হোম গদ্য গল্প জাদুর কাপড়

জাদুর কাপড়

জাদুর কাপড়
538
0

দীর্ঘ কেশরাশিতে ঢাকা যুবতীর ঘুম ভাঙে। চোখে ঝিমুনি। নিজেকে আবিষ্কার করে জিইসি মোড়ের বিশাল এক বিলবোর্ডে। ফিনফিনে দেহে কোনো কাপড় নেই। অনাবৃত শরীরের লেশমাত্র ওজন নিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করে। হাতদুটো ঝুলছে শূন্যে। দীর্ঘ কেশরাশি বাতাসে ওড়ে। রাস্তায় এমন ধোঁয়া ওঠে কী করে? চোখের বিভ্রম হয়তো। এই বিভ্রমের সমাধান কী হতে পারে তার জানা নেই। কাউকে প্রশ্ন করে কোনো সহজ উত্তর পাওয়ার আশাও নেই। খানিকটা সংশয়চিত্তে প্রশস্ত রাস্তার দিকে তাকায়। সন্তর্পণে বিলবোর্ড থেকে রাস্তায় নেমে আসে। উদ্যম ফিরে পায়। তারপর শহরের রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করে।

শরীর ঢাকার কায়দা তার জানা নেই। তার নগ্নকান্তি শরীর এই ফাঁকে শোরগোল তোলে। তারই অজান্তে। সবখানে হইচই। কী নিপুণ নির্মাণ দেহের প্রতিটি গুপ্ত কুঠুরির। সবাই দেখছে। পেলব ও নতুন। কিশোর কিংবা তরুণ শুধু নয়, স্কুল-কলেজ ফেরত মেয়েরাও দেখে। বিস্মিত হয়। তাকে পরখ করতে ভিড় জমে চৌরাস্তার মোড়ে, নির্জন দুপুরে, এমনকি টিভির পর্দায়। এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার।


স্কুল ফেরত বালিকারাই প্রথমে চমকে দেয়। বিবসনা যুবতী তাদেরকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে।


যুবতীর অদম্য গতি ও শরীরের তেজ বাকিদের প্রভাবিত করতে শুরু করে। ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে। শহরের রক্ষণশীল মানুষ প্রথমে কৌতূহলী হয়। ধীরে ধীরে আতঙ্ক গ্রাস করে। স্কুল ফেরত বালিকারাই প্রথমে চমকে দেয়। বিবসনা যুবতী তাদেরকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। শহরের তরুণীদের সংশয়কে মাটিচাপা দিয়ে তারা নির্দ্বিধায় বন্য হয়ে ওঠে। একে একে সব আড়াল খুলে ফেলে। তখন আরও এক নতুন বিস্ময় জমা হয় শহরের বুকে।

