হোম গদ্য গল্প জোড়-বিজোড়

জোড়-বিজোড়

জোড়-বিজোড়
191
0

পারবিনের একটা দুধ যখন অপারেশন কইরা ফালাইয়া দিতে হয়, তখন পারবিনের চেয়ে তো বটেই, সমস্ত আত্মীয় স্বজন পাড়াপ্রতিবেশি বেবাকের চাইতে ওর মায়ই বেশি অস্থির ছিল নানান আগাম চিন্তায়। একজন আবিয়াত মাইয়ার একটা দুধ নাই এইটা কোনো কথা অইল। জাইনাশুইনা কে তারে বিয়া করব। এমনিতেই পারবিনের ওজন বেশি। মায়ের মনে প্রশ্ন হাজার। পারবিন তার পয়লা মাইয়া। পারবিন ছাড়াও তার আরো ২ মাইয়া ঘরে। যদিও ঐ ২টা ছোট, তবে মাইয়া মাইনষের বালেগ অইতে কতক্ষণ। নিজের বয়সই বা আর কত অইল। এখনও মাসিক বন্ধ হয় নাই। পারবিনের বাপের মনে এখনো একটা পোলার আশা। মাইয়ার রোগের বিষয়টা নিয়া বাপে অস্বস্তিতে থাকে, তাই পারতপক্ষে এই রোগ নিয়া কোনো কথায় আগায় না সে। অবশ্য বউ ছাড়া অন্য কারো লগে এই বিষয়ে কথাও হয় না। ক্যানসার-মেনসার অইলে না-হয় কথা ছিল। পরিবারের কারো ক্যানসার হইছে এইটা মাইনষের কাছে কইতেও ভালা লাগে।


পুরুষ ডাক্তারের কাছে যাওয়া আর হয় না। পুরুষ ডাক্তার তার দুধ দেখব, শুধু দেখবোই না, নাড়ব-চাড়ব, এইটা ভাবতেই তার মন যেন কেমন কেমন করে।


পারবিনের রোগটা ধরা পড়ে সেয়ানা হইবার পর। পয়লা সেও বুঝবার পারে নাই। নিজের দুধ নাড়লে-চারলে যে একটা সুখ মেলে এইটা যখন সে বুঝল তখনকার একদিন সে লক্ষ করল তার একটা দুধ অন্যটার চাইতে ছোট এবং তুলনামূলক শক্ত। এই কথা এখন কেমনে সে কারে কয়। দিনকয় বাদে প্রতিবেশি বান্ধবী ফিরোজার লগে বিষয়টা নিয়া প্রথমে সে জারা আলাপ করে; যেহেতু ফিরোজার লগেই তার ভাবটা বেশি। হাজার হোক বাঙালি মাইয়া তো, মাইয়াগো বিষয় নিয়া মাইয়া মাইনষের লগে মাইয়া আলাপ করব তাতেই কত শরম। শুধু শুইনা ফিরোজার মন যেন ভরে না। তার মনে অচিন আনন্দ খেলে। সে কয়, ‘ল, দেখি’। পারবিনের শরম লাগলেও জবাব পারে, ‘আরে এখন কই দেখবি, এই দিনের বেলায়।’

