হোম গদ্য গল্প কাচপুস্তকের খতিয়ান

কাচপুস্তকের খতিয়ান

কাচপুস্তকের খতিয়ান
295
0

১.
ঘটনার বিবরণ ভালোভাবে না শুনলে অনেকে আমাকে গ্রিক পুরাণে বর্ণিত বিশেষ একটি চরিত্রের নামাশ্রয়ী মানসিক রোগী বলতে পারে। ভালোভাবে বুঝিয়ে বলার পরেও চিন্তার বিশৃঙ্খলায় হুটোপুটি খেয়ে অত্যন্ত জটিল এই আত্মানুসন্ধানকে তারা আওতার মাঝে না পেয়ে সরলীকরণ করে যা হোক কিছু একটা বুঝে নিয়ে নিজেদের জ্ঞানী ঠাওরাতে পারে। তাদের উচ্চমার্গের মনোবিশ্লেষণের জাঁতাকলে পড়ে আমি ব্যাপারটার উপসংহার টানব এভাবে, ‌’আরেহ… আমি তো মজা করে বলেছি এসব। অমন কিছু ঘটে নি।’ উপসংহারের সাথের ক্রিয়াপদটি ভবিষ্যৎকাল, কারণ এখনও ব্যাপারটা কাউকে বলি নি আমি। বলার মতো কাউকে পাচ্ছি না। বলব যে, সে সম্ভাবনাও নেই। এসব ব্যাপার কাউকে বলে সময় নষ্ট করার চাইতে অনুসন্ধানের অভিযাত্রী হওয়া ভালো। খুঁজে পাবার সম্ভাবনা যদিও খুব কম, তারপরেও আবছাভাবে তার আবছায়া এসে আমাকে প্রায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিলে নিজেকে ভীষণ জ্যান্ত লাগে। পরক্ষণেই অবশ্য সে মিলিয়ে যায়। মিলিয়ে যায় বাতাসের তৈরি হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো, স্পন্দিত হৃৎকম্পনের স্পর্ধিত সাহস নিয়ে। আমাকে ক্লিন্ন এবং ক্লিষ্ট করে সে চলে যায়। তাকে ফিরিয়ে আনার রোখ আমার জীবনের চালিকাশক্তি হয়ে থাকে। ভবঘুরেদের মতো এলোমেলো ঘুরতে থাকি সারাবেলা। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীদের কেউ কেউ আশ্চর্য নির্বিকারতায় নিজের আসন্ন বিলীন নিয়তিকে মেনে নেয়। আমি জানি, আমিও সেরকম কোনো গুরুদণ্ডপ্রাপ্ত, হয়তোবা অভিশপ্ত। সুখী লেবাস পরিহিত এই আমি সানন্দে ছুড়ে ফেলতে পারি যাবতীয় দ্বিধার খোলস, ছুটে বেরুতে পারি বারণের নৃত্যবৃত্ত চপল পায়ে। পসরা সাজাচ্ছি বেচব বলে, বাঁচব বলে, তাকে নিয়ে। বারেবার ভেঙে পড়ে নির্মীয়মাণ ইমারত। এটা একদিক দিয়ে ভালোই, বারেবার সাজানোর সুযোগ পাই আমি। তাকে সাজাতে আমার কখনও ক্লান্তি আসবে না, জেনে গেছি। বিষমপুরের বিবমিষা, সে তোমাদের জন্যে গচ্ছিত রাখো। যখন আমাদের দুজনকে একসাথে দেখবে, যত পারো উগরে দিও হৃদম্লীয় তরল, ঈর্ষা এবং ঘেন্নার গরল। অবহেলার আঁস্তাকুড়েতে কম জায়গা রাখি নি তোমাদের জন্যে।

