হোম গদ্য গল্প ছুবানের বউ অথবা পতিত জমির গল্প

ছুবানের বউ অথবা পতিত জমির গল্প

ছুবানের বউ অথবা পতিত জমির গল্প
638
0

ছুটির দিনে বাইরের বারান্দায় চেয়ার টেনে বসলে দেখা যায় কাঁথা সেলাইয়ের মতো মনোযোগ দিয়ে ছুবানের বউ একমনে পাতা ঝাঁট দিয়ে যাচ্ছে। কমলা রঙের খাটো শাড়ি হাতির মতো বিশাল থলথলা শরীরকে ঢাকতে পারে না পুরোপুরি। পেট ঢাকতে গেলে বেরিয়ে পড়ে বুকের খাঁজ। বুক ঢাকতে গেলে আলগা হয়ে যায় চর্বি জমা পেট। মোতালেব মাস্টার ভেবে পায় না কোন সে খাদ্যের গুণে ছুবানের বউয়ের পেটে এত মেদ জমে। তখন তার নিজের বউটার কথা মনে হয়। আকলিমা বেগমকে তিনি খাওয়া-পরার বিবেচনায় রানীর হালে রেখেছেন। গ্রামের সাদাসিধে নারী খাওয়া-পরা আর সপ্তাহান্তে বিনোদনের মতো একটু সঙ্গমের বাইরে আর কিছুতে কি সুখ খোঁজে? হয়তো খোঁজে, হয়তো খোঁজে না। মোতালেব মাস্টারের তা জানা নেই। প্রতিদিন তাদের খাবারের থালে মাছ-মাংস থাকেই। পোষা গাই গরু আছে। গরু দুধ দেয়। সেই দুধ বলতে গেলে আকলিমা একাই খায়। তবু তার পেটে কেন ছুবানের বউয়ের মতো চকচকা চর্বি জমে না এই চিন্তায় মোতালেব মাস্টারের ছুটির দিনটা ম্যাড়ম্যাড়া হয়ে যায়। তখন তার মনে পড়ে ছুবানের বউয়ের একটা চার বছরের ছেলে আছে এবং এই ছেলে জন্মের পরেই ছুবানের বউয়ের পেটে চর্বি নামার শুভসূচনা। মোতালেব মাস্টার এবার নতুন করে উপলব্ধি করে, সন্তান না হওয়ার অনেকগুলো অপকারিতার একটা হলো বউয়ের মেদশূন্যতা। তা সন্তানের জন্য তিনি কম লাফঝাঁপ করেন নি। সবই নসিব। নসিবে যদি না থাকে ছেলের মুখে বাপ ডাক শোনা, তবে ডাক্তার কী করতে পারে। মোতালেব মাস্টারের মাঝে মাঝে অবাক লাগে। কতদূর এগিয়ে গেছে চিকিৎসা বিজ্ঞান, অথচ তার বউয়ের পেটের ভেতর বীর্য আটকে রাখার মতো যেন-তেন গোছের একটা জাল আবিষ্কার করতে পারছে না তারা। হ্যাঁ, মোতালেব মাস্টার পূর্ণাঙ্গ পুরুষ মানুষ। সমস্যা তার বউ আকলিমারই। হাতুড়ে ডাক্তার রফি, ইনজেকশন দিতে গিয়ে যার নিজের হাতই কাঁপে, সে বলে নি, বলেছে শহরের বিজ্ঞ ডাক্তার, এ কে এম হুমায়ুন কবির। আকলিমার জরায়ু সন্তান ধারণে অক্ষম।

ছুটির দিনে বারান্দায় চেয়ার পেতে ছুবানের বউয়ের ঝুলে পড়া ভুঁড়ি দেখে আর এসব আবোল-তাবোল ভাবনা ভাবে মোতালেব মাস্টার। ছুবান আর ছুবানের বউ মোতালেব মাস্টারের গায়ের সাথে গা লাগানো প্রতিবেশী। এতটাই গা-লাগানো, এ বাড়ি যদি মাছ ভাজা হয়, ও বাড়ির ছুবান আর ছুবানের বউ টের তো পাই-ই, গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারে ভাজা মাছের সংখ্যা। আকলিমা তাই ভালোমন্দ যা-ই রাঁধুক, ছুবানের বউকে না দিয়ে খেতে পারে না। আকলিমার দয়ার শরীর।

