জামিলা

জামিলা
906
0

১.
পাশের বাড়ির ছাদে খাঁচার মধ্যে মোরগের ডাক শুনে ভোরের বাতাস ফেড়ে ‘আম্মা’ রবে হামলে উঠল জামিলার ছেলে। ক্ষুধায় পেট চোঁ করে ওঠার আগে ছেলের জন্য ছ্যাঁৎ করে উঠল জামিলার বুক।

কিন্তু তিন দিনের জ্বরে আধমরা মফিজের নড়াচড়া নেই।

জামিলা ভাবে, সম্ভবত মরে নি। কিন্তু মরলেই ভালো হতো।

গর্দান টান করে সামনে ঝুঁকে মুখটা নিচে নামিয়ে জামিলা ফোঁস শব্দ তুলে এত জোরে শ্বাস ছাড়ল যে আশপাশের ধুলা সব উড়ে গেল। তারপর বাতাস বেজে উঠল পটাং শব্দে, ছোটখাটো এক বোমা ফাটল যেন। সেই শব্দে আধমরা মফিজের বন্ধ দুই চোখ গেল খুলে; জুলজুল চোখে চেয়ে সে দেখল, জামিলা তুফানের বেগে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।

সে-তুফান দেখতে পেল জামিলার ছেলেও, কারণ সেই তখন থেকে সে মায়ের দিকেই চেয়ে ছিল।

মা উঠানের দরজা দিয়ে ঝড়ের বেগে অন্তর্হিত হলে ‘আম্মা’ রবে আর্তনাদ বেরিয়ে এল সন্তানের গলা থেকে। নীরব নির্জন ভোরে সেই আম্মা ডাক ছুটন্ত জামিলার পিছু পিছু গড়িয়ে চলল অনেক দূর পর্যন্ত।

মনসুরাবাদ পার হয়ে প্রথমে বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির প্রধান সড়ক, তারপর এ-রাস্তা ও-রাস্তা ধরে দৌড়ুতে দৌড়ুতে হাউজিং সোসাইটির ভদ্র চৌহদ্দি পার হয়ে পুরাতন পাড়াটির আরও পুরাতন গলি-ঘুপচিগুলো অতিক্রম করে আদাবর বাজারের কোণে রিং রোডে উঠে থেমে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এদিক-ওদিক তাকাল জামিলা। কিন্তু কিছু দেখতে পেল না, চোখে অন্ধকার : এই দৌড়-ঝাঁপের মধ্যে ক্ষুধাটা চাগিয়ে উঠল পাঁচ গুণ বেশি তেজি হয়ে।

জামিলা টের পেল তার নাড়িভুঁড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। সে রিং রোড ধরে ডান দিকে কিছুক্ষণ হেঁটে এগোবার পর ঢুকে পড়ল রাস্তার বাম পাশের মহল্লা টিক্কাপাড়ার ভিতরে। আঁকা-বাঁকা এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা ধরে কিছু দূর যাওয়ার পর সে দেখতে পেল একটা বাড়ির দেয়ালের গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বেশ টগবগে এক পেঁপে গাছ। বেশি উঁচু নয়, সবগুলো ডাল-পাতা নাগালের মধ্যেই। জামিলা সেদিকে মুখ বাড়াতেই জানালা দিয়ে ছুটে এল গম্ভীর ধমক : ‘ওই, ক্যাডা রে!’

জামিলা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু স্থির করতে পারল না কোন দিকে যাবে। টিক্কাপাড়ার ভেতরের আঁকাবাঁকা রাস্তাটার দুই পাশে কিছু দূর পর পর সরু সরু গলি চলে গেছে আরও ভেতরের দিকে। ওই পথগুলোকে জামিলার বিপজ্জনক মনে হলো; তাই সে এগিয়ে চলল মূল রাস্তাটা ধরেই। কিছু দূর এগোবার পর তাকে থেমে দাঁড়াতে হলো, কারণ সেখানে রাস্তাটা তিন ভাগ হয়ে চলে গেছে তিন দিকে। কোন দিকে যাওয়া উচিত সে বুঝতে পারল না, খানিক দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কিছু না ভেবেই ডান দিকে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।

কয়েক কদম হাঁটার পর সে দেখতে পেল রাস্তার ডান পাশে পেট-সমান প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এক মসজিদ। ঘেরার ভেতরে উঠোনের মতো জায়গায় একটা ছাগলের গলায় ছুরি চালানো হচ্ছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে গেল; জামিলা তা দেখে দুচোখ বন্ধ করে দৌড়াতে আরম্ভ করল।

*

রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুলের দক্ষিণ পাশের সীমানা-প্রাচীরের ধার দিয়ে যে-রাস্তাটি সোজা পুব দিকে এগিয়ে মিরপুর রোডে পড়েছে, জামিলা এগিয়ে চলল সেই থানা রোড ধরে। তার বাম পাশে লম্বা প্রাচীরের ধার ঘেঁষে নানা জাতের গাছের চারার নার্সারি। সেই চারাগুলোকে দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল জামিলা। বিচিত্র চেহারা-সুরত আর স্বভাব-চরিত্রের চারাগুলো নীরবে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল জামিলাকে। তাদের রক্ষক-পরিচর্যাকারী-বিক্রেতাদের একজন আরেকজনকে বলল, ‘মামু, দেখিছ কত্ত বড় ওলান!’

গরম হয়ে উঠল জামিলার দুই কান। সে দ্রুত পা চালিয়ে, প্রায় দৌড়ানোর গতিতে এগোতে লাগল। স্বাস্থ্য উদ্ধারের আকাঙ্ক্ষায় যেসব নারী ও পুরুষ চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে যাচ্ছিল, তারাও হাঁটার গতি কমিয়ে, কেউ-বা থেমে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে লাগল জামিলাকে। তারাও তাকে নিয়ে, বিশেষত তার স্তনের বিশালতা নিয়ে অশ্লীল কথাবার্তা বলল। সে সব শুনতে শুনতে আরও বেড়ে গেল জামিলার চলার গতি। কিন্তু সে দৌড় শুরু করল না, এই ভয়ে যে, তাতে শান্ত সকালে জনসাধারণের শান্তি ভঙ্গ হতে পারে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।


বিরোধী দলের মহাসচিব এ-ঘটনাকে মর্মান্তিক ও ন্যক্কারজনক বলে আখ্যা দিয়ে বললেন, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার সমস্ত ঘাসকে ক্ষমতাসীন দল নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি বলে মনে করে


থানা রোড যেখানে মিরপুর রোডের সঙ্গে মিলেছে, সেই ক্রসরোডের শুরুতে জামিলাকে থেমে দাঁড়াতে হলো। কারণ, বড় বড় বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার ইত্যাদি মোটরযান চলছে এত ঘন হয়ে যে রাস্তা পার হওয়ার ফাঁক-ফুরসত মেলা প্রায় অসম্ভব। যারা চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে যাচ্ছে তারাও দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার কিনারে, ট্রাফিক সিগন্যালের লাল বাতি জ্বলার অপেক্ষায়। একটু পরে সবুজ বাতি হলুদ হলো, তার পর হলুদ বাতি লাল হলো, কিন্তু মোটরযানগুলোর একটাও থেমে দাঁড়াল না, যেমন চলছিল তেমনি চলতে থাকল।

এভাবে অনেকক্ষণ চলল, তার পর লাল বাতি প্রথমে হলুদ ও তার পরে সবুজ হলো। মোটরযানগুলো তবুও থামল না দেখে একজন ট্রাফিক পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে বাঁশি বাজিয়ে ও চিৎকার করে মোটরযানগুলোকে গালি দিতে লাগল। এর মধ্যেই রাস্তার কিনারে অপেক্ষমাণ নারী-পুরুষেরা খানিক বিদ্রোহী হয়ে রাস্তা পার হতে শুরু করলে যানবাহনগুলো থেমে দাঁড়াতে বাধ্য হলো এবং জামিলা এক দৌড়ে মিরপুর রোড পার হয়ে সোজা আরও পুব দিকে এগিয়ে চলল। রাস্তাটি পার হওয়ার পর সে দৌড় থামাল; হেঁটে চলল গণভবনের দক্ষিণ পাশের রাস্তাটি ধরে, যে-রাস্তা ক্রিসেন্ট লেকের ধার ঘেঁষে এগিয়ে গিয়ে মিলেছে বিজয় সরণির সঙ্গে।

গণভবনের উঁচু লাল প্রাচীরের ধার ঘেঁষে ফুট দশেক পর পর একজন করে উর্দিধারী পাহারাওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কেউ দাঁড়িয়ে আছে ডান পায়ে ভর দিয়ে, কেউ বাম পায়ে ভর দিয়ে। কেউই এক সঙ্গে দুই পা ব্যবহার করছে না। সারা রাত ধরে প্রধানমন্ত্রীকে পাহারা দিয়ে এখন তাদের চোখগুলো ঢুলু ঢুলু, ঠোঁটগুলো শুকনো। জামিলা দেখতে পেল, তারা বিশাল বিশাল হাই তুলছে। তাদের পাশ দিয়ে ফুটপাত ধরে চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে অগ্রসরমাণ স্বাস্থ্য উদ্ধারকামী নারী ও পুরুষের সংখ্যা, আকার এবং ওজন থানা রোডের নারী-পুরুষদের চেয়ে বেশি। এদের সবার চোখেমুখে জামিলাকে নিয়ে অশ্লীল কৌতুক আর কৌতূহল। এরা তার স্তন ও দুধ নিয়ে কথাবার্তা বলতে বলতে এগিয়ে চলেছে। জামিলার ক্রোধ জাগছে, কিন্তু সে মানুষগুলিকে ক্ষমা করে দিচ্ছে। কারণ, জামিলা জানে, এই মানুষগুলির মনের অশ্লীলতা এদের আচরণের নিষ্ঠুরতার চেয়ে কম ভয়ংকর।

*

গণভবনের প্রাচীর শেষ হয়ে চন্দ্রিমা উদ্যানে ঢোকার পথ শুরু হবার একটু আগে সড়কটির ডান দিকে একটা শাখা বেরিয়ে সোজা চলে গেছে দক্ষিণে, গিয়ে মিশেছে জাতীয় সংসদের পশ্চিম ফটকে প্রবেশের রাস্তাটির সঙ্গে। সেই শাখাপথটির মুখে লাল ও শাদা রং-করা লম্বা বাঁশের ব্যারিকেড। ব্যারিকেডের বাম ধারে কয়েকজন উর্দিধারী পাহারাওয়ালা, কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে; কারোর হাতে লাঠি, কারোর পিঠে রাইফেল; এবং প্রত্যেকের চোখ ফোলা, চোখের কোণে পিঁচুটি।

জামিলা ব্যারিকেড ডিঙিয়ে ভিতরে ঢুকবে বলে এক পা তুলতেই উর্দিধারী পাহারাওয়ালাদের একজন ঘ্যারঘেরে গলায় ধমক দিয়ে উঠল : ‘ওই মাগি, কই যাস?’

