ছবিটা

ছবিটা
413
0

ঢাকার বাইরে এক বিভাগীয় শহরে পোস্টিং হয়ে গেল আমার। একটি অসরকারি ব্যাংকের শিক্ষানবিশ কর্মকর্তা হিশেবে। দুনিয়ায় কিছু চিরন্তন নিয়ম আছে যেগুলো কোনোদিনও পাল্টাবার নয়। যেমন ব্যাচেলরের বাসা ভাড়া পাওয়ার বিষয়টি। কী ঢাকা মহানগর, কী বিভাগীয় শহর, কী মফস্বল, সব জায়গায় একই অবস্থা। হিশাব নিকাশের ব্যাপারটা তো থাকেই। টাকার পরিমাণ, দূরত্ব, পরিবেশ ইত্যাদি। সমস্যা হলো একটা মিলবে তো আরেকটা মিলবে না। সব মিলবে তো বাড়িওয়ালা ভাড়া দেবে না ব্যাচেলর বলে। আবার দূরত্ব মিলবে তো ভাড়ার পরিমাণ মিলবে না। ভাড়ার পরিমাণ মিলবে তো পরিবেশ খারাপ। একটু রাত হলেই ছিনতাই। ইত্যাদি…


ব্যাচেলর হওয়ার জরিমানা এটা। বিয়ে করলে এক হাজার টাকা কম দিতে পারবে।


বাসা ভাড়া নিয়ে বেশ ঝক্কি ঝামেলা যাচ্ছে। কলিগরা বেশ সহযোগিতা করছে। তাতেও কাজ হচ্ছে না। একরকম নিরাশই হয়ে পড়লাম। হোটেলে থাকতে হচ্ছে। একদিন রাতে সেল ফোনে একটা ফোন এল, ‘ভাইয়া, আমি কণক। কাল সকালে বাসায় আসেন। আব্বু আপনাকে আসতে বলেছে।’

কথাটা শুনে জানে একটু পানি এল। কণক বাড়িওয়ালার মেয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ে। কণকের আব্বুর সাথে ভাড়া বিষয়ে যে-দিন কথা বলছিলাম তখন কণকও ছিল। সে-দিন সামান্য কথা বিনিময় হয়েছিল। আমি কণকের আব্বুকে যতই অনুরোধ করছিলাম, ততই তিনি না করে দিচ্ছিলেন। তার একটাই যুক্তি, ফ্যামিলি বাসার ভেতর ব্যাচেলর ঢুকানো যাবে না। এক্কেবারেই না। আমি হতাশ হয়ে ফিরে আসার সময় অতি বিনয়ের সাথে আরেকটি কথা বলেছিলাম। মানিব্যাগ থেকে কার্ড বের করে বলেছিলাম, ‘আঙ্কেল, যদি আপনার কাছে বোঝা মনে না হয় তাহলে কার্ডটি রাখবেন।’

কণকের আব্বু ভ্রু কুঁচকে নিতান্ত অনিচ্ছায় কার্ডটি নিয়ে টেবিলে প্রায় ছুঁড়ে মারলেন। কষ্ট লাগল খুব। তিনি আমার সামনে অতি বিরক্তিভরে কার্ডটা ওভাবে টেবিলে নাও রাখতে পারতেন। চলে এলাম সেখান থেকে। হোটেলেই থাকি এখনো। প্রায় এক মাস হতে চলল।

কণকের ‘ভাইয়া’ ডাকটি কানে বাজতে থাকল। ‘আব্বু আপনাকে আসতে বলেছে’ কথাটিও মনের ভেতরে অনুরণন তুলল। কী মিষ্টি কণ্ঠ! কণকের আব্বুর সাথে কথা বলার সময় কণকের দিকে ঠিকভাবে তাকাতেও পারি নি। পাছে তারা কিছু ভেবে বসে। এমনিতেই কত ধরনের পরীক্ষা দিয়ে ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া নিতে হয়। কণককে দেখলে এখন চিনব কি-না তাও তো জানি না।

