হোম গদ্য গল্প কুকুর হইতে সাবধান

কুকুর হইতে সাবধান

কুকুর হইতে সাবধান
1.13K
0

এক.

মিসেস বোস ভিন্নরকম। তার বাড়ির গেটে বড় বড় করে লেখা কুকুর সম্পর্কিত সাবধানতা। আসলে তিনি কুকুর পোষেণ। তাকে চিনি, মানে জানি, একুশ মাস, আর সেই জানাটা পর্যায়ক্রমে এই বোধে উন্নীত হয়েছিল, বস্তুত তিনি ‘ভিন্ন’ নয়, ‘অন্য রকম’ তথা ‘অনেক রকম’, এবং খুব আন্তরিকতার সাথেই কুকুর পোষেণ। বয়সে বড় এই রমণী হয়তো খেয়ালের বশেই রাস্তা থেকে আমাকে ডেকেছিলেন হারিয়ে যাওয়া সম্ভ্রান্ত ঘরের কোনো শিক্ষিত কুকুর ভেবে, এবং জানতে সহায়তা করেছিলেন যে, তিনি গান ভালোবাসেন। এছাড়া ভালোবাসেন বই পড়তে, দামি শাড়ি পরতে, কপালের মাঝখানে বড় আকারের টিপ পরতে, ইচ্ছে মতো ঘুরতে, খেতে, ঘুমাতে আর যথেচ্ছ সেক্স করতে। যদিও আমি ছিলাম তার সংগ্রহশালার সবচেয়ে তরুণ ও অনভিজ্ঞ কুকুর, তবু সবকিছুই আমাদের মধ্যে ঘটেছিল দ্রুত, আর মিস্টার বোস কুকুর প্রতিপালনের যাবতীয় সাবাসি তাকে উদারভাবে দিতে দিতে, পোষা জার্মান শেফার্ডের গলার চর্বিপুরুষ্টু মাংসে হাত বুলাতে বুলাতে আমার সম্পর্কে যা, এবং যা-কিছু বলতেন, তার সবগুলো পরবর্তী অভিসারে সে ছেনালি হাসিসহ আমার কানের মধ্যে ঢেলে দিত খুব ঘন হয়ে কান কামড়ে ধরে, নতুবা জামার বোতামের ফাঁক গলিয়ে বুকে আলতো হাত বুলিয়ে; আর মুখের ভেতর আলজিভ পর্যন্ত ওর জিভটা ঢুকিয়ে বরাবরের মতোই আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করত যে, কুকুরপ্রীতি ওর চিরকাল একই রয়ে যাবে, আর প্রতিটি বিশ্বস্ত কুকুরের মতো আমার প্রতিও তার মমত্ব থাকবে সীমা-পরিসীমাহীন, অটুট, অবিচল।

অথচ মুখ বিহ্বরের সবগুলো দেয়ালে ওর রাক্ষুসে জিভ তার লোলুপ ছোঁয়া বুলিয়ে যেতে থাকলে আমার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেত! আমি ছটছট করতাম, আর কখনও কখনও প্রশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসত কুঁই কুঁই শব্দ, যা ওর কানে পৌঁছালে শাড়ির আঁচল মাংসের টুকরোর মতো ছুঁড়ে দিত নিচের দিকে, আর আমি দক্ষহাতে, শ্বাসকষ্টসহ ওর ব্লাউজের বোতামগুলো খুলতে থাকতাম এক এক করে। আমার হাত ততক্ষণ পর্যন্ত কাঁপত না, যতক্ষণ পর্যন্ত না ওর নেভি ব্লু বা হালকা পিঙ্ক কালারের দামি ব্রেসিয়ার বেরিয়ে পড়ত আর ঠেকে যেত হুকের সাথে। অনিবার্যভাবেই আমার হাত হুকের নাগাল পাবার সাথে সাথেই কেঁপে উঠত আর প্রতিবারই কাঁপা হাতে হুকের মুখ আলগা করে ওর বিশাল সাইজের মাই দুটো উন্মুক্ত করতে করতে মনে পড়ত, ‘বৎস ধীরে, মনে রেখ, ব্রা-খোলাও শিল্প’। আমার শঙ্কা এতদিন, এতবার ওর সাবধানী হুক খুলে খুলেও এই স্বস্তিটুকু একটিবারের জন্যও পায় নি, আমারও প্যান্ট আছে, এবং বরাবরের মতোই সে তা একটানে খোলে। অবশেষে শরীরে উপর্যুপরি ছ’ইঞ্চির বেশি ঢুকে যেতে যেতে, ওর আবেশী ও সুখী মুখ দেখে নিশ্চিত হই, সত্যিকার অর্থেই সে কুকুর ভালোবাসে।