মোতালেব মাস্টার চাঁদওঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সিনেমায় অথবা দুঃখের উপন্যাসে দেখা যায় প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক খুব নিরীহ টাইপের হয়। তার একটা পুরনো হয়ে যাওয়া কালো রঙের ছাতা আর বাইসাকেল থাকে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শিক্ষক চোখে কম দেখে। সাইকেল ঠিকভাবে চালাতে পারে না। প্রায়ই সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদের ভেতর পড়ে যায়। কিন্তু আমাদের মোতালেব মাস্টার সিনেমা আর গল্প-উপন্যাসের চিরায়ত ধারণা ভেঙে দিয়ে তিনি স্কুলে যান হিরো হোন্ডা মোটরসাইকেলে চড়ে। এবং তার কোনো রঙজ্বলা কালো ছাতা নেই। মাস্টারি করার পাশাপাশি তিনি মাতব্বরদের একজন হয়ে বিভিন্ন সামাজিক সঙ্কটে নেতৃত্ব দেন। স্কুলের নাবালেক ছেলেরা যেমন তাকে দেখে ভয় পায়, তেমন ভয় পায় নাবালেক ছেলের সাবালিগ বাবারাও।

পদ্মাসনে বসে তিনি মাথা দুলিয়ে একটা কথাই বারবার বলতে লাগলেন, চাঁদওঠ চাঁদওঠ। পীর সাহেবের অলৌকিকত্ব প্রকাশ করার জন্য সেদিনই কাঁচির মতো চিকন ঈদের চাঁদ উঠে গেল। তারপর এই গ্রামের নাম হয়ে গেল চাঁদওঠ

চাঁদওঠ গ্রাম নিয়ে গর্ব করার মতো অনেক কিছুই আছে। তবে সবকিছু পেছনে ফেলে মোতালেব মাস্টারকে সবচে’ বেশি আহ্লাদিত করে এই চাঁদওঠ নামটা। শুনলেই মনে হয় কেউ যেন আদর করে চাঁদকে বলছে, ও চাঁদ, ওঠ না একটু! কবে থেকে এই গ্রামের নাম চাঁদওঠ? ঠিকঠাক জানা নেই কারোরই। ছোটবেলায় মোতালেব মাস্টার বাবার কাছে গল্প শুনেছিলেন। তার বাবাই তখন ছোট। সেময় গ্রামদেশে হালি হালি হুজুর পাওয়া যেত না। দূরদেশের এক পীর সাহেব ঈদের নামাজ পড়াতে আসতেন। একবার নামাজ পড়াতে এসে তিনি কাশফের মাধ্যমে জানতে পারলেন, বাড়িতে তার বাবা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এই আছে এই নেই অবস্থা। সেদিন রমজানের উনত্রিশ তারিখ। ঈদের চাঁদ আজও উঠতে পারে আবার আগামীকালও উঠতে পারে। কারণ আরবি মাস ত্রিশ দিনেও হয়, আবার ঊনত্রিশ দিনেও হয়। পীর সাহেব চাইলেন, সেই ঊনত্রিশতম দিনেই যেন চাঁদ উঠে যায়। তাহলে তিনি নামাজ পড়িয়ে পরদিনই পিতাকে দেখতে চলে যেতে পারবেন। পীর সাহেব চাঁদ ওঠানোর জন্য ধ্যানে বসে গেলেন। পদ্মাসনে বসে তিনি মাথা দুলিয়ে একটা কথাই বারবার বলতে লাগলেন, চাঁদওঠ চাঁদওঠ। পীর সাহেবের অলৌকিকত্ব প্রকাশ করার জন্য সেদিনই কাঁচির মতো চিকন ঈদের চাঁদ উঠে গেল। তারপর এই গ্রামের নাম হয়ে গেল চাঁদওঠ।

