হোম গদ্য গল্প চন্দ্রাহত প্রহরে লোকটা

চন্দ্রাহত প্রহরে লোকটা

চন্দ্রাহত প্রহরে লোকটা
554
0

১.
বদলে গেছে দৃশ্যপট! শহরের চৌরাস্তার মোড় কিংবা বিজ্ঞাপনের আলো ভরা এভিনিউ আর নেই এখানে। এখন সামনে ছোটখাটো একটা বক্স কালভার্ট। যার নিচ দিয়ে বয়ে চলা খালের পানিতে জোয়ার এসেছে। আর সাথে সাথে নেমেছে চাঁদোয়া। সন্ধ্যা নেমেছে কিছুক্ষণ হল। উপরে তাকাতেই লোকটা দেখতে পেল কালো আকাশে মুখ উঁচু করে আছে ফ্যাকাসে হলুদ চাঁদ।

কেমন এক অশ্লীল সন্ধ্যা, অসভ্যের মতো অন্ধকার বিছিয়ে দিয়েছে। সেই অন্ধকার তাকে নিয়ে মশকরা করছে; আর ঐ উটকো হলুদ চাঁদটা ভেংচি দিচ্ছে ওর দিকে।

লোকটা এরকম আবোল-তাবোল ভেবে চলেছে। আসলে এখন তার মাথা ঠিক কাজ করছে না। করার কথাও না। আপনারা খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যদি তার দিকে একটু খেয়াল করে দেখেন। মুখমণ্ডলে শুকিয়ে শক্ত হয়ে লেগে আছে কালচে রক্ত, সেই সাথে পরনের শার্টটাতেও। হাতে একটা বড়সড় চাপাতি, ওতেও রক্ত। আর এই অবস্থাতেই সে দৌড়াচ্ছে, অসংলগ্ন। তার এক পায়ে স্যান্ডেল আর আরেক পায়ে যে নেই, সেদিকে ভ্রুক্ষেপের সময় পায় নি সে। অবশ্য যার পা থেকে মাংস ছিলে নেমে গেছে, আর রক্ত ঝরছে অবিরত—তার পায়ে স্যান্ডেল আছে কি নেই তাতে কিছু যায় আসে না।

লোকটা দৌড়াচ্ছে, একটা অব্যক্ত ভয় ওর শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত তুলে দিচ্ছে।

আচ্ছা এটাকে কি ভয় বলা চলে? না না…ঠিক ভয় নয় আসলে, আতঙ্ক। হ্যাঁ এই শব্দটাই ওর এখনকার অবস্থাটা ঠিক করে বোঝায়। প্রাণ হাতে নিয়ে যারা দৌড়ায় তারা মাথা ঠিক রাখতে না পারলে মুখ থুবড়ে পড়ে। এই লোকটার বেলায়ও তাই হলো। বক্স কালভার্ট এ উঠতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ল। যদি সে এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করত তবে ‘চাঁদের আলোয় রক্তময় যুবকের লাশ’ এমন শিরোনামে সংবাদ আসতে পারে স্থানীয় পত্রিকায়। নাহ, এত আবেগময় ভাষায় কবিতা হয়, সংবাদের শিরোনাম নয়। শিরোনাম হয়ত হতে পারত ‘পেয়ারগঞ্জ বক্স কালভার্টে যুবকের লাশ’।

