হোম গদ্য গল্প ঘুমতৃষ্ণা

ঘুমতৃষ্ণা

ঘুমতৃষ্ণা
713
0

ভুতের গলির সায়কা শারমিনের সাথে মালিবাগের মাহবুব আলির ঘুমাতে চাওয়ার পেছনে একটা গল্প আছে। মাস চারেক আগে, ফাল্গুনের পয়লা দিকে, ফকিরাপুলের এস.এন. ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরসে একটা জরুরি কাজে যেতে হয়েছিল মাহবুব আলিকে। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী মাহবুব আলি মতিঝিলের ইউনিক ট্রেডার্সের একজন সিনিয়র মার্চেনডাইজার। মাহবুব আলিদের কোম্পানিটা মূলত তুরস্ক থেকে শ্যাম্পু, সাবান, ফাউন্ডেশন, ব্লাশ অন, মাসকারা, লিপস্টিক, নেইলি পোলিশ, ডিওডোরেন্ট স্প্রে, ময়শ্চারাইজার ইত্যাদি বিভিন্ন প্রসাধনসামগ্রী আমদানি করে থাকে। তাই তাদের কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে প্রায়শই নানান কাজে ইস্তানবুলে যেতে হয়। ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং তার একজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর জন্য ঢাকা-ইস্তানবুল-ঢাকা রুটের এক্সিকিউটিভ ক্লাসের দু’টো টিকিটের বুকিং দিয়েছিল মাহবুব আলি। ই-মেইল এবং ফোনেই বুকিংয়ের কাজটা সে সেরে ফেলেছিল। তবে ক্যাশ পেমেন্ট করে টিকিট আনতে তাকে সশরীরেই যেতে হয়েছিল ফকিরাপুলের ট্রাভেল এজেন্সিটার অফিসে। ভুতের গলির সায়কা শারমিনের সাথে ট্রাভেল এজেন্সির অফিসেই পরিচয় ঘটেছিল মাহবুব আলির। সেখানেই রিসেপশনিস্ট হিশেবে কাজ করে সায়কা শারমিন।

প্লেনের টিকিট সংগ্রহের জন্য সেদিন ভরদুপুরে শাপলা চত্বর থেকে হেঁটে হেঁটে ফকিরাপুল গিয়েছিল মাহবুব আলি। রাস্তায় গাদাগাদি মেরে ধীর গতিতে তখন হাইকোর্টের দিকে যথারীতি এগিয়ে চলেছিল বাস, কার, রিকশা, টেম্পো, ভ্যান এবং ঠেলাগাড়ি। সেই যানজটের ভেতরে ফকিরাপুল যাওয়ার জন্য রিকশাতে চাপার কোনও মানে ছিল না। বাস্তবতা এই যে, রিকশা নিয়ে ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে ঠেলে ফকিরাপুল পর্যন্ত যাওয়ার আগেই সে পায়ে হেঁটেই পৌঁছে যাবে ট্রাভেল এজেন্সির অফিসে। এমন একটা বিবেচনা থেকে সে তার অফিস থেকে বের হয়ে সোজা হাঁটা দিয়েছিল ফকিরাপুল বরাবার।


মতিঝিল এলাকার রিসেপশনিস্টরা সাধারণত এমন পোশাকি বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকে। রেডিও-টেলিভিশন ছাড়া এমন পোশাকি ভাষা আর কোথাও শোনা যায় না।


ফাল্গুন মাসের রৌদ্রের তাপ তীব্র হয়ে পড়াতে মাহবুব আলির তামাটে শরীর পুড়ে যাচ্ছিল যেন! তদুপরি সে বেশ ঘামছিল। এসব কারণে ভয়ানক মেজাজ খারাপ হচ্ছিল তার ট্রাভেল এজেন্সির রিজারভেশন ডেস্কের কর্মকর্তা মোস্তফা কামালের ওপরে। মাহবুব আলির মনে হচ্ছিল, তার ওপরে চরম অন্যায় করেছে মোস্তফা কামাল! কোনও একজন পিওনটিওন দিয়ে মোস্তফা কামাল মাহবুব আলিদের মতিঝিলের অফিসে প্লেনের টিকিট দুটো পাঠিয়ে দিলেই পারত! সেই বাহকের হাতেই টিকিট ক্রয় বাবদ প্রয়োজনীয় টাকাটা বুঝিয়ে দেয়াটাই সবচাইতে সুবিধেজনক সমাধান ছিল! কার্যত তা আর হয় নি। উল্টো কিনা লাঞ্চ না-করেই রোদের ভেতরে হেঁটে হেঁটে অন্যের ভ্রমণের পথ সুগম করার জন্য টিকিট সংগ্রহ করতে ফকিরাপুল যেতে হচ্ছে তাকে! লাঞ্চ আওয়ার ছাড়া অফিসের বাইরে যাওয়ার সময়টা কোথায়?

অফিস থেকে বের হওয়ার আগ-আগ দিয়ে মোস্তফা কামালকে ফোন করে মাহবুব আলি বলেছিল যে সে রওয়ানা দিচ্ছে; পনের মিনিটের ভেতরেই পৌঁছে যাবে মোস্তফা কামালদের ট্রাভেল এজেন্সির অফিসটায়। মোস্তফা কামাল যেন তার জন্য অপেক্ষা করে! কিন্তু অফিসটাতে ঢুকতে ঢুকতে মোস্তফা কামালকে ফোন করে দেখা গেল, তার জন্য অপেক্ষা করে নি মোস্তফা কামাল। লাঞ্চ করতে সে বেরিয়ে গেছে কোথাও! কাজেই মেজাজ চড়ে গিয়েছিল মাহবুব আলির। তবে ট্রাভেল এজেন্সির অফিসটার রিসেপশনে মোস্তফা কামালের ফিরে আসার অপেক্ষাতে ঠায় বসে থাকা ছাড়া তার আর কোনও গতি ছিল না।

মোস্তফা কামালের ফিরতে বিলম্বই হচ্ছিল। হতাশ হয়ে রিসেপশনের সোফায় মাথা নিচু করে বসেছিল মাহবুব আলি। এভাবে মিনিট বিশেক অতিক্রান্ত হওয়ার পরেই সে নারীকণ্ঠের আওয়াজ শুনতে পায়। কোনও একজন নারী কাউকে জিজ্ঞাসা করছে, ‘কাকে খুঁজছেন আপনি?’

সেই আওয়াজ লক্ষ করে মাথা তুলে তাকিয়ে মাহবুব আলি দেখতে পায়, তার দিকেই সপ্রশ্নে তাকিয়ে আছে ট্রাভেল এজেন্সির রিসেপশনিস্ট। সুন্দর মুখশ্রীর মেয়েটার বয়স তিরিশের কাছাকাছি হবে। তার সুগঠিত ভুরু জোড়ার নিচে বসে আছে পটে আঁকা চোখ। তার চোখের মণি থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে হাজার সূর্যের উজ্জ্বলতা। পরে মাহবুব আলি জেনেছিল যে সেই মেয়েটার নাম সায়কা শারমিন। উত্তর ধানমন্ডির ভুতের গলিতে ভাড়া থাকে তারা। সায়কা শারমিনকে সেই প্রথম দেখেছিল মাহবুব আলি।

সায়কা শারমিনকে মাহবুব আলি বলেছিল, মোস্তফা কামালের জন্য অপেক্ষা করছে সে। সায়কা শারমিন নিস্পৃহ কণ্ঠে তাকে জানিয়েছিল যে লাঞ্চ করতে বাইরে গেছে মোস্তফা কামাল। জলদিই ফিরে আসবে সে। মাহবুব আলি না-হয় কষ্ট করে একটু বসুক! সেই তথ্যের প্রেক্ষিতে সায়কা শারমিনকে অবশ্য কোনও প্রতিক্রিয়াই জানায় নি মাহবুব আলি। সে চুপ করেই ছিল। তার কারণও আছে। সায়কা শারমিন তো আর তাকে নতুন কোনও তথ্য দেয় নি! তাছাড়া মুখ খুললে তখন দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্য সায়কা শারমিনের কাছে মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে হয়, মোস্তফা কামাল এবং তার পরিবারের সকলকে জড়িয়ে খিস্তিও দিতে হয়! কিন্তু মাহবুব আলির শরীরে সেই মুহূর্তে তেমন কোনও শক্তি ছিল না। ভয়ঙ্কর ক্ষিধে লেগেছিল তার। লাঞ্চ না-করেই দুপুরের সেই সময়টায় সে বের হয়েছিল তার মতিঝিলের অফিস থেকে। আর তার গলা শুকিয়ে গিয়ে সেখানে জেগেছিল মাইলকে মাইল পদ্মার চর।

এক মিনিট যেতে না-যেতেই আবারও বেজে উঠেছিল সায়কা শারমিনের রিনরিনে কণ্ঠস্বর। সায়কা শারমিন মাহবুব আলিকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘ঠান্ডা কোকাকোলা দেই আপনাকে, ভাইয়া? অথবা ঠান্ডা পানি? এয়ারকুলারের ভেতরে বসেও আপনি তো দেখি দরদর করে ঘামছেন!’ কোনও আঞ্চলিকতার টান ছাড়াই কথা বলছিল মেয়েটা। মতিঝিল এলাকার রিসেপশনিস্টরা সাধারণত এমন পোশাকি বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকে। রেডিও-টেলিভিশন ছাড়া এমন পোশাকি ভাষা আর কোথাও শোনা যায় না।

মতিঝিল এলাকায় মার্চেন্ডাইজিং, অ্যাকাউন্টস, সেলস ইত্যাদি পেশায় যারা ছোটখাট চাকরি করে তাদের বেশভূষা, চোখের চাউনি এবং কথা বলার ধরন দেখেই সহজেই তাদেরকে চিহ্নিত করা যায়। সেখানে দারিদ্রের ছাপ থাকে; অবদমন, গ্লানি এবং কুণ্ঠারর চিহ্ন থাকে। তখন কোনও অফিসের রিসেপশনে অপেক্ষারত তেমন কাউকে জিন্দেগিতেও কোকাকোলা বা চা সাধা হয় না। অনুরোধের প্রেক্ষিতে তৃষ্ণার্তদেরকে কেবল লাইনের পানি খেতে দেয়া হতে পারে—বোতলজাত পানি মোটেই নয়। কাজেই সায়কা শারমিনের প্রস্তাব শুনে চমকে উঠেছিল রিসেপশনের সোফায় বসে থাকা মাহবুব আলি। জানলা থেকে পলায়নপর দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে সে ফের তাকিয়েছিল সুন্দর মুখশ্রীর সায়কা শারমিনের ডাগর দু’চোখে। মেয়েটার দু’চোখে, উজ্জ্বল মণি পেরিয়ে, লুকিয়ে ছিল বিষণ্নতা আর ক্লান্তি। মাহবুব আলির কাছে তেমনটাই মনে হয়েছিল।

একজন বিষণ্ন মানুষ আরেকজন মানুষের চোখে ঝুলে থাকা বিষণ্নতা পড়তে পারে সহজেই, ধরতে পারে ক্লান্তির ছাপটুকু। সেটাই স্বাভাবিক। কাজেই সেই মেয়ের চোখ পড়তে মোটেই কষ্ট হয় নি মাহবুব আলির। মাহবুব আলির মনে তখন প্রশ্ন জেগেছিল : আশ্চর্য! এই মেয়েটার চোখে এত বিষণ্নতা আর এত ক্লান্তি জমে আছে কেন? আর কেনই-বা মেয়েটার মুখমণ্ডলে এত কাঠিন্য অনড় হয়ে বসে আছে? কী ব্যাপার? মেয়েটার ঘুম হয় না নাকি ঠিক মতো? মাহবুব আলি নিজেও তো তার জীবন নিয়ে বড় ক্লান্ত, বিষণ্ন! রাতে তার ঘুম আসে না সহজে। তার নিজের মুখের রেখাগুলোতেও তো জেগে আছে কাঠিন্যের ছাপ! মানুষজন এবং আয়নারা তো তাইই বলে! মাহবুব আলির নীরব পর্যবেক্ষণ তখন একটা সম্ভাবনা তৈরি করেছিল : সায়কা শারমিন হয়তো তার মতোই জীবনের সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত! হয়তো তার মতো করেই সায়কা শারমিনের জীবনও নিরানন্দে ভরে গেছে! সেটা অবশ্য একটা সম্ভাবনা মাত্র! তবে সব কিছুর ওপরে সায়কা শারমিনকে তখন খুব আপন মনে হয়েছিল তার—যেন কত দিনের চেনা!