খুব সকালে তাদের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। কলিংবেলে কয়েকবার চাপ দিলাম। কোনো রেসপন্স নেই। আরো বেশি চাপ দেওয়া ঠিক হবে কি-না। যদি এদের সবার খুব বেলা করে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস হয়! তাহলে তো সর্বনাশ করেই ফেলেছি। কিন্তু আমারও তো কিছু করার নেই। আমাকে আজ সকালে আসতে বলেছে। সকাল বলতে আমি তো সকাল দশটা ধরে নিতে পারি না। কারণ আমার অফিস তো দশটা থেকে শুরু। এখান থেকে কথা বলে আমাকে অফিস ধরতে হবে। ঠিক কয়টায় আসতে হবে তাও নির্দিষ্ট করে বলে নি আমাকে। আমারও শোনা হয় নি। প্রথমত ফোনটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। দ্বিতীয়ত ওই মিষ্টি কণ্ঠ শুনে আমি খানিকটা হতবিহ্বল। অনেক সাহস সঞ্চয় করে সময়টা শুনে নেওয়ার জন্য ফোন করেছিলাম। নাম্বার বিজি করে দিয়েছিল কণক অথবা কণকের আব্বু। সেই থেকে সেটা নিয়েও টেনশন হচ্ছে। যদি এই অজুহাতে বাসা ক্যান্সেল করে দেয়!

এইসব ভেবে ভেবে একবার মূল রাস্তায় আসছি, আরেকবার গলির ভেতরে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াচ্ছি। যদি কেউ দরজা খুলতে আসে! কেউ এল না দরজা খুলতে। ততক্ষণে সময় চলে গেছে বেশ। কলিংবেলের রেশ ধরে দরজা খোলার সম্ভাবনা কেটে গেছে। আমি গলির মুখে মূল রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। তখনই বাড়িওয়ালাকে দেখলাম হেঁটে আসতে।

‘ও, তুমি এসে পড়েছ? আমি হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। বুঝলে, এটা হলো খ্রিস্টানদের চাল। ওদের সংস্কৃতি চলে এসেছে। সকালে হাঁটো, বিকেলে হাঁটো। ডায়াবেটিকের নামে এই সংস্কৃতি চালু হয়ে গেল। দেশটা একেবারে শেষ। মেডিসিন দেওয়া ওদের জিনিসপত্র খেয়ে খেয়ে ডায়াবেটিক আমদানি হয়ে গেল আমাদের। এখন সকাল বিকাল হাঁটো। মিষ্টি খাওয়া বাদ। নাফারমানের দল। আরে মিষ্টি খাওয়া নবীজির সুন্নাত। যত্তসব।’ চাবি বাড়িওয়ালার কাছেই ছিল। আমরা এসে তাদের ড্রয়িং রুমে বসলাম।

‘শোনো বাসাটা তোমাকে দিচ্ছি। ভাড়া এক হাজার টাকা বেশি। ব্যাচেলর হওয়ার জরিমানা এটা। বিয়ে করলে এক হাজার টাকা কম দিতে পারবে। যে মাসে বউ তুলে আনবে তখন থেকেই নতুন ভাড়া কার্যকর হবে। আরো কিছু শর্ত শুনে নাও, যদি কখনো কোনো কমপ্লেইন শুনি কোনো ভাড়াটিয়াদের কাছে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বাসা ছাড়তে হবে এবং অগ্রিম হিশেবে দেওয়া তিন মাসের ভাড়া ফেরত পাবে না। বুয়া রাখতে হবে। আমরাই ব্যবস্থা করে দেবো। বুয়ার কাছে এক সেট চাবি থাকবে। তোমার কিছু চুরি হলে আমাদের কিছু বলতে পারবে না। আর অবশ্যই যখন তখন এখানে আসতে পারবে না। আমরা ডাকলে আসবে নতুবা নয়।’

আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘আমি রাজি।’

কণকের মিষ্টি কণ্ঠ কি আমার মনের ভেতরে অনুরণন করেই চলছে! কী জানি। এতসব কঠিন শর্ত মেনে নেওয়ার পেছনে কি শুধুই একটা বাসা ভাড়া নেওয়া? কী জানি। আমি রাজি কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে কেন যে কণকের কথা মনে পড়ল!

বাড়িওয়ালা বলল, ‘তুমি যে কোনোদিন উঠতে পারো। তোমাকে চাবি দিয়ে দিচ্ছি। এখুনি নাও। চাবি নেওয়ার নাম করে তুমি এখানে আরেকবার আসবে তা হবে না। নাস্তা করে যাও। ব্যাচেলর মানুষ। আর আমার বাসায় এসে সকালে কেউ খালি মুখে যায় না। তুমি বসো। আমি আসছি।’