এত চমৎকার একটা নাম অথচ লোকে তার কদর বোঝে না। সহজ আর সংক্ষেপের তাগিদে বেশিরভাগ মানুষ চাঁদওঠকে বলে চাদোট। বিশেষ করে ভ্যানওলা, এরা যখন বাজার থেকে প্যাসেঞ্জার নিয়ে গ্রামে ফেরে, সারাপথ হাঁক দেয়, এই চাদোট চাদোট। আছে নাকি কেউ চাদোট! মোতালেব মাস্টরের মনে পড়ে, একবার তিনি ভুল উচ্চারণ শুনে এক ভ্যানওলার গালে চড় মেরেছিলেন। তখন দিনগুলোই ছিল অন্যরকম। বলক ওঠা ভাতের মতো শরীরের ভেতর রক্ত টগবগ করে ফুটত। এখন তিনি বোঝেন, চড় মারারও জায়গা আছে। বিচিত্র এই পৃথিবী। চড় খেয়ে কারো মান-সম্মান যায় না। আবার অজায়গায় চড় মেরে অনেকে নিজের সম্মান নিজে খেয়ে বসে।

মোতালেব মাস্টার মানী লোক। একে তো তিনি শিক্ষক। তার উপর পয়সাওয়ালা মানুষ। আজকাল শহরের মতো গ্রামেও মানুষের মান নিয়ন্ত্রণ করে পয়সা। মোতালেব মাস্টারের একতলা বাড়ির সামনে বিরাট কাঁঠাল বাগান। লাগানোর সময় খুব কায়দা করে লাইন সোজা রাখা হয়েছিল। গাছগুলো বাড়ে নি তেমন। দৈর্ঘ্যে না বেড়ে প্রস্থে ডালপালা ছেড়েছে ঘন। দুই সারির মাঝ দিয়ে হেঁটে গেলে মনে হয় তোরণে তোরণে ছাওয়া রাজপথ। নিজেকে তখন শেখ হাসিনা অথবা বেগম খালেদা জিয়া মনে হয়। ছুবানের ডবকা যুবতী বউটা প্রায় সময় এই কাঁঠাল বাগানে কোমরে আঁচল গুঁজে পাতা খোটে। আশ্চর্য! ওদের এত অভাব খড়ির!

একদিন ছুবানের বউ আকলিমার কাছে এসে এক আবদার করে বসল। তাদের বাড়ির সাথে পুকুরের পাশে এক টুকরো জমি বেহুদা পড়ে আছে। জংলি লতাপাতা আর পোকামাকড়ের আখড়া। মাস্টার কোনো কাজেই ব্যবহার করছে না জমিটুকু। আকলিমা যদি এই জমিটুকু ছুবানের বউকে ব্যবহারের সুযোগ দেয় তবে সে সাফসুফ করে জমিটুকুয় লালশাক বুনতে পারে। শাক সে একা খাবে না। অমন অকৃতজ্ঞ ছুবানের বউ নয়। যা হয় তার অর্ধেক আকলিমাকে দেবে আর বাকি অর্ধেক নিজেরা খাবে। চুক্তিতে আকলিমা রাজি হয়ে যায়। কারণ ছুবান আর ছুবানের বউ বেজায় গরিব মানুষ। ছুবান তো চিরকালের রোগা। কাম করে খাওয়ার মুরোদ নেই। কোনোমতে জান বেঁচে সে সংসার চালায়। নিজে খায়, বউ আর ছেলেটাকে খাওয়ায়। পতিত জমিটা যদি অভাবী পরিবারটার কাজে তো লাগুক।

এক ছুটির সকালে ভাত খেয়ে বারান্দায় চেয়ার টেনে বসার পর মোতালেব মাস্টার খেয়াল করলেন, ছুবানের বউ আজ পাতা ঝাঁট দিচ্ছে না। এমন তো হয় না কখনো। গেল কোথায় সে! মোতালেব মাস্টার নিজের প্রশ্নে নিজেই চমকে ওঠেন। প্রতিটি ছুটির সকালে তার অবচেতন মন কি তবে ছুবানের বউকে খুঁজে ফেরে!

