হোম গদ্য গল্প ট্রেনে তাহারে আহা রে

ট্রেনে তাহারে আহা রে

ট্রেনে তাহারে আহা রে
1.19K
0

রেল স্টেশন, ওয়েটিং রুম, ট্রেনের কামরা নিয়ে কত কত দুনিয়া কাঁপানো গল্প কবিতা আছে না! আমার মাথায়ও একটা গল্পের চাপ ছিল। আমার এক বন্ধু জ্ঞানে গরিমায় অনেক এগিয়ে গেছে, গিয়ে একটা সাহিত্য-পত্রিকা খুলেছে। আজকাল তো কাগজ লাগে না, ওয়েবে ওয়েবে হয়। এগুলোর কী সুন্দর নামও আছে, অনলাইন পোর্টাল। যদিও এসব অনলাইন পোর্টালে আমার লেখা প্রকাশিত হলে আমি এখনও খ্যাতের মতো বলি, আমার লেখা ছাপা হইছে। লেখা মানে দুএকটা গল্প। সেসব সস্তা স্টোরি-টেলারের বয়ান। কেউ কেউ ফেসবুকের ইনবক্সে আমাকে চুপি চুপি বলে গেছে, গল্প বোনা আর গল্প বলায় তফাৎ আছে। আমাকে কী কী পড়তে হবে, পড়ে পাকতে হবে, ইত্যাদি শুনে-টুনে যখন ভাবছি, কত কত গল্প তো লেখা হয়ে গেছে দুনিয়ায়, আরো কত হবে। আমি কিছু ট্র্যাশ যদি পয়দা না দেই, কী এমন ক্ষতি। কিন্তু সমস্যা হলো আমার ঘুম কমে গেছে। ঘুম কমে গেলে গল্প লেখা ছাড়া কী উপায়!

আমার সেই পোর্টাল-বন্ধু যখন বলল, ঈদসংখ্যার জন্য তোমার গল্প দাও, তখন আমি প্রায় আল্লাদে আট খান হয়ে গেলাম। কে বলে আমার গল্প হয় না! এই তো হচ্ছে! সেই থেকে মাথায় গল্প ঘুরছে। এতদিন তো যা-তা লিখেছি, আমার ফাজিল বন্ধুবান্ধব পড়ে বলেছে, ও এই তাইলে ব্যাপার! তাই তো বলি, দুইজনের কারুর পরকীয়া নাই তবু বিয়ে ভাঙ্গল কেন? তুই তাইলে একা থাকার লাইগা এত ভালো জামাইটারে তালাক দিলি! ভাগ্যিস বাচ্চাকাচ্চা নেই, তাই ওরা আমাকে শাপ শাপান্ত করলো না। বলল, আচ্ছা, বিয়া যখন ভাইঙ্গাই দিছস, এবার মন দিয়া লেখ! আর খবরদার গল্পে জ্ঞান দিবি না!

দেখেন তাইলে কেউ বলে গল্প বলবেন শিল্পীর মতো, কেউ বলে গল্পে জ্ঞান দিবি না! কোন পথে যাই! আমি আবার লোকের কথায় খুব পটি। প্রায় কাচের গেলাস আমি, যে রঙের পানি রাখবেন, সেই রঙের বলা যাবে আমাকে।