বাড়িওয়ালা ভেতরে চলে গেলেন। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় ইজি হয়ে বসলাম। তখনই লক্ষ করলাম কর্নার টেবিলে একটি বড় ছবি বাঁধাই করা। সবুজ বর্ডার দেওয়া ফ্রেমের মাঝে এক তরুণীর ছবি। নিশ্চয়ই কণক। মাথাটা একটু কাত করা। পেছনে ফিরে তাকানো। চোখে কৌতকপূর্ণ চাহনি। শাদা পোশাকে প্রসাধনহীন। শুধু কপালে একটি উজ্জ্বল শাদা চকচকে টিপ। মাথার উপরে চুলগুলো একটু ফোলানো। চারপাশে সবুজের সমারোহ।

আমি ভাবতে লাগলাম। ছবিটিকে এত অপূর্ব লাগার কারণ কী? ছবির ভেতরে সবুজের সমারোহ আর সবুজ বর্ডার দেওয়া ফ্রেমের ম্যাচিং?  না-কি কণকের প্রসাধনহীন শাদামাটা সৌরভ? ক্যামেরার মুন্সিয়ানা? সবকিছু ছাপিয়ে আমার মনে হলো এগুলো কিছুই না। ছবিটি অপূর্ব লাগার কারণ কণক নিজেই।

বাড়িওয়ালা ফিরে এল। এসেই গজগজ করতে লাগল। ‘যত্তোসব। এত বেলা হয়ে গেল কারো কোনো উঠবার নাম নেই। কোথায় নাস্তা কোথায় কী? মান সম্মান আর থাকল না। কবির, তুমি কিছু মনে করো না।’

আমি উঠে পড়লাম। বললাম, ‘আঙ্কেল আপনি একটুও ব্যস্ত হবেন না। এটা কোনো সমস্যা না। আমি আজ ওঠি।’


কেন যখন তখন বাড়িওয়ালার বাসায় যাওয়া নিষেধ করেছেন তাও বুঝতে পেরেছি। আগুন এবং মোমকে তিনি দূরে রাখতে চেয়েছেন।


২.
চারতলায় দুই রুমের বাসা। এই বাসার বিশেষত্ব হলো উত্তরের দরজা দিয়ে বাসায় ঢোকা হয়। দক্ষিণের দরজা খুললে ছাদের বাঁকি অংশ। বোঝা যায় বাড়িওয়ালার চালাকি। ফাউন্ডেশন তিন তলার দেওয়া ছিল। তার উপর এই ছোট্ট দুই রুমের বাসা করা হয়েছে। ছাদের এই অংশটা আমার ভীষণ পছন্দ। বৃষ্টিতে ভিজতে এবং জোছনা দেখতে যা লাগবে না এখানে!

বেশি দেরি করলাম না। পরের শুক্রবারই জিনিসপত্র নিয়ে এলাম। জিনিসপত্র বলতে বুকশেলফ কাম টেবিল, চেয়ার, একটা ওয়ারড্রব আর একটা আলমিরা। আর বই। বড় বড় গোটা দশেক কার্টুন যখন লেবাররা নিয়ে আসছিল তখন অনেকের কৌতূহল, এত কার্টুন কিসের?

গোছগাছ নিয়ে আমি বেশ ব্যস্ত। দরজা খোলা ছিল বুঝতে পারি নি। হুড়মুড় করে কে যেন ঢুকে পড়ল। কণক! আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়। বাড়িওয়ালার শর্তগুলো নিয়ে আমি ভেবেছি অনেক। কেন যখন তখন বাড়িওয়ালার বাসায় যাওয়া নিষেধ করেছেন তাও বুঝতে পেরেছি। আগুন এবং মোমকে তিনি দূরে রাখতে চেয়েছেন।

কণক এসে দরজা লাগিয়ে দিল। আমার তখন হার্ট অ্যাটাক হবার দশা। আমি উঠে দাঁড়িয়েছি। মুখে কথা আসছে না। কণক ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভয় নেই। আম্মু জানে আমি বাইরে হাঁটতে বেরিয়েছি। আপনার সাথে গোপন কয়েকটা কথা বলতে এসেছি। আপনাকে বাসা ভাড়া দেওয়া নিয়ে আম্মুর সাথে আব্বুর ঝগড়া হয়েছে। আব্বু দিতে চায় নি। আম্মু জোর করেছে। আব্বু খুব ভয় করে। যদি আপনার সাথে আমার প্রেম হয়ে যায়! আম্মু বলেছে, তুমি কঠিন শর্ত দাও। তবুও ছেলেটাকে থাকতে দাও। কণক তো চলে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে। তুমি বাহিরে যাও ব্যবসার কাজে। ওরকম একটা ছেলে থাকলে একটু ভরসা পাই। কণক ছুটিতে এলে কণকের দাদার বাড়িতে থাকব। আর ওরকম আজে বাজে ধারণা করবে না।’