কাজেই সায়কা শারমিনের প্রস্তাবের সাথে সাথেই কোকাকোলা খেতে রাজি হয়ে গিয়েছিল মাহবুব আলি। তাতে করে উপকারই হয়েছিল তার—সে ভেজাতে পেরেছিল শুকিয়ে প্রায় কাঠ হয়ে যাওয়া তার গলার ভেতরটা। তাছাড়া কোকাকোলা পেটে পড়তেই নিশ্চয় তার শরীরের সুগার লেভেল বেড়ে গিয়েছিল। তাই তার শরীর চাঙা হয়ে উঠেছিল একটু। সায়কা শারমিনকে সে বলেছিল—আপনাকে অনেক ধন্যবাদ!

চুপচাপ কোকাকোলা খেয়ে ফের রিসেপশনের সোফায় চুপচাপ বসেছিল মাহবুব আলি। তারপর সবমিলিয়ে চল্লিশ মিনিট মতো গত হলে বাইরে থেকে রিসেপশনে উদয় হয়েছিল ট্রাভেল এজেন্সির রিজারভেশন ডেস্কের কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল। মাহববু আলিকে খামোখা বসিয়ে রাখার জন্য একফোঁটা দুঃখ প্রকাশ না-করে মোস্তফা কামাল তাকে অফিসের ভেতরে নিয়ে গিয়েছিল। ই-টিকিট প্রিন্ট করেছিল মোস্তফা কামাল, সেই সাথে ভাউচার। ক্যাশের বিনিময়ে লেনদেন শেষ করে রিজারভেশনের ঘরটা থেকে চটজলদি বের হয়ে গিয়েছিল মাহবুব আলি কেন-না তার অফিসে ফিরে যাওয়ার তাড়া ছিল। রিসেপশনে এসে সে দ্রুত গতিতে ধাবিত হয়েছিল প্রস্থানের দরজার দিকে। তখন কী মনে করে থমকে দাঁড়িয়ে, পেছন ফিরে সে রিসেপশন ডেস্ক পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিল। একটা ইয়েলো পেইজ ঘাটতে ব্যস্ত সায়কা শারমিনকে সে বলেছিল, ‘তা হইলে যাইগা আমি! প্রায় কুড়ি বছর ধইরা আমি মতিঝিল এলাকায় চাকরি করতাছি। কিন্তু কোনও অফিসে আমারে কেউ কুনুদিন কোকাকোলা খাইতে দেয় নাই! আপনে দিলেন! থ্যাঙ্ক ইউ!’ এই বলে সে তার একটা নেইম কার্ড বাড়িয়ে দিয়েছিল সায়কা শারমিনের দিকে।

সায়কা শারমিন উত্তর দিয়েছিল, ‘ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম!’ তারপর মাহবুব আলির হাত থেকে নেইম কার্ডটা নিয়ে কার্ডে একনজর চোখ বুলিয়েছিল সায়কা শারমিন। তারপর চোখ তুলে মাহবুব আলির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসেছিল সে। এবং কী আশ্চর্যের ব্যাপার—তখন অনাবিল হাসিতে ঝিকমিক করে উঠেছিল মেয়েটার বিষণ্ন দু’চোখ! এক লহমায় মেয়েটার চোখের বৈশিষ্ট্য পাল্টে গেলেও বারবার মনে হচ্ছিল মাহবুব আলির, এমনকি সে যখন শাপলা চত্বরের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল, তখনও—ক্ষণিকের জন্য জ্বলে উঠলেও সেই চোখ হয়তো আবারও ডুবে যাবে গভীর বিষণ্নতায়! এমনটাই আসলে হয়! সায়কা শারমিনের গল্পটা তবে কী? অবশ্য সেইদিন রাতেই, কিছুটা হলেও, সেই রহস্যের মীমাংসা হয়েছিল।

ফকিরাপুলের এস.এন. ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস থেকে প্লেনের টিকিট নিয়ে মাহবুব আলি ফেরত গিয়েছিল নিজের ডেস্কে। তারপর সে তুরস্কের কোনও এক ব্র্যান্ডের ময়শ্চারাইজার আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় সব ফরম পূরণ করেছিল। তাছাড়া গোপীবাগের এক সি. অ্যান্ড এফ. এজেন্টের কাছেও অফিসের কাজে গিয়েছিল সে। উদ্দেশ্য ছিল—তুরস্ক থেকে আমদানি করা লিপস্টিকের একটা কনসাইনমেন্টের বিল অফ ল্যাডিং সংগ্রহ করা। এসব কাজটাজ শেষে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে অফিস থেকে সে বের হয়েছিল সন্ধ্যে সাতটার দিকে। মতিঝিলের ট্রেডিং কোম্পানির অফিস থেকে হাঁটতে হাঁটতে সে শাপলা চত্বরে গিয়েছিল এবং সেখান থেকে সে উঠে বসেছিল মালিবাগগামী একটা টেম্পোতে। মালিবাগ মোড়ে নেমে শান্তিনগর পোস্ট অফিসের উত্তরের গলিটা দিয়ে সে সোজা পশ্চিমে ঢুকে গিয়েছিল যে গলিটা পড়েছে গিয়ে সিদ্ধেশ্বরীর কালীমন্দিরের দক্ষিণ দিকটায়। মালিবাগের সেই অংশটার পুরনো একটা দোতলা বাসার নিচতলায় প্রায় সতের-আঠার বছর ধরে ভাড়া থাকে সিরাজদিখানের মাহবুব আলিরা। আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে মতিঝিলে চাকরিবাকরি শুরু করার পরপরই সিরাজদিখান থেকে তার বিধবা মা আর ছোট চার ভাই-বোনকে সে পর্যায়ক্রমে ঢাকা শহরে নিয়ে আসে। যা হোক, প্রচণ্ড ক্লান্তির কারণে বাজারসদাই আর করা হলো না সেদিন। সাধারণত রাতের বেলায় শান্তিনগর-বাজারের সামনে টেম্পো থেকে নেমে সে বাজারসদাই সেরে ফেলে। কিন্তু সেদিন শান্তিনগরবাজারে যেতে আলসেমি লাগছিল তার। এমনটা প্রায়ই হয়—অফিস থেকে বের হতে হতে দেরি হয়ে যায় তার এবং শারীরিক ক্লান্তির বিবেচনায় শান্তিনগর-বাজার পর্যন্ত আর যাওয়া হয় না। তখন মালিবাগে মোড়ে পথের ওপরে সাজিয়ে রাখা শাকসবজি যা পায় তাইই কিনে ফেলে সে। সেখানে অবশ্য মাছ-মাংস পাওয়া যায় না। সেদিন টেম্পো থেকে মালিবাগে মোড়ে নেমে শাকসবজি কেনার জন্য একটু দাঁড়ানোর মতো শক্তিও অবশিষ্ট ছিল না তার শরীরে। মতিঝিলের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে এমন করে শরীর ভেঙে আসে সকলেরই!


আয়নায় তাকালে সে দেখতে পায়, আজকাল তার সুশ্রী মুখমণ্ডলে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্লান্তির ছাপ, মুখমণ্ডলের রেখায় রেখায় জমে উঠছে অনড় এক কাঠিন্য।


মালিবাগের সেই পুরনো বাসাটায় সেই মুহূর্তে দু’জন মানুষ বাস করে—মাহবুব আলি এবং তার বিধবা মা। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী মাহবুব আলির পরে তার যে দু’বোন আছে তারা বিয়েশাদি করে যার যার শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছে অনেক আগেই এবং তার দু’ভাই মতিঝিলেই ছোটখাট চাকরি নিয়ে, বিয়েশাদি করে পৃথক হয়ে গেছে অতিসম্প্রতি। এ কারণে বাসাটার জনসংখ্যা আরও কমে গেছে। কাজেই বাজার না-করলেও কোনও আপত্তি করে না মাহবুব আলির বিধবা মা। মা আর তার বড় ছেলে মাহবুব আলির দু’এক পদের তরকারি দিয়ে ভাত খেলেই চলে যায়। ঘরে শাকসবজি, মাছ-মাংস ইত্যাদি না-থাকলেও ফ্রিজে হয়তো একটা মুরগির ডিম থাকে অথবা টুকরিতে দু’একটা আলুটালুু, সাথে মশুরের ডাল। আর কিছু না-থাকলে ডাইলে-চাইলে খিচুরি একটা কার্যকর সমাধান। বলে রাখা ভালো, এখন থেকে দশ বছর আগে মাহবুব আলির বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে গেছে। মাহবুব আলি আর বিয়ে করে নি; করলে হয়তো এই পরিবারে কিছুটা হলেও আড়ম্বর থাকতে পারত, শ্রী ফিরে আসতে পারত এই সংসারটার! সেটা আর হয় নি। বিশেষ একটা কারণে বিবাহিত জীবনে দাগা খেয়ে মাহবুব আলি প্রতিজ্ঞা করেছে যে সে আর কখনই বিয়ের ছাঁচে ঢুকবে না।

ফাল্গুনের সেই রাতে বাসায় ফিরে মাহবুব আলি রুটিনমাফিক হাত-মুখ ধোয়; কাপড়চোপড় পাল্টায়। নাতিদীর্ঘ বসার ঘরটায় টেলিভিশনের সামনে বসে খবর দেখতে দেখতে সে চা-বিস্কিট খায়। তারপর বারান্দার পুরনো একটা কাঠের চেয়ারে সে চুপচাপ বসে থাকে অনেকক্ষণ এবং সে একটা সিগারেট খায়। সারাদিন চৌদ্দ পদের মানুষজনের সাথে বগরবগর করার কারণে তার এতই ক্লান্তি লাগে যে বাসায় ঢোকার পর সে চুপ করেই থাকে সচরাচর। তখন মা’র সাথে সে দু’একটা প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলে মাত্র। তার নৈঃশব্দ্যের ভাষা বুঝে নিয়ে মা-ও তাকে বিরক্ত করে না। সেদিন অন্ধকারের ভেতরে বসে একটা সিগারেট টানার পর সে তার স্যাঁতসেঁতে ঘরে ফিরে যায় এবং সময় কাটানোর জন্য যথারীতি সে মোবাইল ডাটা অন করে ফেইসবুকে ঢোকে। তার পেইজের ইনভিটেশনের তালিকায় ক্লিক করার পরে সে অবাক হয়ে দেখে, তার সাথে সংযুক্ত হওয়ার জন্য অনুরোধ পাঠিয়েছে ফকিরাপুলের এস.এন. ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরসের রিসেপশনিস্ট সায়কা শারমিন। তখন মাহবুব আলির মনে পড়ে যায় সেদিনের মধ্যাংশে ঘটে যাওয়া চমৎকৃত হওয়ার মতো ঘটনাটা যেখানে সায়কা শারমিনের সাথে তার পরিচয় ঘটছে অকস্মাৎ এবং সে শ্যামবর্ণার ডাগর চোখে দেখতে পাচ্ছে ক্লান্তি আর বিষণ্নতার ঝড়। তাই ঔৎসুক্যের চাপে সে তখন কোনও রকম দ্বিধা না-করেই সায়কা শারমিনের বন্ধু হতে চাওয়ার অনুরোধে সাড়া দিয়ে ফেলে। দো’তরফে অবাক হয় মাহবুব আলি কেননা সাথে সাথেই মোবাইলের ম্যাসেঞ্জারে সায়কা শারমিনের ম্যাসেজ আসে : কী করেন?