এখন তাহলে জ্ঞানী বন্ধু গল্প চাইলে, দারুণ একটা গল্প লিখব বলে মনস্থির করলাম! করেই বুঝলাম আমার মাথায় কিছুই আসছে না। এতদিন তো দিব্যি আসছিল। কাউকে ছাপতে বলতে সাহস না পেয়ে ফেসবু্কেও পোস্ট করেছি কয়েকটা। ভাবলাম কোথাও ঘুরে আসি। পথে ঘাটে গল্প পাওয়া যায় বলে শুনেছি। ঠিক তখনই আমার প্রাক্তন শ্বশুর-শাশুড়ি ডাকলেন। আমার সাত বছরের দাম্পত্যে তাদের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। এতটাই ভালো যে তারা আমাকে একটা জমি লিখে দিয়েছিলেন। জমি লিখে দেওয়ার কারণ দেবরের বিয়ে। দেবর যে মেয়েটাকে বিয়ে করবে বলে জানিয়েছিল, সেই মেয়েতে ঘোর আপত্তি ছিল তাদের। সেই বিয়ে আটকে দেওয়াতে খুশি হয়ে তারা আমাকে এই জমি লিখে দিয়েছিলেন। এখন যখন আমি আর তাদের ছেলের বউ নই, তখন সেই জমি আমার নামে কিভাবে থাকবে! কাজেই আমাকে যেতে হবে শ্বশুরবাড়ি, সেই জমি থেকে আমার নাম তুলে ফেলতে। জমি ফের রেজিস্ট্রি হবে দেবরের বউয়ের নামে। তাদের পছন্দ করা বউ। ট্রেনের টিকিট কাটলাম। আগের নাইটে গিয়ে পরের নাইটে ফেরা। ঢাকা-ঈশ্বরদী। কমলাপুর এমন একটা স্টেশন এখানে গল্প পাওয়ার কোনো আশা নেই। ভাবলাম ফেরার পথে যদি মেলে। না-হলে পোর্টাল বন্ধু ভাববে আমার বেশি ভাব হইছে, গল্প চাইছে দিই নাই।

রাতের ট্রেনে গিয়ে ভোরে নামলাম। সারাদিন থাকলাম, কাগজপত্রে সাইন করলাম। দুপুরে আমাদের যে ঘরে বাসর হয়েছিল, সেই ঘরে হালকা ঘুমও দিলাম। এক ফাঁকে দেবরের বউ চা দিয়ে গেল আর জানতে চাইল, মন খারাপ লাগছে? হেসে বললাম, হ্যাঁ, দ্যাখো না কেমন জমিদার ছিলাম এতদিন! সে অবাক হয়ে বলল, এই ঘরের জন্য মন খারাপ লাগছে না? ওহ এই ঘর? না তো, এটা তো আমার নামে লেখা ছিল না!

সন্ধ্যার আগে আগে বেরিয়ে পড়লাম। যদিও ট্রেন সাড়ে আটটায়। স্টেশনে কিছুক্ষন থাকব, ওয়েটিং রুমে বসব, গল্প খুঁজব বলে আগে চলে এলাম। বিয়ের পর আমরা ট্রেনে ঢাকা ঈশ্বরদী যাতায়াত করি নি। গাড়ি ছিল জামিলের। আমিও ড্রাইভিং শিখেছিলাম ওর আগ্রহে। যখন ঈশ্বরদী আসতাম, খুব ভোরে রওনা দিতাম, দুইজনে ভাগাভাগি ড্রাইভ করতাম। কাজেই আপনারা মন খারাপ করবেন না, ঈশ্বরদী স্টেশনে জামিলের সাথে আমার কোনো স্মৃতি নেই।

স্টেশনে এসে চা খেলাম। ওয়েটিং রুমে বসলাম। হতে পারে বহু বছর পরে এই ওয়েটিং রুমে জামিলের সাথে আমার দেখা হয়ে গেল। না, তা কিভাবে হবে, যতই ঝড়বৃষ্টি হোক, বাড়ি তো কাছে, ভিজে ভিজে বাড়ি চলে যাবে ও।