জামিলা মুখ বাগিয়ে রাস্তাটির ডান পাশে সবুজ মাঠের দিকটা দেখিয়ে বলল, ‘ওইখানে।’

‘যা ভাগ!’ পাহারাওয়ালারা জামিলাকে খেদাতে চাইল। জামিলা চেয়ে রইল মাঠের দিকে : মাঠে ঘাসেদের অভয়ারণ্য; বেড়ে উঠেছে বাধাবিঘ্নহীন। এই ঘাসেদের পূর্বপুরুষেরাও বোধহয় ভুলে গেছে কাস্তেবাহিনীর আগ্রাসন কী রকমের হয়।

জামিলা ব্যারিকেড ডিঙানোর জন্য আবার পা তুলল। পাহারাওয়ালারা হুংকার দিয়ে উঠল, ‘খবরদার!’ তারা রাস্তার ওপারে গণভবনের দিকে আঙুল তুলে দেখাল : ‘প্রাইম মিনিস্টার ঘুমাইতাছে।’

তার পর সবুজ মাঠটির দিকে ঘাড় ফিরিয়ে কোনাকুনি তাকাল দূরে : ‘মহান পবিত্র সংসদ!’

মাঠটির পশ্চিম প্রান্তে পাশাপাশি দুটি লাল বাড়ির দিকে চেয়ে পাহারাওয়ালাদের একজন বলল, ‘ইস্পিকার, ডিপুটি-ইস্পিকার স্যারেরা ঘুমাইতাছে।’

জামিলা তাদের বলল, ‘আমি চুপচাপ এক ঘণ্টা ঘাস খাইয়া চইল্যা যামু।’

‘মাগি বেশি কথা কয়!’

‘মাগি মুখে মুখে তক্ক করে!’

‘যা ভাগ অক্ষনি!’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তিনজন লাঠি-রাইফেলধারী সদস্য এ-হেন লাগাতারভাবে উপর্যুপরি বকাঝকা করল জামিলাকে। জামিলা সব সইল, না সয়ে উপায় নেই। পেটে তার প্রচণ্ড ক্ষুধা, সে তাদের বলল, তিন দিন ধরে সে অভুক্ত কারণ মফিজ তিন দিন ধরে জ্বরে পড়ে আছে, তাকে খাবার দেয় নি। সে তাদের বলল যে প্রাণ রক্ষা করতে হলে তাকে এই মুহূর্তেই কিছু খাওয়া শুরু করতে হবে। তাকে মাত্র এক ঘণ্টা ঘাস খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক।

‘আপনেগো পায়ে পড়ি’—মিনতি করে বলল জামিলা।

কিন্তু তার মিনতি শুনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আরও খেপে উঠল। একজন জামিলার দিকে লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে এসে বলল, ‘সাত-সকালে গ্যাঞ্জাম করতে আইছস! মাগিরে দিমু একখান..’

তার কথা শেষ না হতেই আরেক উর্দিধারী লাঠিওয়ালা এগিয়ে এসে বলে, ‘দিমু দিমু করেন ক্যান? দিয়া ফালান!’। এ কথা বলেই সে জামিলার দুই শিংয়ের মাঝখানে বসিয়ে দিল লাঠির এক ঘা।

জামিলার মাথার হাড্ডি ঠং করে আওয়াজ তুলল, তার গলার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল প্রকাণ্ড আর্তনাদ এবং সে মাথাটা নিচু করে এক ঝটকায় উপরে তুলল, আর চোখের পলকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দেখতে পেল জামিলার দুই বাঁকা শিংয়ের ডগায় তাদের এক সহকর্মীর দেহ। জামিলার মাথাটা এক ঝটকায় বাম থেকে ডানে উঠে গেলে উর্দিধারীরা তাদের সহকর্মীটিকে দেখতে পেল নীল আকাশের পটভূমিতে। তারপর ধুপ করে মাটিতে পড়লে তার গলা দিয়ে বেরোল কোঁক আওয়াজ এবং তার সহকর্মীরা দেখতে পেল তার পেটখানা ফেড়ে গিয়ে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে এসেছে উর্দির ছেঁড়া বোতামের ফাঁক দিয়ে।

জামিলা ঘুরে উল্টো দিকে দৌড় শুরু করতেই গর্জে উঠল বিক্ষতনাড়ি উর্দিধারীর সহকর্মীদের একজনের হাতের রাইফেল : পর পর দুটি বুলেট বিদ্ধ হলো জামিলার দুই নিতম্বে। সে তবু ছুটে চলল, কিন্তু আরেকটি বুলেট ছুটে এসে তার পেছনের ডান পায়ের একটা রগ ছিঁড়ে বেরিয়ে গেলে সে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। হাম্বা রবে সে তার ছেলেকে ডেকে উঠল।

*

জামিলার শিঙের আঘাতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় দায়িত্বপালনকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সদস্যের ‘মর্মান্তিক’ মৃত্যু এবং তার সহকর্মীদের হাতে জামিলার গুলিবিদ্ধ হওয়ার কাহিনি পরদিনের সংবাদপত্রগুলিতে প্রকাশিত হলো :

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে নিহতের পরিবারের জন্য এক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিলেন। তিনি জানালেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানের নেতৃত্বে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সে-কমিটি এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিকট পেশ করবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও আশ্বাস দিলেন, ঘটনার জন্য দায়ী যেই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জাতীয় সংসদের স্পিকার এই মর্মে দুঃখ প্রকাশ করলেন যে, তার বাসভবন থেকে মাত্র দুশো গজ দূরে অমন দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটেছে।

সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ঘটনার নিন্দা জানিয়ে গুলিবিদ্ধ জামিলার সুচিকিৎসার দাবি উত্থাপন করলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের মৃত্যুকে অনভিপ্রেত এবং দুঃখজনক ঘটনা বলে আখ্যায়িত করে তিনি বললেন, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার ঘাস প্রকৃতির দান, এই ঘাস খাওয়ার অধিকার স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সকলের সাংবিধানিক অধিকার।

ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বললেন, সংসদ ভবন এলাকার ঘাস খাওয়াকে কেন্দ্র করে এহেন মর্মান্তিক ঘটনার অবতারণা দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের সুগভীর ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতার অংশবিশেষ।

বিরোধী দলের মহাসচিব এ-ঘটনাকে মর্মান্তিক ও ন্যক্কারজনক বলে আখ্যা দিয়ে বললেন, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার সমস্ত ঘাসকে ক্ষমতাসীন দল নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি বলে মনে করে; কারসাজির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই এই ঘাস তারা একাই একচেটিয়াভাবে খেয়ে চলেছে।

পরিবেশবাদী তিনটি সংগঠন এক যুক্ত বিবৃতি প্রকাশ করে বলল, ক্ষুধার্ত জামিলার ঘাস খাওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে তার মাথায় লাঠির আঘাত করার মধ্য দিয়ে প্রাণিকুলের অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রামের প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংবেদনশীলতার চরম অভাব পরিস্ফুট হয়েছে।

ঘটনাটির খবর প্রকাশের পরের দিন সকল জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রে এ-বিষয়ে সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশিত হলো। অধিকাংশ সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের মৃত্যুকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করা হলো, কিন্তু ঘটনার জন্য দায়ী করা হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ‘বাড়াবাড়ি’কে। একটি জনপ্রিয় অনলাইন জার্নালে দিলবর তাউস ছদ্মনামধারী এক ব্যক্তির একটি ব্লগ প্রকাশিত হলো এই শিরোনামে : ‘একটি মৃত্যু বনাম জামিলার ঘাস খাওয়ার অধিকার’।

২.
সাধু বাংলায় রচিত দিলবর তাউসের ব্লগটি এই :

“অষ্টাদশী জামিলা আমার পরিচিতা। তাহার মালিক সৈয়দ আবদুল মুক্তাদির আমার পুরাতন বন্ধু। তিনি একদা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। বন্ধু বলিয়া বলিতেছি না, যাহারা তাকে চিনেন, তাহারা সকলেই জানেন তিনি অতি সজ্জন ব্যক্তি, জীবনে এক পয়সা ঘুষ খান নাই। সারা জীবনের সঞ্চিত সমুদয় অর্থ দিয়া ১৯৯০ সনে তিনি রাজধানীর আদাবর এলাকায় পাঁচ কাঠার একখানা জমির প্লট খরিদ করিয়াছিলেন। এতদিনে উক্ত প্লটের চতুর্দিকের প্লটগুলিতে ঘরবাড়ি, দালানকোঠা উঠিয়া গিয়াছে, শুধু আমার বন্ধুর প্লটখানাই ফাঁকা পড়িয়া আছে। তিনি বাড়ি বানাইতে পারেন নাই। পারিবেন কী করিয়া? তাহার সারা জিন্দেগির সমস্ত সঞ্চয়ই খরচ হইয়া গিয়াছে ঐ এক খণ্ড জমি খরিদ করিতে। অর্থ নাই বিধায় অবসর গ্রহণের পর তিনি ফিরিয়া গেছেন কালিয়াকৈরের নিজ পিত্রালয়ে, বন্ধুর ভাগ্য ভালো যে কালিয়াকৈরে তাহার পিতা একখানা বাড়ি রাখিয়া গিয়াছিলেন।

“রাজধানীর আদাবরের মনসুরাবাদ আবাসিক এলাকার সেই পাঁচ কাঠার প্লটখানা পাছে বেদখল হইয়া যায়, এই ভয়ে বন্ধুবর আবদুল মুক্তাদির নিজ গ্রাম হইতে মফিজ নামক এক দরিদ্র যুবককে ঢাকায় আনিয়া ওই স্থানে একখানা টিনের ঘর তুলিয়া দেন। ঢাকায় মফিজ কী করিয়া খাইবে ইহা ভাবিয়া তিনি তাহাকে একটি রিকশা কিনিয়া দিয়া রোজগারের ব্যবস্থা করিয়া দিলেন। মফিজ রিকশা চালাইতে গিয়া এক বৃষ্টিমুখর বৈকালে এক তরুণী যাত্রীকে পাইল : তরুণী বৃষ্টিতে ভিজিতে ভিজিতে রাস্তার ধার দিয়া হাঁটিয়া যাইতেছিল। মফিজ তরুণীকে কহিল ‘ভিজেন ক্যান? আমার গাড়িতে ওঠেন।’ সিক্তবসনা তরুণী হাসিয়া বলিল তাহার কাছে পয়সা নাই। মফিজ গানের সুরে কহিল ‘তোমার কাছে পয়সা নিব না।’ তরুণী ভ্রুভঙ্গি করিয়া হাসিয়া দুলিয়া উঠিল, কিন্তু মফিজের আহ্বানে সাড়া দিয়া তাহার রিকশায় উঠিল না, নিতম্ব দুলাইয়া নিজপথে চলিতে থাকিল। মফিজ তাহার পিছু ছাড়িল না, নিতম্বের দোলা দেখিতে দেখিতে তাহার পিছন পিছন রিকশা লইয়া আগাইল। তরুণী নিজপথে হাঁটিয়া যাইতে যাইতে বারেক গ্রীবা ফিরাইয়া মফিজের পানে চাহিয়া হাসিল। মফিজ তাহার নাম জিজ্ঞাসা করিলে তরুণী বলিল তাহার নাম জামিলা।