ছুবানের বউ তখন ঘড়া ভর্তি পানি এনে লকলকিয়ে ওঠা লালশাকের গোড়ায় ছিটাচ্ছিল। পুকুরপাড়ে দৃষ্টি ঘোরাতেই মোতালেব মাস্টার দেখতে পেলেন দৃশ্য। তার চার বছরের ছেলেটা আঁচল ধরে পেছন পেছন ঘোরার চেষ্টা করছে। কিন্তু যেই সে আঁচলের নাগাল পেতে যাচ্ছে, অমনি দুই কদম এগিয়ে যাচ্ছে মা। আঁচল ধরাধরি খেলা শেষ হয় না। অনেকদিন পর ছুটির এই মিষ্টি সকালে ছুবানের বউয়ের নাদুসনুদুস ছেলেটার পায়ে পায়ে হেঁটে বেড়ানো দেখে মোতালেব মাস্টারের বুকের মাটি সন্তান-শূন্যতায় নড়েচড়ে ওঠে। কল্পনার চোখে তিনি অমন একটা ছেলে কল্পনা করে ওঠেন, যে কি না আকলিমার আঁচল ধরার জন্য ছোটাছুটি করবে এ-ঘর ও-ঘর। মাঝে মাঝে তিনি ছেলেকে উঁচু করে ধরে গালের সাথে গাল ছোঁয়াবেন। গলায় কাতুকুতু দেবেন। খিলখিল করে হেসে উঠবে ছেলে। কোনো কোনো দিন মোটরসাইকেলের সামনে বসিয়ে স্কুলে নিয়ে যাবেন। এ সময় ছেলেটার মাথায় অবশ্যই একটা ক্যাপ থাকবে। কারণ স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটা অত্যন্ত রৌদ্রময়।

দুপুরে খাবার পাটিতে বসে আবার সেই পুরনো কথা বলেন মোতালেব মাস্টার। এতবড় বাড়িতে তারা স্বামী-স্ত্রী দুটো মাত্র মানুষ। শ্মশানের মতো খাঁখাঁ করে দিনমান। মোতালেব মাস্টারের বড় ভাই, তার আবার পাঁচ ছেলেময়ে, তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে স্বস্তি খুঁজতে চলে গেছেন চাঁদওঠ ছেড়ে। বাজারে জমি কিনে বাড়ি করে সেখানেই থাকেন। ভাইটা যদি থাকত এখানে, তার পাঁচ ছেলেমেয়ের হই-হাঙ্গামায় কবরে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা পেত এই বাড়ি।

মন খারাপ আকলিমারও হয়। তারই তো বেশি হওয়ার কথা। কারণ সন্তান ধারণের ব্যর্থতার দায় একলা তার। তবে ব্যাপারটা সে হেসেখেলে উড়িয়ে দিতে পারে যখন তখন। হয়তো ভয় পায় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে। মাঝে মাঝেই সে বলে, এখন যেমন বলল খাবার পাটিতে, সব দোষ তোমার বড় ভাইয়ের। সে একাই যদি নেয় পাঁচটা ছাওয়াল-মিয়া, অন্যদের শর্ট পড়বি এ জানা কথা। স্ত্রীর কথায় না হেসে পারেন না মোতালেব মাস্টার। পাড়ার ভেতর কার বউয়ের বেকায়দায় পেট বেধে গেছে এবং সেই পেট খালাশ করতে গিয়ে কী কী অসুবিধা হয়েছে, গল্পে, হাসি-ঠাট্টায় সেসব কথাও উঠে আসে মাঝে মাঝে। তাইজালের বউয়ের তিন ছেলেমেয়ে। আর নেবে না। এখন সে নিয়মিত পদ্ধতি মেনে চলছে। তবু কিভাবে যেন জালে আটকা পড়ে গেছে ভ্রূণ। পরপর দুইমাস স্রাব না আসায় টনক নড়ে তার। তারপর ছোট ডাক্তার, ছোট হাসপাতাল। খালাশ করো অপ্রত্যাশিত গর্ভ। আকলিমা ভাবে, আল্লাহর কী লীলা, কেউ চেয়ে পায় না, আর কেউ না চাইতে জল।

সেদিন ছুবানের বউ দুই আঁটি লালশাক দিয়ে যায় মাস্টার বাড়ি। মোতালেব মাস্টার তখন স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন। আকলিমা খাওয়ার ঘর গোছাচ্ছে। মোতালেব মাস্টার শাকের আঁটি হাতে ছুবানের বউকে দেখে বলেন, কী গো, কিসির শাক এ?

ছুবানের বউ মাথার উপর শাড়ির আঁচল টেনে বলে, লালশাগ, ভাই।

কোনে পালে? আয়নার সামনে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে জিজ্ঞেস করেন মাস্টার।

ছুবানের বউ কিছুটা বিস্মিতই হয় যেন— ক্যা, আপনে জানেন না! ভাবি কিছু কই নি!