মোবাইলের কী-বোর্ডে উত্তেজিত মাহবুব আলি টাইপ করে : তেমন কিছু না। ফাও ফাও বইসা আছি ভাই!

‘ফাও ফাও বসে থাকেন কেন? কাজ নাই আপনার?’ সায়কা শারমিনের এমন ধারার তরল প্রশ্ন শুনে মাহবুব আলি বুঝতে পারে যে প্রশ্নকারী তখন মুচকি মুচকি হাসছে।

‘সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত অফিসে কাজ করছি। আমারে আর কত কাজ করতে কন?’ একথা বলার পরে ভুতের গলির সায়কা শারমিনকে দাঁত বের করে কৌতুকে হাস্যরত একটা ইমোটিকন পাঠায় মাহবুব আলি।

তারপর এক লহমায় ম্যাসেঞ্জারে পরস্পরের সাথে কথা বলতে ঢুকে যায় মাহবুব আলি এবং সায়কা শারমিন। রাত সাড়ে ন’টার দিক থেকে রাত দু’টো পর্যন্ত ঝড়াক্রান্তভাবে ম্যাসেঞ্জারে কথামালা টাইপ করে চলে তারা দু’জন। মাঝে তারা কেবল দশ মিনিটের বিরতি নেয় রাতের খাবার খাওয়ার জন্য। তাদের সুদীর্ঘ কথোপকথনে পরস্পরের পেশা নিয়ে কথাবার্তা থাকে, আত্মীয়পরিজনের খবরাখবর থাকে, থাকে চটুল আর গম্ভীর সব বিষয়-আশয়। সেসব আলাপ থেকে সায়কা শারমিনের তেত্রিশ বছরের জীবনের গল্পটা মোটা দাগে সাজালে এমনটা দাঁড়ায় :

সায়কা শারমিনদের মূল বাড়ি মাদারিপুর শহরে। সেখানেই থাকে তার বাবা-মা আর তার তিনজন ছোট ভাইবোন। সায়কা শারমিন সেই মুহূর্তে বাস করছে তার বড় বোন আর দুলাভাইয়ের বাসায়, ভুতের গলিতে। এর আগে সে নীলক্ষেতের কর্মজীবী নারীদের হোস্টেলে থেকেছে অনেকদিন। উল্লেখ্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে ব্যাচেলর ডিগ্রি পাওয়ার পর সে মাদারিপুর থেকে ঢাকা শহরে চলে আসে চাকরি খোঁজার জন্য। সে তার বড় বোন আর দুলাভাইয়ের ভুতের গলিতে বাসাতেই উঠেছিল। বছর দেড়েক বেকার বসেছিল সে। তখন সে ভুতের গলির এক বাসায় ক্লাস থ্রি-র এক শিশুকে পড়াত। পরে দুলাভাইয়ের জনৈক আত্মীয়ের কল্যাণে সেগুনবাগিচার একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে রিসেপশনিস্ট পদে চাকরি পেয়ে যায়। সেখানকার জনৈক সহকর্মীর সাথে তিনবছর ধরে উত্তুঙ্গ প্রেম করে সায়কা শারমিন। পাতি চাকরির ভবিতব্য পাল্টানোর জন্য মোটা অঙ্কের যৌতুকের বিনিময়ে মানিকগঞ্জ টাউনের জনৈক মেয়েকে বিয়ে করে বসে সায়কা শারমিনের প্রেমিক। তারপর থেকে নর-নারীর প্রেম এবং বিবাহের ওপরে কোনও আস্থা আর অবশিষ্ট নেই সায়কা শারমিনের ভেতরে। এমনকি সে আর কোনও প্রেমিকও গ্রহণ করে নি। জীবন সম্পর্কে তার বর্তমান পরিকল্পনা হলো : যত কষ্টই হোক না কেন, সে চাকরি করাটা বহাল রাখবে। বলাই বাহুল্য, মতিঝিল এলাকাতে চাকরি বজায় রাখাটা তীব্র এক সংগ্রামের বিষয়! তবে ট্রাভেল এজেন্সির রিসেপশন ডেস্ক থেকে সে রিজারভেশন ডেস্কে চলে যাওয়ার চেষ্টা করবে। রিজারভেশন ডেস্কে বেতন বেশি। বাস আর টেম্পোতে চড়ে ভুতের গলি থেকে মতিঝিলে যাতায়াত করাটা বেশ সময়সাপেক্ষ বলে ভবিষ্যতে সে একটা স্কুটি কিনতে চায়। তাছাড়া বাবা-মা’র প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বাবা-মা’র মাদারিপুরের সংসারে নিয়মিতভাবে সে পাঠিয়ে যাবে নিজের রোজগারের বড় একটা অংশ। ব্যক্তিজীবন বরবাদ হয়ে গেলে কী আর করা যাবে! আশপাশের মানুষের জন্যও তো বাঁচা যায়! সেটা মন্দ কী!

ভুতের গলির সায়কা শারমিনের জীবনের গল্প তখন ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল মাহবুব আলিকে। তবে সে ভয়ানকভাবে অবাক হয়েছিল সেই মেয়েটার সাথে তার নিজের একটা বিশেষ দিকের মিল দেখতে পেয়ে : শারীরিক ক্লান্তির পরেও রাতে ভালো ঘুম হয় না সায়কা শারমিনের যেটা কিনা তার ক্ষেত্রেও ঘটছে অনেকদিন ধরেই। ভুতের গলির সায়কা শারমিন তাকে বলে, কখনও কখনও এমনও হয় যে এই শহরের বিভিন্ন মসজিদে ফজরের আজান পড়ছে, ভোরের আলো ফুটছে এবং তারপরে ক্লান্ত শরীরে একটু একটু করে ঘুম জড়াচ্ছে তার। কিন্তু বেশিক্ষণ আবার ঘুমানোও যাচ্ছে না। ঘণ্টা দুয়েক পরেই তাকে উঠে পড়তে হচ্ছে চাকরিতে যাওয়ার বিবিধ প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য।

মাহবুব আলি অনুমান করে যে বিবিধ মানসিক চাপের কারণেই আসলে ঘুম কম হয় সায়কা শারমিনের। সায়কা শারমিন তাকে বলে, কিন্তু সে ঘুমাতে চায় অনেক—পারলে বার ঘণ্টা! দীর্ঘদিন থেকে ক্রমান্বয়ে ঘুমের অভাব জমা হচ্ছে তার শরীরে। সায়কা শারমিন ইন্টারনেটে পড়েছে, দিনের পর দিন গড়ে কমপক্ষে ছ’ঘণটা মতো ঘুম না-হলে মানুষের শরীর ভেঙে পড়ে, মানুষ পাগল পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। কাজেই নিজেকে নিয়ে সে ভয়ানকভাবে আতঙ্কিত! তাছাড়া, বিশ্রী ব্যাপার হলো এই যে কম ঘুম হয় বলে প্রায়শই সে অফিসে বসে ঝিমাতে থাকে নিস্পৃহ মুরগির মতো। আর আয়নায় তাকালে সে দেখতে পায়, আজকাল তার সুশ্রী মুখমণ্ডলে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্লান্তির ছাপ, মুখমণ্ডলের রেখায় রেখায় জমে উঠছে অনড় এক কাঠিন্য। তাই তাকে প্রতিদিন নিরবিচ্ছিন্নভাবে গড়ে কমপক্ষে ছ’ঘণ্টা ঘুমাতেই হবে। ডাক্তারের পরামর্শও তেমনটাই। কিন্তু বছর পাঁচেক ধরে সেটা আর ঘটছে না। তার ক্ষেত্রে দিনের পর দিন গড়ে ঘণ্টা তিনেক ঘুম হচ্ছে মাত্র।


সকল পুরুষ তো আর হৃদয়হীন নয়! এই বলে মাহবুব আলি তখন দাঁত ক্যালানো একটা ইমো পাঠায় সায়কা শারমিনকে।


সায়কা শারমিন যেসব সিমটোমের কথা বলছিল সেসবের সবগুলোই মাহবুব আলির চেনা। তবু সে অবাক হয়েছিল কেননা তার ধারণা ছিল যে সেইই কেবল দিনের পর দিন এ ধরনের ঘুমহীনতার শিকার হচ্ছে! তার কোনও বন্ধুরই ঘুম বিষয়ক সমস্যা নেই। তারা সবাই ভোঁস ভোঁস করে ঘুমায় সারা রাত ধরে। হতবাক মাহবুব আলি তখন সায়কা শারমিনকে খুলে বলেছিল যে গেল বছর পনের ধরে তারও খুব একটা ঘুম হয় না—সারাদিনে গড়ে ঘণ্টা তিনেক বড় জোর! সেও একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো কমপক্ষে ঘণ্টা ছয়েক ধরেই ঘুমাতে চায়। আফসোস এই যে তার নিজের শরীর তার শাসন শুনছে না! প্রথম প্রথম মনে হতো যে কম ঘুমেই সে আসলে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আজকাল মাঝে মাঝে অফিসে কাজ করার সময়ে ঘুমে বারবার চোখ বুজে আসতে থাকে তার এবং কখনও কখনও সে কাজের ভেতরে একমুহূর্তের জন্য ঝিমিয়েও যায়। তখন তার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে তার সহকর্মীরা। সহকর্মীদের কেউ কেউ তার সাথে মশকরা করে বলে, ‘কী মিয়া! রাইতে কি চুরিদারি করতে বাইর হইতাছেন নাকি?’ তখন পরিস্থিতি হালকা করার জন্য তাকে দাঁত কেলিয়ে দিয়ে হাসতেই হয়।

ভুতের গলির সায়কা শারমিনকে মাহবুব আলি আরও জানিয়েছিল যে গেল প্রায় সাত বছর যাবৎ তাকে উচ্চ রাক্তচাপ ধরে আছে। জনৈক ডাক্তার তাই মাহবুব আলিকে পরামর্শ দেয়েছে যে তার আরও বেশি মাত্রায় ঘুমানো প্রয়োজন—দিনে কমপক্ষে আট ঘণ্টা মতো। তা না-হলে তার উচ্চ রক্তচাপ কমবে না কিছুতেই! সেজন্য তাকে স্বল্প মাত্রার ঘুমের ওষুধও খেতে দিয়েছিল তার ডাক্তার। প্রথম প্রথম ভালোই চলছিল। কিন্তু ঘুমের ওষুধে আর কাজ হয় না আজকাল! এর অর্থ : ওষুধের মাত্রা বাড়াতে হবে। সমস্যাটা এখানেই : ঘুমের ওষুধের মাত্রা বাড়ালে চব্বিশ ঘণটায় হয়তো তাকে আর চোখ খুলে রাখতে হবে না! কিন্তু তাকে তো চাকরি করে খেতে হয়, নিজের বিভিন্ন কাজে বাসার বাইরে যেতে হয়। সারাদিন পরে পরে ঘুমালে তার চলবে নাকি?

সেকথা শুনে হাসতে হাসতে সায়কা শারমিন ম্যাসেঞ্জারে লিখে : বুঝলেন তো, সারাদিন যদি ঝিমাতেই হয় তবে এর চাইতে আফিম খাওয়া ভালো!

সায়কা শারমিনের মন্তব্যে মাহবুব আলির বেজায় হাসি পায়। ম্যাসেঞ্জারে সে লিখে : লন! তা হইলে আফিমের গুল্লি কিনা আনি, দুইজনে মিল্লা খাই!

