল্পটার কথা হয়তোবা তখন মনে পড়ে যায় তান্নির। তাই হয়তো আবারও বিষণ্ন হয় সে। তবু সে আমাকে পরামর্শ দেয় : তাকে খুঁজে বের করলেই হয়!

কিন্তু তান্নি তো আর জানে না, কোনো মানুষ নিজে থেকে হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়াটা সহজ কোনো কাজ নয়! আর আমরা এই শহরটাকে যত বড় ভাবি এ শহর আসলে তার চাইতেও বহু গুণে ব্যাপ্ত! যার আত্মার ছায়ায় আমাদের বসে থাকা প্রয়োজন তার সাথে এই শহরে দেখা হয় না কোনোদিন! আমাদের চারদিকে সব বাতিল মানুষের ছড়াছড়ি! এখানে চম্পক কোথাও নেই।

এবার থামে বাচ্চু। টেবিলে রাইটিং প্যাড আর কলমটা রেখে বারান্দায় গিয়ে সে একটা সিগারেট ধরায়। ভোরের আলো ফুটছে তখন। সে ভাবে, এখানেই গল্পটা শেষ করে দেয়াটা ভালো। ইতোমধ্যেই হয়তো নানা পুনরাবৃত্তিতে গল্পটা একঘেয়ে হয়ে উঠেছে। তবে এও তো ঠিক যে মানুষের জীবনের সব গল্পই তো আর নাটকীয় হয় না! ঘটনাগুলো এতই সাধারণ যে সেগুলোকে ফ্রি দু’লাইনে প্রকাশ করে ফেলা সম্ভব।

সিগারেট টানা শেষ হলে পর বাচ্চু রাইটিং প্যাডটা নিয়ে বিছানায় চিত হয়ে শোয় এবং সে প্যাডের পাতাগুলোতে চোখ ফেলে। সেখানে লেখা হয়েছে মোট ৩৫৩৮-টা শব্দ। কম তো লিখা হলো না তবে! এবার গল্পটার একটা নাম দেয়া যাক। সম্ভাব্য যে নামগুলো বারবার তার মাথায় ঘুরতে থাকে তার তালিকাটা এমন : ‘কক্সবাজারে পনের দিন’, ‘কয়েকটি আশ্চর্য চুমুর গল্প’, ‘সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ বিকেলের নক্ষত্রের কাছে’, ‘কোথায় পাব তারে’, ‘সাগরবেলায় মূর্তি তুমি’, ‘যে জীবন ফড়িংয়ের, দোয়েলের’, ‘মায়াগৃহ’ ইত্যাদি। এ নামগুলোর একটাও ভালো লাগে না তার। এবাদে আর কোনো জুতসই নামও খুঁজে পায় না সে। কাজেই রাইটিং প্যাডটা বন্ধ করে পাশে রেখে দেয় সে। তারপর সে টানটান হয়ে বিছানায় শুয়ে, পা দোলাতে দোলাতে খুঁজতে থাকে গল্পটার নাম। ভাবনার ফাঁকে ক্লান্তিতে তার চোখ বুজে যায়।

ঘণ্টা দুয়েক পরে, মানে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে, তীক্ষ্ণ শব্দে মোবাইল ফোনে বেজে ওঠে অ্যালার্ম। বাচ্চুকে বিছানা থেকে উঠে পড়তেই হয় তখন। এবার অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়ার পালা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজার সময় বাচ্চুর মনে ভেসে ওঠে গল্পটার আরেকটা সম্ভাব্য নাম—‘তার সাথে’।

নাহ্! এই নামটাও আসলে পছন্দ হচ্ছে না!

ফয়জুল ইসলাম

জন্ম ২৪ নভেম্বর, ১৯৬৩; সিদ্ধেশ্বরী, ঢাকা।

শিক্ষা : এম.এ (অর্থনীতি); এম.এ (উন্নয়ন অর্থনীতি)

পেশা : উপ-প্রধান, পরিকল্পনা কমিশন, বাংলাদেশ সরকার।

প্রকাশিত বই :

নক্ষত্রের ঘোড়া (১৯৯৮) [গল্পগ্রন্থ, বিদ্যাপ্রকাশ, ১৯৯৮]
খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক[ গল্পগ্রন্থ, সমগ্র প্রকাশন, ২০১৬]
আয়না [গল্পগ্রন্থ, পার্ল পাবলিশার, ২০১৭]
নীলক্ষেতে কেন যাই [গল্পগ্রন্থ, যুক্ত, ২০১৭]

ই-মেইল : faizulbd@gmail.com

Latest posts by ফয়জুল ইসলাম (see all)