এতিমখানার শত শত ছেলে-মেয়ের মধ্যে আমিই ছিলাম একমাত্র কুকুর, যে ছিল সম্পূর্ণ অর্থেই বেওয়ারিশ।


দুই.

গত একুশ মাসে কুকুরপ্রীতি আমারও বেড়েছে বৈকি, ফলে রাস্তা-ঘাটে কখনও কখনও বেওয়ারিশ কুকুর দেখলেই দাঁড়িয়ে পড়ি। দাঁড়িয়ে পড়ি, এমনকি শহরের সবগুলো কুকুর সম্পর্কিত সাবধানতা ঝোলানো গেটের সামনে, আর মাথা ওপরের দিকে তুলে ধরে খুঁজতে চেষ্টা করি নতুন কোনো হাত, অন্য কোনো প্রতিপালক, যারা সত্যিকার অর্থেই কুকুর ভালোবাসে। এভাবে খুঁজতে আমার ভালো লাগে, কারণ এতিমখানার দিনগুলো এখনও অধিকাংশ সময় আমার সাথে সাথেই ঘোরে, আর আমি বরাবরের মতোই একটা পরিচিত হাত বা মুখের আন্তরিক ইশারার জন্য কাটিয়ে দিতে থাকি বছরের পর বছর। না, জীবনের কোনো সময়-ই কেউ আমাকে সেভাবে ডাকে নি। এতিমখানার শত শত ছেলে-মেয়ের মধ্যে আমিই ছিলাম একমাত্র কুকুর, যে ছিল সম্পূর্ণ অর্থেই বেওয়ারিশ। মিসেস বোস-ই একমাত্র রমণী ও মানুষ, যে রাস্তা থেকে সম্পূর্ণ বেওয়ারিশ অবস্থায় ডেকেছিল আমায়, আর আমি বিশ্বস্তের মতো ওর গ্যারেজের পাশে বেঁধে রাখা জার্মান শেফার্ড ও সাইবেরিয়ান হাউন্ডের হিংস্র গর্জন উপেক্ষা করে ধীর পায়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম চারতলার দরজায়, ক্রমশ যা ওর হাত, মুখ, ঠোঁট, জিভ, এমনকি শরীরের সবগুলো কোনায়।

ওর খোলা বুক অথবা কোলে মাথা রেখে প্রায়শ আমার মনে পড়ে যেত এতিমখানার শুক্রবারগুলোর কথা। শত শত ছেলেমেয়ে তাদের পরিজনদের সাথে দেখা করে হাসি হাসি মুখে হাতে বিভিন্ন রকমের উপহার বা খাবারসামগ্রী নিয়ে যখন ফিরে আসত, তখন আমি সিঁড়িঘরের সামনে বসে উপর থেকে রেলিঙের ফাঁক দিয়ে দেখতাম ওদের টুকরো টুকরো উজ্জ্বল মুখ, আর মনে মনে ভাবতাম, হয়তো কখনও, কোনো দিন আমারও নাম ধরে ডাকা হবে, সম্পূর্ণ অপরিচিত অথচ খুব আন্তরিক কোনো মুখের সামনে দাঁড়াতে। এইসব ভাবতে ভাবতে কিছু একটা জমা হতো গলার কাছে, যা ক্রমশ ভারি ও গাঢ় হয়ে উঠত ওর বুক অথবা উরুর নরম উষ্ণতায়। অথচ আমি ঝরতে পারতাম না, বরং খুব শীঘ্রই ওর বুক অথবা উরুর ভাঁজে দেখতে পেতাম চৈত্রের প্রচণ্ড খরায় দারুণ পিপাসার্ত কুকুরের অগুনতি মুখ ও লালাঝরা জিভ। আমার মুখ-চোখে লেগে যেত তাদের ঘিনঘিনে লালা, যা কিছুতেই পরতাম না মুছে ফেলতে। অথচ ও অকারণ হাসত আর আমাকে প্রায়শই তুলনা করত সেই সব কুকুরদের সাথে, যারা একসময় ছিল ওর খুব প্রিয় কিংবা এখনও। আমি কুঁকড়ে যেতাম, মৃদু কম্পন ছড়িয়ে পড়ত সারা শরীরে, যা দেখে হয়ত ওর মায়া হতো, এবং আমাকে মনে করিয়ে দিতে চেষ্টা করত যে, অবশ্যই আমি ব্যতিক্রমী ও উন্নত জাতের বিশ্বস্ত সেই কুকুর, যা বাজারে সহজলভ্য নয়।