সায়কা শারমিন তখন একটা থাম্ব আপ ইমো পাঠায় মাহবুব আলিকে।

তারপর সায়কা শারমিন লিখে : আমার শরীরের অবস্থাটা একেবারে আপনার শরীরের মতোই! তিন বছর ধরে আমি হাইপারটেনশন কমানোর ওষুধ খাচ্ছি! এখনও অবশ্য ওষুধের ডোজ বাড়ে নি। বাড়তেই বা কতক্ষণ! ঘুমই তো হয় না আমার! অফিস নিয়ে টেনশনে থাকি—কখন না আবার চাকরি চলে যায়! নিজের জীবনে অস্থিরতা ছাড়া আর কিছুই তো আমি দেখি না! কিভাবে ঘুম হবে আমার, বলেন!

নিজের স্বল্প ঘুমের সম্ভাব্য কারণগুলো তখন সায়কা শারমিনকে জানিয়েছিল মাহবুব আলি। মাহবুব আলির বয়স যখন একুশ বছর তখন তার পিতা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায়। সে তখন তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ক্লাসের ছাত্র। তারপর থেকেই বড় সংসারটার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল তাকে। অল্প বয়স থেকে এমন গুরু দায়িত্ব পালন করার তো একটা মানসিক চাপ থেকেই যায়! তাছাড়া লৌহজংয়ের নাসরিন বানুর সাথে বিয়ের পরপরই তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক দ্বন্দ্বমুখর হয়ে উঠেছিল বিশেষ একটা কারণে : অনেক চেষ্টার পরেও নাসরিন বানু তার পূর্বতন প্রেমিকের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করতে পারছিল না। ভয়ানকভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেও নাসরিন বানুর সমস্যার ব্যাপারে সংবেদনশীল হতে চেয়েছিল মাহবুব আলি। কিন্তু শেষপর্যন্ত সে আর বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনার সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে নি এবং সে নিজে থেকেই উদ্যোগ নিয়ে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটিয়েছিল। মনশূন্য নাসরিন বানুর সাথে দীর্ঘ চার বছর ধরে ঘেঁচোমেচোর ফলে আসলে ভয়ানকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল মাহবুব আলি। দশ বছর আগের ঘটনা সেটা। এখনও সেই ক্লান্তি আর বিভীষিকা লেগেই আছে তার মনে। তার সাথে এখন যোগ হয়েছে একা-একা জীবন চালানোর ভার এবং মতিঝিলের চাকরিতে টিকে থাকার ভয়ঙ্কর সব যুদ্ধ।

মাহবুব আলির কথা শেষ হলে সায়কা শারমিন ম্যাসেঞ্জারে লিখেছিল : আবার বিয়ে করলেই পারতেন! হয়তো-বা শান্তি লাগত আপনার মনে! কে জানে!

উত্তর করেছিল মাহবুব আলি : মাঝখান দিয়া এক মাইয়ার লগে ঝুলছিলাম, বুচ্ছেন? বিয়াশাদি ছাড়া সে ফোনে পর্যন্ত কথা কইব না! তো আমি ছাড়ান দিলাম। জিন্দেগিতেও আর বিয়া বইতাছি না আমি! বহুত হইছে!

সায়কা শারমিনও তার প্রতিক্রিয়া লিখেছিল এভাবে : আমিও বিয়ে করতে চাই না। পুরুষ মানুষের ওপরে আর কোনও বিশ্বাস নেই আমার!

সকল পুরুষ তো আর হৃদয়হীন নয়! এই বলে মাহবুব আলি তখন দাঁত ক্যালানো একটা ইমো পাঠায় সায়কা শারমিনকে।

ফাল্গুনের সেই রাতে ফেইসবুকে কথা বলতে বলতে ফজরের আজান পড়েছিল। একটু পরেই আবার চাকরিতে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হবে—এমন একটা অমোঘ বাস্তবতার প্রেক্ষিতে, মনে না-চাইলেও, তাদের বাক্যালাপ থামাতে হয়েছিল। তারপর সায়কা শারমিন এবং মাহবুব আলি কথা বন্ধ করে শুতে গিয়েছিল যার যার শীতল বিছানায় এবং তারা ঘুমিয়ে পড়েছিল সাথে সাথেই।

এভাবে ম্যাসেঞ্জার ব্যবহার করে ভুতের গলির সায়কা শারমিন এবং মালিবাগের মাহবুব আলি রাতভর কথা বলেছিল পরপর তিনদিন। আলাপের চতুর্থদিনে মাহবুব আলিকে দুপুরের দিকে ফোন করে বলেছিল সায়কা শারমিন, ‘সন্ধ্যা ছ’টার দিকে একবার আমার অফিসে আসতে পারবেন? ধানমন্ডি চার নম্বরে আজকে আপনাকে ফুচকা খাওয়াতে চাই। সময় হবে আপনার?’

ততদিনে সায়কা শারমিনের প্রতি মাহবুব আলির মুগ্ধতা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে সায়কা শারমিনের সেই প্রস্তাব উড়িয়ে দেয়ার কোনও কারণই ছিল না। ফকিরাপুল থেকে রিকশাতে চেপে সন্ধ্যে ছ’টার ঠিক পরপর সায়কা শারমিন এবং মাহবুব আলি রওয়ানা দিয়েছিল গ্রিন রোডের উদ্দেশ্যে। সেগুনবাগিচার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের শরীরে এসে দোলা দিচ্ছিল ফাল্গুনের মৃদুমন্দ হাওয়া। তারা ভাসছিল জগতের নতুন পত্রপল্লবের সুঘ্রাণে এবং সে কারণেই হয়তো তারা প্রগলভ হয়েছিল।

সায়কা শারমিন মাহবুব আলিকে বলেছিল, ‘আপনার চেহারাটা না খুব মায়ায় ভরা! তা কি জানেন আপনি?’

সায়কা শারমিনের কথা শুনে ভয়ানকভাবে বিস্মিত হয়েছিল মাহবুব আলি। শেভ করার সময় সে তো আয়নাতে নিজের চেহারা দেখতে পায়। কই? সে তো তার বৈশিষ্টহীন মুখমণ্ডলে এত কিছু লক্ষ করে নি কখনও! কেউ তাকে এসব বলেও নি কোনওদিন! সে কেবল এটুকু বুঝতে পারে যে তাকে, আর যাই হোক না কেন, অন্ততপক্ষে সুপুরুষ বলা যাবে না। বিভ্রমে পড়ে গিয়ে তাই সে চুপ থেকেছিল। খানিক পরেই তার বিহ্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল তার সহজ স্বীকারোক্তিতে, ‘এইসব তো আমি কখনও খেয়ালই করি নাই, ভাই!’

মৃদু হেসেছিল সায়কা শারমিন। সেই হাসির কোনও অর্থ বুঝতে পারে নি মাহবুব আলি।

হাতির পুলের ঘিঞ্জি রাস্তার পাশের দোকানগুলোর সাইনবোর্ড দেখতে দেখতে এক পর্যায়ে মাহবুব আলি সায়কা শারমিনকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আচ্ছা! আপনের কোনও বন্ধু নাই?’

হাস্যমুখে সায়কা শারমিন তখন উত্তর দিয়েছিল, ‘থাকবে না কেন? তবে তারা আমার সমস্যাগুলো বোঝে না। তাই তাদের সাথে আজকাল আর তেমন যোগাযোগ নেই। ভাল্লাগে না!’

তারপর মাহবুব আলিকে প্রশ্ন করেছিল সায়কা শারমিন, ‘এই যে আপনার ঘুম হয় না ঠিক মতো, আপনার স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়ছে দিনে দিনে—আপনার বন্ধুরা নিশ্চয় সেসব কথা শুনে হাসে! তাই না?’

সেই প্রশ্ন শুনে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল মাহবুব আলি। সেই মুহূর্তে বন্ধুবিষয়ক বিপর্যয় তার সামনে আরও নগ্ন হয়েছিল এবং অদ্ভুত এক গ্লানিতে শিউরে উঠেছিল সে। ছোট্ট করে সে উত্তর দিয়েছিল, ‘সব মাইনষের তো আর সমস্যা-টমস্যা বুঝার মতন মানসিকতা থাকে না! কী আর করা যাইব!’

তখন একটু চুপ থেকেছিল সায়কা শারমিন। তারপর সেন্ট্রাল রোডের অগোছালো বাসাবাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কিছু একটা ভেবে নিয়ে, মাহবুব আলির চোখে সোজাসুজি তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল সায়কা শারমিন, ‘আপনি ঘুমাবেন আমার সঙ্গে?’


একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাহবুব আলি তখন সায়কা শারমিনকে বলেছিল, ‘ঠিকই কইছেন আপনে! কেউ আমাদেরে একসাথে ঘুমাইতে দিব না!


মর্মভেদী সেই দৃষ্টির সমুখে পড়ে গিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল মাহবুব আলি। একটু পরে স্থির হয়ে সে ভেবে দেখেছিল, সে আসলে অনেকদিন ভালো মতো ঘুমায় না—এটা সত্য! হয়তো তাকে নিরবিচ্ছিন্ন ঘুমের ভেতরে ডুবিয়েও দিতে পারে সায়কা শারমিনের উষ্ণতা। মানুষ সামাজিক জীব বলেই একজন মানুষের উষ্ণতা তো আরেকজন মানুষকে প্রশান্ত করতেই পারে! কিন্তু কেউ যেচে তার সাথে কেন ঘুমাতে চাইবে তা আর সে ভেবে বের করতে পারছিল না। এমন ধারার কথা তো সে ইহ জনমেও শোনে নি! তাই আমতা আমতা করতে করতে ভুতের গলির সায়কা শারমিনকে সে বলেছিল, ‘আপনের প্রস্তাবটা খুব ভালো। আমারও আসলে অনেক ঘুমানো দরকার। কিন্তু কিভাবে একসাথে ঘুমানো যাইব তা তো আমার মাথায় আসতাছে না ভাই!’

মাহবুব আলির সংশয়টুকু লক্ষ করে নিয়ে ঋজু ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছিল সায়কা শারমিন, ‘এই শহরে তো কেউ আমাদের দু’জনকে একসাথে ঘুমাতে দেবে না কোনওদিন—কেউ না! তাহলে দিনতিনেকের জন্য ঢাকার বাইরে কোথাও যাই, চলেন।’

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাহবুব আলি তখন সায়কা শারমিনকে বলেছিল, ‘ঠিকই কইছেন আপনে! কেউ আমাদেরে একসাথে ঘুমাইতে দিব না! আপনেগো বাসার কথা জানি না, তয় আপনেরে আমগো বাসায় ঘুমাইতে নিয়া গেলে আমার মা তো কল্লা নামায়া ফালাইব আমার! আর তাছাড়া কোথাও আমার এমন কোনও বন্ধু নাই যে তারে গিয়া রিকোয়েস্ট করুম—আমরা দুইজনে একটু ঘুমামু। তর ঘরে জায়গা দে না ভাই! তা হইলে আপনে যা কইতাছেন—এক লগে কক্সবাজার যাওয়া যাইতে পারে।’

মাহবুব আলির কথার প্রেক্ষিতে তখন প্রতিক্রিয়া জানায়েছিল সায়কা শারমিন, ‘সেটাই ভালো। কারও কাছে ধর্না দেয়ার প্রয়োজন নেই কোনও।’

মাহবুব আলি তখন আগ বাড়িয়ে সায়কা শারমিনকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘দুই জন মিল্লা কক্সবাজার যাইতে আনুমানিক কত খরচ পড়তে পারে তা খোঁজ নিতে পারবেন? আমি কিছু টাকা নিলাম, আপনিও নিলেন কিছু।’

মুচকি হেসে বলেছিল সায়কা শারমিন, ‘খোঁজ নিয়েছি আমি। ষোল হাজার টাকা মতো হলেই দু’জনের খরচ চলে যাবে। আমরা সস্তা হোটেলে থাকব না-হয়, সস্তা রেস্টুরেন্টে খাব।’