২.
এখন দুপুর। এই দুপুর শহরের, যার পেটে লুকিয়ে আছে অনেক অনেক কথা ও অকথার অগ্রন্থিত ইতিহাস। এখানেও আমাদের সাথে আছে লোকটা। শহরটির বর্ণনা দেয়া যাক। শহরের বাড়িগুলো ছোট-বড়, আধা কাঁচা রঙ আর রাস্তা অপ্রশস্ত। রাস্তায় প্রচুর ধুলোর খেলা, প্রয়োজনহীন অজস্র বাঁক, কিছু স্থবির গাড়ি পড়ে থাকে যানজটে—ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কিন্তু মোটর বন্ধ হয় না। অন্যদিনের চেয়ে আজ দুপুরে রাস্তায় গাড়ির সারি দীর্ঘ হয়েছে, কারণ বেশ বড়সড় মিছিল যাচ্ছে। বিরোধীপক্ষও মিছিলের জন্য তৈরি, তাদের একটা বড় ধরনের শো ডাউন দরকার। আজকাল ওদের কর্মসূচি নিয়ে লোকে হাসাহাসি করে, বিশ্বাস করতে চায় না একসময় এই দলটা ছিল দেশের সবচেয়ে বড় দল। তাই তারা ঘোষণা দিয়েছে যেভাবেই হোক—মিছিল চলবে। সরকারি অনুমতির তোয়াক্কা করছে না তারা। পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করেছে, তবুও দুপক্ষই মিছিল নামাবার কথা বলেছে। এই মিছিলে অবধারিত ভাবেই সে আছে। সুবিধাজনক পক্ষেই আছে। ভাড়া করে আনা হয়েছে। আজকের মিছিল অনেকের চোখেই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

‘হইতেই হইবো, যেইখানে আমাকে আনছে লাশ ফেলানের লাইগা সেই মিছিল গুরুত্বপূর্ণ না হইয়া কী উপায়’ লোকটা ভাবে। ভেবে একটা প্রশান্তির হাসি দেয়।

অনেক টাকার বায়নায় তাকে আনা হয়েছে। একদম খোলামেলা কথা হয়েছে—যে কটা লাশ পড়বে তার ভিত্তিতে টাকা। দুতিন মাস গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। দেশও ছাড়তে হতে পারে, তেমন পরিস্থিতি হলে কী করতে হবে পার্টি আগেই ঠিক করে রেখেছে। নালিতাবাড়ি বন্দরের কাছে এক গ্রামে ব্যবস্থা করে রেখেছে, বর্ডার পার করে দেবে ওদের দালালরা।

লোকটার হাতে একটা বড়সড় চাপাতি আর একটা ছোরা আছে পকেটে গোঁজা আর অন্যদের হাতে লাঠিসোটা, গজারি এইসব। উল্টোদিকের রাস্তা থেকে আসছে আখলাক পার্টির মিছিল। ওদের মিছিল আগাতে দেখে লোকটার রক্তে উত্তেজনা খেলা করতে শুরু করে। সে গলা খাঁকিয়ে বলে ওঠে—

প্রস্তুতি কেমন ওগো জানা নাইকা, তয় মন কইতাছে খেলা হবে।

এক্কারে জমজমাট খেলা। হা হা হা, জম জমাট। যম জমাট, সব কয়টারে পিডায়া যমের বাড়িতে পাডামু; যেন ওইখানে গিয়া সব কয়টার লাশ মিছিল করে। কী কন ভাইয়েরা…

লোকটার কথায় সায় দেয় মিছিলের বাকিরা। একটা জোশ চলে আসে সবার মাঝে। এমন নেতাই দরকার মিছিলে। লোকটা ভাবছে অনেকদিন মজা দেখা হয় না। শরীর কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। পেশাদার খুনিদের জন্য ছয়মাস অনেক বড় বিরতি।

৩.
আখলাক পার্টির আজকের মিছিলের আকার অন্য যে কোনো সময়ের চাইতে বড়। আজ ওদের সাথে যোগ দিয়েছে ছাত্রসংঘের ছেলেরাও। ওদের লাল পতাকা আর আখলাক পার্টির সবুজ পতাকা এক সাথে দেখা যাবে তিন চার বছর আগেও কল্পনা করা ছিল কঠিন। পূর্ব আর পশ্চিম কেমন করে মিশে এক হয়ে যায় এ শহরে না এলে কেউ বুঝতে পারবে না। ওরা মিছিলে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছে—

‘জনতা সংঘ নিপাত যাক,
পাশের দেশে গিয়ে ঘুমাক’।

মিছিলের উল্টোদিকে সরকারি দলের উদ্যমী ছেলে-ছোকরাদের মুখ চোখ কেমন লাল হয়ে উঠছে। ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া শুরু হয়ে গেল। এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষি-লাথি দেখেই লোকটার মধ্যে কী এক জোশ চলে এল। সে চাপাতি চালাতে শুরু করল। কোপ দিচ্ছে একের পর এক।

