হোম গদ্য গল্প জাদুকর, অমনিবাস আর চিরকুট

জাদুকর, অমনিবাস আর চিরকুট

জাদুকর, অমনিবাস আর চিরকুট
545
0

হঠাৎ হারালো সন্ধ্যা-রাতে, রাতভর খোঁজা, দিনভর খোঁজা। বাবার দোকানের ঝাঁপি বন্ধ হচ্ছে তখন, সেই সন্ধ্যায়; গোসল শেষে মায়ের চুল থেকে ঝরে পড়া পানি শুকোয় নি তখনও মেঝে থেকে।

মা বিছানায় শুয়ে এলিয়ে দিতেন চুল বিছানার এক ধারে, কংক্রিটের মেঝে অবধি আর পত্রিকাটা পড়তেন দিনের ঐ সময়টায়, বিকেল শেষ—সন্ধ্যার শুরু; গোধূলি।


তৃণা’পা এক আজন্ম বিধবা, চিরন্তন বৈধব্যে মোড়া!


জানালার ওপাশে পঁচিশ তলা চৌদ্দ তলা’রা বেড়ে উঠছে পাল্লা দিয়ে। আর একটা ক্ষুদ্র তিন তলার কিশোরের সাথে কথা বলছে পাঁচ তলার ছাদে দাঁড়ানো কিশোর, ঝুঁকে পড়ছে যেন কার্নিশ টপকে নামবে। শঙ্কা নিয়ে দেখছিলাম ও-কে, গোলাপি শাড়ি—লাল শার্ট—শাদা চাদরটা এড়িয়ে চলছেই ওদের সজোরে গল্প-সল্প। কেবল আমার কানে আসছে কয়েক খণ্ড চিৎকার। ভাবছি তখনও। কোথায় হারালো অমনিবাসটা?

ঠিক ঠিক মনে আছে রেখেছিলাম তাকে একদিকে হেলে পড়া কাঠের সেলফটায়—পায়ের তলায় কাগজ গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে যেটা।

তৃণা’পা ছাদ ঝাঁট দিতে দিতে কাগজের ঢিল ছুড়ল জানালায় আর ভেঙে গেল, ছড়িয়ে গেল ভাবনারা। তৃণা’পাদের একতলা বাড়ির ছাদ এই দু’তলার জানালা লাগোয়া। আমার আর তৃণা’পার বিকেলবেলার আড্ডা তাই বেশ জমে। ‘কি রে পেলি খুঁজে?’—আমি নিরুত্তর, তৃণা’পার ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে ফিসফিস প্রশ্নকে বড় জোরাল মনে হয়। চোখ কী বলছে ভাবতে ইচ্ছে হয়। আসলে মানুষগুলো হুটহাট মরে যায়। তৃণা’পার বরটাও মরে গেল। লঞ্চডুবিতে জলে গেল, নদীর জলে। আর তৃণা’পা ছাদ ঝাঁট দিতে দিতে কাটিয়ে দিচ্ছেন ঝিম মেরে থাকা দিনগুলো। এভাবে কাটিয়ে দিতেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন এক সকালে বিধবা তৃণা’পাকে রেখে গিয়েছিল এখানে। এইসব গল্প হয়ে গেলে, আমাদের মাঝে মাঝে—তৃণা’পার বিয়ে হয়েছিল এ কথাটাই কেমন অলীক মনে হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় যেন তৃণা’পা এক আজন্ম বিধবা, চিরন্তন বৈধব্যে মোড়া!

অমনিবাস-টা পাই নি খুঁজে, কোথাও না—তৃণা’পার বিমর্ষ বিকেলজুড়েও যেন বাজতে থাকে কথাগুলো। ঠিক ঠিক আবার মনে পড়ে যায় অমনিবাসেই রেখেছিলাম চিরকুটটা না পড়েই। পড়া আর হলো কই! তুলন দৌড়ে এসে হাতে গুঁজে দিলো কাগজ আর ফিসফিসিয়ে বলা—জাদুকর দিয়ে গেছে এটা। তারপর হঠাৎ মা-র চলে আসা। আর সেই অমনিবাসের ফাঁকে লুকিয়ে রাখা চিরকুটটা। তারপর কী অদ্ভুত! অমনিবাসটা এখন আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। না বইয়ের তাকে, না পড়ার টেবিলে, না কাপড়ের স্তূপে, বিছানার তোশকের নিচে, এখানে-সেখানে, বাতিল জিনিসের ঘুপচি ঘরটাতে… কোথাও না।

