হোম গদ্য গল্প ছায়ানীল

ছায়ানীল

ছায়ানীল
434
0

আমি জেলে বসে আছি রাজ্যের আফসোস বুকের ভেতর জমা করে। সামান্য খুনই তো করতে চেয়েছিলাম, মস্ত বড় এক পাষণ্ডকে। পারলাম না। আবারও না’কে সামনে এনে জীবনের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হলো। এই ‘না’ ‘না’ শব্দগুলো প্রতিনিয়ত আমাকে নানাভাবে পরাজিত করছে। মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট হলো না। প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় দূরে থাক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভালো কোনো সাবজেক্ট পেলাম না। সেই ধারাবাহিকতায় অনার্সও কমপ্লীট হলো না। বিজয়ী না হওয়া গল্পে আরো যুক্ত হয়েছে না’র নানা অধ্যায়।

আমার বাবা এখন দ্বিতীয় সংসার নিয়ে সুখের স্রোতে ভাসছে। আমার আপন মামা হারামজাদা হারুন নিজে উকিল-বাবা হয়ে বাবাকে দ্বিতীয় বিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে (মায়ের সাথে সংসার ভাঙার কাজটা বাবা আগেই সেরে নিয়েছিল)। সেই বিয়েতে আমাদেরও দাওয়াত ছিল, যেতে পারি নি। প্রচণ্ড ঘৃণা জন্মেছিল, শুধু বাবা আর মামার প্রতি নয়, পুরো জগৎটার প্রতি। সামাজিক অবক্ষয় বলে? আত্মকেন্দ্রিক মানুষের কাছে এ অবক্ষয় হয়তো কিছুই না। কিন্তু জীবনের মাঝে এ বিকৃত-ভাঙন প্রকৃত জীবন হতে মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়—দানবে পরিণত করে।

আমাদের সংসারে ভাঙনের সূত্রপাত তখন থেকেই, কিন্তু এর লক্ষণ দেখা দিয়েছিল বহু বছর আগেই। বাবার অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন আর পরনারীর প্রতি আসক্তি, বোনদের উচ্ছৃঙ্খল চলাফেরা আর আমার একগুয়েমি জীবন সেই লক্ষণের আগুনে ঘি ঢেলে আজকের এই পরিণতি।

আমাদের পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে আমি চতুর্থ। বড় ভাই দীর্ঘদিন মালয়শিয়াতে। কিছুদিন আগে ফোনে বিয়ে করে আমাদেরকে ভাবী উপহার দিয়েছে। বিয়ের পর সামান্য হলেও মায়ের নামে কিছু টাকা পাঠাচ্ছে বিধায় সংসারের চাকা এখনও লঘু গতিতে চলছে। তবে এই লঘু গতির সংসারে মাঝে মাঝে ঝড় গতির হাওয়া বইয়ে দেয় ভাবী নামক অতিথি পাখিটি। নিজের স্বামীর টাকায় সকলকে খাওয়াতে তার বিন্দুমাত্র সুখ নেই। বউ-শাশুড়ির চিরন্তন আর চিরায়ত সম্পর্কটাও ভাবী আর মা বজায় রাখছেন সমানতালে।

আমার বড় আপা বিয়ে করেছিল প্রেম করে। ছোট আপাও প্রেম করেছিল কিন্তু বিয়ে করে নি, করতে পারে নি। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পৃষ্ঠাগুলো আজ চোখে ভাসছে মনের অজান্তেই।