দুইজনে শলা কইরা সাপুর বড় বইনের বাসায় যায়। মহল্লার এই গলিতে ঐ বাসাটা নিরিবিলি। সাপুর বইনের বিয়া অইছিল নাসির বাবুর্চির লগে। হেয় বেবাক সময় শাদা টেট্টনের লং পড়ত। এক শীতে মহল্লার রইসরা পিকনিকের আয়োজন করে। ঐ পিকনিক পার্টির বাবুর্চির কাজে গেছিল গাজীপুরে। পিকনিক পার্টির লগে ঐ দিন হেয় বি মাল-উল খাইয়া জারা টাল আছিল বোধহয়। টেট্টনের লুঙ্গিতে কেমতে জানি আগুন লাইগা যায়। হেই আগুন পয়লাই গিয়া বাড়ি মারে দুই বিচিতে। আগুনের দমকায় টেট্টনের লুঙ্গি দলা পাকাইয়া দুই অণ্ডকোষ জাবরাইয়া ধরে। ঢাকায় ফিরাইয়া আনতে আনতে মানুষটা খরচের খাতায় গেল গা। সেই থেইকা সাপুর বইনে একলাই থাকবার লাগছে। নিজের কোনো পোলামাইয়া নাই। ঘর ভাড়া যা পায় তাতে সংসার চালায়। মন চাইলে মাঝে মইদ্দে মহল্লার ২/৪ ঘরে পোলাপানগো আরবি পড়ায়। তো ঐ বাসায় গিয়া  ব্রা উঠাইয়া পারবিন তার নিজের ছোট দুধটা ফিরোজারে আগে দেখায়। ফিরোজা ২টাই ভালা কইরা দেখে। নাড়েচাড়ে। টিপে। একটা সুখ পায় ২জনই এবং ২জনই খিলখিলাইয়া হাসে। হাসি শুইনা সাপুর বড় বইনে নিকট আসে। পরে কথার জেরে হেয়ও পারবিনের বিষয়টা জানতে পারে। দুধজোড়া সেও ভালা কইরা দেখে এবং তার যৌবনকালে তার নিজের দুধ জোড়াও যে এমন সুডৌল টানটান ছিল সেইটা মনে কইরা সুখ পায় এবং সেখান থেকে চলে যাবার সময় হাসতে হাসতে পারবিনের বড় দুধটাতে একটা টিপও মারে সে। পারবিনের ঐ ছোট দুধটায় লাল-লাল কেমন যেন ঘামাচির মতো হইছে। জায়গাটা খসখসা। চুলকাইলে ভালা লাগে মগর টিপ দিলে চোট লাগে।

যাই যাই কইরা ডাক্তারের কাছে পারবিনের যাওয়া হয় না। ডাক্তার দেইখা কী কইব কে জানে। শেষে একদিন এক মহিলা এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে বান্ধবী ফিরোজারে নিয়া পারবিন দেখা করে। মহিলা দেইখা-টেইখা একজন পুরুষ ডাক্তারের কাছে যাইবার কয়। ঐ পুরুষ ডাক্তার এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বলে জানান তিনি। পুরুষ ডাক্তারের কথা শুইনা পারবিন তো শরমায়।

মহিলা ডাক্তারের কাছথন আসার পরও সময় যায়। পুরুষ ডাক্তারের কাছে যাওয়া আর হয় না। পুরুষ ডাক্তার তার দুধ দেখব, শুধু দেখবোই না, নাড়ব-চাড়ব, এইটা ভাবতেই তার মন যেন কেমন কেমন করে। ঘেন্না না, কী যেন কি।

শেষমেস বিষয়টা আর চাপা থাকে না। মায় জানে হেরপর বাপে বি, এবং আস্তে ধীরে অ্যালোপ্যাথি-হোমিওপ্যাথি-কবিরাজি নানা পদের চিকিৎসা চলে। এই ওষুধ সেই ওষুধ। এই মলম সেই মলম। জুয়াইন মাইয়া। ২দিন আগে-পরে বিয়া তো দেওন লাগব। লেখাপড়া ৩ ক্লাস পর্যন্ত হইলেও কোরান খতম হইছে ম্যালাবার। লেখাপড়ার দিকে এই পাড়ায় মাইয়াগো অবস্থা পারবিনের মতোই। এদিকে চিকিৎসায় উন্নতি তো কিছু হইলই না বরং নানান পদের দাওয়াই খাইয়া নতুন কিছু সমস্যা আমদানি হইল। দুধের মইদ্দে জ্বালাপোড়া শুরু হইল। বগলের কাছে কোনো কারণ ছাড়াই মইদ্দে মইদ্দে ফুইলা উঠতে শুরু করল। দুধের বোটা থেইকা হালকা খয়েরি রঙের পাতলা কিন্তু আঠা-আঠা রস পড়তে লাগল। চামড়ার নিচে তসবিহ দানার মতো গোটা হইছে বইলা মনে হইল। খাউযাইতে খাউযাইতে দুধের মইদ্দে ঘাও হইয়া গেল। পুঁজ বাইর হওয়া শুরু হইল। নানা জনে নানা জ্ঞান দিবার লাগল। এই বয়সে এমন একটা রোগ কেমতে হইল—না ডাক্তার না কবিরাজ কেউ ঠিক কইতে পারল না। ডাক্তাররা শেষে আক্রান্ত দুধটা কাইটা ফালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, এবং তা না করলে বাকি দুধটাতেও এই রোগ ছড়াইয়া যাইব বইলা রুগিরে জানানো হয়।


মহল্লায় পারবিনের স্তন-বন্দনা ধীরে ধীরে একটা রসাত্মক গল্পে রূপ লাভ করে এবং নানা সংস্করণে তা ডানা মেলতে থাকে।