সেই সে দিন থেকে জাদুকরও উধাও … পুতুল নাচের সামিয়ানা কখন, কোন সে সময় যে খুলে নিয়ে চলে গেল লোকগুলো সব, আমরা কেউ খবরই পেলাম না। ওরা চলে গেছে এ হাহাকার কেবল ছড়িয়ে রইল তৃণা’পার ঝাড়ুতে উড়তে থাকা ধুলোমাখা বিকেলে। অথচ আমরা যেন মনেই রাখতে চাই না যে জাদুকরের এখানে থাকার কথা ছিল না।

আর আমাদের মনে পড়ে ফাঁকা রাস্তা, গলির পথ, মধ্যবিত্ত নাগরিক পাড়া ডিঙিয়ে পা টিপে টিপে নেশা-নেশা সন্ধ্যারাতে দেখতে যাওয়া “দু’টাকার খেল” কিংবা জাদুকর। গুটিকয়েক কিশোরী-তরুণী, যারা ভুলে যায় প্রত্যেকের লক্ষ্য হয়ে গেছে একটা চিরকুটে লেখা ঠিকানা। চিরকুটগুলো গোধূলিতে খেলে বেড়ানো বালক-দলের হাতে হাতে পৌঁছে যেত অন্দরে। জাদু দেখানোর সময় থাকত লেখা।

আর পাড়াটায় তখন দুর্গা পুজোর রেশ। জমে উঠেছে মণ্ডপগুলোকে ঘিরে নাগরদোলা, পুতুল-নাচ, মুড়ি-মুড়কি-বাতাসা, চুড়ি-নূপুর-গয়নার বাহার… আর এর আগে এ পাড়ার মেলায় জাদুকর কখনও আসে নি। এরপর জমে ওঠে জাদুকরের ‘দু’টাকার খেল’! জাদুকর তখন যেন অলৌকিক কোনো ছায়া। যেন ধরা যায় না। ছোঁয়া যায় না। যেন এমন কোনো মানুষ দু’টাকার খেল দেখাতে, কেবল “দু’টাকার খেল” দেখাতে আসতে পারে—তা বিশ্বাসে ধরা দেয় না। তুবড়ি বাজিয়ে জাদুকর এক ময়ূরকণ্ঠী নীল রঙের প্রজাপতি নিয়ে আসে কাচের জারে। আর চোখগুলোর সামনে ঘুরিয়ে নিতে থাকে নানান রঙে ডুবানো হাত দুটোকে। এবার চোখ বন্ধের খেলা শুরুর পালা! তারপর আসর ভাঙার ডাকে জাদুকরের অদ্ভুত হাসি চোখে ভাসলে মোহগ্রস্ত মানুষেরা ঠিক হিশেব মেলাতে পারে না কিছুতেই।


পারিবারিক নির্যাতন ব্যক্তিগত নয় বরং একপ্রকার সামাজিক ব্যাধি …


প্রতিদিন কেবল এই চোখ বন্ধের খেলা-র গল্প চলতে থাকে, হাটে-পথে-স্কুল, পাড়ায়-কলেজে আর বিশেষত ছাদের আড্ডার জটলাতে। কেউ বলে শেষবার যে কলিম চাচা খুন হলো আমি ঘটনাটা যেন দেখলাম পুরাটাই কিন্তু অখন আর মনেই পড়ছে না। কলিম চাচার প্যাথেড্রিন বেচার গল্পগুলোও তখন আরবার উঠে আসে। হাতে হাতে প্যাথেড্রিন দিয়ে ভীষণ আনন্দে নাকি হাসতো কলিম চাচা। উঠতি বয়সী ছেলেগুলো এসব আমাদের বলেছিল। আর প্যাথেড্রিনের ঘোরে পুণ্যও একবার কিছু কিছু স্বপ্নদোষের গল্প বলে গিয়েছিল আমাকেই কিংবা একা একা। পুণ্যকেও আমার তখন হুট-হাট সেই দিনগুলোতে মনে পড়ে যেতে থাকে খামোখাই।

