হোম গদ্য গল্প ছারপোকা 

ছারপোকা 

ছারপোকা 
246
0

সারা বিকাল ও সন্ধ্যা ক্যাম্পাসে টই টই করে ঘুরে বাসায় ঢুকে সটাং বিছানায় গিয়ে পড়লাম। নয়টা পর্যন্ত ক্লান্ত শরীরে গভীর ঘুম পাড়লাম ছারপোকার তীক্ষ্ণ কামড় উপেক্ষা করে। বাসা বলতে বাপের বাসা না নিশ্চয়। এই শহরে যাদের বাপের বাড়ি আছে তারাই পৃথিবী নামক গ্রহের সবচেয়ে ভাগ্যবান। ভাগ্যবিধাতাও বলা চলে। ভাড়াটেদের ভাগ্য তো বাড়িওয়ালার উপরও নির্ভর করে সময় সময়। এই শহরে বাপের বাড়ি না থাকাটা মিস করি খুব।

নীলক্ষেত বিসিএস কোয়ার্টারে আমি সাবলেট থাকি। চারপাশে বই, কাগজ আর ছাপাখানার গন্ধে ভরপুর। আমার আরো দুজন রুমমেট আছে। একজন ফিলোজফিতে, তৃতীয় বর্ষ, আমার এক বছরের সিনিয়র। হরওয়াক্ত জোকস ও হাসাহাসিতে মেতে থাকতে আনন্দ পান। এবং পাশের মানুষটিকেও সেই আনন্দে শরিক রাখেন। অন্যজন সোশ্যালজিতে মাস্টার্স খতম করল সবেমাত্র। চাকরিবাকরির ফিকির শিকেয় তুলে ইয়ারমেটের সঙ্গে তুমুল প্রেমে মত্ত।

আজ ডিপার্টমেন্টে নবীনবরণ ও প্রবীণবিদায় অনুষ্ঠান ছিল যুগপৎ। সকাল নয় থেকে বিকাল পাঁচটা তক সেইরকম মৌজ-মাস্তিতে ডুবে ছিলাম। স্যারদের ক্লান্তিকর ওয়াজনসিহতের পর নাচ গান নাট্যাভিনয় ছাদভাঙা মুহুর্মুহু করতালি ব্যান্ডের কানের তালা ফাটানো চিত্কার চূড়ান্ত সেজেগুজে আসা অগণিত মেয়ে সবশেষে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া ও সেলফি তোলার ক্লিক ক্লিক মৃদু শব্দে বিনোদনের ভাগাভাগি।


টানা এক ঘণ্টা পাষাণবৎ বসে থাকার পর আরেকটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে নিঃসঙ্গ মানুষ তৈরির কারখানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি বাসায় ফিরি।


পড়ন্ত বিকালে টিএসসির সূর্য যখন ডুবুডুবু করছে ততক্ষণ আমরা সবাই সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফেলেছি। একা একা কী করব বা এই মুহূর্তের কর্তব্য কী ঠাহর করতে পারছি না। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া সিগারেটওয়ালার কাছ থেকে সিগারেট কিনে অগ্নিসংযোগ করলাম। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আচমকা দেখলাম রিকশা, যানবাহনের অবিরত শব্দদূষণ ও আড্ডামারা ছাত্রছাত্রীদের কথোপকথন সিগারেটের উড়ন্ত ধোঁয়ার প্যাঁচে প্যাঁচে নৈঃশব্দ্যের মতন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ফের মনে হলো একাকিত্বের এক দমকা হাওয়া আমার বুকে প্রচণ্ড ধাক্কা মারছে। আমি সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের লোহার শিকওয়ালা দেয়াল ঘেঁষে বসে পড়লাম। সিগারেট প্রায় ছোট হয়ে গেছে জ্বলতে জ্বলতে বাম হাতের আঙুলের ফাঁকে। ধোঁয়া উড়ছে। সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম, আমি ভীষণ একা।