ও হ্যাঁ, মনে পড়ছে। পুকুরপাড়ে বুনছো। সেদিন দেখলাম পানি দেচ্ছ।

পরের জমিতে শাক বুনে খাচ্ছে সে। সঙ্কোচ তো একটু থাকেই। এই সঙ্কোচ দূর করতে ছুবানের বউ আলাপি ঢঙে বলে মাটেলের ধারে আপনেরে যে জমিখেন খালি পড়ে ছিল, ভাবিরে কয়ে শাগ বুনে দিলাম। আপনেরাও খাবেন, আমরাও খাবো। লালশাগে নাকি ম্যালা ভিটামিন। চোখির জন্নি ভালো।

মোতালেব মাস্টারের একটু ইয়ার্কি করার সাধ জাগে। হাসতে হাসতে বলেন, আজকাল চোখে কম দেখো নাকি ছুবানের বউ!

মাস্টারের ইয়ার্কির জবাবে মুখে কিছু বলে না ছুবানের বউ। তবে শারীরিক মুদ্রায় প্রমাণ করে দেয়, মাস্টারের এই ইয়ার্কি তার পছন্দ হয়েছে।

আকলিমা শাকের আঁটি নিতে নিতে খুশি হয়ে বলে, শাগের চিহারা তো ফাইন হয়ছে রে। একেবারে টসটস করছে। খাতি খুব মজা লাগবিন, না গো বিপ্লবের মা! তুমি একদিনও খাইছো? কেমুন লাগেছে?

খাই নি ভাবি, আজই পথম তুললাম।

শোন, ইট্টু কাজের কতা কই। সামনের সপ্তায় মার বাড়ি যাব। আমার ছোট বোন মালেশিয়া থেকে দেশে আসছে। দুইদিন থাকব। এই দুইদিন তুমার ভাইরে রান্দে খাওয়াতি পারবা না! তুমার ভাই বাজার সদাই করে দিবিন। তুমি খালি কষ্ট করে ইট্টু রান্দে দিবা। পারবা না?

পারব না ক্যান! আমার তো এমনিই রানতি হয়। ভাইর জন্নি বেশি করে চাইল ধুয়ে দিলাম। ভাই, আপনে কুনু চিন্তা করবেন না।

হঠাৎ মোতালেব মাস্টারের কী যে হয়, তিনি পেছন থেকে ছুবানের বউকে জাপটে ধরেন। ক্ষুধার্ত বাঘ যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে হরিণশাবকের উপর

পরের সপ্তায় বাপের বাড়ি চলে যায় আকলিমা। সন্ধ্যা থেকেই কারেন্ট নেই। মোতালেব মাস্টার অন্ধকার ঘরে শুয়ে আছেন একা। ঘুমান নাকি কিছু ভাবেন তা তিনিই জানেন। রাতের অন্ধকার আরেকটু ঘন হয়ে আসলে ছুবানের বউ আসে টর্চের আলো ফেলে। ছোট গামলায় সে ভাত তরকারি নিয়ে এসেছে।

মোতালেব মাস্টার শোয়া অবস্থায় ঘুমঘুম গলায় জিজ্ঞেস করেন, একাই আইছো! তুমার ছাওয়াল কী করে?

ছুবানের বউ টেবিলে ভাত তরকারির গামলা রাখতে রাখতে বলে, বিপ্লব ঘুমায় গেছে, ভাই। উটে খায়ে নেন। সকালে আসে বাসি থালবাটি নিয়ে যাবনে।

মোতালেব মাস্টার হাই ছেড়ে উঠে বসতে বসতে বলে, কী রানদেছো?

