হোম গদ্য গল্প জেরিন ভালো নেই

জেরিন ভালো নেই

জেরিন ভালো নেই
306
0

কাকতালীয়ভাবে ওর সঙ্গে আমার দেখা।

কলেজে যাচ্ছি; সাড়ে আটটার বিরতিহীনে। সেকেন্ড পিরিয়ডে ক্লাস। কাজেই, ধীরে-সুস্থে একটু দেরি করেই যাচ্ছি। প্রতিদিনের মতো সুশান্ত সঙ্গে আছেন। চারখাই পৌঁছাতে পৌঁছাতে ড্রাইভার একটা ঘণ্টা পার করে দিলো। এদিককার বিরতিহীনগুলো নামেই বিরতিহীন। প্রায় সব স্টপেজই ধরে।

গরমও পড়েছে এই সাতসকালে। আকাশটা ঘন মেঘে ঢেকে থাকায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

বৈশাখ মাসের আজ কুড়ি তারিখ। বছর দশেক আগেও এই সময়ে বৈশাখের তাণ্ডব দেখেছি। অথচ, আজ কুড়ি দিনেও বৈশাখের তাণ্ডব নেই; কালবোশেখির দেখা নেই। আবহাওয়া ধীরে ধীরে তার রূপ পাল্টাচ্ছে।

জানালার পাশ দিয়ে কৃষাণ-কৃষাণির বোরো ধান কাটার উৎসব দেখতে দেখতে গাড়ি যে কখন চার খাই এসে দাঁড়িয়েছে, টের পাই নি। মিনিট পাঁচেক দাঁড়ানোর কথা, অথচ, প্রায় মিনিট পনের ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দুয়েকজন যাত্রী মুখ খুলতে শুরু করতেই প্রায় সবাই গলার জোর পেয়ে চিৎকার দিলে, ড্রাইভারকে বলতে শোনা গেল, ‘চাক্কা পামসাট অই গেছে। মেহেরবানি করি বাট চাউক্কা। চাক্কা বদলাই লেইয়ার।’

সব যাত্রীই বিরক্তি প্রকাশ করে চুপ হয়ে গেল। কেউ কেউ বিরূপ মন্তব্য করে নামতে নামতে বলল, ‘এই বেটা হেন্ডিম্যান, টেকা ফিরত দে।’ এই সময় পেছন থেকে কেউ একজন মন্তব্য করে উঠল, ‘ই পনের মিনিট কিতা করছত, গাধার বাইচ্চা গাধা।’ আবার শোরগোল লেগে গেল। ড্রাইভার কোনো উত্তর করল না। কন্ডাক্টর আর হেল্পারকে সঙ্গে নিয়ে চাকা বদলাতে নেমে পড়ল।


নারী সঙ্গ আমার কাছে মুখ্য নয়। তবে, যৌবনের ধর্ম অস্বীকার করি না।


ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছি। ঘাড় দিয়ে কয়েক ফোটা শরীরের কান্না পিঠ গড়িয়ে শার্টে, ফের পিঠে পড়তেই গাড়িতে থাকা আর সমীচীন মনে হল না। নেমে এলাম। নেমে এসে সামনের বিশাল অশত্থ গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ড্রাইভার-হেল্পারের পাংচার্‌ড হওয়া চাকা সারাবার ম্যাকানিজমের দিকে এক মনে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই খেয়াল করলাম, আরেকটি গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। কন্ডাক্টরের চিৎকার শোনা গেল। ‘আগে নামতে দেউক্কা, তারপর উঠবা।’

কত যাত্রী উঠছে, নামছে। ঘোমটা মাথায় কেউ একজন নেমে এল। কাছাকাছি আসতেই চোখের ঝাপসা ভাব দূর হতেই ভালো করে খেয়াল করলাম। এ তো জেরিন! সঙ্গে শ্মাশ্রুমণ্ডিত একজন লোক। নিশ্চয়ই স্বামী।

মস্তিষ্কের নিউরনে জমায়িত স্মৃতিগুলো দ্রুত প্রায় দুইযুগ আগের সময়ে নিয়ে গেল।

তখন আমি টগবকে উচ্ছল এক তরুণ। এইচ. এস. সি. পাশ করে সবেমাত্র অনার্সে ভর্তি হয়েছি। রক্তে ঢেউ খেলা করছে। ক্লাসও শুরু হয়েছে। লম্বা সদরুলটা আমার সঙ্গে ভিড়ে গেল। মাসখানেক ওর সঙ্গে একনাগাড়ে দিন-রাত ঘুরে উপলব্ধি করলাম, ওর আমার ব্যবধান দুস্তর।

