হোম গদ্য গল্প জীবনানন্দ আ-কালে আমাদের স্বপ্নদোষ

জীবনানন্দ আ-কালে আমাদের স্বপ্নদোষ

জীবনানন্দ আ-কালে আমাদের স্বপ্নদোষ
179
0

আমাদের স্বপ্নদোষ


মিস সাগুফতা সরকার আ আ সূচক ধারাল চিৎকার দেন প্রথমে, তারপর গোঙানি। এবং এরকম একটা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে করতে উনি ক্লাস থেকে দেন দৌড়। তার এই পরিস্থিতিতে থার্ড ইয়ারের ছেলেমেয়েরা তখনও বুঝে উঠতে পারে না তাদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত! তখন কেবল তারা ক্লাস থেকে বের হয়ে বিভাগীয় প্রধানের অফিসরুমের দিকে উঁকি মারার কৌতূহল বোধ করে। মিস সাগুফতা সরকার ওইদিকে দৌড় দিয়েছেন। শাড়ি পরেও যে এত জোরে দৌড়ানো যায় এই দৃশ্য না দেখলে বোঝা মুশকিল। আরও মুশকিল মিস সাগুফতা সরকার দৌড় দিয়েছে, যার পেছনে ভার্সিটির অবিবাহিত এবং বিবাহিত শিক্ষকেরা সকাল-বিকাল দৌড়ায়। স্টুডেন্টরা দৌড়াতে না-পারার আক্ষেপে হাঁটে আর ফেসবুকে টুংটাং আওয়াজ করে। এইরকম একজনকে যখন থাপ্পড় মারা হয় এবং গলা টিপে ধরা হয় তখন এটাতে সকলেই মর্মাহত এবং অ্যাটেম্পট টু মার্ডার হিশেবে আখ্যা দেয়। এটা শোনার পর মিস সাগুফতা সরকার ভিসির রুমে কান্নার-আশায় যে টুকু চোখের পানি জমা রেখেছিলেন সেটাও চোখ থেকে ফেলে দেন।

২.
জীবনানন্দ এমন কাজ করতে পারে এটা বিশ্বাস হয় না। তার মতো এমন একজন গোবেচারা মানুষ সাগুফতা সরকারের মতো একজন সুন্দরীকে থাপ্পড় মারবে, গলা দাবাবে এটা অসম্ভব। এমন কথার প্রেক্ষিতে নাই নাই করে জীবনানন্দের পক্ষেও একটা হালকা গোষ্ঠী মত দিতে থাকে। তারা বলে যে, নিশ্চয়ই ডাল মে কুচ কালা আছে। তখন মিস সাগুফতা সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলে, এই মহিলা তার রূপের জোয়ারে সব পুরুষরে ভেড়া বানায়া ভাসাইতে চায়। জীবনানন্দরে সে পারে নাই। আর তাই এমন দোষ দিচ্ছে।


জীবনানন্দদের মতো পুরুষদের তার চেনা আছে। এরা মিনমিন করে কথা বলে, আর নারীদের নির্যাতন করে।


সাগুফতা সরকারের টকটকে আপেলের মতো লাল গালের সেলফি ফেসবুকে দেওয়ার পর নারীবাদীরা ফুঁসে ওঠে। তারা কর্মক্ষেত্রে নারীর এই অবমাননা কোনোমতেই মেনে নিতে রাজি নয়। অবিলম্বে জীবনানন্দকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা না-হলে সারাদেশে বিক্ষোভের ডাক দেওয়ার হুমকি দেয়। এবং একইসঙ্গে এই বিক্ষোভ সফল করার জন্য ওইদিন বাসাবাড়িতে কাজ করা সকল কাজের বুয়া-টাইপ নারীদের খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে কাজ সেরে রাখার তাগিদ দেওয়া হয়। মিস সাগুফতা সরকারের গুণগ্রাহী ছাত্ররা যারা এতদিন তার পেছেনে হাঁটত তারা এবার তার পাশে যাওয়ার একটা চান্স খোঁজে। আর তাতে দেখা যায় যে, তারা ভার্সিটির ভিতরে জীবনানন্দর একটা কুশপুত্তলিকা জ্বালায়।

