হোম গদ্য গল্প ঘুমঘুম রাত

ঘুমঘুম রাত

ঘুমঘুম রাত
96
0

চাকরি থেইকা রিটায়ার্ড করার পর আব্বা কয়েকখান অভ্যাস আপন কইরা নিছে। তার মধ্যে একটা হইল, তারে কোনো ব্যাপার নিয়া কেউ আপত্তি জানাইলে সেইটা আমলে না নেওয়া। ঘরের কিংবা বাইরের যে-কেউ কোনো বিষয়আশয় কিংবা কাজকাম নিয়া আপত্তি জানাইলে সে গায়ে মাখে না। ভাবটা এমন ধরে যেন তাতে আমার কি! আব্বার এই ভাব ধরার ব্যাপারটা আমার ভাল্লাগে। এই যে আমি মাস্টার্স পাস কইরা চাকরি পাইতাছি না এইটা নিয়া মাইনসের আলগা উপদেশ কিংবা চুঁ চুঁ করা মশকরা যদি আব্বার মতন উড়ায়া দিতে পারতাম!


রাতে মশারির ভেতর বইসা আব্বা পেপার খোলে। তারপর কুলকুল কইরা ঘামে। পেপারে রোহিঙ্গাদের ভিটামাটি ছাইড়া জান নিয়া পালায়া আসার ফটো দেইখা আব্বার বুক ধড়ফড়ায়।