রক্ষণশীল অভিভাবকেরা ক্ষোভ ও অপমানে ফুঁসতে থাকে। এই প্রথম তারা জানতে পারে মেয়েদের পর্দা খসে পড়তে আর দেরি নেই। এই লোভ ও প্রলোভনকে এড়ানো অসম্ভব মনে হয়। প্রথমে প্রতিবাদ করার কথা ভাবে। তারপর সম্ভ্রম রক্ষায় নানাবিধ উপায় খুঁজার চেষ্টা করে। একটা অভিনব উপায় বের করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। সন্তানদের আপত্তি সত্ত্বেও তারা মেয়েদের কাপড়ে শতশত আালপিন লাগিয়ে দেয়। একইসাথে শাসন ও আদর দিয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে। মেয়েদের শরীর আলপিনের ভারে ভীষণ ভারী হয়। তারা হাঁপিয়ে ওঠে। বাদবাকি সুন্দরী যুবতীরা তাদের পুষ্ট নিতম্ব, স্তনজোড়া, এমনকি জঙ্গার উপর-নিচে বিশুদ্ধ বাতাস লাগিয়ে হেঁটে যেতে যেতে পর্দানশীল বালিকা ও যুবতীদের দিকে করুণাভরা দৃষ্টিতে তাকায়। কিন্তু এরই ফাঁকে পর্দানশীল মেয়েদের জন্য নতুন বিপত্তি হাজির হয়। যে বিপর্যয় অভিভাবকেরা ঠেকাতে চাইল শতশত ওজনদার আলপিন তাদের শরীরে বিদ্ধ করে তা উল্টা আরও বেশি আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যুবতীরা যখন প্রায় কুঁজো হয়ে রাস্তার কিনার ঘেঁষে বুকে বই কি ব্যাগ চেপে ধরে হেঁটে যায় তখন তাদের জামায় আটকে থাকা ধাতব খণ্ডগুলোর ভারে কাপড়গুলো টুকরো টুকরো হয়ে ছিঁড়ে যায়। আর হয় কি, তাতে মেয়েরা ঘরে ফেরার আগেই দেহের গোপন কুঠুরির আড়াল হারাতে থাকে। হাতের বই ফেলে, কলেজের ব্যাগ ফেলে তারা ব্যস্ত হয়ে ওঠে দেহের আব্রু রক্ষায়। কিন্তু সে-কাজে তাদের খুব একটা উৎসাহী হতে দেখা যায় না। তারা বুকের কাছে ছিঁড়ে যাওয়া জামার জোড়াতালি দিতে পাছার উপর থেকে কাপড় ছিঁড়ে নেয়, আর তাতে পেলব পাছার চামড়াটা তাদের ইচ্ছার কিছুটা আড়াল খুলে দেয়। বাদবাকি পর্দানশীল মেয়েদেরও এই দৃশ্য মনে ধরে। তারাও নিজেদের এভাবে খুলে দিতে উৎসাহী হয়। যখন তারা বাড়ি ফিরে যায় রক্ষনশীল রমণীরা সন্তানদের বেহায়া ও বেআব্রু বেশভূষণ দেখে ফুঁসে ওঠে। তারা দেখে সুরক্ষিত মেয়েরা নিজেদের রক্ষা করতে পারে নি। যা বাদবাকি মেয়েরা অনায়াসে করে তাদের মেয়েরাও সে পথ নির্দ্বিধায় মাড়াতে চাইছে। আলপিনের ভারে ছিঁড়ে যাওয়া কাপড় তখন মেয়েদের হাতে না পেয়ে তারা হিংস্র হয়ে ওঠে। নিজেদের আব্রু ঠিকঠাক করে সেসব ছেঁড়া টুকরা খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে।

রমণীদের এই গৃহত্যাগ হয়ে উঠে বিপত্তি ও সংগ্রামের লড়াই। তাদের জন্য সেসব কাপড় খুঁজে পেতে নেয়া রীতিমত অসম্ভবই। কেননা তাদের কাপড়ের ছেঁড়া টুকরোগুলো সেসব ছেলেমেয়েরাই কুড়িয়ে নেয় যারা বিবসনা যুবতীর প্রাণশক্তি ও সাহসে অনুপ্রাণিত হয়েছে। তার কাছে বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। তাদের খুঁজে পাওয়া সহজসাধ্য ছিল না। তারা প্রায় একজোট হয়ে প্রতিদিন নতুন গন্তব্য ঠিক করে এবং যে যার মতো করে নিজেদের মিশন নিয়ে নতুন নতুন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। তারা কেবল সেসব মানব-মানবীকেই আশীর্বাদ করে যারা সাহসী ও নগ্ন হয়ে উঠতে পেরেছে। লাজুক ও রক্ষণশীলদের জন্য তাদের দরজা খোলা হয় না। কিন্তু যখন তারা ধীরে ধীরে নিজেদের উপর বিশ্বাস হারায়, তখন বিবসনা যুবতীর অনুসারীরা এসব হতাশ ও অতৃপ্তদের আশীর্বাদ করে। নিজেদের নিশ্বাস লম্বা ও দীর্ঘ করার সুযোগ পায়। তারা খানিকটা স্বস্তি পায়। ততদিনে তাদের শরীরে আর কোনো কাপড়ই অবশিষ্ট থাকে না। রক্ষণশীল মায়েরা এসব স্কুল-কলেজ ফেরত ছেলেমেয়েদের একই পথ মাড়ানোর আগেই বিষয়টা নিয়ে সচেতন হলেও কোনো ফয়সালা করতে পারে না। ছেলেদের সুপথে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। সকল পুরুষ গোল্লায় যাক, কারণ তাদের ধর্মই হলো ধর্ষকাম এরকম ভাবনা তাদের কাবু করে। অন্তত এমনটা ভেবে ভেতরের ক্ষোভটা নেভানোর চেষ্টা করে। কিন্তু মেয়েদের রক্ষা করার সবগুলো পথও বন্ধ হয়ে পড়তে দেখে তারা ভীত হয়। সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কল্পনা করে ভীষণ মুষড়ে পড়ে। হতাশায় নিজেদের চুল ছিঁড়েতে থাকে।