একাকিত্বের আজাব থেকে রেহাই পেতে কাছের মানুষদের কল দেয়া আরম্ভ করলাম। আশ্চর্য! সবার ফোনই দেখছি সুইচড অফ। আর যাদের ফোনে রিং হচ্ছে তাদের তরফ থেকে সাড়া নাই বিলকুল। সবশেষে কল দিলাম আমার বান্ধবী বিনয়ীর নম্বরে, যে পাশেই একটি মেয়েদের হলে থাকে। গত এক বছর যাবৎ মাঝেমধ্যেই বিনয়ীর হলের সামনে আমরা দুজন ঘণ্টার ঘণ্টা আলাপ করি। প্রেমালাপ না। শুধু আলাপ। প্রেম না করেও কিভাবে আমরা দীর্ঘ এক বছর কেবল আলাপই করে গেলাম সে আলাপও করি। পাঁচ বার কল দিয়েও বিনয়ীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম না। আমি পাথরের মতন একা হয়ে গেলাম।

টানা এক ঘণ্টা পাষাণবৎ বসে থাকার পর আরেকটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে নিঃসঙ্গ মানুষ তৈরির কারখানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি বাসায় ফিরি।

ঘুম ভাঙার পর পেটের খিদা মস্তিষ্কে সিগন্যাল দিচ্ছে ছারপোকার কামড়ের চেয়েও তীক্ষ্ণ ও তীব্র তরিকায়। খাবারের সন্ধানে বেরোনো দরকার। পকেটে যা পয়সা আছে তাতে আজ রাতের খাবারটুকু শুধু হবে। কাল সকালে কোথায় কিভাবে কী দিয়ে খাব তা অনিশ্চিত।

“কী মিয়া, বাবুল ভায়ের টাকা দিছো?” ঘুম ভাঙার পর আমার দার্শনিক ‍রুমমেটের প্রথম প্রশ্ন।

“দিছি। গুণে গুণে ২৮০০ টাকা ওর টাক মাথার উপর ফেলাই দিয়া আসছি। শালা আস্ত একটা ছারপোকা।”

মৃত্যু আর মাছরাঙা ঝিলমিল প্রথিবীর বুকের ভিতরে
চারিদিকে রক্ত ঋণ গ্লানি ধ্বংস কীট নড়েচড়ে।
তবুও শিশির সূর্য নক্ষত্র নিবিড় ঘাস নদী নারী আছে;
হারিয়ে যেতেছে প্রায় আজ;
মানুষের সাথে মানুষের প্রিয়তম পরিচয়
নেই নেই আর;
আলো আছে তবুও—আলোয় ভরে রয়েছে অন্ধকার…

“ভাই কি কবিতা-টবিতা লিখলেন নাকি?” ঘুম ভেঙে যায় আশেক ভায়ের ভরাট গলার আবৃত্তিতে।

“নারে ভাই, আমার দ্বারা কবিতা হবে এটা তুমি ভাবলা কিভাবে? তেলাপোকাও একটা পাখি আর আমিও একটা কবি। এটা জীবনানন্দের কবিতা।” বলেই হা হা করে হাসতে লাগলেন আমার একবছরের ‍সিনিয়র আশেক মাহমুদ।

“কেমন লাগল আবৃত্তি? অনেক দিন হলো গলা সাধা হয় না। সেই ফার্স্ট ইয়ারে টিএসসির এক ওয়ার্কশপে কিছুদিন আবৃত্তি শিখেছিলাম। এরপর কতদিন আর যাওয়াও হয় না।” অনেকদিন যেতে না পারার খেদ কণ্ঠস্বরে ঝরে ঝরে পড়ছে।

“তাই নাকি! আপনি আবৃত্তি শিখতে গেছিলেন ক্যান? অদ্ভূত! আপনি দার্শনিক গোছের নিরীহ মানুষ। আবৃত্তির পোকা মাথায় ঢুকছিল ক্যান?“