আব্বার লগে আমার লাগে না। যেমন লাগে আম্মা আর বড় ভাইয়ের। আব্বা রিটায়ার্ড করার পর আম্মা চাইছিল পেনশনের টাকাপয়সা নিয়া সে যা পরামর্শ দিবে সেইটাই হবে। আব্বা সেই পরামর্শ না শুইনা পয়লা ধাক্কা দেন। তারপর যতই দিন গড়ায় ততই সে বেয়াড়া হইয়া ওঠে, এইটা আম্মায় কয়। আমি এইসব শুইনা মজা পাই। আব্বা আয়ু ফুরারকালে আইসা এমন মাথাগরম আচরণ করবে তার আগের জিন্দেগি দেইখা কোনোভাবেই এইডা বিশ্বাস করা যায় না। আব্বা তার মাঝারিগোছের সরকারি চাকরিটায় সারাজীবন মুখ বুইজা কাজ কইরা গেছে। উপরি ইনকাম নাই দেইখা আম্মায় সবসময় ক্যাটকেট করছে তার সংসার চালাইতে হিমশিম খাওয়া নিয়া। আমি এতসব নিয়া মাথা ঘামাইতাম না। আমার বড় এক ভাই পলিটিক্যাল সায়েন্সে মাস্টার্স পাশ কইরা ঠিকাদারি ব্যবসায় নামছে। যদিও এখনো যুৎ কইরা উঠতে পারে নাই। আর এক বোন তার স্বামী আর পুত্র নিয়া সুখেই আছে। দুখী বলতে গেলে আমি। চাকরির চেষ্টা করতেছি কিন্তু মিলে না। বাড়ি থেইকা বাহির হইলে এলাকার কিছু মুরুব্বি টাইপের লোক খোটা মাইরা জিগায় চাকরিবাকরি হইব কিনা। পয়লা পয়লা ভদ্রজ্ঞানে জবাব দিতাম। পরে বুঝছি, এরা বইসা থাকে, গ্যাজায় আর ইচ্ছা কইরা এমন খোঁটা মারে। না হইলে কি আর সকালে একবার জিগায় তো বিকালে আরেকবার জিগায় নাকি! তো একদিন আমি ওইরকম জিগানেঅলা একজনরে সবার সামনে বলছিলাম, আমার চাকরি নিয়া এত খোঁজ নেন ক্যান, মাইয়া বিয়া দিবেন নাকি! এমন কথার পর স্বভাবতই আব্বার কানে নালিশ আসে। আব্বা ওইদিন রাইতে খাইতে বইসা আমার দিকে তাকায়া মিটমিটায়া হাসছিল কিছু কয় নাই। সেইদিন থেইকা আমি টের পাইছিলাম আব্বায় স্বাধীনতার স্বাদ নিতাছে। স্বাধীনতা বলতে এক্কেবারে কারও ব্যাপারে নাক না-গলায়া নিজের মতন থাকাটা বাইছা নেওয়া। আব্বার লগে আমার একটু লাগাবাজা হইছিল। সেইটা আমি মনে মনে মিটমাট কইরা নিছি। আব্বা রাইতে ঘুমার আগে মশারির ভেতরে বইসা পেপার পড়ার একটা অভ্যাস তৈরি করে। রিটায়ার্ড কইরা সকালে ঘুম থেইকা উঠার পর আর রাইতে ঘুমানোর আগে দুইবেলা আব্বা পেপার পড়ে। আর আমি সারাদিন পেপার না পইড়া রাইতে ঘুমার আগে পড়ি। ওইসময় পেপার পইড়া আমি চাকরির প্রিপারেশনের সাধারণ জ্ঞান টোকাই। যদিও আব্বার ধারণা চাকরি করার চেয়ে বেকার থাকা সম্মানের যদি সিস্টেম জানা থাকে। ম্যালাদিন এই কথাটা নিয়া তর্ক লাগাইতে চাইছি কিন্তু আব্বা পাত্তা দেয় নাই। তো ওইসময় আব্বা যখন পেপারটা মশারির ভেতর নিয়া পুরাটাই মেইলা ধইরা পড়তে থাকে তখন আমি চাইতে গেছিলাম। আব্বা দেয় নাই, কিছু কয়ও নাই। আমিও জোর দিয়া কিছু কইতে পারি নাই। কারণ চাকরি না-থাকায় আমার মনে জোর আছিল না। মশারির ভেতর পেপার পড়া নিয়া আম্মায় আব্বার লগে একটা ক্যাওমেও লাগাইতে চাইছিল। আব্বা তার কোনোকথার জবাব দেয় নাই। আম্মায় কইছিল, সারাদিন কাজকাম কইরা রাইতে ঘুমারকালে মশারির ভেতর পেপারের কচকচানি সে মাইনা নিবে না। আব্বা কিছু কয় না দেইখা আম্মায় আরও কয়, এই সংসারের ঘানি টানতে টানতে সারাটাজীবন তার পানি হইয়া গেল। আম্মার এমন কথা আমি ছোটকাল থেইকা শুইনা আসতেছি। তো আম্মা মনে করছিল, আমি আব্বার মশারির ভেতর পেপার পড়ার ব্যাপারটা বন্ধ করতে পারব। কিন্তু ব্যাপারটা উলটা হয়া যায়। আব্বার এমন নির্লিপ্ততা দেইখা আমি পয়লা মনে করছিলাম, আব্বায় কি কানে তুলা দিয়া ঘোরে নাকি! কয়দিনের মধ্যে তার এই আচরণে আমি আকৃষ্ট হয়া পড়ি আর ওইরকম হওয়ার তাল খুঁজি। এমন কইরা দিন কাটতেছিল। কিন্তু আজকের রাতটা আর কাটতেছে না। আমরা বাড়ির সবাই আব্বারে ঘিরা বইসা আছি। আম্মা কান্নাকাটি করতেছে সমানে। আজকের দিনটা ছিল অন্যরকম।