“পাঠক বুঝিতে পারিতেছেন, জামিলা ও মফিজের মধ্যে কী ঘটিবার উপক্রম হইতেছে। আমি এক্ষণে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছিয়াছি; প্রেমকাহিনি রচনা করা আমার পক্ষে আর শোভনীয় নহে। তাছাড়া অদ্যকার ব্লগের বিষয়বস্তু ফুর্তির নহে বরঞ্চ বিষাদের : গুলি ফুটিয়াছে, জামিলার রক্তপাত হইয়াছে! না, তাহার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্যের নাড়িভুঁড়ি বাহির হইয়া প্রাণ গিয়াছে। এহেন পরিস্থিতিতে রোমান্স কিংবা প্রেমের আখ্যান রচনা করা অসমীচীন। মফিজ ও জামিলার সম্বন্ধে দরকারি কথাগুলি জানাইবার কালে রোমান্টিক ভাষা ব্যবহার হইতে বিরত থাকিব। যাহা না জানাইলেই নয়, শুধু সেইটুকুন অতি সংক্ষেপে বলিব।

“মফিজ কালিয়াকৈর গিয়া আবদুল মুক্তাদিরকে বলিল, চাচা বিবাহ করিব। আবদুল মুক্তাদির কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ বিধায় বলিলেন, করিয়া ফালাও। বিবাহের খরচ ও মফিজের দারিদ্র্য বিবেচনা করিয়া তিনি মফিজকে কিছু টাকাকড়িও দিলেন। মফিজ টাকা লইয়া ঢাকায় ফিরিয়া জামিলাকে বিবাহ করিয়া সেই টিনের ঘরে সংসার পাতিল। তখন তাহার আর রিকশা চালাইতে ইচ্ছা করিল না, কোথা হইতে রাজ্যের আলস্য আসিয়া চাপিয়া বসিল তাহার দেহমনে। রিকশাটি ভাড়া দিয়া সে রিকশাচালক হইতে রিকশার মালিকে উন্নীত হইল। যাহাকে রিকশাটি ভাড়া দিল একদিন সে যানটি লইয়া চম্পট দিল এবং দিনকয় পরে জামিলাও নিরুদ্দেশ হইল। মফিজ কান্নাকাটি করিল, অতঃপর কালিয়াকৈর ফিরিয়া গিয়া আবদুল মুক্তাদিরকে বৃত্তান্ত জানাইয়া বলিল, চাচা, এই অবস্থা। এখন কী করা যায়?

“আবদুল মুক্তাদির বলিলেন, আর কিছু করা যায় না। তুই গ্রামে ফিরিয়া আয়। আমি জায়গা বিক্রি করিয়া দেওয়ার বন্দোবস্ত করি।

“এই সময়, এক রাত্রিবেলা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটিল : ট্রাকের সহিত বাসের সম্মুখ-সংঘর্ষ। ট্রাকভর্তি ছিল গরু, ভারত হইতে আসিতেছিল। মনুষ্যযাত্রীবাহী একখানা বাসের সহিত সেই গরুবাহী ট্রাকটির মুখোমুখি সংঘর্ষ লাগিয়া মারা পড়িল এগার জন মানুষ, কিন্তু গরুরা কেহই মরিল না, ট্রাক হইতে পড়িয়া কিছু ছত্রভঙ্গ হইয়া দিগ্বিদিগে ছুটিয়া গেল, আর কিছু ভ্যাবাচেকা খাইয়া নিজেদের মধ্যে হুটোপুটি করিতে লাগিল।

“ছত্রভঙ্গ গরুদের মধ্য হইতে একটির সহিত দেখা হইল মফিজের, যখন সে দুর্ঘটনার খবর শুনিয়া অকুস্থলের দিকে ছুটিয়া যাইতেছিল। গরুটি মফিজের সামনে পড়িয়া থমকিয়া দাঁড়াইল এবং বলিল, ভাই আমাকে বাঁচাও। মফিজ উহাকে অভয় দিল এবং আবদুল মুক্তাদিরের পিত্রালয়ে লইয়া গিয়া খড়-বিচালি খাইতে দিল।

“গরু আমদানিকারকের লোকেরা ছত্রভঙ্গ হইয়া পলায়নকারী গরুদের অন্বেষণে পাশ্ববর্তী গ্রামগুলিতে হানা দিল। তাহারা আবদুল মুক্তাদিরের বাড়িতেও আসিল এবং মফিজকর্তৃক আপ্যায়ন লাভকারী দীর্ঘাঙ্গী বকনা গরুটিকে নিজেদের বলিয়া শনাক্ত করিল। মফিজ গরুটি ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানাইলে বিবাদ উপস্থিত হইল। সৈয়দ আবদুল মুক্তাদির সাহেব গরুওয়ালাদিগকে নগদ টাকা দিয়া বিবাদ মিটাইয়া বিদায় করিলেন। গরুটি মফিজের তত্ত্বাবধানে রহিয়া গেল। মফিজ উহার নাম রাখিল জামিলা। টাঙ্গাইলের জেলা পশুপালন কর্মকর্তার সহযোগিতায় ষাঁড়ের সংসর্গ এড়াইয়া মফিজ কৃত্রিম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জামিলার গর্ভসঞ্চারের ব্যবস্থা করিল।

“জামিলাকে লইয়া মফিজ কালিয়াকৈরে অধিক কাল অবস্থান করিলে ঢাকার মনসুরাবাদে মুক্তাদির সাহেবের প্লটখানা বেহাত হইয়া যাইতে পারে, এই ভাবিয়া মুক্তাদির সাহেব মফিজকে ঢাকা যাইতে বলিলেন। মফিজ জামিলাকে সঙ্গে নিয়া ঢাকায় ফিরিল। মনসুরবাদে মুক্তাদির সাহেবের উক্ত প্লটে টিনের ঘর-সংসারে যথাকালে জামিলার একটি বাছুর ভূমিষ্ট হইল এবং জামিলা দিনে দুই বেলা করিয়া মোট পাঁচ কেজি করিয়া দুধ দিতে লাগিল। ষাট টাকা কেজি দরে দুধ বেচিয়া মফিজের সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য আসিল। কিন্তু জামিলার সহিত তাহার সম্পর্কের অবনতি ঘটিল কেননা মফিজ জামিলার বাছুরটিকে অতি নির্মমভাবে বঞ্চিত করিয়া জামিলাকে দোহন করিতেছিল।

“একদিন মফিজের গায়ে কাঁপুনি দিয়া জ্বর আসিল। সে বিছানায় পড়িয়া গোঙাইতে আরম্ভ করিল। তাহার যন্ত্রণা দেখিয়া জামিলার ছেলেটি সুখ পাইল। সে কিছুদিন ধরিয়া বলিতেছিল যে তাহার শিং গজাইলে সে মফিজের পেট ফাঁড়িয়া দিবে। জামিলাও ভাবিল, মফিজ এইবার মরিলেই হয়, সে দড়ি ছিঁড়িয়া মুক্ত হইয়া ছেলেকে লইয়া যেদিকে দুচোখ যায় চলিয়া যাইবে।

“কিন্তু বাস্তবিক বিপদের কথা হইল, মফিজ বিছানায় পড়িয়া জ্বরে কাতরাইতে থাকিলে জামিলার অন্নাভাব উপস্থিত হইল। তাহার ছেলেটিও খাইতে না পাইয়া আম্মা আম্মা করিয়া হামলাইতে থাকিল। এইভাবে তিন দিন অতিক্রান্ত হইলে এক সকালে জামিলা ক্ষুধার যন্ত্রণায় দড়ি ছিঁড়িয়া ঘাস-অন্বেষণে বাহির হইল এবং নিদারুণ বিপদে পড়িয়া গেল। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্মম আচরণের শিকার হইয়া তার কী অবস্থা দাঁড়াইল তাহা আপনারা সংবাদমাধ্যম মারফতে জানিয়াছেন। ঘাস খাওয়ার অধিকার তাহার ন্যায্য প্রাকৃতিক এবং সেই হেতু সাংবিধানিক অধিকার, ইংরেজিতে বলিলে এইরকম বলিতে হয় : ন্যাচারাল রাইটস মাস্ট বি কনস্টিটিউশনাল রাইটস। কিন্তু অধিকার কী বস্তু বা বিষয় সে সম্বন্ধে বাংলাদেশের মানবজাতি কিংবা পশুকুলে কোনো প্রকার উপলব্ধি নাই। সংবিধান বলিতে তাহারা একখানা পুস্তক চিনে এবং পুস্তকের কথাকে এই সমাজের প্রাণীকুল কেবলমাত্র অপরকে বিপদে ফেলিবার কাজে ব্যবহার করিয়া থাকে। তাই, অধিকারের কথা ছাড়িয়া দিলাম, করুণার কথা বলি। একটুখানি করুণাও কি অবশিষ্ট নাই? জামিলার প্রতি সামান্য একটু করুণা প্রদর্শন করিলে সে-ও ক্ষুধার জ্বালা হইতে রক্ষা পাইত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যেরও প্রাণ যাইত না।

“যদিও নরহত্যা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ, কিন্তু ঘটনার আদ্যোপান্ত বিবেচনা করিয়া দেখিলে মানিতে হইবে যে জামিলা হত্যা করে নাই। করোটির মধ্যখানে লাঠির আঘাত পাইয়া সে মাথাটা ঝাঁকুনি দিয়াছিল মাত্র, সে কাহাকেও শিঙের আঘাত করিতে চায় নাই। তাহার শিং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের উদরে প্রবিষ্ট হইতে পারে ইহা ভাবিয়া সতর্কতার সহিত মাথা ঝাঁকাইবে এমন অবস্থা তাহার ছিল না। লাঠি দ্বারা ব্রহ্মতালুতে আঘাত করিলে যে-কেহ দিশাহারা হইয়া মাথা ঝাঁকাইবে তাহাতে বিস্ময় কী।