ওর এই উদারতা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে পুনরায় নিয়ে যেত এতিমখানার সেই অন্ধকার ঘরে, যেখানে আমার শিক্ষকরা মাঝেই মাঝেই আমাকে ডাকতেন, এবং খেয়াল-খুশি মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা আদর করতেন। সত্যিকার অর্থেই আমি তখন সুখী হতাম, এবং তাদের সেই অকৃত্রিম উদারতার বিনিময়ে আমি চুপ, খুব বেশি চুপ করে থাকতাম, এমনকি অসহ্য নারকীয় যন্ত্রণা বা রক্তপাত শুরু হলেও! ও জানে না ওর এই চারতলা থেকে এতিমখানার সেই অন্ধকার ঘরের দূরত্ব এত বেশি যে, সেখানে চলে গেলে আমি আর ফিরতে পারি না। তবুও তো চেয়েছিলাম, এবং ওর ইচ্ছে ও খেয়াল-খুশি মতোই বারবার চেষ্টা করেছিলাম চারতলা থেকে নামিয়ে আনতে, অথচ প্রতিবারই, ঠিক চরম মুহূর্তে আমার চুল-মাথা টেনে, ঠোঁট-মুখ কামড়ে অথবা পিঠে আঁচড় কেটে, আকুল ও সর্বান্তঃকরণে যাদের ও বারবার ডাকত, তাদের কারও সাথেই আমার নামের কোনো অক্ষর কখনও মেলে নি, আর প্রতিবারই এতিমখানার আমি, শত চেষ্টা করেও ওকে জানাতে পারি নি, অন্য কেউ নয়, বরং আমিই এখনও ঢুকে আছি তোমার ভেতরে। ও হয়তো বুঝত, কারণ আমার দৃঢ়তা তখনও ওর শিথিলতার ভেতর ফোঁস ফোঁস করে চলত, আর নিজের ব্যর্থতা ও আকস্মিক ঝরে যাওয়ার খেসারত স্বরূপ মুখটা বাড়িয়ে ধরত জননাঙ্গের দিকে। ওর দাঁতগুলো সত্যিই হলুদ, এই বোধ আমাকে বাধ্য করত টয়লেটে গিয়ে দাঁড়াতে। ফিরে আসার আগেই ও ঘুমিয়ে পড়ত, আর চিত বা কাত যেভাবেই শুয়ে থাক না কেন, ওর বিশাল থলথলে মাই ও মোটা কালো পাছা, প্রতিবারই আমাকে মনে করিয়ে দিত সেই সব বমির কথা, যা পৃথিবীর সকল ক্ষুধার্ত কুকুর নিজ ইচ্ছেয় করে আর পরম তৃপ্তিতে চেটে-পুটে খায়।

তিন.