সেই বাবার সন্তান বলে মনের অজান্তে নিজেকে কুকুর-বেড়ালের মতো মনে হতো।


আমার দুরন্ত অধ্যায় ছিল স্কুল জীবনে। হাইস্কুলের পথে পা দিতেই আমাদের ছোট ভাইয়ের জন্ম। কিযে ভালোলাগা উপচে পড়েছিল শরীরময়। যেন বর্ষণে বর্ষণে সমগ্র দেহ-মন পুলকিত। কিন্তু কতক্ষণ? কতদিন স্থায়ী ছিল সেই ভালোলাগা বোধ, ভালো-থাকার তুঙ্গশীর্ষ মুহূর্ত । কিন্তু বিধিবাম! প্রতিবন্ধী হয়ে ভাইটা জন্ম নিল। মা আমার জ্ঞান ফেরার পরও যেন নির্বাক। কিছুদিন পর ঘোরটা কাটিয়ে উঠলে বাবাকে শাপ-শাপান্ত করতে ছাড়ল না। বাবা তখন পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মায়ের ভয়ে নয়—তখন বাজারে তার প্রচুর দেনা। সুদে টাকা এনে ব্যবসা করেছে, নয়তো জমি কিনেছে। যখন টাকা ছিল তখন সুদে টাকাও লাগাত। বাবার পাপেই নাকি ভাইটা প্রতিবন্ধী হলো। পাড়ার সকলেই বাবার অগোচরে তাকে দালাল বলে ডাকত। দালাল শব্দটা বলায় তাদের মুখের বিকৃতি এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, সেই বাবার সন্তান বলে মনের অজান্তে নিজেকে কুকুর-বেড়ালের মতো মনে হতো। জমির দালালি ছিল বাবার প্রধান পেশা। ক্রেতার নিকট টাকা খেত আবার বিক্রেতার নিকটও খেত। টাকা আয় ছিল প্রচুর আবার ব্যয়ও অত্যল্প ছিল না। মেয়েদের বিয়ে দেওয়া কিংবা ছেলেদের ক্যারিয়ার গঠনের প্রতি তার বিন্দুমাত্র ভাবনা কাজ করত না। নিজের পাপের জগৎ নিয়েই তিনি ছিলেন চিরসুখী।

বাবার সাথে আমার কোনো সুখস্মৃতি মনে পড়ে না। এমনকি মায়ের সাথেও বাবাকে কখনো ভালোভাবে কথা বলতে দেখি নি। বাবার যত ঘনিষ্ঠতা ছিল মামার সাথে। মামা বাবাকে ভাঙ্গিয়ে বড়লোক হয়েছে এ কথা আমাদের পরিবারসহ পাড়ার সকলেই স্বীকার করে। শুধু অস্বীকার করে বাবা আর মামা। মামা ছিল চতুর মিথ্যাবাদী আর চাপাবাজ এবং পা-চাটা কুত্তাদের গুরুর সমতুল্য। পাড়াময় তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল হারামজাদা হারুন নামে। মামার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল বিপ্লবদা। মামার বন্ধু হলেও একই পাড়া এবং একসাথে খেলাধূলা বলে আমি তাকে বিপ্লব-মামা না বলে বিপ্লবদা বলেই ডাকতাম। বিপ্লবদা যখন পাড়ার উঠতি মাস্তান আমি তখন মাধ্যমিক শেষ করেছি। হঠাৎ-ই তিনি আমাকে খুব খাতির-যত্ন করতে শুরু করলেন। বিপ্লবদার টাকায় আমরা বন্ধুরা সিনেমা দেখি। মনে আছে, চাইনিজ ফুডের স্বাদ উনার টাকাতেই প্রথম নেই। ক্লাবের জন্য ক্রিকেট ব্যাট, ফুটবল এমনকি দৈনিক পত্রিকার ৮০% টাকাও বিপ্লবদার নিজস্ব তহবিল থেকে নেওয়া। বিপ্লবদার নামে আমিই তো পাড়ায় কত প্রভাব খাটিয়েছি। একই বাইকে চড়ে বেড়াতাম পাড়ার অলিতে-গলিতে। এরপর পাড়ার যুবকদের কাছে আমার ক্ষমতার সংবাদ না পৌঁছে কী মাঝ পথে আটকে থাকবে?

বাবার এসব খবর রাখার কথা না। মায়েরও জানার কোনো কারণ ছিল না। আমার এই মসৃণ যাত্রাপথে বাধ সাধল ছোট আপার তিরস্কার। ছোট আপা ইন্টার মিডিয়েটের ছাত্রী তখন। একদিন রাতে বাড়ি ফিরলে ওর রুমে ডেকে নিয়ে রাগত স্বরেই ধমকে চলেছিল আমাকে।
—লাবলু, লেখাপড়া ছেড়ে তুই কি পাড়াময় গুণ্ডামি করে বেড়াবি?
—গুণ্ডামির আবার কি দেখলে? আমি কি পাড়ায় চাদাবাজী আর ছিনতাই করে বেড়াই?
—সেই পথেই তো এগুচ্ছিস। সারাদিনই তো দেখি বিপ্লব মামার সাথে। সিনেমাও নাকি দেখতে যাস একসাথে। গুণ্ডা মাস্তানদের সাথে চলাফেরা করলে ভালো হবি কিভাবে?
—তুমি বিপ্লবদাকে যত খারাপই ভাব না কেনো, উনার মনটা কিন্তু খুবই বড়।

