হোম গদ্য গল্প কাজল নামে আমার এক বন্ধু ছিল

কাজল নামে আমার এক বন্ধু ছিল

কাজল নামে আমার এক বন্ধু ছিল
985
0

বাবলু, আমি কাজল। রেল স্কুলের কাজল!

বিরিয়ানির প্যাকেটের পোলাও ছাড়িয়ে মাংসটা কেবল আলাদা করেছি তখনই কথাটা কানে এল। রেল স্কুল! কাজল! মোবাইলের ও প্রান্তে কাজলই কথা বলেছে? সত্যিই কাজলের ফোন?

উনিশ বছর যাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছি, যাকে খুঁজতে গিয়ে হতাশ হতে হতে অপ্রত্যাশিতভাবে পুরনো আরো কয়েকজনের সাক্ষাৎ পেয়েছি এবং শেষ পর্যন্ত যাকে খুঁজে পাচ্ছিলামই না আচমকা সেই কাজলের ফোন পেয়ে কিছুক্ষণ আমি মাথা মোড়া মৃত ডাবগাছের মতো স্থির বসে রইলাম। একটু পর সম্বিৎ ফেরা মাত্রই দুটো চোখ আনন্দে কান্না দিয়ে ওঠে। হাসতে হাসতে করা এই কান্নার অর্থ অফিসের সমন্বয়সভায় আগত আমার সহকর্মীরা বুঝতে পারে না।


জেনে গিয়েছিল বা আমরাও যে, বিউটি ওকে ভালোবাসবে না।


কাজলকে আমি এত বছর ধরে খুঁজছি অথবা বলা যায়, নিরাশ হতে হতে এত বছর ধরে ভুলতে চেয়েছি কিন্তু পারি নি। ওর কথা মনে পড়লেই এক সঙ্গে অনেকগুলো ছবি দল বেঁধে একটি ক্যানভাসে ভেসে ওঠে। ওকে মনে পড়তেই পিছন দিকে চুল ঝাঁকিয়ে নাক টেনে বড় বড় চোখে ভাসান দেন রোবানা ম্যাডাম। যাকে আমরা লুকিয়ে সিগারেট কিনে দিয়েছি। ভেসে উঠবে কৃষ্ণকলি বিউটির নাম। ফেরিঘাটের বিউটি রেস্টুরেন্টের মালিক আঃ লতিফের একমাত্র কন্যা বিউটি, যে শেষ পর্যন্ত কাজলকে ভালোবাসলই না। আর উঠবে মেঘনার ওপাড়ে আশুগঞ্জে নামা স্বপ্নের মতো রঙিন সন্ধ্যাগুলো।

তখন মেসে থাকি। আঃ রহমান গেটের মেসে একদিন মেস-মালিক নিজে যখন কাজলকে আমার রুমমেট হিশেবে নিয়ে আসেন, তখন পারি তো অজ্ঞান হয়ে যাই। একে তো আমি বাইরের ছেলে তার উপরে কাজলের মতো টেস্টে খারাপ করা একটা স্টুডেন্ট আমার রুমমেট হবে, এটা মানতে পারছিলাম না। ওর তখনই সিগারেট আর মারামারির অভ্যাস। থুতনি পর্যন্ত নেমে আসা সামনের ঝরঝরে চুল। ক্লাসমেট হয়েও সত্যি বলতে কী, প্রথম প্রথম আমি ওকে ভয়ই পেতাম।