কণক একটু দম নিল। ‘ড্রয়িং রুমে যে ছবিটা দেখেছিলেন ওটা আমার। একদম পঁচা একটা ছবি। আব্বু বলে, নীল জামায় আমাকে নাকি নীল পরীর মতো লাগে। আমি সবসময় গোলাপি টিপ পরি। একটুও লিপস্টিক দেই না। এই দেখেন।’

কণক ঠোঁট উল্টে লিপস্টিক দেখাল। ‘আমি যাই, ধরা খেলে সব শেষ। আপনি এ কথাগুলো কাউকে বলবেন না।’

আমি ততক্ষণে মূর্তি হয়ে গেছি। কণক দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে এল। ‘জানেন, ওই দিন আমরা আগেই ঘুম থেকে উঠেছিলাম। আপনার জন্য অনেক নাস্তা বানিয়েছিলাম আমি আর আম্মু মিলে। আব্বু মিথ্যা বলেছে। আপনি চলে গেলে বলেছে, পাক কষ্ট পাক। খাবার কষ্ট কী বুঝুক। বুঝে বুঝে যদি স্টুপিডগুলো বিয়ে করে।!’

কণক কথা বলছিল নিচু স্বরে। খানিকটা ফিসফিস করে। শেষে হেসে উঠল তরুণীসুলভ। বোঝা গেল এতক্ষণ খুব সাবধানতার সাথে সংযমী হয়ে ছিল। এখন সংযমের বাঁধ শেষ। কণক দ্রুতই হাসি থামাল। ধীর পায়ে আস্তে করে দরজা খুলল। তারপর আরেকবার পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল। ‘আর দেখা হবে না।’

আস্তে করে দরজা লাগিয়ে দিল কণক। কিছুক্ষণ পর দুম-দাম শব্দ পেলাম সিঁড়িতে। বুঝতে পারলাম এখানে আসার চব্বিশ ঘণ্টা হওয়ার আগেই চব্বিশ ঘণ্টার আল্টিমেটাম পেয়ে যাব। কিন্তু আমার চারপাশে কণকের ছায়া লেগে থাকল। তার সুবাস লেগে থাকল। তার ছবিটাও লেগে থাকল। কানে লেগে থাকল কণকের কিন্নরীকণ্ঠ।

এক সপ্তাহ পর। শুক্রবার। বই গোছাচ্ছি। ওই সময় দরজা খুলে কে যেন ভেতরে ঢুকল। ভাবলাম বুয়া। বুয়ার কাছে চাবি দেওয়া আছে বাড়িওয়ালার শর্ত অনুযায়ী। কিন্তু আমাকে হতচকিত করে দিয়ে কণক এসে সামনে দাঁড়াল। ‘স্যরি বলতে এসেছি। আমি আপনার সাথে মিথ্যে বলেছি।’

‘কী মিথ্যা বলেছেন?’

কণক চুপ। মাথা একটু নিচু করে তার দীর্ঘ আঁখি-পল্লব মেলে আমার দিকে চেয়ে থাকল। তারপর বলল, ‘আমি বলেছিলাম আর দেখা হবে না, কিন্তু হয়ে গেল।’

কণকের ভেতরে স্থিরতা ছিল। তা অতি কিঞ্চিৎ সময়ের জন্য। একটা বাক্য শেষ করার আগেই তার স্বভাবসুলভ চাঞ্চল্য ফিরে এল, ‘কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘ভয় পাচ্ছেন? ভয় নেই। আব্বু নেই। আম্মু কিছু বলবে না। আচ্ছা বলেন তো, নীল পরী কে? আপনি ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘নীল পরী নীলাঞ্জনা, চোখ দুটো টানা টানা।’ আমার চোখ? কণকের রিনিঝিনি হাসি।

‘আমি আপনার ডায়েরি পড়ে ফেলেছি।’

কণকের রিনিঝিনি হাসি।

‘বুয়া আপনার রুমের চাবি আমাদের বাসায় রেখে যায়। দুপুরে আম্মু ঘুমালে আমি চুপি চুপি এসে আপনার ডায়েরি পড়ি।’

কণকের রিনিঝিনি হাসি।

‘কপালের টিপ, যেন জোনাকির দ্বীপ’