উত্তেজনার বশে মাহবুব আলির তখন সিগারেট খাওয়ার তেষ্টা পেয়েছিল। বুকপকেটে রেখে দেয়া শেখ ব্র্যান্ডের একটা সিগারেট বের করেছিল সে। দীর্ঘক্ষণ পকেটে পড়ে থাকার কারণে দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিল সিগারেটটা। প্যান্টের পকেট হাতড়ে ম্যাচবক্স বের করে সিগারেটটা ধরানোর চেষ্টা করেছিল সে। কিন্তু উত্তেজনায় প্রকম্পিত দু’হাতের আঙুলগুলো বাতাসের ঝাপটা থেকে আগুনকে আড়াল করতে পারছিল না মোটেই। তাই বারবার নিভে যাচ্ছিল ম্যাচের কাঠির আগুন। বিরক্ত হয়ে বুকপকেটে ফের সিগারেটটা ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে সায়কা শারমিনকে সে প্রশ্ন করেছিল, ‘কক্সবাজারে কবে যাইতে পারবেন আপনে? ভাবছেন কিছু? তারিখের রেঞ্জটা জানতে পারলে হোটেল ঠিক করতাম আগে দিয়াই।’

আবারও মুচকি হেসেছিল সায়কা শারমিন। সে মাহবুব আলিকে বলেছিল, ‘তারিখটা পরে জানাচ্ছি আপনাকে। আর হোটেল বুকিং আমিই দিয়ে দেবো। ভাববেন না।’

মাহবুব আলিকে সায়কা শারমিন জানিয়েছিল, কক্সবাজারের কিছু হোটেলের সাথে তাদের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস কোম্পানির ব্যবসা আছে। কাজেই হোটেলে বুকিং পাওয়াটা সহজ কাজই হবে। তাছাড়া হোটেল ভাড়া বাবদ ডিসকাউন্ট প্রাপ্তির সম্ভাবনাও একেবারেই ফেলে দেয়া যায় না।

তারপর যা হয়—কার্যত মাহবুব আলি এবং সায়কা শারমিনের দু’জনের অফিসেই নানা কারণেই কাজের চাপ বেড়ে গেল। সেই কারণে ফাল্গুন মাসে তারা আর কক্সবাজারে ঘুমাতে যাওয়ার সময় বের করতে পারল না। চৈত্র মাসে যেটা হলো, অনেক কষ্টেসৃষ্টে দ্বিতীয় সপ্তাহে তিনদিনের ছুটি পেল সায়কা শারমিন। কিন্তু মাহবুব আলি আর সেই সময়টায় ছুটির ব্যবস্থা করতেই পারল না। তুরস্ক থেকে রপ্তানিকারকদের চারজনের একটা ডেলিগেশন মাহবুব আলিদের মতিঝিলের অফিসে এসে উপস্থিত হয়েছিল হঠাৎ করেই। তখন কি আর অফিসে ছুটিছাটা নেয়ার কথা বলা যায় নাকি? বলা গেলও না। কাজেই হতাশ হয়ে পড়েছিল তারা দু’জনেই। হতাশা কাটানোর জন্য চৈত্রমাস জুড়ে তারা পরস্পরের উষ্ণতা ধার করে যাচ্ছিল নিয়মিতভাবে।

সাধারণত প্রতিদিন সন্ধ্যে ছ’টার দিকে ছুটি মেলে সায়কা শারমিনের। তাই সপ্তাহে দু’একদিন মিছে কথা বলে সন্ধ্যে ছ’টার দিকে অফিস থেকে বেরিয়ে সায়কা শারমিনের ফকিরাপুলের অফিসে যাচ্ছিল মাহবুব আলি। বলে রাখা ভালো যে কাজের চাপে সন্ধ্যে সাতটার আগে মাহবুব আলি তার অফিস থেকে কখনই বের হতে পারে না। সন্ধ্যে সাতটার পরে অফিস থেকে বেরিয়ে বেশির ভাগ সময়ে সে আরামবাগের বিভিন্ন মেসে বসবাসরত সিরাজদিখান এলাকার বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারতে যায়। তার বাল্যকালের বন্ধুরা সবাই মতিঝিলের বিভিন্ন অফিসে নিম্নপদে কর্মরত। ভুতের গলির সায়কা শারমিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়ার পর থেকে মাহবুব আলি আর আরামবাগের মেসগুলোতে ঢুঁ দিচ্ছিল না। সে তখন অনুধাবন করেছিল যে আসলে বন্ধুদের গল্পের সাথে তার গল্প কোনওভাবেই যায় না কেননা তার বন্ধুরা কেউই তার মতো ঘুমহীনতার রোগী নয়। এমন পার্থক্যের পরেও বন্ধুদের সাথে সে বিস্তর সময় কাটিয়েছে। বন্ধুরা তার জটিল জীবনের সমস্যাগুলো সর্বত বুঝতে পারে নি। এ কারণে বন্ধুদের সাথে ভাবনার লেনদেন কখনই মসৃণ ছিল না। মাহবুব আলি ভেবে দেখেছে, সায়কা শারমিন পাশে থাকলে আর বন্ধুদের সাথে তাকে খামোখা ঝুলে থাকতে হচ্ছে না। সায়কা শারমিনের সাথেই সে মন খুলে কথা বলতে পারছে। কাজেই সন্ধ্যের দিকে ফকিরাপুলে সায়কা শারমিনের অফিসে প্রায়শই হানা দিচ্ছিল মাহবুব আলি। একসাথে সময় কাটানোর জন্য তারপর তারা নিউমার্কেটে ঘুরে বেড়াচ্ছিল উদ্দেশ্যহীনভাবে অথবা ধানমন্ডি লেকের ধারে বসে গল্প করছিল রাত প্রায় ন’টা পর্যন্ত। তারা চটপটি খাচ্ছিল, ফুচকা খাচ্ছিল অথবা বার্গার, ফলের জুস, মিল্কশেক ইত্যাদি। কিন্তু কিছুতেই তাদের শরীর চাঙা হচ্ছিল না। শরীরে জমে থাকা ক্লান্তি বারবার এসে আক্রমণ করছিল তাদেরকে। তাদের খুব ঘুম পাচ্ছিল। আর তারা দুঃখ করছিল এই বলে যে এসব গণস্থানে তো ঘুমিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়! যদি শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লেকের ধারের ঘাসের ওপরে ঘুমিয়ে যায় তারা, তখন মানুষজন সন্দেহের বশে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকবেই আর নিশ্চয় এর-ওর গা গুঁতিয়ে তারা বলবে : এগো প্রবলেমডা কী, কন তো? হেরা ঘাসের উপরে ঘুমায় কেন? ঘরে ঘুমানির জায়গা নাই নেকি?

কখনও কখনও মাহবুব আলি ভুতের গলির সায়কা শারমিনের বিভিন্ন ব্যক্তিগত কাজেও অংশ নিচ্ছিল। যেমন, ব্যাকপেইন তীব্র হওয়াতে সায়কা শারমিন একদা মাহবুব আলিকে বলেছিল, ‘আমার সাথে একটু পান্থপথে যেতে পারবেন? বিছানায় পাতার জন্য একটা শক্ত বোর্ড কেনা দরকার। ব্যাকপেইনটা যন্ত্রণা দিচ্ছে খুব! একা-একা অত দূর যেতে ভালো লাগছে না আমার!’ স্বভাবতই সায়কা শারমিনের প্রস্তাবে প্রীত হয়েছিল মাহবুব আলি। তার মনে হয়েছিল, একটু হলেও তো ঘোরা হবে একসাথে! তারপর পান্থপথের পুবমাথার একটা দোকান থেকে বোর্ড কিনেছিল তারা। ভুতের গলি পর্যন্ত বোর্ডটা টেনে নেয়ার জন্য একটা ভ্যান ভাড়া করতেও সে মেয়েটাকে সাহায্য করেছিল।

কোনও একদিন সায়কা শারমিন মাহবুব আলিকে বলেছিল যে তার বারান্দার টবে লাগানো গাছগুলো সব দীর্ঘ অযত্নে মরে গেছে! নানা কারণে মনমেজাজ ভালো থাকে না বলে গাছেদের যত্ন করা হয় নি তার। একটু ধানমন্ডি চারের দিকে তার সাথে যেতে পারবে নাকি মাহবুব আলি? তাহলে কটা টবে লাগানো গাছ কেনা যেত! মাহবুব আলি সাহায্য করলে টবগুলো রিকশাতে বসিয়ে সহজেই তাদের ভুতের গলির বাসা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবে সায়কা শারমিন। কাজেই সঙ্গের লোভেই সায়কা শারমিনের গাছ কেনার অভিযানে অংশ নিয়েছিল মাহবুব আলি। গাছ কেনা হয়ে গেলে তারা দুটো রিকশার পাদানিতে বসিয়েছিল টবগুলো। ভুতের গলি অভিমুখী একটা রিকশাতে উঠেছিল স্বয়ং সায়কা শারমিন আর আরেকটাতে মাহবুব আলি। সায়কা শারমিনদের ভুতের গলির বাসার গেটে টবগুলো রিকশা থেকে নামিয়ে দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল সে। সায়কা শারমিনের ঘরটা একবার চোখে দেখার খুব ইচ্ছে হয়েছিল তার। সায়কা শারমিন তাকে বলেছিল : আজ থাক! আপা আর দুলাভাই যত ভালো মানুষই হোক না কেন, আপনাকে তারা আমার ঘর অবধি যেতেই দেবে না! কাজেই বিষণ্ন মাহবুব আলি সায়কা শারমিনদের বাসার গেট থেকে হাঁটা দিয়েছিল হাতিরপুলের দিকে।


‘নাহ্! আমি আর প্রেমট্রেম করব না! শিক্ষা হয়েছে আমার! আমি এখন কেবল ঘুমাতে চাই প্রাণভরে। আমার খুব ক্লান্তি লাগে আজকাল!’


বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসেও কক্সবাজারে ঘুমাতে যাওয়ার সময় বের করতে পারল না ভুতের গলির সায়কা শারমিন অথবা মালিবাগের মাহবুব আলি। তাই কাজে-অকাজে ঘোরাঘুরি করে এবং ফোন আর ফেইসবুকে পরস্পরের সাথে কথা বলে অলস সময় পার করছিল তারা দু’জনে। তবু তাদের ভীষণ একা-একা লাগছিল। আর তাছাড়া ঘুমের তীব্র বাসনাও স্তিমিত হচ্ছিল না। বরঞ্চ ঘুমের তৃষ্ণা মিটছিল না বলে অস্থিরতার চাপে ঘুম আরও অন্তর্হিত হয়ে গিয়েছিল মাহবুব আলির ক্ষেত্রে। একদা পরপর দু’রাতে ঘুম হলো না তার। তখন অফিসের কাজে তার ভুলভাল হচ্ছিল। আর তাছাড়া অফিসে বসে সে বিশ্রীভাবে ঝিমাচ্ছিল এবং থেকে থেকেই অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছিল সহকর্মীদের সাথে। সহকর্মীদের বেশির ভাগই বিরক্ত হচ্ছিল তার ওপরে, কেউ কেউ আবার দুশ্চিন্তিতও হয়ে পড়েছিল তার অসংলগ্নতা প্রত্যক্ষ করে। শুভানুধ্যায়ীরা তাকে জলদি একজন ডাক্তারের সাহায্য নেয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিল। ঘুমহীনতার কারণে এদিকে সে নানা ধরনের জলো কথার অবতারণা করছিল সায়কা শারমিনের সামনে বসে। যেমন, ভুতের গলির সায়কা শারমিনের সাথে একদা সাত মসজিদ রোডের একটা সস্তা খাবারের দোকানে সে তেহারি খাচ্ছিল এবং প্রেম-বিবাহ নিয়ে আলাপ করছিল। এক পর্যায়ে পার মাতালের মতো লাগামছাড়া হাসিতে সায়কা শারমিনের সাথে সে মজা করেছিল এই বলে, ‘ঠিক হ্যায়! বিয়াশাদি যুদি না-করতে চান তো কইরেন না। তয় একখান প্রেম কইরা ফালান! তা হইলে আর একা-একা লাগব না আপনের! ঘুমও ভালো হইব!’