২.
আমার স্ত্রী ব্যাপারটা এখনও বুঝতে পারে নি। সম্ভাব্য বুঝদারদের তালিকায় তার নাম অবশ্য প্রথমেই! আমার ভেতর লুকোবার কোনো চেষ্টা নেই। তাই, হয়তোবা খুব সহসাই সে অনুধাবন করবে কী প্রবল একজন প্রতিপক্ষের উদয় হয়েছে তার জীবনে! প্রতিপক্ষের প্রতি প্রতিহিংসার পাশাপাশি সে অনুভব করবে দায়, এই অনভিপ্রেত আগমনে যা এড়ানোর সুযোগ নেই তার, অনুভব করবে মাঝেমধ্যেই খেলাচ্ছলে সহযোগিতা করে কী বিতিকিচ্ছিরি বিপদটাই না টেনে এনেছে! তখন কী আমি তাকে চলে যেতে দেবো? না। সেটা আমার পক্ষে সম্ভব না। তার গোলাপি ঠোঁটে রক্ষিত আছে আমার পুণ্যের আমলনামা, দীর্ঘনিশির নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর সালতামামি, তার কাঁধ থেকে প্রজাপতি অথবা পরি বা পাখির মতো ডানা বের হয়ে আমার ঘর্মাক্ত দেহ এবং নর্দমাক্ত মনকে হাওয়া দিয়ে উড়িয়ে দিত সমস্ত ক্লেশ এবং ক্লেদ। কিভাবে তাকে ছেড়ে যাই আমি অথবা তাকে ছেড়ে যেতে দিই? কিন্তু সে নিশ্চয়ই অন্য কারো সাথে ভালোবাসা ভাগাভাগি করতে রাজি হবে না। আর এতটুকু আত্মসম্মান যদি তার না থাকে তাহলে আমিই বা কী করে ভালোবাসি তাকে?


চুমু ছাড়াও শৃঙ্গারের যাবতীয় কলাকৌশল প্রয়োগ করে তাকে আমি অস্থির করে তুলি। এই অস্থির প্রবাহে ভেসে গিয়ে সে লক্ষ করে নি আমি অপলক চেয়ে আছি আয়নার দিকে


৩.
ইদানীং আমি নিয়মিত শেভ করি, অনেক সময় নিয়ে। নিজের সৌন্দর্যের ব্যাপারে কখনই তেমন সচেতন ছিলাম না। এখনও যে হয়েছি তাও না। শেভ না করলেই আমাকে নাকি ভালো লাগে। বাকপটু সহকর্মী কটাক্ষ ভরে আমাকে ‘মাকুন্দা’ নামক অপমানজনক আধা স্ল্যাং দিয়ে সম্ভাষণ করে, তার দিকে আমি তীর্যক দৃষ্টিতে তাকাই। কী এক অবাক ভালোবাসার পেছনে ছুটছি আমি তাকে বলে দেবো? সে কী বুঝবে? সে কি ভুলে গেছে যে একদিন ক্লিনশেভড অবস্থায় অফিসে আসার পর আমার গাল থেকে বিচ্ছুরিত নীলচে আভা নিয়ে সে একপ্রস্থ প্রশংসাসূচক কাব্য পর্যন্ত করে ফেলেছিল। ভুলে গেছে সে? হয়তোবা মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করে নি। কিন্তু আমি মনে রেখেছিলাম। আমার স্ত্রীকেও বলেছিলাম সে কথা। সে ঈর্ষান্বিত না হয়ে বরং উসকে দিয়েছিল আমাকে—

‘বাব্বাহ! এরকম প্রশংসা তো আমি মেয়ে হয়েও কখনও পাই নি। তুমি যদি এখন ঘনঘন শেভ করা শুরু কর, তাহলে মোটেও অবাক হব না।’