তো, ও রুমে আসার পর থেকে পড়াশোনা যে আমার ঠিকমত চলবে-না বা না-জানি অনাকাঙ্ক্ষিত আরো কত বিড়ম্বনায় আমাকে পড়তে হবে ভেবে ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেলেও যতটা ডিস্টার্ব ও আমাকে করবে ভেবে ভয় পাচ্ছিলাম দেখা গেল, যত দিন যায়, বাস্তবে ভয় পাবার মতো কিছুই সে করছিল না, বরং সারা দিন বাইরে বাইরে কাটিয়ে রাতে হাতে করে খাবার নিয়ে এসে প্রায়ই আমাকে চমকে দিত। না খেতে চাইলেও বা রাতে খেয়ে ফেলেছি বললেও আমাকে সে শেষমেষ খাইয়ে ছাড়ত। একটু পরপর বাইরে গিয়ে সিগ্রেট টেনে আসত আর রুমে এসে তার নিজের আনা খাবার খেতে অনুরোধ করত। ওকে পড়তে বসতে বললে কয়েকঘণ্টার আয়োজনে সে ঘর ঝাড় দিত, টেবিল পরিষ্কার করত, বই-খাতা-জ্যামিতি বক্স সব এক সঙ্গে নিয়ে যখন সে টেবিললাগোয়া চৌকিতে বসত তখন ক্লান্তির ভারে ফুলে উঠা দীর্ঘ দীর্ঘ হাই তুলে বই-খাতার উপরই বিড়ালের বাচ্চার মতো মাথা বাঁকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। এইসব কারণে বা অন্য কোনো কারণে বা কারণ ছাড়াই যত দিন যায় ততই না চাইতেও ক্লাসের সবচেয়ে দুর্বল ছাত্রটির সঙ্গে টেস্টে ফার্স্ট হওয়া উজ্জ্বল ছাত্রটির দরদ অথবা মায়া অথবা টান অথবা ভালোবাসা অথবা সবগুলো মানবিক বোধেরই যোগসূত্র ঘটতে থাকল। কাজল রুমে না ফিরলে পড়তে পড়তে হঠাৎ ওর ভাবনায় গালে আঙুল ঠেকিয়ে অন্যমনস্ক হতে হচ্ছে!

ও পড়ত না। কিন্তু ভৈরবপুরের পাশ দিয়ে নেমে আসা পরিত্যক্ত রেল লাইনের পাশে নোঙর গাঁড়া ত্রুটিযুক্ত লঞ্চের ছাদে আমাদের বন্ধুদের আড্ডা ও সংক্ষেপ করে দিত ‘বাবলুর পড়া আছে’ অজুহাতে। লঞ্চের ছাদে ও আর অন্য বন্ধুরা সবাই সিগারেট টানত, আমি না টেনে টান দিতাম গানে। আমাদের এই আলাদা আলাদা কাজের মধ্যেও এক সঙ্গে আমরা যে কাজটা করতাম তা হলো, ঝিলের ওপারে বিউটিদের একতলা বাড়ির জানালায় তাকিয়ে থাকা। আমরা তাকিয়ে থাকি। আশুগঞ্জের পাড়ে যে জলের ওপর কারখানার নানা রঙের বাতির রঙিন ছায়া এসে পড়ে আর স্বপ্ন-ভারাক্রান্ত কৈশোরোত্তীর্ণ কিছু তরুণের গানচঞ্চল-ধূমায়িত সন্ধ্যাগুলোকে ঝলমলে করে তোলে।

ও জেনে গিয়েছিল বা আমরাও যে, বিউটি ওকে ভালোবাসবে না। তবু আশাহত না হয়ে নির্লজ্জের মতো পেছন পেছন হেঁটে রোজ ওর বাড়ির কাছ পর্যন্ত যাবার প্রতিদিনের বিকেলগুলো বা ওকে কিছু উপহার দেয়ার দুর্দান্ত চেষ্টাগুলো যখন বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল তখন আমরা এক সন্ধ্যায় লঞ্চের ছাদে বসে সিদ্ধান্ত নিলাম, বিউটির মনে আসলে কী, কেন ও সাড়া দিচ্ছে না অথবা তার গন্তব্য অন্য কোথাও ঠিক করা আছে কিনা আগে সেটা নির্ণয় করতে হবে। আমরা কাজলকে আগাম বোঝাবার চেষ্টা করলাম, এবার বিউটির ব্যাপারে কোনো নেগেটিভ তথ্য পাওয়া গেলে কাজলকে বিউটির পথ থেকে চিরতরে ফিরে আসতে হবে।

কাজল কথা দিল।

সেই রাতে কাজল রাতকে কোমরে করে রুমে ফেরে। ফিরেই বই খাতা নিয়ে পড়তেও বসে! আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসি দিই। যাক, শেষ পর্যন্ত সুমতি হলো। কিন্তু সুমতির প্রকৃতিটা বুঝতে পারলাম তখন, যখন দেখলাম টেবিলে খাতা খুলে, হাতে কলম নিয়ে সে কেবল বসেই আছে আর ফাঁকেফাঁকে আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে হাঁশ-ফাঁশ করছে। আমি চেয়ার ছেড়ে কাছে যেতেই আঙুলের টানে ও কপালের চুল সরায়, দেখি, টলটলায়মান ওর চোখে এক রাশ অসহায়ত্ব কোটর ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বললাম, ‘কী হয়েছে!’