মিস্টার বোসকে নিয়ে এখন আমি আর ভাবি না। মিসেস বোস আদতেই উনার বউ কিনা, এই প্রশ্নের সদুত্তর খুঁজে খুঁজে নিশ্চিত হয়েছি যে, কুকুর প্রতিপালনে উনারও সায় আছে, ফলে তিন তিনটে কাজের বুয়া ও দু’দুটো আইবুড়ো শালির দিনভর বাড়িতে পড়ে থাকা খুব সহজেই আমাকে ভাবনা থেকে মুক্তি দেয়। কিন্তু উনার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতে বাড়িতে দিন বা রাতের যে কোনো সময় নানা বয়সী পুরুষের অবাধ যাওয়াত ও মিসেস বোসের মাত্রাতিরিক্ত আন্তরিকতা বা উচ্ছ্বাস, অথবা কারও না কারও সাথে ঘুরতে বেরিয়ে পড়া বরং আমাকে একদিন দাঁড় করিয়ে দিল পাশের বাড়ির অ্যান্টির দরজায়। তিন সন্তানের এই জননী যে এখনও পরিপূর্ণ অর্গাজম বা হুক খোলার শিল্প বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত, তা নিশ্চিত হয়েছিলাম দু’দিন দরজায় দাঁড়িয়ে, একদিন ড্রয়িংরুম, ও পরদিন বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে, কথা বলে। আর উনার স্বামী, যে কিনা চোখ-কান বন্ধ রেখে খুব বিশ্বাসের সাথেই সকাল-সন্ধ্যা নিয়মিতভাবে মসজিদে আসা-যাওয়া করেন তসবি হাতে, আমাকে বরং উসকে দিয়েছিল নিজস্ব প্রতিপালনে।


ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো গজরাতে গজরাতে খিস্তি করে ওঠে, ‘বাঞ্চত ছেলে, বেশি ত্যাড়ামি করবি তো লাথি মেরে বের করে দেবো!’


কুকুর মাংস ভালোবাসে—এই তথ্য অনেকে জানলেও, খুব কম লোকই জানে, কিভাবে সে প্রলুব্ধ হয় ও কতটা তৃপ্তিসহকারে ভক্ষণ করে। আমিও অনেকটা সেভাবেই কোনো এক দুপুরে, ওনার তৃতীয় সন্তানকে মেঝেয় খেলায় ভুলিয়ে যখন শিল্প বিষয়ক নানাবিধ জ্ঞান দিতে শুরু করলাম, তখন কী করে জানি উনি বুঝে ফেলেছিলেন যে, আমি ঠিক কী শেখাতে চাইছিলাম, আর ক্রমশ প্রতিবাদহীন সমর্থনের লভ্যাংশ বুঝে নিতে নিতে যখন জোরে চিৎকার (শীৎকার) করে ওঠেন, তখন মেঝেয় বসা দেড় বছরের কন্যাশিশুটি কোনো কিছু না বুঝেই কেঁদে উঠেছিল। অ্যান্টি উঠলেন না, চোখ বুজে পড়ে রইলেন, আর আমি শিশুটিকে কোলে তুলে বিছানায় ফিরে এসে দু’জন মিলে ভাগাভাগি করে যা খেলাম, তাতে মা বিষয়ক কোনো একটা বোধ জন্মাতে জন্মাতেও মারা গেল কন্যাশিশুটির চোখ বুজে এলে, এবং সারা দুপুর আরও কিছু চিৎকার ও শীৎকারে অতিবাহিত হলে।

 

চার.

মিসেস বোস আজকাল প্রায়শই আমাকে ‘বর’ বলে ডাকে, যাতে করে উনত্রিশ বছরের আমি সত্যিকার অর্থেই বর্বর হয়ে উঠি সমস্ত শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে। কিন্তু আমার দৃঢ়তা ওর কোনো গহ্বরেই কোনোরূপ বাধাপ্রাপ্ত হয় না দেখে, ওর বুকে মাথা এলিয়ে পড়ে থাকি, ওরই চুপসে ঝুলে যাওয়া ঢলঢলে মাংসপিণ্ডের মতো। তবু একবার, দুইবার, তিনবার, এমনকি চারবার পর্যন্ত হলেও, কন্ডোমের ত্রিশ টাকা ভুলতে পারি না কিছুতেই। একেক সময় চট করে উঠে পড়ি, এবং ওর ব্যাগ থেকে টাকা নিয়ে বেরিয়ে যাই দুধ, কলা, ফল-মূল কিনতে, আর ফিরে এসে ওর বিছানা-বালিশ, চাদর, চেয়ার, ড্রেসিং-টেবিল, টয়লেট, এমনকি ছাড়া বা ভাঁজ করে রাখা কাপড়-চোপড়ে শিকারি কুকরের মতো শুঁকতে থাকি অন্য কুকুরের ঘ্রাণ। পেয়েও যাই মাঝে মাঝে, আর তখন ঝাঁপিয়ে পড়ে দু’হাতে টিপে ধরি গলা। প্রথমে ও হাসে, এবং চেষ্টা করে অন্যকিছু ভাবাতে বা বোঝাতে, অথচ আমার হাত শিথিল হয় না দেখে বল প্রয়োগ করে ও রাগান্বিত হয়। বরাবরের মতো আমিই পরাস্ত হই আর ও ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো গজরাতে গজরাতে খিস্তি করে ওঠে, ‘বাঞ্চত ছেলে, বেশি ত্যাড়ামি করবি তো লাথি মেরে বের করে দেবো!’ ওর শব্দগুলো আমার কানে ঢোকে প্রতিধ্বনি সহকারে, আর আমি বিছানায় শুয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকি এই ভয়ে, অসহায় ইঁদুর গর্ত হারাবে বলে।