যদিও তার পছন্দ ছিল আমার কয়েকদিনের না কামানো মখমলের মতো নরম দাঁড়ির স্পর্শ। তার কিছুদিন পরই আমি নিয়মিত শেভ করা শুরু করে দিই এবং আমার পরিবর্তনে সুন্দরী পৃথুলা কলিগের নির্লিপ্ততায় কতটা ব্যথিত হয়েছি তা করুণ স্বরে বর্ণনা করি। খেলাটা বেশ বিপদজনক ছিল, সন্দেহ নেই, কিন্তু কিভাবে যেন, কী ভেবে যেন সে এই খেলাটা অনুমোদন করে এবং আমরা অনিয়মিত বিরতিতে খেলাটা খেলতে থাকি।

৪.
একদিন রাত্তিরে, শোবার আয়োজন করার সময় আমার সদা পরিপাটি সহধর্মিনী যখন তার প্রসাধন সামগ্রীগুলো সাজিয়ে রাখছিল যতন করে, তখন আমার মাথায় এক অদ্ভুত খেয়াল চেপে যায়। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে তার প্রসাধনসামগ্রীগুলো নিজে ব্যবহার করার ইচ্ছে ব্যক্ত করি। নতুন খেলার প্রস্তাবটি তার বেশ পছন্দ হয়। হয়তোবা এতদিন ধরে চলে আসা খেলাটির খেলুড়েদের সংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কা করেছিল সে, দুই থেকে তিন… হতে পারে না? বৃহৎ মনের পরিচয় দেয়াটা সংকোচের আবরণে ঢেকে যাচ্ছিল। নতুন খেলাটা হয়তোবা তাকে এবং আমাকে আসন্ন মনোমালিন্য এবং সন্দেহের বেড়াজাল থেকে মুক্তি দেবে, তাই সে বেশ উৎসাহ ভরেই রাজি হয়। আমার ঠোঁটে লিপস্টিক, চোখে কাজল আর কপালে একটা মস্তবড় টিপ দিয়ে সজ্জিত করার পর তার সে কী হাসি!

—দ্যাখো, দ্যাখো না একবার আয়নায় নিজেকে! উফ! মারা যাব হাসতে হাসতে!

আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বটাকে বড় অচেনা লাগে। কোনোরকম হাস্য উপকরণ খুঁজে পাই না আমি। প্রথম দেখায় স্বভাবতই খুব অদ্ভুত লেগেছিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই চোখটা ধাতস্থ হয়ে আমাকে জানান দেয় যে, মেয়ে হয়ে জন্মালে আমি কিরকম সুন্দর হতে পারতাম। হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। আমার মা’র স্টুডিওতে তোলা শাদাকালো ছবিগুলো দেখলে যে কেউ ধন্দে পড়ে যাবে সেটা চিত্রনায়িকা ববিতার ছবি নাকি সাধারণ এক আটপৌরে ঘরের তরুণীর শখ করে তোলা ছবি, এ নিয়ে। সুতরাং, তার সন্তান যদি ছেলে না হয়ে মেয়ে হতো তাহলে ডাকসাইটে সুন্দরী হতো, এতে সন্দেহ কী? অন্তত আমার মুটিয়ে যাওয়া স্ত্রীর চেয়ে ঢের সুন্দর হতো। আমি বিহ্বল চোখে তাকিয়ে থাকি বেশ কিছুক্ষণ আয়নার দিকে। ওদিকে আমার স্ত্রী হেসে গড়িয়ে পড়ছে গায়ের ওপর।

—হয়েছে, হয়েছে এবার রাখো! আহা কী রূপ! ভাগ্যিস আমি লেসবিয়ান না!

আমি আমার খসখসে গালে এবং ঠোঁটের সন্নিকটের ওপরের অংশটুকুতে অসন্তোষে হাত বোলাই। শেভ করা হয় নি বেশ কদিন।

—এই খোঁচা খোঁচা অংশগুলো না থাকলে কিন্তু প্রায় পুরোপুরিই মেয়েদের মতো লাগত, তাই না?

—হ্যাঁ, তা ঠিক। একেবারে সোফিয়া লরেন হয়ে যেতে!

—শেভ করে আসব নাকি?