আমি ইলেভেন থেকেই ক্লাস, ছাত্র রাজনীতি আর টেবিল টেনিস নিয়ে আছি। ক্লাস শেষে সামান্য কিছুক্ষণ খেলে শ্লোগানে শ্লোগানে সময়টা পার করে দিই। মেহনতি মানুষের মুক্তি খুঁজি। নারী সঙ্গ আমার কাছে মুখ্য নয়। তবে, যৌবনের ধর্ম অস্বীকার করি না। আর ও সম্পূর্ণ উল্টো। মধুসুধা পান করা অলি।

ক্লাস শেষে জারুল তলা হয়ে পোস্ট অফিসের দিকে যাচ্ছি, জেরিন আর সুজানাকে সিঁড়ি বেয়ে অফিসের দিকে যেতে দেখলাম। একটু দূরে এক দঙ্গল ছেলে গাছের নিচে সুনিবিড় ছায়ায় বসে ‘জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজও আমি…’ কোরাস গাইছে। সদরুলের সেদিকে খেয়াল নেই। ও সামনের দিকে চেয়ে বলল, ‘ঐ লম্বা মালটা আমার, আর তুই ছোট, ছোটটাকে নিয়ে থাক।’

হৃদয়ের তন্ত্রীতে একটা সুরের মূর্ছনা ঝড় তুলল। তাল মেলাতে লাগলাম।

বলল, ‘মালদের নাম জানিস?’

বললাম, ‘ছোটটা জেরিন, লম্বাটা সুজানা।’

বলল, ‘তোরটা আগে আর আমার লম্বাটা পেছনে! শালা বদমাশ। চল অফিসে যাই।’

হাসতে হাসতে জীবনানন্দ মেলাতে মেলাতে দ্রুত হেটে জেরিন-সুজানার সঙ্গী হয়ে গেলাম।

মাস ছয়েক স্বপ্নের মতো কেটে গেল। খুনসুটি-আড্ডা গান গাওয়া, বই আদান-প্রদানের মাধ্যমে সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ হয়ে এল।

একদিন ইচ্ছে করেই ওর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্যে সিলেবাসের একটা বই রেখে দিয়ে বললাম, ‘তোমার বই হারিয়ে ফেলেছি।’

বলল, ‘ব্যাপারই না। আরেকটা কিনে নেব।’

আরেকদিন, শরীর একটু গরম, মায়ের বারণ সত্ত্বেও কলেজে এসেছি, টের পেয়ে টিলাগড়ে গিয়ে ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল নিয়ে এসে জোর করে গিলাল।

এত কিছুর পরও মূল নেশা ছাত্র রাজনীতি ছাড়তে পারি নি। ছাত্র রাজনীতি করি, জেরিনের সঙ্গেও ঘুরি।

একদিন লেগে গেল ধুন্ধুমার সংঘর্ষ। সংখ্যায় কম থাকায় প্রতিপক্ষের ভয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলাম। জড়ো হলাম, জিন্দাবাজারে।

সেদিন জেরিন কলেজে যায় নি। কোত্থেকে যেন রিকশায় ফিরছিল। আমাকে দেখে ত্বরিত রিকশা থামাল। তারপর বলল, ‘চলো আমার সঙ্গে।’ তবুও সঙ্গী হলাম না। অগত্যা চলে গেল।

মিনিট বিশেক পরে আবার ফিরে এল। এবার পায়ে হেঁটে। খুঁজে বের করে বলল, ‘ঐ যে আমাদের বাসা। প্রয়োজনে যেও।’ গেলাম না। সঙ্গী কমরেডদের রেখে কিভাবে যাই!