“কর্তব্যপালনকালে একজন সংসদরক্ষীর মৃত্যু কাম্য ছিল না। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে যাহারা লিখিয়াছেন যে জামিলা একটু ধৈর্যশীল হইলেই মৃত্যুটা এড়ানো যাইত, তাহাদের মাথায় লৌহদণ্ডের বাড়ি মারিয়াও বুঝানো যাইবে না যে ব্রহ্মতালুতে লাঠির বাড়ি পড়িলে শুধু ধৈর্য কেন, সমুদয় বিচার-বুদ্ধিও চিরতরে ছুটিয়া যাইতে পারে। সৌভাগ্যের বিষয় জামিলার প্রাণবায়ু বাহির হইয়া যায় নাই। এক্ষণে সরকারের উচিত হইবে জামিলার সুচিকিৎসার ঘাটতি না হয় তাহা নিশ্চিত করা। বুঝিতে হইবে, জামিলাকে আঘাত করা হইয়াছিল মাথার মধ্যখানে, একদম ব্রহ্মতালু বরাবর। লাঠির দ্বারা মাথায় আঘাত করিলে যদি প্রাণে না মরে, মস্তিষ্ক বিগড়াইয়া যাওয়া বিচিত্র নয়, অবশ্য জামিলার মধ্যে অদ্যপি তেমন লক্ষণ দৃষ্টিগোচর হয় নাই। গ্রেপ্তারের পর জামিলা যেসব বক্তব্য দিয়াছে তাহাতে মনে হইতেছে না যে তাহার মস্তিষ্ক বিগড়াইয়া গিয়াছে। ঘাস খাইতে চাওয়া যে অপরাধ নহে, এবং সংসদরক্ষীর উদর-বিচ্ছেদে তাহার যে কোনও দোষ ছিল না এই বিবেচনাশক্তি জামিলার অক্ষুণ্ন রহিয়াছে বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে।

“জামিলার দ্রুত আরোগ্য ও সর্বাঙ্গীন মঙ্গল আমাদের সকলের কাম্য হওয়া উচিত। এবং তাহার অনিচ্ছাকৃত অপরাধ (নরহত্যা) অতি অবশ্যই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে বিচার করিতে হইবে..।”

৩.
পঙ্গু হাসপাতালের শৈল্যচিকিৎকরা জামিলার গুলিবিদ্ধ নিতম্ব থেকে দুটি বুলেট উদ্ধার করেছেন, অস্ত্রোপচার করে জোড়া লাগানো হয়েছে তার ডান পায়ের ছেঁড়া রগ। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হলো জামিলার শরীরে কোনো বুলেট পাওয়া যায় নি। সংবাদমাধ্যমে ছুটল প্রতিবাদের তুফান : অভিযোগ করা হলো যে ঘটনার আলামত গায়েব করা হয়েছে। একটি দৈনিকের সম্পাদকীয় নিবন্ধে এমন প্রশ্ন তোলা হলো : জামিলাকে যদি গুলি করা না-ই হয়ে থাকবে, তাহলে কিভাবে সে আহত হয়েছিল? কিভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল তার দুই নিতম্ব, যেখানে আঠারোটি সেলাইয়ের প্রয়োজন হয়েছে? জামিলার ডান পায়ের একটি রগই বা ছিঁড়েছিল কী প্রকারে?

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অবশ্য সংবাদমাধ্যমের এসব প্রশ্ন আমলে নিল না, জামিলার প্রসঙ্গে তারা আর কোনো বক্তব্যই দিল না। কয়েকটি সংবাদপত্র ‘সূত্রমতে’, ‘তথ্যমতে’, ‘নির্ভরযোগ্য সূত্রের’ বরাত দিয়ে দেশবাসীর কাছে অভিযোগ তুলে ধরল যে, পঙ্গু পাসপাতালের ডাক্তার, সিস্টার, ব্রাদার, আয়া ও ক্লিনারদের সরকারের অতি উচ্চ পর্যায় থেকে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

টিভি টক শো এবং সংবাদপত্রের কলামে জামিলার লিগ্যাল স্ট্যাস্টাস ও সর্বশেষ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরুত্তর রইল। নাছোড়বান্দা কতিপয় রিপোর্টার তেজগাঁও থানা চত্বরে হানা দিতে লাগল। তারা জানতে পেরেছিল পঙ্গু হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর জামিলাকে ওই থানা হাজতে রাখা হয়েছে। কিন্তু তারা থানা চত্বরে গিয়ে জামিলাকে দেখতে পেল না। থানায় কর্তব্যরত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সকলের মুখে তালা, সংবাদকর্মীদের উপর্যুপরি জিজ্ঞাসায় তারা তিতি-বিরক্ত। থানার আশেপাশের লোকজনের মুখে সংবাদকর্মীরা জানতে পেল যে থানাচত্বরের ভিতরে সীমানা-প্রাচীরের লাগোয়া একটি আমগাছের সঙ্গে জামিলাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল, লোকেরা তাকে সেখানে আমপাতা, কলার ছাল ইত্যাদি খেতে দেখেছিল।

জামিলার মালিক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ আবদুল মুক্তাদির কালিয়াকৈর থেকে ঢাকা এসে সদ্য-আরোগ্যপ্রাপ্ত মফিজকে সঙ্গে নিয়ে জামিলার সন্ধানে বের হলেন। তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের কাছে তিনি নিজেকে জামিলার মালিক বলে পরিচয় দিলেন। মলিন পাঞ্জাবি পরা, মেন্দিরাঙা চুল-দাড়িতে আবদুল মুক্তাদিরকে একজন গোবেচারা সাধারণ মানুষ মনে হচ্ছিল। ওসি মোহাম্মদ আলাউদ্দিন তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না।

আবদুল মুক্তাদির বললেন, ‘আমার জামিলা কোথায়?’

প্রশ্নকর্তার দিকে না তাকিয়ে থানার খাতার পাতা উল্টাতে উল্টাতে ওসি আলাউদ্দিন বেশ কেজো ভঙ্গিতে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘জেলখানায় চালান দেওয়া হইছে।’

‘কবে? কখন?’ শিশুর মতো উৎসুকভাবে জানতে চাইলেন মুক্তাদির সাহেব।

‘সেইটা দিয়ে তো আপনার কাজ নাই। জেলখানায় যান, দেখা পাইবেন।’ খাতা থেকে মাথা না তুলেই বললেন ওসি আলাউদ্দিন।

সৈয়দ আবদুল মুক্তাদির ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন। তেজগাঁও থেকে লালবাগ পৌঁছতে তার সময় লাগল পৌনে দুই ঘণ্টা। তিনি কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার ও ডেপুটি জেলারের খোঁজ করলেন, জানতে পেলেন উভয়ে অন্যত্র কাজে ব্যস্ত, কর্মস্থলে অনুপস্থিত। মাঝারি র‌্যাংকের একজন কর্মকর্তাকে পেয়ে মুক্তাদির সাহেব আহাজারির সুরে বললেন, ‘আমার জামিলা কোথায়?’

কারা-কর্মকর্তা মুক্তাদির সাহেবের দিকে তাকালেন। তার চোখেমুখে অতিশয় বিরক্তি, যেন গোটা জীবনের প্রতিই বিতৃষ্ণা চলে এসেছে। মুক্তাদির সাহেব তাকে একই প্রশ্ন আবার জিজ্ঞাসা করলেন।

এবার কারা-কর্মকর্তা ধমকের সুরে বললেন, ‘আমারে জিজ্ঞাসা করতেছেন কেন?’

‘তাহলে কাকে জিজ্ঞাসা করব?’ অসহায়ের মতো বললেন মুক্তাদির সাহেব।

‘আমি তার কী জানি?’

‘কে জানে তাহলে? কোথায়, কার কাছে জামিলার খবর পাওয়া যাবে?’

‘খবর পাবেন খবরের কাগজে। আমরা এখানে খবর নিয়া বইসা নাই।’

‘তেজগাঁও থানা থেকে আমাকে বলা হলো, জামিলাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। আমি কি তাকে একটা বার দেখতে পাব না?’

‘না, পাইবেন না। কারণ জামিলা এইখানে নাই।’

‘নাই মানে? থানা কি মিথ্যা বলল?’

‘জানি না। আমরাও শুনছি, কারাগারে পাঠান হইছে। কিন্তু আমরা তারে বুইঝা পাই নাই।’

‘কখন পাঠানো হয়েছে?’

‘সেটা যারা পাঠাইছে তারাই বলতে পারবে। আপনে গিয়া তাদেরকেই জিজ্ঞাসা করেন।’

মুক্তাদির সাহেব আবার এলেন তেজগাঁও থানায়। ওসি আলাউদ্দিন এখন থানায় নেই। কয়েকজন কনস্টেবল গল্পসল্প করছেন। মুক্তাদির সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন জামিলাকে কখন জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ কনস্টেবলরা পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি শুরু করলেন। বললেন, তারা এ-বিষয়ে কিছু জানেন না। দুপুর গড়িয়ে গেছে, জামিলাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়ে থাকলে সকালের দিকেই পাঠানোর কথা। মুক্তাদির সাহেব থানার নথিপত্র দেখতে চাইলে পুলিশের সদস্যরা তার ওপর বিরক্ত হলেন। একজন রেগে বললেন, ‘আপনে কোথাকার কে থানার খাতা দেখতে চাইতাছেন?’

মুক্তাদির সাহেব সরলভাবে বললেন তিনি জামিলার মালিক। পুলিশের সদস্যরা যে তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করে নি, বরং তাকে তুচ্ছ করে উড়িয়ে দিতে ‘কোথাকার কে’ বলেছে, পরের ‘লাটসাহেব’ বলাটা বাকি রেখেছে, তা বুঝতেই পারলেন না আবদুল মুক্তাদির সাহেব। তিনি মফিজকে দেখিয়ে বললেন, ‘এই যে, একে জিজ্ঞাসা করে দেখেন, আমি জামিলার মালিক কি না।’


নীরবতা নেমে এলো বুদ্ধিজীবী সমাজে, যুবসমাজে ক্লান্তি আর অবসাদ। শুধু একটি অনলাইন জার্নালে জাতির বিবেককে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখলেন ব্লগার দিলবর তাউস


কিন্তু পুলিশের সদস্যরা জামিলার মালিকানা যাচাই করতে উৎসাহ দেখালেন না। তাঁরা মুক্তাদির সাহেবকে বললেন, জামিলার বিষয়ে কিছু বলা যাবে না, উপরমহলের নিষেধ আছে। মুক্তাদির সাহেব এবার ক্ষুব্ধ হলেন এবং তাঁর স্বভাবসুলভ নরম সুরে হুমকি দিলেন যে, জামিলার অবস্থা ও অবস্থান তাঁকে জানানো না হলে তিনি সংবাদ সম্মেলন ডাকবেন।

কিন্তু মুক্তাদির সাহেবের হুমকিতে পুলিশের সদস্যদের টনক নড়ল না। বরং একজন বললেন, ‘যান, যা পারেন করেন গিয়া। আমরা জামিলার বিষয়ে কিছু জানি না। আপনেও থানায় আসেন নাই, আমাগোরে কিছু জিগান নাই।’

৪.
জামিলা কোথায় আছে, কেমন আছে এ-বিষয়ে জানার চেষ্টা করতে গিয়ে সৈয়দ আবদুল মুক্তাদির সাহেব থানাপুলিশ ও কারাগার কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার পরিবর্তে কিরকম হয়রানির শিকার হয়েছেন, জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে তিনি সেসবের বিশদ বর্ণনা দিলেন।

জামিলার শিঙের আঘাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সদস্যের মৃত্যুকে দুঃখজনক ঘটনা বলে উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘সেজন্য আইন অনুযায়ী জামিলার যা শাস্তি হয় হোক, সে তা মাথা পেতে নেবে, আমারও কোনো আপত্তি থাকবে না। কারণ আমি আইনের শাসনে বিশ্বাসী, আইনের প্রতি আমি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু তার আগে তো আমাকে জানতে হবে জামিলা এখন কোথায় আছে, কেমন আছে। তার অবস্থান সম্পর্কে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার রহস্যময় আচরণ আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। সাংবাদিক ভাইদের মাধ্যমে আমি সরকারের কাছে জামিলার অবস্থান প্রকাশ করার বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।’

সংবাদকর্মীদের একজন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ জামিলার অবস্থান সম্পর্কে আপনাকে কিছু জানাচ্ছে না—এতে আপনার কী মনে হচ্ছে? কেন তারা বিষয়টা গোপন করতেছে?’