ঠিক যেমন করে কেউ কেউ হারিয়ে ফেলা সোনার চুড়ি, দুল, চাবি, টাকা ফিরে ফিরে পেতে থাকে। আর একদিন অদ্ভুতভাবে স্কুল-পড়ুয়া মেয়েগুলো বলে বসে—জাদুকররে কেবল স্বপ্নে দেখি ক্যান! ছাদের আড্ডাগুলোয় তখন চুপ চুপ গল্প-কথা। তখন খোঁজ নিয়ে জানা যায় জাদুকর কেবল মেলার মাঠে থাকে, কখনও পাড়ার সীমানায় উঠে আসে না। তারপর জাদুকর এক ভাবনা। তারপর আমরা নিজেরা জেনেও জানি না যে অনেক চিরকুট জাদুকরের তাবুর বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে জমতে থাকে। তৃণা’পাকে আর সে ক’দিন অস্থির হয়ে কাঁদতে দেখা যায় না। আমাদের নিতাইদা মদ খেয়ে বাড়ি ফিরলেও শিপ্রাদির কেন যেন ঝগড়া করতে ইচ্ছেই করে না। আর ছাদের আড্ডায় সবাই বলেও বলে না যে জাদুকরটা কেমন অদ্ভুত যেন, যেন কেমন মন টানে! যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার আসরে বসে থাকার ছিল আমাদের।

আর তাই চটের ব্যাগ ঝোলানো যুবককে এখন আর কাল্পনিক ভাবা যাচ্ছে না। এমনকি চিরকুট আর অমনিবাস খুঁজে ফেরার যন্ত্রণায় ডুবে থেকে জাদু-র গল্প করতে থাকা পাড়ার লোকগুলোকেও অগ্রাহ্য করা যাচ্ছে না কিছুতেই।

টিউশন শেষে যে পথ ভেঙে উঠে যেতে হয় নর্দমা আর ডাস্টবিন পেরিয়ে, মায়া বৌদি বাজারের থলি হাতে দাঁড়িয়েই ছিল সেখানে। জাদুকরের চিরকুট জমানোর খেলা মায়া বৌদিই আমাদের মধ্যে বেশি খেলেছে এ ক’দিন। শেষ চিরকুট কেবল আমার হাতে পড়েছিল সেজন্য মেয়েটার আফসোসের অন্ত ছিল না। আমারও বটে, তবে কী না মায়া বৌদিকে তা জানানো হবে না কোনোদিন। আমাদের ঈর্ষাগুলো আকাশে মিলিয়ে যাওয়া রঙধনুর মতন আবছা আলোয় মাখানো। মায়া বৌদি যে স্কুলে পড়ায় তা কোনোদিন বোঝাই যায় নি গৃহস্থ বৌদির ভাড়া বাড়িতে পা রেখে। ওর চোখের কোণ ফুলে ফুলে থাকে প্রায়ই, একবার মাথা ফেটে চারটা সেলাই… আর বৌদি বই খুলে কোরাস করিয়ে পড়িয়ে গেছে ক্লাসরুমে… পারিবারিক নির্যাতন ব্যক্তিগত নয় বরং একপ্রকার সামাজিক ব্যাধি …

পাড়াতে তখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে। আমারও তখন আর কাউকেই বলে উঠা হয় না যে নৌকোর পাটাতনের ওপর গলুই-এর ভেতর পুণ্য আমায় ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছিল এ গল্পটুকু জাদুকর বদলে দেবে বলেছিল। তখন ভর-সন্ধ্যায় ছন্দাপাকে আজও কেউ না কেউ দেখতে আসে। চুল খুলিয়ে, হাঁটিয়ে-বসিয়ে-বলিয়ে-রাঁধিয়ে তারপর শেষ অবধি বলিরেখাগুলো ভারী মেকআপের আড়ালেও চোখে পড়তেই ক্ষান্ত হয় বটে! ছন্দাপা মাঝে মাঝে বলিরেখাগুলোকেও ধন্যবাদ দেয় বুঝি! যাক অন্তত কোথাও এসে তো আটকে যায় প্রমাণ করার অক্লান্ত পরিশ্রমের ক্ষণ! পাড়ার সবাই তখন ছন্দাপাকে নিয়ে ভীষণ অস্থির হয়ে ওঠে। ছন্দাপা-র সবগুলো একাডেমিক সার্টিফিকেট লুকিয়ে ফেলা হয় আর বলা হতে থাকে সব কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। ছন্দাপার ড্রয়ারে একের পর এক পার্লারের ঠিকানা জমতেই থাকে। আর ছন্দাপা একদিন ছাদ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলে—দ্যাখ্‌ আকাশটার কত বয়স হলো, তবু কী যে দারুণ রঙ ধরেছে সূর্য ডুবতেই।