ও তখন একটু শরম নিয়ে বলে, ‘একটা চিঠি লিখে দাও না। এইটাই লাস্ট।’

আমি ওকে পড়ায় মন দিতে বলি, ‘সামনে পরীক্ষা। এই কয়দিন পড়। দেখবে, পাশ করে ফেলেছ।’

ও মাথা নুইয়ে ঠোঁটে হাসি আনার চেষ্টা করে, ‘বাবলু, আমার আত্মাটা কষ্ট পাইতেছে। আত্মারে কষ্ট দিতে হয় না!’

ওকে আশ্বস্ত করি, ‘আচ্ছা, কাল লিখে দেবো। আজকে পড়ো।’

নিরাশ বদনে ‘ঠিক আছে’ বলে ও পড়তে বসার চেষ্টা করে, কিন্তু লক্ষ করলাম, ও পারে না, জানতাম পারবেও না। অগত্যা চিঠি লিখতে লিখতে সেই রাতটাকে ভোরে নিয়ে গেলাম।

বাবার সাবানের ফ্যাক্টরি থাকাসূত্রে ওর পকেটের স্বাস্থ্য সব সময় থলথলে থাকত। চলন-বলনও ছিল ওর ইচ্ছাসই। কী হলো, একদিন আমাদের কাউকে কিছু না বলে ও ঢাকায় চলে গেল। ফিরে এল আজাদ প্রোডাক্টের বেশ কিছু পলিথিনে মোড়ানো সুদৃশ্য মিউজিক কার্ড আর মৌচাক মার্কেট থেকে সোনালি জরিপরা একটা লাল জর্জেটের জামা নিয়ে। পরিত্যক্ত রেললাইনের পাশে গাড়া লঞ্চের ছাদে বসে আমরা এসব দেখি আর হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ি। জলে ঢেউ ছিল। আমাদের হাসি দেখে আশুগঞ্জের রঙিন আলোও সেদিন ঢেউয়ের সাথে গড়াগড়ি খায়। কী কাকতাল! বিউটি কোনোদিন কাজলের সাথে ঠিক মতো কথাই বলে নি বা যদি বলতও তবু একটা মেয়ের টকটকে লাল জর্জেটের জামা পছন্দ হবে কি হবে না, জিনিসটা ওর গায়ে লাগবে কি লাগবে না, শেষ পর্যন্ত বিউটি সেটা রিসিভ করবে কি করবে না বা আমরা তো জানিই, রিসিভ করার প্রশ্নই আসে না—তবু প্রচণ্ড আশাবাদী কাজল নিতান্ত নিজের আত্মাকে সন্তুষ্ট করতে বা কষ্ট না দিতে এই উপহারসামগ্রী নিয়ে এসেছে। মূল্যও বিরাট, তেরশো আশি টাকা, সালটা উনিশশো পঁচানব্বই!

২.
বিউটির কাছে কাজলের উপহারসামগ্রী পৌঁছে দিতে আমরা ওর এক প্রতিবেশী ছোটবোন নাম শিমু, তার আশ্রয় নিলাম। বিউটির ক্লাসমেট, শিমু প্রথমে রাজি না হলেও আমাদের চারজনের চাপাচাপির সামনে ভয়ার্ত চিত্তে কথা দিল, প্রাইভেট পড়তে যাবার সময় প্যাকেটটা যে করেই হোক বিউটিকে দেবে। এ উপলক্ষে শিমুর সব বান্ধবীর জন্য ভৈরববাজারের জনতা হোটেলের কলিজার মোগলাই ঠিক করল কাজল। আরও ঠিক করে, আমাদের খাওয়া ঠিক করব আমি, মানে আমি যা বলব তাই। এর অর্থ, সন্ধ্যায় পেটচুক্তি বড় খানা। এখন ঘটনাটা ঠিক মতো ঘটলেই হলো।