আবদুল মুক্তাদির বললেন, ‘তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। কেন গোপন করা হচ্ছে এটা আমারও প্রশ্ন।’

‘আপনার কি সন্দেহ হচ্ছে না যে পুলিশ হেফাজতে জামিলার হয়তো খারাপ কিছু হয়েছে, সে-কারণেই এই গোপনীয়তা?’ আরেক সংবাদকর্মীর প্রশ্ন।

‘আমি জানি না।’ দ্বিধান্বিত স্বরে বললেন মুক্তাদির সাহেব।

অন্য এক সংবাদকর্মী বললেন, ‘আচ্ছা মুক্তাদির সাহেব, সরকারি দলের পক্ষ থেকে যে বলা হচ্ছে, এই পুরা ঘটনাটার পিছনে মহলবিশেষের ষড়যন্ত্র আছে—এ ব্যাপারে আপনি কী বলেন?’

‘আমি জানি না, এখানে কার কী ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।’

‘সরকারকে বিব্রত করা, বর্হিবিশ্বে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে প্রক্রিয়া এই সরকার শুরু করেছে, সেটাকে বানচাল করার যে নীলনকশা, এই ঘটনা তারই একটা অংশ হতে পারে কি না?’

‘আমি জানি না। আমি শুধু জানতে চাই জামিলা এখন কোথায়, কী তার অবস্থা। তার তিন মাস বয়সী বাছুরটা দুধ ছাড়া আর কিছুই খায় না; মাকে ছাড়া তার এখন মর মর অবস্থা। সে তার মাকে ফিরে পেতে চায়।’

একটি ইংরেজি দৈনিকের রিপোর্টার তির্যক স্বরে বললেন, ‘বাই দ্য ওয়ে, জামিলার বাছুরটা যদি দুধ ছাড়া আর কিছুই না খায়, তাহলে এই এতগুলা দিন, প্রায় এক সপ্তাহ, সে কিভবে বেঁচে আছে?’

মুক্তাদির সাহেব কিছু বলতে যাবেন, এর মধ্যে ইংরেজি দৈনিকটির প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক ইংরেজি দৈনিকের রিপোর্টার উঁচু কণ্ঠে বলে উঠলেন : ‘এইসব ফাজলামির মানে কী?’

সঙ্গে সঙ্গে প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিকটির রিপোর্টার প্রতিবাদ করে উঠলেন, ‘দিস ইজ নো ফাজলামি। মুক্তাদির সাহেব যে বলছেন মায়ের দুধ ছাড়া বাছুরটা আর কিছুই খায় না, এখন সেই মা এক সপ্তাহ ধরে কাছে নাই, তাহলে বাছুরটা কী খেয়ে বেঁচে আছে? দিস এই এ ভেরি লজিক্যাল কোশ্চেন।’

‘কিন্তু এটা এখানে কোনো প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হতে পারে না। এখানে জামিলার হয়্যার অ্যাবাউটস সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জামিলাকে পঙ্গু হাসপাতাল থেকে তেজগাঁও থানাহাজতে নেওয়া হয়েছিল। থানাহাজত মানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হেফাজত, ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশন, মাই ডিয়ার কলিগ..!’

‘প্লিজ ডোন্ট কাম টু টিচ মি হোয়াট ইজ কল্ড রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হেফাজত। আপনি আমার প্রশ্নের মাঝখানে ইন্টারভেন করলেন কেন? দিস ইজ ভেরি আনফরটুনেট!’

‘আনফরটুনেট না, আনফরচুনেট!’

‘ইউ শাট আপ! ডন্ট কাম টু টিচ মি ইংলিশ..!’

‘সাংবাদিক ভাইয়েরা, সাংবাদিক ভাইয়েরা! প্লিজ!’ আবদুল মুক্তাদির সাহেব কাঁদো কাঁদো সুরে মিনতি করে উঠলেন। তার চোখের মণি দুটো বড় বড় হয়ে গেছে, তিনি দুই হাত জোড় করে বাক-বিতণ্ডারত রিপোর্টারদের শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানাতে থাকলেন, কিন্তু তার অনুরোধ মাঠে মারা যেতে লাগল।

‘..ইউ শাট আপ, অ্যান্ড লিসেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা অবস্থায় জামিলা নিখোঁজ; রাষ্ট্রের তরফে এর চেয়ে বড় হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশান আর হতে পারে না…!’

‘আ হা হা, কী জ্ঞানের কথা রে, কী ইউজডম!’

‘থামেন আপনারা এবার! এটা একটা প্রেস কনফারেন্স, আপনাদের বাহাসের জায়গা না!’

‘আরে ফালতু! রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হেফাজত! জেলখানার মধ্যে চার জাতীয় নেতারে মাইর‌্যা ফেলল, কোন দেশে কিসের কথা..! শ্যাষ করেন, প্রেস কনফারেন্স শ্যাষ কইরা দেন!’

‘না না! জামিলা তো জাস্ট ভোজবাজির মতো ভ্যানিশ হয়ে যাইতে পারে না। তার অবস্থান সরকারকে অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে। কারণ সে সরকারের হেফাজতেই ছিল..’

‘কিন্তু এটাও অবশ্যই দেশবাসীকে জানাতে হবে, মায়ের দুধ ছাড়া জামিলার বাছুরটা এক সপ্তাহ ধরে বেঁচে আছে কিভাবে!’

‘আমি কইতাছি,’ এটা মফিজের কণ্ঠ। সে মুক্তাদির সাহেবের ফরমায়েশ খাটার জন্য প্রেস ক্লাবে উপস্থিত আছে, সম্মেলন কক্ষের এক কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল; প্রশ্নকারী রিপোর্টারের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘জামিলার পোলার জন্যে ডেলি তিন লিটার কইর‌্যা মিল্কভিটা কিনা লাগে।’

৫.
শুধু রাষ্ট্রীয় টিভিকেন্দ্র বাদে দেশের সব স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে সৈয়দ আবদুল মুক্তাদিরের সংবাদ সম্মেলন দেখানো হলো। মধ্যরাতে লাইভ টক শো আরম্ভ করল কয়েকটি চ্যানেল। একটি চ্যানেলে প্রচার করা হলো মুক্তাদির সাহেব ও মফিজের এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ, দেখানো হলো জামিলার ক্ষুধার্ত ও শোকার্ত বাছুরটির ফুটেজ : বড় বড় দুই চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগ, মফিজ ফিডারে করে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু বাছুরটি মুখ সরিয়ে নিচ্ছে। মফিজ বারে বারে তার মুখে ফিডারের নিপল ঢুকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছে। এই দৃশ্যের সঙ্গে নেপথ্যে এক নারীকণ্ঠ করুণ সুরে বলছে : ‘প্রিয় দর্শক, নিষ্পাপ এই ছোট্ট শিশুটিকে তার মায়ের জন্য আর কতকাল প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে হবে?’

পরদিনের সবগুলো জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় সৈয়দ আবদুল মুক্তাদিরের সংবাদ সম্মেলনের খবর ও তার বক্তব্য ফলাও করে প্রচারিত হলো। লেখা হলো সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, সংবাদ-বিশ্লেষণ ও মন্তব্য প্রতিবেদন। অনেক পাঠক পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তর ও বার্তা বিভাগে টেলিফোন করে ও ই-মেইল বার্তা পাঠিয়ে জামিলার অবস্থান প্রকাশ করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানাতে লাগলেন। একই দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠল দুটি মানবাধিকার সংস্থা, তিনটি পরিবেশবাদী সংগঠন, জাতীয় আইনজীবী সমিতি, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, সম্মিলিতি নারী সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো। দেশের ১০১ জন বুদ্ধিজীবীর স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিবৃতির কপি পৌঁছে গেল প্রত্যেকটি সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলের বার্তাকক্ষে। বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, নাট্যকার, চলচ্চিত্র-নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, চিত্রশিল্পী, আলোকচিত্রশিল্পী, আবৃত্তিশিল্পী, জাদুশিল্পীসহ আপামর জনসাধারণ জামিলার অবস্থান প্রকাশ করার দাবিতে সোচ্চার হলেন।

বিকেলে ‘জামিলা কোথায়?’ লেখা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে সমবেত হলেন ‘তরুণ নাগরিক উদ্যোগ’ নামের একটি সংগঠনের তরুণ-যুবক-যুবতীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ অধ্যাপক সেখানে বক্তৃতা করার সময় পুলিশ তার হাত থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নিয়ে সবাইকে ঘরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলে সমবেত তরুণ-যুবকদের সঙ্গে পুলিশের বাক-বিতণ্ডা শুরু হলো। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে একজন সম্মানিত শিক্ষককে পুলিশ লাঞ্ছিত করেছে। ফলে টিএসসি চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল এগিয়ে এল শাহবাগ মোড়ের দিকে। ওই বিক্ষোভ-মিছিলে বাধা দিলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ঠেলাঠেলি শুরু হলো; ঠেলাঠেলি অচিরেই উন্নীত হলো ধাওয়া ও পাল্টা-ধাওয়ায়। এক পর্যাযে পুলিশের সদস্যরা লাঠি প্রয়োগ শুরু করলে শিক্ষার্থী-যুবসমাজ হাতে তুলে নিল ইট-পাটকেল; পাটকেলের আঘাতে এক পুলিশের নাক ফেটে রক্ত গড়ালে তার অন্য সহকর্মীরা আকাশে গুলি করা শুরু করলেন। আকাশ বেয়ে উড়ে যাচ্ছিল তিন কাক, তাদের একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে ধপ করে মাটিতে পড়ে গেলে শাহবাগ মোড় এলাকায় বোমার স্প্রিন্টারের মতো ছড়িয়ে পড়ল ত্রাস। ত্রস্ত-দিশাহারা লোকজন দিগ্বিদিকে ছুটোছুটি আরম্ভ করলে একটি যাত্রীবাহী বাস চাপা দিল এক পথচারীকে। ফলে দিশাহারা পলায়নপর জনগণ দিশা ফিরে পেয়ে চড়াও হলো ঘাতক বাসটির ওপর, তাদের সঙ্গে যোগ দিল বিক্ষোভকারী ছাত্রযুবসমাজ : ইট-পাটকেল, লাঠি, লোহার রড, পেট্টোলভরা জেরিক্যান, দেশলাইয়ের কাঠি। পক্ষান্তরে পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্রগুলির ঠাস ঠাস, বুম বুম; কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চরাচরে লক্ষ লক্ষ কাকের চিৎকার।