“আরে ফার্স্ট ইয়ার, বুঝোই তো, খালি সুন্দরী সুন্দরী মেয়ে দেখা ছাড়া তো ক্যাম্পাসে আর কোনো কাজ ছিল বলে মনে হতো না। টিএসসিতে দিনরাত আড্ডা মারতাম পোলামাইয়া একলগে মিইল্যা। একদিন এক সিনিয়র আপুকে বেশ মনে ধরে গেল। উনি এক আবৃত্তির ওয়ার্কশপের ফর্ম বেচতেছিলেন। আগেও কয়েক বার দেখেছি। কিন্তু ওই দিন সন্ধায় চায়ের দোকানের বাতির আলোয় আপুকে ভীষণ কবিতাবতী লাগছিল। পরের দিনই ফর্ম কিনে জমা দিয়ে দিলাম।মাসতিনেক অনিয়মিত ওয়ার্কশপ করলাম। তারপর ক্ষেমা দিলাম চিরতরে…”

আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন আশেক ভাই। কিন্তু ছাপপোকার কামড়ে বাধাপ্রাপ্ত হলেন। বুকের পাঁজর সরিয়ে বিছানায় দ্রুত বিচরণরত ছারপোকাটাকে দুই আঙুলের ভোগে পিষে ফেললেন।

“হমমম। বুঝলাম।”

“এখন আবৃত্তি কেমন লাগল বলো।”

“আবৃত্তি কেমন জানি না। তবে কবিতার শেষ লাইন চিন্তায় নাড়া দেয়ার মতো। ওই যে, আলো আছে তবুও—আলোয় ভরে রয়েছে অন্ধকার। তাছাড়া, জীবন বাবুর কবিতা মৃত্যুবাদী মৃত্যুবাদী ভাব থাকলেও আমার পড়তে বেশ লাগে।”

আমার প্রসংশা শুনে আশেক ভায়ের মুখের চওড়া হাসি আরো বিস্তৃত হলো।

“ক্লাস আছে। বেরোতে হবে। সন্ধ্যায় পারলে ফের আপনার দরাজ গলার আবৃত্তি শুনব।”

“ওকে। আমিও বেরোচ্ছি।”

বিসিএস কোয়ার্টারের যে বিল্ডিংয়ে আমরা তিনজন সাবলেট থাকি সেটি প্রশাসনের নিম্নশ্রেণির স্টাফদের পরিবারসহ বসবাসের জন্য। এক্সট্রা টাকা কামাইয়ের জন্য অনেকেই আমাদের মতন ছেলেমেয়েদের সাবলেট ভাড়া দিয়ে রেখেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ এই কোয়ার্টারে ঢাকা কলেজ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা—যাদের একটু আর্থিক সঙ্গতি আছে, সাবলেট থাকে। সার্বক্ষণিক পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সুবিধা আছে। খালি একটু ভাড়া বেশি এই যা। কিন্তু রুমগুলো কবুতরের খোপের মতন বেজায় ছোট। আমাদের রুমটাতে তিনজনের তিনটা চৌকি ফেলার পর আর কোনো জায়গা নাই। এমনকি টেবিলচেয়ার রাখার পরিসরটুকুও হচ্ছে না। ওর মধ্যেই আমার রুমমেট দুজন কিভাবে যেন দুটো ছোট্ট টেবিল পুরে দিয়েছে। একখান চেয়ারও আছে। যেটা শোপিজের মতন টেবিলের সঙ্গে লেগে থেকে সৌন্দর্য বর্ধন করছে। টেবিল সংস্পর্শ থেকে চেয়ার টেনে বসতে গেলে তিন চৌকির মধ্যবর্তী ক্ষুদ্র পরিসরটুকু দখল করে ফেলে। তখন বাকি দুজনের পক্ষে নড়াচড়া খানিক কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। মেঝের জায়গা এতই অপরিসর যে জায়নামাজ বিছানো যায় না। ঘরে যখন নামাজ পড়তে হয় তখন পুবপশ্চিম করে পেতে রাখা চৌকিতে দাঁড়িয়ে যাই। আর বাদবাকি পড়াশোনা যা করার সব বিছানায় শুয়ে বসেই সারতে হয়। আর মাস গেলে ভাড়া গুনতে হয় ৯ হাজার টাকা। ‍টু মাচ।


বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া ক্লান্তশ্রান্ত ছাত্ররা এখানে রাতে খেতে আসে। চা সিগ্রেট তো ক্রমবর্ধমান চাহিদা। সারাদিনই ধূম্রপান চলে এখানকার টং দোকানগুলোর কাঠের বেঞ্চে।


আর আছে ছারপোকার জুলুম-নির্যাতন-অত্যাচার। ছারপোকার কামড়ে কোনো রাতেই শান্তিতে ঘুমাতে পারি না। আরামের ঘুম হারাম করে দেয় অসভ্য ছারপোকার দল। বিছানা-বালিশ বই-খাতা জামা-কাপড় সবখানেই ছারপোকার অবাধ বিচরণ। কোয়ার্টারে বিচরণশীল ছারপোকাগুলো এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে পোলাপানের বিছানাবালিশকাঁথার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে লুকিয়ে।

আমাদের ফ্লাটের মালিকও প্রশাসনের একজন ৩/৪ শ্রেণির কর্মচারী। কিন্তু উনি এই ফ্লাটে থাকেন না। দ্বিতীয় পক্ষের বউয়ের সঙ্গে অন্য কোথাও চলে গেছেন। দুটো প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেসহ প্রথম পক্ষের বউ আছেন আমাদের সঙ্গে। বড় ছেলে বাবুল ভাই নীলক্ষেতে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে কাঁচাবাজারের ব্যবসা করেন। আয়রোজগার যে মন্দ না সেটা তার তেলচকচকে টাক মাথা দেখলেই ঠাহর করা যায়। মাসের শুরুতে ভাড়া আদায়ের লগ্ন হলেই আমাদেরকে দেখলে টাক মাথায় হাত ডলতে থাকে।

“ভাইজানরা সহি সালামতে আছেন আপনারা? কোনো ঝামেলা নাই তো?”

পান চিবানো প্রসারিত গালে লাল লাল দাঁত বের করা ক্রিমিনালের হাসি।

“বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেকা করতাছেন। কত বড় কপাল আপনাগোর।”

কেবল মাথাই তেলচকচকে না, তেল মারামারিতেও উস্তাদ এই লোক।

“ছারপোকা জালায় খুব তাই না? দেখি ওষুদ দেওন যায় কিনা। আমি তো আর পারুম না ছারপোকা মারতে। বমি বমি লাগে ছারপোকার বজ্জাতি গন্ধে। ওষুদওয়ালারে খবর দিছি। আইব কইছে।”

দরদ যেন উথলে ওঠে! এই লোকটাকে কোনো এক বিচিত্র কারণে মনে হয় কাফকার গল্পের কিম্ভূতকিমাকার বৃহদাকার তেলাপোকা।

ক্লাসের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ি। প্রথমে হলে যাব। শোভনের কাছ থেকে ৫০০ টাকা পাই। ধার দিছিলাম দুইমাস হয়ে গেছে। শোভনের রুমে গিয়ে দেখব ছারপোকার কামড়ের যন্ত্রণা সহ্য করে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করা বন্ধু আমার সারারাত পলাশীর মোড়ে আড্ডাবাজি করে ভোরে বিছানায় গেছে। পলিটিক্সের চক্করে বেচারাকে রিএড খাইতে হলো।

এবছর ঢাকায় শীত খুবই অপ্রতুল। নাই বললেই চলে। রাতের আঁধার একটু গাঢ় হলেই হিমেল হাওয়া বইতে থাকে। তখন হালকাপাতলা এক চাদর গায়ে চড়ালে বেশ আরাম বোধ হয়। আগের বছর গাংনী বাজার থেকে আম্মার কিনে দেওয়া এমনই এক হালকাপাতলা শাদাকালো ডোরাকাটা চাদর গলায় পেঁচিয়ে আনুমানিক রাত সাড়ে দশটার দিকে ক্যাম্পাস থেকে আমি নীলক্ষেতের বাসায় ফিরছিলাম। নীলক্ষেতের সিগন্যালের যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল একখান তোরণ তৈরি করা হয়েছে অতদূর হেঁটে আসার পর পকেটে অবস্থিত নকিয়া এক্সপ্রেস মিউজিকের পুরোনো সেল ফোনটি বেজে ওঠে। সদ্য বাংলা বিভাগ থেকে ফারেগ হওয়া এক বামপন্থি বড় ভায়ের নম্বর ভেসে উঠেছে।