পারবিনের এক দুধ খোয়ানোর খবরটা পয়লা মুরগিটোলার এই গলি এবং পরে পুরা মহল্লার নারী মহলে চাউর হইয়া যায়, তারপর পুরুষ মহলেও। এই গলি সেই গলি থেইকা নানান বয়সী মাইয়ারা পারবিনরে নানা উসিলায় দেখবার আহে। পারবিন ভালা কইরাই জানে তাদের এই আসার পেছনে এক দুধ ছাড়া একজন জুয়ান মাইয়ারে দেখতে কেমুন লাগে এইটাই মূল বিষয়। জেনানারা বেবাকই মহল্লার রইস। চিনজান। কারে না করন যায়। পারবিন ও তার মায়ের এই এক নতুন জ্বালা।

দুধ হারানোর পর অবশ্য পারবিনের চলনে-বলনে তেমন পরিবর্তন ঘটে না। সে আগের মতোই থাকে। হঠাৎ-বিটাৎ গলি থেইকা কখনো বাইর অইলে মহল্লার ছেলেছোকড়া মাইকি বাপের বয়সী খালু-চাচারা বি তার নির্দিষ্ট জায়গায় যে চোখ রাখে এইটা পারবিন ভালা কইরাই বুঝবার পারে। তয় তারা ঠিক ঠাহর কইরা উঠতে পারত না কোন দুধটা খোয়া গেছে—ডাইনের টা না বায়ের টা। তবে মহল্লায় পারবিনের স্তন-বন্দনা ধীরে ধীরে একটা রসাত্মক গল্পে রূপ লাভ করে এবং নানা সংস্করণে তা ডানা মেলতে থাকে। সেই গল্পে কেউ কেউ সৃজনশীল প্রশ্ন তোলে, ‘আচ্ছা, আল্লায় যদি মাইয়াগো বুকে একটাই দুধ দিত তবে কোন পাশে দিত—ডাইনে না, বায়ে?’—আরেকজনে হয়তো জবাব করত—‘আল্লায় এউগ্গা দুধ দিব কেলা?  আল্লার হিশাব পাক্কা। আল্লায় পোলাগো হাত দিছে ২টা, আর মাইয়াগো বুঝি দুধ দিব ১টা। চোদনা কোনহানকার।’

দুধ হারানোর পর বুকটা দুইপাশে সমান রাখাই পারবিনের নিত্যদিনের বড় কাজ হইয়া দাঁড়ায়। এই কাজে সে তার সৃজনশীলতার চমৎকার পরিচয় দিতে থাকে।

এক দুধ খোয়া যাবার পর পারবিনের মা ছাড়াও সবাই ভাবছিল পারবিনের সাদিটা বুঝি সহজে হইবার নয়। অথচ পারবিনের সাদিটাই অন্যদের চাইতে আগে আগে হইয়া গেল। এইদিকে পারবিনের আগে হয় হয় কইরাও বান্ধবী ফিরোজার সাদিটা ভাইঙা গেল। পারবিনের মা পারবিনের সাদির সম্বন্ধটা আসার লগে লগেই রাজী হইয়া যায়, পারবিনের বাপে বি অমত করে না। বেশি ভালা সম্বন্ধ খুঁজতে গিয়া মাইয়ার বয়স বাড়াইয়া লাভ নাই, এমনিতেই মাইয়ার বয়স বাড়তি। সম্বন্ধটা ভালা। ঢাকাইয়া পোলা; কাউয়ারটেকে নিজেগো বাড়ি। হোক আধা কাঠা। মাস গেলে ভাড়া তো গুনতে হইব না। পারবিনরা বি ঢাকাইয়া, মুরগিটোলার রইস। পারবিনের লগে সামসুর সাদির সম্বন্ধটা নিয়া আহে কাউয়ারটেকেরই চিনজন মোতাছা আসিয়া। মোতাছাগিরিতে অর্থাৎ ঘটকালিতে আসিয়া বেগমের একটা সুনাম আছে।

এক রবিবারে সরকারি ছুটির দিনে পারবিনের লগে সামসুর সাদি মোবারক হইয়া যায়। মাইয়ারে জামাইবাড়ির থন আড়াইদিনের ফিরানি আনার রাইতে পারবিনের মা বুঝতে পারে আবারও সে গর্ববতী হইছে।