কণকের রিনিঝিনি হাসি।

‘আমার টিপটি কিন্তু জোনাকির না। জোনাকির টিপ হয় না। ওটা কাঁচপোকা টিপ। কাঁচপোকা নামে এক পোকা আছে। যার পাখা তেঁতুলের পাতার মতো দেখতে। সবসময় চিকচিক করে।’

কণকের রিনিঝিনি হাসি।

এবার আর রাখঢাক নয়। একদম চঞ্চলা কিশোরীর মতো দরজা খুলে হাসতে হাসতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল কণক। আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম।

৩.
গভীর রাতে ঘুম থেকে জাগা পেয়ে গেলাম এক কিন্নরকণ্ঠীর গানের সুরে। কণক! ‘নাই বা তুমি এলে।’ বলে আস্তে আস্তে সুরটা মিলিয়ে গেল। আমি সচকিত হয়ে উঠলাম। এত মিষ্টি! এত সুরেলা! দূরাগত কণ্ঠে ঢেউ খেলে খেলে আসা সুরের এত মূর্ছনা! রাতের নির্জনতা এবং গোপন রহস্যকে আরো রহস্যময় করে দেওয়া এ কণ্ঠটি কার! আবার ভেসে এল ‘আকাশের ওই মিটিমিটি তারার সাথে কইবো কথা’।

উঠে বসলাম বিছানায়। কিন্নরকণ্ঠীর কণ্ঠ কয়েক চরণ গেয়ে চুপ হয়ে গেল। আমি বুঝার চেষ্টা করলাম এই সুর কোন্ দিক থেকে ভেসে আসছে। কণক! কণকের কণ্ঠ কি এরকম? কথা বলা কণ্ঠ এবং গানের সুরের কণ্ঠ কোনোদিনও একরকম হয় না। তারউপর রাতের বেলা এবং আকস্মিক।


আমাকে হতবিহ্বল করে তরুণী এক বিকট চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল।


বাকি রাত ঘুম এল না। মোবাইলের বাটনে চাপ দিয়ে ঘড়ি দেখলাম। রাত তিনটা। ভাবলাম দরজা খুলে ছাদে যাব কি-না। একা থাকি। একটু ভয় ভয়ও করছিল। একটু ধাতস্থ হয়ে ছাদে গেলাম। ছাদ মানে এটাই আমার বারান্দা। দরজা খুলতেই একটা ঠান্ডা বাতাস আমাকে আলিঙ্গন করল। আকাশে পাণ্ডুর চাঁদ। তার ম্রিয়মাণ আলোর দিকে তাকালে একটু উদাস লাগে বৈকি। একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল বুক চিরে। আশে পাশে তাকালাম। রাস্তার লাইটপোস্টের আলোর চারিদিকে তখনও যথারীতি পোকার ওড়াওড়ি। রাস্তার ওপাশে একটা ছোট্ট মাঠের মতো। তার পাশ দিয়ে যাওয়া রাস্তার ডানদিকে কয়েকটি বাড়ি। উত্তরে আরেকটি শাদা একতলা বাড়ি। বিশাল বেলকুনি। কেন জানি আমি এই বেলকুনির দিকেই তীক্ষ্ণ চোখে তাকালাম। না, কেউ নেই। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলাম।

পরের রাতে কেন জানি ওই গানের জন্য প্রতীক্ষা করলাম আমি। ঘুমও এল না। কণক আছে কি-না তার সন্ধান করাও আমার পক্ষে অসম্ভব। আজ গানের কোনো খোঁজ নেই। সকালের দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন রাতে আগেই ঘুমিয়ে পড়লাম। বোধহয় আগের রাতের রাতজাগা এবং ব্যাংকের প্রবল খাটুনি তো আছেই। আজ হঠাৎ ওই একই গানের সুরে ঘুম ভেঙে গেল। খুব তাড়াতড়ি দরজা খুলে ছাদে চলে এলাম। আজ একটুও ভয় ভয় করে নি। দূরে কয়েকটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠল। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারলাম না গানের সুরটা কোন্‌ দিক থেকে ভেসে আসছে। এই ছাদ থেকে দেখা যায় এমন সবগুলো বাড়ি, বাড়ির ছাদ ও ব্যালকনিতে তীক্ষ্ণ নজর রাখলাম। কোথাও কেউ নেই। ছাদেই সকাল হয়ে গেল। বহুদিন পর সকাল হওয়া দেখলাম। কিন্তু মনের ভেতরে ওই কণ্ঠ গেঁথে গেল।