এলোপাথাড়ি। ইচ্ছেমতো। যেখানে সেখানে।

রক্তের ধারা পিচ ঢালা পথে গড়িয়ে পড়ছে।

ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে ওরা। এমন সাড়াশি আক্রমণ হবে ভাবতে পারে নি ওরা।

প্রস্তুতি ছিল না তেমন। দাঙ্গাপুলিশ আর র‍্যাব সামলেই সময় পায় নি ওরা। তাই যে যেদিক পারে ছুটতে শুরু করেছে। জনতা সংঘের লোকেরা পিছনে ছুটতে লাগল। ধাওয়া দিয়ে প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে দিল।

‘শালার বাইনচোত, দাঙ্গা-পুলিশগুলান লাঠিতে ভর দিয়া গোঁয়া ভরাইতাছে, আমগো পাহারা দিতাছে, বিরাট দেশসেবা করতাছি আমরা’ লোকটা মনে মনে ভাবে আর হাসে। একটু পরে সামনে আরেকজনকে পেয়ে কোপ দিয়ে বলে ওঠে ‘জয় জনতা সংঘ’।

৪.
‘এখনতরি এলোপাথাড়ি যে কয়টারে কোপাইছি, কোনো হালার পুতের কি মরণের কতা? মনে অয় না। দুই একটা মাস-দুই বিছনায় পইড়া থাকত, তয় মরত না।’

মাথায় এমন চিন্তাই ঘুরছে লোকটার। বেশ কয়েকজনকে কুপিয়ে হাত নিশপিশ করছে শেষ দানটা দেবার জন্য। ওরা এত সহজে ছত্রখান হয়ে পালিয়ে যাবে ভাবতেও পারে নি সে।

প্রবল ঘৃণায় একটা লোকের পিছু নিয়েছে সে। তাড়া খাওয়া লোকটা এত ভয় পেয়েছে যে চেঁচিয়ে সাহায্য চাইতেও ভুলে গেছে। যেন ওকে তারা করেছে শ্বদন্ত উঁচু করা কোনো বাঘ। দৌড়াতে গিয়ে চটিজুতা পা থেকে খসে পড়ল আর তাতে পায়ের তালু কিছুটা কেটে গেল দৌড়াতে গিয়ে। ওসবের তোয়াক্কা না করেই সে দৌড়াচ্ছে। আর তা খুবই যুক্তিসংগত যেহেতু তাড়া করা লোকটার চাপাতিটা মাথায় পড়লে মাথার ঘিলু বের হয়ে যেতে পারে।

লোকটা নিজেকে শিকারি ভাবছে। আগের যুগে যারা বাঘ সিংহ মারত তারা হতো খ্যাতিমান শিকারি। কিন্তু মানুষ মেরে কী যে আনন্দ, মানুষের রক্তের স্বাদ যে পায় নি কোনোদিন সে বুঝবে না। বোকা বাঘেরা জানে না মানুষের রক্তের স্বাদ সবচেয়ে বেশি, জানা থাকলে মানুষই হতো বাঘের খাবার, হরিণ নয়।

বেশ কয়েকটা অলিগলি পার হয়ে সামনে একটু চওড়া রাস্তার ধারে এসে তাড়া খাওয়া একটা ইটে পা বাঁধিয়ে উশটা খেল। কপাল ফেটে রক্ত নেমেছে ছেলেটার। একটা গাছতলায় সে ধরা পড়ল লোকটার থাবায়।

ওর চোখেমুখে ভয়, রক্ত আর ঘৃণা মিলেমিশে এক অদ্ভুত অভিব্যক্তির জন্ম দিয়েছে। ভালো করে তাকিয়ে লোকটা বুঝতে পারল ও আসলে অল্পবয়স্ক একটা ছেলে। উদভ্রান্তের মতো দৌড়োবার সময়েও ঝোলা ব্যাগটা হাতে ধরে রেখেছে। ব্যাগে ছাত্র-সংঘের লিফলেট। ছেলেটার করুণ আর্তি—