ছাত্রদের এহেন কর্মে শিক্ষকেরাও কিছু একটা করার তাগিদ বোধ করে আর তাতে তারা হাতে হাত রেখে মানববন্ধন করতে আগ্রহী হয়। মানববন্ধনে সাগুফতা সরকার নিজেও হাজির হয়। তখন ফিলসোফির এক শিক্ষক বলে, উনার থাকাটা বোধহয় যৌক্তিক হবে না। আর তখন সাগুফতা সরকার বলে, সে থাকবে। তা না-হলে হয়তোবা অনেকেই মনে করতে পারে, তিনি ভেঙে পড়েছেন। ফিলসোফির ওই শিক্ষক যখন আরেকটা যুক্তি দেওয়ার কসরত করছিলেন তখন জেন্ডার স্টাডিজ-এর এক ম্যাডাম তাকে আচ্ছা ধ্যাতানি দিয়ে বলে, জীবনানন্দদের মতো পুরুষদের তার চেনা আছে। এরা মিনমিন করে কথা বলে, আর নারীদের নির্যাতন করে। আর আপনিও ওই দলের লোক কি-না আমার সন্দেহ হয়। কারণ মিনমিনা পুরুষেরা নারী নিপীড়নের ওস্তাদ। ফিলসোফির শিক্ষক ঢোক গিলে আর ভয় পায়, যাতে তার বউয়ের কাছে এই খবর না-যায়।

মানববন্ধন শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে একটা হট্টগোল বাধে। বেশ কয়েকজন শিক্ষক যারা অনেকদিন ধরে সাগুফতা সরকারের পিছে দৌড়াচ্ছিলেন তারা এখন তার পাশে আসার একটা চান্স খোঁজে। মানববন্ধনে হাতে হাত রেখে দাঁড়ানোর এই দুর্লভ সুযোগটা চাঁদে পা দেওয়ার মতো কিংবা তারচেয়েও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে তাদের কাছে। কিন্তু এইখানেও সিনিয়র প্রফেসররা অগ্রাধিকার চায়। তখন সিনিয়র আর তরুণ শিক্ষকদের মধ্যে একটা হট্টগোল লাগে। হট্টগোলে মানববন্ধন ভেস্তে যাবার দশা হলে সাগুফতা সরকার কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, প্লিজ আপনারা আমার কথাটা একবার ভাবুন। ঠিক ওইসময় সেখানে ভিসি এসে হাজির হয় আর বলে, আমি ধরব সাগুফতার হাত। তখন সেখানে উপস্থিত শিক্ষকরা আমতা আমতা করে বলে, স্যার আরেকটা হাত তো ফাঁকা থাকবে। সেটা কে ধরবে? ভিসি তাড়াহুড়া করে বলে, কেন, দুটো হাত ধরার শক্তি কি আমার নাই! তখন সবাই আবার আমতা আমতা করে বলে, স্যার, মানববন্ধনে একজন আরেকজনের একটা করে হাত ধরে দাঁড়াতে হয়। তখন ভিসি রেগে গিয়ে বলে, দুটো হাত দিয়ে না ধরলে বন্ধন শক্ত হবে কিভাবে? এক হাতের কাজ কখনোই ভালো ফল আনে না। তখন সবাই একসাথে মাথা কাত করে সায় দেয়। তখন ভিসি বলে, এটা খুব শক্ত একটা ইস্যু। অতএব, এক হাতে করা যায় এমন কোনো কর্মসূচি দিয়ে এটাকে হালকা করা যাবে না। আপনারা অন্য কোনো কর্মসূচি নেন যেটাতে একজন আরেকজনের দুটো হাত শক্ত করে ধরতে পারেন। আপনারা আজ ছন্নছাড়া, তাই এই অবস্থা। একথা বলে তিনি মিস সাগুফতাকে বলেন, যেহেতু আপনি ভিকটিম, তাই এখানে আপনার থাকা ঠিক নয়। আপনি আমার গাড়িতে গিয়ে বসুন, আর আপনারা মানববন্ধন করুন।