 

পাঁচ.

অ্যান্টির বাচ্চা হয়েছে, চতুর্থবার। আঙ্কেল তসবি ও মিষ্টি হাতে আমাকে তা জানিয়ে গেছে। অনেক মিষ্টি, কারণ পুত্রসন্তান। সবগুলো খাব বলে পণ করেছিলাম, কিন্তু প্যাকেট খুলে কালো কালো মিষ্টির টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে মিসেস বোসের জার্মান শেফার্ডের হাগার দৃশ্য মনে পড়ায়, ফেলে দিয়েছিলাম। রোজ বিকেলে ব্যাটাকে নিয়ে ও হাঁটতে বেরোয়। আসলে ব্যাটা জার্মান বিকেলের ঝরঝরে হাওয়া ও রমণীসঙ্গ ছাড়া যে হাগতে পারে না সেটা জেনেছিলাম কোনো এক বিকেলে ওর একপাশে জার্মান আর অন্যপাশে আমি নিজে হেঁটে। হঠাৎ ও দাঁড়িয়েছিল রাস্তার একধারে কিছু ঘাস দেখে আর জার্মান সাহেব এগিয়ে গিয়ে আশপাশ দেখে পোঁদ নিচু করে ধরেছিল ঘাসের দিকে। অনেকক্ষণ ওভাবেই, অথচ একদলাও যদি বেরোয়, যা দেখে ওর মনিব ব্যতিব্যস্ত হয়ে কোষ্ঠ-কাঠিন্য সম্পর্কিত উদ্বেগ আমার কানে উগরে দেয়ার মাঝখানেই কালো কালো দলার মতো হেগেছিল, যা দেখে ও এতটাই খুশি হয়েছিল যে, ওর চোখ-মুখে ফুটে উঠেছিল শিশুসুলভ চপলতা আর দড়ির অপর প্রান্ত হাতে ধরে মুখ দিয়ে এমন সব শব্দ বের করছিল যে, আমার মনে পড়েছিল গ্রামাঞ্চলের মায়েদের সেই সব শব্দের কথা, যা তাঁরা শিশু সন্তানকে হাগাতে বা পেচ্ছাব করাতে মুখ দিয়ে বের করে থাকেন।

আমি ওর পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, দলা দলা গু কিভাবে ঘাসের মধ্যে পড়ল আর ও কত না মনোযোগ সহকারে সেই দৃশ্য দেখল, যেনবা নিজেকে ও সত্যি সত্যিই ভাবছিল ঐ জার্মান কুকুরের জননী, আর নিজ সন্তানের কোষ্ঠ-কাঠিন্যের পীড়ায় হয়ে উঠছিল অস্থির ও চিন্তিত। মিষ্টি ফেলে দিলেও সন্ধ্যাবেলা ঠিকই হাজির হয়েছিলাম শুভেচ্ছা জানাতে, আর কথা চলাকালীন অদূরে দাঁড়িয়ে আঙ্কেলের খুশিভরা আপ্লুত মুখের পাশ দিয়ে অ্যান্টি চোখের ইশারায় যা জানালেন, তাতে আমার রক্ত জীবনে প্রথমবারের মতো হিম হয়ে এলেও, সামলে নিয়েছিলাম, কারণ সদ্যোজাত শিশুসন্তান-কোলে অ্যান্টির উপচে পড়া বুক আমাকে বরং গর্বিতই করেছিল, আর পরদিন দুপুরে বাপ-ছেলে একসাথে একই বুকে হামলে পড়লে অ্যান্টির আকস্মিক কেঁদে ওঠা আমাকে বিস্মিত করে নি, বরং মাংসের প্রতি চূড়ান্ত অনীহা নিয়ে ক্ষুধার্ত আমি বেরিয়ে এসেছিলাম ঘর থেকে!