সকাল হওয়া দেখার পাশাপাশি আরো কিছু দেখা হলো। প্রথমে মাঠের মতো ওই জায়গাটার উত্তরে অবস্থিত একতলা শাদা বাড়িটার ছাদে এক তরুণীকে দেখা গেল। মাথা নিচু করে হাঁটছে সে। একটু পর আকাশের দিকে তাকাল। তারপর বুক ভরে শ্বাস নিয়ে এই ছাদের দিকে তাকাল। খুব দ্রুত নিজেকে আড়াল করার জন্য আমি অন্যদিকে তাকালাম। একটা পরিতৃপ্তির আবেশ খেলে গেল মনের ভেতরে।

দুইদিন পর আমাকে ঢাকা চলে আসতে হলো একমাস ব্যাপী ফাউন্ডেশন ট্রেনিং-এর জন্য। একমাস পর ফিরে  ব্যাগপত্র রেখে প্রথমে ছাদে গেলাম। তখন বিকেল। ওই ছাদের দিকে তাকালাম আবার। কয়েকটি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। মিছেমিছি দৌড়াদৌড়ি করছে। চারটা চেয়ার পাতা। দুটো খালি। অন্যদুটোতে মধ্যবয়সী দু’জন। কাপড়-চোপড় না চেঞ্জ করেই বিকেল ও বিকেলের ছাদের দিকে চোখ রাখলাম। ঠিক সন্ধ্যার আগে সেদিনের সকালে দেখা তরুণীটি চেয়ারে এসে বসল। একসময় সন্ধ্যার আঁধারে হারিয়ে গেল তারা। সন্ধ্যায় যথারীতি আকাশে ঘোমটা খুলেছে শুকতারা।

কণকের ভাবনাটা কেন জানি আর ভাবাচ্ছে না। গভীর রাতে কিন্নরকণ্ঠের ওই সুর এবং রহস্য আমাকে ব্যাকুল কলে তুলছে। ওই গানের রহস্য বের না করা পর্যন্ত যেন নিস্তার নেই। ভাবলাম আজ ঘুমাব না। দেখি কী হয়। কিন্তু বিছানায় যাওয়ার পরপরই আমি কখন যে ঘুমে হারিয়ে গিয়েছিলাম!

সকালবেলাটা শুরু হলো মন খারাপ দিয়ে। কারণ যেভাবে চেয়েছিলাম সেভাবে হলো না। আসলে মন চাইলেও শরীর চায় নি। ভ্রমণের ধকলে শরীর চেয়েছে ঘুমের আবেশ।

পরের রাতে আর চেষ্টাই করতে হলো না না-ঘুমানোর জন্য। শুধু মাঝে মাঝে তন্দ্রার মতো আসছিল। এবং একসময় ওই গান শুরু হলো। মোবাইল জ্বেলে ঘড়ি দেখলাম। রাত আড়াইটা। খুব দ্রুত দরজা খুলে ছাদে এলাম। সঙ্গে সঙ্গে গান বন্ধ।

দরজা খোলার শব্দটা মনে হয় জেনে গেছে কিন্নরীকণ্ঠী।

পরের রাতে গান শুরু হলে খুব আস্ত করে দরজা খুলে, সাবধানে লক্ষ করতে থাকলাম কোন্ জায়গা থেকে সুরটি ভেসে আসছে। এবং দেখলাম শাদা বাড়িটার নিচতলার ব্যালকনি থেকে গানের কণ্ঠ ভেসে আসছে। এক তরুণী আলো আঁধারি ভরা ব্যালকনিতে হাঁটছে আর গান করছে। হাঁটার তালে নাচের ছন্দ। হাতে পায়ে এবং কোমরে নৃত্যের দোলা।

পরের রাতেও একই অবস্থা। আমি আবারো দরজা খুলে খুব সাবধানে তাকে দেখতে থাকলাম। আলো আঁধারির ভেতরে তার মুখটা একটু একটু দেখা যায়। একসময় সাহস করে সামনে এগিয়ে গেলাম প্রাচীর বরাবর। গান থেমে গেল।

পরের রাতে আমি রাখ ঢাখ না করেই গেলাম ছাদের প্রাচীর বরাবার। আজ গান থামল না। আজ আরেকটি গান গাচ্ছে সে। ‘আকাশের গায়ে আছে একরাশ নীল..’