‘ভাই, আমারে মাফ কইরা দেন ভাই। ভাই, আমারে ছাইড়া দেন। মা বাসায় একলা, আমি ছাড়া কেউ নাই তার। ভাই আপনে আমার ধর্মের ভাই লাগেন ভাই।’

‘আহ, এক কথা বারবার বলিস না তো।’ বিরক্ত লোকটার জবাব। ‘আমার কোনো ধর্মটর্ম নাই। আমার ধর্ম খালি টাকা। যে আমারে টাকা দেয় আমি তার হইয়া জান নেই। চিন্তা কইরা দ্যাখ, বছর তিনেক আগে আখলাক পার্টি আমারে বায়না করল জনতা সংঘের গাজিবাড়ির এমপি সোলেমান মাস্টররে খুন করার লাইগা। লাশ গলা কাইটে জলারপাড়ের বটগাছে ঝুলাইয়া দিছিলাম। কেউ কোনো বাল ফালাইতে পারল না। হরতাল হইল, গাড়ি পুড়ল, আমি রয়া গেলাম আমার মতন। আর অহন ওরাই আমারে বায়না কইরা আনছে আজকের মিছিলে লাশ ফালানোর লাইগা। তোর কপাল খারাপ, তুই আমার হাতে পড়ছস। তোর জানের টাকা অর্ধেক আমারে দেয়া হইয়া গেছে, বাকিটাও দিয়া দিবে তুই খালাস হইলে।’

৫.
ছেলেটা বুঝতে পারছে ওর সময় ঘনিয়ে এসেছে। ওর কণ্ঠে কাতর অনুনয় শোনা যায়—

‘ভাই আমি পার্টির কেউ না ভাই। আমি একটা সাধারণ ছাত্র। বাহারুল কলেজে পড়ি। গতবছর ঢুকছি কলেজে। বড় ভাইয়ের কথায় মিছিলে আইছি ভাই। আপনার পায় ধরি ভাই আমারে ছাইড়া দেন।’

ছেলেটা নিজের প্রাণ বাচাতে লোকটার পায়ে হাত দিতে গেল। ওর বুক বরাবর কষে এক লাথি বসাল লোকটা। এরপর ওর পা বরাবর এক কোপ বসিয়ে দিল। ওর ডান পায়ের মাংস অনেকটা কেটে নেমে গেল।

চিৎকার দিয়ে সে বসে পড়ল ফুটপাথে। এরপর আরেক কোপ বসালো ওর তলপেটে।

নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে এল। আর ফিনকি দিয়ে রক্তের দমক…

এতক্ষণ যে মুখটা থেকে ঘৃণা-মিশ্রিত অনুনয় বের হয়ে আসছিল সে বদলে গেল একেবারে। এখন তার মুখে আর কান্নার ছাপ নেই। অকস্মাৎ কেমন বদলে গেল পাশার দান। ছেলেটার এতক্ষণে মরে যাবার কথা কিন্তু মরে যাবার বদলে লোকটার দিকে চেয়ে হাসছে।

শুধুই হাসছে।

ভীষণ অবজ্ঞার হাসি।

অট্টহাসি।

পেট দুলিয়ে দুলিয়ে হাসছে।

আর ফিনকি দিয়ে দিয়ে রক্ত এসে পড়ছে লোকটার মুখমণ্ডলে আর শার্টটাতে।

অসহ্য বোধ হতে লাগল লোকটার। ওর হাসি থামাতে ঘাড় বরাবর দিল এক কোপ। ওর কল্লা নেমে গেল, গড়িয়ে পড়ল রাস্তার পাশের নর্দমায়। তবুও ওর হাসি বন্ধ হলো না। লোকটা চলে যাবার জন্য ঘাড় ঘোরাতেই তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল—

‘ভাই মাইরাই তো ফেলছেন, এত তাড়াহুড়া করেন ক্যান? কবরে যাওনের আগে একটু গফসফ কইরা লই। কত টাকার লাইগা আমারে মারলেন কন দেখি…’