প্রথমবারের মতো সমস্ত শঙ্কা ও শিল্পজ্ঞান ভুলে দু’হাতে ছিঁড়তে থাকলাম ব্লাউজ, ব্রেসিয়ার, শাড়ি, সবকিছু!


ছয়.

যদিও জানতাম, তবু খবরটা আমাকে ও নিজেই দেবে বলেই হয়তো এতদিন পর ডেকেছিল। এগারমাস পর দেখা। চামড়া আগের চেয়ে উজ্জ্বল, ফলে সুন্দর দেখাচ্ছিল। তবে চোখ-মুখে লেগেছিল অবসাদের ছাপ, আর শরীরের ভার যেন ক্রমশ ওকে করে তুলেছিল ক্লান্ত। আমি অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম, আর অযথাই মনে পড়ে গেল প্রথম দিনগুলোর কথা, যখন সে আমার সামনে নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াত, আর আমি ওর মুখ বা শরীরের বিভিন্ন অংশে তাকিয়ে থাকতাম একভাবে। ও লক্ষ করত আর আলতো হেসে জানতে চাইত, ‘কী রে অমন করে কী দেখছিস? বুড়িয়ে গেছি, না? তা কী করব বল, বয়স তো কম হলো না।’ যা শুনে আমারও বলতে ইচ্ছে হতো, ‘তুমিও তো আমাকে অনেকখানি বুড়িয়ে দিয়েছ, আর গত কয়েক মাসে আমার বয়স যতটা বেড়েছে, ততটা বয়স এই পৃথিবীতে কারোর-ই বাড়ে নি আর।’ আসলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমি ওর বেঢপ ফুলে থাকা পেট দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, এতিমখানা থেকে বেরিয়ে আসার পর আমি আর কখনোই কোনো পরিচিত হাত বা মুখের আন্তরিক ইশারা কামনা করি নি। এইসব ভাবতে ভাবতে চেয়ার ছেড়ে বিছানায় ওর পাশে আগের মতো ঘন হয়ে বসলাম। ও কিছুই বলল না, শুধু সামান্য নড়ে অদৃশ্য একটা দূরত্ব তৈরি করে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকল।