আমাকে দুই পুরুষের মাঝখান থেকে উদ্ধার করার দাম উশুল তিনি করবেনই।


ওয়েটিং রুম থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম। পলিথিনে ঢাকা ভ্যানের দোকান থেকে সন্দেশ কিনে খেলাম। রাতে খাওয়ার জন্য কিছু সন্দেশ কিনেও নিলাম। মিষ্টি খাবার আমার খুব পছন্দ। স্টেশনে হাঁটাহাঁটি করতে করতে, লোকজন দেখতে দেখতে, গল্পের মুখ খুঁজতে খুঁজতে আবার চা খেলাম। কত কত মানুষ! তাদের কত কত গল্প। কেউ কি আমাকে তার গল্প শোনাবে না? হঠাৎ দেখি দারুণ স্মার্ট এক বুড়া চায়ের দোকান থেকে চা নিল। কানে হেডফোন, পিঠে ব্যাকপ্যাক! সব চুল পাকা, কত হবে বয়স? ষাট? পঁয়ষট্টি? আর বাড়াতে সায় দিল না আমার বুড়াপ্রীতি। লম্বায় প্রায় ছয় ফিট, কালোই। ভুড়ি নেই। সবচেয়ে আকর্ষণীয় তার জামাকাপড়! জলপাই কালারের মোটা কাপড়ের ফুল শার্ট, অফ হোয়াইট গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট। ইন করে পরা। শার্ট প্যান্ট পরিষ্কার টানটান। শুধু শার্টের দুই হাতা অযত্নে আড়াইটা ফোল্ড করা। জুতা, বেল্ট, ঘড়ির ফিতা কফি-কালার। চশমার ফ্রেমও কফি। জামাকাপড়ের এত বর্ণনা দিলাম কারণ, এসবই আমার পছন্দ। পাঞ্জাবি-পরা পেট-মোটা বুড়াদের দুই চোখে দেখতে পারি না, সে তারা যতই দিগগজ পণ্ডিত হোক।

প্রায় আটটা বাজে, ট্রেন যদি লেট না করে আর এই বুড়া যদি অন্য কামরায় ওঠে তাহলে তো আমার গল্পের কোনো আশা নেই। একটাই আশার কথা ঈশ্বরদী থেকে এসি বার্থ বেশি থাকার কথা নয়, রাজশাহী থেকেই বুকড হওয়ার কথা। এই রঙ্গিলা বুড়া এসি বার্থের টিকিটই কেটেছে বলে আমার ধারণা। এসব এসি বার্থে ট্রাভেল করার মতো বড়লোক নই আমি। আমি নিজে কাটলে শোভন চেয়ারেই কাটতাম। টিকিট কেটেছে আমার এক বড় ভাই। তিনি রেলে কি জানি বড় চাকরি করেন। বলেছিলাম ঈশ্বরদী যাব, একটু দেখবেন টিকিট পাওয়া যায় কিনা। ঈশ্বরদীর পাট চুকিয়ে আবার কেন ঈশ্বরদী যাই? জমি-কাহিনি শুনে মনে হয় তার দয়া হয়েছিল। টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আমার অফিসে। ফোনে বলেছিলেন খবরদার টাকা দেবে না! না, ডিভোর্সি বলে আলগা খাতিরের খোঁজ করবেন না! আমি তার ড্রাইভারের হাতে টাকা দিয়ে বলেছি সাতদিন পরে তাকে দিতে। আমার মনে হয় না, তিনি আর এটা নিয়ে কোনো ঝামেলা করবেন।

ট্রেন প্রায় ঠিক সময়েই এল। উঠে গেলাম কামরায়। আমরা রেলকে ইংলিশে ট্রেন ডাকি, অথচ ট্রেনের রুমকে ডাকি কামরা! বগিও তো মনে হয় বাংলা শব্দ না। কি জানি এসব নিয়ে কেন ভাবতে বসলাম! যাই হোক, কামরায় ঢুকে দেখি একপাশে দুই বাচ্চা আর এক বরকে নিয়ে বসেছে অল্পবয়সী এক মেয়ে। ওরা মনে হয় রাজশাহী থেকে এসেছে। ছয় সিটের বার্থ। অন্য পাশে একটা কুড়ি বাইশ বছরের ছেলে। আমি জানালার পাশের সিট ফাঁকা রেখে মাঝখানে বসলাম। ট্রেনে জানালার পাশে বসা নিয়ে ভীতি আছে আমার। একবার ঢিল খেয়েছিলাম।

ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার দুই মিনিট পরে বুড়া এল! আমাকে পেরিয়ে জানালার পাশে বসল, হালকা সুরভিতে ভরে গেল কামরা! আমার এত্ত খুশি লাগল, কী বলব! কিন্তু আমার উল্টা দিকে বসা দয়াময়ীর বিষয়টা পছন্দ হলো না। সে পাশে বসা বরকে বলল, ভাইয়া তুমি ওইপাশে বসো, আপু আপনি এদিকে চলে আসেন! আহারে বুড়ার পাশে বসে কত খুশি হয়েছিলাম! আর লোকটাকে আমি তার বর ভেবেছিলাম! মনে মনে  জিভে কামড় খেয়ে উঠে জায়গা বদল করলাম। আমাকে দুই পুরুষের মাঝখান থেকে উদ্ধার করে দয়াময়ী খুব খুশি হলেন। যাই হোক, বিষয়টা মন্দ হলো না। বুড়াকে ভালো করে দেখতে পাব এবার। কিন্তু দয়াময়ী নিজেকে রেশমা নামে পরিচয় দিয়ে আলাপ জুড়ে দিলেন। ছোট পিচ্চিটা শান্তিমতো কথা বলতে দিচ্ছিল না বলে তাকে মামার কোলে চালান করে দিয়ে জুত করে বসলেন! বড়টা নিয়ে চিন্তা নাই, ট্যাব নিয়ে র‍্যাব হয়ে বসে রইলেন তিনি।

ঈশ্বরদীতে কোথায় এসেছিলাম দিয়ে শুরু হলো প্রশ্নের মেশিন! বুড়ার কানে হেডফোন নেই। রেশমার হাতে নাড়ু, সবাইকে বিলালেন। ওনাকে বরং দয়াময়ীই ডাকি।

কোথায় এসেছিলাম? আবার! এবার পুরো আমার দিকে ঘুরে বসলেন! তাকে কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না বুঝে গেলাম। আমাকে দুই পুরুষের মাঝখান থেকে উদ্ধার করার দাম উশুল তিনি করবেনই।

বললাম, শ্বশুরবাড়ি এসেছিলাম। একা? ভাইয়া কই?

ছয় সিটের একটা বার্থ কত স্কয়ার ফিট হবে? সাত ফিট বাই সাত ফিট? সব কথা শুনছে বুড়া? সে কেন কানে হেডফোনটা লাগায় না! শরীর খারাপের দোহাই দিয়ে উপরে লাগেজ রাখার বেঞ্চিতে উঠে শুয়ে পড়ব কিনা ভাবলাম একবার! সেই সময় বুড়ার একটা ফোন এল! আহারে কী সুন্দর পিয়ানোর টিংটং শব্দের রিং টোন। তারপর আমরা কামরার সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। কোনো অচেনা ভাষায় লিসা নামের কারো সাথে দুই মিনিট কথা বলল। ফ্রেঞ্চ একটু-আধটু বুঝি আমি, ফ্রেঞ্চ নয়। জার্মান হতে পারে! একটাই লাভ হলো, তার ভয়েস শুনতে পেলাম! কী আর বলব, দারুণ! যারে লাগে ভালো তার সবই ভালো। কথা বলে শেষ করে কানে হেডফোন গুঁজল সে। আমি দয়াময়ীর প্রশ্নের জবাব দিতে শুরু করলাম। প্রাক্তন শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলাম জমি ফিরিয়ে দিতে, এটা শুনে দয়াময়ীর মুখ হলো দেখার মতো। এখনি আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কানতে পারলে ভাল লাগল তার, বুঝতে পারি! না পেরে ব্যাগ থেকে বুটের হালুয়া বের করে বলল, আমরা টঙ্গি নামব। আমার তখন মনে পড়ল আরে আমিও তো সন্দেশ কিনেছিলাম! বুড়ার উত্তেজনা আর দয়াময়ীর জেরার চোটে ভুলে গিয়েছিলাম!