ছুবানের বউ ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বলে, লালশাগ ভাজি আর আলু পটল দিয়ে পুনা মাছ। খায়ে নেন আপনে, আমি গেলাম। বিপ্লবের বাপ এখুনু খায় নি।

হঠাৎ মোতালেব মাস্টারের কী যে হয়, তিনি পেছন থেকে ছুবানের বউকে জাপটে ধরেন। ক্ষুধার্ত বাঘ যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে হরিণশাবকের উপর। নারীসুলভ সতর্কতায় একটা চিৎকার বেরোতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত গলার কাছে আটকে যায় ছুবানের বউয়ের। কারণ, চিৎকার দিলে সবার আগে শুনবে ছুবান, তার ছেলের বাপ। সংসারে অশান্তি নামবে। চাই কি রাগের মাথায় বউকে তালাকও দিয়ে দিতে পারে ছুবান। আর সত্যি বলতে কি, একজন মানী লোকের দেহলগ্না হয়ে থাকতে খারাপ লাগছে না তার। এই চাঁদওঠ গ্রামে তার মতো কত শত নারী রয়েছে, মাস্টার আর কউকে তো জড়িয়ে ধরে নি। ধরেছে শুধু তাকে। এই মুহূর্তে নিজেকে কি একটু গুরুত্বপূর্ণও মনে হয়!

মোতালেব মাস্টার দেহলগ্নার ঘাড়ের উপর গরম নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, বুলবুলি, তুমাকে একটা কথা বলি?

কতকাল পর সে বুলবুলি নামের ডাক শুনল একজন পুরুষের মুখে। বিয়ের প্রথম দিকে এই নামে ডাকত শুধু ছুবান, তার স্বামী। বিপ্লব যখন হলো, স্বামীর কাছে সে হয়ে গেল বুলবুলি থেকে বিপ্লবের মা। আর পাড়ার মানুষের কাছে সে তো কেবলই ছুবানের বউ। তার যে নিজস্ব একটা নাম আছে বা থাকতে পারে, যে নামের সাথে জড়িয়ে আছে তার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি, এ যেন ভুলেই গেছে এই চাঁদওঠের মানুষ। আজ, এতকাল পর, সেই বুলবুলি নাম, যে নামে এক অপরিণত কিশোর তার প্রথম যৌবনে প্রেমের কবিতা লিখেছিল, সেই নাম যখন উঠে এল মাস্টারের ঠোঁটে, বুলবুলির বুকের ভেতর রক্ত যেন ছলকে ছলকে উঠল। ওই নামের অভিঘাতে ভূমিকম্পে ধসে পড়া বিল্ডিংয়ের মতো ধ্বসে পড়ল তার সকল প্রতিরোধ ব্যবস্থা। পোষমানা ঘোড়ার মতো সে ঘাড় নামিয়ে দিল মালিকের সামনে। মোতালেব মাস্টার বললেন, বুলবুলি, তুমি আমার জমিতে শাক বুনে খাচ্ছ। কারণ, তুমার বীজ আছে, কিন্তু জমি নাই। আমারও সেই একই অবস্থা। আমার বীজ আছে, কিন্তু জমি নাই। আজ তুমার জমিটা আমাকে ব্যবহারের সুযোগ দাও। আমার বউ একটা বাঁজা। তুমার উর্বর জমিতে আমি সন্তানের বীজ বুনতি চাই। না, এই সন্তান তুমার আর ছুবানের পরিচয় নিয়েই বড় হবি। সন্তান মানুষ করতি যা লাগে গোপনে সব খরচপাতি আমি দেব। তুমার তো একটা মাত্র ছাওয়াল। আর একটা হলি কুনোই সমস্যা না। বরং ভালো। মরার আগে নিজের রক্তে তৈরি সন্তানের মুখ দেখে যওয়ার বড় হাউস আমার। বুলবুলি, কও তুমি রাজি?

বুলবুলি কিছু বলে না। সে মাস্টারের বাহুবন্ধনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে আদরখেকো বিড়ালের মতো। নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ ভেবে মাস্টার বুলবুলির শরীরের উপর চাপ বাড়ান। বুলবুলির উর্বর জমি সিক্ত করতে মাস্টারের শ্যালোমেশিন এখন পুরোপুরি প্রস্তুত।

সাব্বির জাদিদ

জন্ম ১৭ আগস্ট, ১৯৯৪; কুষ্টিয়া। কথাসাহিত্যিক।

ইসলামিক স্টাডিজ, অনার্স, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

প্রকাশিত গ্রন্থ :
একটি শোক সংবাদ [গল্পগ্রন্থ, ঐতিহ্য, ২০১৭]

ই-মেইল : sabbirjadid52@gmail.com

Latest posts by সাব্বির জাদিদ (see all)