আমি তো রীতিমতো ওই কিন্নরীকণ্ঠে আবিষ্ট হয়ে গেলাম। দিনরাত্রি সারাক্ষণ ওই কণ্ঠ বাজতে থাকে মনের ভেতরে। আজ গান চলাকালীন শব্দ করে গলা খাঁকারি দিলাম দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। গান থেমে গেল। আবার শুরু হলো। আমি সাহসী হয়ে উঠছি ক্রমশ। আমি  ডান হাতটি উপরে তুলে দুইদিকে দোলাতে থাকলাম। তরুণীর কণ্ঠ একটু নিচু হলো। তারপর আমাকে চমকে দিয়ে তরুণীও হাত তুলে দুইদিকে দোলাতে থাকল।

কণ্ঠ দিয়ে শুরু হয়েছিল। বাতাস সে কণ্ঠের সুর নিয়ে এসেছিল আমার কানে। আবিষ্ট আমি সে-সুরের টানে ঘর থেকে বের হয়েছি মধ্যরাতে। এখন দু’জনের দুহাতের ইশারায় রচনা করে ফেলেছি একটি সেতু। এই সেতুটি কী, আমি জানি না। সকালে, বা দিনের বেলায় তাকে দেখলে আমি ঠিক ঠিক চিনব কি-না তাও জানি না। কারণ সুরের কণ্ঠ আর কথার কণ্ঠ তো এক নয়। দিনের সুরের কণ্ঠ আর গভীর রাতের সুরও তো এক নয়। আর আলো আঁধারিতে আমি তার রূপ কতটুকুই বা বুঝতে পারি। শুধু আবছা একটা মুখ। ধবধবে ফরসা লাগে। ব্যালকনির নীল আলোয় মাঝে মাঝে ঝিক ঝিক করে ওঠে চিবুক। তবে টিকালো নাক। এটুকুই। মুখের চারিপাশে কৃষ্ণ-নীল চুল। এটুকুই।

কিন্তু সুরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাতের আলো আঁধারির মাঝে হাতের ইশারায় সেতু নির্মাণ করলেই কি দিনের আলোর কোনো সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায়! মানুষ তো একা না। মানুষ তো পারিবারিক। মানুষ তো সামাজিক।

এই ঘটনা প্রতিদিনই ঘটতে থাকল।

কারণ আমি ভেবে দেখলাম সম্পর্কের এ ধরনের সেতু নিয়ে কীই-বা নির্মাণ করা যায়! এটা দিয়ে তো কোনো কিছু নির্মাণও করতে পারছি না। কিন্তু এটা যে আমার পক্ষে ভাঙাও কঠিন। তাই, না গড়ুক কোনো কিছু, এটুকু যেন না ভাঙে সেটাই এখন চাওয়া।

কয়েকদিন পর অফিসে একটি খবর এল। যেটা রীতিমতো আকাশ ভেঙে পড়ার মতো আমার জন্য। বদলির হুকুম। কর্তৃপক্ষ ট্রেনিং পারফরমেন্সে সন্তুষ্ট হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমাকে দিয়ে হেড অফিসে কাজ করানো হবে। এর মধ্যে আমি হাত ইশারায় তাকে অনেক কিছু বুঝাতে চেয়েছি। কিন্তু সে কিছুই বুঝে না। এত দূর থেকে হাতের ভাষা বুঝাও তো মুশকিল।

তাই সাহস করে ওই বাসায় গেলাম পরদিন।। কলিং বেলে চাপ দিলে এক তরুণী দরজা খুলে দিল। আমি বোঝার চেষ্টা করলাম এই তরুণীই গান শোনাানো আলো আঁধারির মাঝে দেখা ব্যালকনির ওই তরুণী কি-না।  আমি ভাবছিলাস তরুণীও কি এরকমটাই ভাবছে?

কিন্তু আমাকে হতবিহ্বল করে তরুণী এক বিকট চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল।

বাসার ভেতর থেকে তার বাবা মা ছুটে এল। তরুণীকে ধরাধরি করে ভেতরে নেওয়া হলো। আমি কী করব ভেবে পাচ্ছি না। একটু পর তরুণীর বাবা এসে আমাকে খুব অবাক হয়ে দেখতে থাকল। আমি খুব অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। লোকটি আমাকে বলল, ভেতরে এসো।


অবাক করা বিষয় কি জানো? ওর আঁকা ওই ছবিটি ঠিক তোমার মতো দেখতে।


তারপর বলল, ‘কে তুমি?’

‘আমার পরিচয় দিচ্ছি। কিন্তু আমি কী জানতে পারি আপনারা আমাকে দেখে এত অবাক হচ্ছেন কেন? ওই মেয়েটিই বা কেন অজ্ঞান হয়ে গেল?’