সময় রাত সোয়া এগারটা। মধ্য ডিসেম্বর। মিহি মিহি বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে মৃদু সুঁই ফোটানো শীত। আমি বসে আছি কলাভবনের পাশে নবনির্মিত আবাসিক হলের সামনের টং চায়ের দোকানগুলোর একটার ঝুপড়ির তলে বামপন্থি রাজনীতির ভাইদের সাথে। নতুন হলটির চারপাশে আরো চারটি পুরোনো হল বিদ্যমান। নতুন পুরাতন মোট পাঁচটা হলকে কেন্দ্র করে ঠিক নতুন হলটির সামনের দেয়াল ঘেঁষে প্রায় একডজন টং দোকান গড়ে উঠেছে। রাত গভীর হয় যত টং দোকানগুলো ততই জমজমাট হয়ে ওঠে। হলে থাকা ছেলেরা, যারা সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমায়, মুভি দেখে, পলিটিক্স করে এবং দিনে ক্লাস করে ও লাইব্রেরিতে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া ক্লান্তশ্রান্ত ছাত্ররা এখানে রাতে খেতে আসে। চা সিগ্রেট তো ক্রমবর্ধমান চাহিদা। সারাদিনই ধূম্রপান চলে এখানকার টং দোকানগুলোর কাঠের বেঞ্চে। কলা পাউরুটি বিস্কিট কেকের পসার তো আছেই, বেচাকেনার রমরমা অবস্থা টের পেয়ে কেউ কেউ রাত নয়টা-দশটার পর থেকে পরোটা বানানোর আয়োজন করেছে। গরম পরোটার সাথে ডিম ওমলেট ও সবজি। ক্রেতার চাহিদা মোতাবেক ডিম ও সবজি মিক্স করে আরেক টাইপের আইটেম তৈরি করে দেয়া হয়। যেটার নাম নাকি চাইনিজ। অতি উপাদেয় খাবার। বাতির আলোয় বসে আমি নিজেও কয়েকদিন খেয়েছি। তবে চিন দেশ এই রেসিপির চল আছে কিনা আমার কোনো আইডিয়া নাই।

দেশ, দুনিয়া, পলিটিক্স, গ্রাম থেকে পড়তে আসা স্টুডেন্টদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, ক্লাসে টিচারদের মুখস্ত নোট পড়ানো এবং সেই নোটগুলো ফটোকপি করে পরীক্ষায় পাস করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের নোংরা টয়লেট, ময়লা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, বিভিন্ন সংকটকালে ক্যাম্পাসে কণ্ঠস্বর সরব রাখা ও প্রয়োজনে আন্দোলন জারি রাখা ইত্যাদি সার্বিক হালহকিকত নিয়ে আলাপ করছিলাম বা আরো খোলাসা করে বললে সামনে উপবিষ্ট বাম তরিকার কয়েকজন ভাইয়েরা বাতচিত করছিলেন আর আমি ধীরে ধীরে শীতল হতে থাকা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম এবং সবজান্তা একটা ভাব দেখিয়ে ঘন ঘন মাথা ঝাঁকাচ্ছিলাম।

উত্তপ্ত আলোচনা একটু শীতল হলে বাংলার সেই বড় ভাই চায়ের কাপে শেষ চুমুক ও বাম হাতের দুআঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত বিড়িতে সুখটান মেরে আমার দিকে তাকালেন।

“তারপর, তোমার খবর বলো। কেমন চলছে পড়াশোনা? তোমার না সেমিস্টার ফাইনাল ছিল লাস্ট উইকে?”