এই ঘটনা নিয়ে একটা তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়। অতিউৎসাহী কমিটির সদস্যরা তিনদিনের মাথায় রিপোর্ট জমা দেয়। রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, মিস সাগুফতা সরকার সেদিন খুব সাজগোজ করে এসেছিলেন। কারণ কার সঙ্গে যেন তার ভিডিও চ্যাট করার ডেট ছিল। তারপর বিভাগীয় প্রধানের রুমে যান। সেখানে কুশলাদি বিনিময় করেন। বিনিময় করতে করতে একটু সময় গড়িয়ে যায়। ফলে তার সকাল ১১টার যে ক্লাস সেটা শুরু করতে সকাল সাড়ে ১১টা বাজে। উনি ক্লাসে হাজির হয়ে শোনেন জীবনানন্দ দাশের কবিতা আলোচ্য। তখন তিনি বলেন, জীবনানন্দ দাশ গ্রামের কবি ছিলেন। তার ‘বিড়াল’ কবিতায় বিড়াল আছে, ‘শকুন’ কবিতায় শকুন আছে, ‘অন্ধকার’ কবিতায় অন্ধকার আছে, ‘কমলালেবু’ কবিতায় কমলালেবু আছে। কমলালেবুর চেয়ে আম ভালো। তোমাদের এসাইনমেন্ট থাকল, জীবনানন্দ দাশ আম নিয়ে কবিতা লিখেছে কিনা সেটা খুঁজে আনা। তখন তিনি আরও বলেন, জীবনানন্দ দাশ অনেক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায়। আর তখন ফ্যানের বাতাসে পৃষ্ঠা উল্টে ‘ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল’ কবিতাটা বের হলে তিনি বলেন, রাঙা আপেলের মতো লাল যার গাল, এটা জীবনানন্দ দাশ তাকে নিয়ে লিখেছে। এই কথা বলার পরপরই তার গালে থাপ্পড় পড়তে থাকে এবং থাপ্পড় দিতে দিতে গলাও টিপে ধরে। আর তখন মিস সাগুফতা সরকার জীবন বাঁচাতে প্রথমে আ আ করে তারপর গোঙাতে গোঙাতে দৌড় দেয়। তদন্ত কমিটির তিন সদস্য জীবনানন্দ দাশের বিড়াল, শকুন, অন্ধকার, কমলালেবু কবিতাগুলো পড়ে দেখেন এবং তারা বিড়াল শকুন, কমলালেবু ও অন্ধকার দেখতে পান।


জীবনানন্দ দাশ একজন ভ্রষ্টপুরুষ। অনেক নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল।


তদন্ত কমিটির রিপোর্টের প্রেক্ষিতে জরুরি সভায় জীবনানন্দ দাশকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারও কাছে জীবনানন্দ দাশের বই পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।


জীবনানন্দ দাশের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে, না-হলে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে জীবনানন্দকে ফিরিয়ে আনা হবে—কবি সমাজের এমন হুমকির মধ্যে নারীবাদীরাও আন্দোলনের ডাক দেয় এবং তারা বলে, জীবনানন্দকে ফিরিয়ে আনা হলে দাঁত ভাঙা নয়, দাঁত উপড়ে ফেলা জবাব দেওয়া হবে। এরকম পাল্টাপাল্টি কথায় সামাজিক মিডিয়া গরম হলে দেশের একজন স্বঘোষিত বড় কবি এবং একজন নারীবাদী নেত্রীকে নিয়ে টক শো আয়োজন করা হয়। টক শোতে নারীবাদী নেত্রী বলেন, জীবনানন্দ দাশ একজন ভ্রষ্টপুরুষ। অনেক নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। সুরঞ্জনা, বনলতা, সবিতা, সুচেতনা, শ্যামলী এদের নিয়ে তো কবিতা আছেই, এদের বাইরেও আরও অনেকেই আছে। এটা নিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া হতো এবং সংসারে অশান্তি হয়। এই লোক মাঝে মাঝে বাড়ির বাইরেও রাত কাটাত। নারীনেত্রীর এইসব কথার পিঠে কবি বলেন, নারী ছাড়া কবিতা হয় না, হয় নাকি? তো জীবনানন্দ দাশ ছিলেন প্রকৃতির কবি, নির্জনতার কবি। আরও কিছু বলতে চাচ্ছিলেন বড় কবি, কিন্তু তখনই নারীবাদী নেত্রী বলেন, আপনারা কবিরা এত নির্জনতা খোঁজেন কেন? নির্জনতায় আকাম করতে সুবিধা, তাই না?  কবিদের চেয়ে যারা নাটক, সিনেমা, অ্যাড বানায় তারা অনেক ভালো। কারণ তারা নারীদের ব্যবহার করে টাকা দেয়, কিন্তু আপনারা নারীকে ব্যবহার করে কবিতা লেখেন, কিন্তু কাউকে তো টাকা দেন না। তখন নারীবাদী নেত্রী উদাহরণ হিশেবে বলে, আমার এক কবির সঙ্গে প্রেম ছিল, সে আমাকে মডেল বানিয়ে অনেক কবিতা লিখেছে, সে এখন বিখ্যাত, কিন্তু আমাকে মডেলিংয়ের জন্য একপয়সাও দেয় নি, উল্টো সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে। তখন বড় কবি বলে, তারপর থেকেই কি আপনি নারীবাদী হয়ে গেলেন? কবির এমন কথায় নারীবাদী নেত্রী জ্বলে ওঠেন এবং বলেন, পৃথিবীর সকল কবি অসভ্য। অশ্লীল কবিতা লেখার দায়ে জীবনানন্দ চাকরি হারায়। আপনিও একটা অসভ্য। এইবার বড় কবি মিনমিনে স্বরে বলেন, আশলে উত্তরাধুনিক কবিদের পাঠ করার সময় এখন। অতএব, জীবনানন্দ দাশ না-পড়লেও কোনো ক্ষতি হবে না। এরপর বড় কবি স্বরচিত একটি কবিতা পড়ে শোনান।