কাজলের উপহারসামগ্রী শিমুর কাছে দেয়ার পর থেকে আমাদের সমস্ত মনোযোগ বিউটিকে ছাপিয়ে শিমুর দিকে ঝোঁকে।


রেলওয়ে স্কুলের পিছন দিকে সরব রেললাইন আর এর দুপাশে স্তরে স্তরে সাজানো বড় বড় মূক পাথরের আড়ালে আমরা অপেক্ষা করি। কাজল সিগারেট শেষ না হতেই ফেলে দিয়ে আবার ধরায় আর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অস্থির চোখে পায়চারি করে। আমরা একজন একজন করে সামনে এগিয়ে শিমুর আসার পথে নিরীক্ষণ করে আসি। এক সময় রাস্তা ক্রস করে ওকে আসতে দেখা গেলে আমাদের মুখে হাসি ফোটে। কিন্তু সুসংবাদ আসে না। বিউটি সেদিন প্রাইভেটেই যায় নি। পরের দিনও না। তৃতীয় দিন শিমু নিজেই না এলে আমরা চিন্তায় পড়ি।

স্কুলেও তার কোনো খবর পাওয়া গেল না। স্কুল-মাঠের পূর্ব ও পশ্চিমে দুটো বিশাল টিনের ঘরে আমাদের ক্লাস। পশ্চিমে ছেলে আর মেয়েদের পূর্বে। আমরা ক্লাসে বসেই মেয়েদের নাইনের রুমটা দেখতে পাই। কাজলের উপহারসামগ্রী শিমুর কাছে দেয়ার পর থেকে আমাদের সমস্ত মনোযোগ বিউটিকে ছাপিয়ে শিমুর দিকে ঝোঁকে। ফলে আমরা মাঠের ওপাশে ক্লাস নাইনের রুমটার দিকে, যদিও ক্লাসে বসে ঠিক মতো কিছুই দেখার উপায় নেই তবু তাকিয়ে থাকি। অষ্টম ঘণ্টার বেল পড়ে, স্কুল ছুটি হয়, সকল কোলাহল থেমে যায়, কিন্তু কারোরই খবর পাই না।

এভাবে আরো কদিন যাবার পর কাজল ব্যাকুল হয়ে ওঠে। চিঠি না নিলেও, কথা না বলে মুখ ফিরিয়ে নিলেও এতদিন বিউটিকে ঠিক দেখা যেত আর আমরা ওর পিছুপিছু ওদের বাড়ির আগ পর্যন্ত যেতে পারতাম। এখন সেটারও উপায় নেই। যাকে দিয়ে কাজল আর বিউটির সম্পর্কটা এগিয়ে যাবে ভাবছিলাম তারও কোনো খোঁজ না পেয়ে আমরা যখন বিউটির বাড়িতেই সাহস করে চলে যাব চিন্তা করছিলাম তখন এক সকালে প্রাইভেটের সময়ে থতমত শিমুর সাক্ষাৎ পাই আমরা। আর জানতে পাই, দুর্ভাগ্যবশত কাজলের প্যাকেট বিউটি হয়ে ওর মা-বাবা এমনকি শিমুর মা-বাবার কানে পর্যন্ত পৌঁছে যায়, ফলে প্রথমত ওদের দুজনেরই ক্লাস-প্রাইভেট বন্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত শুনি, উচিত শিক্ষা দিতে কাজলকে ধরার জন্য বিউটির বাবা ওত পেতে বসে আছে। কাজলের বাসার ঠিকানা জানত না বলে আপাতত বাসায় বিচার যাচ্ছে না, এটা ভেবে আমরা স্বস্তি পাই।

শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার আগে আমাদের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক আর কাজলদের প্রতিবেশী রোবানা ম্যাডামের মধ্যস্থতায় ব্যাপারটার একটা আপাত-মীমাংসা আসে। রোবানা ম্যাডাম বিউটিকে বুঝিয়ে দেন, তার বাবাকে বলতে যে, কাজল ওকে আর ডিস্টার্ব করবে না, আর কাজলকে বলেন, সামনে পরীক্ষা, আগে পাশ করো এরপর এইসব দেখা যাবে।