পুরাতন ফাজলামির বা খেলাটার প্রসঙ্গ তোলায় তার কিন্নর হাসিতে কিছুটা ছন্দপতন ঘটে যেন। আশঙ্কাকে আবারও হাস্যরসের আবরণে মুড়িয়ে সে আমাকে ঘুমুতে যাবার আমন্ত্রণ জানায়।

—এসো গো সুন্দরী। শেভ করতে হবে না। আবার সেই পুরুষটা হয়ে যাও। ঘুমুতে যাবার আগে আমাকে একশটা চুমু খাও!

এ প্রস্তাবে অসম্মত হবার কোনো কারণ ছিল না। চুমু ছাড়াও শৃঙ্গারের যাবতীয় কলাকৌশল প্রয়োগ করে তাকে আমি অস্থির করে তুলি। এই অস্থির প্রবাহে ভেসে গিয়ে সে লক্ষ করে নি আমি অপলক চেয়ে আছি আয়নার দিকে, নিজের নতুন রূপ প্রত্যক্ষ করছি অবাক দৃষ্টিতে। সেদিনের মতো সবকিছু সাঙ্গ হলে দাড়ি কামানো খেলাটার বিস্তারিত রূপ মনশ্চক্ষে অবলোকন করে অদ্ভুত সব স্বপ্নসম্বলিত একটি শিহরিত ঘুম দিই।


নীরবতার বাগানে অভিমান এবং ঈর্ষার থোকা থোকা কাঁটাযুক্ত ফুল ফুটতে থাকে। আমি সাবধানে হাতে নিই পুষ্পস্তবক।


৫.
—আপনাকে আজ বেশ অন্যরকম লাগছে। মাকুন্দা মাকুন্দা লাগছে না মোটেও। আমি আবার কাব্য করব আজ সেদিনের মতন!

ওহ! মনে রেখেছে তাহলে! কী কাব্যি করবে শোনার জন্যে আমি উৎকর্ণ হয়ে থাকি। কিন্তু সে আর কিছু বলে না। তাড়িয়ে তাড়িয়ে আমার আগ্রহ এবং অস্থিরতা উপভোগ করতে থাকে।

—হু! খুব শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে তাই না?

আমার শুনতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমি নিরুত্তর থাকি।

—এখন না, পরে বলব! অফিস টাইমে কি সবকিছু বলা যায়?

একদম প্রাণঘাতী ফ্লার্ট! প্রাণের সলতেয় জ্বলে ওঠে এক নতুন আগুন। অগ্নিবদ্ধ হয়ে কাটিয়ে দিই ব্যস্ত অফিস-সময়। আমাদের মধ্যে আর কথা হয় না। প্রস্থানকালে, লিফটের আকাঙ্ক্ষিত নির্জনতায় সে শুধু একটি কথা বলারই সময় পায়—

—শেভ করলে আপনাকে কিন্তু বেশ লাগে।

বাসায় যাবার পথে আমি সেলুনে যাই।

সেদিন রাতে স্ত্রীর সাথে আবারও সে পুরোনো ফাজলামো করি,

—জানো, আজকে শিমি আমার চেহারার যা প্রশংসা করল না!

—ওহ তাই নাকি! এখন কী হবে বেচারা আমার! তা কী বলল সে?

—কী বলল তা আঁচ করো দেখি! আমাকে দেখে বলো। কিছু বোঝা যায়?

—উমম! তুমি শেভ করে এসেছ। কালকেই না করলে? আজকে আবারও!

খেলাটায় সে তেমন আমোদ পাচ্ছে না বোঝা যায়।

—এমন সুন্দরী সহকর্মিনীর স্তুতিবাক্যের অমর্যাদা করি কী করে বলো!