‘কে তুমি? তোমার নাম কী? তুমি অহনাকে চিনতে?”

‘না তো! আমি অহনা নামে কাউকে চিনি না।’

‘তাহলে এখানে এসেছ কেন? কার কাছে এসেছ তুমি?’

আমি চুপ করে থাকলাম। এই প্রশ্নের উত্তর কী হবে আমার  জানা নেই।

‘একটু আগে যে মেয়েকে দেখলে সে মোহনা। আমার আরেকটি মেয়ে ছিল। অহনা।’

‘অহনা কোথায়?’

‘অহনা নেই।’ কণ্ঠ ধরে এল ভদ্রলোকটির। ‘সে আত্মহত্যা করেছে।’

‘কেন!!’

তা আমরা কেউ জানি না। উচ্ছল চঞ্চল মেয়েটি এরকম করতে পারে আমরা কেউই ভাবতে পারি নি। এত সুন্দর গান করত! ওই ব্যালকনি তার এত প্রিয় ছিল! এত সুন্দর আঁকত!’

‘আমরা অনেক চেষ্টা করেছি ওর আত্মহত্যার কারণ বের করতে। ওর ব্যক্তিগত যা যা ছিল সব বিশ্লেষণ করেছি। মোবাইল ফোন। ডায়েরি। গানের খাতা। আঁকাআঁকি।’

‘একটা পেইন্টিং পেয়েছি। এক যুবকের ছবি। অবাক করা বিষয় কি জানো? ওর আঁকা ওই ছবিটি ঠিক তোমার মতো দেখতে।’

‘অহনা চলে যাবার পর থেকেই মোহনা বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। সে কথা বলতে পারছে না। ছবিটার সাথে তোমার এত মিল! এজন্য সে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। সত্যি করে বলো তো কে তুমি?’

‘আমি এরকম কাউকে চিনি না। আমি খুব অবাক হচ্ছি। খুব বিস্মিত হচ্ছি।’

‘তাহলে বলো কে তুমি। তুমি এখানে কেন এসেছ।’

বিস্ময়ের চূড়ায় তখন আমি। কী বলব ভেবে পাচ্ছি না। তখনই মোহনা দরজায় এসে দাঁড়াল। অশ্রু বিস্ফারিত চোখ। হাতে মোহনার আঁকা পেইন্টিং। আমি ছবিটার দিকে তাকালাম। তাকিয়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালাম। অবিকল আমার মতো দেখতে ছবিটা। খুব পাকা হাতের আঁকা নয়। তবুও বোঝা যাচ্ছে, ছবিটা যেন আমারই।

মোহনা হঠাৎ বলে উঠল, ‘আপনার নাম কী?’

আমি বললাম, ‘কবির’।

মোহনার চোখ আবার বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হয়ে উঠল। তার হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেল।

এমরান কবির

জন্ম ০৫ এপ্রিল ১৯৭৯; সার্টিফিকেটে ০৯ নভেম্বর ১৯৮০। জন্মস্থান বগুড়ার কৃষ্ণপুরে।

শিক্ষা : রসায়ন শাস্ত্রে অনার্স-মাস্টার্স, এবং মার্কেটিং-এ এমবিএ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : অধুনালুপ্ত দৈনিক আজকের কাগজ-এ সাব-এডিটর হিশেবে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবনে প্রবেশ। বর্তমানে একটি অসরকারি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়ায় কর্মরত।

সম্পাদনা : ছোটকাগজ থার্ডম্যাগ, সেন্ট্রাল জেল, পরিধি।

প্রকাশিত গ্রন্থ :

কী সুন্দর মিথ্যাগুলো [কাব্যগ্রন্থ, ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ]
নিদ্রাগহন মহাশূন্যে [গল্পগ্রন্থ, ২০১২, ঐতিহ্য প্রকাশনী]
পালকভরা সূর্যাস্ত [কাব্যগ্রন্থ, ২০১৩, গদ্যপদ্য প্রকাশনী]
আমি লিখেছি এইসব, আমি লিখি নাই [গদ্যগ্রন্থ,২০১৪,বাঙলায়ন]
নীল বোতাম [উপন্যাস, ২০১৬, বেহুলাবাংলা]

পুরস্কার ও সম্মাননা :
জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার, ২০১০।
পাঠকপণ্য পাঠশালা সম্মাননা, ২০১২।

ই-মেইল : kobir_bangladesh@yahoo.com

Latest posts by এমরান কবির (see all)