কাজলের বাসা ছিল বাগানবাড়িতে। বাসায় জানত, ভালো ছাত্রের পাশে থেকে বখে যাওয়া কাজল মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছে। ওর বাবা-মা মানে খালা-খালু কাজলের ভবিষ্যতের ব্যাপারে ওই সময়টায় খানিকটা আশাবাদী হয়ে ওঠেন। ফলশ্রুতিতে আমাদের দুজনের জন্য প্রায় প্রতিবেলায় বাসা থেকে কাজল বা ওর আরো দুটি ভাইয়ের কেউ না কেউ খাবার নিয়ে আসে। প্রতিবেলা বাসার খাবার আসাসূত্রে কাজলের চাপেই মেসে আমার মিল বন্ধ করে দিতে হলো। মেট্রিক পরীক্ষার আগে সমাদরের মাত্রাটা আরো বাড়ে।

কিন্তু বাসায় না জানলেও আমি বুঝতে পারি, বিরহের দুরূহ খাদে পতিত কাজলের মন আর ভালো হয় না।

আমরা একটা একটা করে পরীক্ষা দিয়ে রুমে ফিরে পরেরটার প্রস্তুতি নিতে বই-খাতায় যতটা ঝাঁপিয়ে পড়ি, কাজল ঠিক ততটাই একরোখা বিউটির ভাবনায় উদাসীন হতে থাকে। এমনিতেই ছাত্র হিশেবে ও ছিল শেষের সারির, তার পর যদি পরীক্ষার হলে গিয়ে খাতায় কিছু লিখার বদলে তিন ঘণ্টা অন্য কোথাও মনোযোগ দিয়ে রাখে, তা বিউটি বা অন্য যে কোনো ব্যক্তিগত অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারেই হোক না কেন, সেক্ষেত্রে ফলাফলে ভালো কিছুর বিপক্ষে যা আসার কথা কাজলের তাই এসেছিল। পাশ করতে পারল না ও।

রেজাল্টের দিন কী মনে করে ও খুব উৎসাহ নিয়ে স্কুলে যায়। হেডস্যার মাইকে উত্তীর্ণদের নামসহ ডিভিশন ঘোষণা করছেন। আমরা শেষ নামটা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। অঘোষিত কয়েকটা নামের মাঝে অনিবার্যভাবে কাজলেরটাও পড়ে রইল। আমার তখন বাড়ি যাবার তাড়া। ভৈরব থেকে লোকাল ট্রেন ঈশাখাঁ এক্সপ্রেসই বাড়ি যাবার একমাত্র উপায়। বাড়ির তাড়া সবার ছিল। ফলে নিজেদের রেজাল্টের আনন্দ উপভোগের মুহূর্তে কাজলের ব্যর্থতায় যতটা ওর পাশে থাকা দরকার ছিল, সত্য স্বীকারে বলতে হয়, আমরা কেউই ততটা থাকতে পারি নি। হাঁটতে হাঁটতে ভৈরববাজারের ছবিঘর সিনেমাহলের সামনে এসে ও আমার হাত ধরে কাঁদো-কাঁদো স্বরে বলে, বাবলু, একবার বাসায় চলো।

পরীক্ষার ব্যর্থতায় মারামারি করা দুঃসাহসী কাজলের সমস্ত জোর নিস্তেজ হয়ে আসে।

আমি বললাম, বাড়িতে আম্মা চিন্তা করতেছে। গাড়ি ধরতে না পারলে আজ বাড়িই যেতে পারব না। আম্মা ভাববে, আমি ফেল করে পালিয়ে গেছি!

কথাটা ওকে বিদ্ধ করল কিনা বুঝতে পারি নি, না করলেও করতে পারত। কিছুতেই বলা ঠিক হয় নি, কিন্তু ও কিছু মনে না করে আবার আগের মতো কাকুতি করে, প্লিজ, একবার বাসায় চলো।