ছোটবেলাতেই টিপুসুলতান রোডে এক লেদ মেশিনের দোকানে কাজে লেগে পড়ে সামসু। লেগে পড়ে মানে লাগাইয়া দেয়া হয়।  কাউয়ারটেকের অনেকেই ওর বয়েসে এই কাজে লেগে পরে। লেখাপড়ায় যেহেতু মাথা নাই তাই তাদের বাবা-মারা এই কাজে পাঠাইয়া দেয় আশপাশের অন্যদের দেখাদেখি। সামসুরে অবশ্য প্রথমে ধোলাইখালে এক ভাঙারি দোকানে কাজে লাগাইছিল ওর বাপে, পরে আরেকজনের পরামর্শে ওকে লেদের কারখানায় কাজে লাগায়। লেদের কারখানায় কাজে লাগলে একদিন না একদিন হেড মিস্তিরি হইবার পারব এই আশায়। প্রায় দেড় যুগ কাজ করার পর একদিন বাম হাতের কব্জিতে মারাত্মক আঘাত পায় সামসু। মেশিনের ভেতর হাত চইলা যায় ওর। খুন আর খুন। পয়লা ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে ন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়া যাওয়া হয় তারে। তারা এমন সিরিয়াস রুগিরে ওইখানে ভর্তি রাখে না। পাঠাইয়া দেয় ঢাকা মেডিকেলে। ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তাররা কব্জিটা কাইটা ফালাইয়া দেয়। কব্জিটা তখন না কাটলে পুরা হাতই পরে কাটন লাগত। কী আর করা। তাই সই। টানা ৮ মাস চিকিৎসা চলল। আট মাস পরে টিপু সুলতান রোডেরই অন্য এক দোকানে কব্জিবিহীন নতুন সামসু নতুন করে চাকরি নিল। আর সামসুর মা যখন এক হাত কাটা পোলার বিয়া হওয়া নিয়া দুঃশ্চিন্তায় দিন গুজরায় তখনই আসিয়া মোতাছা পারবিনের সম্বন্ধটা নিয়া বাড়ি আসে।


যেই রাইতে দেশের রাষ্ট্রপতি নিহত হয় সেই রাইতে সামসু আর পারবিন দম্পতির ঘরে জোড়া সন্তান আহে।


কব্জি না থাকার কারণে নতুন কারখানায় সামসুকে আর তার শেষ পদবী ফোরম্যান অর্থাৎ হেড মিস্তরির মর্যাদা দেয়া হয় না; যে পদটা সে অনেক সাধনায় আগের কারখানায় অর্জন করেছিল। এখন মনে হয় বাকী জীবন হেড মিস্তরির অ্যাসিস্টেন্ট হিশাবেই চাকরি করতে হইব। কব্জি ছাড়া লোকেরে কোন মহাজনই বা ফোরম্যান বানাইবো? এই নিয়া সামসুর এখন খেদ নাই। যারে সে পিচ্চিকাল থেইকা নিজের হাতে কাজ শিখাইছে সেই ফয়সল এখন এই নতুন কারখানার ফোরম্যান। নিজের সাগরেদের আন্ডারে কাজ করতে সামসুর পয়লা একটু দির লাগলেও এখন গর্বই হয় তার। তাছাড়া একটা কাজও তো তার দরকার, তাই না? ফয়সলের বেরেন ছিল ভালা। চট কইরা ধরবার পারত। অন্যদের চেয়ে দ্রুত সে কাজ শিখে ফেলত। তারই ফল সে পাইছে। বয়সের তুলনায় এই লাইনে ও তাড়াতাড়িই ফোরম্যান হইবার পারছে। ওস্তাদের জন্য ওর দরদ আছে ঠিকই। ও-ই মহাজনরে রাজী করাইয়া ওস্তাদ সামসুরে এইহানে কাজে নিয়া আইছে। এখন সাগরেদ আর ওস্তাদে ভালাই মিল খাইছে।

বিয়ার বছর না ঘুরতেই যেই রাইতে দেশের রাষ্ট্রপতি নিহত হয় সেই রাইতে সামসু আর পারবিন দম্পতির ঘরে জোড়া সন্তান আহে। পারবিনের সদ্য হওয়া বইনের লগে পারবিনের জমজ পোলারা বি নানির দুধে ভাগ বসাইয়া বড় হইবার থাকে।

অস্ট্রিক আর্যু
অস্ট্রিক আর্যু

Latest posts by অস্ট্রিক আর্যু (see all)