আব্বার পেনশনের ভাতা তোলার ডেট ছিল আজ। এইদিন খুব ভিড় হয় ব্যাংকে। আব্বা যখন সকাল সকাল বাড়ি থেইকা বাহির হইয়া যায় তখনও পেপার বাসায় আসে নাই। ফলে আব্বার আর সকালে পেপার পড়া হয় নাই। দিনটা ছিল খুব গরম। দরদর কইরা ঘামতেছিল শরীর। আব্বাও খুব ঘামছিল। এইরকম একটা দিনের শেষে রাত নামছিল। রাতে মশারির ভেতর বইসা আব্বা পেপার খোলে। তারপর কুলকুল কইরা ঘামে। পেপারে রোহিঙ্গাদের ভিটামাটি ছাইড়া জান নিয়া পালায়া আসার ফটো দেইখা আব্বার বুক ধড়ফড়ায়। আরও কিছু বিবরণ পইড়া এইবার আর নিজেরে কন্ট্রোল করতে পারে না। আম্মা পাশেই বইসা আছিল। আব্বার চোখমুখ আটো হয়া আসে। তখন আব্বা বলে, তার হাঁস-ফাঁস লাগতেছে। তখন আম্মা হাউমাউ কইরা আমার নাম ধইরা ডাক দেয়। আব্বা ক্যামন ফ্যালফ্যাল কইরা পেপারের রোহিঙ্গাদের ছবিতে চাইয়া থাকে। অনেকদিন পর আব্বার এই বিকার মাথাচাড়া দিল। আব্বার এই বিকার বহুত পুরানা। অনেক ডাক্তার কবিরাজ দিয়াও কোনো উপকার পাওয়া যায় নাই। ওই যে আমার দাদা ইন্ডিয়া খেইকা ভিটামাটি ছাইড়া এক কাপড়ে পলাইলো তখনকার পুব পাকিস্তানে সেইটা ১৯৬০ কি ৬২ হবে। তখন থেইকা আমার আব্বার এই রোগ। আব্বা তখন ৮ কি ১০ বছরের। ওই রাইতে যখন এক কাপড়ে জান নিয়া আব্বায় তার আব্বার লগে আরও ভাইবোন মিলা দৌড়াইতেছিল তখন তার মনে ভয় ঢুকছিল যে, তারা রাস্তার মধ্যে মারা পড়বে। এই ভয় আব্বা জিন্দেগি ভর বহন কইরা বেড়াইলো কাউরে কিছু না-জানায়া। তয় মানুষ তারে জানান দিত। আমার বড় বোনের বিয়ার সময় রিফুজির মাইয়া বইলা অনেক সম্বন্ধ ভাঙছে। আমাদের ভিটামাটি নাই, গাঁও-গেরাম নাই এমন কথা কইয়া অনেকেই আব্বারে খেয়াল করায়া দিত ওই রাইতের কথা।


মায়ানমারের লগে ইন্ডিয়া আছে, চীন আছে, কেউ তারে কিছু করতে পারবে না।


আজ আবার অনেকদিন পর আব্বার ওই রাইতের কথা মনে পইড়া যায় যখন সে দেখে কিছু রোহিঙ্গা পোলাপান মৃত্যুরে পাশ কাটায়া দৌড়াইতেছে। অনেকদিন পর আম্মা হাউমাউ কইরা কান্নাকাটি করতেছে। আব্বা ঘোলাটে চোখ নিয়া চারপাশে তাকাইতেছে। আমি দিনের বেলা পেপার পইড়া ভাবছিলাম, রোহিঙ্গা আসতেছে, আরেকখান খেপমারা কাজ পাব। ভার্সিটির ছাত্র থাকাকালে এনজিও করা এক স্যারের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ওপর ডাটা কালেকশনের কাজ কইরা কিছু টাকা কামাইছিলাম। এইবার আবার যখন রোহিঙ্গা আসতেছে তখন মনে করছিলাম স্যারের লগে যোগাযোগ কইরা আরেকটা খেপ মারার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু আব্বার অবস্থা দেইখা মনে হইতেছে সেইটা আর সম্ভব না। আব্বা বিড়বিড় করা শুরু করছে। কিছু অস্পষ্ট নাম বলতেছে। এইসব নাম তার মাথার ভেতরে বহুদিন ধইরা হান্দায়া আছে। আম্মা একবার কইছিল, আব্বারে নিয়া যাইতে তার ইন্ডিয়ার বাড়িভিটায়। ওইটা দেখলে তার মাথাচাড়া দেয়া রোগটা সারতেও পারে। আম্মা আর ভাইয়া মিলা অনেক চেষ্টা করছে কিন্তু তারে রাজি করানো যায় নাই। ওইসব নাম যাদের স্মৃতি নিয়া সে বিড়বিড় করে যদি যায়া দেখে বাস্তবে তারা নাই কিংবা ওইরাইতেই তারা মারা পড়ছিল কিংবা যে-ভিটায় তার শৈশব আটকায়া আছে সেইটা আর নাই, এইরকম যদি হয় তাইলে তার মাথা আরও আউলা হইতে পারে ডাক্তারের এমন শঙ্কায় আব্বারে আর নেওয়া হয় নাই।