খুব গম্ভীর সুরে তখন মাহবুব আলিকে সায়কা শারমিন উত্তর দিয়েছিল, ‘নাহ্! আমি আর প্রেমট্রেম করব না! শিক্ষা হয়েছে আমার! আমি এখন কেবল ঘুমাতে চাই প্রাণভরে। আমার খুব ক্লান্তি লাগে আজকাল!’

তখনও বালখিল্যতা ভর করে আছে মাহবুব আলির ওপরে। তাই খি-খি করে হাসতে হাসতে সে মন্তব্য করে বসেছিল, ‘ ঘুমাইতে না-করছে কেডা আপনেরে? আপনের ঘুম আপনে ঘুমাইবেন। হইল?’

‘আপনের হয়েছেটা কী আজকে? এটা ইয়ার্কি করার বিষয় নয়। ঘুম না-এলে আমি কী করব?’ গম্ভীর কণ্ঠে বলেছিল সায়কা শারমিন। তখন প্রমাদ গুনেছিল মাহবুব আলি। সে দুঃখ প্রকাশ করেছিল সায়কা শারমিনের কাছে এবং তারপর সে জানিয়েছিল যে গেল দু’রাত তার মোটেই ঘুম হয় নি। সেদিন অফিসেও সে বেশ ক’বার উল্টোপাল্টা কথাবার্তা বলে বসেছে।

সায়কা শারমিন তখন মাহবুব আলির ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে গুরুতর পরিস্থিতির মাত্রাটা বোঝার চেষ্টা করেছিল। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সায়কা শারমিন ঠিকই বুঝেছিল যে এভাবে ঘুমহীনতার সাথে চলতে গেলে আক্ষরিক অর্থেই উন্মাদ হয়ে যাবে মাহবুব আলি! তখন আরও বিষাদে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল সায়কা শারমিনের কাজলকালো চোখ। তারপর ব্যতিব্যস্ত সায়কা শারমিন মাহবুব আলিকে বলেছিল, ‘আজ রাতেও যদি আপনার ঘুম না আসে তবে আগামীকাল সন্ধ্যায় অবশ্যই আপনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব আমি। আমার ফুফাত বোন পিজি হাসপাতালের নার্স। সে একটা ব্যবস্থা করবে, জানি।’

সায়কা শারমিনের কথায় মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিল মাহবুব আলি। তবে সেই রাতে ভালো ঘুম হয়েছিল তার। ভিডিও চ্যাটে আটপৌরে পোশাকে সায়কা শারমিনকে অনেকক্ষণ দেখার পরে তার ভেতরে তীব্র যৌন-উত্তেজনা জেগেছিল। সায়কা শারমিনকে সে খবর আর দেয় নি মাহবুব আলি। সংকোচ হচ্ছিল তার। ভোর চারটের দিকে সায়কা শারমিনের সাথে কথা থামার পরে সে বিছানাতে শুয়ে সায়কা শারমিনের সাথে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা কল্পনা করেছিল এবং হস্তমৈথুনে প্রবৃত্ত হয়েছিল সে। ক্লান্তিতে তার শরীর ঝেপে ঘুম নেমেছিল তারপর।

বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসেও কক্সবাজারে ঘুমাতে যাওয়া হলো না বলে পরস্পরকে চাঙা রাখার জন্য মাহবুব আলির সাথে একটা খেলায় মেতেছিল ভুতের গলির সায়কা শারমিন। মাহবুব আলিকে সে বলেছিল, ‘কক্সবাজারে গিয়ে শুধু আমরা ঘুমাব, এটা কেমন কথা হবে? এদিক-ওদিক একটু বেড়ানোর প্ল্যান করলে কেমন হয়?’

তখন রাজ্যের বিরক্তি ঝেরেছিল মাহবুব আলি, ‘ঐসব সী-বিচ, পাহাড়ী ছরাটরা বহুত দেখছি আমি! খালি মানুষজন গাদাগাদি দিয়া ঘুরতাছে! আর ভাল্লাগে না! আমি খালি ঘুমাইতে চাই।’

‘না! আমি টেকনাফে যেতে চাই। আমি তো টেকনাফে যাই নি কখনও! আমার দৌড় কক্সবাজার পর্যন্তই!’ দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল সায়কা শারমিন। এবং সে ইন্টারনেটে টেকনাফ-ভ্রমণ সংক্রান্ত গবেষণায় লেগে পড়েছিল।

মাহবুব আলি তো জানে, ইন্টারনেটে সার্চ করে শান্ত একটা সমুদ্র সৈকত এবং মাথিনের কূপ ছাড়া টেকনাফে দেখার মতো তেমন কিছুই খুঁজে পাবে না সায়কা শারমিন। এ জগতের সুখী মানুষেরা দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে যায়, তারা লইট্টামাছের ফ্রাই খায়, রূপচান্দার ঝোল চাখে। সেসব সুখী মানুষের জগতে মাহবুব আলির কিছু করার নেই। তবে সে সায়কা শারমিনের উদ্যমে কোনও বাধা দেয় নি। দু’দিন ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করে এবং পরিচিতদের সাথে কথা বলার পরে সায়কা মাহবুব আলিকে বলেছিল, ‘যা বুঝলাম, টেকনাফের বিচটা অনেক নির্জন। ঘুমিয়ে যদি সময় পাই তবে আমরা টেকনাফ-বিচে না-হয় একটু হাঁটলাম! কী বলেন আপনি?’ তাতে আর অমত করার কোনও কারণ দেখে নি মাহবুব আলি।

ক’দিন পরেই সায়কা শারমিন পণ করেছিল যে সামনের মাসে, অর্থাৎ আষাঢ় মাসে, যদি তাকে চারদিনের জন্য ছুটি না-দেয়া হয় তবে সে আলবত কাজ ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনও ট্রাভেল এজেন্সিতে যোগ দেবেই দেবে। সায়কা শারমিনের হুমকিতে অবশ্য অফিস তাকে ছুটি মঞ্জুর করেছিল শেষ পর্যন্ত। তারপর জেনারেল ম্যানেজারের হাতে-পায়ে ধরে, তাকে মেঘনাঘাট থেকে আনা বিশাল একটা রুইমাছ উপঢৌকন দিয়ে একই সময়ে ছুটির ব্যবস্থা করে ফেলেছিল মাহবুব আলি।

সেদিন রাতে ফোন করে হাসতে হাসতে মাহবুব আলিকে বলেছিল সায়কা শারমিন, ‘কোয়ি বাত নেহি! আষাঢ় মাস জন্যই তো ভালো হলো! সী-বিচে ভিড় কম থাকবে। তাই না? আপনি তো মানুষজন থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলেন! আর দেখেন, অফ সিজেন বলে হোটেল ভাড়াও কম পড়বে আমাদের!’

প্রত্যুত্তরে মাহবুব আলি বলেছিল, ‘কোনও মাসেই আমার কিছু যায় আসে না—বুঝলেন তো? আমি শুধু আপনের সাথে মন ভইরা ঘুমাইতে চাই। ঢাকা শহরে কেউ আমারে সেই সুযোগটা দিব না। চিন্তা করেন, আম্মারে কইলাম যে তুমি না-হয় কয়দিন সিরাজদিখান গিয়া থাইকা আস, আর সে কিনা আমারে কয়—সে গ্রামের বাড়ি চইলা গেলে আমারে রাইন্ধা দিব কেডা! মনে হইতেছে, আমি যেন খাওনের লিগা কানতাছি! আমার তো দরকার ঘুম! বুঝলেন তো অবস্থাটা?’


হোটেলের রুমে ঢুকে সোজা হাত-মুখ ধুয়ে ছাই রঙের একটা নাইটি পরেছিল সায়কা শারমিন এবং মাহবুব আলিকে সে খোঁচাচ্ছিল, ‘জলদি যান তো! কাপড় পাল্টে আসেন। ঘুমে চোখ ভেঙে আসছে আমার!’


তখন, মাহবুব আলির উষ্মার বহর দেখে, হা-হা করে হেসে উঠেছিল ভুতের গলির সায়কা শারমিন। তবে একটু পরেই সে বিষণ্ন হয়েছিল। পিজি হাসপাতালে নার্স হিশেবে কর্মরত তার ফুফাত বোনের বরাতে মাহবুব আলিকে সে বলেছিল যে ঘুমহীনতার সাথে সম্পর্কিত একটা অসুখ আছে। সেই অসুখটা ধরলে দিনের পর দিন আক্ষরিক অর্থেই মানুষের ঘুম হয় না। একসময়ে মানুষের ভেতরে নানা রকমের মানসিক বিকার দেখা দেয়, অসুস্থতার ঘোরে সে প্রলাপ বকতে থাকে, তার বিভ্রম দেখা দেয়, এবং তার মনের ভেতরে আনাগোনা করতে থাকে বিভিন্ন কল্পিত বস্তু অথবা কল্পিত মানুষের অবয়ব। এভাবে চলতে চলতে আঠারো মাস মতো পরে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মানুষ। সায়কা শারমিন মাহবুব আলিকে আরও বলেছিল, ‘মাঝে দু’দিন ধরে যখন আপনার ঘুম হলো না তখন আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, জানেন? আমি যে অসুখটার কথা বলছি, তার কোনও চিকিৎসা নাই! আপনাকে নিয়ে কক্সবাজারে না-গেলে আর চলছে না!’

তার জন্য ভুতের গলির সায়কা শারমিনের উদ্যোগ লক্ষ করে অভিভূত হয়ে পড়েছিল মাহবুব আলি। সে চুপচাপ ভাবছিল, সায়কা শারমিনের মতো এমন একজন উষ্ণ মানুষকে কোন যুক্তিতে পরিত্যাগ করেছিল তার প্রেমিক? ব্যাপারটা আসলে মেলে না! তখন সে সায়কা শারমিনের মায়ায় আরেক প্রস্থ জড়িয়ে গিয়েছিল। তার এও মনে হয়েছিল—আগে কেন দেখা হলো না কাজলনয়নার সাথে! তাহলে হয়তো তার রাতগুলো এমন করে অনিদ্রায় নিঃশেষিত হয়ে যেত না! তবু ভালো, সায়কা শারমিনের উষ্ণতায় এখনও যদি তার ব্যর্থ জীবনের অপচয় কিছুটা হলেও রোধ করা যায়!