আমি ওর বাসায় না যাবার বা দ্রুত নিজের বাড়ি ফেরার পক্ষে কথা পেঁচাচ্ছিলাম আর ইতস্তত করছিলাম। ও এক সময় জেদ করে হাত ছেড়ে দিয়ে হাঁটা দেয়। আমি ডেকে উঠি, কাজল, শোনো..। ও ফেরে না। একটি বার ফিরে তাকায়ও না। ওর চলে যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ অসহায় নয়নে তাকিয়ে থাকলাম। যদিও পিছু নেয়া প্রয়োজন ছিল তবু না নিয়ে পরীক্ষাপাশের উত্তেজনা প্রশমনে নিজের বাড়ি ফেরার তীব্র তাড়নায় হাঁটতে থাকা কাজলের দ্রুত অদৃশ্য হওয়া দেখতে হলো। কে জানত, এই চলে যাওয়াই ওর সাথে আমার উনিশ বছরের বিচ্ছেদ এনে দেবে?


ওর মুখে ‘ক্যাপিটালের অভাব’ কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরটা আচানক সতর্ক হয়ে ওঠে।


৩.
একটু অভিমান হয়তো জমেছিল আমারও। হয়তো জমেছিল অকারণেই। যে কারণে কলেজের দুটো বছর আর ভৈরবে ফেরা হয় নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একবার যাই, কিন্তু কাজলের দেখা মেলে নি। ওরা বাসা বদল করে কোথায় গেছে নতুন ভাড়াটিয়ারা জানে না, জানে না এমনকি কোনো বন্ধুও! তবে কারো কারো মুখে শুনেছি, লঞ্চের ছাদে নেশায় ডুবে থাকতে নিঃসঙ্গ কাজলকে আগে দেখা যেত, এখন যায় না। কেউ কেউ সন্দেহ করে, মনে হয় ওরা বাড়ি চলে গেছে। ওদের বাড়ি ছিল নারায়ণগঞ্জ, এটুকুই জানি। ফলে বিশাল এই জেলাটা খুঁজে কাজলকে বের করা আমার পক্ষে অসম্ভব বলেই সম্ভবত ওকে খোঁজার চেষ্টাটা ধীরে ধীরে কমে এসেছিল। আজ এতদিন পর কাজলের ফোন তাই বহু বছর তাকে খুঁজে না পাওয়ার ব্যর্থতার কষ্ট কিছুটা লাঘব করে দিচ্ছে। আরো ভালো লাগে যখন কাজল বিকেলে আবার ফোন করে। প্রথম ও ফোন করলে আমি ওকে ‘এনি হাউ’ দেখা করতে বলি। বলি, কোথায় আছে বলতে, আমি নিজে গিয়ে দেখা করব। কী কারণ জানি না, ও তেমন সাড়া দেয় না। কিন্তু বিকেলে যখন ও নিজে থেকে দেখা করার আগ্রহ দেখায় তখন আমি আমার বাসার ঠিকানা দেই আর কিভাবে আসতে হবে তার ডিটেইল বলে তার অপেক্ষা করতে থাকি।

ও আমাকে ভৈরব থেকে রওয়ানা হবে বলে। বলে, কাল সন্ধ্যায় আসতে পারে। আমি বাসায় বড় খানা করতে বলি। বৌকে বলি, ও আমাকে জীবনে এত খাবার খাইয়েছে এর ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না। আজ এতগুলো আইটেম রান্না করবে যাতে টেবিলে একটা ইঞ্চিও জায়গা না থাকে। কাজল আমার কাছে অনেক বড় আবেগের নাম।

মেইন রোড থেকে আমার বাসা পনের টাকা আর পনের মিনিটের রিকশাপথ। ওকে ফোন করি। বলে, নেমেছে। বাসায় অপেক্ষা না করে আমি হাঁটতে হাঁটতে এগোতে থাকি। ওকে কাছে পেলে জড়িয়ে ধরব নাকি চিৎকার উঠব বা কী যে করব ভাবতে পারছি না। উনিশ বছরে কত কথা জমে আছে। কত গল্প করার আছে। দশ মিনিট পেরিয়ে যেতে আবার ফোন করি। বলে, আসছি। আমাকে অধৈর্যে পায়। বলি, আমি হেঁটে এগুচ্ছি। রিকশায় আসতে পথেই আমাকে দেখতে পাবে। আমার গায়ে শাদা টি-শার্ট, কালো প্যান্ট।

বিশ মিনিট পর আবার ফোন দিই। ও আগের মতোই বলে, আসছি।

আরো কিছুক্ষণ পর আধো আলো আধো অন্ধকারে এক যুবককে হেঁটে আসতে দেখে চিৎকার করে উঠি, কাজল না!