সন্দেশ বের করে সবাইকে দিলাম। বুড়াকে বললাম, ভাইয়া নিন! আগে দয়াময়ীর নাড়ুর সময় বলেছিল, নো থ্যাঙ্কস! এবার নিল, থ্যাংকস দিয়ে বলল আমার নাম জগলুল আসাদ! আপনি? নিজের নাম বলতে এত ভালো কখনো লাগে নি! তার মনে হয় মনে হলো, শুধু আমার নাম জানতে চাইলে কেমন দেখায় না! তাই সবার সঙ্গেই পরিচিত হলো। নামটা একটু সাবেকি হয়ে গেল, তবু ভালো লাগল। নির্ঘাৎ ওর মায়ের নাম জয়গুন বিবি। সে যে বাংলা বলেছে তাতেই আমি খুশি। একবার তো আমার সন্দেহই হতে শুরু করেছিল যে সে বিদেশি কিনা!

যমুনা ব্রিজ পেরিয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। আমি আর জগা বুড়া টুক টুক করে গল্প করতে শুরু করলাম। তার সমান স্মার্টনেস দেখিয়ে আমিও কোনো ব্যাক্তিগত প্রশ্ন না করে কথা চালিয়ে গেলাম। তিনি নিজে থেকে বললেন, জার্মানি থাকেন তিনি, দুইমাসের জন্য দেশে এসেছেন। ঈশ্বরদী তার বাপদাদার বাড়ি, তেমন কেউ থাকে না সেখানে। জমিজমা ভাগ হচ্ছে তাই তাকে আসতে হয়েছে। এই জগার সাথে আমার প্রেম না হয়ে যায়ই না! তারও জমিজমা! মনে মনে খুব হাসলাম। নিজের পরিচয়ে আমি বললাম, একটা ছোটখাট কাগজের ছোটখাট সাব-এডিটর আমি। ঢাকায় থাকি, একটা ছোটখাট লেডিস হোস্টেলে।

সে হেসে ফেলল, সবই ছোটখাট! আহা এত সুন্দর করেও মানুষ হাসতে পারে! তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বলল, খুব সুন্দর আপনার চোখ! আহা এ কথা তো কেউ আমাকে বলে নাই আগে! আমার অবাক হওয়া দেখে সে বলল, প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার আমি। যদি অভয় দেন তাহলে একটা কথা বলি!

আমি মাথা ঝাঁকিয়ে হেসে অভয় দিলাম। সে বলল, একটা আই সিরিজের একজিবিশন হবে তার। বন-এ মাস তিনেক পরে। প্রায় একশ ছবি থাকবে সেখানে। ছয় বছর ধরে সে বনেজঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন প্রাণীর চোখের ছবি তুলেছে। শুধু মানুষের চোখ বাকি! আমি পুরা বাকরহিত হয়ে গেলাম! সেই চোখ আমার? আমার!

গল্প খুঁজতে গিয়ে শেষে নিজেই গল্পের নায়িকা হয়ে যাব নাকি!


ট্রেনের অর্ধেক খাওয়া চুমু শেষ করতে করতে সকালের নাস্তার সময় হয়ে গেল।


টঙ্গি স্টেশনে ট্রেন থামলে রেশমারা নেমে গেল। নামার আগে আমার ফোন নম্বর নিল, নিজেরটাও দিল। টঙ্গিতে ওদের বাসায় বেড়াতে আসতে বলল। আহা মেয়েটা সত্যিই ভালো। শুধু শুধু বিরক্ত হয়েছি। এয়ারপোর্ট স্টেশনে নামল ছেলেটি। জগা বুড়া উঠে এসে আমার পাশে বসে বলল, আসুন আপনাকে চোখের ছবি দেখাই। ব্যাগ থেকে ট্যাব বের করে ছবি দেখাতে দেখাতে বলতে লাগল একেকটা ছবি তুলতে কত কী করতে হয়েছে। বন্য প্রাণীরা তো আর পোজ দেওয়ার মতো স্মার্ট নয়! আমি ঝুঁকে তার গায়ের সাথে গা লাগিয়ে তন্ময় হয়ে ছবি দেখছি, হঠাৎ সে বলল, মে আই কিস ইউ?