নীরবতার বাগানে অভিমান এবং ঈর্ষার থোকা থোকা কাঁটাযুক্ত ফুল ফুটতে থাকে। আমি সাবধানে হাতে নিই পুষ্পস্তবক। তাকে আহবান জানাই গতকাল রাতের সেই অদ্ভুত খেলাটি খেলার জন্যে। আজ রাতে খোঁচা খোঁচা পদার্থগুলো ঝঞ্ঝাট করবে না মোটেও। সে আমাকে সাজায়। আমোদ পেয়ে হাসে। ছবি তোলে। কিছু আদিরসাত্মক কথাবার্তাও বলে। আমি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকি আয়নার সামনে। আমার ভেতরের নারীটাকে অনুভব করার চেষ্টা করি। তার অতনু অবয়ব যেন গুমরে গুমরে মরে আমার দেহের ভেতর, প্রকাশিত হবার জন্যে। আরেকটু, আরেকটু অন্যরকম হলে, আরেকটু কমনীয় হলেই তো আমার দ্বিপাশবেষ্টিত নারীদ্বয়, শিমি এবং সানজানাকে টপকে সুন্দরীতমা হতে পারত সে! আমার ভেতরটা ফেটে যায়, ফেটে চৌচির হয়ে যায়, কিন্তু সে বের হয় না। আমি তাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করি, যাবতীয় স্পর্শচেষ্টা সানজানার কামজ দেয়ালে বাধা পেয়ে ফিরে আসে। ঘরের আয়নার সামনে বেশিক্ষণ ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। তাই আমি বাথরুমে যাওয়ার অজুহাতে অন্য আমি অথবা আমার একান্ত অন্য কাউকে উন্মোচন করতে চাই। আমি আরো একবার শেভ করি। সেই সাথে ভাবি, চুল কাটা বন্ধ করে দেবো এখন থেকে।

৬.
সানজানা দিন দিন মুটিয়ে যাচ্ছে। শিমি সুন্দর হচ্ছে। প্রায় সমানুপাতেই এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। সানজানার অতিমাত্রায় রুটিনবাধা গৃহী ভালোবাসা আর শিমির চকিতে দুয়েকটা রহস্যময় চোখভঙ্গি, ছিনালি বাক্যমদিরা পরিস্থিতিটাকে সহজেই একটা গতানুগতিক ত্রিভুজ প্রেমপড়েনে পরিণত করতে পারত, এবং সেখানে চালকের আসনে শিমি বসতে পারত অনায়াসেই। বাঁধ সাধে আমার অন্তর্লীন নিজস্ব নতুন নারী। তার মাঝে কোনো রহস্য নেই। তাকে আমি খোলা বইয়ের মতোই পড়তে পারি, সেও আমাকে। সে সুন্দর, এবং তাকে সুন্দর করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছি দিনকে দিন। সে একসময় সবার চেয়ে সুন্দর হবে। আমার চুলটা আরেকটু বড় হলে, চুলে রং করলে। সে ছাপিয়ে যাবে সবাইকে। শিমির রহস্যময় আহবান আর সানজানার প্রতি নির্ভরতা এ দুইয়ের সমন্বয়ে সে হবে অনন্যা। আমি তার অন্বেষণেই ব্যস্ত থাকি। তাই শিমির প্রতি আকর্ষণ সেভাবে জন্মায় না, সানজানার প্রতি বিকর্ষণও জাগে না তেমন। এই যেমন-তেমন এর মাঝেও কিছু কিছু ঘটতে থাকে হয়তোবা…

—চুল বড় রাখাতে তোমাকে দারুণ লাগছে। একদম জনি ডেপের মতো।

আমাদের সম্বোধন তুমিতে উন্নীত হয়। প্রশংসা শুনতে ভালো লাগে আমার। বিশেষ করে শিমির কাছ থেকে। তবে তার চেয়েও বেশি আকাঙ্ক্ষিত নিজের কাছ থেকে নিজেকে! রাতের অপরূপ আঁধিয়ারিতে আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারীর মুখ দেখতে পারি। ওহ খোদা! তুমি কেন আমার দুটো জন্ম দিলে না? আমি যে আর কাউকে ভালোবাসতে পারি না। নির্ভরতা আর কামাবেগের জোড়াতালি দিয়ে শিংমাছের মতো দীর্ঘদিন প্রেমজলে জিইয়ে রাখা দুটো অসম্পর্ক অসহ্য লাগে এখন! শিমির দিকে আমি খরচোখে তাকাই।

—কী হয়েছে তোমার, বলো তো আমাকে!