কাজলও বলে, বাবলু?

আমরা অনেকক্ষণ পরস্পরে জড়িয়ে ধরে রাখি। ওর কাঁধে নাক ঘষে স্কুলবেলার ঘ্রাণ খুঁজি। ভালো লাগে, বড় ভালো লাগে। বলি, চলো, বাসায় চলো।

৪.
খেতে বসে ও তেমন কিছুই খেলো না। আমার আর আমার বউয়ের যৌথ পীড়াপীড়ির বিপরীতে কেবল একটু মুচকি হাসি ফেরত দেয়। তখন আকাশে ওঠে চাঁদ। গোলাকার পূর্ণচন্দ্র। কাজলদের বাসায় একটা ড্রেসিংটেবিলে বিশাল একটা আয়না সাঁটা ছিল আর ছিল এমন আশ্চর্য গোল। আমি আর কাজল বাসা থেকে বেরিয়ে একটা নির্জন পথের পাশে এসে বসে ওদের বাসার সেই ড্রেসিংটেবিলটার ন্যায় গোল চাঁদের দিকে তাকিয়ে উনিশ বছর আগের স্মৃতিচারণ করতে করতে অনেকটা চুরি করে এক অন্যের দিকে তাকাই। কাজলের মুখটা সেই আগের মতন ফর্সাই আছে। ঘাড় সোজা করলে মুখের ওপর ওর জেদি ভাবটা ফুটে ওঠছে। কিন্তু পায়ে ওর ছেঁড়া স্যান্ডেল, ডান বুড়ো আঙুলে বাঁধা ব্যান্ডেজ। কারণ জিজ্ঞেস করলে ‘ও কিছু না’ বলে এড়িয়ে যায়। ওর দিকে সিগ্রেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিলে ও ‘খায় না’ বলে হাসিমুখে প্রত্যাখ্যান করে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ধরা আমার হাতে সিগ্রেট অনবরত জ্বলতেই থাকে। এত বছরের জমানো গল্পের কোনটা রেখে কোনটা নিয়ে কথা বলি, কিভাবে বলি এই সব ভাবতে ভাবতে দেখা গেল, চোখ পিটপিট করে একে অন্যে তাকিয়ে থেকে ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা অনুভব ব্যতীত অনেকক্ষণ আমরা বলার মতো কোনো বিষয়ই খুঁজে পাই না। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই কথার ফাঁকে ফাঁকে কিছু বৈষয়িক প্রসঙ্গ ঢুকে পড়ে। ও আমার বেতন সম্পর্কে জানতে চায়। আমি নিঃসংকোচে সব বলি। এরপর ওকে ‘কী করে’ জিজ্ঞেস করলে, কমলপুর বাসস্ট্যান্ডে জুতার দোকান দিয়েছে বলে জানায়। আরো জানায়, ক্যাপিটেলের অভাবে সুবিধা করতে পারছে না।

কাজল কাছে এলে তা যেভাবে যে পরিস্থিতিতেই আসুক, ওর জন্য সম্ভব সবই করব বলে উনিশ বছর ধরে আমি যে ইচ্ছাপোষণ করে রেখেছি কী কারণে জানি না, ওর মুখে ‘ক্যাপিটালের অভাব’ কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরটা আচানক সতর্ক হয়ে ওঠে।

তখন পড়াশোনা শেষে ভালো চাকরি, বিয়ে আর আরো যা যা অর্জনের গল্প ওকে এতক্ষণ ধীরে ধীরে শোনাচ্ছিলাম, এক অদ্ভুত অথচ অব্যর্থ কায়দায় এইগুলোর মাঝখানে সাংসারিক টানাপোড়েনের বেশকিছু নির্জলা মিথ্যার দাঁড়ি-কমা বসিয়ে দিতে থাকলাম। ও ধার চাইবার আগে নিজেই বললাম, আব্বা ও ছোটচাচাকে হজে পাঠিয়ে আমি প্রায় শেষ, সামনে বউয়ের বাচ্চা হবে তবু ব্যাংকে কয়েক হাজার টাকা জমা নেই, বাড়িভাড়া পড়ে রয়েছে তিনমাস!