আষাঢ়স্য অষ্টম দিবসের রাতে এগারটার দিকে রাজারবাগ থেকে কক্সবাজারগামী বাসে উঠেছিল সায়কা শারমিন এবং মাহবুব আলি। সারারাত বাসের সিটে বসে ঝিমাতে ঝিমাতে, এর-ওর গায়ে ঢলে পড়তে পড়তে পরদিন সকাল আটটার দিকে কক্সবাজার শহরে নেমেছিল তারা। তখন আকাশ ছেয়ে আছে জলদ মেঘের দল। কক্সবাজারে একপশলা বৃষ্টিও হয়ে গেছে। আবহাওয়াটায় বেশ ঠান্ডা-ঠান্ডা ভাব।

সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে বেশ ভেতরে সস্তা একটা হোটেলে তিনরাতের জন্য ডাবল বেডের একটা নন-এসি রুম আগে থেকেই রিজার্ভ করে রেখেছিল সায়কা শারমিন। পূর্ব পরিচয়ের সূত্রে ভ্যাটসহ প্রতিরাতে তিন হাজার টাকা ভাড়ার জায়গাতে তাই তাদের ক্ষেত্রে শতকরা তিরিশ ভাগ ডিসকাউন্ট মিলে গিয়েছিল। হোটেলে চেক ইন করে পাশের একটা সস্তা রেস্টুরেন্টে গিয়ে তারা নাশতা সেরেছিল সবজি-পরোটা দিয়ে। নাশতা করার পরে রসিয়ে রসিয়ে চা আর সিগারেট খাচ্ছিল মাহবুব আলি। কিন্তু তখন ঘুমে সায়কা শারমিনের দু’চোখ সরু হয়ে আসছিল, চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে ঢলে পড়ছিল সে। তাই সায়কা শারমিন অস্থির হয়ে মাহবুব আলিকে তাড়া দিচ্ছিল বারবার, ‘জলদি হোটেলে চলেন তো!  এমন ঘুম পেয়েছে যে আমি আর বসে থাকতে পারছি না!’ কাজেই গরম চা পিরিচে ঢেলে সুরসুর আওয়াজ তুলে চটজলদি চা খেয়েছিল মাহবুব আলি। তারপর রিকশাতে বসে আরামে একটা সিগারেট টানতে টানতে সায়কা শারমিনের অনুগামী হয়েছিল সে।

হোটেলের রুমে ঢুকে সোজা হাত-মুখ ধুয়ে ছাই রঙের একটা নাইটি পরেছিল সায়কা শারমিন এবং মাহবুব আলিকে সে খোঁচাচ্ছিল, ‘জলদি যান তো! কাপড় পাল্টে আসেন। ঘুমে চোখ ভেঙে আসছে আমার!’ কাজেই সায়কা শারমিনের নির্দেশনা অনুসরণ করেছিল মাহবুব আলি। বাথরুম থেকে বের হয়ে সে দেখেছিল, দেয়ালের সাথে লাগানো খাটটায় দেয়ালের দিকে মুখ করে শাদা একটা চাদরে আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে চুপচাপ শুয়ে আছে সায়কা শারমিন। সে ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা তা অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না। সন্তর্পণে চাদরের ভেতরে ঢুকেছিল মাহবুব আলি। তার মনে হচ্ছিল, মেয়েটা যদি ঘুমিয়ে গিয়েই থাকে, তবে তার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়াটা মোটেই উচিত হবে না। জীবন নিয়ে কতই না ক্লান্ত মেয়েটা! তারপর একগাদা কুণ্ঠা নিয়েই সে মেয়েটার শরীরের সাথে কিছুটা সেঁটে গিয়েছিল এবং পেছন দিক থেকে আলতো করে মেয়েটাকে বাম হাতে জড়িয়েছিল সে। তখন মৃদু একটা আদুরে আওয়াজ উঠেছিল মেয়েটার মুখ থেকে এবং মেয়েটা একটু নড়েচড়ে শুয়ে মাহবুব আলির তলপেটের সাথে তার গুরুভার নিতম্বের যতটুকু ব্যবধান ছিল তাও ঘুচিয়ে ফেলেছিল। মেয়েটার ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে মাহবুব আলি ফিসফিস করে বলেছিল, ‘যা টায়ার্ড লাগতেছে না! আপনে ঘুমাইয়া যান। আমিও ঘুমাই।’ মাহবুব আলির এই কথাটার ভেতরে হয়তো কোনও জাদু ছিল! সেই কথাটা মাহবুব আলি উচ্চারণের সাথে সাথেই তারা দু’জনে তাদের ক্লান্ত শরীর আর মনের ভার ছেড়ে দিয়েছিল এবং নিমিষের ভেতরে তারা ঘুমিয়ে পড়েছিল যুগপৎভাবে।

সেদিন দুপুরের দিকে ঘুম ভেঙেছিল মাহবুব আলির। ঘুম ভেঙে সে আর মনে করতে পারছিল না যে অপরিচিত একটা ঘরে সে কী করছে এবং একটা মেয়ে কেন তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে! কয়েক সেকেন্ড পরেই তার মনে পড়েছিল সব কিছু। সায়কা শারমিনের ভারি শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ শুনে সে বুঝতে পেরেছিল যে মেয়েটা তখনও গভীর ঘুমে নিমজ্জিত। রাতভর জার্নির কারণে মাহবুব আলির শরীরে ঘুমের যতটুকু অভাব ঘটেছিল তা পূরণ হলো বলে মনে হয়েছিল তার। তারপর বিছানা ছেড়ে উঠে সোফায় বসে সে একটা সিগারেট খেয়েছিল এবং সায়কা শারমিনের সাথে একটু দূরত্ব রেখে বিছানার কোনায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে আবারও ঘুমিয়ে গিয়েছিল সে।

সেদিন দ্বিতীয় পর্যায়ে মাহবুব আলির ঘুম ভেঙেছিল সন্ধ্যে ছ’টা নাগাদ। সায়কা শারমিন তখনও ঘুমে অচেতন। মাহবুব আলি হিশেব কষে দেখেছিল যে সে ঘুমিয়েছে প্রায় আট ঘণ্টা মতো! পনের বছর আগের সময়গুলোতে শেষবারের মতো এমন দীর্ঘ সময়ের জন্য সে একটানা ঘুমিয়েছিল বলেই স্মরণ হয়েছিল তার। তখনও নাসরিন বানুর সাথে তার বিয়ে হয় নি। গভীর ঘুমের তৃপ্তি নিয়ে সায়কা শারমিনের পাশ থেকে সন্তর্পণে সরে এসে চাদর থেকে বের হয়েছিল সে। বারান্দায় গিয়ে সে একটা সিগারেট ধরিয়েছিল। সাগরের চনমনে বাতাসে ক্ষিধে পেয়েছিল তার। এবং তখনই ঘরের ভেতর থেকে সায়কা শারমিনের মৃদু কণ্ঠ শোনা গিয়েছিল, ‘কোথায় আপনি?’

‘এই তো বারান্দায়। সিগারেট খাই।’ এই বলতে বলতে সিগারেট নিয়ে ঘরে ঢুকেছিল মাহবুব আলি এবং সে দেখেছিল, বিছানায় শুয়ে শুয়ে আড়মোড়া ভাঙছে মেয়েটা, হয়তো দীর্ঘ ঘুমের তৃপ্তিতেই। তখন মেয়েটার চোখে আর বিষণ্নতা ভর করে ছিল না। তার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠেছিল হাসিতে।

প্রশান্ত কণ্ঠে ভুতের গলির সায়কা শারমিন তখন মাহবুব আলিকে বলেছিল যে চা-টা খেয়ে সাগরের ধারে বসে সে সূর্যাস্ত দেখতে চায়। মাহবুব আলি রাজি থাকলে বালুকাবেলায় একটু হাঁটাও যেতে পারে। তারপর তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে নেবে তারা। সলজ্জ হাসিতে মাহবুব আলিকে সে আরও বলেছিল, ‘আমাকে আবারও ঘুমাতে হবে। কতদিন যে এত আরামে ঘুম হয় না আমার! মনেও পড়ে না, জানেন?’

চা খেয়ে সাগরবেলাতে হাঁটতে মন্দ লাগছিল না তাদের। শরীর খুব নির্ভার মনে হচ্ছিল তাদের। ফুরফুরে বাতাসে উড়ছিল তাদের চুল। হাঁটু সমান পানিতে ঢেউয়ের দোলায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখেছিল তারা। অফ-সিজন হলেও তাদের চারপাশটা মুখরিত হয়েছিল অজস্র মানুষের উল্লাস আর কোলাহলে। মাহবুব আলি সায়কা শারমিনকে বলেছিল, ‘এইখানে মানুষ ভনভন করতাছে! চলেন, রুমে গিয়া ঘুমাইগা!’

কাজেই মাহবুব আলিকে সঙ্গে নিয়ে বিচ ছেড়ে সস্তা একটা রেস্টুরেন্টে রাতের খানা খাওয়ার জন্য ঢুকে ছিল সায়কা শারমিন। সেখানে বসে রূপচান্দার ঝোল দিয়ে ভাত খেতে খেতে তারা দু’জনেই ঘুমে বিশ্রীভাবে হাই তুলছিল বারবার। তাই চটজলদি খানা শেষ করে রাত ন’টার পরপর হোটেলের রুমে ফিরে গিয়েছিল তারা এবং কাপড়চোপড় না-পাল্টেই তারা সোজা শুয়ে পড়েছিল বিছানায়। টেলিভিশনে খবর ছেড়েছিল সায়কা শারমিন। একটু পরে সে মাহবুব আলির বুকের ভেতরে আশ্রয় নিয়ে মাহবুব আলির দুই উরুর মাঝে ঢুকিয়ে দিয়েছিল তার ডান পা-টা। ক’মিনিটের ভেতরেই মেয়েটার ভারি শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ পেয়েছিল মাহবুব আলি। কুণ্ঠিত হলেও সায়কা শারমিনের নরম শরীরের স্পর্শ খুব ভালো লাগছিল তার। তার প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে এভাবে ঘনিষ্ঠভাবে ঘুমানোর স্মৃতি তেমন একটা নেই বলেই তার মনে হয়েছিল। সায়কা শারমিনের উষ্ণতায় সেও ঘুমিয়ে গিয়েছিল আধা ঘণ্টা মতো পরে। টেলিভিশনে খবর চলছিল তখনও।


আলতো করে ক’টা চুমু খেয়েছিল সায়কা শারমিন। তার অভিযান ধাবিত হয়েছিল মাহবুব আলির ঠোঁট পর্যন্ত। তখনই জ্বলে উঠেছিল মাহবুব আলির শরীর, কত বছর পরে—তা সে মনেও করতে পারছিল না!


কক্সবাজারে ঘুমাতে যাওয়ার দ্বিতীয় দিনে সকাল আটটার দিকে ঘুম ভেঙেছিল মাহবুব আলির। আধোঘুমের ভেতরে সে অনুভব করেছিল, তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে তার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে কেউ! তার মনে হয়েছিল, সেই মানুষটা নিশ্চয় ভুতের গলির সায়কা শারমিনই হবে! তখন পাশ ফিরে শুয়ে সায়কা শারমিনের নরম বুকের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল মাহবুব আলি। ঘুম ছুটে যাওয়ার ভয়ে চোখ খুলছিল না সে। আলতো করে তার উন্মুক্ত পিঠে নরম আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছিল সায়কা শারমিন। তখন ঝিমিয়ে গিয়েছিল মাহবুব আলি।

সেই সকালে ঘরেই নাশতার অর্ডার দিয়েছিল তারা। কিছু পরে হোটেলের একজন বয় তাদের ঘরে বুটের ডাল-পরোটা দিয়ে গিয়েছিল। সোফায় মুখোমুখি বসে নাশতা করতে করতে ঢাকা শহরের রাস্তা কাটাকুটি সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছিল তারা। নাশতা সেরে বাথরুমে গোসল করতে ঢুকেছিল সায়কা শারমিন। আর ঝরঝরে মন নিয়ে বারান্দায় গিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়েছিল মাহবুব আলি। তখন আকাশে জমে থাকা গম্ভীর মেঘদলের সাথে দেখা হয়েছিল তার। সে বুঝেছিল, বৃষ্টি নামবে এবং তাদের আর সাগরবেলায় হাঁটতে যাওয়া হবে না। সত্যিই তাইই—খানিক পরেই আকাশ ঝেপে বৃষ্টি নেমেছিল। তখন হোটেলের বাইরে না-যাওয়ার পক্ষে একটা মোক্ষম যুক্তি তৈরি হয়েছিল তার ভেতরে।

গোসল সেরে মেরুন রঙের সালোয়ার-কামিজ পরে বাথরুম থেকে যখন বের হয়েছিল সায়কা শারমিন তখন হাসতে হাসতে তাকে মাহবুব আলি বলেছিল, ‘দেখলেন তো! বৃষ্টি আইসা পড়ল! বিচে আর যাওয়া হইব না এই বেলা!’