সেই বড় মনের পরিচয় একদিন ছোট আপাও পেয়েছিল। বিপ্লবদার উদ্দেশ্যই ছিল আমাকে পটিয়ে, এমনকি পরিবারের সকলকে হাত করে ছোট আপার সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা। ছোট আপা সেই চোরা সম্পর্কের ফাঁদে পা-ও দিয়েছিল মামার প্ররোচনায়। বিপ্লবদা আর্থিক বিষয়টার প্রভাব খাটিয়ে এ সম্পর্ক টেনে অনেক বড় করেছিল। বিপ্লবদা আর আমার সম্পর্কের শেষ সময়ে ওর অন্যতম চেলা ঝন্টু আমার খুব বন্ধু হয়ে যায়। ঝন্টুর কাছ থেকেই বিপ্লবদার যাবতীয় চক্রান্তের তথ্য পেতাম আমি। বিপ্লব লম্পটের অসৎ উদ্দেশ্য বোঝার সাথে সাথেই উনার সাথে আমার সম্পর্কের সুতোটা একেবারেই ছিড়ে যায়। ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড ঘৃণা করতে শুরু করি বিপ্লবের অস্তিত্বকে। প্রকাশ্যে কিছু বলার উপায় ছিল না। ওর অধীনে এতই বখাটে ছিল যে, ইচ্ছে করলে ওরা আমাকে চার রাস্তার মোড়ে ফেলে টেনে ছিড়ে খেয়ে ফেলতে পারত। বাহিরে না পেরে বাড়িতে এসে বড় আপার কাছে বিচার দেই। কিন্তু বড় আপার বিচার করার সময় কোথায়? উনার চোখে তখন রঙ্গিন চশমা। গায়ে নিত্যনতুন রঙ-বেরঙের পোশাক। বাবু ভাইয়ের সাথে তার প্রেম যে তখন মধ্যগগনে। বাবু ভাই বখাটে ছিল না। তারপরও পাড়ার সকলে তাকে নেতিবাচক বাক্যে সর্বদাই বিদ্ধ করত। ভদ্রবেশি মুখোশের আড়ালে বাবু নাকি পিশাচদেরও হার মানায়। চেহারার গঠনেও চমৎকৃত কিছু ছিল না। তবুও মেয়েরা যে কেনো ওদের প্রেমে পড়ে?


বাবা তো নিজেকে নিয়ে দিব্যি আছে। পাখাবিহীন পরীদের পাশে পাশে, পাপের সাথে।


এবার ছোট আপাকে আমিই জোর করে রুমের ভেতরে নিয়ে যাই। ভনিতা না করে সোজা-সাপ্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেই।
—এসব কি শুনছি? বিপ্লবদার সাথে তোমার কিসের সম্পর্ক?
ছোট আপা অপ্রস্তুত। বলল, আমরা বন্ধু। সম্পর্ক আবার কিসের?
—বন্ধু মানে? তোমার না মামা হয়। উনার বয়স আর তোমার বয়স কি এক?
—বয়স দিয়ে কি আর বন্ধুত্ব হয় রে পাগল? তুই তো ওর খুব বন্ধু ছিলি। আজ কেনো এত ক্ষেপে উঠছিস?
—ক্ষেপার কারণ আছে। লোকটা লম্পট। তোমায় নিয়ে খেলছে।
—বাজে কথা বলবি না। আমাকে নিয়ে খেলা অত সহজ না। তুই রাগের মাথায় যাই বলিস না কেনো, ওর মনটা খুবই বড়।