পরের দিন কলেজে দেখা। ততক্ষণে, আমাদের প্রতিপক্ষ রণে ভঙ্গ দিয়েছে। কলেজে আমাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বলল, ‘অনেকক্ষণ জানালায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, যতক্ষণ তুমি ছিলে। এগুলো কী করো, ইমরুল! কালকে যদি তোমার কিছু একটা হয়ে যেত।’

ছাত্ররাজনীতি করি, মেহনতি মানুষের মুক্তি চাই। তাই, সস্তা আবেগকে পাত্তা দিলাম না। মেহনতি মানুষের মুক্তির চেষ্টা অব্যাহত রাখলাম। আরও ব্যাপকভাবে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লাম। তবে, জেরিনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকল।

দেখতে দেখতে একটা সময় ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা চলে এল। পরীক্ষার সপ্তাহ-দশদিন আগে ওর কাছ থেকে শিট যোগাড় করে কোনোমতে পড়ে-টড়ে পরীক্ষা দিলাম।

পরীক্ষা খারাপ হয়ে গেল।

ভাবনায় পড়ে গেলাম। মনের মধ্যে দোনো-মনো চলল। অবশেষে,পড়াশুনার জয় হলো।


দেখি, জেরিন আর আমাতে নেই। জেবুলের সঙ্গে ভিড়ে গেছে।


ধীরে ধীরে ছাত্র রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। আগে থেকেই আউট বই পড়ার একটা অভ্যেস ছিল, এবার তা বহুগুণে তা বৃদ্ধি পেল। ক্রমেই বুক ওয়ার্মে পরিণত হলাম। বছর খানেকের মধ্যে, জ্ঞানচর্চার বিশাল যে একটা ঘাটতি ছিল, তা কিঞ্চিত পরিমাণ হলেও পুষিয়ে নিলাম। সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষাও বেশ ভালো ভাবে দিয়ে ফার্স্ট ইয়ারের মার্কসের দীনতাও কাভার করে দিলাম।

থার্ড ইয়ারে উঠে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। ছাত্র রাজনীতিতে আমার যারা প্রতিপক্ষ ছিল, একদিন প্রতিপক্ষের সঙ্গে মারামারি করে আমার ওপর প্রতিশোধের ঝাল মেটাল। যতই বলি, ‘আমি আর ছাত্র রাজনীতি করি না, বছর খানেক আগে ছেড়ে দিয়েছি।’ কে শোনে কার কথা! পা থেকে হাঁটু পর্যন্ত ইচ্ছে মতো কোপাল।

মাস খানেক হাসপাতালে থাকলাম। হায়রে কী যন্ত্রণা! বন্ধু-বান্ধব সবাই এল। দেখল, সহানুভূতি দেখাল। অনেকে রক্ত দিল। একসময় জেরিনও এল। তবে, হাবভাব দেখে মনে হলো, যেন কর্তব্যের খাতিরে কর্তব্য করতে এসেছে।

ভালো হয়ে ডাক্তারের পরামর্শে ক্রাচে ভর করে ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম।

দেখি, জেরিন আর আমাতে নেই। জেবুলের সঙ্গে ভিড়ে গেছে।

সবকিছু ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নিজেকে নিয়ে আবার ব্যস্ত হয়ে গেলাম। ক্লাস করা ,বই পড়া নিয়ম মাফিক চলল।

সময় দ্রুত চলে।

এক সময় ছাত্রত্ব শেষ হয়ে এল। জীবনের আহবানে সাড়া দিয়ে সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল। বছর পাঁচেক ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, এক সময় সে সুতোও ছিড়ে গেল।

সেই সময়ে জেলা সদরের একটা মহিলা কলেজে যোগ দিয়েছিলাম, ভাগ্য ভালো, বছর তিনেকের মধ্যে সেই কলেজ সরকারি হয়ে গেল।

জেরিনের কথা তেমন একটা জানি না। যখন বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, জেনেছিলাম, একজন ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে ওর বিয়ে হয়েছে।

ইনি কি সেই ইঞ্জিনিয়ার?

পাংচার্‌ড হওয়া চাকা বদলিয়ে ইতোমধ্যেই নতুন চাকা লাগানো হয়েছে। যাত্রীরা উঠতে শুরু করেছে। কন্ডাক্টর চিৎকার দিচ্ছে, ‘উটুক্কা, জলদি উটুক্কা।’

আস্তে আস্তে গাড়িতে উঠলাম।

জেরিন আর তার স্বামী হেঁটে অনেক দূরচলে গেছে। আস্তে আস্তে তারা দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে গেল।

মুখ যদি মনের প্রতিচ্ছবি হয়, তাহলে এক পলকের দেখায় বলতে পারি, জেরিন ভালো নেই।

iqbal@gmail.com'
iqbal@gmail.com'

Latest posts by ইকবাল তাজওলী (see all)