কাকেদের চিৎকার চলল সারা রাত ধরে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের ওপরের আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে চিৎকার করে চলল বিক্ষুব্ধ কাকসমাজ। নগরীর সমস্ত গাছে, সব রাস্তার ইলেকট্রিকের তার ও খুঁটিতে, ঘরবাড়ির ছাদে-কার্নিশে, বিভিন্ন ভবনের প্রাচীরের মাথায় এবং আকাশে জটলা করে বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে কাকেরা চিৎকার করে চলল।

টিভি চ্যানেলগুলি রাত ন’টার সংবাদে জানাল : কাকের ঠোকরে ঢাকা মেট্টোপলিটান পুলিশের এগারজন সদস্য কানা হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে সাতজন ট্রাফিক পুলিশের সদস্য, একজন প্রধানমন্ত্রীয় কার্যালয় ও তিনজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের প্রহরার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কর্তব্যরত অবস্থায় কাকেদের অতর্কিত ঠোকরে তারা প্রত্যেকে একটি করে চোখ হারিয়েছেন।

রাত আটটার দিকে আজিমপুর এলাকায় চিৎকাররত এক ঝাঁক কাকের দিকে নীলক্ষেত থানায় কর্তব্যরত পুলিশের সদস্যরা এলোপাথারি গুলি ছুড়লে তিন কাক গুলিবিদ্ধ হয়ে ভূপতিত হয়, বাকিরা উড়ে চলে যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে।

‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিঞ্চিত অবনতি হয়েছে,’ রাত দশটার সংবাদে বলতে শোনা গেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে, ‘কিন্তু এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, এরকম হতেই পারে, অতীতেও হয়েছে’—অবিচলিত কণ্ঠে মন্তব্য করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রাষ্ট্রীয় টিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন, স্বাধীনতা-সাবভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী একটি কুচক্রী মহল দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের খায়েশে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের কোনও ষড়যন্ত্র, কোনও জঘন্য অপচেষ্টাই বাংলার মানুষ সফল হতে দিবে না। পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে; শাহবাগ ও তার পার্শ্ববর্তীয় এলাকায় পরিপূর্ণ শান্তি ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

জামিলার অবস্থান প্রকাশ করার দাবিতে বিক্ষোভকারী যুবসমাজের ওপর পুলিশের ন্যক্কারজনক নিপীড়নের প্রতিবাদে পরদিন সকাল এগারোটায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সম্মিলিত নাগরিক সমাজের মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণার খবর জানানো হলো রাষ্ট্রীয় টিভিকেন্দ্র বাদে সব টিভি চ্যানেল ও এফ এম বেতারকেন্দ্রগুলি থেকে। আর রাষ্ট্রীয় বেতার-টিভিতে ঘোষণা করা হলো, পরদিন সকাল আটটা থেকে দুপুর দুটা পর্যন্ত জাতীয় প্রেসক্লাব ও তার আশেপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।

পরদিন সকাল সাতটা থেকে কেন্দ্রীয় শহীর মিনারের বেদিতে বিছানা পেতে আমরণ অনশন ধর্মঘট শুরু করলেন দেশের বিশিষ্ট অহিংস লড়াকু বুদ্ধিজীবী, নিরামিষভোজী অকৃতদার গান্ধীভক্ত অসাম্প্রদায়িক বামপন্থি লেখক-কলামিস্ট মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা। সরকার জামিলার অবস্থান প্রকাশ না করা পর্যন্ত তার অনশন চলবে বলে তিনি পণ করেছেন বলে টিভি চ্যানেলগুলো জানাল। শহীদ মিনারের বেদিতে অর্ধশায়িত মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফাকে চারপাশ থেকে ঘিরে বসে রইলেন ‘ঢাকা ব্রতচারী সংঘে’র পাঁচ তরুণ ও তিন তরুণী সভ্য।

সকাল সাড়ে আটটায় পুলিশের একটি দল এসে মোহাম্মদ গোলাম মোস্তাফাকে তার সঙ্গীসাথিসহ শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার অনুরোধ জানালেন। মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা পুলিশকে বললেন, শহীদ মিনারে ১৪৪ ধারা জারি করা হয় নি বিধায় তিনি এখানে তার অনশন পালন করছেন। তাকে সরে যেতে বলার কোনো অধিকার পুলিশের নেই বলে তিনি মন্তব্য করলেন।

পুলিশবাহিনীর নেতা ওয়াকিটকিতে কথা বলা শুরু করলেন, পুলিশ সদরদপ্তর থেকে তাকে নির্দেশ দেওয়া হলো : এই মুহূর্তে শহীদ মিনার ক্লিয়ার করেন, কোনো কথা শুনতে চাই না। পুলিশ বাহিনীর নেতা ওয়াকিটকি কোমরে ঝুলিয়ে রেখে সহকর্মীদের ইশারা করলেন। পুলিশের চার সদস্য কমান্ডো স্টাইলে এগিয়ে গিয়ে মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফাকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিতে চাইলে ব্রতচারী তরুণ-তরুণীদের দিক থেকে প্রবল বাধার সম্মুখীন হলেন। প্রাণপণ ঠেলাঠেলি, কুস্তাকুস্তি, চুলাচুলি এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ঘুসাঘুসি চলল; সুঠামদেহী ব্রতচারী যুবকদের হস্তচালনায় পুলিশের মধ্যবয়স্ক ভুঁড়িদার দুই সদস্য ধরাশায়ী হলে তাদের নেতা কোমর থেকে পিস্তল বের করে আকাশে দুটি গুলি ছুড়লেন। গুলির শব্দে ব্রতচারী যুবক-যুবতীরা সচকিত হয়ে তাকাল মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফার দিকে, পরবর্তী দিক-নির্দেশনার প্রত্যাশায়। গান্ধীভক্ত মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা কিছু বলতে শুরু করবেন এই ফাঁকে পুলিশের অন্য তিন সদস্য তাকে জাপটে ধরে তার হাড্ডিসার হালকা-পাতলা দেহটি পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে শহীদ মিনারের বেদি থেকে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ের বেগে নামতে শুরু করলে তিনি তাদের একজনের হাতের কবজিতে সজোরে কামড় বসিয়ে দিলেন। কামড় খেয়ে পুলিশের সদস্যটি ‘ওরে মা রে মরে গেলাম’ বলে আর্তনাদ করে ঝটকা মেরে কবজি সরিয়ে নিলে মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফার মাঢ়ির দুটি দাঁত খুলে পড়ল শহীদ মিনারের সিঁড়িতে। ব্রতচারী তরুণীদের একজন দাঁতদুটি কুড়িয়ে নিয়ে টিস্যুপেপারে মুড়িয়ে পার্সের মধ্যে রেখে দিলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফার মাড়ি-গাল ফুলে উঠল; তার চেহারা-সুরত এমন ভয়ংকরভাবে বদলে গেল যে টেলিভিশন চ্যানেলগুলির পর্দায় তার সেই চেহারা দেখে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা গুরুতর অশনিসংকেত পেলেন।

মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে যুবসমাজের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংঘাত-সংঘর্ষ শুরু হলো : অফিস-আদালত, দোকান-পাট, বিপনীবিতান, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও যানবাহন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ ইত্যাদি ঘটনায় মহানগরীজুড়ে নেমে এল বিরাট নৈরাজ্য। মেট্রোপলিটান পুলিশের সকল সদস্যকে নামিয়ে দেওয়া হলো আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের কাজে; কিন্তু তার ফলে বিশৃঙ্খলা আরও বেড়ে যাওয়ায় নামানো হলো বিডিআর; এবং সেনাবাহিনীকে ‘রেডি টু মুভ’ অবস্থায় রেখে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে ঘোষণা করা হলো টানা ছত্রিশ ঘণ্টার সান্ধ্য আইন।

এক ঘণ্টার মধ্যে মহানগরীর রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে গেল : নেমে এলো কবরের নীরবতা।

ওই নীরবতার মধ্যে দুপুর বারোটায় পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‌্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটেলিয়নের মহাপরিচালক, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধানদের নিজ কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলেন : ছত্রিশ ঘণ্টার মধ্যে দেশবাসীকে জানাতে হবে জামিলা কোথায় আছে।

কিন্তু ছত্রিশ ঘণ্টা নয়, আট ঘণ্টার মধ্যেই জামিলা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হলো : পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসা শেষে জামিলাকে স্থানান্তর করা হয় রাজধানীর তেজগাঁও থানায়। থানা-কমপ্লেক্সের ভিতরে সীমানা প্রাচীরের লাগোয়া একটি আমগাছের সঙ্গে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং তাকে নিময়িত খাদ্য-পানীয় দেওয়া হচ্ছিল। এভাবে দুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর ততৃীয় দিন গভীর রাতে জামিলা দড়ি ছিঁড়ে থানাচত্বর থেকে পালিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সারা মেট্রোপলিটান এলাকা জামিলার সন্ধানে চিরুনি অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু তার অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব হয় নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অসদুদ্দেশ্যে কোনো কুচক্রী মহল বা ব্যক্তি জামিলাকে গোপন স্থানে আটকে রেখেছে কি না সে ব্যাপারেও গোয়েন্দা বিভাগ অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

পরদিন পুলিশ সদরদপ্তর থেকে বলা হলো, তারা রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে জামিলাকে গ্রেপ্তার করেছে। তার পনের মিনিট পরেই র‌্যাবের পক্ষ থেকে দাবি করা হলো, তারাও এক জামিলাকে গ্রেপ্তার করেছে। র‌্যাব বলল, পুলিশের গ্রেপ্তার করা গাভীটি জামিলা নয়। এ নিয়ে দুই বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হলো।

র‌্যাব মনসুরাবাদে হানা দিয়ে তুলে নিয়ে গেল মফিজকে : ১২ ঘণ্টা অন্তরীণ রাখার পর তাকে একটা গাভীর সামনে হাজির করে বলা হলো, ‘মিডিয়ার সামনে বলবি, এইটা তোর জামিলা।’

গাভীটি ফেনাভর্তি মুখে জাবর কাটছিল, মফিজের দিকে চেয়ে বলল, ‘ভাই, আমার নাম কিন্তু রহিমা।’

পুলিশ বাহিনীর প্রেপ্তার করা গাভীটি টিভিক্যামেরার সামনে বলল, ‘আমার নাম জামিলা, এই কথা আমি না কইলে হেরা আমারে জবো কইর‌্যা খাইয়া ফেলব।’