‘আপনের বদ দোয়া লেগেছে আরকি! কী আর করা! চলেন, শুয়ে থাকি।’ এই বলে টেলিভিশন ছেড়ে খবর দেখতে দেখতে পুনরায় বিছানার শাদা চাদরের নিচে ঢুকে গিয়েছিল সায়কা শারমিন। সোফায় বসে সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল মাহবুব আলি। তখন শ্যামবর্ণার অনুচ্চকিত সৌন্দর্য নতুন করে ধরা পড়েছিল তার চোখে।

নিচু স্বরে মাহবুব আলি সায়কা শারমিনকে বলেছিল, ‘আকাশের যা গতিক দেখতাছি তাতে মনে হইতাছে যে আবারও বৃষ্টি হইব। নিম্নচাপ আসতাছে মনে হয়। আপনে টেকনাফ যাইবেন কী কইরা?’

টেলিভিশনের খবরে ডুবে থাকতে থাকতে সংক্ষেপে উত্তর করেছিল সায়কা শারমিন, ‘কী আর করা! টেকনাফ যাওয়া বাদ দেন! পড়ে পড়ে ঘুমাতেই বেশি ইচ্ছে করছে আমার!’

তারপর মাহবুব আলিও অনেকক্ষণ ধরে গোসল করেছিল সাবান-শ্যাম্পু মেখে। গোসল সেরে সে বারান্দায় গিয়ে বৃষ্টি দেখেছিল কিছুক্ষণ। বৃষ্টিই-বা কতক্ষণ দেখা যায়! কাজেই সে ঘরে ফিরে পুনরায় ঢুকে গিয়েছিল বিছানার শাদা চাদরের নিচে। তখন টেলিভিশনে গান শুনছিল সায়কা শারমিন। চাদরের নিচে ঢুকতেই হঠাৎ করে মাহবুব আলির নাকে এসে লেগেছিল মিষ্টি একটা গন্ধ। সে তার পাশে শুয়ে থাকা সায়কা শারমিনকে নিচু স্বরে বলেছিল, ‘আমি তো আপনের মতো গুছায়া কথা কইতে পারি না। তাও কই : আপনের গায়ের গন্ধটা না খুব সুন্দর—এক্কেবারে ছাতিমফুলের মতন!’

বেশ লজ্জাই পেয়েছিল মেয়েটা। অস্ফুট স্বরে সে বলেছিল, ‘তাই নাকি? কিন্তু আমি তো ছাতিমফুল চিনিই না! কেমন হতে পারে ছাতিমফুলের গন্ধটা?’

‘তা তো আর আপনেরে বুঝাইতে পারব না! আমি কথা কইতে পারি না ভালো। শীতকাল আইলে পরে আপনেরে ছাতিমফুল দেখামু নে।’ এই বলে মাহবুব আলি মনোযোগ দিয়েছিল টেলিভিশনে বাজতে থাকা কোনও একটা গানে। তখন চকিতে মাহবুব আলির শরীরে ঘন হয়েছিল ভুতের গলির সায়কা শারমিন। শ্যামবর্ণার ডাগর চোখে উদ্বেলিত হয়েছিল কৌতুক। তার মুখমণ্ডলে যে ক্লান্তিজনিত কাঠিন্য জমে ছিল এই সেদিনও, তা ক্রমশ ঝরে ঝরে পড়ছিল। ফিসফিস করে মাহবুব আলিকে মেয়েটা বলেছিল, ‘আপনার গায়ের গন্ধও খুব ভালো লেগেছে আমার!’ এবং তারপর মাহবুব আলির শরীরের ভেতরে ঢুকে পড়ে তার ডান গালে আর গলার অংশে আলতো করে ক’টা চুমু খেয়েছিল সায়কা শারমিন। তার অভিযান ধাবিত হয়েছিল মাহবুব আলির ঠোঁট পর্যন্ত। তখনই জ্বলে উঠেছিল মাহবুব আলির শরীর, কত বছর পরে—তা সে মনেও করতে পারছিল না!

শরীর জ্বলে গেলেই বা কী হবে? যদি কোনও কারণে তখন সঙ্গম যথার্থ বলে মনে না-হয়, যদি তখন দোলাচল জাগে মনের গভীরে? তবে তো আর কিছুই করার থাকে না! তাই বিছানা থেকে উঠে গিয়ে উত্তেজনা কমাতে মাহবুব আলি একটা সিগারেট ধরায়। মুচকি হেসে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে সায়কা শারমিন। সিগারেট শেষ করে ফের বিছানায় যায় মাহবুব আলি এবং সায়কা শারমিনকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বৃষ্টির আওয়াজের দিকে মনোযোগ দিতে শুরু করে সে। তার বাম হাতের আঙুলগুলো নিয়ে তখন ধীরে ধীরে খেলছে সায়কা শারমিন। তখন নিমিষেই মিলিয়ে যেতে শুরু করেছিল মাহবুব আলির সচেতন জগৎ। সেখানে প্রশান্তি জেগে উঠেছিল এবং সে ঘুমিয়ে পড়েছিল আবার।

প্রচণ্ড ক্ষিধের ঘোরে তাদের দু’জনের ঘুম ভাঙে বিকেল চারটের দিকে। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে সায়কা শারমিন মাহবুব আলিকে বলে, ‘নাহ্! বাইরে যাব না। ঘরেই খাবার অর্ডার দেন।’ সেই মতো করিডোরে বসে থাকা জনৈক বয়কে হোটলের লাগোয়া সস্তা একটা রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আনতে পাঠায় মাহবুব আলি। খাবার এলে খাটের পিঠে হেলান দিয়ে বসে মজা করে কোরালমাছের ঝোল দিয়ে ভাত খায় সায়কা শারমিন এবং সে নানা বিষয় নিয়ে গল্প করে মাহবুব আলির সাথে। সায়কা শারমিনের গল্প শোনার ফাঁকে সোফায় বসে খেয়ে নেয় মাহবুব আলি। একটা সিগারেট ধরিয়ে মেয়েটার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় ম্রিয়মাণ কণ্ঠে মাহবুব আলি বলে, ‘দুই দিন তো শেষ হয়া যাইতেছে! আর মাত্র একদিন পরে ঢাকায় ফেরত যাইতে হইব! তারপর আপনে কেমনে ঘুমাবেন আর আমিই বা কেমনে ঘুমামু!’

টেলিভিশনে কোনও গানের অনুষ্ঠান দেখছিল ভুতের গলির সায়কা শারমিন। মাহবুব আলির কথার প্রেক্ষিতে বিষণ্ন চোখ মেলে সায়কা শারমিন মাহবুব আলির দিকে তাকিয়েছিল একপলক। একটু পরে গম্ভীর কণ্ঠে সে বলেছিল, ‘শোনেন, ক্লান্তি থেকে আমার মুক্তি দরকার। তাই আমি আপনার সাথে আরও ঘুমাতে চাই।’


তখন পৃথিবীতে ক্রমশ রাত ঘন হচ্ছিল। ভুতের গলির সায়কা শারমিন এবং মালিবাগের মাহবুব আলি টেলিভিশন দেখতে দেখতে আবারও আক্রান্ত হয়েছিল ঘুমের তৃষ্ণায়।


তা নিয়ে মাহবুব আলির মনে স্পষ্টতই কোনও দ্বিধা ছিল না। সে কেবল ভাবছিল, এই পৃথিবী কি কোনওদিন তাদের দু’জনকে একসাথে ঘুমাতে দেবে? কিভাবে সেটা সম্ভব? নিশ্চয় একই প্রশ্ন কড়া নাড়ছিল সায়কা শারমিনের মনেও। কিন্তু তারা সেসব বিষয় নিয়ে আর কোনও আলোচনায় ঢোকে নি। বিছানার দু’প্রান্তে তারা দু’জনে যার যার মতো চুপচাপ শুয়েছিল। গভীর মনোযোগ দিয়ে টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখছিল তারা। মনে হচ্ছিল, তারা যেন অনেকদিন টেলিভিশন নামক যন্ত্রটা দেখেই নি!

সেই বিকেলে তারা পরস্পরকে জড়াল না। তাদের আর ঘুমানো হলো না।

সন্ধ্যের আগ-আগ দিয়ে মুখ খুলেছিল নির্বাক সায়কা শারমিন। বিষণ্ন চোখ তুলে একটু দূরে বিছানায় শুয়ে থাকা মাহবুব আলির দিকে তাকিয়ে সে একটু হাসতে চেষ্টা করেছিল এবং সে বলেছিল, ‘অতশত ভেবে আর কী হবে! চলেন, হাঁটতে যাই। ভালো লাগবে আপনার।’

তাই সন্ধ্যেবেলায় মাহবুব আলি আর সায়কা শারমিন হাঁটতে গিয়েছিল সাগরবেলায়। বিচ-চেয়ারে বসে বসে এটা-ওটা নিয়ে গল্প করেছিল সায়কা শারমিন। মুগ্ধ হয়ে বঙ্গোপসাগরে সূর্যাস্ত দেখেছিল সে। কথা বলতে ভালো লাগছিল না মাহবুব আলির। এক ফাঁকে চিন্তিত মাহবুব আলি সায়কা শারমিনকে বলেছিল, ‘কোথাও পালায়া গেলে হয় না যেইখানে কোনও মানুষজন থাকব না? আমি আর আপনে একলগে ঘুমাইতেছি না গাছে চইড়া নারকোল পারতাছি—হেইডা তো কেউ আর দেখতে আসতাছে না তহন! কী কন আপনে?’

মাহবুব আলির কথা শুনে সায়কা শারমিনের ঠোঁটের কোণে খেলে গিয়েছিল ক্লিষ্ট একটা হাসি। সেই হাসির হয়তো কোনও অর্থই ছিল না! মাহবুব আলির ইচ্ছেটার কী করা যায় হয়তো-বা তাই নিয়েই সে ভাবছিল। ফেরার পথে তারা সুগন্ধা পয়েন্টের একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে ভাত খেয়েছিল রূপচান্দার ঝোল দিয়ে। বিভিন্ন দোকান ঘুরে ঘুরে ক’টা বার্মিজ দুল, চুড়ি আর ত্বক উজ্জ্বল করার জন্য উপটান কিনেছিল মেয়েটা। তখন মেয়েটার ভেতরে উচ্ছলতা এবং প্রাণশক্তি ফিরে আসতে দেখে স্বস্তি পেয়েছিল মাহবুব আলি। হোটেলে ফিরে পরস্পরের শরীরের সুঘ্রাণ, পরস্পরের উষ্ণতায় শুয়ে শুয়ে টেলিভিশনে হাসির কোনও নাটকও দেখেছিল তারা এবং সকৌতুকে হেসেছিল প্রাণ খুলে।

তখন পৃথিবীতে ক্রমশ রাত ঘন হচ্ছিল। ভুতের গলির সায়কা শারমিন এবং মালিবাগের মাহবুব আলি টেলিভিশন দেখতে দেখতে আবারও আক্রান্ত হয়েছিল ঘুমের তৃষ্ণায়। কক্সবাজারে দ্বিতীয় রাতেরবেলায় পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আবারও একসময়ে তারা ঘুমিয়ে পড়েছিল। পরদিন হয়তো অনেক বেলা করে ঘুম থেকে উঠেছিল তারা, হয়তো-বা আরও গভীর ঘুম হয়েছিল তাদের।

ফয়জুল ইসলাম

জন্ম ২৪ নভেম্বর, ১৯৬৩; সিদ্ধেশ্বরী, ঢাকা।

শিক্ষা : এম.এ (অর্থনীতি); এম.এ (উন্নয়ন অর্থনীতি)

পেশা : উপ-প্রধান, পরিকল্পনা কমিশন, বাংলাদেশ সরকার।

প্রকাশিত বই :

নক্ষত্রের ঘোড়া (১৯৯৮) [গল্পগ্রন্থ, বিদ্যাপ্রকাশ, ১৯৯৮]
খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক[ গল্পগ্রন্থ, সমগ্র প্রকাশন, ২০১৬]
আয়না [গল্পগ্রন্থ, পার্ল পাবলিশার, ২০১৭]
নীলক্ষেতে কেন যাই [গল্পগ্রন্থ, যুক্ত, ২০১৭]

ই-মেইল : faizulbd@gmail.com

Latest posts by ফয়জুল ইসলাম (see all)