বিপ্লবদা ছোট আপার কাছেও বড় মনের অধিকারী হয়ে গেল। আমি ছোট হয়ে ওকে কি শাসন করব। যার শাসন করার সেই বাবা তো নিজেকে নিয়ে দিব্যি আছে। পাখাবিহীন পরীদের পাশে পাশে, পাপের সাথে। বাড়িতে আমার অবস্থান কর্তৃত্বের ছিল না। বড় ভাই ও আপাদের কাছে স্নেহের কাঙাল ছিলাম। ছোট ভাইটাকে স্নেহ দিয়ে ভরিয়ে রাখতাম। ভাবীর সাথে সম্পর্কটা ছিল কিছুটা খুনসুটি, হাস্যরসের উপাদান মিশিয়ে। ভেতরে ভাবীর জগতে অন্ধকারের প্রলেপ যাই থাকুক না কেনো—বাহিরের মুখে সর্বদাই ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়ে থাকত—অন্তত আমার ক্ষেত্রে। আমার সবচেয়ে ভালোলাগার জায়গা ছিল ছোট ভাইটার বুকেতে। আমাকে কেনো জানি ও খুব পছন্দ করত। কত নামে যে ওকে সম্বোধন করতাম। কখনো বাবু, কখনো রাজা, কখনো বা বাদশা বলে। আমাকে দেখলেই ওর ডান হাতটা বাড়িয়ে দিত। চকোলেট, আইসক্রিম কত কি নিয়ে আসতাম ওর জন্যে। মাঝে মাঝে অবাক হতাম, প্রায়ই ও খাবার নিতে চাইত না। তবুও হাত বাড়িয়ে রাখত। শুধুই আদর প্রত্যাশা করত কি? কথা বলতে পারত না, এমনকি হাঁটতেও না। তবুও ওর মুখে সর্বদাই হাসি লেগে থাকত। কি এক মায়াময় দ্যুতি ওর শরীরময় ছড়িয়ে পড়ত। রাজা বাড়ির সকলের কাছেই প্রিয় পাত্র ছিল। বাবার সাথেও ওর ভাব ছিল প্রচণ্ডরকম। আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে একমাত্র রাজাই বাবাকে পছন্দ করত।

পারিবারিকভাবেই বাবু ভাইয়ের সাথে বড় আপার বিয়ে হয়। আমাদের সবার অমত সত্ত্বেও বাবা বিয়েতে পাকা কথা দিয়েছিল। সেজন্যে চাহিদার অতিরিক্ত যৌতুকের টাকা গুনতে হয়েছিল উনাকে। এতে বড় আপার বিন্দুমাত্র আক্ষেপ ছিল না। ওর শুধু বাবুকে পেলেই হলো এতে টাকা আর সম্মান কতটুকু গেল তা দেখার মতো মানসিকতাও ওর মধ্যে ছিল না।

আমার জীবনে দুঃখের পৃষ্ঠাগুলো যখন একে একে চোখের সামনে ভেসে আসছিল তখনই পুলিশ মারফত জানতে পারলাম, ঝন্টু দেখা করতে এসেছে। ঝন্টুর তো আমার সাথে জেলেই থাকার কথা ছিল। অপারেশনে আমার সঙ্গী হবেই, কি তেজ দেখলাম ওর চোখে-মুখে। আমি সঙ্গী করি নি। বিপদে ফেলতে চাই নি। বাহিরের বন্ধুদের নিয়েই কাজটা সারতে চেয়েছি।

ঝন্টুকে দেখলাম। খাঁচার ভেতর থেকে এত দূরত্বে কিভাবে কথা বলব? আরো অনেক কয়েদির বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়ের ভীড়ও লক্ষ্য করার মতো।
—লাবলু, কেমন আছিস?
আমার হাসি পেল। ঝন্টুর কথার সাথে সাথে আরো অনেক কথার ঝড়ও কানে গেল। মেয়েলি কন্ঠের সান্ত্বনা, পুরুষালী কন্ঠের কর্কশতা, আরো কত কি।
—আমি ভালোই আছি। তোরা সবাই কেমন আছিস? বাড়িতে গিয়েছিলি? মার অবস্থা কেমন?
—সবাই ভালো আছে। কাকা তোকে দেখতে এসেছিল?
—বাবার যদি দেখার মন থাকতো, তবে কি আমার জেলে আসতে হয় রে?
বলেই হাসি পেল আমার।
—লম্পটটা তো বাড়িতে ফিরেছে। আমাকে খবর পাঠিয়েছিল, যাই নি।
—তুই সাবধানে থাকিস। আমার জন্যে না ভেবে নিজেকে নিয়ে ভাবিস।