আ-কালের পরেরকাল


জীবনানন্দ দাশের কাছে রবীন্দ্রনাথ হুড়মুড় করিয়া বসিয়া বলিল, তুমিই প্রকৃত গুরু, তুমি কেমন করিয়া করিলে, মন্ত্র দাও। আর নজরুল বাবরি চুল ঝাকুনি দিয়া বলিল, মন চাহিতেছে আবার মিলিটারিতে নাম লেখাই আর সবকয়টারে ক্রসফায়ারে শেষ করি। তখন জীবনানন্দ বলিল, দ্যাখো, আমি জীবিতকালে পাঠক পাই নাই, তাহাতে আমার মনঃকষ্ট হইলেও মানিয়া নিছি। কিন্তু মরার পরে আমাকে ভুলভাবে পাঠ করা হইতেছে, অপবাদ দেওয়া হইতেছে, ইহা মানিয়া নেওয়া আর সম্ভব হইল না। এখন আমাকে নিষিদ্ধ করা হইয়াছে, আর পাঠ করা হইবে না। তাহাতে আমি বড়ই সন্তুষ্ট। তবে আর দুইখানা কাজ বাকি আছে, একজন আমারে নিয়ে ভুলভাল নভেল না কি লিখিয়াছে, আমি তাকে একখানা চটকানা দিব, আর একজন সিনেমা বানানোর পাঁয়তারা করিতেছে, তাকে একখানা চটকানা দিব। তারপর শান্তিতে ধবল মেঘ দেখিব। তখন রবীন্দ্রনাথ বলিল, আমার কী হইবে, আমার তো গল্প, নাটক, উপন্যাস, সংগীত, প্রবন্ধ সবকিছুই পাঠ্য। এত এত বিকৃত পঠন, বিকৃত সংগীত থামাইতে তো জীবন কাটিয়া যাবে। কে আমাকে উদ্ধার করিবে, পৃথিবীতে কে কাহার? তখন জীবনানন্দ বলিল, পৃথিবীতে কে কাহার জানি না, তবে আ-কালে সকলে সকলের। তখন রবীন্দ্রনাথ বলিল, বলিয়া দাও গুরু, বলিয়া দাও। তখন জীবনানন্দ বলিল, আসছে আষাঢ়ে গপ্পোটা হবে…

তখন নজরুল মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলিল, গুরু, আমার কেসটা তো ডেঞ্জারাস, একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়ে যেতে পারে।

জীবনানন্দ বলিল, তুমি বরং মিলিটারিতেই যাও…

Masud Parvaj

মাসুদ পারভেজ

জন্ম ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫; দিনাজপুর।

শিক্ষা : স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

প্রকাশিত বই—

জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]
বিচ্ছেদের মৌসুম [গল্প, দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
ঘটন অঘটনের গল্প [গল্প, বটতলা, ২০১১]

ই-মেইল : parvajm@gmail.com
Masud Parvaj

Latest posts by মাসুদ পারভেজ (see all)