লোকটা কেমন একটু ভয় পাচ্ছে বলে মনে হলো। সে নিজেকে অবশ্য ভয়ডরহীন বলে দাবি করে।  আর তার ইতিহাস যদি কারো জানা থাকে তবে যে কেউ ওর সাথে একমত হবে। নয় বছর বয়সে গঞ্জের হাটে ছোরা ঠেকিয়ে মণ্ডল ব্যাপারীকে ছিনতাই করে সে। এরপর শহরে পালিয়ে এসে অন্ধকারের খানাখন্দ ভরা অলিগলি ঘুরে এসে আজকের ভাড়াটে খুনি। খুনে হাতেখড়ি যার আঠারোর আগেই তার ভয় থাকাই অস্বাভাবিক।

ছেলেটার কাটা মুণ্ডু বিশ্রী করে হাসছে। ওর রক্তাভ মুখের হাসি দেখে কেমন গা গুলাচ্ছে লোকটার। দৌড় দিতে শুরু করতেই নালায় পড়ে থাকা মুখটা আবার নড়েচড়ে উঠল—

‘আরে আরে কই যান। যাইবার আগে রক্তটা ধুইয়া পরিষ্কার কইরা নেন। পুলিশ না ধরলেও পাবলিকে ধরবার পারে। টিভিতে খবর উঠলে ক্রসফায়ারেও দিয়া দিতে পারে। জামা আর মুখটা মুইছা লন। নাইলে ধরা খাইবেন।’

কোনো দিকে না তাকিয়ে লোকটা দৌড় দিল। চাপাতিটা ফেলতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। ওটা হাতে লেগে আছে, ঠিক যেন হাতেরই বর্ধিত অংশ। দৌড়ে সামনের গলিতে গিয়ে সে দেখে চেনা কণ্ঠস্বর আবার ডাকছে—

‘ভাই, কেন মারলেন, কত টাকায় বায়না করলেন কিছুই তো কইলেন না। কিন্তুক কারে মারলেন এইডা তো দেইখা যান। আমার চেহারাখান ভুইলেন না। আপনের লগে আমার দেখা হইব আবার। যে কোনো রাইতে, বদ খোয়াবের সময়।’

আতঙ্কিত লোকটা ফিরে তাকায় নালার দিকে। প্রায় রাতেই বদ খোয়াবে ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে জেগে ওঠে সে। কাটা মুণ্ডুটা কী করে জানল ভেবে পায় না লোকটা।

মাথাটা এখনো হাসছে।

অট্টহাসি। পিত্তি জ্বলানো হাসি।

অবাক কাণ্ড! চেহারাটা কেমন বদলে গেছে মনে হচ্ছে লোকটার। ঠিক যেন নিজেকেই দেখতে পেল সে। সেই চোখ, সেই নাক সেই ঠোঁট—যেন নিজেকে আয়নায় দেখা। অবশ্য সাথে একটা জিনিস বেশি আছে, তা হলো রক্ত। সারা মুখে লেপটে আছে রক্ত।

৬.
পড়ে যাবার পর ধাতস্থ হয়ে মুখ উঁচু করেই খালের পানিতে চাঁদের ছায়া দেখতে পেল। উঠে গিয়ে খালের জলে মুখ ধোয়ার চেষ্টা করল। জামাটাও খুলে নিল। জামাটা খুলতে যাবার আগে হাত ঝাড়া দিয়ে চাপাতিটা ফেলতে চাইল হাত থেকে। কিন্তু পারল না। হাত থেকে কিছুতেই ফেলতে না পেরে ঐ অবস্থাতেই শার্ট খুলে নিল। একধার ধরে ছিঁড়ে গেল বেশ খানিকটা।  মুখে যেই জলের ঝাপটা দিতে যাবে অমনি ওর চোখে পড়ল সেই কাটা মাথাটা। বিকট হাসি দিচ্ছে। খালের জলে কাঁপন তুলছে রক্তাভ কাটা মুণ্ডুটা। সে হেসে হেসে বলছে—