—তোমার খুব শুনতে ইচ্ছে করে, না?

প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপটা বেশ প্রকটভাবেই প্রকাশিত হয়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শিমি। এমন সুরে কথা শুনে সে অভ্যস্ত না।

—তোমাকে বলব একদিন হয়তো সবই। হয়তো-বা শুধু তোমাকেই।

—আমার সাথে রহস্য করবা না। স্পষ্ট করে কথা বলার সময় এসেছে এখন। তুমি কাকে চাও? সানজানা নাকি আমাকে?

—যদি বলি অন্য কাউকে?

—যদি টদি না, অন্য কেউ থাকলে সেটাও স্পষ্ট করে বলো।

—বললে তুমি বিশ্বাস করবে? ব্যাপারটা যথেষ্টই উইয়ার্ড।


নার্সিসিস্ট হলে আমি নিজেকে ভালোবাসতাম, নিজের সকল কাজকর্মে মুগ্ধ হতাম, নিজের প্রতিবিম্বের প্রেমে পড়তাম…


৭.
শিমি মন দিয়ে আমার কথা শোনে। কফি এবং মুরগির হাড্ডিগুড্ডিও হয়তো পাকস্থলির ভেতর থেকে উদগ্র আগ্রহে ওঁত পেতে থাকে। এবং সে যথারীতি ভুল বোঝে। এই আখ্যানের একদম শুরুতে যা উল্লেখ করেছিলাম। সে আমার মনোবিকলনকে সরলীকরণ করে একটি গৎবাঁধা মানসিক রোগের নাম বলে যা গ্রিক মিথোলজি-উদ্ভূত।

—ইউ আর নার্সিসিস্ট, রাইট? সে তো আমিও। আমরা প্রায় সবাই।

—নার্সিসিস্ট হলে আমি নিজেকে ভালোবাসতাম, নিজের সকল কাজকর্মে মুগ্ধ হতাম, নিজের প্রতিবিম্বের প্রেমে পড়তাম…

—হ্যাঁ, এখানে তো তাই হচ্ছে! তুমি আয়নায় নিজেকে দেখে নিজের প্রেমে পড়ে গেছ, একই তো ব্যাপার।

—আমি নিজেকে দেখি নি। নিজের প্রেমে পড়ি নি।

—মানে? তাহলে কাকে দেখেছ? আচ্ছা, আবার গোড়া থেকে শুরু করা যাক ব্যাপারটা…

—শাট আপ স্টুপিড বিচ! ইউ উইল নেভার আন্ডারস্ট্যান্ড।

কাকে কী বলছি! আমি জানতাম কেউ বুঝবে না। কারো সাধ্যি নেই বোঝার।

৮.
অথচ আমি নিজেই কি বুঝি নিজেকে? বছর পেরিয়ে গেছে। আমার যন্ত্রণা বাড়ছে। আমি পীড়িত হচ্ছি। নির্ভর নশ্বরতার উৎকেন্দ্রিকতা আমার অনিবার অনুরাগকে দলিত করছে। দর্পণের কাছে নিজেকে অর্পণ করে দর্প চূর্ণ হয়েছে কেবল। আমার ভেতরের নারীটা আমায় দেখে হাসে এখন। স্পর্শের আড়ালে অগ্নীভূত অনুভূতিরা ভেজা কাঠ হয়ে থাকে। সেই ভেজা কাঠগুলো এখনও সানজানা এবং শিমির অর্ধ-উত্তপ্ত চুলোয় বসিয়ে গরম করি। সে আমাকে তার অপারগতা জানিয়েছে। জানিয়ে দিয়েছে তার সীমাবদ্ধতার কথা। তাকে বন্দিশালা থেকে মুক্ত করার ক্ষমতা আমার নেই, সেও পারবে না বেরুতে।

—তো কী হবে? কী করব এখন?