আমি ওর ঘাড়ের চুল সরিয়ে সেখানে চুমো খেলাম, এবং হাতটা পিঠ ঘুরে ঘুরে বুকের দিকে নামিয়ে আনতেই ও উঠে দাঁড়াল আর কোনো কিছু না বলে টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে পেছন ফিরে দাঁড়াল। যখন মুখ ফেরাল, দেখলাম ওর হাতে হলুদ রঙের প্যাকেট, যেটা সে এগিয়ে এসে আমার মুখের সামনে বাড়িয়ে ধরে বলল, ‘এটা রাখ। দু’লাখ আছে। কিছু একটা করিস।’ আমার হাসি পেল, এবং হাসলামও। তারপর প্যাকেটটা নিয়ে বিছানায় রেখে ওর হাতে চুমো খেয়ে দাঁড়িয়ে ওর মুখোমুখি হলাম। ও হয়তো অন্য কিছু আশা করেছিল, কিন্তু আমি পেছন দিকে ওর চুলগুলো মুঠো করে ধরে ঠোঁটের দিকে মুখ নামিয়ে আনতেই ও দ্রুত বাধা দিয়ে উৎকন্ঠার সাথে জানাল, ‘শোন, পাগলামো করিস না। ন’মাস হয়ে গেছে। সামনের আট তারিখ ডাক্তার ডেট দিয়েছে।’ ওর পদবি যে বদলে গেছে, এবং শীঘ্রই আমেরিকা যাচ্ছে, জানতাম। আশ্চর্য হবার কিছুই ছিল না, তবুও এভাবে ওর ছেড়ে যাওয়া মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই শেষবারের জন্য ওকে অনুরোধ জানালাম। এমনকি কাকুতি সহকারে নিশ্চিত করলাম, কোনো ক্ষতি হবে না, খুব আস্তে ও যত্নসহকারেই আমি তা করব। অথচ ও কিছুতেই রাজি হলো না, বরং জোরাজুরি ও ধস্তাধস্তিতে ক্ষিপ্ত হয়ে চড় বসিয়ে দিল। আমি আবারও হাসলাম, এবং ওর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেও হাত উঠালাম, যা একের পর এক চলতে থাকল ওর চোখ-মুখে, যতক্ষণ না ও টলে পড়ে গেল ফ্লোরে। হাত ব্যথা হয়ে যাওয়ায় এবার সচল হলো পা, আর সেটা কয়েকবার জোরে পেটের উপর পড়তেই চিৎকার করে উঠল, অথচ ওর চারতলার ভারি ভারি পর্দা ঝোলানো এসি রুমের ঠান্ডা গুমোট বাতাস ভেদ করে তা বাইরে বের হলো না।

ও অসহ্য যন্ত্রণায় কোঁকাতেই থাকল আর আমি ওর পাশে হাঁটুমুড়ে বসে ওর কষ বেয়ে গড়িয়ে আসা রক্তের ফোঁটা জিভ দিয়ে চেটে, প্রথমবারের মতো সমস্ত শঙ্কা ও শিল্পজ্ঞান ভুলে দু’হাতে ছিঁড়তে থাকলাম ব্লাউজ, ব্রেসিয়ার, শাড়ি, সবকিছু! যন্ত্রণায় ওর কথাগুলো জড়িয়ে গেলেও আমি বুঝতে পারছিলাম যে, ও অনুনয় করছে, এবং আমাকে থামতে বলছে। অথচ আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই ওর বুকের মাংসে ক্ষুধার্ত কুকুরের মতো দাঁত বসিয়ে দিলাম আর সমস্ত বর্বরতা জড়ো করে খুব দ্রুত ঢুকে গেলাম ভেতরে। ঢুকতেই থাকলাম ক্লান্তিহীন, অনবরত, এইভাবে, যেন ফেঁড়ে-ফুড়ে চৌচির করে দেবো। এক সময় গলগল করে বেরিয়ে আসা রক্তের স্রোত বিষাক্ত সাপের মতো আমাদের নিচ দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলেও, আমি ঢুকতে থাকলাম বাধ্য হয়েই। যখন থামলাম, এবং প্যাকেট হাতে দরজার দিকে এগুলাম, তখন ও মেঝেয় পড়েছিল, নিথর। হয়তো জ্ঞান হারিয়েছে এবং এভাবে রক্ত ঝরে ঝরে এক সময় মারা যাবে, এমন ভাবতে ভাবতেই নেমে এলাম নিচে। লোহার গেটটার দিকে এগোনোর সময় হঠাৎ চোখ পড়ে গেল গ্যারেজের পাশে বেঁধে রাখা জার্মান শেফার্ডের ওপর। ব্যাটা অসহায় ভঙ্গিতে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে আছে আমার দিকে, যা দেখে নতুন করে হাসি পেল। হাসিসহ বেরিয়ে এলাম বাইরে, এবং বড় একটা নিশ্বাসে বুক ভরিয়ে ফেললাম মুক্ত বাতাসে। ওভাবে কয়েকবার, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে শেষবারের মতো তাকালাম চারতলার সেই জানালায়, যেখান থেকে কোনো এক বিকেলে ও ডেকেছিল আমাকে। অথচ কিছুই দেখতে পেলাম না, শুধু চোখের সামনে ঝুলে থাকল টকটকে লাল কয়েকটি অক্ষর—

‘কুকুর হইতে সাবধান!’

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য