“জ্বি ভাই। পরীক্ষা ভালো হইছে আলহামদুলিল্লাহ।”

“সিজিপিএ কেমন তোমার?”

সিজিপিএর অবস্থা শুনে ভাই বললেন, খারাপ না তোমার সিজিপিএ। ভালো অবস্থানেই আছো। আরো বাড়ানোর চেষ্টা করো সামনে থেকে।

“ঠিক আছে ভাই। চেষ্টা অবশ্যই করব।”

ভাই এটাসেটা কিছু একটা খাইতে বললেন। ঘণ্টা খানেক আগেই রাতের খাবার খেয়েছি। তাই আর কিছু খেলাম না।


ভাই কত ধরনের ছারপোকা আছে হলে। আনিম্যাল ছারপোকা, হিউম্যান ছারপোকা…


“একাডেমিক পড়ার বাইরেও নাকি তুমি শুনছি প্রচুর পড়ো। ভালো গুণ। ইউনিভার্সিটির পোলাপান এখন আর লেখাপড়া করে না। বুঝলা? খালি পরীক্ষায় পাস করে। পরীক্ষায় পাস করা আর লেখাপড়া করা দুটো আলাদা জিনিস। পাস করলে তুমি একটা ডিগ্রি পাবা। এর বেশি কিছু না। কিন্তু ভেতরটা থাকবে ফাঁকা। একেবারে লবডঙ্কা। আর পাশাপাশি লেখাপড়া করলে, মানুষের সাথে মিশলে, কথা কইলে, চোখকান খোলা রাখলে তুমি মানুষ হইয়া বেরোতে পারবা। আমাদের ইউনিভার্সিটিগুলো এখন আর এইসব কামের মানুষ প্রডিউস করে না। বুঝলা? ইউনিভার্সিটি এখন একখান প্রতিষ্ঠান যার কাজ হচ্ছে সার্টিফিকেট বিলানো। আচ্ছা, তুমি কি হলে থাকো?”

“না ভাই। নীলক্ষেত বিসিএস কোয়ার্টারে থাকি। গাউসুল আজম মার্কেটের পেছনে।”

“হলে থাকো না কেন?”

“ছারপোকা কামড়ায়।”

“ছারপোকার কামড়ের ভয়ে তুমি হলে থাকো না? অদ্ভুত!”

“ভাই কত ধরনের ছারপোকা আছে হলে। এনিম্যাল ছারপোকা, হিউম্যান ছারপোকা…”

আমার রসিকতায় মজা পেয়ে বামপন্থি ভাই টং দোকানগুলোর সোনালি আলোয় হা হা করে হেসে উঠলেন। অন্যরাও ততক্ষণে আমাদের আলাপে মনোযোগ দিয়েছে। তারাও হাসিতে যোগ দিল। ভাই এবার পকেট থেকে বেনসন অ্যান্ড হেজেসের নতুন প্যাকেট বের করে একটা সিগ্রেট ঠোঁটে পুরে দিলেন। আমাকেও একটা অফার করলেন। অতঃপর দিয়াশলাই আগুনে নিজের সিগ্রেটে অগ্নিসংযোগ করলেন। আমারটাও ধরিয়ে দিলেন।

পৌনে বারটা বাজে। মেহগনির পাতা বেয়ে নেমে আসা ডিসেম্বরের তীক্ষ্ণ কুয়াশা একটু একটু গাঢ় হচ্ছে রাত গভীর হওয়ার তালে তালে। দোকানগুলোর পসার ও ক্রেতাসমাগমও অধিক হচ্ছে মিনিটে মিনিটে। এবার আমাকে উঠতে হবে। কোয়ার্টারের গেট বন্ধ হয় বারটায়।

মাহমুদুল হাসান

জন্ম ৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬; কুষ্টিয়া। স্টুডেন্ট। বিএ অনার্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল : mahmudnodia@gmail.com

Latest posts by মাহমুদুল হাসান (see all)