—সানজানা অথবা শিমি যেকোনো একজনকে বেছে নাও, একদম ভালো মানুষের মতো। তারপর মাঝেমধ্যে আমাকে নিয়ে খেলো।

—শাট আপ স্টুপিড বিচ! ইউ উইল নেভার আন্ডারস্ট্যান্ড।

আমি ভাবতেও পারি নি, তুমিও বুঝবে না।

৯.
তাই,

আমি…

একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম অবশেষে।

শিমির সাথে আমার গোপন সম্পর্কটা ঠিকই বজায় রাখব, কিন্তু কোনো শারীরিক ব্যাপার না। কারণ, আমি সানজানার প্রতি ‘বিশ্বস্ত’ থাকতে চাই।

সানজানার সাথে পুরনো ফাজলামি, খেলাধুলো এসব বাদ দিয়ে তাকে ভালোবাসব, এবং প্রচুর সেক্স করব। কারণ, আমি তাকে ভালোবাসি।

আর আমার সেই রহস্যময় নারী! তাকে অন্বেষণের চেষ্টা! শি! রিটার্ন অফ শি! নো ফাকিং ওয়ে। জাস্ট বাথরুমের আয়নার সামনে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে তাকে দেখে জার্ক অফ করব। সিম্পল!

১০.
একদিন বাসায় এসে দেখি সবগুলো আয়না ভাংচুর করে গেছে কারা যেন। আর কোনো ক্ষয় ক্ষতি হয় নি। সানজানা ঠিকই গুনগুন করে গান গেয়ে ঘরের কাজ করছে!

—আয়নাগুলো সব ভেঙে গেছে। কালকে মিস্তিরি ডাকিয়ে ঠিক করে নিয়ো।

আমি জানতে চাইতে পারতাম, কেন শুধু আয়নাগুলোই ভাঙল, কেন অন্যান্য জিনিস অক্ষত থাকল, কিভাবে এসব ঘটল, এতসব কিছুর পরেও সানজানা কেন এত নির্বিকার। জিজ্ঞেস করতে পারি নি সানজানার মুখে ক্রূর হাসি দেখে। আমি জানি, কালকে অফিসে গিয়েও সব কাচ ভাঙা দেখব, এবং শিমিও এরকম ক্রূর হাসি হাসবে।

ঠিক আছে বালিকারা! আমি আত্মসমর্পণ করছি। তোমাদের দুজনের কাছেই। একদিন হয়তো শহরের সব বিপণিবিতান, ঘর, সেলুনের কাচ ভেঙে যাবে তোমাদের ইন্ধনে। তবে জেনে রেখো, ভাঙা কাচের টুকরোতেও কখনও দেখা যেতে পারে নিজের প্রতিবিম্ব, অনুভব করা যেতে পারে অনাস্বাদিত ভালোবাসা। গ্যালাক্সির প্রতিফলিত সমস্ত আলোর আল ধরে আমি অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব না কখনও। তার দরকারও নেই। কাচপুস্তকে ইতোমধ্যেই মুদ্রিত হয়ে গেছে আমার অহমিকার খতিয়ান। তোমরা তা দেখতে পেলে তো!

হাসান মাহবুব

জন্ম ৭ নভম্বের; ১৯৮১, ঢাকা। কুয়েট থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক বিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে ‘অন্যরকম ইলেকট্রনিক্স’-এর মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই—

প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত [কাঠপেন্সিল, ২০১২]
আনন্দভ্রম [অনুপ্রাণন, ২০১৬]
নরকের রাজপুত্র [অনুপ্রাণন, ২০১৭]

ই-মেইল : paranoidteen@gmail.com

Latest posts by হাসান মাহবুব (see all)