যার সবকিছুই ভালো লাগছে তাকে চুমু না খাওয়ার কারণ নেই। বাতি নিভিয়ে দিয়ে আমরা কেবল জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে শুরু করেছি, ট্রেন ঢুকে পড়ল কমলাপুরে। বাইরে হালকা ভোরের ঘুমন্ত ঢাকা। হাসতে হাসতে আমরা একসাথে বললাম, এটা কোনো কথা হলো, শুরু না হতেই শেষ?

নেমে এসে হাঁটছি গেটের দিকে, হঠাৎ আমার মনে হলো, কমলাপুর স্টেশনে আবাসিক হোটেল আছে! তাকে বললাম, দেখব নাকি খোঁজ নিয়ে, রুম খালি আছে নাকি? জবাবে যে সুন্দর করে হাসল, কী বলব! পাওয়া গেল কামরা!

ট্রেনের অর্ধেক খাওয়া চুমু শেষ করতে করতে সকালের নাস্তার সময় হয়ে গেল। নাস্তা করতে করতে ঠিক হলো আরেকটা ট্রেন ভ্রমণ লাগবে আমাদের। টিকিট কাউন্টার খোলার সঙ্গে সঙ্গে আমরা নিজেদের একটা বার্থের খোঁজে দৌড়ে গেলাম। পাওয়া গেল ঢাকা-খুলনা একটা আস্ত বার্থ। কিন্তু ফেরার টিকিট পাওয়া গেল না। ঠিক হলো একদিন সুন্দরবন ঘুরে পরের দিন ট্রেনে না আসতে পারলে বাসে ফিরব। রুমে ফিরে আবার মাতলাম আমরা, বিছানায়ও সে দারুণ! বুড়া বলে শুরু করতে দ্বিধা করছিলাম আমি, সে দেরি করছিল আমি কী মনে করব, সেই ভেবে।

তিনটায় ট্রেন, তার আগ-পর্যন্ত খুব চমৎকার সময় কাটালাম। গোসল করে ট্রেনে উঠে পড়লাম। ভাগ্যিস দুজনের ব্যাগেই এক্সট্রা জামাকাপড় ছিল। ট্রেনেও খুব প্রেম করলাম আর সে আমার চোখের ছবি তুলল সমানে। কান্না চোখের ছবি তুলতে চাইলে মুশকিল হয়ে গেল, তার সঙ্গ এত ভালো লাগছিল আমার, কোনোভাবে মন খারাপ হচ্ছিল না। পরে ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা টর্চ বের করল, এমন তীব্র আলো কখনও দেখি নি। চোখের ভেতর দিয়ে সে আলো মাথা ভেদ করে বেরিয়ে গেল, মনে হলো অজ্ঞান হয়ে যাব। সমানে পানি পড়তে লাগল চোখ দিয়ে। সে বলল ঠিক হয়ে যাবে। অশ্রুসমেত চোখের ছবি পেয়ে গেল সে। ঘণ্টাখানেক পরে ঠিক হয়ে গেল ব্যথা, কিন্তু ঘুম পেতে লাগল খুব। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি, জানি না। উঠে দেখি খুলনার কাছাকাছি, মানে সাত-আট ঘণ্টা ঘুমিয়েছি! আমাকে উঠতে দেখে হাসল সে, বলল, হাত মুখ ধুয়ে এসো, চা খাই। চা খেতে খেতে আমার চোখের ছবি দেখালো, আহা আমার চোখ যে এত সুন্দর আগে তো জানি নাই! চোখের মণি নীল-সবুজ কিভাবে হলো!

খুলনা থেকে এসে দুদিন পরে চলে গেল সে। পৌঁছে ফোন করল, বলল, আমি খুব স্যরি! আমার প্রচণ্ড মাথাব্যথা সেদিন, চোখ খুলতে পারি না এমন! বললাম, স্যরি কেন? সে বলল, অন্ধ হয়ে যাবে তুমি!


ঈদসংখ্যা ২০১৮

আনোয়ারা আল্পনা

জন্ম ৭ মার্চ ১৯৭৮; উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ। অর্থনীতিতে মাস্টার্স, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশায় সাংবাদিক।

ই-মেইল : alpana01552@yahoo.com

Latest posts by আনোয়ারা আল্পনা (see all)