ঠিক তখন তৃণা’পারও নিঃসন্দেহে আর মনে পড়ে না যে পাশের বিল্ডিং-এর আকাশ আলী তাকে একবার বিয়ে করবে বলেছিল। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে হুটহাট ছাদে চিঠি উড়িয়ে দেওয়া বন্ধ করে দেয়। তৃণা’পার ‘কী যেন কেন!’-র উদাসীনতার আড়ালে আমার মনে পড়ে যায় আগের চিঠিতে মাসিকের ঝামেলামুক্ত হয়ে যাওয়ার গল্পটা সে লিখে দিয়েছিল। যেমন করে তার আগের ঝিম ধরা দুপুরে হেসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে আমায় বলেছিল।

সেই দিনগুলোয় তখন অমনিবাস হারিয়ে যাওয়ার অস্বস্তির কথা লেখা হতে থাকে। এবং সত্যি আমাদের সবারই মনে হতে থাকে যে শেষ চিরকুটে জাদুকরের কোনো ঠিকানা নিশ্চয় লেখা ছিল। ছাদের ঐ বিকেলের আড্ডায় যারা বয়সে ছোট, যারা মাত্র নিজেদের তরুণী ভাবতেই উজ্জ্বল। যাদের টিফিন বাঁচানো পয়সা থেকে দু’টাকার বদলে পাঁচ টাকা যেত জাদুর খেলা দেখতে। তাদের চোখ প্রতি বিকেলেই ভিজে ভিজে উঠতে থাকে। অতঃপর ভীষণ অপরাধবোধ নিয়ে অদ্ভুতভাবে ভাবতে থাকি অমনিবাসটা ঠিক কোথায় গেল। একটা ছেঁড়া-মলিন মলাটের অমনিবাস যার প্রতিটি পাতা ভীষণ প্রিয় ছিল, সে চিরকুটসহ উধাও হয়ে যাবে ভাবনাটা সমস্ত সত্তাকে ভেঙে ভেঙে দিতে থাকে ক্রমশ।


প্রতিদিন কেউ না কেউ খুন হয়ে যায়, প্রতিদিন তাজা কিছু অদ্ভুত খবর থাকেই পত্রিকায়।


তখন সামনের চৈত্র সংক্রান্তির মেলার কথা মনে পড়ে যায় হঠাৎ। অথবা জমজমাট বৈশাখী মেলা। কিংবা বর্ষাতেও পহেলা আষাঢ়ে একটা ছোট্ট মেলা বসে পাড়াতে। আমরা তখন হিশেব মিলিয়ে দেখতে থাকি প্রতি মেলার খবরই নরেনদা এখানে ওখানে দিয়ে আসে তো। কমিটিগুলোয় বাবলু ভাই সবসময়ই থাকেন। তখন খুব জরুরি হয়ে পড়ে জাদু দেখতে চাওয়াটা। যেন অপরিহার্য!

কিন্তু পাড়া থেকে তারপর ধীরে ধীরে জাদুকরের গল্প উঠে যেতে থাকে। প্রতিদিন কেউ না কেউ খুন হয়ে যায়, প্রতিদিন তাজা কিছু অদ্ভুত খবর থাকেই পত্রিকায়। জাদুকর শব্দটার বদলে নতুন নতুন শব্দেরা আড্ডাগুলোয় হামলে পড়তে থাকে।

কেবল দু তিনটে ছাদের কার্নিশে কোনো কোনো তরুণী কিংবা কিশোরী কাঁচা হাতে একটা আদল এঁকে যায়… দোহারা গড়নের একটা ছেলে, একটা চটের ব্যাগ, একটা ঢোলা পাঞ্জাবি গা-য় …

জুয়েইরিযাহ মউ

জন্ম ১৯৮৮, ঢাকা।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ‘২য় চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রশিক্ষণ’-এ স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়নরত।

প্রকাশিত বই :

তাসেরা বুকমার্ক (প্রকাশক—মিতাক্ষরা, ফেব্রুয়ারি ২০১৬)

nirjola_zuairijah@yahoo.com