পুলিশের এক কর্মকর্তা লাঠির বাড়ি মেরে টিভিক্যামেরা ভেঙে ফেললেন; কিন্তু তিনি ভাঙলেন মাত্র একটি ক্যামেরা, আরও অন্তত বারোটি টিভিক্যামেরায় ধারণ করা হয়ে গেল গাভীটির বক্তব্য।

টিভিচ্যানেলগুলির বার্তাকক্ষে টেলিফোন এল : গাভীটার বক্তব্য প্রচার না করাই হবে দেশ-জাতি-গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক। জনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে গাভীটার ফুটেজ বা তার দেওয়া বক্তব্য প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

এই ফোনকল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এল আরেকটি ফোন : পুলিশ বাহিনী কত বড় মিথ্যাবাদী তার চাক্ষুষ প্রমাণ তো হাতেনাতেই পাওয়া গেল। আপনারা গাভীটার বক্তব্য ফুটেজসহকারে প্রচার করে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন।

দেশের টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রগুলো প্রায় অভিন্ন ভাষায় ও সুরে জনসাধারণকে জানিয়ে দিল যে পুলিশ বা র‌্যাব কোনো বাহিনীই প্রকৃত জামিলাকে গ্রেপ্তার বা উদ্ধার করতে সক্ষম হয় নি। দুই বাহিনীর হাতে পৃথক পৃথক স্থান থেকে গ্রেপ্তারকৃত গাভীদের কোনোটির সঙ্গে সৈয়দ আবদুল মুক্তাদির বা মফিজুদ্দির কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের এহেন চোখে-ধুলি-দেওয়া আচরণের নিন্দা জানাল কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।

আসল জামিলা কোথায় কী অবস্থায় আছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। সংবাদপত্রগুলি তাদের সম্পাদকীয় কলামে লিখল, থানাহাজতের নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা অবস্থায় রাতের অন্ধকারে জামিলা দড়ি ছিঁড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে—এই বক্তব্য দিয়েই পুলিশ বিভাগ নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতে পারে না, বরং তাদের দায়-দায়িত্ব দ্বিগুণ বেড়ে যায়। জামিলার বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় তাকে খুঁজে বের করে আবার নিরাপত্তা হেফাজতে নেওয়ার গুরুদায়িত্ব। একই সঙ্গে থানা-হাজতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং গভীর রাতে থানায় কর্তব্যরত পুলিশের সদস্যদের দায়িত্বপালনে অবহেলার বিষয়টিও বড় হয়ে দেখা দেয়।

সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার সুর ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল। কয়েকদিন ধরে নগরীর কাকসমাজ যেভাবে চিৎকার করে চলেছিল তাও ক্রমশ স্তিমিত হয়ে এল। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অনুদানের টাকায় একপাটি নকল দাঁত কিনে স্থাপন করা হলো মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফার মাড়িতে। নীরবতা নেমে এল বুদ্ধিজীবী সমাজে, যুবসমাজে ক্লান্তি আর অবসাদ।

শুধু একটি অনলাইন জার্নালে জাতির বিবেককে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখলেন ব্লগার দিলবর তাউস :

৬.
“দেখিয়া-শুনিয়া মনে বীতস্পৃহা ঘনাইয়া উঠিতেছে। সর্বাপেক্ষা বেজার বোধ হইতেছে প্রধান বিরোধী দলের কারবার দেখিয়া। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে দেশের প্রধান বিরোধী দল নীরব দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করিল। ইতিহাস তাহাদের কিছুতেই ক্ষমা করিবে না।

“দলীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির জরুরি বৈঠক বসিয়াছিল বটে। কিন্তু সেখানে তারা কোনও সিদ্ধান্তই গ্রহণ করিতে পারিলেন না। বরং দোনামনা করিলেন, সরকারকে উৎখাত করিবার এই সুযোগ গ্রহণ করিবেন কি করিবেন না। জাতির বারোটা বাজিতেছে, সেদিকে তাহাদের ভ্রুক্ষেপ নাই, তাহারা আছেন নিজেদের মতলব লইয়া, ক্ষমতা দখলের বাসনা লইয়া।

“কিন্তু সেই সাহসও তাহাদের জুটিল না।…

“এক নেতা উঠিয়া দাঁড়াইয়া চেয়ারপারসনের মুখপানে চাহিয়া কহিলেন : ‘আমরা কি প্রস্তুত আছি? এই প্রশ্ন তুলিতেছি কারণ আমরা ইতিমধ্যে যে-কয়েকটি ছোটখাটো কর্মসূচি পালন করিলাম, দেখা গেল রৌদ্রের জ্বালা সহিতে না পারিয়া কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করিয়া নিজ নিজ বাসায় ফিরিয়া গিয়া এসির বাতাস খাইতে লাগিলাম। ইহাতে প্রমাণিত হয় কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা আমাদের কতখানি লোপ পাইয়াছে। পুলিশ একটা বাড়ি না দিতেই আমরা হাউমাউ চিল্লাপাল্লা করিয়া রাস্তায় পড়িয়া অজ্ঞান হইয়া যাই, অথবা অজ্ঞান হওয়ার ভান করি। আর আমাদিগকে চ্যাংদোলা করিয়া প্রিজনভ্যানে তোলা হয়; উহাতে যে-সিনক্রিয়েট হয় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পর্দায় তাহা জনসাধারণ দেখিতে পায়; তাহারা দেখিতে পায় আমাদের লড়াই-সংগ্রামের কী অবস্থা, কী দশায় পৌঁছিয়াছে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নৈতিক মনোবল। পুলিশ রিমান্ডে লইয়া একটু ধমকাধমকি করিলেই কাপড়চোপড় নষ্ট হইয়া আমাদের মরণদশা উপস্থিত হয়! আমরা আদালতে দাঁড়াইয়া বোতল থেরাপির শিকার হইয়াছি বলিয়া সেই থেরাপি বিশদ বর্ণনা করি। ছি ছি ছি! কী লজ্জার কথা। আমার গুহ্যপথে বোতল ঢুকানো হইয়াছে—এই ধরনের কথা আমরা বলি প্রকাশ্য আদালতে দাঁড়াইয়া। কিন্তু একটি বারও ভাবিয়া দেখি না, যে-নেতার গুহ্যপথে বোতল ঢুকান হয় জনসাধারণ তাহার সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করিতে পারে।’”


আপনাদের মনে কি এতদিনে এই সন্দেহ জাগে নাই যে, গোবেচারি জামিলা বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হইয়াছে?


“আরেক নেতা উঠিয়া পূর্বের বক্তাকে আক্রমণ করিলেন, ‘আপনি নিজে কি বোতল থেরাপির শিকার হইয়াছেন? উহাতে কী যন্ত্রণা হয়, সেই অভিজ্ঞতা কি আপনার আছে? থাকিলে এমন কথা বলিতে পারিতেন না। ব্যথা যাহার লাগে চিৎকার সেই করে।’”

‘গাভী হারাইয়াছে, পুলিশের গুলিতে কাক মরিয়াছে, পুলিশ একজন শান্তিবাদী বুদ্ধিজীবীর দাঁত ফালাইয়া দিয়াছে—এই সমস্ত বিষয় জনসাধারণকে যেভাবে আন্দোলিত করিল, তাহারা যে-স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ-বিক্ষোভ জানাইল, এমনকি সরকারকে কারফিউ ঘোষণা করিতে পর্যন্ত বাধ্য করিল, সে-তুলনায় প্রধান বিরোধী দল হিসাবে আমরা কিছুই করিতে পারিলাম না, এই দুঃখে আমার বুক ভাঙিয়া যাইতেছে।’

‘আমরা কিছুই করিলাম না, অথচ আমাদের ১৩০০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হইল। ইহা কি কিছুই নহে? পুলিশ তাহাদিগকে কিভাবে নির্যাতন করিতেছে, খাইতে দিতেছে কি না, ঘুমাইতে দিতেছে কি না—এইসব খবরাদি কি আমরা রাখিয়াছি?’

‘কিন্তু এই গণগ্রেপ্তারের সাহস সরকার কোথা হইতে পাইল? আমাদিগের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নৈতিক মনোবলের হীনদশা দেখিয়াই পাইল।’

‘যাহারা নির্যাতনের শিকার হইয়াছেন এবং হইতেছেন, যথাসময়ে তাহাদের উপযুক্তভাবে মূল্যায়ন করা হইবে।’

‘একেকটি ঘটনা ঘটিতেছে, আর সেই সুযোগে পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদের পাইকারি হারে গ্রেপ্তার করিয়া লইয়া যাইতেছে; টাকা-পয়সাও লইতেছে পাইকারি দরে। নির্যাতনের কথা না-ই বা বলিলাম।’

‘টাকা-পয়সা খরচ হইতেছে বলিয়া চিন্তার কিছু নাই। টাকা-পয়সা আবার হইবে। সকলকে ধৈর্য ধারণ করিতে হইবে।’”

‘‘এই সমস্ত লক্ষ্যহীন কথাবার্তায় প্রধান বিরোধী দলের জরুরি বৈঠকের সময় অতিবাহিত হইল : সুনির্দিষ্ট করণীয় সম্পর্কে তাহারা কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারিলেন না। আসল কথা হইল, তাহারা সিগন্যাল পান নাই। সিগন্যাল আসিতে এখনও অনেক বিলম্ব আছে তাহারা বিলক্ষণ জানেন। তাই নেতাকর্মীদিগকে মনোবল চাঙা রাখিবার কথা মুখে যতই বলুন, কার্যত কিছু করিতে পারিতেছেন না। ক্ষমতা হইতে সাড়ে তিন বৎসর তফাতে থাকিয়া নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা করিবার পন্থা যে নাই তাহারা সকলেই তা বিলক্ষণ জানেন।

“যাক, প্রধান বিরোধী দলকে লইয়া আর সময় নষ্ট করিব না। এখন আমাদের মিডিয়ার কথা বলিব, স্বাধীন সাংবাদিকতা, অবাধ তথ্যপ্রবাহ ইত্যাদি ফাইন ফাইন কথাবার্তার উল্টা চিত্র আপনাদিগকে দেখাইতে প্রয়াস করিব। দেখুন পাঠক, জামিলাকে কেন্দ্র করিয়া সংবাদমাধ্যমের লম্ফঝম্প অকস্মাৎ থামিয়া গেল। কিন্তু তাহারা চূড়ান্ত সত্য প্রকাশ করিল না। আপনারা কি ভাবিয়াছেন সত্যটা তাহারা জানিতে পারে নাই? তা হইলে ভুল করিবেন। আমি আশা করিতেছি এহেন ভুল আপনারা করিবেন না।