আমার আত্মাটা কষ্ট পাইতেছে। আত্মারে কষ্ট দিতে হয় না!


কথা আর এগুতে চায় না। ওর ভাইয়েরা, খালাম্মা-খালু এমনকি বিউটির প্রসঙ্গ শেষ না করেই আমরা উঠে পড়ি।

হাঁটতে হাঁটতে বাসার দিকে এগোবার মুখে হঠাৎ কাজল বলে, বাবলু, আমি যাই।

আমি বজ্রাহত হই, যাই মানে! কোথায় যাবে?

কাজল কোনোমতে না বলার মতো বলে, বাবলু, আমার কাছে রিকশাভাড়া নেই। পারলে তুমি আমাকে বিশটা টাকা ধার দাও। আমি তোমারে পরে ফ্ল্যাক্সি করে দেবো।

আমি ওর হাত ধরে ফেললাম, কাজল, বাসায় চলো। এত রাতে হঠাৎ তোমার কী হলো!

ও হাত ছেড়ে দেয়, আচ্ছা আমি যাই।

আমি ওর বাহু চেপে ধরি, প্লিজ, একবার বাসায় চলো। এভাবে যেতে নেই।

আমার হাতের মুঠো থেকে খুব ধীরে বাহু ছাড়িয়ে আর কোনো কথা না বলে কাজল হাঁটা দেয়। উনিশ বছর আগের সেই হাঁটা। চাঁদের আলোর যে-টুকু ফরসা দেখা যায় খুব দ্রুতই অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কাজল তা পার হয়ে যায়। হতবিহ্বল আমি কেবল তাকিয়েই থাকি।

আত্মা কষ্ট পাওয়ার ব্যাপারটা এত বছর বুঝি নি। এই মাত্র কাজলের চলে যাওয়ায় ভৈরবপুরের আঃ রহমান গেটের মেস, রেলওয়ে স্কুল আর এর সামনে জড়ো করে রাখা মূক পাথর, পরিত্যক্ত রেললাইনের পাশে নোঙর গাড়া ত্রুটিযুক্ত লঞ্চ আর নিঃশব্দ অজস্র রাত্রির বুকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বহুবার বলা ওর কথাটা এত দূরের বৃত্তাকার চাঁদের আলো ভেদ করে এত বছরের আমার সমস্ত অর্জনকে কাঁপিয়ে দিয়ে দু’কানের খুব কাছে ধ্বনিত হয়, ‘বাবলু, আমার আত্মাটা কষ্ট পাইতেছে। আত্মারে কষ্ট দিতে হয় না!’

ওকে ফেরাবার শেষ চেষ্টায় তখন ব্যস্ত হয়ে আমি ফোন করি, কিন্তু কাজলের ফোন আর খোলা পাওয়া যায় না।

৫.
কাজলের এই ভাবে চলে যাওয়া আরো কত বছরের বিচ্ছেদ নিয়ে আসে কে জানে। অথবা আনলেও আর মনে হয় কষ্ট পাব না, কেননা খুব দ্রুতই আমি সামলে নিয়েছি। ও এলেই তো টাকা-পয়সা, ধার-দেনার আলাপ চলবে। তো কী দরকার! দুয়েকটা মিথ্যায় সারা জীবনের অনাহূত ঝামেলা দূর করতে পারায় দোষের কিছু আছে কিনা, কে জানে!

শাহ ইয়াছিন

শাহ ইয়াছিন বাহাদুর

জন্ম ০৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২; বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক। উপ-সহকারী প্রকৌশলী, বাংলাদেশ টেলিভিশন, নোয়াখালী উপকেন্দ্র, নোয়াখালী।

প্রকাশিত বই :
অন্ধকারের কাছাকাছি [গল্প, মুক্তদেশ, ২০১১]
জলপট্টি [গল্প, পুথিনিলয়, ২০১৬]

সম্মাননা : কেমুসাস (কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট) তরুণ সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৪।

ই-মেইল : yeasinbahadur@gmail.com
শাহ ইয়াছিন

Latest posts by শাহ ইয়াছিন বাহাদুর (see all)