ঝন্টু চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল কোনো চিন্তা না করতে। ভাবী আর ও মিলে উকিলের সাথে কথা বলেছে। শীঘ্রই নাকি জামিন হয়ে যাবে। বড় ভাইও ফোন করেছিল। কোনোরকম দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করেছে। টাকার বিষয়টাও নাকি উনি দেখবেন। এই পারিবারিক বন্ধনটা আমার খুব ভালো লাগে। বিপদের সময়ে সবার সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা কেমন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ঝন্টু বিভিন্ন রকম খাবারের আইটেমও রেখে গেল আমার জন্যে। এই খাবার আর পেটের জন্যেই তো জীবনকে নিয়ে আমরা জুয়া খেলি। ছোট আপা সেই জুয়াতেই হেরে গেল। সিগারেট ধরালাম আয়েশ করে। ধোঁয়ার কুণ্ডলি পাকিয়ে ছেড়ে দিচ্ছি বাতাসময়। আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে আমার আশেপাশের জগৎটা। অতীত আবারও বর্তমানকে ঘিরে ধরেছে। গিলে খাচ্ছে।


বিপ্লব তোর ছোট আপার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে নিজেই ক্যাসেট করে বাজারে ছেড়ে দিয়েছে।


বড় আপা বাসায় ফিরে এসেছে। যৌতুকের টাকা পাওয়ার পরও তার বাবু-স্বামীর মন ভরে নি। আপা মানসিক নির্যাতনের সাথে শারীরিক নির্যাতনের ছবিও শরীরময় এঁকে এনেছে। আমি অনুচ্চ স্বরে কেনো যেন বলতে ছাড়লাম না, আরেক জনের অবস্থাও তাই হবে। কথা শুনে ছোট আপা রেগে গেল। এরপর আমার সাথে আর কোনোদিন কথা বলে নি। মা’র সেকি কান্না আর গালিগালাজ। বাবু’র চৌদ্দগুষ্টিকে একাই নির্বংশ করে দিবে যেন। বাবু ব্যবসায় মার খেয়েছে। জুয়া খেলাকেও বড় আপা ব্যবসা বানিয়ে ফেলেছে। হাসি পেল দুঃখের মাঝেও। রাতে বাড়ি ফিরে বাবা রীতিমত ক্ষুব্ধ। বাবু নাকি যৌতুক নেওয়ার পরও বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল। এরকম অন্যায় কোনোভাবেই আর সহ্য করা যাবে না। আপা দু’দিন কোনো কথা বলে নি। ছোট ভাই রাজা হয়তো ধরে নিয়েছিল, আপা ওর মতো হয়ে গেছে। তারপর যা হবার তাই হলো, বড় আপা থেকে গেল আমাদের সাথে। জামাই-বাবু মদ, জুয়া নিয়ে মেতে রইল আপাকে ছেড়ে। এদিকে আপা বাড়ি ফিরে পুরনো অশান্তিকে ফিরেয়ে নিয়ে এল। বড় ভাই বাড়ির সকলের জন্যে টাকা পাঠাতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। বোনদের খরচ তো দিতে পারবেই না—আমাকেও আর বসে বসে খাওয়া চলবে না। এ চিত্রনাট্যের শেষ পরিণতিতে মা আর ভাবীর ঝগড়া তুঙ্গে। বাবা তাই কি কয়েক রাত বাড়িই ফিরে নি।

মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন ঘটনার জন্ম হয়। কখনো ভাবনার, কখনো আতঙ্কের, কখনো বা চূড়ান্ত বিপদের। এ পরিস্থিতিতে সুখ ঘটনা হয়ে ঢোকার সুযোগ খুব একটা পায় না। বড় আপা যখন ভাবীকে সমঝে চলে নিজেকে পরিবারের সাথে মানিয়ে নিয়েছে, তখনই লোক মারফত বাবা খবর পাঠাল, খবর আর কি, এবেবারে বিয়ের নিমন্ত্রণের সাথে মাকে ডিভোর্স লেটার। মার সেকি কান্না মাটিতে গড়াগড়ি করে। যে স্বামীকে মা দু’চোখে দেখতে পারে না, সেই স্বামীর সাথে বিচ্ছেদে মায়ের মনে অসন্তোষের কারণ কি বুঝতে পারলাম না। আমরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়াতে? নাকি নিজের প্রতি চরম অপমানিত বোধ হওয়া? এ সংসারের পেছনে মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। আমাদের মানুষ করার দায়িত্ব মায়ের উপরেই ছিল। বাবার দায়িত্ব বলতে, শুধুমাত্র আমাদেরকে কী পৃথিবীতে নিয়ে আসা? সেই বাবার চূড়ান্ত নোংরামির খবরে আমার কিন্তু সেরকম খারাপ লাগে নি, ততদিনে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখে গিয়েছিলাম।

হাজতের আকাশে অন্ধকার নেমে এল। আমার জীবনের মতো গাঢ় রঙ হয়ে। এ অন্ধকারে মিশে জীবনকে নিয়ে আমার অনুশোচনা হচ্ছে নাকি অসম্ভব ভালোলাগা কাজ করছে তা আমি নিজেই বুঝতে পারছি না। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রেক্ষিতে,  স্বার্থপরের মতো কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে সব ভুলে গেলে জীবনের কাছে হয়তো ভালো থাকা যেত। কিন্তু সেই ভালোলাগাতে কতটুকু স্বস্তি ফিরে আসত আমার জীবনে?

ছোট আপা ভুল করল। গা ভাসিয়ে দিয়েছিল পাপের জোয়ারে। এ পাপ লঙ্ঘনীয় ছিল না হয়তো কিন্তু জীবনের প্রতি এ সিদ্ধান্ত কী চরম নিষ্ঠুরতা ছিল না? সেদিন দুপুরে ঝন্টু ফোন দিল। কিরকম যেন অস্থিরতা ওর মধ্যে। এখনই আসতে হবে। জরুরি তলবে কেন এত উৎকন্ঠা তাও বুঝতে পারলাম না। গায়ে শার্ট টেনে তখনই বেরিয়ে পড়লাম। আমি পৌঁছলে ঝন্টু রীতিমত নির্বাক। তখন আমার ভেতরেই অস্থিরতা জেগে উঠল। কিন্তু ঝন্টু তো কিছুতেই কথা বলছে না। হাতে একটা সিডির ক্যাসেট তুলে দিয়ে ওর বাড়িতে নিয়ে গেল। রুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা লক করে দিল। ওর কম্পিউটারে সিডিটা প্রদর্শিত হতেই চিৎকার দিয়ে ওঠলাম। ঝন্টু কম্পিউটার বন্ধ করলে আমি দু’হাতে মাথা চেপে মাটিতে বসে পড়লাম।
—লম্পট বিপ্লব তোর ছোট আপার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে নিজেই ক্যাসেট করে বাজারে ছেড়ে দিয়েছে।
—চুপ কর, ঝন্টু। চুপ কর।