‘ভাইজান, পালাইলেন কেন ? আমার থেইকা পালাইতে পারবেন না তো। আমি তো আপনেই। নিজের থাইকা কি আপনে পালাইতে পারবেন? ভাল কইরা চাইয়া দেহেন, পায়ে কোপ দিছিলেন। আপনের পায়েও তো মাংস নাই, নালি কাইটা ফিনকি দিয়া রক্ত নামছে।’

লোকটা পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে সত্যিই পায়ের এক অংশে মাংস খসে পড়েছে। হাড় বেরিয়ে গেছে। আ করে চিৎকার দিতেই তলপেটের কাছে চাপ লাগল। বেরিয়ে এল তাবৎ নাড়িভুঁড়ি। রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল খালের জলে।

‘আরে, চিৎকার দেন কেন? আপনে যখন কোপ মারলেন তহন কী শুনশান কোপ খাইছি! একটুও চেঁচাই নাই। আপনে কানতেছেন, দেইখা হাসি আসতেছে। এহনো তো আপনেরে আসল খবরডা দেই নাই। খবরডা জবর। শুনোনের পরে আপনের জবান বন্ধ হইয়া যাইব। গলায় হাত দিয়া দেহেন আপনের মাথাডা যেই জায়গায় থাকনের কথা সেই জাগায় নাই।’

সে গলায় হাত দিয়ে দেখে তার ধর থেকে আলাদা হয়ে গেছে মুণ্ডুটা। কোথায় গড়িয়ে পড়েছে এই দুশ্চিন্তায় কাঁদতেও ভুলে গেছে লোকটা। সে হাত বাড়িয়ে খুঁজতে শুরু করল কাটা মাথাটাকে। জলের মাঝ থেকে বলে উঠল অট্টহাসিরত মস্তকটা—

‘এই দিকে আসেন, পানির দিকে। ঘাসের ঐদিকে কিছু নাই। আপনের যা থাকনের সব আছে আমার কাছে। আমিই তো আপনে।’

এপাশ থেকে লোকটার কাটা মাথাটা ওকে সাবধান করার চেষ্টা করছে আর ডাকছে—

‘যাইস না মাদারচোত, ওদিক না, এদিক আয়। হাউয়ার নাতি, তোর কল্লা এইদিকে।’

অথচ কিছু বলতে পারল না সে। বলা ভালো, সে নয়, তার মুণ্ডুটা। ধীরে ধীরে জলের দিকে আগাচ্ছে লোকটা। ওদিকে রক্ত ছড়িয়ে যেতে শুরু করেছে খালের জলে। আর চাঁদের হলদে আভাও শাদা হতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণ পরেই হয়তো ধুয়ে যাবে এই লাল-হলুদের খেলা, থেকে যাবে শুধু শাদাকালোর অনিঃশেষ অন্ধকার। আর থাকবে চন্দ্রাহত সেই লোকটা, যে খালের পানিতে কবন্ধ হয়ে খুঁজে যাচ্ছে তার হারানো কাটা মুণ্ডু!

রেজওয়ান তানিম

রেজওয়ান তানিম

জন্ম ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭, বরিশাল। বুয়েট থেকে পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছেড়েছেন। বর্তমানে জার্মানির টি ইউ ফ্রাইবার্গ-এ অধ্যয়নরত।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
শাদা পরচুল অন্ধকার [অনুপ্রাণন, ২০১৪]
মৌনমুখর বেলায় [জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ২০১২]

গল্প—
অবন্তি [ভাষাচিত্র, ২০১২]

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শাহবাগের সাথে সংহতি [ই-বুক, ২০১৩]
আন্তর্জাতিক কবিতা সংকলন ‘In Praise-In Memory-In Ink’‘In Our Own Words’ ‘Heavens above, poetry below’, [Blurb Publication, Canada, ২০১৩, ২০১৪]

সম্পাদিত পত্রিকা—
লিপি (২য় ও ৩য় সংখ্যা), ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্রিকা 'অনুপ্রাণন'

ই-মেইল : rezwan.tanim@gmail.com
রেজওয়ান তানিম