আম্মার কান্নাকাটির আওয়াজ শুইনা পাশের ঘর থেইকা বড় ভাই আসে। সে প্রথমে ব্যাপারটারে ইগনোর করতে চায়। তারপর পরিস্থিতির বিবরণ শুইনা মায়ানমারের সু চি-রে শালির বেটি শালি কইয়া গাইল দেয়। ভাইয়ার গাইল শুইনা আব্বা আরও ভয় পায়। সে তখন এমন কইরা ভাইয়া আর আম্মার দিকে চায়া থাকে যেন তারা তার দুনিয়ায় নাই। ভাইয়া কয়েকবার আব্বা আব্বা কইরা ডাকে কিন্তু আব্বা রেসপন্স না-দিয়া বিড়বিড়ানি বাড়ায়া দেয়। তখন কিছু নাম স্পষ্ট হয়। আম্মা ওইসব নাম শুইনা কান্দনের আওয়াজ বাড়ায়া দেয়। এইবার ভাইয়াও ঘাবড়ায়া যায়। তখন সে বিছানা থেইকা রোহিঙ্গাদের একটা মরা শিশুর পানিতে ভাসা ছবিওয়ালা পেপারটা টাইনা নিয়া ছিঁড়া ফালায়। আম্মা চিল্লায়া ডিকরায়া কয়, খোদা, এ তোমার কেমন বিচার? আব্বা কেবল ফ্যালফ্যাল কইরা তাকায়া থাকে। আম্মা আমার দিকে তাকায়া কান্নাকান্না গলায় কয়, এখন কী হবে? আমি কইতে থাকি, তিন লাখ রোহিঙ্গা আইছে, আরও আইতে পারে। মায়ানমারের লগে ইন্ডিয়া আছে, চীন আছে, কেউ তারে কিছু করতে পারবে না। তারচেয়ে ভালো পালায়া যাওয়া। চলেন আব্বা, পালায়া যাই। এইখানে থাকলে আমরা মারা পড়ব। চলেন পালাই বইলা হাতটা বাড়ায়া দিলে আব্বা মশারির ভেতর থাইকা বাহির হয়া আমার হাতটা ধরে। তারপর আমি আর আব্বা ঘুমঘুম রাইতে হাত ধরাধরি কইরা পালাইতে থাকি। পিছে পিছে আমার আম্মা কানতে কানতে দৌড়ায়। আমার ভাইয়ের কোনো খবর নাই। একটু আগে সে যেমনে গালি দিছে তাতে মারা পড়তে পারে।

Masud Parvaj

মাসুদ পারভেজ

জন্ম ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫; দিনাজপুর।

শিক্ষা : স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

প্রকাশিত বই—

জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]
বিচ্ছেদের মৌসুম [গল্প, দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
ঘটন অঘটনের গল্প [গল্প, বটতলা, ২০১১]

ই-মেইল : parvajm@gmail.com
Masud Parvaj