বিপ্লব লম্পটের রক্ত দেখে আমার হাত আর দা যেন আরও উল্লাস করে ওঠল।


আমি আর কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না। নিথর হয়ে কিছুক্ষণ পড়ে ছিলাম। হঠাৎ-ই ভেতরে পশুত্ব জেগে উঠল। ঝন্টুর খাটের নিচ থেকে দা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এক ঝন্টু তখন আমাকে কিভাবে আটকাবে? বাড়িতে প্রবেশ করে ছোট আপাকে উচ্চস্বরে ডাকছি। আমার রণমূর্তি দেখে বাড়ির সবাই ভয়ে তটস্থ। ছোট আপা ভেতর থেকে দরজা লক করে বসে আছে। দরজা ভাঙতে ঔদ্ধত হলাম। ওর রক্ত না দেখে আমি কিছুতেই স্বস্তি পাব না। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই আমার হাত থেকে দা-টা খসে পড়ে গেল। আমি তো ছোট আপার মৃত্যুই চেয়েছিলাম, কিন্তু তার মৃত্যুময় সেই দৃশ্য এখনও আমার চোখে ভেসে ওঠে। কি মর্মান্তিক! নিজেকে কেউ এভাবে ক্ষত-বিক্ষত করতে পারে? পুরো শরীর যেন রক্ত নিয়ে খেলছে। মা, বড় আপা আর ভাবী আছড়ে পড়ল ওর রক্তে রাঙা শরীরের ’পর। ততক্ষণে ঝন্টু এসে গেছে। আমরা একে অপরকে ধরে কান্না জুড়ে দিলাম। কিছুক্ষণ পর আমি নিজেকে সামলে নিয়েছি। মাথা ঠান্ডা করে বিষয়টা বুঝে দা-টা আবার হাতে তুলে নিলাম। ঝন্টু আমার সাথে যেতে চাইল। বাধা দিলাম। ওকে আমাদের বাড়িতে রেখে বাহিরের কিছু বন্ধু নিয়ে বিপ্লব লম্পটের বাড়িতে পৌঁছে গেলাম, শিরচ্ছেদ করার উদ্দেশে। পিঠে দু’টো কোপ দিতে পেরেছিলাম। বিপ্লব লম্পটের রক্ত দেখে আমার হাত আর দা যেন আরও উল্লাস করে ওঠল। তারপর আচমকাই পেছন থেকে মাথায় আঘাত পেলাম। জ্ঞান ফিরে দেখি আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি। ছোট আপার দাফন শেষ করার পরপরই পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করল।

গতরাতে ভালো ঘুম হয় নি। একটা লম্পটের নিথর দেহের অপেক্ষায় আমাকে আর কত রাত জেগে থাকতে হবে? সকাল হলো। পুলিশ জানাল, বড় আপা দেখা করতে এসেছে। বড় আপা এখন কম কথা বলে। জীবন বাস্তবতা হাসি কেড়ে নিয়ে আমাদেরকে গম্ভীর হতে শিখিয়েছে। বড় আপার চোখই আগে কথা বলে উঠল। টপ টপ করে পানি পড়ছে আর আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
—কথা বলবে না, বড় আপা?
—ভেবেছিলাম আমিই আত্মহত্যা করব, কিন্তু ছোট বোনটাই সবাইকে কাঁদিয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেল।
—আত্মহত্যাকে আর প্রশ্রয় দিয়ো না, বড় আপা। আমরা জীবনের সাথে লড়াই করেই বেঁচে থাকব।
—বড় ভাইয়া তো দেশে ফিরে আসছে। জানিস, আমরা বাড়ি বিক্রি করে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছি। আমাদের পেছনে কোন লম্পট বিপ্লব থাকবে না, জুয়াড়ি আর যৌতুকলোভী বাবু থাকবে না, হারামজাদা হারুনের মত স্বার্থানেষী থাকবে না, এমনকি বাবা নামক দানবও থাকবে না। আমরা ভালো থাকব না, বল?
—সেই ভালো হবে, বড় আপা।
—মা তোর জন্যে খুব কান্নাকাটি করছে রে। আর রাজা যেন প্রতিনিয়ত তোকেই খুঁজে বেড়ায়।
—রাজাকে তো আমিও খুঁজে বেড়াই আমার ভেতরে। এরকম অমলিন মন আর কোথায় পাব?
—কাল মা আর ভাবী আসবে তোকে দেখতে?

বউ আর শাশুড়ি এক সাথে। একদিন নিশ্চয়ই আমরা সবাই একসাথে মিলিত হব। মা আরব্য রজনীর গল্প বলে যাবে প্রতিনিয়ত আর ভাবী মুগ্ধ শ্রোতার মতো শুনে যাবে। দু’ভাই বৈষয়িক বিষয় ভুলে অটুট বাঁধনে আবদ্ধ হব। বড় আপা আর ছোট ভাই ভাসমান জীবন নিয়ে নয়, বন্ধনের দাবিতেই আমাদের সংসারে চিরস্থায়ী হবে। আর ছোট আপা? আমাদের সকলকে কি লক্ষ্য করবে? ছোট আপা, তোমার খুনিদের আমরা নিশ্চয়ই শাস্তি দেবো।

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৮৪, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।

কবি ও কথাসাহিত্যিক।

মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর।

পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই :
সমাপ্তির যতিচিহ্ন [উপন্যাস, ইমন প্রকাশনা, ২০১৩]

ই-মেইল : joychironton@gmail.com

Latest posts by মহ্‌সীন চৌধুরী জয় (see all)