“আপনাদের মনে কি এতদিনে এই সন্দেহ জাগে নাই যে, গোবেচারি জামিলা বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হইয়াছে? ধারণা করি জাগিয়াছে। এবং আপনাদের এরূপ সন্দেহ সম্পূর্ণ সঠিক : জামিলা সন্দেহাতীতরূপে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হইয়াছে। ওই নির্মম নৃশংস হত্যাকাণ্ড স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছেন এমন এক ব্যক্তির সহিত আমার সাক্ষাৎ ঘটিয়াছে। আমার নিকট আসিবার পূর্বে তিনি পাঁচটি দৈনিক সংবাদপত্রের কার্যালয়ে গিয়া উহাদের সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকগণের নিকট সবিস্তারে বর্ণনা করিয়াছেন তিনি কী দেখিয়াছেন। অনুরূপভাবে পাঁচখানা স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের কর্তাব্যক্তিগণের সহিতও তিনি সাক্ষাৎ করিয়া নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু না কোনও সংবাদপত্র, না কোনও টিভি চ্যানেল তাহার সেই বক্তব্য প্রকাশ বা প্রচার করিয়াছে।

“আপনাদিগের মধ্যে যাহারা সাংবাদিকতার স্বরূপ ও গতিপ্রকৃতি সম্বন্ধে আগ্রহী, তারা এই ঘটনাটি ভালোভাবে লক্ষ করিবেন : এই দেশে সাংবাদিকতা কতদূর পর্যন্ত যাইতে পারে, দেখিতে পাইবেন, কোথায়, কত দূর অবধি গিয়া, অথবা কত নিকটে থাকিয়া উহার দৌড় সমাপ্ত হয়। জামিলার বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সেই প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সাধারণ সদস্য : পুলিশ কনস্টেবল। নাম জগন্নাথ সাহা। পিতার নাম, স্থায়ী ঠিকানা ইত্যাদি প্রকাশের আবশ্যকতা এক্ষণে নাই। তিনি আমাকে বলিলেন, নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জামিলাকে জবাই করিয়া রান্না করিয়া খাইয়া ফেলিয়াছে, উহার চামড়া বিক্রয় করিয়া টাকা-পয়সা ভাগবণ্টন করিয়া লইয়াছে। তাহারা যখন জামিলাকে জবাই করিবার উদ্যোগ নিতেছিল, তখন তাহাদের সহকর্মী জগন্নাথ সাহা নিষেধ করিয়াছিলেন। উহারা নিষেধ শুনে নাই। জগন্নাথ সাহা উহাদের হাতে-পায়ে ধরিয়া বিলাপ করিয়া বলিয়াছেন : এই পাপ তোমরা করিও না!

“পাঠক নিশ্চয়ই বুঝিতে পারিতেছেন জগন্নাথ সাহা তাহার পবিত্র গো-মাতাকে রক্ষা করিবার জন্য কত প্রকারে চেষ্টা করিয়া থাকিতে পারেন। কিন্তু তাহার সকল প্রচেষ্টা, সমস্ত অনুনয়-বিনয়, এবং সর্বশেষে আইনের অজুহাত-কোনও কিছুই গো-মাতাকে রক্ষা করিতে পারে নাই। কাণ্ড দেখুন : জামিলাকে উহারা জবাই করিয়া স্রেফ খাইয়া ফেলিয়াছে! ইহাকে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলিলে যথেষ্ট বা যথার্থ বলা হয় কি না তাহাও ভাবিয়া পাইতেছি না।

“এক্ষণে আপনারা জিজ্ঞাসা করিবেন, জগন্নাথ সাহা যখন তাহার এই প্রত্যক্ষদর্শনলব্ধ অভিজ্ঞতা সংবাদ মাধ্যমের কর্তাব্যক্তিগণকে অবহিত করিলেন, তখন কী বলিয়া তাহারা তাহাকে ফিরাইয়া দিলেন? আমিও জগন্নাথ সাহাকে এই প্রশ্নই জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। তিনি জানাইলেন, খবরের কাগজ ও টিভি চ্যানেলগুলির কর্তাব্যক্তিগণ তাহাকে বলিয়াছিলেন, আপনার সকল বৃত্তান্ত শুনিলাম, বড়ই পরিতাপের বিষয়। দেশটা যে দিন দিন কী হইয়া যাইতেছে ইত্যাদি বলিয়া আফসোস করিলেন, অতঃপর বলিলেন, আচ্ছা, কী করা যায় আমরা দেখিব।

“একটি পত্রিকার একজন প্রতিবেদক জগন্নাথ সাহার বৃত্তান্ত শুনিয়া তাকে টানিয়া লইয়া বলিয়াছেন, আপনি বিপদে পড়িবেন, ইতিমধ্যে পড়িয়া গেছেন, আপনার চাকরি নাই, এখন প্রাণ লইয়া টানাটানি বাঁধিবে; আপনি এই মুহূর্তে অমুক দেশের দূতাবাসে গিয়া আশ্রয় লন। অতঃপর তিনি নিজেই জগন্নাথ সাহাকে সঙ্গে করিয়া উক্ত দূতাবাসে গিয়া বৃত্তান্ত বলিয়া তাহাকে আশ্রয় দিতে অনুরোধ জানাইয়াছেন। কিন্তু উক্ত দূতাবাসের কর্তৃপক্ষ কোনও কারণ ব্যাখ্যা না করিয়া জগন্নাথ সাহাকে ফিরাইয়া দিয়াছে। অতঃপর ওই প্রতিবেদক জগন্নাথ সাহাকে লইয়া গেলেন একটি ইউরোপীয় দেশের দূতাবাসে; সেখানকার লোকেরা তাহাদের বলিল, আমরা তোমাদের এত ঝামেলা আর সহিতে পারিব না। কিছুদিন পূর্বে তোমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর তাড়া খাইয়া তোমাদের এক সাংবাদিক দৌড়াইয়া আসিয়া এইখানে উঠিল; তাহাকে আমাদের দেশের মাটিতে আশ্রয় দিতে হইবে নচেৎ প্রাণসংশয়। আমরা তাহাকে দূতাবাসে আশ্রয় দিলাম। তারপর তাহাকে আমাদের দেশে লইয়া গিয়া মুক্ত বাতাসে ছাড়িয়া দিব কিন্তু তাহার উপায় কী? আমরা তাহাকে দূতাবাস হইতে বিমানবন্দর লইয়া যাইব সেই সাহসও পাই না, পাছে পথিমধ্যে তাহার কিছু হইয়া যায়। এখন আপনারা যে কেস লইয়া আসিয়াছেন, শঙ্কা হইতেছে ইহা আরও গুরুতর এবং জটিল। আমরা আপনাকে দূতাবাস ভবনে আশ্রয় দিতে অপারগ বলিয়া দুঃখিত। তবে যদি কোনও প্রকারে সদেহ আমাদের ভূখণ্ডে পৌঁছিতে পারেন, তা হইলে আমাদের ল অফ দি ল্যান্ড আপনার সুরক্ষার দায়িত্ব লইবার চেষ্টা করিবে।

“কিন্তু জগন্নাথ সাহা ইউরোপ যাইতে পারেন নাই। নিজের দেশের মাটির উপর দিয়া হাঁটিয়া নিরাপদ দূরত্বে পলাইয়া যাইতে চাহিয়াছেন : যাইতে যাইতে সম্মুখে কাঁটাতারের বেড়ার বাধার মুখে পড়িয়াছেন, সেই বাধা ডিঙ্গাইতে গিয়া গুলি খাইয়া মরিয়াছেন।

“আর কিছু বলিব না। যা বলিয়াছি তাহাতেই অনেক হইয়াছে, আমার এখন বোতল থেরাপি গ্রহণের প্রস্তুতি লইবার পালা। ”

৭.
কুক-কুরুশ-কুউক!

পাশের বাড়ির ছাদে খাঁচার মধ্যে ডেকে উঠল মোরগ। ‘হাম্মা’ বলে আর্তনাদ করে উঠল জামিলার বাছুর : তারপর গর্দান টান টান করে মুখটা নিচের দিকে নামিয়ে এত জোরে শ্বাস ছাড়ল যে আশেপাশের ধুলা সব উড়ে গেল। পটাং করে একটা শব্দ উঠল, তারপর ফোঁস!

মফিজ চোখ মেলে তাকাতেই কপাল বরাবর দেখতে পেল দাবনীয় দুটি চোখ : মাত্র এক ঝলক। জামিলার ছেলের শিংবিহীন মাথার ঢুসে নড়ে উঠল মফিজের ব্রহ্মতালু। সে হামলাতে শুরু করল: ‘মা গোওও.. আম্মাহ!’

মশিউল আলম

জন্ম ১৫ জুলাই, ১৯৬৬; জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই :
গল্পগ্রন্থ—
১. রূপালী রুই ও অন্যান্য গল্প [সাহানা, ১৯৯৪]
২. মাংসের কারবার [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০২]
৩. আবেদালির মৃত্যুর পর [ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০০৪]
৪. পাকিস্তান মাওলা ব্রাদার্স [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১১]

উপন্যাস—
১. আমি শুধু মেয়েটিকে বাঁচাতে চেয়েছি [মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৯]
২. তনুশ্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় রাত [মাওলা ব্রার্দাস, ২০০০]
৩. নাবিলাচরিত [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০১]
৪. ২০৯৯ [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ২০০১]
৫. ঘোড়ামাসুদ [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৫]
৬. প্রিসিলা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০১]
৭. বাবা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৯]
৮. বারে বারে ফিরে আসি [জনান্তিক, ২০১১]
৯. জুবোফস্কি বুলভার [প্রথমা, ২০১১]
১০. দ্বিতীয় খুনের কাহিনি [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৫]
১১. কাল্লু ও রেজাউলের সত্য জীবন [আলোঘর প্রকাশনা, ২০১৬]
১২. যেভাবে নাই হয়ে গেলাম [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৬]

শিশু সাহিত্য [উপন্যাস]—
১. তুমুল ও হ্যারি পটার [মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৫]
২. তুমুলের আঙুলরহস্য [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৫]
৩. বিড়াল কাহিনি [চন্দ্রাবতী একাডেমি, ২০১৬]

কলাম সংকলন—
১. জাহাঙ্গীর গেট খোলা আছে [অনন্যা, ২০১১]
২. বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়েছিল কে ও অন্যান্য নিবন্ধ (আলোঘর প্রকাশনা, ২০১৭]

অনুবাদ—
১. প্লেটোর ইউটোপিয়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ : বার্ট্রান্ড রাসেল [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ১৯৯৭]
২. অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স ও অন্যান্য প্রসঙ্গ : বার্ট্রান্ড রাসেল [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ১৯৯৯]
৩. সক্রেটিসের আগে : বার্ট্রান্ড রাসেল [অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ২০০৩]
৪. সাদা রাত : ফিওদর দস্তইয়েফস্কি [বাংলা একাডেমি ২০০০, অবসর প্রকাশনা সংস্থা ২০১৬]
৫. বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি : আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম [মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৯]
৬. উইকিলিকসে বাংলাদেশ : মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তার অনূদিত সংকলন [প্রথমা প্রকাশন ২০১৩]
৭. দ্য গুড মুসলিম : তাহমিমা আনাম [প্রথমা প্রকাশন ২০১৫]

ই-মেইল : mashiul.alam@gmail.com

Latest posts by মশিউল আলম (see all)