বিবসনা যুবতীকে হ্যামিলনের বাঁশিঅলা মনে হয়। এভাবে পুরো শহরকে কব্জা আর কেউ করতে পারে নি। 


সন্তানদের আব্রু রক্ষার শেষ চেষ্টায় তবু তারা পিছপা হয় না। শহরের রাস্তায় রাস্তায় খুঁজতে থাকে বিবসনা যুবতীকে। এভাবে রাস্তায় হাঁটার অভ্যাস তাদের আগে ছিল না। পা আলগা করে, অতি সতর্কতার সাথে হাঁটতে গিয়ে তাদেরকে বারবার নিচের দিকে খানিকটা ঝুঁকতে হয়। বাদবাকি দৃশ্যাবলি, মানুষজন, কোলাহল ও গাড়ির হর্ন কিংবা সাঁই করে চলে যাওয়া দ্রুতগামী বাস কোনোকিছুই তারা নজরে আনতে পারে না। কেবল রাস্তার পাশের বিশাল বিশাল ড্রেনগুলো দেখে স্বভাববশত শাড়ির আঁচলে নাক চেপে ধরে। তাদের কাছে বিবসনা যুবতীকে হ্যামিলনের বাঁশিঅলা মনে হয়। এভাবে পুরো শহরকে কব্জা আর কেউ করতে পারে নি। কী মোহনীয় জাদুতে বশ করেছে সমগ্র জনপদ। শহরে এমন দৃশ্য কখনও দেখা যায় নি। হতাশা তাদেরকে পাগল করে ফেলে। সম্ভ্রম টিকিয়ে রাখার জন্য কোনোকিছুই বাদ রাখে নি। সম্ভাব্য সবরকম চেষ্টাই করছে। তবু শেষরক্ষা হয় নি।

আর কে জানত এই চূড়ান্ত হতাশা ও বিভ্রমই তাদের নিয়তি। যে রাস্তা ধরে তারা সন্তানদের ফিরিয়ে আনতে ছোটে, সেই রাস্তাতেই তারা গন্তব্যহীন হয়ে পড়ে। একটা সময় রাস্তাটি শেষ হয়। সামনে আর কোনো রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায় না। যেসব পথ অতীতে সুখী মানুষের পদভারে বেজে উঠত সেসব রাস্তার কোথাও খোঁজাখুঁজি বাদ রাখে নি। সেসব রাস্তায় আর কোনো সুখী মানুষের দেখা পাওয়া যায় না। তবে কি আর কোনো কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী কিংবা নারী-পুরুষই সুখে নেই? যদিও এই সত্যের সাক্ষ্য দেবার কেউ নেই। কাউকে কোথাও চোখে পড়ে না। তাদের আন্দাজকে কেবল অসংখ্য মানুষের অতীতের পায়ের চাপ নীরবে সাক্ষ্য দেয়।

প্রতিদিন এভাবে সূর্য অস্ত যায়। সন্ধ্যা নামে। কোনো কোনো পূর্ণিমার রাতে চাঁদের আলোয় রাস্তার পাশের বিশাল বিলবোর্ডে শায়িত এক বিবসনা যুবতীর চোখ চিকচিক করে ওঠে। তাকে খুব নিঃসঙ্গ মনে হয়। চাঁদের আলোয় পেলব যুবতীর চোখের জল কেবল তারাই দেখতে পায় যারা কখনও বিলবোর্ড দেখে নি। কিন্তু বিলবোর্ড দেখে নি এমন মানুষ শহরের কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

যুবতীর সারা গায়ে যখন পূর্ণিমার আলো পড়ে, তখন এক অবিশ্বাস্য আভার জন্ম হয়। সে আভায় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে দলা দলা পুঁজ। নিঃসঙ্গ যুবতীর দীর্ঘ কেশরাশি শরীরের ক্ষত আড়াল করে জাদুর কাপড়ের মতো পতপত করে উড়তে থাকে।

Fazlul Kabir

ফজলুল কবিরী

জন্ম ৯ অক্টোবর ১৯৮১; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগে কর্মরত।

প্রকাশিত বই :
বারুদের মুখোশ [গল্প, বাঙলায়ন, ২০১৫]
ঔরসমঙ্গল [উপন্যাস, বেহুলাবাংলা, ২০১৭]
ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া গল্প [গল্প, জেব্রাক্রসিং, ২০১৮]

ই-মেইল : fazlulkabiry@yahoo.com
Fazlul Kabir